#কল্পকুঞ্জে_কঙ্কাবতী
লেখনীতে: নবনীতা শেখ
|পর্ব ২|
আমি আর এখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। কোনো মতে এগিয়ে এসে রুমের মাঝ বরাবর দাঁড়ালাম।
তখনই কুঞ্জ ভাই বললেন, “পা দুটো ম্যাচম্যাচ করছে। টিপে দে!”
আমি বিস্ফোরিত নেত্রে ওঁর দিকে তাকালাম। এতে উনি হাই তুলে বললেন, “এত ভুল যে কীভাবে করিস! তোর ভুলের জন্য তোকে টানা দু’ঘণ্টা পাহারা দিতে হয়েছে, উফফ! পা ব্যাথা করছে। টিপে দে। বরের সেবা করা বউয়ের ধর্ম। কাজে লেগে যা, অকর্মা নবু।”
“এখানে বর কে? বউ কে?”
“তোকে একাদশে ওঠাল কে? তার চাকরি খাব আমি।”
আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তাতে কুঞ্জ ভাই বললেন, “সিরিয়াসলি নবু! তুই লিঙ্গ ভেদ বুঝিস না? কেমনে একাদশে উঠলি?”
“আপনি একদম যা-তা বলবেন না, বলে দিচ্ছি।”
“ফ্রী তে শিক্ষা দিচ্ছি, কিপ্টে মেয়ে, শোন! বর হচ্ছে– পুরুষবাচক শব্দ আর বউ হচ্ছে– স্ত্রীবাচক শব্দ। এখানে বর নামক কচি খোকা আমি আর বউ নামক মহিলাটা হচ্ছিস– তুই।”
“কুঞ্জ ভাই!”
“চোখ রাঙাচ্ছিস কেন? আচ্ছা যা, তুই মহিলা নোস, বাবুর আম্মু। ওকে?”
“দেখুন, কুঞ্জ ভাই! আজেবাজে বকবেন না। মাথাটা গরম হয়ে যাচ্ছে।”—কথাটি বলেই আবারও বললাম, “বাই দ্যা ওয়ে! আপনি আমার কোন জন্মের বর?”
কুঞ্জ ভাই বাঁকা হেসে বললেন, “এই জন্মেরই, ভবিষ্যত কালের। ফর এক্সাম্পল– এই যে আজকের এই ভিডিয়োটা আমি গিয়ে ফুপিকে দেখাব। এতে ফুপি তোকে বকতে আসবে। তখন তুই ফুপিকে বলবি,‘আম্মু, কুঞ্জ ভাই এগুলো এডিট করেছেন।’
এরপর প্রশ্ন আসবে, ‘কেন? কুঞ্জর মতো অতিভদ্র ছেলেটা এমন করবে কেন?’
আমরা জানি– গাঁধি ইজ ইক্যুয়াল টু নবনী। সেই সূত্রানুসারে তুই বলবি, ‘তোমাদের কাছে আমাকে খারাপ বানানোর জন্য।’
এতে সবাই আরও ভড়কে যাবে। কেউ কেউ ধরেও নেবে যে, তোর আর আমার মাঝে ইয়ে ইয়ে আছে। মনোমালিন্যের কারণে আমি এসব করছি। আর তোর যা ধুরন্ধর বাপ! ব্যাস! এই রাতেই কাজী ধরে এনে বিয়ে পড়িয়ে দেবে।
রাতেই তুই আমাকে সালাম করে বলবি, ‘আজ থেকে আপনি আমার পতিপরমেশ্বর।’ তো! হলো না?”
ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল উঁচিয়ে বললাম, “কুঞ্জ ভাই! বেশি হয়ে যাচ্ছে! আমি কিন্তু মণিকে বলে দেব!”
“আমাকে বিয়ে করার এতই তাড়া! আম্মু তো তোকে অলরেডি মনে মনে ছেলের বউ হিসেবে মেনেই নিয়েছে। এখন কি আমার বেডরুমও দখল করতে চাস! এ্যাই! ছিঃ! নবু, ছিঃ! শ্যেইম অন…”
“চুপ! চুপ! চুপ!”
