#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_১২_
মাথা নিচু করে সোফায় বসে আছে ফারহান। ড্রইংরুম জুড়ে এক ধরনের ভারী নীরবতা ছড়িয়ে আছে। অন্য সোফায় বসে আছে ফারিহা পারভিন আর ফারিন।দুজনের মুখই গোমড়া হয়ে আছে। বিশেষ করে ফারিহা পারভিনের মুখের কঠোরতা দেখে বোঝাই যাচ্ছে, তিনি ছেলের কথায় মোটেও সন্তুষ্ট নন।অনেকক্ষণ ধরে কেউ কোনো কথা বলছে না। ফারহান দুই হাত একসঙ্গে জড়িয়ে বসে থাকে। চোখ নিচু। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সারারাত ঘুম হয়নি, সারাদিনও ঘুমায়নি। কিন্তু, এই মুহূর্তে শারীরিক ক্লান্তির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানসিক চাপ।অবশেষে সে গভীর শ্বাস নিয়ে মাথা তোলে।
” আমি জানি, আম্মু! এইটা তুমি সহজে মানতে পারবে না। কিন্তু, আম্মু! বিশ্বাস করো, আমি প্রভাকে বিয়ে করতে চাওয়ার প্রধান কারণ ইফতি!”
কথাটা বলেই ফারহান মায়ের দিকে তাকায়। ফারিহা পারভিন একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখের ভেতর বিস্ময়, রাগ আর হতাশার মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ফারহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলতে শুরু করে,
” প্রভাকে যখন একতরফা ভালোবেসেছিলাম, আর পরে যখন প্রভাকে পাইনি, তখন আমার খুব কষ্ট হয়েছিলো। অনেক রাত ঘুমাতে পারিনি। অনেক সময় নিজেকে সামলাতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু কখনো দম বন্ধ অনুভূতি হয়নি। কিন্তু ওই যে ছোট্ট বাচ্চাটা, ইফতি! ওর থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা ভাবলেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, আম্মু! বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। সেই কষ্টটা প্রভাকে হারানোর কষ্টের থেকেও অনেক বেশি।”
কথাগুলো বলতে বলতে ফারহানের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। ইফতির হাসিমুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার খোঁজ করা, কোলে উঠতে চাওয়া, গলা জড়িয়ে ধরা, শিশুসুলভ অধিকার নিয়ে বলা কথাগুলো। ছোট্ট মানুষটার প্রতি ঠিক কখন এতোটা মায়া জন্মে গেছে, তা নিজেও জানে না ফারহান। শুধু এটুকু জানে, ইফতিকে ছাড়া নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে গেলে বুকের ভেতর শূন্যতা তৈরি হয়। ফারিহা পারভিন হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। তার কণ্ঠে অসন্তোষ স্পষ্ট,
” তাই বলে আমার অবিবাহিত, প্রতিষ্ঠিত, সুদর্শন ছেলে, একটা সন্তানের মাকে বিয়ে করবে? এইটা আমাকে মেনে নিতে হবে?”
