#এক_মুঠো_প্রেম
#Writer_Mahfuza_Akter
#পর্বঃ১০
আদ্র একপা একপা করে এগোচ্ছে আর স্পৃহা সমানতালে পিছু হটছে। স্পৃহার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। ভয়ংকর বিপদ যেন সাইরেন বাজিয়ে নিজের আগমন জানান দিচ্ছে। আদ্রের রক্তিম চোখজোড়ায় ফুটে ওঠা হিংস্রতা দেখে স্পৃহার পিলে চমকে উঠলো। কম্পিত কণ্ঠে বললো,
-আদ্র, আপনি এগোবেন না। আমার কথা শুনুন। এমন এগ্রেসিভ হবেন না, প্লিজ।
আদ্র ভাঙা ভাঙা গলায় কাঠিন্য বজায় রেখেই বললো,
-ক্ কেন? কেন এগোবো না? আহির তোমার কাছে এলে তো নিষেধ করতে না! আমি এলেই সমস্যা?
আদ্রের কথা শুনে স্পৃহা অবাক চোখে তাকালো। ওর নাকে একটা বিদঘুটে গন্ধ ঠেকছে। নাক-মুখ কুঁচকে ফেললো স্পৃহা। আদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললো,
-ডোন্ট বি প্যানিকড্। ইউ আর মাই ওয়াইফ। আই লাভ ইউ আ লট, সুইটহার্ট!! আই ওয়ানা স্পেন্ড এভ্রি মোমেন্ট অফ মাই লাইফ উইথ ইউ। এন্ড নাও, আই ওয়ান্ট ইউ।
আদ্রের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই স্পৃহার পা পেছনে ঠেকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো মা-রা-ত্ম-ক বিপদসংকেত হিসেবে বেডের সাথেই ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ও। ভীত দৃষ্টিতে আদ্রের দিকে তাকালো স্পৃহা।
সকালের নরম রোদ জানালা ভেদ করে চোখে এসে পড়তেই নাক-মুখ কুঁচকে ধীরগতিতে চোখ খুলে তাকালো আদ্র। মাথাটা প্রচন্ড ভার লাগছে। কপাল চেপে ধরে উঠে বসলো সে। ঝাপসা দৃষ্টি ক্রমশ স্বচ্ছ থেকে স্বচ্ছতর হতেই আশেপাশে চোখ বুলালো। ঘরের এক কোণায় চোখ যেতেই দৃষ্টি থেমে গেল তার। পুরু ভ্রূদ্বয় কুঞ্চিত হয়ে গেল মুহুর্তেই।
বেড থেকে অদূরে ঘরের এক কোণে গুটিশুটি মেরে বসে আছে স্পৃহা। হাটুর ভাজে মুখ পুরে স্থির হয়ে আছে সে। শাড়ির আঁচল মেঝে গড়িয়ে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। স্পৃহার চুল ও পোশাকের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আদ্র অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। স্পৃহার এমন অবস্থা কীভাবে হলো? প্রশ্নটা বারবার মাথায় ঘুরছে। কাল রাতে কী কিছু হয়েছিল? মনের কোণে উঁকি দেওয়া প্রশ্নটির প্রেক্ষিতে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আদ্রের এখন কিচ্ছু মনে পড়ছে না।
ধীর পায়ে স্পৃহার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর সামনে বসলো আদ্র। অতি নিকটে কারো অবস্থান টের পেয়ে মুখ তুলে ভীত দৃষ্টিতে তাকালো স্পৃহা। ফুলে যাওয়া অশ্রু পূর্ণ চোখ দুটো দেখে আদ্রের বিস্ময়ের মাত্রা আরো একধাপ বৃদ্ধি পেল। কিন্তু আদ্রকে দেখা মাত্রই স্পৃহার চোখে মুখে ফুটে ওঠা ভয়টা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে রাগ ও ঘৃণার একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হলো।
আদ্র হাত বাড়িয়ে স্পৃহার মুখ স্পর্শ করতে গেলেই স্পৃহা ঝামটা মেরে ওর হাত সরিয়ে দিল। রাগী গলায় বললো,
-ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি! ছোঁবেন না আপনি আমায়। একদম ছোঁবেন না!!