কান দুটো চেপে ধরে একথা বললাম। মণি আর মামা তো যথেষ্ট শালীন! তাদের ঘরে এই নির্লজ্জটা কী করে এলো? নাহ্! এটা আমার মামাতো ভাই হতেই পারে না। নিশ্চয়ই মণি ওঁকে পালতে নিয়ে এসেছে। আমি মনে-প্রাণে এক্ষুনি এই বেলাজটাকে ভাই হিসেবে ত্যাজ্য করলাম। ত্যাজ্য! ত্যাজ্য! ত্যাজ্য! হুঁঃ!
“নবু বেইবি, এসো বেইবি, পা টিপে দিয়ে যাও, বেইবি।”
আমি চোখ রাঙালাম কুঞ্জ ভাইকে। তার আর কিছু বলার আগেই টেবিলের উপর থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা খুললাম।
কুঞ্জ ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কী করতে চাচ্ছিস?”
আমি সেসবে পাত্তা না দিয়ে বক্স থেকে তুলো ছিঁড়ে দু’কানে গুঁজে নিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। এখন আর ওঁর এসব কথা শুনতে হবে না। উফফ! কান দুটো পঁচে যাচ্ছিল। কী অশ্লীল!
বিছানায় বসে শান্ত ভঙ্গিতে ওঁর পা টিপতে লাগলাম। মিনিট তিনেক যেতেই কুঞ্জ ভাই আমার কানের তুলো সরিয়ে দিলেন। আমি ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে রইলাম, যার অর্থ– কী হলো এটা?
কুঞ্জ ভাই দু’হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে বললেন, “এভাবেই তুই বুঝিস কম, চিল্লাস বেশি। তার উপর কানে তুলো গুঁজে আরেক ধাপ বেশি বোঝার ধান্দা। আমার ‘বোন’ ডাককে ‘বউ’ শুনে আমার সুইট আম্মুটাকে এত জলদি দাদি বানানোর ফন্দি এটেছিস, না? ছিঃ! নবু, ছিঃ! শ্যেইম অন ইউ।”
আমি কিছুক্ষণ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আমার নির্বিকার থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ইশ! অসহায়ত্বের উপর যদি কোনো ডিগ্রি থাকত! তবে আমি অবশ্যই পিএইচডি করে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করতাম। কিন্তু আফসোস! আমি এই বিষয়েও অসহায়।
হঠাৎ ইচ্ছে হলো এই লোকটাকে একটু জ্বালাতে। এমনি আজ ওঁকে দেখে মেজাজ গরম হয়ে গিয়েছিল আমার। দীর্ঘ তিন মাস পর দেখা দিলেন, আর এসেই শুরু হয়ে গিয়েছে! মানলাম উনি না থাকলে, ওঁকে একটু মিস করেছি। আচ্ছা! একটু না, প্রচুর মিস করেছি। বাড়ি থেকে বেরোলেই চাইতাম, রাস্তায় যেন ওঁর সাথে দেখা হয়ে যায়! আজ হলোও! কিন্তু, দিন দিন এই লোকটা এতটা নির্লজ্জ হয়ে পড়বে, বুঝিনি। বুঝলে কি আর চাইতাম, উনি আসুক?
আমার ভাবনার মাঝেই অবচেতন মন আমায় বলে উঠল, “মিথ্যে বলে নিজেকে একদম সান্ত্বনা দিবি না। তোর কুঞ্জ ভাই আগে থেকেই এমন ছিল।”
আমি এর বিপরীতে আর উত্তর দিতে পারলাম না। সব ভাবনা ছুঁড়ে ফেলে কুঞ্জ ভাইকে জ্বালানোর প্ল্যান কষলাম।
পা টিপতে টিপতেই কুঞ্জ ভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি ফোন ঘাটছেন আর মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমার চাহনি নিজের চোখে স্থির থাকতে দেখে উনি পরপর দু’বার ভ্রু উঁচু করলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে দাঁত কেলালাম। এতে যেন উনি সামান্য ভড়কে গেলেন।
আমি চওড়া হাসি দিয়ে বললাম, “কুউউউঞ্জ ভাইইই!”
