#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
৩২.
পা টিপে টিপে কোনরকমে পিছনের দরজার দিকে এলো আরু। সবকটা কাঠগোলাপ নিয়ে আসতে পারেনি ও। ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে, একটা কাঠগোলাপ চুলে গুঁজে নিয়ে বাকিগুলোর মায়া ত্যাগ করেছে ও। সারা শরীর সহ পরনের সালোয়ার কামিজটাও ভেজা ভেজা লাগছে। সেই তো রুমে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যাবে গোসল করতে সেই কারণে জামায় কাঁদা লাগার বিষয়টা নিয়ে অতোটাও গুরুত্ব দিলো না ও। দরজার কাছে এসে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো
— রুমে গিয়েই গোসল করে নেবো উনি কিছু বুঝতে পারবেন না।
পায়ের জুতোটা এক হাতে নিয়ে আর এক হাতে দরজাটা খোলার জন্য ধাক্কা দিলো কিন্তু দরজা খুলছে না। আরু একবারের জায়গায় আরও কয়েকবার ধাক্কা মারলো কিন্তু দরজা খুলছে না। আরিশ ল্যাপটপটা সোফাতে রেখে দরজাটা আর এক হাত দিয়ে চেপে ধরলো।
আরু বিড়বিড় করে বলল
— এই দরজা আবার খুলছে না কেন? না জানি কোন আপদ দরজাটা এভাবে আটকেছে।
আরিশ চোয়াল শক্ত করলো। দরজাটা ছেড়ে দিয়ে বেশ কিছু দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ালো। আরু ভাবতে লাগলো যে সামনের দরজা দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কি। কথাটা বিড়বিড় করে বলল যা আরিশের কান অবধি গেল। আরু আলতো পায়ে সামনের দরজার কাছে গেল, কাঁচের ওপার থেকে উঁকি মারলো যে সেখানে আরিশ আছে কি। উঁকি দেওয়া মাত্রই আরিশকে দেখতে পেলো যে সে ল্যাপটপ নিয়ে কিছু করছে। আরু রেগে গিয়ে বলল
— উফফফ! যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই কেন সন্ধে হতে হয়। ভাল্লাগেনা।
কথাটা বলে আবার পিছনের গেটের দিকে যেতে লাগলো। আরিশ এবার ল্যাপটপ টেবিলে রেখে দৌড়ে ছুটলো পিছনের দরজার দিকে। আজ আরুকে ও হাতেনাতে ধরবে। আরুর আগে পিছনের দরজার কাছে ও পৌছে গেল। মাঝপথে গিয়ে হঠাৎ আরুর মনে হলো যে জুঁতোটা সেদিকে রেখে আসবে, এই কাঁদা জুতো নিয়ে ঘরে ঢোকা যাবে না। কথাটা ভেবে আরু সামনের দরজার কাছে জুঁতোটা যেই রাখতে গেল তখনই দেখলো আরিশ নেই সেখানে। আরু খুশি হয়ে গেল ভীষনরকম। এই দরজাটাও কি লক করা? কথাটা ভেবে দরজা ধরে টানলেই দেখল দরজা খুলে গেছে কারন আরিশ দরজা লক করেনি কারন সামনের গেট দিয়ে ওর বাবা মা বাসায় ঢুকবে। আরু একটা বিজয়ীর হাসি দিয়ে গুটিগুটি পায়ে ঢুকে এক দৌড়।
অপরদিকে আরিশ অপেক্ষায় রয়েছে পিছনের দরজায়।
দুই মিনিট হতে যায় আরু এখনো দরজা ধাক্কাও দিলো না আর না কোন কথা বলছে। আরিশ বিরক্ত হয়ে দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।
পাঁচ মিনিট হতে চলল তখনও দেখলো আরু আসছেনা, আরিশ বিরক্ত হয়ে বলল
— এই মেয়ে আসতে এতো লেট করছে কেন? আজ একবার হাতেনাতে ধরি তারপর কাদার মধ্যে ভিজে ভিজে কাঠগোলাপ কোঁড়ানো বার করবো।
সময় বাড়তে লাগলো আর আরিশের বিরক্তিভাব ও বেশি পরিমানে প্রকাশ পেতে লাগলো। না পেরে পাইচারি শুরু করে দিলো, এদিকে আরিশ ভাবছে যে সামনের দরজা সে বন্ধ করে রেখে এসেছে কিন্তু সে যে তা খোলা ছেড়ে এসেছে তা মনে নেই। প্রায় পনেরো মিনিট হতে যায় আরু আসছেনা দেখে আরিশ নিজেই দরজা খুলে বাইরে গেল, দেখল আরু কেন আরুর নাম ও নিশানা নেই। আরিশ ধাম করে দরজাটা বন্ধ করে ওর রুমে গেল। রুমে গিয়ে দেখলো আরু ওয়াশরুমে, শাওয়ারের জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আরিশ দাঁত কিড়কিড় করে বলল
— ফাজিল কোথাকার, ঠিক সামনের গেট দিয়ে পালিয়েছে।
বিছানায় ফোনটা রেখে শার্টের বোতামটা খুলে হাত থেকে ঘড়িটা খুলে বিছানার ওপর রাখতেই দেখল কাঠগোলাপ রাখা আছে। হয়তো আরু স্নান করে এসে পুনরায় সেটা মাথায় দেবে তাই।
আরিশ শার্টটা খুলে ওয়াশরুমের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। খট করে আরু বেরিয়ে আসলো। আরিশ নিরবে দৃষ্টি সরিয়ে নিতেই আরু বলে উঠলো
— আপনি কখন এলেন? ভিজে যাননি তো?
