#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
৩৪.
আরু কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরিশ আরুর মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরলো যাতে সে কথা বলতে না পারে। আরু রাগী চোখে আরিশের দিকে তাকাতেই আরিশ বলল
— সবসময় টেপরেকর্ডারের মতো ফটর ফটর করা। আমি কি বলছি সেটা তোমার কাছে বেশি ইম্পরট্যান্ট হওয়া উচিত।
আরু মুখ থেকে আরিশের হাত নামিয়ে ফোঁস ফোঁস করে উঠলো যেন, বেশ রেগে গিয়েই বলল
— আপনার কথা শুনতে আমার আর ভালো লাগছে না, আপনি যান। যখন শুনতে চেয়েছিলাম তখন ঘুমের ভান করে বেশ ঘুমিয়ে পড়িছিলেন। আমি কতো অপেক্ষা করেছিলাম আপনি জানেন?
আরিশ আরু কে ঘুরিয়ে আরুর কাধে মুখ দিয়ে ভর রেখে বলল
— বললেই বুঝি তুমি আমার কথা শুনতে!
আরু আরিশের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো, আরুর চোখ ছলছল করছে। আরিশ আরুর গালে হাত রাখতেই আরু ধীর কন্ঠে বলল
— একবার না হয় বলেই দেখতেন, শুনতাম নাকি শুনতাম না।
কথাটা বলে আরু আরিশের থেকে সরে গিয়ে বলল
— আপনাকে এসব বলে কি লাভ, আপনার মতো নির্দয় মানুষ আমি আর দুটো দেখিনি। আপনি যেখান থেকে এসেছেন সেখান থেকেই ফিরে যান। আই এম টায়ার্ড এনাফ।
আরিশ আরুর বিগড়ে যাওয়া মুডকে ভালো করার জন্য বলল
— বাই দা ওয়ে আমি কিন্তু এই এতো রাতে গাছের ডাল বেয়ে বেয়ে এসেছি। ওঠাটা যতোটাও সহজ নামাটা কিন্তু ততোটাও কঠিন। এই লাফ দিলে হাত পায়ের হাড় গুলো যে কতো গুলো টুকরো হবে বোঝা মুশকিল।
কথাটা বলে আরুর দিকে আড়চোখে তাকালো আরিশ, আরু কি বলে তার অপেক্ষা। কিন্তু আরিশকে অবাক করে আরু বলল
— আপনি গাছ থেকে ঝাপ মারবেন নাকি আমি ধাক্কা মেরে ফেলে দিবো কোনটা।
আরিশ আরুর দিকে ঝুকে বলল
— এই কাজটা তুমি পারবে মিস আরুশিইইই!
আরু আমতা আমতা করে বলল
— আআআআমি সব পারি। আপনাকে ধাক্কা মারা আমার কয়েক সেকেন্ড এর কাজ। আর আপনি আমাকে দূর্বল ভেবেছেন? এখন আর আমি একা নেই, আমার বেবিও আছে সাথে তাই আমাকে কমজোর ভাববেন না।
আরিশ হাত গুটিয়ে বেশ রিলেক্স ভাবে বলল
— ফাইন। লেটস সি।
কথাটা বলতেই আরু বলল
— আপনি এক্ষুনি যান। এক মিনিটও যেন দেরি না হয়।
আরুর কথাটা শোনার পর আরিশ এক পলক আরুর দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলো। আরিশকে যেতে দেখে আরুর ভ্রু কুঁচকে এলো। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল
— আজব তো, যেতে বলেছি বলে কি সত্যিই যেতে হবে নাকি! অভিমান বোঝেননা নাকি!
আরিশ ব্যালকনির কাছে গিয়ে থেমে গেল আর বলল
— আমি কোথাও যাব না বুঝেছো। ডু হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট।
আরু নিজের রাগ বজায় রাখতে বলল
— আপনি না গেলে আমি ধাক্কা মেরে আপনাকে নীচে নামিয়ে দেবো।
আরিশ রিল্যাক্স একটা ভাব নিয়ে বলল
— অবশ্যই!
