#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৯_
দুই মাসের বাচ্চাকে নিয়ে আজ অফিসে পা রাখলো প্রভা। অফিসের বিশাল কাঁচঘেরা ভবনটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নিজের ভেতর এক অস্থিরতা অনুভব করলো সে। গত কয়েক মাসে তার জীবনে এত কিছু বদলে গেছে যে মাঝে মাঝে মনে হয়, আগের সেই প্রভা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। এখন সে শুধুই একজন মা। একজন একাকী মা, যার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ছোট্ট একটি শিশু।
বুকের সঙ্গে তোয়ালে জড়িয়ে রাখা ইফতি। তার ছোট্ট মাথাটা মায়ের বুকে হেলান দিয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে নিঃশ্বাসের উষ্ণতা এসে স্পর্শ করছে প্রভার শরীর। গত পনেরো দিন ধরে নিজের নতুন ফ্ল্যাটে থাকছে সে। বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। পরিবারের সবাই আপত্তি জানিয়েছিল। রহিমা ইয়াসমিন অনেক বুঝিয়েছেন। ইকবাল শিকদারও চেয়েছিলেন মেয়েটা অন্তত আরও কিছুদিন তাদের কাছেই থাকুক। কিন্তু প্রভা নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল। জীবনের একটা সময় পর্যন্ত সে অন্যদের সিদ্ধান্ত মেনে চলেছে। কখনো বাবার কথা, কখনো স্বামীর কথা, কখনো সমাজের কথা ভেবে নিজের ইচ্ছেগুলোকে চাপা দিয়েছে। এখন আর সে সেটা করতে চায় না।
নতুন ফ্ল্যাটটা খুব বড় নয়। মাত্র দুই কামরার ছোট্ট একটা বাসা। তবুও সেটাই এখন তার নিজের। প্রথম কয়েকদিন রহিমা ইয়াসমিন তার সঙ্গে ছিলেন। নাতিকে সামলেছেন, মেয়েকে বিশ্রাম নিতে সাহায্য করেছেন। কিন্তু, হঠাৎ করেই পিয়াস অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। তারপর থেকে পুরো দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছে প্রভা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে পেরেও যাচ্ছে। রাত জেগে বাচ্চার কান্না থামানো, ডায়াপার বদলানো, খাওয়ানো, কাপড় ধোয়া, রান্না করা, সবকিছুর মাঝেও সে টিকে আছে। কখনো কখনো অবশ্য খুব ক্লান্ত লাগে। ভীষণ ক্লান্ত। কিন্তু, ইফতির মুখের দিকে তাকালেই যেন সব ক্লান্তি কোথায় মিলিয়ে যায়।
সমস্যা শুরু হয়েছে অন্য জায়গায়। মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন বাড়ি থেকে কাজ করলেও সেটা আর বেশিদিন সম্ভব নয়। অফিসে ফিরতেই হবে। কিন্তু অফিসে ফিরলে ইফতিকে রাখবে কোথায়? এই প্রশ্নটার উত্তর গত কয়েকদিন ধরে তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এতো ছোট্ট একটা বাচ্চাকে কোনো ডে কেয়ারে রেখে দেওয়ার কথা ভাবতেই তার বুক কেঁপে উঠে। আর বাসায় একা রেখে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বিষয়টা ফারহানকে জানিয়েছিল প্রভা। সব শুনে ফারহান খুব স্বাভাবিক গলায় তাকে পরদিন থেকেই অফিসে আসতে বলেছে। সঙ্গে ইফতিকেও নিয়ে আসতে বলেছে। কথাটা শুনে প্রভা অবাক হয়েছিল। একটা অফিসে দুই মাসের শিশুকে নিয়ে আসবে? ব্যাপারটা তার কাছে মোটেও স্বাভাবিক মনে হয়নি। সে কারণ জানতে চেয়েছিল। কিন্তু ফারহান কেবল আশ্বস্ত করেছিল, কোনো সমস্যা হবে না। এর বেশি কিছু বলেনি। সেই কারণেই আজ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও তার মাথার ভেতর একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সে ঠিক কী করতে যাচ্ছে?