“এভাবে তাকাবি না, নবু। তোর মতিগতি ভালো ঠেকছে না।”
আমি প্রশস্ত হাসি দিলাম। উনি আড়চোখে আমাকে দেখে বললেন, “বলে ফেল।”
“বলছি, আপনার গলা ব্যাথা করে না?”
কুঞ্জ ভাই ফোন ঘাটতে ঘাটতে বললেন, “স্বামী হত্যা মহাপাপ। ও চিন্তা বাদ দে।”
আমি কিছুক্ষণ নির্লিপ্ত থেকে ওঁকে গভীরভাবে অবলোকন করে ডাকলাম, “কুঞ্জ ভাইইই!”
উনি অদ্ভুত ভাবে তাকালেন। মনে মনে হাসছি আমি। ওঁর তাকানোতে বুঝতে পারছি, আমার এই ডাকে উনি বেশ অসন্তুষ্ট।
আমার আবারও ডাকাতে উনি হালকা কেশে বললেন, “বারবার ডাকবি না, নবু। বুকে লাগে।”
আমি ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলাম। উনি মনোযোগ অন্যদিকে দিয়ে বললেন, “কী বলবি, বল।”
“আপনাকে দেখলেই না আমার ইয়ে ইয়ে পায়।”
কুঞ্জ ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কী পায়?”
আমি লাজুক হেসে ওঁর একটু কাছ ঘেঁষে বললাম, “ইয়ে মানে, প্রেম পায়।”
অতঃপর সঙ্গে সঙ্গে যেন আমার পুরো পৃথিবী ঘুরতে লাগল। আল্লাহ! ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি? এ্যাই! আমি কথা বলতে পারছি না কেন? আমার ডান গাল অবশ হয়ে আছে। বুক ফেঁটে চিৎকার আসছে আমার। মরে-টরে গেলাম নাকি?
আমার অবচেতন মনের ধ্যান ধারণাকে দূরে ঠেলে কুঞ্জ ভাই বললেন, “গা ঘেঁষিস কেন, নবু? তোর মতলব সুবিধার না রে। আমি বইন পিউর ভার্জিন। আর তুই আমাকে নিয়ে এসব ভাবিস! ছিঃ! নবু, ছিঃ! শ্যেইম অন ইউ।”
এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম, আমার গালটাতে এই বজ্জাতের হাত পড়েছে। মুখশ্রীর ডান অংশটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কী জ্বলছে! এভাবেও কেউ মারে! এত হাত চলে কেন ওঁর? কী বলেছিলাম আমি? সামান্য মজাই তো করেছিলাম! তাই বলে এভাবে মারবেন? এভাবে?
উনিও তো কত আজেবাজে কথা বলেন। আমারও তো ইচ্ছে হয়, ওঁকে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। ইশ! আব্বু! আফসোস! আফসোস! এই বংশের মহিলা বিয়ে করে তোমার পুরো লাইফটাই আফসোস!
পিউর বাঙালি জাতির মতো কেঁদে কেঁদে “মা মা” বিলাপ করা শুরু করলাম। কুঞ্জ ভাই খাটে হেলে শুয়ে ছিলাম। আমার আওয়াজ পেয়ে, উঠে ঠিক করে বসলেন।
অস্থির চিত্তে শুধালেন, “নবু, কী হয়েছে?”