ফারিন চুপচাপ বসে আছে। সে জানে এই মুহূর্তে কিছু বলা ঠিক হবে না। ফারহান কয়েক সেকেন্ড মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হালকা হাসে। সে ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
” ইফতিকে আমি খুব ভালোবাসি, আম্মু! হয়তো আমি ওর বায়োলজিকাল ফাদার না। কিন্তু, ইফতিকে দেখলেই আমার পিতৃত্বের টান আসে। মনে হয় ও আমারই সন্তান।”
ফারিহা পারভিন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। ফারহান আবার বললো,
” আমি প্রভাকে ছেড়ে থাকতে পারলেও ইফতিকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।”
কথাটা বলার সময় তার চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়।যেন এই একটি সত্য নিয়ে তার মনে কোনো দ্বিধা নেই। প্রভাকে নিয়ে হয়তো সে হাজারবার ভেবেছে। নিজের অনুভূতি নিয়ে সন্দেহ করেছে। সিদ্ধান্ত বদলেছে। কিন্তু, ইফতির ব্যাপারে তার মনে কখনো কোনো প্রশ্ন জাগেনি। ছোট্ট ছেলেটার প্রতি তার ভালোবাসা নিঃশর্ত। নিঃস্বার্থ। আর ঠিক সেই কারণেই আজ সে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও সরে আসতে রাজি নয়।
ফারিহা পারভিন ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই প্রথম তিনি উপলব্ধি করেন, তার ছেলে শুধু প্রেমে পড়েনি। সে দায়িত্বের প্রেমে পড়েছে। একটা শিশুর হাসির প্রেমে পড়েছে। একটা ছোট্ট হাতের নির্ভরতার প্রেমে পড়েছে। আর সেই ভালোবাসা থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। ফারহান আর কোনো কথা বললো না। সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায় সে।একবার মায়ের দিকে তাকায়। তারপর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো সে।
ফারিহা পারভিন স্থির হয়ে বসে রইলেন। তার চোখ সিঁড়ির দিকে নিবদ্ধ। আর বুকের ভেতরে জন্ম নিতে লাগে দ্বন্দ্ব। একদিকে, সমাজ, মানুষের কথা, বাস্তবতা। অন্যদিকে, নিজের ছেলের চোখে দেখা সেই গভীর ভালোবাসা। কোন দিকটা তিনি বেছে নেবেন, তা এই মুহূর্তে তিনি নিজেও জানেন না। ফারিহা পারভিন মুখ ফিরিয়ে ফারিনের দিকে তাকালেন।
” তোর ভাই এইসব কী বলে গেলো দেখলি? বিয়েতে রাজি হতো না বলে একটা সময় গিয়ে বিয়ের কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আর এখন এসে বলছে, একটা সন্তানের মাকে বিয়ে করবে।”
কণ্ঠে বিস্ময়ের সঙ্গে অসন্তোষও স্পষ্ট। ফারিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। সে জানে, এই মুহূর্তে মায়ের আবেগের বিপরীতে কিছু বলা সহজ হবে না। তবুও সে নিজের মনকে গুছিয়ে নিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
” আম্মু! ভাইয়া যদি এইটাতেই হ্যাপি থাকে, তাহলে ক্ষতি কী?”
ফারিহা পারভিন ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
” তুই তোর ভাইকে সাপোর্ট করছিস?”
” হ্যাঁ, করছি। প্রভা আপুর সম্পর্কে সবটা জানার পর, আমি কোথাও আপুর অন্যায় বা ভুল দেখিনি, আম্মু! একটা মেয়ের জীবনে স্বামীই সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। সেই ভরসার জায়গাটা হারিয়েছে প্রভা আপু! কতোটা কঠিন ছিলো তার সময়গুলো, সেটা আমরা হয়তো পুরোপুরি অনুভব করতে পারবো না।”
ফারিহা পারভিন চুপ করে শুনতে লাগলেন। ফারিন আবার বললো,
” প্রভা আপু তো ইচ্ছে করে সংসার ভাঙেনি। বরং, পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছে। আর যে মেয়ে সংসার হারানোর কষ্ট বোঝে, সে সংসারের মূল্যও বোঝে। আমার বিশ্বাস, প্রভা আপু ভাইয়ার সঙ্গে খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে নিতে পারবে।”
ফারিহা পারভিনের মুখের কঠোরতা কিছুটা নরম হলেও তিনি এখনও নিশ্চুপ। ফারিন একটু থেমে আবার বলে ওঠে,
” আর তুমি তো নিজেই দেখলে, ভাইয়া ইফতির ওপর কতোটা সফট। ছোট্ট বাচ্চাটাকে নিয়ে ওর অনুভূতিগুলো একদম সত্যি। ভাইয়া যেটা চাইছে, সেখানে জোর করে বাধা দেওয়াটা আমার কাছে ঠিক মনে হয় না, আম্মু!”
ফারিহা পারভিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
” তাই বলে।”
কথাটা শেষ করলেন না ফারিহা পারভিন। ফারিন মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
” একটা অবিবাহিত মেয়েকে তুমি ভাইয়ার জীবনে এনে দিতে পারো, আম্মু! কিন্তু, সেই মেয়েটা কালকে ভাইয়াকে ছেড়ে চলে যাবে না, তার কোনো গ্যারান্টি কি আমাদের কাছে আছে?”
