কল্পকুঞ্জে কঙ্কাবতী পর্ব-৬+৭

0
608

#কল্পকুঞ্জে_কঙ্কাবতী
লেখনীতে: নবনীতা শেখ
|পর্ব ৬|

“আমার হৃদয়হরণী, কোমল এক রমণী সে। তাকে দেখলেই শুধু দেখে যেতে ইচ্ছে হয় এই দু’চোখ ভরে। তার চোখের উপচে পড়া মায়ায় আমি তলিয়ে পাচ্ছি না কুল। বড্ড অদ্ভুত নারী সে। তার আশেপাশে না থাকলে নিজেকে ছন্নছাড়া লাগে, দিন-দুনিয়া হারিয়ে ফেলি। অথচ, সেই নারীটি পাশে থাকলে আমি গোটা নিজেকেই হারিয়ে ফেলি। প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন আমিটা তার সান্নিধ্যে পালটে যাই, পুরোই বিপরীতধর্মী এক সত্তা আমাকে কাবু করতে থাকে। আমার সবচেয়ে প্রিয়! সবচেয়ে প্রিয়– তার কোমল শরীরের মিষ্টি সেই পদ্ম পাপড়ির সুবাস। পাগল করে দেয়। কখনও কোনো নারীর প্রতি আমার এমন অনুভূতি আসেনি। তবে তার প্রতি কেন? কারণ একটাই– সে যে ভিন্ন, আমার কঙ্কাবতী ভিন্ন। তাকে…”

হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে আমি ঈষৎ কেঁপে উঠলাম। মুহূর্তেই ভয় আমার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। দরদর করে ঘামা শুরু করলাম। মনে মনে দোয়া-দুরুদ পড়ে পেছনে মুড়লাম। আমাকে ভয় পেতে দেখে আমার বিপরীতে অবস্থিত মানুষটি খিলখিল করে হেসে উঠল।
চোখ মেলে তাকালাম আমি। সামনে রাহী দাঁড়িয়ে আছে। বুকে হাত রেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। পরক্ষণেই এক হাতে রাহীর বাহুতে মারলাম।

ও ‘আউচ’ টাইপের শব্দ করে বলল, “মারিস কেন?”

“ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি। আমি তো মনে করেছিলাম, আমার পেছনে তোর ভাই।”

রাহী আবারও হাসল। সেকেন্ড দশেক পর সে প্রশ্ন করল, “ভাইয়ার রুমে কী করছিস?”

“উমম… কিছু না।”—বলেই হাতের ডায়ারিটা জায়গা মতো রেখে দিলাম। তারপর আবার রাহীকে বললাম, “চল এখান থেকে। তোর রুমে যাব। মণি কী করছে এখন?”

“রান্না করছে। শোন, পরশু নৌশির বার্থডে। প্ল্যান করেছিস কিছু?”

“হুমম, করেছি।”

দুজনে মিলে কথা বলতে বলতে রুম থেকে বেরোলাম। মামার বাসায় এসেই মণির সাথে কিছুক্ষণ গল্প করেছিলাম। কুঞ্জ ভাই বাসায় এসেই কোথায় যেন গিয়েছে! তাই মণির সাথে কথা শেষেই কুঞ্জ ভাইয়ের রুমে চলে এসেছিলাম। এই বাসায় আমার সবচেয়ে প্রিয় রুম এটা। এখানে সব কিছুতে ওঁর ছোঁয়া আছে। বাতাসে মিশে আছে তাঁর ঘ্রাণ। এজন্যই আসা।
আমি কুঞ্জ ভাইয়ের বুক শেলফ থেকে বই হাতড়াতে হাতড়াতে তাঁর ডায়ারি পেয়েছি। সেটাই পড়ছিলাম। এই ডায়ারিটা আমি এর আগেও পড়েছি। এটা পড়েই তো তাঁর প্রেমিকা সম্পর্কে জেনেছি। মানতে হবে, মেয়েটা সৌভাগ্যবতী!