কথাটা বলে মাথা থেকে পেঁচিয়ে রাখা টাওয়ালটা খুলে সোফার ওপর রেখে আলমারী থেকে একটা শার্ট বার করে আরিশ এর দিকে এগিয়ে দিতেই আরিশ তা উপেক্ষা করে যেতে নিলেই আরু আরিশ এর হাত ধরে ফেলল। আরিশ এর সামনে গিয়ে বলল
— এতোটা অভদ্র তো আপনি ছিলেন না! এমন করছেন কেন? আচ্ছা রাগটা কমিয়ে একটা কথাও কি বলা যায়না বলুন তো?
আরিশ এবার আরুর চোখের দিকে তাকালো। আরুর প্রানচ্ছল চোখ বলে দিচ্ছে যে সে আরিশের আরু পাখি ডাকটা শোনার জন্য ঠিক কতোটা ব্যাকুল। চেয়েও আরিশ চোখ সরিয়ে নিতে পারলো না। আরু পুনরায় বললো
— আমার জন্য না হলেও নিজের বেবির জন্য আমাকে মাফ করে দিন। সত্যি বলছি আর কখনো আপনার কথার অবাধ্য হবো না।
আরু অরিশের দুই গালে হাত রেখে বলল
— কারণে অকারণে ভালোবাসি। এতোটা দূরে দূরে থাকবেন না, কষ্ট হয় তো।
আরিশের বুক জুড়ে একরাশ প্রশান্তি খেলে গেল। আরিশ আরুর হাতটা মুখ থেকে সরাতে গেলেই আরু মোহনীয় কন্ঠে বলল
— কিছু কিছু রাগকে ভালোবাসা দিয়েও কমানো সম্ভব কারন কেও কেও হয় তৃষ্ণার্থ প্রেমিক যারা কেবল ভালোবাসা পেতে চায়।
কথাটা বলে আরু চোখ বন্ধ করলো। আরিশের মুখটা তার মুখের খানিকটা কাছে এগিয়ে আনলো। পা দুটো উঁচু করে আরিশের মুখের সমানে পৌছানোর তুমুল চেষ্টা চালিয়ে সফল ও হলো আরু। আরিশের শরীরে যেন এক অদ্ভুত অনুভূতির বন্যা বয়তে লাগলো। আরু বেশ ঘনঘন শ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করে বলল
— আপনার জন্য এটুকু অভদ্র আমিও হতেই পারি।
কথাটা বলে আরিশের ওষ্ঠদ্বয়কে আঁকড়ে ধরলো আরু। আরিশ এক অদ্ভুত অনুভূতির সাগরে ভাসছে। আরিশের বুকের সাথে মিশে গেল আরু। আরিশ এবার আরুর কোমরে আলতো স্পর্শ করে ধরতেই আরু লজ্জা পেয়ে গেল। নিমেষে আরিশের থেকে সরে এলো। আরু সরে যেতেই আরিশ কঠিন দৃষ্টিতে আরুর দিকে তাকালো। আরু আরিশের চাহনি লক্ষ করে বলল
— আমার ভীষন লজ্জা লাগছিল তাই সরে এলাম। সরি।
আরিশ এবার আর চুপ করে থাকতে পারল না। দাঁত কিড়কিড় করে বলল
— পরেরবার আমার কাছে আসার সময় লাজ লজ্জার মোহমায়া ত্যাগ করে আসবে।
কথাটা বলে আরিশ ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আরু বেশ ল্জ্জা পেলো ওর ক্রিয়াকর্মে।
আরু মুচকি হেসে কাঠগোলাপটা নিয়ে ঘ্রান নিতে আরম্ভ করলো। বর্ষায় ঝরে যাওয়া কাঠগোলাপ যার অদ্ভুত এক মোহনীয় সুগন্ধ যা আরু কে আকর্ষণ করে ভীষনরকম। কাঠগোলাপটা রেখে চিরুনি টা হাতে নিতেই গাড়ির হর্নের আওয়াজ পেল আরু। তাড়াতাড়ি করে নিজের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ওড়নাটা নিয়ে নীচে নামলো তাড়াতাড়ি।
।।।।
— আচ্ছা আরিশ তো বোধহয় সিঙ্গাপুর যাচ্ছে না তাহলে আরুকে কদিনের জন্য মীরপুর নিয়ে যায়? অনেকদিন হলো মেয়েটা যায়নি। আরিশও যাবে আরুর সাথে, কদিন না হয় ওখান থেকেই হসপিটাল যাবে।