ফারিহা পারভিন কোনো উত্তর দিলেন না। ফারিন ধীরে ধীরে মায়ের আরও কাছে সরে এলো।
” কিন্তু প্রভা আপু জানে, একটা সংসার ভেঙে গেলে কতোটা কষ্ট হয়। কতোটা যন্ত্রণা নিয়ে একজন মানুষকে বাঁচতে হয়। আমার বিশ্বাস, প্রভা আপু কখনোই সেই কষ্ট আরেকজন মানুষকে দিতে চাইবে না। আর ভাইয়া যদি সত্যিই ইফতিকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে থাকে, তাহলে সেখানে বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই, আম্মু! ভালোবাসা তো শুধু রক্তের সম্পর্ক দেখে আসে না। কখনো কখনো মায়া, দায়িত্ব আর অনুভূতির সম্পর্কও রক্তের সম্পর্কের চেয়ে অনেক গভীর হয়ে যায়।”
কথাগুলো বলে ফারিন চুপ করে যায়। ফারিহা পারভিন নির্বাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ করেই মনে হলো, তার মেয়েটা আসলেই অনেক বড় হয়ে গেছে, একটা সন্তানের জননী হয়েছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতাগুলো সে কতো সহজে বুঝতে শিখেছে। ফারিহা পারভিনের চোখের সামনে ভেসে উঠলো ফারহানের মুখ। ছেলের চোখে তিনি আজ যে ভালোবাসা দেখেছেন, তা ছিল ভিন্ন ধরনের। সেখানে কোনো মোহ ছিল না, ছিল দায়িত্ব। ছিল একটি শিশুর প্রতি মমতা। মায়ের মনটা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে। তবুও সমাজের ভয়, মানুষের কথা আর দীর্ঘদিনের বিশ্বাস তাকে বারবার টেনে ধরে রাখছে।
…
রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। চারপাশে এক ধরনের নীরবতা নেমে এসেছে। দূরের রাস্তার আলো ঝাপসা হয়ে বারান্দার গ্রিলে এসে পড়ছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস বারবার এসে ফারহানের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, অথচ তার ভেতরের অস্থিরতাকে একটুও কমাতে পারছে না। বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। মুখটা গম্ভীর, চোখে গভীর চিন্তার ছাপ।
এই পরিস্থিতির আশঙ্কাই ফারহান করেছিলো। মায়ের প্রতিক্রিয়া তার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিলো না। বরং, কোথাও না কোথাও সে জানতো, একজন মায়ের পক্ষে এতো সহজে এমন একটি প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সমাজ, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টা তার মায়ের কাছে কঠিন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। সন্ধ্যার দিকে প্রভার বাসা থেকে ফিরে এসেছিল ফারহান। কিছুক্ষণ পর ফোনে আসা একটি ছোট্ট বার্তা তার মনকে অন্যরকম আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিল। প্রভার নম্বর থেকে আসা সেই কয়েকটি শব্দ বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
< আমি বিয়ের জন্য রাজি। ইফতির বড্ড প্রয়োজন তোকে। তুই আমার না হলেও ইফতির হয়ে থেকে যাস। >
মেসেজটা পড়ার পর ফারহানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটেছিল। বুকের ভেতর জমে থাকা অনেকটা ভার যেন হালকা হয়ে গিয়েছিলো। কারণ প্রভা রাজি হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় ছিল অন্য একটি বিষয়, ইফতি তার জীবন থেকে হারিয়ে যাবে না। ছোট্ট ছেলেটার কথা মনে হতেই ফারহানের চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। আড়াই বছর আগের সেই দিনের কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে তার।হাসপাতালের করিডোরে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। চারপাশে ব্যস্ততা, উদ্বেগ আর অপেক্ষার চাপা পরিবেশ। হঠাৎ, করেই নবজাতকের কান্নার শব্দ ভেসে এসেছিল। খুব সাধারণ একটি শব্দ, অথচ সেই মুহূর্তে যেন পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিল তার কাছে। অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গিয়েছিল শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দুতে। কিছুক্ষণ পর সাদা তোয়ালে জড়ানো ক্ষুদ্র দেহটাকে প্রথমবারের মতো কোলে নিয়েছিলো সে। এতো ছোট, এতো কোমল একটা প্রাণকে বুকে জড়িয়ে ধরার মুহূর্তে তার ভেতরে কী পরিবর্তন ঘটেছিল, তা আজও ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। শুধু মনে হয়েছিল, হৃদয়ের গভীরে কোথাও অদৃশ্য এক সূক্ষ্ম সুতো বেঁধে গেছে। সেই সূতোর টান আর কোনোদিন ছিঁড়ে যায়নি।