আরু দ্রুত পায়ে আরিশের কাছে গিয়ে বেশ গলা ছেড়ে চিৎকার করে বলল
— আপনাকে তো আমি বলেছিলাম যে আপনি আসবেন না এই বাসায় তবুও আপনি কেন এসেছেন বলুন!
— বাবাহ, দস্যি বউকে চোখে চোখে রাখতে হবে না। যদি মাঝ রাতে বাইরে গিয়ে ভূতের নেত্য করে তখন কে থামাবে?
আরু রেগে গেল শুনে ভীষনরকম। আরিশের পিঠে জোরে একটা কিল বসিয়ে বলল
— আমি দস্যি হলে আপনি কি! আপনি তো অভদ্র একজন মানুষ।
আরিশ আরুর নাকটা ধরে টেনে বলল
— আমি তো জানি আমি কি!
— আমিও জানি আমি কি। বুঝেছেন!
কথাটা বলে আরু আর কোন কথা বাড়ালো না, বিছানার কাছে গিয়ে গটগট করে শুয়ে পড়লো। আরিশকে ও আর বেশি ঘাটালো না কারন ও জানে যে সে কখনোই আরিশের সাথে পেরে উঠবে না তাই বৃথা এনার্জি নষ্ট করে লাভ নেই।
আরু শুয়ে পড়তেই আরিশ একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আরুর পাশে শুয়ে পড়লো। আরুর গায়ে হাত রাখতেই আরু হাত সরিয়ে দিলো। তখন আরিশ গুনগুন করে গেয়ে উঠলো
— ও বউ তুমি আমায় কি ভালোবাসো না? ও বউ কেন আমার কাছে আসো না।
গানটা শুনতেই আরু আরিশের দিকে ঘুরে বলল
— সমস্যা কি! একেই তো উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন তারপর আমাকে এভাবে বিরক্ত করছেন সেই থেকে। কি চান আপনি।
আরিশ মুচকি হেসে আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
— তুমি যাতে আমার দিকে ফিরে ঘুমাও আপাতত সেটাই চাই, বাকি চাওয়া গুলো ধীরে সুস্থে পূরন করবে না হলে একবারে সবটা সামলাতে পারবে না। গুড মর্নিং।
আরু অবাক হয়ে গেল। মানুষটা কতো সহজে ওর রাগ গুলো ভাঙিয়ে ওকে মানিয়ে নেই কিন্তু আরু পারেনি আরিশের রাগ ভাঙাতে, আরিশ নিজেই রাগটা হজম করে ফিরে এসেছে। সে এমন কেন?
।।।।
— কি রে কখন থেকে ডাকছি কিছু শুনছিস না যে। আমি তো ভাবলাম কি বিপদ হলো না কি।
হঠাৎ হাঁপাতে হাঁপাতে আরুর বাবা আরমান সাহেব বলে উঠলেন। আরু সদ্য ঘুম থেকে উঠে এমন পরিবেশ দেখে অবাক, ঘুম থেকে উঠেই চোখের সামনে দৃশ্যমান ওর ব্যাতিব্যাস্ত বাবা মা। আরু বেশ হকচকিয়ে উঠে বলল
— কি হয়েছে এমন করছো কেন! আমি তো ঠিকই আছি।
আরুর মা ধমকের সুরে বললেন
— হ্যাঁ ঠিক আছো তা তো দেখছি তাই বলে এভাবে বেমালুম ভাবে ঘুমাবে আর সারা দিন দুনিয়ার হুস থাকবে না তোমার?
আরু বেশ জোরেই বলল
— তো কি হয়েছে? তুমি তো জানো আমি কতো ঘুমায়, আরিশের পাল্লায় পড়ে এখন আর অতো ঘুমানো হয়না। আর ঘুম আসছিলো না বলে দুটো ঘুমের ঔষধ না হয় খেয়েই ফেলেছিলাম তাই বলে এমন চেঁচাবে!