বুকের ভেতর একটা চাপা দুশ্চিন্তা নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে প্রভা। রিসেপশনে বসা কর্মচারীরা তাকে দেখে হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানালো। অনেকদিন পর তাকে অফিসে দেখে সবার চোখেমুখে উচ্ছ্বাস ফুটে উঠলো। কিন্তু তাদের চেয়েও বেশি কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলো ইফতি। কেউ দূর থেকে তাকিয়ে রইলো। কেউ এগিয়ে এসে ছোট্ট মুখটা দেখার চেষ্টা করলো। কেউ আবার মুগ্ধ হয়ে ফিসফিস করে বললো, বাচ্চাটা দেখতে যেন একেবারে পুতুলের মতো। প্রভা সবার প্রতি ভদ্রভাবে হাসলো। কিন্তু তার মন পুরোপুরি অন্য কোথাও। লিফটে উঠে নির্ধারিত ফ্লোরে পৌঁছানোর পরও সেই অস্বস্তি কমে না।
করিডোর পেরিয়ে নিজের ডিপার্টমেন্টের দিকে এগোতে এগোতে প্রভা লক্ষ্য করে, অনেকেই বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। অবশ্য অবাক হওয়ারই কথা। কেউ বাচ্চা নিয়ে অফিসে আসে না। ইফতি হঠাৎ করেই সামান্য নড়ে উঠলো। ছোট্ট মুখটা কুঁচকে এলো। প্রভা দ্রুত তাকে আরও একটু শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিলো। মুহূর্তের মধ্যেই শিশুটি আবার শান্ত হয়ে যায়।
ইফতিকে কোলে নিয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে প্রভা। অফিসে অনেকদিন পর তার ফিরে আসা নিয়েই সহকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল ছিল, তার ওপর কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা, স্বাভাবিকভাবেই সবাইকে আরও বেশি আকৃষ্ট করেছে। কয়েক জন কলিগ কাজ ফেলে এগিয়ে এলো তার কাছে। কেউ ছোট্ট হাতটা ছুঁয়ে দেখল, কেউ গাল টিপে আদর করার চেষ্টা করে। ইফতি অবশ্য এসবের কিছুই বুঝলো না। মায়ের বুকের সঙ্গে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে রইল। বাচ্চা টাকে দেখে সবার চোখে মুখে এক ধরনের মুগ্ধতা ফুটে উঠল। আসলেই, ইফতিকে না আদর করে থাকা কঠিন। তার গোলগাল মুখ, ছোট্ট নাক আর শান্ত অভিব্যক্তি যে কাউকেই মুহূর্তে দুর্বল করে দিতে পারে।
ঠিক তখনই করিডোরের অন্যপ্রান্ত থেকে ফারহানকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ফারহানকে দেখামাত্র সবাই প্রায় একসঙ্গে সরে গেল। কেউ নিজের ডেস্কে ফিরে গেল, কেউ আবার ফাইল হাতে ব্যস্ত হওয়ার ভান করে। মুহূর্তের মধ্যে আশপাশ ফাঁকা হয়ে যায়।
ফারহান ধীর পায়ে এসে প্রভার সামনে দাঁড়ায়। একবার ইফতির দিকে তাকায়, তারপর চোখ তুলে প্রভার দিকে। প্রভা আর অপেক্ষা করে না, বলে ওঠে,
” তুই ওকে নিয়ে কেন আসতে বললি?”
” অফিস করবি না? মাগনা মাগনা টাকা দিবো নাকি তোকে?”
কথাটা শুনে প্রভার মুখ মুহূর্তেই ভোঁতা হয়ে গেল।
” মাগনা মাগনা টাকা কবে দিলি তুই? বাড়িতে থেকে আমি কাজ করে দিইনি?”
ফারহান কাঁধ ঝাঁকায়।
” বাড়িতে থেকে সব কাজ হয়? এখন থেকে মিটিং এটেন্ড করা লাগবে, ক্লায়েন্ট মিট করতে হবে, আরও অনেক কাজ আছে যার জন্য অফিসে আসা প্রয়োজন।”
” সেটা বুঝলাম। কিন্তু ইফতিকে কেন আনতে বললি? আমি তো ওই বাড়িতে মায়ের কাছে রেখে আসতে পারতাম।”
ফারহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলল। তারপর শান্ত গলায় বললো,
” সারাদিন বাবুকে ছেড়ে থাকতে পারবি?”
