#কারণে_অকারণে_ভারোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
৪২.
ভীষনরকম একটা আওয়াজের সাথে ল্যাপটপটা বন্ধ হতেই আরু একটু কেঁপে উঠলো, মনে মনে ভীষনরকম খুশি হলো এটা ভেবে যে কাজ হয়েছে অর্থাৎ তার ও সামনে ওয়ালি কলেজ মে গানটা শুনে আরিশের গায়ে ছ্যাঁকা লেগেছে বেশ। আরু মুচকি হেসে স্বাভাবিক ভাবেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে লাগলো। ওড়নাটা খুলে সোফাতে রেখে দিল। আরিশের দিকে আপাতত তাকাচ্ছে না, তাকে কোনভাবেই বুঝতে দিতে চায় না যে সে রেগে গেছে তাতে তার কিছু যায় আসে না। আরু মাথায় চিরুনি ছোঁয়াতে গেলেই আরু ধমক শুনতে পেল তবে ভয় পেলো না। প্রত্যেকবার ধমকটা যেভাবে শুরু হয় এবারও তার ব্যাতিক্রম নয়, প্রত্যেক বার ‘এই মেয়ে ‘ কথাটা বলে শুরু হয় আরিশের ধমক চমকের পালা পর্ব।
আরু অরিশের দিকে বিরক্তি ভাব নিয়ে তাকালো যেন পৃথিবীর সমস্ত বিরক্ত আরিশের ধমকে ঢেলে দিচ্ছে।
— কি হয়েছে! এভাবে চেচাচ্ছেন কেন?
আরুর ভাবনায় এক বালতি জল ঢেলে দিয়ে আরিশ বলল
— কি সব কার্টুন দেখো তুমি? এই ছেলেটা এতো বদমাশ কেন? ওর দেখেই তুমি এসব কুমতলব পাও তাইনা?
আরু এই সময় মোটেও এটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না যে আরিশ কে ছ্যাঁকা দিয়ে বলা কথাটার এত নেগেটিভ রেজাল্ট আসবে? কোথায় ক্ষেপে না গিয়ে কার্টুন নিয়ে ধমক দিচ্ছে। আরু বেশ রেগে গেল।
— আমি দেখি তো দেখি, আপনাকে দেখতে বলেছে কে? আমি কি আপনাকে বলেছি হরিড হ্যানরি দেখতে? আর আমি এতো সুন্দর গান করছিলাম আর আপনি আমার গানের মাঝে এমনভাবে বকা ঝকা শুরু করলেন যে কি না কি।
আরিশ অবুঝ হওয়ার ভান করে বলল
— গান করো আর যাই করো, এই কার্টুন আর দেখবে না বলে দিলাম। ছেলেটা ভারী বজ্জাত।
আরু মুখ ভঙচি দিয়ে বলল
— আপনার থেকে অন্তত কার্টুনের হ্যানরি বেটার।
কথাটা বলে ওড়নাটা আরিশের মুখের সামনে ঝাড়ি মেরে আরু রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আরু রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই বলল
— যতোই তুমি রাগানোর চেষ্টা করো আরুপাখি, কিন্তু আমি তো রাগবো না।
আরু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল
— অদ্ভুত লোক, এদিকে তো আমাকে অন্য কারোর সাথে দেখলে সহ্য করতে পারে না আবার আমি এতো কিছু বলার পরও কিছু বললো না। একটা প্রেগন্যান্ট মহিলার ও অতোটা মুড চেন্জ হয়না যতোটা ওনার হয়। ভাল্লাগেনা।
…….