আরমান সাহেব আরুর মাথায় তিনবার ফু দিয়ে বললেন
— আমার মেয়েটার এতো রাগ কেন! এত কথায় কথায় রেগে গেলে হয়? আসলে তুই জানিস না কি হয়েছে।
আরু নরম দৃষ্টিতে তাকাল ওর বাবার দিকে, উনি আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আরু বেশ নম্র কন্ঠে বলল
— আচ্ছা বাবা আমি কি সত্যিই অনেক ঘুমিয়ে পড়িছিলাম।
উনি আরূর দিকে তাকিয়ে বেশ জোরেই হেসে উঠলেন।
— কটা বাজে খেয়াল আছে? সাড়ে এগারোটা। আরিশ এর মধ্যে চারবার খোঁজ নিয়েছে তুই উঠেছিস কি, কারন তুই তো ফোন ধরছিস না। তাড়াতাড়ি করে এলাম। প্রায় এক ঘন্টা ধরে ডাকছি তোর কোন সাড়াশব্দ নেই। প্রথমে তোর মা বলল দরজা ভাঙার কথা, আমিও ভাবলাম দরজা ভেঙে ফেলি। তখনই দারোয়ান চাচা চিৎকার দিয়ে ডাকলেন আমাকে।
আরু ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো– কেন?
আরমান সাহেব বলতে যাবেন তার আগেই আফসানা বেগম বলতে শুরু করলো
— কেন আবার! তোর ঘরের পিছনে কার জুতোর ছাপ পেয়েছে বেশ কয়েকটা। গাছের গায়েও কাঁদার ছাপ রয়েছে, কেও বোধহয় গাছ বেয়ে তোর ঘরে উঠার চেষ্টা করেছে আর কাঁদার মধ্যে পড়েও গেছে।
কথাটা শুনে আরু হেসে ফেলল ফিক করে। আরুর হাসির আওয়াজ শুনে আরমান সাহেব অবাক হয়ে বললেন
— কি রে হাসছিস যে!
আরু হাসতে হাসতে বলল
— চোর বোধহয় সব ট্রেনিং নিলেও গাছে ওঠার ট্রেনিং টা নেইনি তাই হয়তো উঠতে গিয়ে পিছলে বারবার পড়ে গেছে। তারপর বাবা সেই চোর কি আদতেও গাছে উঠতে পেরেছে?
আরমান সাহেব আরুর ব্যাবহারে অবাক হলেও বললেন
— না না উঠবে কি করে, সে তো উঠতে পারেনি তাই চলে গেছে, পায়ের ছাপ ও আছে যাওয়ার, তবে ছাপ দেখে মনে হলো মাঝ রাতের বা ভোরের দিক এর পায়ের ছাপ।
আরু চোখ সরু করে বলল
— চোর বোধহয় সারারাত ওঠার চেষ্টা করেছে পারেনি তাই ফিরে গেছে। বেচারা চোর।
আরুর কথা শুনে আফসানা বেগম ধমক দিয়ে বলল
— তোমার মেয়ের কথা শোন। চোর এসেছে আর তার চিন্তায় নেই কোন।
আরু আর বেশি কিছু বললো না না হলে হয়তো কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বার হয়ে আসবে।
— তারপর কি হলো?
— তারপর তুই ঠিক আছিস কি সেই চিন্তা হলো। আরিশকে এসব চোরের কথা কিছুই বলিনি নাহলে হসপিটাল থেকে তড়িঘড়ি ফিরবে। আমি তারপর গাছে উঠে তোর ঘরে ব্যালকনি দিয়ে এলাম। এসে দেখলাম তুই ঘুমাচ্ছিস বেঘোরে।
আরু ভ্রু কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে বলল
— তা ব্যালকনিতে চোরের পায়ের ছাপ পাওনি?