শেষোক্ত কথাটা অনেকটা কান্নামিশ্রিত গলায় বললো স্পৃহা। আদ্র বিস্ময়বিমূঢ় কন্ঠে বললো,
-তুমি এমন রিয়েক্ট করছো কেন, স্পৃহা? আর এমনভাবে বসেই বা আছো কেন? কিছু কি হয়েছে?
স্পৃহা তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে তাকালো। বললো,
-এমনভাবে বলছেন যেন আপনি কিছুই জানেন না? নাটক করছেন আমার সাথে?
-আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না, স্পৃহা! আমার কিছু মনে পড়ছে না।
স্পৃহা এবার অদ্ভুতভাবে হাসলো। আদ্র অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্পৃহার মুখের হাসির দিকে। সেই হাসিতে ফুটে উঠেছে শ্লেষ, অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা আর নিজের জীবনের প্রতি হাজারো অভিযোগ ও অনুযোগ
__________________________
আহির চিন্তিত মুখে বসে আছে। মনে মনে চাইছে, একটু আশার আলো যেন অবশিষ্ট থাকে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের উপস্থিতি স্পষ্ট। মুখোমুখি বসে থাকা ব্যক্তিটা বেশ মনযোগ সহকারে কাগজপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। অনেকক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পর ব্যক্তিটা মুখ তুলে আহিরের দিকে তাকালো। মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললো,
-ইউ হ্যাড বেটার গো টু এব্রোড, মিস্টার আহির। দেয়ার ইজ নো আদার আল্টারনেটিভ ফর ইউ।
আহির যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললো,
-দেশের বাইরে আমি যাচ্ছি-ই। কিন্তু আমায় এটা বলুন যে, কোনো ইম্প্রুভমেন্টের চান্স আছে?
ব্যক্তিটি হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,
-আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী হয়তো নয়! ম্যাক্সিমাম ১% পসিবিলিটি আছে।
আহির হাতের মুঠোয় হাত মুষ্টিবদ্ধ করে থম মেরে বসে রইলো অনেকক্ষণ। এটা তো জানাই ছিল তার! কিন্তু সরাসরি নিশ্চিত হওয়ার পর মানতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। মানবমন এতো অদ্ভুত কেন? তার থেকেও বড় কথা, নিয়তি এতো নিষ্ঠুর কেন?
_______________________
ভার্সিটির সামনে এসে গাড়ি থামতেই স্পৃহা কোনো বাক্যব্যয় না করেই গাড়ি থেকে নেমে গেল। আদ্র বললো,
-স্পৃহা, লিসেন টু মি। আমি…
কথা শেষ হওয়ার আগেই স্পৃহা ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
-ক্লাস শেষে গাড়ি পাঠানোর কোনো দরকার নেই।
বলেই গটগট করে চলে গেল। কয়েকদিন ধরে স্পৃহার আচরণগুলো বেশ কষ্ট দিচ্ছে আদ্রকে। কোনো কিছু স্পষ্টভাবে বলছেও না, স্বাভাবিকও হচ্ছে না। প্রতিটা মুহুর্ত এভোয়েড করে চলে ওকে। সরাসরি কথা বলা সেদিনই বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি আদ্রের দিকে চোখ তুলে একবার তাকায়ও না। বিষয়টা প্রচন্ড পীড়া দিচ্ছে আদ্রকে। বিতৃষ্ণায় দাঁতে দাঁত চেপে স্টিয়ারিং-এ একটা ঘুষি দিল আদ্র।
-তোর ইদানীং কী হয়েছে? বল তো! সবসময় অমন মুখ কালো করে থাকিস কেন? কিছু কি হয়েছে?
প্রান্তির প্রশ্ন শুনে নীড় আর আহান প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালো স্পৃহার দিকে। বিষয়টা ওরা-ও খেয়াল করেছে, তবে তেমন সিরিয়াস ভাবে নেয়নি। কিন্তু প্রান্তির প্রশ্ন শুনে ওদের মনেও কৌতূহল জাগছে। স্পৃহা ভাবলেশহীন ভাবে বললো,
-কী হবে? কিছুই হয়নি!