______________
“আচ্ছা, নবু! তুই থাক। আমি শাওয়ার নিয়ে আসি। বিশ মিনিট।”

“জানা আছে। তোর আর তোর ভাইয়ের ৪০ মিনিটের নিচে কখনো হয় না। তুই না হয় মেয়ে মানুষ, মানা যায়। কিন্তু তোর ভাই! তাঁর এত সময় লাগে কেন? সে পোলা মানুষ। গুনে গুনে পাঁচ মিনিটে গোসল করবে। এর বেশি কেন নেবে?”

“আমি কি জানি!”

“এককাজ করতে হবে। তোর যে ভাবি হবে, তাকে বলব, ‘ভাবি, শুনুন, জামাইকে হাতে রাখুন। গোসলে পাঁচ মিনিটের যত সেকেন্ড বেশি লাগাবে, তত টাকা ফাইন কাটবেন। আপনার ভালোর জন্যই বলছি।’ একথা বললে দেখবি, সব একদম ঝাক্কাস!”

আমার কথা শুনে রাহী হাসল। কপাল কুঁচকে বললাম, “এত হাসি পায় কেন তোর? আমার জামাই এমন করলে তাকে ওয়াশরুমে আটকে রাখব। বলব, ‘তোর বের হাওয়া লাগব না। তুই এখানেই থাক।’ আমার আবার এরম মানুষ দেখলে রাগ উঠে। উফফস, সরি! এরকম ‘পোলা’ মানুষ।”

রাহী হাসতে হাসতে বলল, “তোর কপালে এমন একটাই জুটুক। আমি গেলাম।”

কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল রাহী। আমি রাহীর রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে চলে এলাম। মণি এক ধ্যানে রান্না করছে। আমি পা টিপে টিপে গিয়ে মণির পেছনে দাঁড়ালাম।

“কিছু লাগবে, মা?”

আমি মণিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “উফফ! বুঝে গেলে কী করে, আমি এসেছি?”

মণি আলতো হেসে বলল, “ওভাবেই।”

“কী রান্না করছ এটা?”

“ছোটো মাছ।”

“উমম… লুকস ডিলিসিয়াস।”

মণি হাসল। আমি আবারও বললাম, “আচ্ছা, মণি! তোমার ছেলে যে দিনদিন কেমন যেন রুঢ় হয়ে যাচ্ছে, এই ব্যাপারে খেয়াল রেখেছ?”

মণি হাতের খুন্তি নাড়ানো বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সে কী! কী করেছে তোকে ঐ গর্ধবটা?”

“কিছু করেনি। তবে মনের ভেতর এক নারীকে রেখে আমার এই বাচ্চা মনটার সাথে খেলছে।”

শেষোক্ত কথাটি বড্ড মিনিমিনিয়ে বললাম; যা মণির কানে পৌঁছোয়নি। মণি জিজ্ঞেস করল, “কী বললি?”

“কিছু না। বলছি, তোমার ছেলেকে বিয়ে-টিয়ে দিয়ে দাও। পরে মেয়ে পাবে না, বুঝলে?”

“কেন? আমার ওমন ছেলের জন্য কি মেয়ের অভাব আছে নাকি?”

“সেই তো! এখন অভাব নেই। দিনকে দিন যেমন হয়ে যাচ্ছে; পরে দেখবে, একটা মেয়েও বিয়ে করবে না।”

“সমস্যা নেই। অন্য কেউ বিয়ে না করলে তুই করে নিস।”

মণির এই একটা কথাতেই আমার সমগ্র মুখশ্রী সিঁদুর-লাল বর্ণ ধারণ করে ফেলল। কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। লজ্জা পেলাম বুঝি! খানিকটা অবাকও হলাম। ওঁকে পছন্দ করলে তার মানে বাড়ির কারো কোনো সমস্যা নেই! ইশ! কেন যেন খুশি খুশি লাগছে।