— আমাদের বেবির হার্টবিট চলে এসেছে । তোমাকে এখন আমি বাসায় ড্রপ করে দিব, একদম ভালো মেয়ের মতো বাসায় যাবে।
আরু আরিশের দিকে রাগী ভাবে তাকিয়ে বলল
— আপনি যা বলবেন আমাকেও কি তাই করতে হবে? আমি এখান থেকে কলেজ যাবো আজকে কলেজে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।
আরিশ জবাব দিলো না কোন প্রকার। আরিশের উত্তর না পেয়ে আরু নিজেই বলল
— আপনার কি একাই দরকারী কাজ থাকতে পারে? আমার কি কাজ থাকতে পারে না? কি মনে করেন নিজেকে।
আরিশ নিরুত্তর।
আরু আরিশের প্রতি বিরক্ত হচ্ছে রিতীমতো। ওর গুরুত্বপূর্ণ কাজটা আসলে কি তা বোঝানোর জন্য আরিশ কে দেখিয়ে দেখিয়ে সানাকে কল করলো।
আরিশ একমনে ড্রাইভ করছে যেন সে কিছুই যানে না।
প্রথমবার কল করলে সানা ধরলো না, পরেরবার আবার কল করতেই সানা হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকে ফোনটা ধরতেই কোনরকম হাই হ্যালো ছাড়া আরু বলল
— আহানাফ ভাইয়া আসছেন তো? ওনার না আজকে কলেজ এ আসার কথা? উনি তো বলেছিলেন ওনাকে ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখাতে আমি ওনার জন্য কলেজে অপেক্ষা করে থাকবো বলে দিস।
সানা বলে উঠলো
— ভাইয়া তো যাবেন না।
আরুর রাগ হলো তাও আরিশ কে রাগাতে আরু মিথ্যা বলে উঠলো
— ওহহ ওনার আসতে দেরি হবে? আমাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন? হ্যাঁ হ্যাঁ ওনার জন্য আমি ঘন্টার পর ঘন্টাও অপেক্ষা করতে রাজি ওনাকে বলে দিস।
আরিশ নির্বিকার।
আরুর কথা শুনে সানা বলল
— কি বলছিস এসব? উনি যাবেন না, উনি তো যাস্ট মজা করে বলছিলেন যাবেন।
আরুর মেজাজ বিগড়ে গেল। রেগে গিয়ে বলল
— সবার আমার ইম্পরট্যান্ট কাজের দিনেই শরীর খারাপ, পেট খারাপ হতে হয়। যতসব।
কথাটা বলে আরু কেটে দিল, জানালার দিকে মুখ করে ফোঁসফোস করছে।
আরিশ বলে উঠলো
— বাসায় যাবে নাকি কলেজে?
আরু উত্তর দিল না কোন। আরিশ আবার বলল
— উনি আসবেন না কেন? কি যে নাম বললে আহানাফ না কি?
আরু দা্ঁতে দাঁত চেপে বলল
— উনি অসুস্থ কালকে রাত থেকে।
আরিশ মুখ চেপে হেসে বলল
— কিন্তু আজকে সকালেই যে আহনআফ আমাকে ফোন করে বলল যে সে ভালো আছে, আর ফোন করে বলল যে কালকে নাকি তোমার সাথে দেখা হয়েছিল, তুমি নাকি অনেক শান্ত শিষ্ঠ।
আরু ঝটকা খেলো ভীষনরকম। আরু ঝটপটিয়ে উঠে বলল
— এই গাড়ি থামান গাড়ি থামান। আমার বমি পাচ্ছে খুব।
আরিশ রাস্তার ধারে গাড়ি থামাতেই আরু গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে ছুটে বড়ো বড়ো শ্বাস নিতে লাগলো। আরিশ জলের বোতল নিয়ে আরুর কাছে গিয়ে দেখলো আরু বড়ো বড়ো শ্বাস নিচ্ছে।
আরিশ চিন্তিত সুরে বলল
— আরুপাখি আর ইউ ওকে? খুব শরীর খারাপ লাগছে?