আহান সন্দিগ্ধ কন্ঠে বললো,
-ঐ আহিরকে নিয়া এখনো ভাবছিস নাকি তুই? ওয় কোনো ঝামেলা করে নাই তো? দেখ, বইন! কিছু হইলে আমারে তাড়াতাড়ি বল। আমি তো ওকে…
-অহেতুক হাইপার হচ্ছিস, আহান। আমার কিছু হয়নি, বললাম তো?
স্পৃহার কথার পৃষ্ঠে বলার মতো কিছু পেল না ওরা। আহান আর নীড় হতাশ হয়ে চা খেতে চলে গেল। স্পৃহা গেল না। প্রান্তি ইচ্ছে করেই স্পৃহার সাথে রয়ে গেল।
ওরা চলে যেতেই প্রান্তি উচ্ছ্বল গলায় বললো,
-আহির ভাইয়ের কোনো খবর জানিস তুই?
স্পৃহা ভ্রু কুঁচকে বললো,
-তোর মনে হয় যে, আমার আহিরের সাথে এখনো যোগাযোগ আছে?
-আরে, আমি সেটা কখন বললাম? আহির ভাই তো স্পন্দন ভাইয়ার ফ্রেন্ড! ওনার কাছ থেকে কিছু শুনিসনি?
স্পৃহা তেমন কোনো হেলদোল না দেখিয়ে বললো
-ওনার সম্পর্কে কিছু জানার ইচ্ছে আমার নেই। তাই জিজ্ঞেস করিনি।
প্রান্তির মুখটা চুপসে গেল। মুখ ছোট করে বললো,
-আমি বেশ কয়েকদিন আগে আহির ভাইকে দেখেছি। তারপর থেকেই আমার কেন যেন মনে হয়, আহির ভাইয়ের বিয়ের ব্যাপারে এমন কোনো রহস্য হয়তো আছে যেটা আমাদের অজানা।
স্পৃহা অবাক চোখে তাকালো। বললো,
-মানে? কোথায় দেখেছিস তুই আহিরকে যে তোর এমন মনে হয়?
-পার্কে দেখেছিলাম। আহির ভাইয়ের বউ-ও ছিল। আর…
বলেই প্রান্তি দ্বিধাভরা চোখে স্পৃহার দিকে তাকালো। স্পৃহা সন্দেহ নিয়ে বললো,
-আর?
-আর ওনাদের সাথে একটা চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলেও ছিল।
স্পৃহা হতভম্ব হয়ে বললো,
-মানে?
-মানেটা তো আমিও জানি না! প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা ওনাদের ছেলে নয় হয়তো। পরে দেখলাম, আহির ভাইকে পাপা আর আনিলাকে পাপা বলে ডাকছে। তখন থেকেই আমি এটার সমীকরণ মেলাতে পারছি না।
স্পৃহা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না ওর। কম্পিত কণ্ঠে বললো,
-ওটা আহির ছিল? নিশ্চিত তুই?
প্রান্তি বিরক্তি নিয়ে বললো,
-আরে হ্যাঁ! তোকে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আহানের ঝাড়ি খেয়ে আর বলতে পারিনি, বলার সুযোগও পাইনি।
স্পৃহা চোখে বিস্ময় নিয়ে থম মেরে বসে রইলো অনেকক্ষণ। হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে ভাবতে লাগলো ও। আহিরের বিয়ে তো কয়েকমাস আগেই হলো! তাহলে চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা কীভাবে সম্ভব? আহির কি অনেক আগেই বিয়ে করেছে? কিন্তু এটা তো হতেই পারে না! ওদের বিয়ের সময় স্পন্দন উপস্থিত ছিল। স্পষ্ট ভাবেই বোঝা যাচ্ছে, বাচ্চাটা আহিরের নয়। তাহলে কীভাবে কী হয়েছে?
প্রশ্ন গুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা হাতে নিয়ে স্পন্দনকে ফোন দিলো স্পৃহা। স্পন্দন ফোন রিসিভ করতেই স্পৃহা হুট করে বললো,
-ভাইয়া! ভাইয়া তুই আহির ভাইয়ার ব্যাপারে কিছু জানিস?
আহিরের ব্যাপারে স্পন্দন বেশ অবাক হলো। হতবাক হয়ে বললো,
-হঠাৎ আহিরের ব্যাপারে জানতে চাইছিস কেন?
স্পৃহা দৃঢ় কন্ঠে বললো,
-তুমি বলবে?