কয়েকদিন’ কথাটা শুনে আরু বিষম খেলো। অনিকা খান ধমক দিয়ে বললেন
— ধীরে ধীরে খা, এভাবে কেও খায়! গলায় আটকে যাবে খাবার নাহলে। এই সময় সবকিছু একটু খেয়াল করে চলবিনা?
আরু কোনরকমে ঢোক গিলে আফসানা বেগমের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বললেন
— কদিনের জন্য মানে কি? তুমি জানো না উনাকে!
–আরে কিছু হবে না আরিশ ও যাবে।
অনিকা খান আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
— আরিশ কিছু বলবে না। তোর এই সময়ে আরিশ আর তোকে বকাঝকা করবে না।
আরু কপাল ভাজ করে বলল
— কিছু বলবে না আবার! উনি চিরকাল ই আমার ওপর জুলুম করবেন হু।
অনিকা খান আর আফসানা বেগম হেসে ফেললেন। আরিশ আর আরুর মাঝে যে একটা ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে সেটা আরু কাওকে বুঝতে দেয়নি এখনো, সানাও চুপচাপ আছে এবিষয়ে।
আরু কোনরকমে খাবারটা খেয়ে উঠতে গেলেই আরমান সাহেব বললেন
— চলো সময় হয়ে গেছে, আমরা যাই। আরু তুমি আরিশের সাথে দেখা করে এসো।
আরু বেফাসে বলল
— এখনই যাবো নাকি? এখনো তো ওনার ওনার রাগ কমলো না।
অনিকা খান বললেন
— তোরা আবার ঝামেলা করেছিস?
আরু চোখ মুখ বন্ধু করে বলল
— না না ফুপি তেমনটা না। আমি আসছি।
কথাটা বলে আরু রুমে গেল। রুমে গিয়ে দেখলো আরিশ ফোন ঘাটছে গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে। আরু ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে গলা পরিষ্কার করে বলল
— এহেম এহেম। শুনছেন?
আরিশ আরুর দিকে তাকালো না। সে ফোনে আরু সব ছবিগুলোই উল্টেপাল্টে দেখছে তা আরু জানে না। আরিশের উত্তর না পেয়ে আরু বলল
— আমি ওই বাসায় যাচ্ছি। আপনি যাবেন? যেতে চাইলে চলুন, আমি গাড়িতে ওয়েট করছি।
আরিশ ভাবলেশহীন। আরু একটু রেগে গেল। সে ভেবেছিল আরিশ তাকে আটবাকে একথা শুনে, যেতে দেবে না কিন্তু তেমনটার কিছুই হলো না।
আরু আবার বললো
— আমি একা যাচ্ছি না আপনার বেবিকেও নিয়ে যাচ্ছি আমার সাথে করে, আপনি তো জানেন আমি কেমন কেয়ারলেস।
আরিশ কিছু বলছে না সে ফোনে ব্যাস্ত।
আরু আরও রেগে গেল।
— এক মাস বাসায় ফিরবো না।
আরিশ আগের মতোই নির্বিকার। আরুর রাগটা বাড়লো। বেশ জোরে চেঁচিয়ে বলল
— যদি মন টিকে যায় তো ডেলিভারি অবধি ওখানেই থাকবো।
আরিশ একটা হাই তুললো। তার ক্লান্ত দৃষ্টি নিয়ে ফোন দেখছে।
আরু দাঁতে দাঁত চেপে বলল
— আপনি কি আমাকে আটকাবেন না? আমি চলে যাচ্ছি শুনেও এমন উদাসিন ভাব নিচ্ছেন কেন যে চেনেন না আমাকে? একটা ভুল ই তো করেছি।আপনাকে যতোবার সরি বলেছি ততোবার আমি সারা জীবনেও বলিনি। আর আপনি রেগে কথায় বলছেন না। বুঝেছি এখন আর আপনার তো আমাকে আর ভালো লাগে না। আমি আর এই বাসায় ফিরবো না।
আরুর চোখে জল চলে এলো। ফুঁপিয়ে কথাগুলো বলে উঠলো।