আরু আরিশের হাত থেকে বোতল নিয়ে ঢকঢক করে জল খেয়ে নিয়ে আরিশের হাতে বোতল ধরিয়ে দিলো। আরু চুপচাপ আছে। আরিশ বলে উঠলো
— আহানাফ হলো আরাভের কাজিন, ওর থেকে তিনবছরের ছোট। আমরা যে বছর পাস আউট হয় সেই বছর আহনাফ এডমিশন নেয়। ইন্টারশিপের সময় আমি ওদের হসপিটালে গেলে সেখানে আহানাফের সাথে দেখা হয়। আরাভ আমাকে নিয়ে আহানাফের কাছে অনেক গল্প করতো। আমি ডি এম সি তে পড়তাম তাছাড়া আমি প্রথম সারির স্টুডেন্ট ছিলাম তাই আহানাফ আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো ইন্সপায়ার হওয়ার জন্য যদিও আমি মনে করি যে একজনকে ছাড়া সবাইকে এডভাইস দিলে সবাই এডভাইজ নেবে। যাইহোক। সানা ওই কলেজে পড়ে আর আরাভের সূত্রেই আহানাফের সাথে পরিচয় ওর। কালকে তোমার সাথে দেখা করে ফেরার পথেই আহানাফ আমাকে ফোন করেছিল, আজকে সকালে নয়।
আরুর কপালে ভাঁজ পড়লো, আরিশ ওর থেকে আরও বেশি এডভান্স সেটা বুঝলো। অবাক হয়ে বলল
— তারমানে আপনি সবটা জানতেন? ওই জন্য আপনাকে রাগানোর চেষ্টা কথা স্বত্তেও আপনি রেগে যাননি তাইতো?
আরিশ আরুর নাকটা টেনে দিয়ে বলল
— তোমার কি মনে হয় আমি এতটাই উদার যে, যে কেও আমার বউয়ের সাথে ফ্লার্ট করেবে আর আমি তাকে ছেড়ে দেবো? আমি না জাতীয় অভদ্র তোমার ভাষায়!
আরু কাচুমাচু ফেস করে বলল
— আপনি সবসময় আমাকে বোকা বানান আর আমিও বোকা বনে যাই। আপনি খুব বাজে মি অভদ্র!
কথাটা বলে আরিশের পাশ কেটে চলে যেতে নিলেই আরিশ হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল
— মোটেও না, তুমি বোকা হওয়ার মতো কাজ করো। আমি কি তোমাকে বলেছিলাম আহানাফকে নিয়ে আমাকে রাগাতে?
আরু গোমরা মুখ করে বলল
— তাহলে আপনি কেন বললেন যে আপনি আরও বউ ডিজার্ভ করেন? বলুন হ্যাঁ!
আরিশ হো হো করে হেসে উঠলো সাথে আরুকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল
— এতো আজাইরা চিন্তা করো কিভাবে? আমি বলেছি আমার আরও বউ লাগবে? আমার একটা বউ মিস টুইটুই ওরফে ড্রামা কুইন। একটা সামলাতে হিমশিম খাই আবার দুটো। নিজের পায়ে নিজে খুড়ুল মারার মতো মানুষ নয় এই আরিশ খান।
আরিশ হো হো করে হেসে উঠল। আরিশ এর বুকে মাথা রেখে বলল
— আচ্ছা মি অভদ্র আমাদের ছেলে হবে না মেয়ে হবে?
আরিশ আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
— আমাদের যদি মেয়ে হয় তো তার নাম হবে আয়ূশি।
আরু আরিশের কথা নাকচ করে বলল
— নাহ আমাদের ছেলে হবে, যার নাম হবে আর্শিয়ান। মেয়ে হলে আপনি আমাকে ভুলে মেয়েকে বেশি বেশি আদর করবেন, আমার আদরে ভাগ কমে যাবে।
আরিশ সশব্দে হেসে বলল
— আরুপাখি, তোমার ভালোবাসা তোমারই থাকবে কেও তাতে ভাগ বসাবে না বুঝলে?
— হয্মম হমম। না বললেও বুঝি। আমি মজা করছিলাম। ছেলে মেয়ে যেটা হবে আমি তাতেই খুশি। আমি তো কখনো ভাবিনি যে আমি মা হতে পারবো।
আরু চোখ বন্ধ করে নিল। আরিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল
— সবটা অন্ধকার করে তুমি হারিয়ে যেওনা প্লিজ তাহলে আমিও হারিয়ে যাবো তোমার সাথে। ভালোবাসি।
#চলবে,,
#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
৪৩.