ইফতির প্রথম হাসি, প্রথম দাঁত ওঠা, প্রথম হামাগুড়ি, প্রথম দাঁড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা, প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী ফারহান। অফিসের ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করে ছেলেটাকে আদর করা, নতুন কোনো শব্দ শিখলে আনন্দ পাওয়া, সামান্য জ্বর হলেও অস্থির হয়ে ওঠা, সবকিছু ধীরে ধীরে তার জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। কখন যে ইফতি তার কাছে শুধুমাত্র প্রভার সন্তান না থেকে নিজের সন্তানের মতো হয়ে উঠেছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। আজ যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে, তখন প্রভা আর ইফতির মধ্যে কোনো তুলনা খুঁজে পায় না সে। প্রভার প্রতি তার অনুভূতি আছে, ছিলও। কিন্তু ইফতির প্রতি যে টান, তা অন্যরকম। সেখানে কোনো চাওয়া নেই, কোনো প্রত্যাশা নেই। আছে শুধু নিঃশর্ত মায়া আর দায়িত্ববোধ। এই কারণেই হয়তো তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ছোট্ট ছেলেটা।
বারান্দার ওপরে তাকিয়ে আকাশের দিকে দৃষ্টি স্থির করলো ফারহান। অসংখ্য তারার মাঝেও তার মন যেন কোনো উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে জানে, তার মা ভুল নন। একজন মা হিসেবে তিনি নিজের জায়গা থেকে ঠিকই ভাবছেন। ছেলের জন্য সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য, সহজ ও নিরাপদ একটি ভবিষ্যৎ চাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু, নিজের অবস্থান থেকেও ফারহান ভুল নয়। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সে বুঝেছে, মানুষ সবসময় সমাজের নিয়ম মেনে ভালোবাসে না। কখনো কখনো ভালোবাসা জন্ম নেয় দায়িত্ব থেকে, অভ্যাস থেকে, কারও নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। প্রভাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়েও আজ তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে ইফতির ছোট্ট হাতের স্পর্শ। ছোট্ট ছেলেটা এখনও কিছুই বোঝে না। কিন্তু ফারহান জানে, তার নিজের জীবনের সঙ্গে ইফতির জীবন অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। আর সেই সম্পর্ক থেকে নিজেকে আলাদা করার কথা ভাবলেই তার বুকের ভেতর এক অসহনীয় শূন্যতা জন্ম নেয়।
ঠান্ডা বাতাস আবারও এসে ফারহানের চুল এলোমেলো করে দিলো। ফারহান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে। সামনের পথ সহজ হবে না, সেটা সে জানে। মাকে বোঝাতে হবে, সমাজের নানা কথা শুনতে হবে, অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তবুও তার মন আজ অদ্ভুতভাবে স্থির। কারণ, জীবনে প্রথমবারের মতো সে নিশ্চিত জানে, ঠিক কী হারাতে চায় না। আর সেই উত্তরটির নাম, ইফতি!
…
সকালের আলো চারিদিকে ঝলমল করছে। আকাশে রোদের তেজ এখনও তেমন বাড়েনি। হালকা বাতাস বইছে বারান্দা জুড়ে। সেই বাতাসে অনন্যার খোলা চুলগুলো বারবার উড়ে এসে মুখে পড়ছে। বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। হাতে মোবাইল ফোন। কারও সঙ্গে বেশ মনোযোগ দিয়ে কথা বলছে। তার কণ্ঠস্বর নিচু,
” হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।”
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতেই অনন্যার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
” না, এখন না। পরে কথা বলবো।”
ঠিক তখনই পেছনে কারও উপস্থিতি টের পায় অনন্যা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলো রাজকে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলেও মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয়।
” রাখছি, পরে কথা হবে।”
কথাটা বলেই কল কেটে দিলো অনন্যা। মোবাইলটা নামিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। রাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তার চোখ দুটো কেমন যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মুখেও স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা নেই। কিন্তু, অনন্যা সেদিকে খুব একটা মন দেয় না। রাজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
” কার সঙ্গে কথা বলছিলে?”