মণিকে উদ্দেশ্য করে থেমে থেমে বললাম, “তাহলে এখন তাঁকে বিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, আমি আছি।”
মণি কাজে ব্যস্ত। শুনল কি আমার কথা! হয়তো হ্যাঁ, কিংবা না। সে যাক গিয়ে! আমার মনে লাড্ডু ফুটছে। এখন তার কঙ্কাবতীর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমার জিনিসের ব্যাপারে আমি আবার ভীষণ পজেসিভ। কিছু পছন্দ হয়ে গেলে, আমার ওটা লাগবেই। সেম ডিজাইনের অন্য প্রোডাক্ট না, আমার এটাই লাগবে।

_____________
কুঞ্জ ভাই বাসায় ফিরেছেন ঘণ্টা দুয়েক বাদেই। এদিক-ওদিক না তাকিয়ে মণিকে দু’টো কথা বলে নিজের রুমে চলে গেলেন। বসার ঘর থেকে আমি সবটা দেখলাম। বাহ! লোকটার ভাব দ্যাখো! আমাকে যেন দেখেও দেখলেন না।

কুঞ্জ ভাই রুমে যাওয়ার মিনিট দশেক বাদে আমিও গেলাম সেদিকে। দরজা ভেজানো। ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলাম। নাহ্! পুরো রুমে কুঞ্জ ভাই নেই। হয়তো শাওয়ার নিচ্ছেন! স্বস্তির একটা শ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলাম কুঞ্জ ভাই বারান্দা থেকে বেরোলেন। চোখাচোখি হয়ে গেল আমাদের। শুকনো একটা ঢোক গিলে মনে মনে বাহানা আওড়াতে লাগলাম।

কুঞ্জ ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কী?”

“ইয়ে… বলছিলাম কী… আপনি শাওয়ার নেবেন না?”

“হুম। নেব। এটা বলার জন্য রুমে এসেছিস?”

“না… মানে হ্যাঁ। মণি বলল…”

কুঞ্জ ভাই আমাকে থামিয়ে দিলেন, “থাক, কিছু বলতে হবে না। বোস এখানে।”

আমি চুপচাপ গিয়ে সোফায় বসে পড়লাম। কুঞ্জ ভাই নিজের হাতের ফোনটা বিছানায় ফেলে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে ওঁর ঠোঁটের সাথে লাগোয়া সেই বাঁকা হাসিটা আমার দৃষ্টি অগোচর হয়নি। উনি কি বুঝে গেলেন?
কপাল কুঁচকে ঠোঁট কামড়ে ভাবতে লাগলাম, উনি হাসলেন কেন?

উত্তর পেলাম না। কিন্তু বিছানার উপর ফেলে রাখা ফোনটা আমার নজর কাড়ল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোরের মতো ফোনের কাছে গেলাম। ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম লক করা। পাসওয়ার্ড কী হবে?
প্রথমবার লিখলাম, ‘03041999’

ওঁর জন্মতারিখ এটা। কিন্তু খুলল না। পরেরবার মণির জন্মতারিখ ট্রাই করলাম। তাও হলো না। আর একবার করা যাবে! ভাবতে লাগলাম। অনেক ভেবে এক পর্যায়ে লিখলাম, ‘KANGKABATI’

খুলে গেল। ইশ! প্রচুর রাগ লাগছে। এত দরদ কীসের ঐ মেয়ের প্রতি! এই মেয়েটাকে এখন সামনে পেলে তুলে একটা আছাড় দিতাম। শাকচুন্নিটা আমার জিনিসের দিকে হাত বাড়িয়েছে!
কুঞ্জ ভাইয়ের মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, কনট্যাক্টস, সব দেখতে লাগলাম। নাহ্! কোথাও এই কঙ্কাবতীকে পেলাম না। কুঞ্জ ভাই যে সেয়ানা! কোন চিপায় যে লুকিয়ে রেখেছে!

এসব কাজে আধা ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। আমার হাতে আছে আর দশ মিনিট। যা যা করার এই দশ মিনিটেই করতে হবে। ভাবতে ভাবতে কুঞ্জ ভাইয়ের মেসেঞ্জারে আমার ইনবক্স ওপেন করলাম। একদম ফক্কা। কোনো কথা হয়নি। অন্য হাতে নিজের ফোন বের করলাম।

কুঞ্জ ভাইয়ের ফোন থেকে নিজেকে মেসেজ করলাম, “শোনো!”