প্রশ্নটা শুনে প্রভা থমকে যায়। ঠোঁট পর্যন্ত চলে আসা কথাগুলো হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। সে নিচে তাকায়। ইফতি একটা হাত তোয়ালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের জামা আঁকড়ে ধরেছে। প্রভার বুকের ভেতরটা হঠাৎ নরম হয়ে এলো। আসলেই তো, এই ছোট্ট প্রাণটাকে ছেড়ে এখন এক ঘণ্টা থাকাও তার কাছে অসম্ভব মনে হয়। গত দুই মাসে ইফতি তার জীবনের এতটাই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে যে তাকে চোখের আড়াল করার চিন্তাটুকুও কষ্ট দেয়।
সারাদিনের জন্য ইফতিকে অন্য কোথাও রেখে আসবে? ভাবতেই বুকের ভেতর কেঁপে উঠে। প্রভার নীরবতা দেখে ফারহানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে।
” দেখলি? উত্তরটা তোর নিজের কাছেই ছিলো।”
প্রভা কিছু বললো না। ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে প্রভার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর সামনে একটু এগিয়ে আসে।
” ওকে আমার কোলে দে।”
প্রভা ইফতিকে তার কোলে তুলে দেয়। ফারহানের হাতটা বেশ শক্ত, কিন্তু ভীষণ সাবধানী। ইফতিকে কোলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফারহান তার গোলগাল গালে কয়েকটা টপাটপ চুমু দিয়ে দেয়। ইফতি প্রথমে একটু চমকে যায়। তারপরই, হঠাৎ করেই ছোট্ট দুই হাত তুলে ফারহানের গালে থাপ্পড় মারতে থাকে। শক্ত না, একদম আদুরে, এলোমেলো ছোট ছোট হাতের আঘাত। ফারহান হেসে ফেলে। তার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সেই দাড়ির খোঁচায় ইফতির নরম গালে একটু অস্বস্তি লাগে বোঝা যায়, সে মুখটা একটু কুঁচকে আবার হাত নাড়ায়। কিন্তু থামে না। যেন এটা একটা খেলা। ফারহান আরও একবার ঝুঁকে পড়ে আবার চুমু দেয়। ফারহান প্রভার দিকে তাকিয়ে বলে,
” চল।”
” কোথায়?”
” তোর জন্য কেবিন বরাদ্দ করা হয়েছে।”
” কেবিন?”
” ইয়াহ! কাম।”
এই একটা বাক্যের পর আর কিছু ব্যাখ্যা দেয় না সে। ইফতিকে কোলে ধরে এগিয়ে যেতে থাকে করিডোর ধরে। তার পেছনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রভা দাঁড়িয়ে থাকে। মাথার ভেতরটা যেন থেমে গেছে। অফিস, কেবিন, বাচ্চা, সবকিছু একসাথে মিশে ঘোলাটে অনুভূতি তৈরি করছে। সে বুঝে উঠতে পারে না, আসলে এখানে ঠিক কী ঘটছে। কিন্তু এক মুহূর্ত পরই সে পা চালায়। ফারহানের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে প্রভা।
কেবিনের দরজাটা খুলতেই প্রভা এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে যায়। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে উঠেছে। এটা যে শুধুমাত্র একটা অফিস কেবিন, প্রথম দেখায় তা বিশ্বাস করাই কঠিন। সবকিছু অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। একদম মাঝখানে রাখা কাজের টেবিল, তার সামনে আরামদায়ক চেয়ার, পাশে ফাইল রাখার ক্যাবিনেট, সবই স্বাভাবিক। কিন্তু যেটা স্বাভাবিক নয়, সেটা চোখে পড়তেই প্রভার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে উঠলো।
কেবিনের একপাশে ছোট্ট একটা শেলফ রাখা। সেখানে পরিপাটি করে সাজানো আছে ইফতির দুধের কৌটো, ফিডার, কয়েকটা খেলনা। শেলফের ঠিক পাশে একটা ছোট্ট দোলনা। তার পাশেই রাখা একটি ছোট্ট খাট, আর খাটের এক কোণে সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা আছে ক্ষুদ্র একটা মশারি। প্রভা ধীরে ধীরে চারদিকে তাকায়। তারপর অবিশ্বাস মাখা চোখে ফারহানের দিকে ফিরে তাকায়।
” এসব?”