অনন্যা ভ্রু তুলে।
” তোমাকে বলা প্রয়োজন?”
প্রশ্নটা শুনে রাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। তবুও নিজেকে সংযত রাখে সে। শান্ত গলায় বলে,
” আমি তোমার স্বামী। জানার অধিকার রাখি অবশ্যই।”
অনন্যা হালকা হেসে ফেলে। সেই হাসিতে বিদ্রুপের আভাস।
” রাজ, প্লিজ! টিপিক্যাল হাসবেন্ডের মতো করে কথা বোলো না।”
রাজের ভ্রু কুঁচকে যায়।
” আচ্ছা তাই? এখন আমার কথা টিপিক্যাল হাসবেন্ডের মতো লাগছে?”
বিরক্তি নিয়ে চুল সরিয়ে নিল অনন্যা।
” উফ! অফিসে না গিয়ে বাসায় কী করছো তুমি?”
প্রশ্নটা শুনে রাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
” তোমার অসুবিধা হচ্ছে?”
” অসুবিধা কেন হবে? অফিস যাওনি তাই জিজ্ঞেস করছি।”
রাজ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকায়। দৃষ্টিটা অদ্ভুত রকমের স্থির।
” আমার যে জ্বর এসেছে, শরীর ভালো না, এইটা বুঝি তোমার চোখে পড়ে না, তাই না?”
কথাটা শুনে অনন্যা একটু থমকে যায়। প্রথমবারের মতো ভালো করে তাকায় রাজের দিকে। সত্যিই তো। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। চোখ দুটো লালচে। দাড়িগুলোও এলোমেলো। সাধারণত এতো অগোছালো থাকে না সে। অনন্যা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। তারপর ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলো। ধুর! অসুস্থ হওয়ার আর সময় পায় না মানুষটা। এমনিতেই সবকিছু শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এখন যদি রাজ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে পরিকল্পনার গতি কমে যেতে পারে। কিন্তু, মুখে সেসবের কিছুই প্রকাশ করলো না সে। অনন্যা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও জিজ্ঞেস করলো,
” কখন থেকে জ্বর?”
রাজের ঠোঁটের কোণে এক ধরনের তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।
” জানার প্রয়োজন মনে হয়েছে এখন?”
অনন্যা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে।
” প্রশ্নের উত্তর দাও, রাজ!”
রাজ কিছু বললো না। ধীর পায়ে ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু ঠিক তখনই অনন্যা হাত বাড়িয়ে তার কব্জি ধরে ফেলে। রাজ থেমে যায়।অনন্যা অনুভব করে, রাজের শরীর সত্যিই বেশ গরম। হাতের তালুতেই সেই উত্তাপ স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে।
” তোমার শরীরে এখনো বেশ জ্বর আছে।”
রাজ নিজের হাতের দিকে তাকায়, তারপর অনন্যার দিকে। নিম্নস্বরে বললো,
” রাতভর আরও বেশি ছিলো। কিন্তু, তুমি অন্য রুমে ব্যস্ত ছিলে। সারা রাত আমার কাছে আসার সুযোগই তোমার হয়নি। তাই জানো না।”
কথাগুলো খুব শান্ত স্বরে বলা হলেও প্রতিটি শব্দে কষ্ট মিশে আছে। অনন্যা কিছু বলার আগেই রাজ নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। তারপর আর একবারও তার দিকে না তাকিয়ে ভেতরে চলে যায়। অনন্যা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার বিরক্ত লাগছে। ভীষণ বিরক্ত।এমন একটা সময় রাজের অসুস্থ হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। সবকিছু যখন ধীরে ধীরে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে, ঠিক তখনই এই নতুন ঝামেলা। ঠোঁট কামড়ে বিরক্ত স্বরে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
” অসহ্য! এখনই জ্বর আসতে হলো? এখন বসে বসে ওর সেবা করা লাগবে নাকি? এইদিকে জিসানের কাছে না গেলে কুরুক্ষেত্র শুরু করে দেবে। ওহ গড! একদম বিরক্তিকর!”