নিজের ফোন থেকে মেসেজ করলাম, “হুম… বলুন।”

ওঁর ফোন থেকে মেসেজের রিপ্লাই দিলাম, “তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে।”

আমার ফোন থেকে দুটো অবাক হওয়ার ইমোজি দিয়ে লিখলাম, “হঠাৎ?”

কুঞ্জ ভাইয়ের ফোন থেকে লিখলাম, “না। অনেক আগে থেকেই। বলার সাহস পাইনি।”

নিজের ফোন থেকে লিখলাম, “তা আজ কীভাবে পেলেন?”

কুঞ্জ ভাইয়ের ফোন থেকে লিখলাম, “অপেক্ষা করতে করতে যদি অন্য কারো হয়ে যাও! তাই আগেই বলে দিলাম। এখন যা হবার হবে।”

“উমম… বুঝলাম।”

“বোঝাবুঝি না। স্যে ইয়েস অ্যর নো।”

নিজের ফোন থেকে লজ্জার ইমোজি দিয়ে লিখলাম, “ইয়েস…”

ব্যাস! এই কনভারসেশনের একটা স্ক্রিনশট নিলাম। এরপর কনভারসেশন ডিলিট করে দিলাম। স্ক্রিনশট ভালো মতো এডিট করে নিলাম, যাতে আমার নাম না বোঝা যায়। তারপর কুঞ্জ ভাইয়ের ফেসবুকে এই স্ক্রিনশটটা পোস্ট করে দিলাম। ক্যাপশনে লিখে দিয়েছি, “অনেক অপেক্ষার পর ফাইনালি সে আমার!”

সাথে দুটো রেড লাভ ইমোজি। আহা! এবার যেন শান্তি লাগছে। গ্যালারি থেকে সেই স্ক্রিনশটটাও ডিলিট করে ফোনটা জায়গা মতো রেখে দিলাম।

তখনই পেছন থেকে দরজা খোলার সাউন্ড পেয়ে সেদিকে তাকালাম। সদ্য শাওয়ার নেওয়া কুঞ্জ ভাইয়ের দিকে তাকাতেই মনে হলো আমার হৃৎপিণ্ড একটা স্পন্দন মিস করে গেল। পরপর তুমুল বেগে স্পন্দিত হতে লাগল।

আমাকে রুমের মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুঞ্জ ভাই বললেন, “এভাবে মূর্তি বনে আমাকে দেখার কিছু নেই। আমি জানি, আমি দেখতে অসাধারণ! হাঃ!”

মুখ ভেটকালাম। কুঞ্জ ভাই আমার এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে শব্দ করে হাসলেন। হাসতে হাসতে হাতের টাওয়ালটা আমার দিকে ছুঁড়ে বললেন, “ব্যালকনিতে শুকোতে দিয়ে আয়।”

কিছু না বলে তাই করলাম। এখন কোনো মতে ওঁর সামনে থেকে সরতে হবে। উনি পাশে থাকলেই হৃৎপিণ্ডটা কীভাবে যেন লাফায়! উফ! হার্টের পেশেন্ট বানিয়ে দিয়েছেন আমাকে।

চলবে…

#কল্পকুঞ্জে_কঙ্কাবতী
লেখনীতে: নবনীতা শেখ
|পর্ব ৭|

সন্ধ্যের পরপরই বাসায় চলে এসেছি। ভীষণ চিল মুডে আছি। সাথে খুব হাসিও পাচ্ছে। এখন ঐ মেয়েটা যদি পোস্টটি দেখে ফেলে, তো ব্রেকআপ! আহা! শান্তি, শান্তি! ব্রেকআপ যে কারোর শান্তির কারণ হতে পারে, তা এতদিনে বুঝলাম।