— আরে ব্যালকনিতে পাবো কি করে! সে তো গাছেই উঠতে পারেনি।
আরু বেকুব সাজার ভান করে বলল
— ওহ তাই তো।
আরমান সাহেব বলে উঠলেন
— আরিশকে একটা কল করে দিস আর আজকে দারোয়ান চাচা সারা রাত পাহারা দেবে বলেছে। আজকে চোর আসুক একবার।
আরু তখন ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে বলল
— না না পাহারা দেওয়ার দরকার নেই। চোর আসুক।
আফসানা বেগম বললেন
— তোমার মেয়ের মাথা খারাপ হয়েছে। তাকে তুমি সামলাও আমি চললাম।
কথাটা বলে উনি বেরিয়ে গেলেন। আরমান সাহেব বললেন
— এই গাছটা কেটে দেবো ভাবছি। কাঠমিস্ত্রিকে কল করেছি। সে কালকেই গাছটা কাটতে আসবে।
— গাছ কাটবে কেন তুমি? তাছাড়া ওই কৃষ্ণচুড়া গাছটার কতো বয়স বলো তো। আমার বয়সের ও বেশি। এটা তো দাদভাই লাগিয়েছিলেন। গাছটা কেটো না।
— সে পরে ভেবে দেখা যাবে। এখন ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করতে আয়। আমরাও কিছু খায়নি সকাল থেকে।
— হমম যাচ্ছি। বাট তুমি বলো গাছটা তুমি কাটবেনা। চোরকে বারন করে দেবো গাছে চড়ে না আসতে তাও তুমি গাছটা কেটো না।
আরমান সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন
— সকাল সকাল ঘুমের ঘোরে কি বলছিস ঠিক পাচ্ছিস না। ফ্রেশ হয়ে নে।
আরু বিছানা থেকে নামলো। আরমান সাহেব রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন আবার কি ভেবে এসে জিজ্ঞাসা করলেন
— হ্যাঁ রে কালকে রাতে আরিশ এসেছিলো?
আরু কপাল কুঁচকে ওনার দিকে তাকাতেই উনি আমতা আমতা করে বললেন
— না না, আমি এসব কি বলছি। আরিশ কি করে আসবে। সে নিজেই তো সকালে কতোবার ফোন করে খোঁজ নিলো।
আরুর দৃষ্টির গভীর হতে হতেই আরমান সাহেব সেখান থেকে চলে গেলেন।
আরু হাসতে লাগলো উনি বেরিয়ে যেতেই। ওয়াশরুমে না গিয়ে বাছানায় গেল, তারপর ব্যাঙ্কেটটা সরিয়ে দেখলো বিছানায় অল্প কাঁদা লেগে আছে।
আরু ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো আরিশের ম্যাসেজ আর ফোন।
আরু ম্যাসেজ করলো।
— কালকে রাতে গাছ বেয়ে বাসায় চোর ঢুকেছিল। আজকে চোর পাহারা কড়াকড় হবে তাই চোর যেন আজকে বাসায় না আসে।
এস এম এস টা লিখে আরিশকে পাঠিয়ে দিল আরু। কয়েক সেকেন্ড পরই আরিশ উত্তর দিলো।
— চোর তো চোর ই। জাতীয় অভদ্র। সে তো আসবেই সে যে করেই হোক।
আরু তা দেখে হাসলো আর কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেল। ওয়াশরুমে ঢুকতেই ফোনটা বেজে উঠলো। নিঃসন্দেহে আরিশ ফোন করেছে কিন্তু ও তো ফোন তুলবে না।
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল
— এটা চুরি করার পানিশমেন্ট।
আরু ওয়াশরুমে ঢুকে দেখলো সেখানে আরিশের কালকে রাতের সব পোশাক ধুঁয়ে রাখা আছে। আরু মুচকি হাসলো। আরিশের বেশ কয়েক সেট জামা প্যান্ট আরুর মা কিনে এই বাসায় রেখে দিয়েছেন যাতে আরিশ আসলে তা পরতে পারে। আরিশ সেগুলো পরেই বেরিয়েছে। আরু ওয়াশরুম থাকে বেরিয়ে তা ছাদে গিয়ে মেলে দিল কারন তার মা ছাদে যায় না ভ্রুনাক্ষরেও তাই অসুবিধা নেই কোন।
#চলবে,,,,
#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
35.