— আমার বেবি হলে আপনি একদম দেখতে আসবেন না বলে দিলাম। আপনি খুব পচা হয়ে গেছেন। আমার আগের মি অভদ্র এতোটাও কঠিন না।
কথাটা বলে আরু চোখের জলটা মুছে নিয়ে বললো
— যদি দেখেছি না রাতের বেলা আমার বাসার গেট টপকে চোরের মতো বাসায় ঢুকে তারপর আমার রুমে এসে আমার পাশে শুয়ে আছেন তো আপনার খবর আছে।
আরিশ একটা লম্বা হাই তুলে বলল
— গুড নাইট।
আরু রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে ধাম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো এটা বোঝানোর জন্য যে এ রেগে আছে।
#চলবে,,
#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
৩৩.
— কি রে আরিশ এল না যে। ও কি যাবে না?
অনিকা খান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন। আরুর মুখটা খানিকটা গম্ভীর আর চোখের নীচের অংশ বেশ ভিজে ভিজে। অনিকা খানের প্রশ্নর বেশ স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলো
— উনি ক্লান্ত তাই ঘুমাচ্ছেন। উনি যাবেন না।
অনিকা খান অবাক হয়ে বললেন
— যাবে না বলে না করে দিলো?
আরু ওনার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। বেশ থমথমে আরুর মুখ। একটা সত্য কে চাঁপা দিতে গেলে বেশ কাঠ খড় পোড়াতে হয় আর এই মুহূর্তে আরু সেই মন মানসিকতায় নেই বিধায় চুপ করে রইলো আরু। অনিকা খানের কপালের চামড়ায় ভাঁজ দেখা গেল। আরুর নিরবতাতে উনি আর কিছু বললেন না। সানা ও বেশ চুপচাপ, সানাও হয়তো ভেবে অবাক হচ্ছে যে ওদের মাঝের ঝগড়াটা এতখন চিরস্থায়ী হলো কীভাবে?
আফসানা বেগম সবার মুখের দিকে একটাবার করে চেয়ে দেখলেন, কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না উনি, বিধায় প্রশ্ন করে উঠলেন
— কোন সমস্যা হয়েছে নাকি? আরিশ কি রাগ করেছে কোনভাবে যে তাকে না জানিয়েই।
ওনার কথাটা আরু শেষ করতে দিলো না। ওনার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল
— আম্মু উনি কিছু মনে করেননি। আর বলবেই বা কেন? একটা মানুষের কি এক জিনিস সবসময় ভালো লাগে নাকি? মানুষের জীবনেও কিছু নতুনত্বের দরকার। উনি যেতে মানা করেননি একবার ও।
আরুর কথাতে অভিমান আর বিদ্রুপের লক্ষন স্পষ্ট। একটা ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে দুজনের মাঝে আর তা বেশ গুরুতর ভাবে তা অনিকা খান সহ সানার ও বুঝতে বাকি নেই।
অনিকা খান আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
— তুই সাবধানে যা, কোন চিন্তা করবি না কিছুতেই। কেও তোর সাথে না থাকুক আমি আছি।
আরু অনিকা খানকে জড়িয়ে ধরলেন যেমনটা করে সে যেন তার চাপা কষ্টটা অনিকা খানের সাথে ভাগ করে নিচ্ছেন আর উনিও তা সাদরে গ্ৰহন করে নিচ্ছেন। উনি আরুর কপালে আলতো ঠোঁটের স্পর্শে ভরসা জোগালেন। আরু নরম সুরে বলল
— আই উইল মিস ইউ শাশুড়ি আম্মু। লাভ ইউ!