পড়ার টেবিলে বসে বইয়ে মুখ গুঁজে এসব ভাবছিলাম। জীবন কেমন অদ্ভুত! সকালের আনন্দে আত্মহারা মনটা দুপুর হতে না হতেই ঘন কালো মেঘে ছেয়ে যায়। তবে তা সরতেও সময় লাগে না! এই যে! আমাকেই দ্যাখো!
তৎক্ষনাৎ মাথায় এলো, কুঞ্জ ভাই কি পোস্টটি দেখেছেন? তবে ওঁর প্রতিক্রিয়া কী? রেগে আছেন? না কি বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কে ভেবে চলেছেন, ‘হলোটা কী?’
কথা সেটা না। কথা হচ্ছে, যদি বুঝে ফেলেন কাজটা আমার, তবে?
বিষয়টা ভেবেই আমার উজ্জ্বল মুখখানা পেঁচার মতো হয়ে গেল। নিজেকে সান্ত্বনা দেবার উদ্দেশ্যে শব্দ করেই বলে উঠলাম, “না, না! তা হবে কেন? কীভাবে বুঝবেন! আর বুঝলেই বা কী? ভয় পাই নাকি ওঁকে?”

এতে যেন আমার ভেতরের সত্তা আমাকে ব্যাঙ্গ করে বলে উঠল, “সিরিয়াসলি, নবু? ভয় পাস না?”

আমি মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নেড়ে বললাম, “না। কেন পাব? হু ইজ হি?”

সে আবারও বলল, “তবে যে তোর কুঞ্জ ভাইয়ের কড়া চাহনিতে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে যাস! সে বেলায়?”

আমি আবারও বললাম, “হুটস! পাগল দেখলে মানুষ ওরকম একটু-আধটু সবাই করে।”

“তুই তোর কুঞ্জ ভাইকে পাগল বললি? বলতে পারলি?”

আমি ব্যাপারটা একটু অবজ্ঞা করেই বললাম, “কী ‘তোর কুঞ্জ ভাই’, ‘তোর কুঞ্জ ভাই’ লাগিয়ে রেখেছিস? সে আমার কবে হলো?”

“তাহলে তাঁর জন্য এসব আজেবাজে পোস্ট করছিস কেন?”

“ও এমনিই।”

“সে যাই বলিস…”

“ধুর ছাই! বিদেয় হ।”

মস্তিষ্কের সাথে মনের তর্ক থেকে বাঁচার জন্য পাশ থেকে ফোন হাতে তুলে ফেসবুক ওপেন করলাম। নিউজ ফিড স্ক্রল করতে করতেই আজকের সেই পোস্টটি সামনে এলো। অনেকগুলো কমেন্ট এসেছে। বেশ ধীরে সুস্থে কমেন্টগুলো পড়তে শুরু করলাম। অধিকাংশ কমেন্টে এই ছিল, ‘ডেয়ার নাকি, ভাইয়া?’
এটা দেখে আমার পেট ফেটে হাসির উপক্রম। মানে, সবাই মনে করে কী? কিছু উলোট-পালট কাহিনি মানেই ডেয়ার?
আর কিছু সংখ্যক কমেন্ট এসেছে, ‘কংগ্রাচুলেশন।’

এসব কমেন্ট পড়তে পড়তেই আমার ফোনে একটা আননৌন নম্বর থেকে কল এলো। আমি ভাবতে লাগলাম, এটা কে? পরিচিত কেউ!
ভেবেও যখন কিছু পেলাম না, তখন আমি কল রিসিভ করার জন্য উদ্যত হলাম। ওমনিই কল কেটে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে একটা মেসেজ এলো, “আচ্ছা!”

আমি কিছুক্ষন হা হয়ে তাকিয়ে ভাবলাম, “কী আচ্ছা? আর উনি কে?”