স্পন্দন হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে যে উত্তরটা দিলো, সেটা স্পৃহার একদম প্রত্যাশিত ছিল না। মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়লো ওর। নিজেকে অকূল পাথারের শিকার বলে মনে হচ্ছে এখন।
# চলবে…
#এক_মুঠো_প্রেম
#Writer_Mahfuza_Akter
#পর্বঃ১১
স্পৃহা থম মেরে বসে আছে অনেকক্ষণ যাবৎ। প্রান্তি বারবার জিজ্ঞেস করছে, স্পন্দন ফোনে কী বললো? কিন্তু স্পৃহা কোনো উত্তর দিচ্ছে না। এরই মধ্যে আহান আর নীড় ফিরে এলো। স্পৃহার মুখের অবস্থা দেখে ওরা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে যে, কিছু একটা হয়েছে। প্রান্তি চিন্তিত ও ভীত ভঙ্গিতে নখ কামড়াচ্ছে। নীড় সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বললো,
-ইজ দেয়ার এনিথিং রোঙ্? পিহুর মুখের কন্ডিশন ভালো ঠেকছে না।
আহান বিরক্তি নিয়ে নীড়ের মাথায় একটা থাপ্পড় দিয়ে বললো,
-শালার ইংরেজ কোথাকার! রাজাকারের বংশোদ্ভূতের মতো ইংরেজি না ছেড়ে মাথা খাটাইতে পারোস না? এই প্রান্তি কিছু করছে, আমি শিয়র!!!
বলেই প্রান্তির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
-শোন ছেড়ি, আমরা যাওয়ার পর থেইকা পিহুরে কী কী কইছোস, এইখানে কী কী হইছে ফটাফট এখন উগলে দিবি। একটা কমা-ও যেন এদিক সেদিক না হয়!
প্রান্তি রাগী গলায় আহানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-আমি কী করেছি? আজব! কিছু হলেই সব দোষ আমার ঘাড়ে কেন দিস তুই?
-কারণ তুই-ই যত নষ্টের গোড়া! আস্ত একটা ঝামেলার গোডাউন। আর তুই-ই এখন কিছু একটা করছোস, সেটাতে আমার কোনো সন্দেহ নাই। সো, তাড়াতাড়ি কইয়া ফেল, কী হইছে?
প্রান্তি আমতা আমতা করে ওদের সবটা খুলে বলতেই আহান দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বললো,
-দেখলি? দেখলি তো! আমি কইলাম না? ঐ তোরে আমি মানা করছিলাম না? এসব কথা পিহুকে না কইতে। ক্যান বললি?
নীড় বিরক্ত হয়ে আহানের দিকে তাকিয়ে বললো,
-ভাই, যা বলার বলেছে ও। এখন সেটা নিয়ে ঘাটলে কোনো লাভ হবে? তার চেয়ে স্পন্দন ভাই কী বললেন সেটা জানা এখন বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।
আহান ঘোর আপত্তি জানিয়ে বললো,
-দেখ, তোরা যেমনে ভাবোস, আমি তেমনে ভাবতে পারবো না। আহিরের বাচ্চা আছে কি নাই? বউয়ের কী হইছে? এসব জাইনা এখন লাভ কী? আর এই পিহুরে মন চায় একটা আছাড় মারি। এই তুই এখনো আহির ভাইরে নিয়ে পড়ে আছিস কেন, বলতো! তোর বিয়ে হইসে না? যেভাবেই হোক, হইসে তো? এখন আহিররে নিয়া মাথা ঘামাইয়া কী হইবো? যতই ঘাটোস না ক্যান, মামা! রেজাল্ট সেই একই হইবো। মিলাইয়া নিস!
সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে স্পৃহা এবার মুখ খুললো,
-আমি আসল সত্যিটা জানতে চাই, আহান! একচুয়েলি কী হয়েছে?
-আচ্ছা, মানলাম। তুই সত্যিটা জানতে চাস। যদি এমন হয় যে, আহির ভাই কোনো যৌক্তিক কারণেই বিয়েটা করসে, তখন কী করবি? আদ্র ভাইকে ছেড়ে দিবি?