অনিকা খান মৃদু হাসলেন আরুর কথাতে। উত্তর বললেন
— আমিও ভালোবাসি আমার বাচ্চা মেয়েটাকে।
।।।।
আরু আর ওর বাবা মা বেরিয়ে গেছেন বেশ অনেকটা আগেই। নীচে অনিকা খান পায়চারি করছেন এদিক থেকে ওদিক। সানা বসে বসে ফোন চালাচ্ছে, তাকে দেখলেই বোঝা যাবে সে অন্যমনস্ক। আফজাল খান পেপার থেকে চোখ সরিয়ে আড়চোখে একবার অনিকা খানের দিকে তাকিয়ে পেপারের আড়ালে সানাকে ফিসফিস করে বলল
— তোর আম্মু এমন পায়চারি করছে কেন? জ্বীন ভূতে ধরেছে নাকি রে?
সানা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো। সেও ফিসফিসিয়ে বলল
— তাকেই জিঞ্জাসা করো।
আফজাল খান বিড়বিড়িয়ে বললেন
— নাহ থাক। সুখে থাকতে ভূতের কিলাই খেতে চাই না। ও বরং যা করছে করুক।
অনিকা খান পায়চারি থামিয়ে সানকে বেশ রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করলো
— আচ্ছা সানা আরিশ আর আরুর মাঝে কি কোন ঝামেলা হয়েছে?
সানাকে হঠাৎ ডাকতে সানা চমকে গেল। খানিকটা তুতলিয়ে বলল
— কইই না তো?
সানার কথা শুনে অনিকা খান বিরক্ত হয়ে বললেন
— তোতলাচ্ছিস কেন?
সানা এবার সোজা হয়ে বসে বলল
— না মানে এমনি। হঠাৎ এমন প্রশ্ন করলে তো তাই।
উনি বেশ অন্যমনস্ক হয়ে বললেন
— সত্যি বলছিস তো?
সানা ঘাবড়ে গিয়ে বলল
— হ্যাঁ সত্যি না বলার কি আছে। তবে,,,
সানা থেমে গেল। উনি জহুরির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন
— তবে কি?
— তেমন কিছুই না আসলে কালকে রাতে আরু সিঁড়ি থেকে পা পিছলে একটু পড়ে গেছিল ততই ভাইয়া একটু বকা দিয়েছিল। এর থেকে আর বেশি কিছুই না।
উনি রেগে গিয়ে বললেন
— বেশি কিছু না মানে কি? মেয়েটা সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে আর এটা বেশি কিছু না বলছিস? এটা তোরা কেও আমাকে ফোন করে বলার প্রায়োজন বোধ করিস নি?
আফজাল খান ওনাকে শান্ত করতে বললেন
— আরু এখন তো ঠিকই আছে, দেখলে তো। আর সানকে আগে পুরোটা বলতে দাও।
— আসলে ভাইয়া রাগ করেছিল আরুর ওপর একটু, এখনো রাগ কমেছে কি আমি জানি না।
— রাগ করে আছে মানে টা কি? ছেলেটা মেয়েটার এমন একটা সময়েও বকবে? বোঝে না এখন মেয়েটার মনের অবস্থা কি।
কথাটা বলে উনি এক মুহূর্ত আর সেখানে দাঁড়ালেন না। আরিশের রুমের দিকে এগোলেন। আরিশের রুমের দরজা বন্ধ। আরু দরজাটা জোরে টান দেওয়ায় লক হয়ে গেছিল ওটা। উনি লক খুলে রুমে ঢুকে গেলেন। গিয়ে দেখলেন আরিশ ঘুমাচ্ছে।
উনি রাগের চোটে বেশ জোরে চিৎকার দিয়ে বললেন
— তুই মেয়েটার সাথে ঝামেলা করেছিস? মেয়েটা মন খারাপ করে ওই বাড়িতে গেল।
হঠাৎ আরিশ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল
— ও কি চলে গেছে?
— তা তোর জন্য অপেক্ষা করবে? মেয়েটার এই সময়েও কি বকাঝকা না করলেই না! এই সময় একটা মেয়ের কতোটা মানসিক শান্তির প্রায়োজন হয় জানিস কিছু?