ঠিক তখনই অনন্যার হাতে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠে একটি নাম। জিসান। নামটা দেখেই অনন্যার মুখের বিরক্তি মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয় সে। ঠোঁটে হালকা হাসি এনে কল রিসিভ করে।
…
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশের শেষ আলোটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে অন্ধকারের ভেতর। নিজের রুমে বিছানার উপর সোজা হয়ে বসে আছেন মারফুয়া বেগম। মুখটা কঠিন, গম্ভীর। চোখে মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ। বেডসাইড টেবিলের উপর রাখা মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিলেন তিনি। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা নম্বরে কল করলেন। রিং হতে লাগে। কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। মারফুয়া বেগম কোনো ভূমিকা না করেই গম্ভীর স্বরে বললেন,
” কাজটা কি ঠিকমতো হচ্ছে?”
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো। মারফুয়া বেগম মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর ঠোঁট শক্ত করে বললেন,
” চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখবে। কোনোভাবেই যেন চোখের আড়াল না হয়।”
আবারও ওপাশ থেকে উত্তর এলো। মারফুয়া বেগম এবার উঠে দাঁড়ালেন। জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।
” পরের সাক্ষাতের দিনটাই হবে ওদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমি সবকিছু প্রস্তুত করে রেখেছি। শুধু হাতেনাতে ধরা পড়ার অপেক্ষা। একবার রাজের সামনে সত্যিটা প্রকাশ পেয়ে যাক, তারপর আর কাউকে ছাড়বো না। যতো প্রমাণ দরকার, যতো কেস দরকার, সব প্রস্তুত আছে। সত্যি আর মিথ্যার এমন জাল বুনেছি যে বের হওয়ার কোনো পথ পাবে না ওরা। সারাজীবন জেলের ভাত খেতে হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। কোনো ভুল যেন না হয়। একটাও না। টাকা সময়মতো তোমার অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। প্রতি সেকেন্ড ওদের ওপর দৃষ্টি রাখবে।”
কথা শেষ করে কল কেটে দিলেন মারফুয়া বেগম। রুম আবার নীরব হয়ে যায়। ফোনটা নামিয়ে রাখতে গিয়েও থেমে গেলেন মারফুয়া বেগম। স্ক্রিনে ভেসে থাকা ওয়ালপেপারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ছবিটা ইফতির। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট ছেলেটা। নিষ্পাপ, উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত। অজান্তেই মারফুয়া বেগমের কঠিন মুখটা একটু নরম হয়ে এলো। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন তিনি ইফতির কাছে যান। সময় কাটান তার সঙ্গে। গল্প করেন। খেলেন। আদর করেন।
আর যতো দিন যাচ্ছে, ততোই একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইফতি দিন দিন অবিকল রাজের মতো হয়ে উঠছে। একই রকম চোখ। একই রকম হাসি। একই রকম মুখের গড়ন। একই রকম গায়ের রঙ। মাঝে মাঝে ছেলেটার দিকে তাকালে তাঁর বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয়, যেন ছোটবেলার রাজকে দেখছেন। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। যে শিশুটি নিজের বাবার প্রতিচ্ছবি হয়ে বড় হচ্ছে, সেই বাবাই আজ পর্যন্ত একবারও তাকে দেখেনি। ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা অনুভব করলেন তিনি।
রাজ কিছুই জানে না। জানে না তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা। জানে না, তার চারপাশে কতো বড় ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে। অথচ রাজ অবেহলা করে গেছে, এমন একজন মানুষ তার জীবনে আছে, যে তার রক্তের সম্পর্ক বহন করে পৃথিবীতে হাঁটছে।মারফুয়া বেগম ধীরে ধীরে বিছানায় ফিরে বসলেন।চোখ বন্ধ করলেন কিছুক্ষণ। আর না। চোখ খুলতেই সেই দৃষ্টিতে ফিরে এলো পুরোনো কঠোরতা। এবার সব সত্যি সামনে আসবে।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