যাক! উনি এতক্ষণে একটু সিরিয়াস হলেন। আমার কান্না সার্থক। ওঁর আহ্লাদে আমি ঠোঁট ফুলিয়ে পূর্বের সুরে আরও শব্দ করে কান্না করতে লাগলাম।
কুঞ্জ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা সবাই জানি, তুই একটা ছাগল। প্রুভ করার জন্য কেউ ম্যা ম্যা করতে বলেনি। খিদে পেলে, যা। গিয়ে ঘাস খা।”
আমার কান্না নিমিষেই থেমে গেল। নাহ্! আর একটা মুহূর্তও এখানে থাকব না। আ’ম ড্যাম শিউর, এই লোকটা একটা বদ্ধ উন্মাদ।
চলবে…
#কল্পকুঞ্জে_কঙ্কাবতী
লেখনীতে: নবনীতা শেখ
|পর্ব ৩|
হাতে কফির মগ নিয়ে কুঞ্জ ভাইয়ের রুমের দিকে যাচ্ছি। মেজাজ আমার সপ্তম আকাশ ছুঁয়েছে। আমাদের বাসায় চারটা বেডরুম। একটা আব্বু-আম্মুর, একটা আমার আর আপির, একটা গেস্ট রুম ও অন্যটা কুঞ্জ ভাইয়ের। নিজের বাসার চেয়ে মহারাজের এ বাসায় থাকতে বেশি ভালো লাগে। ঠিক সেই কারণেই ওঁর জন্য এ বাসায় বরাদ্দকৃত একটা আলাদা রুম রয়েছে।
আজ এখানেই থাকবেন উনি। গোগ্রাসে জামাই আদর গিলবেন। এমনিতেই আমার মেজাজ চোটে আছে, তার উপর আবার আমার জন্মসূত্রের আম্মাজান আমাকে কুঞ্জ ভাইয়ের জন্য কফি দিতে ওঁর রুমে পাঠাচ্ছেন। মায়ের বাধ্য মেয়ে কি না! না বলতে পারিনি।
হাজার খানেক ভাবনা নিয়ে রুমের ভিতর পা বাড়ালাম। দরজা নক করতে মনে নেই। সোজা ঢুকে পড়লাম। দেখলাম, কুঞ্জ ভাই ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছেন। উনি ল্যাপটপে কিছু একটা করছেন। হাত কী-বোর্ডের উপর। তাই ফোনটা স্পিকারে দেওয়া। ওঁদের কথা বার্তা এরকম ছিল—
“ভাই, তুমি যেতেই আবারও ঝামেলা লেগে গেছে। আসবা কবে?”
কুঞ্জ ভাই জবাব না দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “তোরা সামলাতে পারবি না?”
“পারব, কিন্তু…”
“কী?”
“ওরা বাড়াবাড়ি করছে।”
“আপাতত সামলে নে। বাকিটা আমি ফিরে দেখব। শালাদের পাঙ্খা গজিয়েছে!”
কথাটা বলার পরপরই দরজার সামনে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উনি ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে বললেন, “দু’দিন আর ডিস্টার্ব করবি না। যদি একটা কলও পাই, তবে তোকে ভার্সিটির সব মেয়েদের সামনে শাড়ি পরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখব। বুঝলি?”
অপর পাশের উত্তরের আর অপেক্ষা করলেন না। কল কেটে দিয়ে আমার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বললেন, “আমার মতো সিঙ্গেল অ্যান্ড ভার্জিন ছেলের ঘরে নক না করে ঢোকার মানে কী, নবু? বাই এনি চান্স, আমাকে বেইজ্জতি করার ফন্দি আটিসনি তো?”
শেষ বাক্যটি বলতে বলতেই ল্যাপটপ পাশে রেখে, অপর পাশ থেকে কাঁথা তুলে গলা অবধি জড়িয়ে ফেললেন। আমি হা হয়ে গেলাম। আবার শুরু হলো! একটু আগেই না সিরিয়াস মুডে ছিলেন! কতটা গম্ভীর ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন! এত জলদি একটা মানুষের কণ্ঠস্বরের এমন পরিবর্তন কী করে হয়? এটা মানুষ না। আমি নিশ্চিত কুঞ্জ ভাই, আপনি গিরগিটি!