— ফুপি উনি বাসায় ফিরেছেন? ওনি বাসায় ফিরলে তুমি আজকে রাতে ওনাকে বাসা থেকে বার হতে দিবা না সে যে করেই হোক।
আরুর এমন অস্থি্রতাপূর্ণ কথা শুনে অনিকা খান চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন
— কেন রে কি হয়েছে? আরিশ তো একটু আগেই বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।
আরু মাথায় হাত দিয়ে বসলো। নির্বিকারের সুরে বলল
— উনি কি অলরেডি বেরিয়ে গেছেন নাকি এখনো বার হননি তুমি সত্যি করে বলো ফুপি।
অনিকা খান কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন
— আমি কেন তোকে মিথ্যা কথা বলতে যাব? এই তো কিছুক্ষণ আগে আরিশ বাসা থেকে বেরিয়ে গেল আর বলল যে তোদের বাসায় যাচ্ছে। কেন কোন সমস্যা হয়েছে?
আরু বেশ আমতা আমতা সুরে বলে উঠলো
— নাহ না ফুপি তেমন কিছুই না।
অনিকা খান তো নাছোড়বান্দা তিনি সবটা না জেনে মানবেন না কোনপ্রকার তাই তিনি আরু কে আগের তুলনায় বেশি জোর দিয়ে বললেন
— কি হয়েছে বল আরু মা। কোন সমস্যা হয়েছে নাকি?
আরু তবুও অনর্গল মিথ্যা বলার তুলনামূলক চেষ্টা করে বলল
— আসলে ফুপি সন্ধ্যায় আমি উনাকে নিয়ে একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম সেই জন্যই আমি চাইছি না আজকে উনি বাসা থেকে বার হোক, কোন ভাবে বিপদ হয় বলা যায়না ।
অনিকা খানের আরুর বলার ভঙ্গি শুনে যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না। উনি জানেন আরু আরিশকে নিয়ে এমন বাজে স্বপ্ন দেখলে তৎক্ষণাৎ আরিশকে নিজের চোখের সামনে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় দেখতে চাই আর আরু যেখানে সন্ধ্যেবেলা স্বপ্ন দেখেছে আর এতক্ষণ পরে তাকে আলোচ্য বিষয় করে আরিস কে বাসায় আটকে রাখার আলাদা একটা বাহানা খুঁজছে তখন তার পিছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে সেই বুঝে উনি বললেন
— চিন্তা করিস না সন্ধ্যার স্বপ্ন সত্যি হয় না। কি হয়েছে বল। তবে এভাবে আমার থেকে সত্যিটা লুকিয়ে রাখলে আমি কিন্তু খুব কষ্ট পাব।
অনিকা খানের কথায় আরু স্পষ্ট বুঝতে পারলো যে আজকে যতক্ষণ না সে অনিকা খানকে সব সত্যিটা বলবে ততক্ষণ তার নিস্তার নেই তাই বাধ্য হয়ে ্ আরু বেশ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে উঠল
— তার ছেলেকে নিয়ে একটা ব্যাপার ঘটেছে। সাধে আর তোমার ছেলেকে মি অভদ্র বলি।
অনিকা খান বেশ আগ্ৰহ দেখিয়ে বললেন
— কি হয়েছে রে? মনে হচ্ছে বিষয়টা বেশ সিরিয়াস।