ফারহান ইফতিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন শুনে সে কেবল কাঁধ ঝাঁকায়।
” আমি চাই না, আমার এই পিচ্চি সোনাটার বিন্দুমাত্র কষ্ট হোক।”
কথাটা বলার সময় তার দৃষ্টি ছিল ইফতির মুখের ওপর। প্রভার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠলো। কিছু কিছু মুহূর্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষ শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। ফারহান আবার ঝুঁকে ইফতির গোলগাল গালে একটা চুমু দিল। ইফতি সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ছোট্ট হাত দুটো নাড়াতে লাগে। যেন দাড়ির খোচা লাগায় প্রতিবাদ করছে। সেটা দেখে ফারহান হেসে ফেলে। তারপর, সাবধানে ইফতিকে দোলনার মধ্যে শুইয়ে দিল সে। ছোট্ট শিশুটি হাত পা ছুঁড়ে নিজের মতো খেলতে লাগে। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট কিছু শব্দ বের হচ্ছে। ইফতির দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ফারহান এবার প্রভার দিকে এগিয়ে এল। মুখে গম্ভীর ভাব এনে বললো,
” তো, ম্যাম! আমি ফাইল পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি প্লিজ কাজগুলো কমপ্লিট করুন। ফ্রিতে টাকা দেবো না কিন্তু। কাজের ঘাটতি পেলে স্যালারি কেটে রাখব।”
কথা শেষ করেই ফারহান ভ্রু উঁচু করলো। প্রভা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ফিক করে হেসে ফেলে।
” ওকে, স্যার!”
” গুড! এই উত্তরটাই আশা করছিলাম।”
ফারহানের ঠোঁটেও হালকা হাসি ফুটে উঠলো। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে। দরজার হাতলে হাত রাখার পর আবার ফিরে তাকায়।
” বাট!”
প্রভা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ফারহান গম্ভীর মুখে বললো,
” আমার পিচ্চি সোনার দেখভাল যেন ঠিকঠাক হয়। নাহলে কিন্তু চাকরি নট করে দেওয়া হবে।”
প্রভা হাসি চাপতে পারে না।
” জি, স্যার! বিষয়টা মাথায় রাখবো।”
সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে ফারহান কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই কেবিনটা শান্ত হয়ে যায়। প্রভা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর দোলনার কাছে গিয়ে বসে। ইফতি তখনও নিজের ছোট্ট জগতে ব্যস্ত। মায়ের মুখ দেখতে পেয়ে হাত পা আরও জোরে নাড়াতে লাগে। প্রভা ঝুঁকে তার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেলো।
” তুমি তো দেখি অফিসেও চলে এলে, পাপা!”