পা চালিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। কফির মগটা দিয়েই কেটে পড়ব। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকার কোনো মানে নেই।
সেই উদ্দেশ্যেই বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম, “আপনাকে বেইজ্জতি করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আম্মু কফি দিতে পাঠিয়েছিল, সেটাই দিতে এলাম। নয়তো এই নবনী আপনার ছায়াও না মাড়ায়, মি. ফাহিম কুঞ্জ!”
উনি চোখ বড়ো বড়ো করে কাঁথাটা আরও শক্তকরে চেপে ধরে বললেন, “একদিনেই নামের পাশের ভাই ট্যাগটা সরিয়ে ফেললি তুই? একটু আগে মজা করে বললেও এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে, নবু। তুই কফির সাথে অ্যালকোহল মেশাসনি তো! না মানে আমার…”
আমি তপ্ত শ্বাস ফেলে বললাম, “না। বিষ মিশিয়েছি। খান, খেয়ে মরে যান।”
“তোর উপর বিশ্বাস নেই। মেশাতেও পারিস। কিন্তু এতে তো তুই বিয়ের আগেই বিধবা হবি।”
“হলে হব।”
“পাষাণ নবু!”
আমি কণ্ঠভরা বিরক্তি নিয়ে বললাম, “কিছু মেশাইনি, কুঞ্জ ভাই। নিন না!”
“না, নবু। না। তুই নির্দয় হলেও আমার হৃদয় অনেক বড়ো। তোকে বিধবা করতে চাই না।”
“সত্যি বলছি, এতে কিছু মেশাইনি।”
“তোকে বিশ্বাস করি না। আমার মরার পর আমার একমাত্র বউটার উপর কোনো অনাচার হোক, তা আমি হতে দেব না। ভুলে যাস না নবু, তোর হবু বর ভীষণ সচেতন। আগে এই কফি তুই খাবি।”
আমি রাগ দেখিয়ে বললাম, “ব্যাস! অনেক হয়েছে। আপনার খেতে ইচ্ছে হলে খান। নয়তো ফেলে দিন। আমি আপনার কথা শুনতে পারব না। আসলে শুনব না। না মানে না। ’ন’-আকার না। বুঝলেন?”
আমার কথা শুনেই উনি কাঁথা সরিয়ে ফোন হাতে নিলেন। ভ্রু-কুঁচকে ফেললাম আমি। ফোনে কিছু একটা বের করেই আমার দিকে ধরলেন। কলেজের সেই ভিডিয়োটা!
আমি মেকি হেসে বললাম, “আরে, কুঞ্জ ভাই! মাইন্ড খাচ্ছেন কেন? খাচ্ছি তো আমি। না মানে গিলছি! কফি! আহা! এই কফিটা খাওয়ার জন্য তো আমি মরেই যাচ্ছিলাম। আমাকে এটা দিয়ে ধন্য করার জন্য আপনাকে এভারেস্ট সমান ধনেপাতা।”
কুঞ্জ ভাই বাঁকা হেসে বললেন, “দে, ধনেপাতার ব্যবসা করব। আমি হব ধনেরাজা আর তুই হবি আমার ধনেরানি। একসাথে একটা ধনেবংশ তৈরি করব। ঠিক আছে?”
আমি নির্লিপ্ত রইলাম। ওঁর থেকে আর কী-ই বা আশা করা যায়!
কুঞ্জ ভাই হাই তুলতে তুলতে বললেন, “এটা ঠান্ডা হয়ে গেছে, তোর বকবকানির জন্য। যা, নতুন করে বানিয়ে আন।”
আমি কিছু না বলেই বের হয়ে গেলাম। এখানে কিছু বললে আরও কথা শুনিয়ে দেবেন। রান্নাঘরে এসে দেখলাম আম্মু সবকিছু গোছাচ্ছে। আমার আগমনের আভাস পেয়ে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবারও নিজের কাজে মন দিয়ে বলল, “কফি দিতে যাসনি?”