হয়তো রং নম্বর হবে। তাই আর মাথা ঘামালাম না। আমার ফোনে তেমন কারোর কল আসে না। এলেও রং নম্বর। তাই ফোন রেখে আবারও পড়তে বসলাম। ঘণ্টাখানেক পরেই আবারও আমার নম্বরে কল এলো। হাতে নিয়ে দেখলাম, আমার ফ্রেন্ড নৌশি কল দিয়েছে।

রিসিভ করেই বললাম, “তোকেই কল দিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ভুলে গেছিলাম। শোন! শীলা ম্যাম তো কাল থেকে আবারও কলেজে জয়েন করবেন। ভুলে গেছিলাম, ম্যামের ছুটি শেষ। এতদিন রাকিব স্যার ক্লাস করিয়েছেন, পড়ে না গেলেও কিচ্ছুটি বলেননি। তাই বায়োলজি সেকেন্ড পেপারের লাস্ট ক্লাসেও অমনোযোগী ছিলাম। কিন্তু… শীলা ম্যাম! ফটাফট নোটসগুলো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ কর তো!”

নৌশি অস্থির চিত্তে বলল, “ছাড় ওগুলো। এটা বল, কে তোকে প্রপোজ করল?”

মুহূর্তেই যেন আমার মস্তিষ্কে ছোটো-খাটো একটা বিস্ফোরণ ঘটল। তাজ্জব বনে গেলাম আমি। প্রপোজ! কে করবে আমাকে? কার এত সাহস? আমাকে যারা চেনে, তারা ভুলেও আমাকে প্রপোজ করার দুঃসাহস দেখাবে না। কেননা আমি সোজা থাপ্পড় মেরে দিই। আর হাড়গোড় ভাঙার জন্য তো কুঞ্জ ভাই আছেনই!

ব্যাপারটা বেশ ঘোলাটে। আরও পরিষ্কার করার জন্য নৌশিকে বললাম, “কী পাগলের মতো যা-তা বলছিস? কে প্রপোজ করবে?”

নৌশি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আরে, শালি! নিজের টাইমলাইন দ্যাখ!”

কথাটা বলেই কল কেটে দিল নৌশি। আমি কিছুক্ষণ হতভম্বের ন্যায় বসে রইলাম। মিনিট পাঁচেক অতিক্রম করতেই তড়িঘড়ি করে ফেসবুক ওপেন করলাম। নিজের টাইমলাইনের লাস্ট পোস্টটি দেখতেই আমি বিস্ময়ে হতবাক। কুঞ্জ ভাইয়ের টাইমলাইনে করা সেই ফেইক চ্যাটটিই আমার টাইমলাইনে পোস্টেড।
ক্যাপশনে লেখা, “ফাইনালি, হি প্রপোজড মি!”

কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইলাম। এটা কী হলো? প্রচুর কমেন্টস আসছে, সাথে মেসেঞ্জারেও অনেকেই জিজ্ঞেস করছে। এটা কে করেছে তা বুঝতে আমার মোটেও বেগ পোহাতে হলো না। আবারও সেই নম্বর থেকে দুটো দাঁত কেলানো ইমোজি মেসেজ এলো।

পরপরই আমি দাঁতে দাঁত চেপে গর্জন করে উঠলাম, “কুউউউঞ্জ ভাইইই!”

_____________
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে আরেক বায়না জুড়ে বসলাম, আলাদা ঘুমনোর। কিন্তু আপি মানছেই না। আচ্ছা! আমি বড়ো হয়েছি তো! আলাদা ঘুমোলে সমস্যাটা কোন জায়গায়? আমাকে কি এরা এখনও বাচ্চা পেয়েছে?

আবারও আপিকে বললাম, “এক রাতই তো!”

আপি সরু চোখে তাকিয়ে বলল, “পারবি না তুই।”

“পারব, পারব। গেলাম আমি।”

“একদমই না। পরে মাঝরাতে এসে জ্বালাবি। এর আগেও করেছিস। তা হবে না। চুপচাপ এখানেই শুয়ে পড়।”

আমি এবার চটে গেলাম, “বড়ো হয়ে গেছি আমি। ভয় পাই না একা থাকতে।”
তারপর একটু শান্ত গলায়ই বললাম, “ওওও আপিইই! যাই না?”