— সিরিয়াস বলতে সিরিয়াস! সে কালকে রাত্রে আমার ঘরের ব্যালকনির সাথে থাকা কৃষ্নচুড়া গাছে উঠে আমার ঘরে ঢুকেছে। মেইনগেট দিয়ে আসলে একটা কথা, কিন্তু না, উনি তো জন্মগত ঘাড় ত্যাড়া, ওনাকে তো কিছু একটা ত্যাড়ামি করতেই হবে। এখন বাবা ওনাকে চোর ভেবে আজকে সিকিউরিটির ব্যাবস্থা করেছে। আজ হাতে নাতে ধরা পড়লে মান ইজ্জত এর ফেলুদা হবে ওনার সেটা ওনাকে কে বোঝায়।
কথাটা শোনামাত্র হাসা শুরু করলেন তিনি।
— তুই বোঝাবি।
কথাটা বলে উনি অনর্গল হেসেই চলেছেন। আরু ওনার হাসি শুনে বুঝতে পারলো যে ওনার এই হাসি আজকে এত সহজে থামার নয়। উপরন্ত সময় নষ্ট হবে আর আরিশ হাতে নাতে ধরাও খাবে হয়তো, কিন্তু তার আগে যদি আরিশ আবার ধরা খেয়ে যায় তখন সকলের সামনে মান ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে তাই আর দেরি না। আরু ঝটপট বলে উঠলো
— ফুপি তুমি হাসতে থাকো আমি চললাম।
— আচ্ছা আবার পরে কথা হবে তার আগে আমি একটু হেসে নিই। অনিকা খান হাসতে হাসতে ফোনটা কাটলেন,উনি ওনার ছেলের কর্মকাণ্ডে সত্যিই অবাক হয়েছেন আজ।
হাসতে হাসতে বলতে লাগলো
— সানা শুনে যা তোর ভাইয়া শ্বশুর বাড়িতে চোর বদনাম পেয়েছে।
।।।
বেশ অনেকখন হলো আরু রুমের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে। আরিশ আজকে আর গাছ বেয়ে আসবে না কারন সে এতোটাই কাচা কাজ করার মানুষ না। কিন্তু কোথা দিয়ে আসবে তা আরু বলতে পারে না কিন্তু হাতেনাতে ধরা খেলে সমস্যা। আরিশ একবার আসবে বলেছে তো আসবেই সে যে করেই হোক আর তা নিয়েই আরুর চিন্তা বেশি। সে যা ঘুমকাতুরে, আরিশের চিন্তা না করলে এ তখন হয়তো ঘুমিয়ে পড়তো আয়েশ করে। আরুর এবার বিরক্ত ভাব লাগছে। জানালার কাছ থেকে নড়তেও পারছে না। কিছুটা আগে ব্যালকনিতেও একটু নজর রাখছিল কিন্তু সেখানে দারোয়ান চাচার কড়া টহলদারি দেখে সেদিকে তাকানোর জো নেই। আরমান সাহেব ও এসে মাঝে মাঝে হাটাহাটি করছেন।
আরু একটা হাই তুললো, ঘুম পাচ্ছে ভীষন রকম। সারাদিনে অনেক রকম ভাবে চেষ্টা করেছে যাতে আজ রাতে পাহারা না বসে। আরমান সাহেব আরুর কথার নাকচ করা তো দূর থাক, আফসানা বেগমের ধমকে আরু আর বেশি কিছু বলতে পারেনি। আরু নিজেও চাইনি যে সন্দেহের তীরটা আরিশের দিকে যাক। দারোয়ান চাচা গেট থেকে সরে এসেছে। হঠাৎ আরু খেয়াল করলো আরিশ বাসার গেটের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর আরুর দিকে তাকিয়ে হাসছে। আরু কেঁপে উঠলো আর খানিকটা ভয় ও পেলো। বুকে ফু দিয়ে বিড়বিড় করলো
— এই মানুষটা কি দিয়ে তৈরী আল্লাহ মালুম।
কথাটা বলে আরিশকে না দেখার ভান করে তীব্র উপেক্ষা করে আরু ব্যালকনিতে গিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে বলল