৪মাস পর,,,
— এই যে শুনছেন? আমার খুব ক্ষুদা পেয়েছে আপনি একটা কিছু এনে দিন না।
আরিশ এক কথাতেই চোখ খুলে আরুর দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভাবে বলল
— বলো কি খাবে।
আরু মুচকি হেসে বলল
— আপনার মাথা।
আরিশ বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল
— সে তুমি ২৪ ঘন্টায় খাও নো ডাউট। এখন কি খাবে বলো।
আরুও বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল
— বিয়ে বাড়ির অনেক খাবার খেয়ে আমার পেটে ওসব খাবার আর ঢুকবে না, আপনি নুডলস নিয়ে আসুন।
— ওয়েট আমি আসছি। তুমি আবার বিছানা থেকে নামলে কেন চুপচাপ শুয়ে থাকো।
আরিশ বেরিয়ে গেল। ঘড়ির কাটা বলছে এখন রাত আড়াইটা। আরু ফোনটা হাতে নিলো, নেট টা অন করতেই দেখলো সানার থেকে বেশ কয়েকটা এস এম এস। এস এম এস গুলো তার বাসর রাত নিয়ে যে বিরাট একটা ভয় তারই জানান দিচ্ছে যেমন–
” দোস্ত আমার ভয় করছে, আমাকে ওনার কাজিনরা রুমে বসিয়ে রেখে চলে গেছে। আমি একা বসে আছি। ”
দুই মিনিট পর,,,
” আরু ওনার একটা মেয়ে কাজিন আমাকে যা তা বলে ভয় দেখিয়ে গেছে বাসর রাত সমন্ধে। এখন কি হবে?
আরও এক মিনিট পর,,,
” কি রে জবাব দে। আমি ভয়ে তামা তামা আর তুই উত্তর দিচ্ছিস না কেন? বজ্জাতের হাড্ডি মহিলা।
তারপর আবার একটা এস এম এস,,
” আরু তুই ঠিক আছিস তো? এই এই এই উনি রুমে চলে আসছেন, আমি ওনার পায়ের আওয়াজ শুনেছি।বিদায় পৃথিবী।
এস এম এস গুলো পড়ে আরু দম ফাটা একটা হাসি দিলো। পেটটা বেশ ভালোই উঁচু হয়েছে পাঁচ মাসে। পেটে আলতো করে হাত দিয়ে আরু হাসতে লাগলো। একটা রিপ্লাই দিলো
— বেঁচে আছো তো ননদিনী নাকি আরাভ ভাইয়া,,,, ইশ লজ্জা লজ্জা।
এমন একটা এস এম এস পাঠালো আরু। কালকে সকালে হয়তো বেচারি সানা এটা দেখে লজ্জায় আর কিছু রিপ্লাই দেবে না। আরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা বিছানার ওপর রাখলো, ব্যালকনির দিকের সাদা পর্দাটা সরিয়ে দেওয়া, জোছনা রাতের চাঁদের আলোটা পুরোপুরি ঘরে প্রবেশ করছে নির্দিধায়। আরু আরিশ কে এই মধ্য রাতে আরও খানিকটা ব্যাতিব্যাস্ত করে তুলতে চাইলো। রুম থেকে বেরিয়ে গুটিগুটি পায়ে ছাদে উঠলো।
কিছুখন পর আরিশ নুডলস বানিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখলো রুমের ভিতর ফাকা, ওয়াশরুমে আলো জ্বলছে না দেখে আরিশ বুঝলো আরু কোথায়। চটজলদি নুডলসের বাটিটা নিয়ে ছাদে উঠে গেল আরিশ। ছাদের কার্নিশ বরাবর আরু দাঁড়িয়ে আছে আর আকাশের দিকে তাকিয়ে আঁকিবুকি করছে। আরিশ পিছন থেকে ডেকে উঠলো
— আরু পাখি ওখানে কি করছো তুমি?