আপি নির্বিকার ভঙ্গিতে শুধু বলল, “না।”

আমি বিছানায় এসে বসলাম। আমি অন্ধকারে ভয় পাই। মূলত পাশে কেউ না থাকলেই ভয়টা পাই। এজন্য ছোটো থেকে আমাকে কখনো আলাদা থাকতে দেওয়া হয়নি। যদিও বা বায়না করেছি অনেক। থাকতে গিয়েও পারিনি। একা শুলেই মনে হয়, কেউ আমার পায়ের কাছে বসে আছে। তার নিঃশ্বাস আমার পায়ে পড়ছে। কিংবা খাটের নিচে কেউ বসে বসে গোঙাচ্ছে। মাঝে মাঝে অন্ধকার রুমে উজ্জ্বল চোখও দেখতে পাই। এগুলো অবশ্যই আমার অবচেতন মনের ভ্রম বৈ অন্য কিছু নয়।
মানুষ যখন কোনো কিছু নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে কিংবা ভয় পায়, তখন এরকম অনেক কিছুই দেখে।
আমিও তাই দেখতাম। মনে করতাম, ভূতগুলো আমাকে খেয়ে ফেলবে। সেবার তো ঘটল এক বাজে ঘটনা।
মাঝরাতে একা শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছিলাম। তখন মনে হলো কেউ আমার পাশে শুয়ে আছে, আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমার আর পাশের এই বস্তুটিকে দেখার ইচ্ছে কিংবা সাহস, কোনোটাই জাগেনি।
গায়ের কাঁথা যেভাবে ছিল, সেভাবেই নিয়ে উঠে আপির রুমে চলে এসেছিলাম। আপি দরজা খুলেই রেখেছিল। এসে দেখি আপি বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। গায়ের কাঁথাটা মেঝের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ছিল, যে-কোনো সময় আমি পড়ে যেতে পারতাম। তাই সেটা ভালো করে নিজের সাথে পেঁচিয়ে নিয়েছিলাম। তারপর আপিকে সুন্দর মতো ডাকা আরম্ভ করলাম। আপি জাগ্রত হয়ে আমাকে নিজের সামনে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেবার যা ভয় পেয়েছিল! মোটে এক সপ্তাহে জ্বর মাখিয়ে বিছানায় পড়ে ছিল। এরপর থেকে আমাকে আর একা থাকতে দেওয়া হয় না।

আমি বিছানার উপর মন খারাপ করে বসে আছি। আপিকে কি আরেকবার জিজ্ঞেস করব? যদি মেনে যায়? লাস্ট ট্রাই!

মন খারাপের ভান করে বললাম, “জীবনে কি শখ-আহ্লাদ থাকতে পারে না, আপি?”

আপি ফোন ঘাটছিল। আমার কথা শুনে ফোন থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তা থাকবে না কেন?”

“আমারও একা ঘুমনোর শখ জেগেছে। এখন কি এই শখটাকে হিরো আলমের গানের মতো অ্যাভয়েড করব?”

আমি ছলছল নেত্রে আপির দিকে তাকিয়ে একথা বললাম। আপি বড্ড অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল। কেন যেন মনে হচ্ছে, এতে কাজ হলো!

আপি কিছুক্ষণ ভেবে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “যা। তবে সকালের আগে আর এমুখো হবি না।”

আহা! খুশি এবার আমি। অধর কোণে হাসি ছড়িয়ে বললাম, “ওকে! ওকে! ডান!”

নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কুঞ্জ ভাইয়ের রুমে চলে গেলাম। সন্ধ্যেতে নিজের টাইমলাইনের ওমন পোস্টের কারণে যেই বিস্ময়টা আমাকে জেঁকে ধরেছিল, তা কাটাতে আমার বেশ সময় লেগেছিল। আর কাটানোর পরপরই যেভাবে হাসি শুরু হয়েছিল, তা যেন থামার নামই নিচ্ছিল না। আর যাই হোক! রিভেঞ্জটা দারুণ ছিল। পোস্টটি আর ডিলিট করিনি। ইচ্ছে করেনি। একটা ভ্রান্তি হিসেবেই হোক, তাঁর প্রপোজালই তো ছিল!
তাছাড়া ডিলিট করার প্রয়োজনও নেই। আমার অ্যাকাউন্টে তো আর তাঁর মতো চৌদ্দ গোষ্ঠীর বসত নেই। সবগুলো ব্লক লিস্টে আরাম-আয়েশ করছে।

ভাবতে ভাবতে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম। রুমে ঢুকে আর লাইট অন করলাম না। দরজা ভিড়িয়ে দিয়েই রুমের মাঝবরাবর চলে এলাম। বুক ভরে লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিলাম। আজ সকালেও কুঞ্জ ভাই এই রুমে ছিলেন! এখনও তাঁর পারফিউমের স্মেল এখানে মিশে আছে। বড্ড প্রিয় এই স্মেলটা! ফোনটা বেডসাইড টেবিলে রেখেই বিছানার উপর গা এলিয়ে দিলাম।

ইশ! মনে হচ্ছে যেন আমি কুঞ্জ ভাইয়ের সাথেই আছি। আমি আর কুঞ্জ ভাই! একা রুমে! উফফ! ভাবতেই আমার ফুলকো গালদুটো সিঁদুর লাল বর্ণ ধারণ করল। নিজের এমন কুরুচিপূর্ণ ভাবনার উপর ছিঃ ছিঃ করতে লাগলাম। সোজা হয়ে শুতেই বাম হাত গেল বিছানার মধ্যাংশে। হাতের নিচের অংশটা বিছানার চাদরের মতো মসৃণ নয়। অন্য কিছুর আভাস পেতেই বুঝলাম, পাশেই অগোছালো হয়ে নকশী-কাঁথাটা ছড়িয়ে আছে। কেউ গোছায়নি নাকি?
কথাটা ভেবেই এই কাঁথাটা নিজের দিকে টেনে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। বিছানার অপর পাশে খানিকটা চেপে আসতেই শক্ত কিছু একটার সাথে ঠেকে গেলাম। দেয়াল নাকি! নাহ্! তবে কী? এই রুমে তো কোলবালিশও ছিল না!
তবে? সে যাই হোক! ভালোই লাগছে! হাত-পা উঠিয়ে এই কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে শুলাম। কোলবালিশ এত লম্বা হয়? তার উপর কেমন শক্ত, তবুও ভালো লাগছে। কুঞ্জ ভাইও এমন শক্ত। এই কোলবালিশ দিয়ে ওঁর স্মেল পাচ্ছি। ঘুমেরা চোখের মাঝে ভর করছে। আবছা আবছা ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি। কোলবালিশটাকে তার উপর ওঠানো হাত ও পা দিয়ে আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম। এবার তো আমি পুরোটাই কোলবালিশের উপরে চার হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। রোমশ কিছুতে নাক ঠেকেছে। কুঞ্জ ভাইয়ের স্মেলটা আরও প্রকটভাবে আসছে।
হঠাৎ কোলবালিশটি নড়ে উঠল। আমার অবচেতন মন জাগ্রত হলো। ফট করে চোখ দুটো খুলে নিলাম। ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি। তবে ব্যাপারটা জটিল হচ্ছে আরও।

কিছু করতে যাব, তার আগেই ভরাট ও গম্ভীর গলায় কেউ একজন চাপা আর্তনাদ করে বলে উঠল, “পেত্নী! ওগো! তোমার হবু সোয়ামির সম্ভ্রম-হরণ হচ্ছে এখানে। রক্ষে করো আমায়। দয়া করে, রক্ষে করো। আমি আর কোনোদিন ঢাবির মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকাব না। ওঁরা আমার বোনের মতো। তুমি বাদে সব মেয়ে আমার বোন। ঐ যে! ওবায়দুল কাদের চাচার কথাবার্তার দিব্যি।”

চলবে…?