— চাচা এইদিকে কেও যেন মনে হলো দৌড়ে পালালো আমি দেখেছি।
আরুর কথা শুনে আরুর বাবাও বেরিয়ে এলেন আর আরুর কথা অনুযায়ী সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ছুটলেন। আরুর মা বাসা থেকে বার হওয়ার আগে একবার চিৎকার দিয়ে আরুকে সাবধান করে বললেন
— খবরদার ঘর থেকে বার হবি না তুই। দরজা লক করে রাখ।
আরিশের পথ পরিষ্কার করে দিল আরু। জানালার কাছে এসে আরিশের দিকে গমগমে চোখ তাকালো যেন দূর থেকেই তাকে ভস্ম করে দেবে। আরিশ দূর থেকে একটা ফ্লাইং কিস ছুড়ে রাজার মতো একটা ভাব নিতে নিতে এলো।
আরু দরজাটা খোলা রেখে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
আরিশ ডাকলেও আজ ও শুনবে না।
এক দুই মিনিট পর সিঁড়ি দিয়ে কারোর উঠে আসার পায়ের শব্দ শোনা গেল। আরু আগের তুলনায় বেশ স্বাভাবিক ভাবে ঘুমনোর ভান করে রইল। আরিশ রুমের ভিতর ঢুকে দেখলো আরু ঘুমাচ্ছে। আরিশ বেশ জোরে শব্দ করেই দরজার ঠিটকিনি টা টেনে দিল। আরু একটু কেঁপে উঠলো আওয়াজে। আরিশ মৃদু হেসে গুটিগুটি পায়ে গিয়ে আরুর পাশে বসলো।
মৃদু স্বরে ডাকলো
— আরুপাখি।
আরু চোখ বন্ধ করেই রেখেছেন কোন রকম কোন উত্তর দেওয়ার ইচ্ছা নেই তার।
আরিশ বলে উঠলো।
— আমি জানি তুমি ঘুমাওনি। চোখ খোল।
আরু নিরুত্তর।
আরিশ আরুর দিকে ঝুঁকে আরুর মুখের ওপর গরম নিশ্বাস ফেলে বলল
— তুমি নিজেই সহজে আসার ব্যাবস্থা করে দিয়েছো আমি কিন্তু তোমার হেল্প চাইনি তাই এখনো আমার ওপর রাগ করে থেকে লাভ হবে না্ বইকি লস ও হবে না।
আরু বিছানার চাদর খামচে ধরলো। আরিশ এসব কি বলছে!
আরিশ এবার আরুর শরীর থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে বলল
— নিজে থেকে উঠবে নাকি আমি জাগিয়ে দেবো কোনটা।
আরু একটা নড়াচড়া অবধি করলো না। আরিশ লক্ষ করলো আরু বিছানার চাদর খামছি মেরে ধরে আছে।
আরিশ মুচকি হেসে বলল
— কি হলো উত্তর দাও!
আরু যেন পন করেছে যে আজ কোনভাবেই আরিশের সাথে কথা বলবে না।
আরিশ আরুর পেটে হাত দিয়ে আলতো স্পর্শ করে বলল
— আর্শিয়ান এরপর যা হবে তার জন্য কিন্তু তোমার পাপা কোনভাবেই দায়ী নয়। আরুপাখি আমি কিন্তু পারমিশন নেবো না।
আরুর শ্বাস প্রশ্বাস গভীর হচ্ছে। বেশি কিছু ভাবার সময় পেলো না সে। এক তীক্ষ্ণ ব্যাথা অনুভব করতেই কুঁকড়ে গেল আরু। চোখের পাপড়ি কুঁচকে গেল। নিজেকে সংযত করার চেষ্টা। আরিশ আর একটা কথাও এগোল না। আরু শক্ত করে বিছানার চাঁদর খামচি দিয়ে ধরে আছে, এভাবেই চোয়াল শক্ত করে জেদ বজায় করে থাকবে যতখন না ওর রাগ কমে।
#চলবে,,,