আরু পিছন ঘুরে আরিশের দিকে একবার তাকিয়ে বলল
— ওহ আপনি এসে গেছেন? আসুন এখানে।
— ওখান থেকে চলে এসো। নুডলস টা খেয়ে যাও।
— ওটা ওখানেই রাখুন। আগে এখানে আসুন।
আরিশ নুডলস টা রেখে আরুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলো
— কি করছো এটা?
— মেঘেদের মান অভিমান কাটাচ্ছি। আপনিও করুন তাহলে তাড়াতাড়ি তাদের অভিমান ভাঙবে।
আরিশ আর অযথা প্রশ্ন করলো না, সেও আরুর মতো কল্পনায় মেঘেদের মান অভিমান কাটাতে লাগল। একটা সময় বুঝলো আরুর এমন পাগলামিতে সেও আনন্দ অনুভব করছে। প্রশ্ন না করে পারলো না।
— আচ্ছা কি করে বুঝবো মেঘেরা অভিমান করে আছে?
— আরু থেমে গেল, আরিশের দিকে বেশ গম্ভীরভাবে তাকিয়ে বলল
— কেন আপনি জানেন না?
অরিশ আরুর নাকের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছিয়ে দিয়ে বলল
— আমি তো আর মেঘেদের মনের ডক্টর নই যে জেনে ফেলবো। তা কি করে বুঝবো বলো?
আরু গম্ভিরতার ছাপ সরালো। স্বাভাবিক ভাবে মুচকি হেসে বলল
— যখন দেখবেন মেঘেরা আর সরে সরে যাচ্ছে, তারা আর এক জায়গায় স্হির নেয় তখন বুঝবেন তারা অভিমান করে আছে।
— তাহলে পুরো বর্ষাকালে মেঘেরা অভিমান করে থাকে বলছো?
— নাহ, তা কেন? যখন আকাশ পরিষ্কার থাকবে, ঝকঝকে চাঁদের আলোকে ওরা মাঝে মঝে ঢেকে দিতে দিতে সরে যাবে একে অপরের থেকে দূরে তখন বুঝবেন তারা অভিমান করে একে অপরের দূরে সরে যাচ্ছে। আর যখন দেখবেন মেঘেরা স্হির আর প্রান খুলে পাশাপাশি রয়েছে আর এক ঝকঝকে চাঁদের আলোতে আপনার সর্বাঙ্গ রাঙিয়ে যাচ্ছে তখন বুঝবেন তারা গভির প্রেমালাপে মত্ত।
আরিশ অবাক হওয়ার ভান করে বলল
— ওয়াও তুমি তো জিনিয়াস আরু পাখি। তুমি তো দেখছি মেঘেদের ও মন পড়তে পারো শুধু আমার মন ছাড়া।
আরু আরিশের পেটে একটা চিমটি দিয়ে বলল
— আঞ্জে না জানাব। এটা নানাভাই আমাকে শিখিয়েছে। আপনার সাথে তো নানা ভাইয়ের বনতি হয়নি তাই আপনাকে উনি শেখাননি।
আরিশ আর কিছু বললো না। নিরবে আরুর পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। আরিশের এই গুমসে থাকা নিস্তব্ধতা ভেঙে আরু বলল
— আপনি পরের কাহিনীটুকু আর শোনালেন না তো মি অভদ্র!
আরিশ আগের মতোই সামনের দিক তাকিয়ে বলল
— সেদিনের পর তুমি আর শুনতে চাওনি তাই বলা হয়ে ওঠেনি আর। এখন শুনবে?