স্পৃহা ভ্রু কুঁচকে তাকালো আহানের দিকে। পরমুহূর্তেই হেসে দিয়ে বললো,
-তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে, আহান? আমার যেমন বিয়ে হয়েছে, আহিরেরও হয়েছে। ওনার স্ত্রী আছে। নিজে একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সংসার ভাঙবো আমি? আর আহির বিয়ে না করলেও ওনার কাছে কখনো যেতাম না। কারণ তাহলে আদ্রকে ঠকানো হবে। আদ্রের সাথেই নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি আমি।
আহান স্পৃহার কথাগুলো শুনে বেশ সন্তুষ্ট হলো। ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বললো
-এই না হইলো আমার বইন! দেখলি, কী সুন্দর কইরা ভাবতে পারে ও? কিন্তু আহিরের ব্যাপারে জেনে তো এখন আর কোনো লাভ নাই। ওর টপিক বাদ দে।
-সত্যিটা জানতে হবে, আহান। নিজেকে আর ধোঁয়াশার মাঝে রাখতে চাই না আমি। অন্তত মানসিক পরিতৃপ্তির জন্য সত্যিটা জানা প্রয়োজন আমার।
আহান ঠোঁট উল্টিয়ে বললো,
-ওকে। তাহলে এখন কী করবি?
স্পৃহা ভাবলেশহীন ভাবে বললো,
-এয়ারপোর্ট যাবো। আহির কানাডা চলে যাচ্ছে। বিকেল চারটায় নাকি ফ্লাইট। হাতে অনেক টাইম আছে। পৌঁছানো যাবে আশা করি।
এয়ারপোর্টে পৌঁছে স্পন্দনের কথা অনুযায়ী সেকেন্ড টার্মিনালে যেতেই স্পন্দনকে দেখতে পেল স্পৃহা। স্পন্দনকে একা দেখতে পেয়ে স্পৃহা বেশ অবাক হলো।
-ভাইয়া!
স্পন্দন চমকে উঠে পাশে তাকাতেই স্পৃহাকে দেখতে পেল। ও আগেই বুঝতে পেরেছিল যে, স্পৃহা আসবে। তাই তেমন অবাক হয়নি। তবুও চোখে মুখে কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে বললো,
-তুই? এখানে কেন এসেছিস?
স্পৃহা উত্তর না দিয়ে ব্যস্ত স্বরে বললো,
-আহির ভাই কোথায়, ভাইয়া? এখনো তো অনেক সময় বাকি! উনি কি ইমিগ্রেশন পেরিয়ে গেছে?
স্পন্দন মাথা নাড়িয়ে বললো,
-হ্যাঁ, কিছুক্ষণ আগেই তো গেল! তুই দেখা করবি জানলে ওয়েট করত হয়তো!
স্পৃহার মুখটা কালো হয়ে গেল। ভেবেছিল আহিরের সাথে বাচ্চাটা সরাসরি দেখলে ওকে জিজ্ঞেস করা যাবে আর আহির মিথ্যেও বলতে পারতো না। কিন্তু আহির তো চলেই গেল!
স্পন্দন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্পৃহার দিকে। আহির যে স্পৃহাকে ভালোবাসত, সেটা ও জানে। কিন্তু স্পৃহা আহিরকে ভালোবাসে কি না সেটা ও জানে না। মনে মনে সন্দেহ জাগছে তার। আবার স্পন্দনের এতোকিছু জানার ব্যাপারে স্পৃহা অজ্ঞাত।
-ভাইয়া, তোমার কাছে একটা জিনিস জানতে চাইবো। সত্যি করে বলবে?
স্পন্দন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বললো,
-আমার জানা থাকলে বলবো।
-আহির ভাইয়ের নাকি একটা ছেলে আছে? এটা কি সত্যি?
স্পন্দন ভাবলেশহীন ভাবে বললো,
-হ্যাঁ, আছে তো!
স্পৃহা অবাক হয়ে বললো,
-মানে? এটা কীভাবে সম্ভব? উনি তো কয়েক …
-ছেলেটা ওর নিজের না। দত্তক নিয়েছে ওরা।
স্পৃহা হতভম্ব হয়ে তাকালো। অবাক হয়ে বললো,
-দত্তক কেন নিয়েছে? বিয়ে যখন হয়েছে, বাচ্চাও হতো একসময়। এতো তাড়াতাড়ি …
-ছেলেটা আহিরের নিকটাত্মীয়ের কেউ একজন। বাবা-মা কেউই এখন জীবিত নেই, তাই নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। বুঝলি?
