#এক_বরষায়[২]
জেরিন আক্তার নিপা
ধারা নিজে রেডি হয়ে জেসমিনকে তাড়া দিতে লাগল। এই মেয়েটা এত লেট লতিফ কেন? কোন কাজে তার গরজ নেই। স্কুল শুরু হয় দশটায়। আটটা থেকে কোচিং শুরু হয়। এই মেয়ে অধিকাংশ সময় সকালে ঘুমের জন্য কোচিং ধরতে পারে না। ধারা মেরে ধরে আটটার সময় তুলে দিলেও ওর হাতমুখ ধুয়ে রেডি হতে হতেই আড়ে আটটা বেজে যায়। বাড়ি থেকে বেরই হয় পনে নয়টায়। কোনোরকমে শুধু এসএসসিটা পাস করুক। বাবাকে বলে এর পড়াশোনা বন্ধ করতে হবে। বছরে বছরে ফেল করলে এরকম পড়াশোনার দরকার নেই। শুধু শুধু টাকা খরচ। জ্ঞান অর্জনের খাতায় রেজাল্ট শূন্য।
‘জেসমিন তোর হয়েছে? বাড়িতেই আজ নয়টা বাজে। প্রতিদিন দেরি করায় স্যার ম্যাম তোকে কিছু বলে না?’
জেসমিন ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখছিল। ধারার কথা শুনে চিরুনি হাতে তাড়াহুড়ো করে ওর কাছে আসতে গিয়ে উস্টা খেয়ে নখ উলটে ফেলল। কলকল করে রক্ত বেরিয়ে আসছে। পায়ের নখের দিকে তাকিয়ে বজ্রপাত হওয়ার শব্দে এক চিৎকার দিল।
‘আল্লাহ গো! আমার নখ উলটে গেছে গো। কত রক্ত পড়ছে।’
ধারা ওর কাছে ছুটে গেল। মেয়েটার উপর বিরক্ত সে রাগও লাগছে। আল্লাহ দু’টো চোখ দেওয়ার পরেও যেকোনো জায়গায় কানার মতো ছুটে। ইশ কত রক্ত পড়ছে! জেসমিন ততক্ষণে মাটিতে বসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ধারা ওর পাশে বসে পা ধরতে নিলে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল।
‘ধরিস না। ছুঁস না রে আপু। দাদীকে ডাক। আমি আর বাঁচব না। কলিজা বেরিয়ে যাচ্ছে আমার। ও দাদী গো, তুমি কই গো?’
‘নাটক করিস না তো। দেখতে দে আমায়।’
গরম তেলে পানির ছিটার মত ছেত করে উঠল জেসমিন। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
‘তোর মনে হয় আমি নাটক করছি! দেখছিস কীভাবে রক্ত পড়ছে। তুই আমার বোন না। তুই আমার কেউ না।’
‘আরে আল্লাহ, দেখতে না দিলে বুঝব কীভাবে কতটুকু ব্যথা পেয়েছিস। নখ কী একেবারে উলটে গেছে নাকি৷ ধরতে দে আমায়। আমি তোকে ব্যথা দেব না।’
‘শরীরের ব্যথা দু’দিন পর সেরে যাবে। কিন্তু তোর কথায় আমার মনে যে ব্যথা পেয়েছি তা কীভাবে সারাবি তুই?’
‘ভালো জায়গায় কীভাবে উস্টা খেলি বল তো!’
‘আমি তো শখে উস্টা খেয়েছি। নখ উলটে রক্ত বের করার আমার অনেক শখ ছিল। দেখিস না ব্যথা পেয়ে এখন কেমন হাসতেছি।’
‘আচ্ছা রাগ করিস না। আমাকে দেখতে দে।’
ধারা কোনভাবে রক্ত পড়া বন্ধ করে ঔষধ লাগিয়ে দিল। ব্যান্ডেজ করতে গিয়েও জেসমিনের থেকে বাধা পেল।
‘ধরিস না। কোনোকিছুর ছোঁয়া লাগলেই জান বেরিয়ে যাবে। ব্যান্ডেজ ফ্যান্ডেজ করতে হবে না।’
‘ঘা খোলা রাখলে সহজে ভালো হবে না। জীবানু লেগে ইনফেকশন হয়ে যাবে। আস্তে করে শুধু কাপড়টা পেঁচিয়ে দিব। বেশি জোরে দিব না।’
‘আচ্ছা দে। কিন্তু ব্যথা যেন না পাই।’
বোনের খেদমত করা শেষ হলে ঘড়ির দিকে দেখল ধারা। নয়টা বাজে। আজ তার প্রথম ক্লাস মিস গেল। এই পড়া চোর পায়ে ব্যথা নিয়ে তো মরে গেলেও স্কুলে যাবে না। তারও একা যেতে ভালো লাগল না। থাক আজ একদিন নাহয় ভার্সিটি কামাই করলো।
‘এখন তো পায়ে ব্যথা পেয়েছিস। স্কুলে যাবি না। তা এখন কি চুপচাপ বসে থাকবি? নাকি শয়তানি করতে বেরুবি।’
‘আজ আমার যম এলেও আমাকে হাঁটিয়ে কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না। কোলে করে নিয়ে গেলে তবেই পারবে।’
‘বসে থাক তাহলে।’
‘তুই ভার্সিটি যাবি না?’
