এক ফোঁটা প্রেমের বিষ পর্ব-০১

0
3324

#এক ফোঁটা প্রেমের বিষ
#Tahmina Akhter
১.

বিয়ে বাড়িতে এসে এরকম একটা পরিস্থিতিতে পড়ে যাব ভাবতেও পারিনি। শাড়ির আঁচলের দিকটা পিন খুলে কোথাও পড়ে গিয়েছে। এত মানুষের ভিড়ে কিভাবে যে ওয়াশরুমে যাব সেটা ভেবে মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমার। আমার তিন ভাইয়ের মধ্যে একজনও নেই আশেপাশে।

কাঁধের কাছে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে রওনা হচ্ছিলাম ওয়াশরুমের উদ্দেশ্য। এমন সময় পেছন থেকে আমার কাঁধে কারো হাতের পরশ পেলাম। পেছনে ঘুরে মানুষটাকে দেখার জন্য চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারিনি। যেভাবে কাঁধ চেপে ধরেছে নড়াচড়া করা মুশকিল।

কিছুসময় পর কাঁধের ভারী অনুভবটুকু কমে গেলো। এবার পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলাম একটি অচেনা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম কারণ অচেনা একটি মেয়ে এসে আমাকে এমন একটা পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছে।

—আপনার নাম কি?

অচেনা মেয়েটার প্রশ্নে আমি নিজেকে স্বাভাবিক করে উত্তর দিলাম।

—আমি মিলি।

— বড়ো নাম নেই আপনার? মিলি তো শর্টনেম!

মেয়েটির কথায় আমি হতবাক হয়ে পরলাম। নিজেকে ধাতস্থ করে হাসিমুখে বললাম,

—আমার পুরো নাম মেহেনুবা আজিম মিলি। আপনার নাম কি? আপনি কি কনে পক্ষের নাকি বরপক্ষের?

— আমি কনে পক্ষের। যেই সুন্দরী মেয়েটার বিয়ে হয়েছে সে আমাদের পঞ্চম আপা।

— পঞ্চম আপা মানে?

—মানে হচ্ছে আমরা ছয় বোন। আমি সবার ছোট মানে ষষ্ঠ নাম্বার মেয়ে। আর আজ যার বিয়ে হচ্ছে সে আমার পাঁচ নাম্বার বোন।

আমি মেয়েটির কথা শুনে মাথা উঁচু নিচু করে ঝাঁকিয়ে বুঝালাম আমি বুঝতে পেরেছি।

— আপনাদের ভাই নেই?

— মিলি, এইদিকে আয়। তোর আব্বু ডাকছে।

মেয়েটা উত্তর দিবে এমন সময়, আমার নাম ধরে কাউকে ডাকতে দেখে সামনে তাকিয়ে দেখি আমার খালা ইশারায় তার কাছে ডাকছে আমাকে। আমি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

— আপনারাও তাহলে এই বাড়িতে থাকেন। তবে আগামীকাল ছাঁদে আসুন না জমিয়ে আড্ডা হবে।
আজ চলি।

—ঠিক আছে।

মেয়েটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে খালার কাছে চলে গেলাম। খালার কাছে যেতে খালা বললো,

—তোর বাবা আর তোর দুই ভাই নাকি আজই চলে যাবে। মাহিম আর তুই এখানে আরও একসপ্তাহ থাকবি, বুঝেছিস?

—হুম।

—আয় ফ্ল্যাটে যাই। তোর বাবা আর ভাইয়েরা তোর জন্য অপেক্ষা করছে।

খালার হাত ধরে ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় একটি ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় কোত্থেকে আরেকটি ছেলেটি এসে আমাকে ধরে ফেললো। ভয়ে আমি চিৎকার দিয়ে ছেলেটির শার্টের কলার আঁকড়ে ধরি।

আমার হৃদপিন্ডের ধুকপুকানি যেন শতগুন বেড়ে গেলো। সেই সাথে আরও একজনের হৃদপিন্ডের ধুকপুকানির শব্দ আমি গাড় ভাবে অনুভব করছি।

—মিলি,তুই ঠিক আছিস? এই মিলি?