ইফতি মুখ দিয়ে বুদবুদের মতো শব্দ করে হাসার চেষ্টা করে। প্রভার বুকটা হঠাৎ উষ্ণ হয়ে উঠে। কয়েক মিনিট ছেলেকে আদর করার পর সে উঠে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই একজন স্টাফ এসে কয়েকটা ফাইল টেবিলের ওপর রেখে যায়। কাজ শুরু করার সময় হয়ে গেছে। প্রভা ইফতির হাতে একটা ছোট্ট খেলনা ধরিয়ে দেয়। দোলনার বেল্টটা ঠিক করে দিল যাতে সে নিরাপদে থাকে। তারপর একবার নিশ্চিত হয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। চেয়ারে বসে ফাইল খুললো সে। অনেকদিন পর অফিসে ফিরেছে। নতুন জীবন, নতুন দায়িত্ব, নতুন বাস্তবতা। তবে এবার একটা পার্থক্য আছে। আজ তার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তার ছেলে তার সঙ্গে আছে।
…
ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা বেশ শান্ত। সোফার একপাশে বসে আছেন ফারিহা পারভিন, আর তার পাশে ফারিন। দুজনের হাতেই চায়ের কাপ, তবে কথার ভাঁজে চায়ের প্রতি কারও তেমন মনোযোগ নেই।মেঝের ওপর রঙিন ব্লক আর খেলনার ছোট্ট রাজ্য সাজিয়ে বসে আছে চার বছরের ফিহা। কখনো পুতুলের সঙ্গে কথা বলছে, কখনো আবার ব্লক দিয়ে উঁচু একটা বাড়ি বানানোর চেষ্টা করছে। মাঝেমধ্যে নিজের মনেই খিলখিল করে হেসে উঠছে। ফারিহা পারভিন চায়ের কাপে আলতো করে চুমুক দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
” রোজ রোজ এই নিয়ে অশান্তি বাধছে আমার সাথে।”
ফারিহা পারভিনের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপ। ফারিন মায়ের দিকে তাকায়। কথাটা কী নিয়ে, সেটা তার অজানা নয়। সে শান্ত স্বরে বললো,
” আচ্ছা, তুমি চিন্তা করো না। ভাইয়া আসুক, আমি কথা বলবো। ডেকে এসেছি আমি।”
” ভালো করে বোঝা। আর এখান থেকে কোনো মেয়ে পছন্দ হয় কিনা দেখতে বল।”
ফারিন হালকা হাসে।
” ঠিক আছে!”
” কতোদিন থাকবি?”
ফারিন একটু ইতস্তত করে উত্তর দিলো,
” পরশু চলে যাবো, আম্মু!”
কথাটা শুনেই ফারিহা পারভিনের ভ্রু কুঁচকে যায়।
” পরশু চলে যাবি মানে? গতকালই তো আসলি।”
” কী করবো বলো? মামা শ্বশুরবাড়ি যাওয়া লাগবে। তোমার জামাই তো অনেক ব্যস্ত থাকে। ছুটি পেয়েছে মাত্র দুই দিনের জন্য। ওই সময়ের মধ্যেই যেতে হবে।”
” তাহলে ভুবনকে এখানে আসতে বল। দুইদিন বেড়িয়ে যাবে। এখানে তো আসেই না।”
ফারিন মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলে,
” মামা শ্বশুর অনেকবার কল করছে। এবার না গেলে রাগ করবে। যাওয়াই লাগবে।”
ফারিহা পারভিন হেলান দিলেন সোফায়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুকের ভেতর থেকে। মেয়েরা বড় হয়ে গেলে যে এভাবেই একসময় নিজেদের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সেটা তিনি জানেন। তবুও মন তো আর সবসময় বাস্তবতা মানতে চায় না। একসময় যে ঘর সারাক্ষণ সন্তানদের কোলাহলে মুখর থাকত, এখন সেখানে নেমে আসে দীর্ঘ নীরবতা।
ফারিন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, তিনি কষ্ট পেয়েছেন। সে এগিয়ে এসে মায়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলে ওঠে,
” এমন মুখ করে আছো কেন? আমি কি আর বিদেশ চলে যাচ্ছি? আবার আসবো।”
ফারিহা পারভিন মৃদু হেসে বললেন,
” তোদের সবাইকে একসাথে কাছে রাখতে ইচ্ছে করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ বোধহয় একটু বেশি স্বার্থপর হয়ে যায়।”
ফারিন কিছু বললো না। শুধু মাথাটা আলতো করে মায়ের কাঁধে রেখে দিল। ঠিক তখনই মেঝেতে খেলা করতে থাকা ফিহা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো,
” নানুমনি! দেখো, আমি কতো বড় বাড়ি বানিয়েছি।”
মুহূর্তেই দুজনের দৃষ্টি সেদিকে চলে গেলো। ফারিহা পারভিনের মুখে অবশেষে সত্যিকারের একটা হাসি ফুটে উঠোল। তিনি এক দৃষ্টিতে ফিহার দিকে তাকিয়ে থাকে। বড়দের চিন্তা, অভিমান আর দীর্ঘশ্বাসের মাঝেও ছোটদের পৃথিবী কতো সহজ, কতো আনন্দে ভরা। সেই আনন্দই হয়তো মাঝে মাঝে সব দুঃখকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেয়।
উপরে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে ফারহান। নিচে নেমেই তার চোখ গেলো ছোট্ট ভাগ্নিটার দিকে। ফিহা এতোটাই মনোযোগ দিয়ে খেলছিল যে মামার উপস্থিতি প্রথমে টেরই পেলো না। ফারহান এগিয়ে গিয়ে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
” কি খেলছো, মামা?”