‘আমি চলে গেলে তোর সেবা কে করবে? দাদীকে তো খাটিয়ে মারবি।’
‘আচ্ছা তাহলে তোরও যেতে হবে না। তুই আমার লক্ষী বোন। ঘরে চানাচুর আছে আপু?’
‘জানি না।’
‘দেখ তো আছে কিনা। আমার মনে হয় আছে। বড় বয়ামে দেখিস। আমাকে একটু চানাচুর মাখিয়ে দে তো। ছোট ছোট করে লেবুর কুচি কেটে দিস। কামড়ে পড়লে হেব্বি লাগে। বেশি করে ঝাল দিবি।’
জেসমিন কথাগুলো বলে ঢোঁক গিলল। বলতেই জিভে পানি এসে যাচ্ছে তার। ধারা কটমট করে বোনকে দেখছে। আপুকে রাগতে দেখে জেসমিন মিইয়ে গিয়ে বলল,
‘অর্ডার দিচ্ছি না। অনুরোধ করছি। তুই-ই তো একটু আগে বলেছিস বাড়িতে থেকে আমার সেবাযত্ন করবি। এখন একটু চানাচুর মাখা করে দিতে বলেছি দেখেই এভাবে তাকাচ্ছিস।’
*****
নয়ন এতক্ষণ বসে ছিল। বারবার সময় জিজ্ঞেস করছে সে। আজ তো আটটা কখনই বেজে গেছে। এখন নয়টা বাজে। এখনও বেরুচ্ছে না কেন ওরা? নয়ন অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার সাথের দুই চ্যালা বেঞ্চে বসে চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে আরামে খাচ্ছে। এই কাপ নিয়ে তিন কাপ হলো। এদিকে তার পেরেশানি শুরু হয়ে গেছে। আজ কি দুই বোন বাড়ি থেকে বেরুবে না! আজ কি ধারাকে ও দেখতে পাবে না? ওকে অস্থির হয়ে পায়চারি করতে দেখে সাথের এক চ্যালা বলল,
‘ভাই শুধু শুধু অস্থির হইতাছো। একটু পরেই গেট দিয়া ভাবি বাইর হইব। টেনশন নট। ভাবি না আসলেও আমরা টিনের চাল ইট ছুইড়া ভাবিরে বাড়ি থেইকা বাইর কইরা আনমু।’
‘আজ কি ওরা স্কুল/ভার্সিটিতে যাবে না? বাড়িতে কিছু হলো নাকি? নিশ্চিত ওর মাতাল বাপ কিছু করেছে।’
এই দোকানে বসে ধারাদের গেট দেখা যায়। দুই বোন এই পথ দিয়েই সকালে স্কুলে যায়৷ দুপুরে বাড়ি ফিরে। নয়ন প্রায় চার বছর ধরে একটি বার ধারাকে দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা এই দোকানের বেঞ্চে বসে থেকেছে। কখনো বেঞ্চে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। এটা তাদেরই পাড়া। তাই ওকে কেউ কিছু বলতে পারে না। আর কেনই বা বলবে? ধারাকে তো ও বিরক্ত করে না। শুধু এখানে বসে থেকে মেয়েটাকে দু-চোখ দিয়ে দেখে। কোনোদিন কথা বলতেও যায়নি। একই পাড়ায় থেকেও ধারাকে তার চোখে পড়েছে বছর চারেক আগে। তার আগে এই মেয়ে যে ওদের পাড়ায় থাকে তা সে জানতোই না। চার বছর ধরে মেয়েটাকে দূর থেকে পাহারা দিচ্ছে সে। ওর গম্ভীরতা দেখে কখনও সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস হয়নি। ধারা যে তাকে লক্ষ করে না এমন না। লক্ষ করলেও পাত্তা দেয় না। মেয়েটা যে কেন তাকে পছন্দ করে তা সে আজও জানতে পারেনি।
‘আজ মনে হয় তোর ভাবি ভার্সিটিতে যাবে না।’
‘তাইলে এখন আমাদের কাজ কী ভাই? আপনি খালি হুকুম দেন।’
‘কোন কাজ না। এখানে বসে থাক। তোর ভাবি না বেরুলেও জেসমিন ঠিকই একটু পরে বেরুবে। ওরে বলবি আমার কাজ কতদূর এগিয়েছে।’
‘আপনি কি এখন বাড়ি যাইবেন ভাই?’