খালার গলার আওয়াজ পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালাম দেখলাম, সবই অন্ধকার হয়ে আছে। এবার মাথা তুলে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, সেই ছেলেটার বুকে আমার মাথা। তড়িৎ গতিতে আমি ছেলেটার কাছ থেকে সরে গিয়ে খালাকে জড়িয়ে ধরলাম। লজ্জায় এবং ভয়ে আমার পুরো শরীরে অদ্ভুত এক অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে।

—বাসায় নিয়ে যান এবং পানি খাইয়ে দেন। ঠিক হয়ে যাবে।

—তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ শোয়েব। তোমার জন্য আজ মিলি বড়ো ধরণের দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছে।

আমি খালার বুকে মাথা গুঁজে রইলাম। ভয়ে এখনও আমার পুরো শরীর কাঁপছে। এমন সময় দুটো গুলির শব্দ শোনা গেলো। গুলির শব্দে যেন পুরো বিল্ডিং কেঁপে উঠল। আমি চিৎকার দিয়ে খালাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। এমন সময় শুনতে পেলাম খালা বলছে,

— এটা তুমি কি করলে শোয়েব? ছেলেটা মরে যাবে।

আমি তৎক্ষনাৎ খালার কাছ থেকে সরে এসে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম, আমাকে ধাক্কা দেয়া সেই ছেলেটা রক্তাক্ত হয়ে পড়ে ডানহাত ধরে কাতরাচ্ছে। এত রক্ত দেখে আমার দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। একসময় আর কিছু দেখতে পেলাম না। শুধু অনুভব করলাম, আমার মাথা খুব শক্ত কিছুর সঙ্গে লেগেছে। যার দরুন ব্যাথায় আমি আরও শক্তিহীন হয়ে গেলাম।

প্রচন্ড মাথা ব্যাথা নিয়ে দুচোখ খুললাম অনেক কষ্ট করে। জায়গাটা ভীষণ অচেনা। মনে হচ্ছে না আগে কখনো এসেছি। চট করে মনে পড়ে গেলো আমি নারায়ণগঞ্জ আছি। খালার বাসায়। সিঁড়ির ঘটনা সব কিছু। আমি তড়িঘড়ি করে দাঁড়াতে গিয়েও আবারও বসে পড়লাম কারণ চোখে-মুখে অন্ধকার দেখেছি।

— এখন, কেমন লাগছে তোর মিলি?

খালা আমার মাথায় হাত রেখে কান্নারত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন। আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে খালার কোমড়ে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম। খালা কাঁদছে আমার সঙ্গে। কিছুসময় অতিক্রম হবার পর আমি কিছুটা শান্ত হই। খালা আমার পাশে বসে ধীর গলায় বললেন,

— তোর বাবা আর ভাইয়েরা চলে গিয়েছে কুমিল্লায়। তোর সম্পর্কে ওদের কিছু বলিনি। চল আমাদের ফ্ল্যাটে ফিরে যাই।

বলেই খালা আমার হাত ধরে টেনে দাঁড় করালেন। আমি ধীরপায়ে এক কদম ফেলতেই কেউ এসে আমাকে শূন্যে উঠিয়ে নিলো। আমি চোখ বুজে ফেললাম।

—আপনি যান গিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি মিলিকে নিয়ে আসছি।

পুরুষালি কন্ঠ শুনে চোখ খুলে তাকাতেই দেখতে পেলাম শোয়েব নামক লোকটাকে। যে কি-না একজনকে গুলি করে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। আচ্ছা, সেই লোকটা বেঁচে আছে তো?

খালা লোকটার শুনে রুম থেকে বের হয়ে চলে গেলো। আমি অসহায়ের মতো খালার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে শোয়েব নামক লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

—আমাকে নামিয়ে দিন। আমি হেঁটে যেতে পারব।

মিলির কথা শুনে শোয়েব ভ্রু কুঁচকে মিলির চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,

—আমি নিশ্চয়ই তোমার সঙ্গে রোমান্স করার জন্য তোমাকে কোলে নেইনি। তুমি অসুস্থ তাই তোমাকে একটু সাহায্য করছি। দ্যাট’স ইট।

—এই ফ্ল্যাট কি আপনারা থাকেন?

—হুম।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে আছি। কারণ, এই লোকের সাথে বাড়াবাড়ি করতে পারব না। যেই ডাকাত মার্কা লোক দেখা যাবে আমাকে উনার কোল থেকে এক আছাড় মেরে নিচে ফেলে দিবে আর আমি সোজা ওপর ওয়ালার কাছে চলে যাব। কোনোমতে সাত দিন চলে গেলে হলো। এরপর আমি আর কখনো খালারা এই ফ্ল্যাটে থাকাকালীন নারায়ণগঞ্জে আসব না।

দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে চতুর্থ তলায় অবলীলায় এই লোক বিন্দুমাত্র ঘাম না ঝরিয়ে আমাকে নিয়ে চলে এলো খালার ফ্ল্যাটের ভেতরে। খালা শোয়েবকে দেখিয়ে দিলেন আমি কোন রুমে থাকি।

খালার দেখানো ডিরেকশন অনুযায়ী শোয়েব আমাকে সেই রুমে গিয়ে খাটের ওপর আস্তে করে শুইয়ে দিলেন। তারপর, খাটের পাশে রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে নিজে ঢকঢক করে খেয়ে জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,

— তোমাকে দেখতে শুকনা পাঠকাঠি মনে হলেও তুমি যথেষ্ট ভারী। বাপরে আমার পুরো গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে।

আমি বোকার মতো ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছি এই অদ্ভুত এবং ভয়ংকর লোকটার দিকে। কি বলে এই লোক, আমি নাকি ভারী! হুহ আমার এত সুন্দর স্লিম বডিকে উনি এরকম কমেন্ট করতে পারবেন না।

— তুমি কি কথা বলতে পারো না? কানে কম শুনো?

— না। শক্ত গলায় উত্তর দিলো মিলি।

মিলির মুখ থেকে ছোট একটি শব্দ শুনে শোয়েবের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে শোয়েব মিলিকে উদ্দেশ্য করে বললো,

—তোমার মোবাইল নাম্বারটা দাও।

মোবাইল নাম্বারের কথা শুনে মিলি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে নীচের দিকে। রাগে ওর পুরো শরীর কিড়মিড় করছে।

— কি হলো? তোমার মোবাইল নাম্বারটা দাও।

— আমার মোবাইল নেই।

— গুড। কিন্তু, তোমার সাথে আমি যোগাযোগ করব, কিভাবে?

—এই লোকের নিশ্চয়ই সমস্যা আছে। প্রথম দেখায় এত জঘন্য কান্ড করে। আবার, আমার থেকে মোবাইল নাম্বার চাওয়া হচ্ছে। মরে গেলেও আমার মোবাইল নাম্বার এই লোককে দেয়া যাবে না।

মনে মনে কথাগুলো বলে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠেছে মিলির অন্তরে।

— থাক লাগবে না। আমি তোমার খালার মোবাইলে কল করে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব। চলি। ভালো থেকো।

কথাগুলো বলে চলে যায় শোয়েব। আর আমি মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে কাত হয়ে বালিশে মাথা পেতে শুয়ে রইলাম। মিনিট পাঁচেক পর আমার মোবাইল ভাইব্রেট হতে শুরু করেছে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা সাতটা বাজে। তারমানে, নিঝুম কল করেছে। আমি বালিশের নিচ থেকে মোবাইল হাত নিয়ে কল রিসিভ করে বলি,

—জানেমান। কেমন আছিস, তুই?

— জানেমান, যে কেউ হোক কিন্তু তুমি যে আমার সঙ্গে মিথ্যে বললে সেটার পরিণতি খুব একটা ভালো হবে না।

—কে.. আপনি?

—বুঝে নাও আমি কে?

— আ..পনি কি শোয়েব?

—তাহলে, কি অন্যকেউ?

— আপনি আমার মোবাইল নাম্বার কোথায় পেলেন?

—তোমার কাছ থেকে নাম্বার চাওয়ার আগে আমি তোমার খালার কাছ থেকে তোমার নাম্বার নিয়েছি। তোমাকে একটু যাচাই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, তুমি যে আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবে আমি ভাবতেও পারিনি।

মিলি মনে মনে ঢক গিলে আল্লাহকে বলছে,

— এ তুমি কোন পাগল পাল্লায় ফেললে আমায়!

—আজকের মতো মাফ করে দিলাম। কিন্তু, ভবিষ্যতে আমার সঙ্গে মিথ্যা বলেছো এবং আমি যদি টের পাই। তবে,তোমার কি হবে তুমি নিজেও জানো না।

টুটটুট…

কল কেটে গিয়েছে কিন্তু মিলি এখনো মোবাইল কানে ধরে বসে আছে। কি কারণে এই লোক ওর সাথে এমন করছে বুঝতে পারছে না? কিন্তু, ভালো যে কিছু হচ্ছে না সেটাও বুঝতে পারছে মিলি। কিন্তু, খালা কেন ওকে জিজ্ঞেস না করে ওর মোবাইল নাম্বার দিয়ে দিলো? আর যেই ফ্ল্যাটে এতক্ষণ ছিল সেখানে কেন নিয়ে গেল মিলিকে ?

#চলবে