ফিহা মুখ তুলে তাকাতেই চোখ দুটো চকচক করে উঠে।
” খেলনা দিয়ে খেলি।”
ফারহানের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো।
” তোমার কি আরও খেলনা চাই?”
” ইয়েস, মামা!”
” ওকে! আমি তোমাকে কিনে দিবো, মা! আগামীকাল তোমাকে আমি নিয়ে যাবো, ওকে?”
ফিহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
” ওকে, মামা!”
ফারহান ঝুঁকে পড়ে তার গোলগাল গালে একটা চুমু দেয়। ফিহা খিলখিল করে হেসে উঠে। আরেকবার মাথায় হাত বুলিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। তারপর সোফার দিকে এগিয়ে গিয়ে বসলো। সোফায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই ফারিন টেবিলের ওপর রাখা কয়েকটা ছবি তার দিকে এগিয়ে দেয়।
” এই নাও।”
ফারহান অবাক হয়ে ছবিগুলো হাতে নেয়। প্রথম ছবিটা দেখেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। দ্বিতীয়, তৃতীয় ছবিতেও একই অবস্থা। সবগুলোই বিভিন্ন মেয়ের ছবি। ফারহান বিরক্ত দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকায়।
” এইসব কি?”
” মেয়ে পছন্দ করো। বিয়ে দিবো তোমাকে।”
ফারহান ছবিগুলো টেবিলের ওপর রেখে দেয়।
” এইসব কি আজগুবি কথা? হঠাৎ করে মেয়ে পছন্দ, মানে কি?”
” বিয়ে করবা না তুমি?”
” করবো। আর একটু সময় দে।”
” আর কতো সময়? আর কতোদিন পর বিয়ে করবে তুমি?”
ফারহান উত্তর দেওয়ার আগেই পাশে বসে থাকা ফারিহা পারভিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
” আমি মারা গেলে করবে তোর ভাই।”
মুহূর্তের মধ্যেই ড্রয়িংরুমের পরিবেশ বদলে যায়।ফারহান বিরক্ত হয়ে বললো,
” আরে, আম্মু! আবার শুরু করছো কেন?”
কিন্তু ফারিহা পারভিন আর কোনো কথা বললেন না। মুখ গম্ভীর করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর গটগট করে হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন।
” আম্মু!”
ফারহান একবার ডাক দিল। কোনো উত্তর এলো না।
” আম্মু, শুনো তো।”
তবুও ফারিহা পারভিন পেছনে ফিরে তাকালেন না।ফারহান অসহায় চোখে বোনের দিকে তাকায়। কিন্তু, ফারিনের মুখও তখন গোমড়া।
” আম্মু ভুল কিছু বলে নাই।”
এইটুকু বলেই ফারিনও মায়ের পেছনে হাঁটতে শুরু করে।
” ফারিন!”
ফারহান ডাক দিলো। ফারিন শুনেও না শোনার ভান করে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ড্রয়িংরুম প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু মেঝেতে বসে থাকা ফিহা নিজের খেলনার জগতে মগ্ন রইলো। বড়দের অভিমান, রাগ কিংবা অশান্তির কোনো অর্থই তার কাছে নেই। ফারহান সোফায় হেলান দিয়ে বসে। এক হাত তুলে কপাল চেপে ধরে। মাঝেমধ্যে তার মনে হয়, ব্যবসা সামলানো, শত মানুষের কাজের দায়িত্ব নেওয়া হয়তো সহজ। কিন্তু, নিজের পরিবারের এই একটাই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সবচেয়ে কঠিন। বিয়ে।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