আরিশ এবার আধশোয়া হয়ে উঠে বসে বলল
— অভিমানটা যখন আমার থেকেই শুরু হয়েছে, শেষ টা না হয় আমিই করবো।
কথাটা বলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। অনিকা খান বেশ অনেকখন সেখানে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আরিশের মতিগতি বোঝা দুষ্কর। সে সবসময় তার নিজের মতোই চলে। তাকে নিয়ে কে কি ভাবলো না ভাবলো তা নিয়ে সে বিষয়ে মাথা ঘামায় না, তাই বলে তার ছেলেটা যে এতোটা কঠিন সেটা তিনি বুঝতে পারেননি।
উনি রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আরিশের ওপর ওনারও একটা ছোট্ট অভিমানের পাহাড় তৈরি হয়েছে যা উনি বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন।
।।।।
— হ্যাঁ রে আরিশ তোদের বাসায় কি গেছে? অনেক রাত হলো ছেলেটা এখনো ফিরলো না। কতো রাত হয়ে গেল।
অনিকা খানের এমন কথাতে আরু অবাক হলো। ভ্রু কু্চকে বলল
— উনি কোথায় গেছেন তোমাকে বলে যাননি?
— নাহ। কখন বেরিয়েছে আমি তাও তো কিছু জানি না। সানা বলল যে আরিশ নাকি সেই দুপুর দুটো নাগাদ বেরিয়েছে। এখন তো রাত এগারোটা বাজে প্রায়। ফোনটাও সুইচ অফ।
আরু বেশ চিন্তিত হয়ে বলল
— আচ্ছা ফুপি আমি দেখছি উনি কোথায়। ফোন করে দেখি।
আরু ফোনটা কানে ধরে আছে তখনই পিছনে একটা কিছু ধপ করে পড়ার আওয়াজ হলো সাথে গাছের পাতার নড়ার সাঁইসাঁই আওয়াজ। আরু খানিকটা চমকে উঠলো। তখনই পিছন থেকে আরিশ বলে উঠল
— এই ব্যালকনির সাথে গাছটা না থাকলে দেখি আজকে পাইপ বেয়ে উঠতে হতো। বউকে দেখার জন্য এতো স্ট্রাগেল উফফ।
আরু রাগী চোখে আরিশের দিকে তাকাল। তাকিয়ে ফোনের ওপাশে অনিকা খানকে উদ্দেশ্যে করে বলল
— মাঝে মাঝে কিছু কিছু মানুষের জন্য চিন্তা করা বেকার। ঘুমিয়ে পড়ো তুমি চিন্তা না করে।
অনিকা খান আরিশের গলা শুনে চিন্তামুক্ত হলেন আর আরুর কথাতে খানিকটা হেসে বললেন
— গুড নাইট আর সুইট ড্রিমস।
আরিশ এই মুহূর্তে আরুর ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় আরুর মুড চেন্জ হলো। গলায় তীব্র কঠোরতা নিয়ে বলল
— হমম।
আরুর কানে ফোন দেখে আরিশ বলে উঠলো
— পরকীয়া নাকি? এক রাত একা আছো কি ওমনিই!
আনিকা খান আগেই ফোন কেটেছেন।
আরুর সারা শরীর রাগে রি রি করতে লাগলো আরিশের এমন কথাতে। না জানি একটা ভুলের দরুন আর কতো কথা শুনতে হবে ওকে। আরু ভীষনরকম রেগে বলল
— হ্যাঁ পরকীয়া। আর কিছু?
কথাটা বলে আরু দরজার দিকে যেতে নিলেই আরিশ হাত ধরে থমকে নিল। আরুকে কাছে টেনে বলল
— কিছু কিছু রাগকে ভালোবাসা দিয়েও কমানো সম্ভব কারন কেও কেও হয় তৃষ্ণার্থ প্রেমিকা যারা কেবল ভালোবাসা পেতে চায়।
কথাটা শুনতেই আরু আরিশের দিকে ঘুরে তাকলো। রাগী ভাব নিয়ে বলল
— আমার কথা আমাকেই ফেরত দিচ্ছেন?
আরিশ আরুর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল
— কে কার ডায়ালগ বলে সেটা ইম্পরট্যান্ট নয়। কে বেশি ভালোবাসা দিয়ে রাগ আর আভিমানকে দূর করতে পারে সেটাই ইম্পরট্যান্ট। নাও লেট মি ডু দিস ইম্পরট্যান্ট থিং।
আরু আরিশ কে ধাক্কা মেরে সরিয়ে বলল
— একদম না। কাছে আসবেন না একদম।
আরিশ আরুর দিকে এগোতে এগোতে বলল
— অভদ্ররা কখনোই ভদ্রতা দেখানোর জন্য অভদ্র হয় না। এন্ড ইউ নো হোয়াট আমি হলাম সেই জন্মগত অভদ্র যে কখনোই ভালো হবে না।
আরু কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরিশ,,,,
#চলবে,,,,,,