আরু অরিশের কাধে মাথা রেখে বলল
— হমম বলুন।
আরিশ দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লো।
— তোমার তখন এক বছর বয়স হলো, আর আমি ছয় আর আদিবা চার। আদিবা তখন নতুন নতুন স্কুলে যাওয়া শিখেছে আর তুমি তখন সবে হাটতে শিখেছো অল্প অল্প। ততদিনেও আমি তোমাকে কখনো কোলে নিইনি আর।
আরু বিড়বিড়িয়ে বলল
— হাও খাড়ুস ইউ আর।
আরিশ হেসে উঠলো।
— আদিবার জেদ শুরু হলো সে আমার সাথে স্কুলে যাবে এবং আমার পাশেই তার বসা চায়। কিন্তু তাকে কে বোঝাবে যে সে আর আমি অসমবয়সী তাই আমাদের ক্লাস ও ছিলো ভিন্ন, চাইলেও একসাথে বসে থাকা সম্ভব ছিলো না, তাছাড়া আমি তো আদিবাকে আমার ধারে কাছেও ঘেষতে দিতাম না।
আরু চুপ করে শুনতে লাগলো।
— সেদিন তো আদিবা বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিল খুব। মাঝ ক্লাসে আমার ক্লাসে ঢুকে সে কি কান্না যে সে আমার পাশে ছাড়া অন্য কোথাও বসবে না। ক্লাস টার শেষ হওয়ার পরই মিসরা আদিবাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। সেদিন সারাটা দিন আমি রাগে মুঠিবদ্ধ করেছিলাম।
আরিশের কথার মাঝে আরূ প্রশ্ন করে উঠলো
— সেই রাগ কমলো কিভাবে?
আরিশ নির্বিকারে জবাব দিল
— তোমাকে মেরে।
আরু অরিশের থেকে ছিটকে সরে এলো। তারপর কপাল ভাজ করে বলল
— কেন মেরেছিলেন আমাকে হু?
— সেদিন বাসায় ফিরছি তোমার রুমে গিয়েছিলাম আমি। গিয়ে দেখি যে তুমি একটা গোলাপী রঙের ফ্রক পরে দেওয়াল ধরে হাটার চেষ্টা করছো। আমি তখন রাগটাকে সহ্য করতে না পেরে তোমার পায়ে গিয়ে আলতো করে মেরেছিলাম। আর চিৎকার দিয়ে বলেছিলাম
— এই মেয়ে তুই বড়ো হবি কবে? তাড়াতাড়ি হেটে তোর বোনকে নিয়ে খেলতে পারিস না? তাড়াতাড়ি কথা বলে ওর সাথে বকবক করতে পারিস না? ও আমাকে কেন এতো জালাই। তাহলে তুই হয়েছিল ই বা কেন?
কিন্তু সেদিন আমি যদি বুঝতাম সেই পিচ্চিটা শুধু আমার হওয়া জন্য পৃথিবীতে এসেছে তাহলে এবং কড়া কড়া কথা বলতাম না
এই কথাটা বলার পর তুমি সেদিন চিৎকার দিয়ে ভ্যা করে কাঁদার পরিবর্তে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদছিলে। তোমার গাল বেয়ে যখন নিরবে অশ্রুকনা ঝরে পড়ছিলো সেদিন সেই প্রথম তোমার জন বুকের মাঝে এক চিনচিনি ব্যাথা অনুভব করেছিলম। খারাপ লাগছিল এভাবে তোমার সাথে ব্যাবহার করে। তোমাকে সরি বলে যেই কলে নিতে যাবো অমনি দেখলাম তুমি দৌড়ে পালিয়ে গেলে। আমার চোখ যেন ভুল কিছু দেখ ছিলো মনে হতে লাগলো একটা সময়ের জন্য।
আরিশের কথা থামিয়ে আরু বলতে লাগলো
— হ্যাঁ! আমি অনেক আগেই হাটা শিখেছিলাম কিন্তু হাটতাম না কখনো কারন আমি ভাবতাম আমি হাটতে শুরু করলেই বুঝি কেও আর আমাকে কোলে নেবে না তাই আমি কখনো কারোর সামনে হাটিনি। আর সেদিন পায়ে মার খাওয়ার পর আর প্রকাশ্যে হাটলাম।
আরিশ আরুকে কাছে টেনে এনে বলল
— তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো আরুপাখি?
আরু আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল
— এমন বোকা বোকা প্রশ্নের যদি আমিও আপনাকে করি।
আরিশ হেসে উঠলো।
— তারপর বলুন।
— তারপর থেকেই শুরু হয় এক বিরাট অনুভুতির খেলা। যা সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে লাগলো অর অনুভুতি গুলো দৃঢ় হলো, আর জন্মালো অধিকারবোধ।
#চলবে,,,