‘হুম। সকালে না খেয়ে বেরিয়েছি। এখন না ফিরলে মা ক্যাটক্যাট করবে।’
‘আচ্ছা ভাই আপনি যান। ভাবির দেখাশোনার জন্য আমরা আছি। আপনার টেনশন নট।’
*****
নয়ন চলে যাবার একটু পরেই ধারা গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে। রাসেল ধারাকে দেখে বসা থেকে উঠে পড়ে চাপা গলায় পাশেরটাকে বলল,
‘ভাবি বাইর হইয়ে। ভাবি আসতাছে দেখ।’
পারভেজও দাঁড়িয়ে গেল। আফসোস করে বলল,
‘ভাই আর কিছুক্ষণ থাকলেই ভাবিরে দেখতে পাইত।’
‘ভাবি কই যায়? কাছে গিয়া জিজ্ঞেস করমু?’
‘না, না। ভাই না কইরা দিছে কোনোদিন যেন আগ বাড়াইয়া ভাবির সাথে কথা না কই। ভাবি ভীষণ রাগি।’
‘আচ্ছা আচ্ছা।’
***
দাদীর শরীর খারাপ লাগছে। আজকের দুপুরের রান্না তাকেই করতে হবে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে তেল নেই। তেল ছাড়া তো তরকারি রান্না সম্ভব না। জেসমিনও সকালে পায়ে ব্যথা পেয়েছে বসে আছে। বিছানা থেকে নামতে নারাজ। বাবাও বাড়িতে নেই। তাই বাধ্য হয়ে তাকেই আসতে হয়েছে। বাড়ি থেকে দোকান বেশি দূরে না৷ দোকানদারকে বাবা বলেই রেখেছে এসে বললেই হবে। যা লাগবে দিয়ে দিবে টাকা লাগবে না৷ মাস শেষে যা হবে বাবা সব একসাথে দিয়ে দিবে। কিন্তু সমস্যা একটাই। ওই নয়ন নামের লোকটা সারাদিন এই দোকানের সামনে আসে থাকে। যেতে আসতে প্রতিদিনই দেখে। কিন্তু দেখেও না দেখার মতো চলে যায় সে। লোকটার ধৈর্য আছে বলতে হবে। চার বছর ধরে এক কাজ করে যাচ্ছে। মানুষটা বিরক্ত হচ্ছে না। আবার কোনোদিন পথেঘাটে তাকে বিরক্তও করেনি। যেহেতু তাকে কিছু বলছে না। তার কাছে কিছু চাইছে না। তাই তার বিরক্ত হওয়ার মানে নেই। যেদিন পথ আটকে দাঁড়াবে সেদিন বাবার কানে তুলবে।
ধারা দোকানের কাছে গেলে পারভেজ মুখে হাসি নিয়ে ওর দিকে দেখল। বিনয়ী গলায় বলল,
‘ভা… ‘বলতে বলতে থেমে গেল। মুখ দিয়ে পুরো শব্দটা বেরুবার আগে আটকে নিয়েছে। নইলে আজ কপালে খারাবি ছিল। জিভে কামড় দিয়ে বাক্য সংশোধন করে নিয়ে বলল,
‘আপু কী লাগবে আপনার?’
ধারা ছেলেটাকে পাত্তা দিল না। নয়নের এক নাম্বার চামচা এটা। দুই নাম্বারটাও সাথে আছে। এদের সাথে কথা বাড়াতে চায় না সে। দোকানকে সয়াবিন তেল দিতে বললে পারভেজ আবার বলল,
‘আর কিছু লাগবে না ভা..’ আবারও একই ভুল করতে যাচ্ছিল। ধারা তীক্ষ্ণ চোখে ওকে দেখছে দেখে মুখের হাসি দুই কান পর্যন্ত নিয়ে ঠেকাল।
‘চাল, ডাল আর কিছু লাগবে না আপু? এই দোকানে কাঁচা বাজারও পাওয়া যায়৷ পেঁয়াজ, আদা, রসুন লাগলে নিয়ে যান।’
‘আমার বাড়িতে কী আছে কী নেই তা নিশ্চয় আমার থেকে ভালো আপনি জানবেন না। আমার যা লাগবে নিচ্ছি।’
***
রাতে খাবার সময় বাবা এই প্রথম বাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলল। ধারা তখন বাবার পাতে মাছের মাথাটা তুলে দিচ্ছিল। বাবা সহজ গলায় বলল,
‘ভাবছি একটা ঘর ভাড়া দেব। মা আর জেসমিন বাবার ঘরে উঠে যাক। ওদের ঘরটা ওই ছেলেকে দিয়ে দিই। ভীষণ জোড়াজুড়ি করছে।’
বাবা একটা ছেলেকে ঘর ভাড়া দিবে শুনেও ধারা কিছু বলল না। কারণ সে সংসারের টানাপোড়েনের কথা জানে। ইদানিং বাবার ব্যবসাটা যে বিশেষ ভালো যাচ্ছে না এটা বুঝতে তার অসুবিধা হয়নি। জেসমিন চট করে একবার বোনের মুখের দিকে দেখল। যাক কোন দম্পতি আসছে না। সকাল দুপুর জামাই বউয়ের ঝগড়া শুনতে হবে না। একটা ছেলে আসছে! ইশ ছেলেটা যেন দেখতে সুন্দর হয়। আর কিচ্ছু চায় না সে।
চলবে_