আমি মনে মনে কুঞ্জ ভাইকে গালি দেওয়ায় ব্যস্ত ছিলাম। আম্মুর কথা শুনে জোরপূর্বক হাসলাম। কুঞ্জ ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটা শব্দও আম্মুকে বলা যাবে না। যদি বলি, তবে আম্মু বলবে, “তোরা বাপ-বেটি আমার বাপের বাড়ির লোকদের সহ্য করতে পারিস না, তাই না? ওমন চান্দের টুকরো ছেলেকে নিয়ে এমন বানোয়াট কথা বলতে তোদের বিবেকে বাঁধে না?”
এভাবে শুরু হবে আম্মুর কথা, শেষ হবে আমার ফোনের টপিকে এসে। তাই আর ওঁর বিরুদ্ধে কিছু না বলে বললাম, “উনি কিছু কাজ করছিলেন, আম্মু। কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। নতুন করে বানিয়ে দাও তো!
আম্মু বরাবরের মতোই বলল, “দেখেছিস? কয়েকমাস পর বাসায় এসেছে ছেলেটা। এসেও কাজ! এই বয়সেই আমার ভাতিজা লেখা পড়ার পাশাপাশি নিজের খরচ নিজে মেটায়; বাসা থেকে এক টাকাও নেয় না। উলটো ভাবিকে মাঝে মাঝে কেনাকাটা করে দেয়। ঐ ছেলের নখেরও যোগ্য না তুই, আবার আসিস ওর বদনাম করতে!
সারাদিন ম্যা ম্যা ছাড়া আর পারিস কী করতে? যা! ছেলেটা যাওয়ার আগে ওর পা ধোয়া পানি খাবি। খেতেই হবে। তাও যদি তোর আক্কেল-জ্ঞান হয়!”
আমি আম্মুর কথাগুলো শুনেও শুনলাম না। সয়ে গেছে এসব। এ বাসায় আমার দাম ভালো করেই জানা আছে। ঐ যে! ব্রয়লার মুরগি! ঐ মুরগির দামও বাড়ে। কিন্তু আমার! এক আনাও না। ছ্যাহ্! ছ্যাহ্! ছ্যাহ্! অকর্মা নবু!
এই বাসায়, দিনের শুরুতে আম্মুর চিল্লানো শুরু হয় বাবার কারণে আর শেষ হয় আমাদের দু’বোনের ফোন ঘাটাঘাটিতে এসে। আহা! আমি বেচারি!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আম্মুকে বললাম, “তোমার চান্দের লাহান পিতলার পাতিলডার কফিখানা বানিয়ে দাও।”
আমার সহজ-সরল আম্মু এই জটিল কথাটা না বুঝে বলল, “আমি নামাজ পড়ব। সারাদিন শুয়ে-বসে থাকিস, কফিটা অন্তত বানা।”
আবারও অপমানস! আমি হতাশ নিশ্বাস ফেলে কফি বানিয়ে নিয়ে গেলাম। এবার আর দরজায় নক করতে ভুললাম না।
দরজায় করাঘাত করে বিষাদে ভরা হাসি দিয়ে বললাম, “আসতে পারি, কুঞ্জ ভাই?”
কুঞ্জ ভাই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার ডাকে পিছু মুড়লেন। পরনে অ্যাশ কালার টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার। টিশার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। চুলগুলো হালকা ভেজা। সন্ধ্যায় শাওয়ার নিয়েছিলেন, এজন্য। সত্যি বলতে, ভীষণ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে ওঁকে। আচ্ছা! এই মানুষটা সবসময় এমন শান্ত-শিষ্ট হয়ে থাকতে পারেন না? উনি কি জানেন, এভাবে ওঁকে ঠিক কতটা সুন্দর লাগে! খুব বলতে ইচ্ছে হয়, চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগে এভাবে আপনাকে, কুঞ্জ ভাই।
আমাকে হা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুঞ্জ ভাই লাজুক হেসে বললেন, “পারমিশন নেওয়ার কী আছে, নবু? যেখানে আমি নিজেই তোর, সেখানে অটোমেটিকালি আমার সব কিছু তোর। আমার লাইফের মতো হুট-হাট সব জায়গায় চলে আসার অনুমতি তোর আছে, বুঝলি?”