স্পৃহা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইলো। তার মানে আহিরের বিয়েটা ও স্বেচ্ছায়-ই করেছে। এখানে কোনো রহস্য নেই। শুধু শুধু আকাশপাতাল ভাবছিল স্পৃহা। নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে বললো,
-আচ্ছা, তাহলে আমি যাই। বাইরে প্রান্তি-ওরা ওয়েট করছে আমার জন্য।
স্পৃহা চলে যেতেই স্পন্দন ফোন বের করে আহিরকে কল দিলো।
-তুই যেভাবে বলতে বলেছিস, সেভাবেই পিহুকে সবটা বলে দিয়েছি।
আহির মলিন হেসে বললো,
-ওয়েল ডান! গুড জব।
-তোর জন্য আজ নিজের বোনকে এতোগুলা মিথ্যে বলতে হলো।
-নিজের বোনের সুখের জন্য একটু মিথ্যেও বলতে পারবি না? কেমন ভাই তুই?
স্পন্দন মুখ বাকিয়ে বললো,
-হ্যাঁ, সেই! কিন্তু সত্যি কখনো চাপা থাকে না, আহির। একদিন পিহু সবটা জানবেই।
আহির আপনমনেই হেসে বললো,
-এমন যেন না হয় যে, আমার নিজেরই ওকে সব সত্যি খুলে বলতে হয়! যাই হোক, প্লেন একটু পরেই টেইক অফ করবে। এখন রাখি। ভালো থাকিস।
স্পন্দন হতাশ গলায় বললো,
-পৌঁছে ফোন দিস। রাখছি।
__________________________
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে অনেকক্ষণ আগেই। চিন্তিত ভঙ্গিতে বাড়ির গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদ্র। স্পৃহার ক্লাস তো দুপুরেই শেষ হওয়ার কথা! সারাদিন পেরিয়ে গেল, এখনো বাড়ি ফিরে নি বলে চিন্তা হচ্ছে ওর। একবার ভার্সিটিতেও ঢু মেরে এসেছে সে। কিন্তু স্পৃহা সেখানে নেই। এখন হাত দিয়ে কপাল চেপে নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদ্র।
এমনসময় স্পৃহা আদ্রের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অবাক হয়ে বললো,
-আপনি এই সন্ধ্যে বেলায় বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
আদ্র চমকে উঠে সামনে তাকালো। স্পৃহা তার চোখের সামনে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। আদ্র কিছুক্ষণ শকড কেন তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ স্পৃহার আগমন চমকে দিয়েছে তাকে। ধীরে ধীরে প্রকৃতির হতেই আদ্রের চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। রাগী গলায় বললো,
-সারাদিন কোথায় ছিলে তুমি? দেরি হলে একটা ফোন করে জানিয়ে দিতে পারতে আমায়! জানো, আমি কত টেনশনে ছিলাম এতক্ষণ?
-এতো চিন্তার কিছু নেই। বেঁচে আছি আমি। এতো সহজে মরবো বলে মনে হয় না।
আদ্র আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
-স্পৃহা!! কী বলছো তুমি এসব?
স্পৃহা মলিন হেসে বললো,
-চলুন, ভেতরে যাই।
আদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অনেকদিন পর স্পৃহা ওর সাথে সরাসরি একটু কথা বললো। ভাবতেই বেশ ভালো লাগছে ওর। কিন্তু সেদিন রাতে কী এমন হয়েছিল যে, স্পৃহা ওর থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিল এতোদিন? কোনো ভুল করে বসেনি তো সেদিন! আদ্রকে জানতে হবে।
স্পৃহা ফ্রেশ হয়ে আসতেই আদ্র ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। স্পৃহা হতভম্ব হয়ে বললো,
-কী হলো? এভাবে সামনে এসে দাঁড়ালেন যে!
আদ্র গম্ভীর কন্ঠে বললো,
-সেদিন রাতে কী হয়েছিল, স্পৃহা? যার জন্য তুমি এতোদিন আমায় এভয়েড করে চললে!
স্পৃহা এমন প্রশ্ন শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তেমন কোনো হেলদোল না দেখিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
-কিছুই হয়নি।
# চলবে…