অন্য সময় হলে হয়তো কুঞ্জ ভাইয়ের এমন আবেগী কথায় আমি প্রভাবিত হতাম, মুচকি হাসতাম, লজ্জা পেতাম। কিন্তু এখন আমার এরকম অনুভূতি হচ্ছে না। আগেরবারই তো বিনা পারমিশনে আসার জন্য কী কী কথা শুনিয়ে দিলেন! আর এখনই! কালই গিয়ে মণিকে বলব, তার ছেলের মাথার সবগুলো তার ছিঁড়ে গেছে। তার ছেলে একটা তারছিঁড়া।
আমি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করলাম। সোজা গিয়ে জানালার ধারে, কুঞ্জ ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম। ওঁর দিকে কফির মগ এগিয়ে দিতেই উনি ভ্রু-কুঁচকে বললেন, “তোকে দিয়ে বিশ্বাস নেই, নবু। আগে তুই টেস্ট করবি।”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। চা-কফি খেতে পারি না আমি। প্রতিবারই জিভ পুড়ে যায়। তাই জোড়ে জোড়ে ফুঁ দিতে লাগলাম। কুঞ্জ ভাই এক দৃষ্টিতে আমার কাহিনি দেখছেন। আমি সেটা বুঝতে পেরে ফুঁ দেওয়া বন্ধ করে হালকা কেশে বললাম, “জানেন? কফির জায়গায় আপনি থাকলে, এই জানালা দিয়ে পড়ে যেতেন।”
কুঞ্জ ভাই ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “তোর ফুঁ-তে এত দম! ইন্টারেস্টিং! দে। ফুঁ দে।”
আমি এবার কফির মগটা জানালার পাশের টেবিলে রেখে ওঁর মুখশ্রীতে ফুঁ দিতে লাগলাম। উনি চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। ঠোঁটের কার্নিশ হালকা বেঁকে আছে। আচ্ছা! উনি কি হাসছেন? এত সুন্দর লাগছে কেন ওঁকে?
কুঞ্জ ভাই! আপনার সবগুলো রূপ এরকম কেন? আলাদা কেন? আপনার মুখ চলার সঙ্গে সঙ্গে আমার রাগ আকাশ ছুঁয়ে যায়। আপনি দু’চোখ বন্ধ করে নিলে শীতল এক হাওয়া আমার বক্ষে ঝড় তুলে দেয়। কেন, কুঞ্জ ভাই? কেন? এখন ইচ্ছে হচ্ছে, আপনার এই স্নিগ্ধ মুখখানা ছুঁয়ে দিতে।
মনে মনে এসব ভেবে সেই উদ্দেশ্যেই হাত বাড়ালাম। তৎক্ষনাৎ কুঞ্জ ভাই চোখ খুললেন। আমাকে নিজের এতটা কাছে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে দূরে ছিটকে গেলেন।
আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোর প্ল্যান আমি ধরতে পেরেছি, নবু। আমার আম্মুর এই বয়সেও এত ইয়াং আছে বলে তোর জ্বলছে। তাই এখনই তাকে দাদি বানানোর ধান্দা, না? ছিঃ! নবু, ছিঃ! শ্যেইম অন ইউ। আমার তেইশ বছরের ভার্জিন উপাধিটা আমি তোকে ছিনিয়ে নিতে দেব না। কখনও না। ওগো! কেউ আছ? এই লুচু মহিলা আমার সর্বনাশ করে দিচ্ছে। বাঁচাও। বাঁচাও।”
আমি বরাবরের মতই হা হয়ে গেলাম। আমি স্তব্ধ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়! আমি লুচু মহিলা? আর কী কী শুনতে হবে আমায়!
চলবে…