কারণে অকারণে ভালোবাসি০২ পর্ব-৩৬+৩৭

0
898

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

৩৬.

–আজ টানা এক সপ্তাহ হয়ে গেল আপনি এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে আসছেন দেখা করতে এদিক ওদিক করে। আপনাকে আর এভাবে আসতে হবে না। তাছাড়া বাড়ির সবাই যানে আপনি টানা এক সপ্তাহ আমার সাথে দেখা না করে আছেন। সবাই ভীষন অবাক হচ্ছে এটা ভেবে। কালকে রাতেই তো ডিনারের পর আম্মু এসে জিজ্ঞাসা করলো যে আমাদের মাঝে ঝামেলা হয়েছে কি না।

আরুর কথাটুকু এখানেই থামিয়ে দিয়ে আরিশ শার্টের বোতাম লাগাতে লাগতে হাসতে শুরু করে বলল
— তা তুমি কি বললে? বলোনি যে তোমার জামাই রোজ রাতে ডিউটি করতে আসে তার বউয়ের!

আরিশের মৃদু সুরের হাসিটাও আরুর কাছে খানিকটা বিদঘুটে বলে মনে হলো। আরিশের কাছে গিয়ে পিঠে একটা বেশ জোরপূর্বক কিল দিতেই আরিশ বিস্ময় প্রকাশ করে বলল
— আহহ!

আরু রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
— সিরিয়াস বিষয় নিয়েও আপনার হাসাহাসি হ্যাঁ?

আরিশ রেডি হয়ে আয়নার সামনে তাকিয়ে বলল
— এম আই লুকিং পারফেক্ট?

আরু চোখ ছোট ছোট করে বলল
— সোওও আনপারফেক্ট।

আরিশ মুচকি হেসে আরুর কপালে একটা ভালোবাসার পরশ একে বলল
— সুইট মাদার হয়ে থাকবে বুঝেছো? নো দৌড়াদৌড়ি নো লাফ ঝাপ।

কথাটা বলে আরিশ ব্যালকনির দিকে না গিয়ে সিঁড়ির দিক দিয়ে যেতে লাগলো। তিন চারদিন ধরে কৃষ্ণচুড়া গাছ বেয়েই আসছে আরিশ, এই কদিনের বেশ প্র্যাকটিসিং হয়ে গেছে ও। আরুর কথাতে আরুর বাবা কৃষ্নচুড়া গাছটা আর কাটেনি।
আরিশ কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে আরু দৌড়ে ছুট দিয়ে আরিশের সামনে গিয়ে ফিসফিস করে বলল
— এই দাঁড়ান। কোথায় যাচ্ছেন আপনি? এদিক দিয়ে কেন? ধরা খেয়ে যাবেন।

আরিশ ফিসফিস করে না বলে বেশ জোরেই বলল
— তো!

আরিশের উচ্চকন্ঠ শুনে আরু ওর মুখটা চেপে ধরে বলল
— পাগল নাকি, ধীরে ধীরে কথা বলুন। জেগে যাবে সবাই।

আরিশ মুখ থেকে হাতটা নামিয়ে বলল
— কেও জাগবে না। আমি আসছি, আজকে একটু তাড়া আছে আমার।

আরু সচেতন হয়ে বলল
— আপনি এখানেই দাঁড়ান। আগে আমি দেখি কেও আছে কিনা। আপনি আমার পিছন পিছন আসবেন।

আরিশ হ্যাঁ না কিছুই বলল না কেবল আরুর পিছন পিছন যেতে লাগল। মেইন দরজাটা খুলে দিয়ে আরু আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল
— এই জন্য বলছি আর আসতে হবে না এভাবে। কথা কেন শোনেন না আমার।

আরিশ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল
— শুনবো এবার।

আরু ভ্রু কুঁচকে বলল
— মানে?

আরিশ কিছু না বলে বার হলো। আরু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। এতো সকালে দারোয়ান চাচা আর পাহারা দেন না তাই আরিশের সকালে বেরিয়ে যেতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। আরিশ সামনের দিক তাকিয়ে চার কদম হাটতেই পিছন থেকে কে যেন বলে উঠলো
— এ কি আরিশ তুমি এখানে!

আরিশ পিছন ঘুরে দেখে চাদর মুড়ি দিয়ে চোরের মতো করে কেও দাঁড়িয়ে আছেন তবে তার গলার স্বর চিনতে বেশি অসুবিধা হলো না আরিশের। যার অর্থ সে ধরা খেয়েছে হাতেনাতে আর আরিশ এটাই চাইতো যে সে ধরা খাক, এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে বউকে ভালোবাসার, তার সাথে সব সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়াটা তার পোষাচ্ছে না। দরজার ওপাশে আরু, ধরা খেয়েছে ভেবে ভয়ে আর লজ্জায় জড়োসড়ো। কিন্তু আরিশ?

— একি মামা আপনি এখানে কি করছেন?

আরিশ ওনার প্রশ্নের বিপরীতে কথাটা এমন ভাবে বলে উঠলো যে বাড়িটা তার আর আরুর বাবা অন্যায়ভাবে এখানে প্রবেশ করেছেন। আরিশের কথায় বিন্দুমাত্র লজ্জা আর ভয়ের রেশমাত্র নেই।
আরিশের কথায় উনি উল্টে হকচকিত হয়ে গেলেন, বেশ দ্বিধাগ্রস্ত ভাব নিয়ে বললেন
— আসলে চোর পাহারা দিচ্ছিলাম আমি আজকে সারারাত। আরু তোমাকে চোরের কথা বলেছে নিশ্চয়ই।

আরিশ মোটেই অবাক হওয়ার ভান করলো না।
— হ্যাঁ শুনলাম। চোরটার ধরা পড়া উচিত। তাই বলে আপনি সারারাত এখানে শীতে পাহারা দেবেন? চোর তো গাছ বেয়েও উঠতে পারে।

— তা ঠিক তা ঠিক। আমি আর সানোয়ার ভাই দুজন মিলে সারারাত পাহারায় ছিলাম, সানোয়ার ভাই এখন একটু ঘুমাতে গেছেন উনি ফিরলে আমি যাবো। কিন্তু তুমি কখন এলে?

— এই তো আমি কাল অনেক রাতেই এলাম কিন্তু আপনাকে বা সানোয়ার চাচাকে কাওকেই তো দেখলাম না। আরিশের কথা শুনে উনি বেশ হকচকিয়ে গেলেন যেন।
— আমরা তখন এদিক ছিলাম না বোধহয়।

আরিশ এবার এক পলক আরুর দিকে তাকালো। আরু ভয়ে গুমসি মেরে আছে। দরজা থেকে দুজনের দূরত্ব বেশ অনেকটাই তাই আরু কোন কথা শুনতে পারছে না তাই তার এমন ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। আরিশ ইচ্ছাকৃতভাবে আরুর দিকে করুন ভাবে তাকালো যাতে আরুর ভয়টা বেড়ে যায়। আরু যেমন আরিশ কে সবসময় বিরক্ত করে তেমনই আরিশের ও ভালো লাগে আরুর গোপনে আরুকে ভয় পাইয়ে দিতে। আরিশের এমন মুখ দেখে আরু ভয়ে ঢোক গিললো।
আরমান সাহেব বেশ জোরেই জিজ্ঞাসা করে উঠলেন
— আরিশ বাবা বললে না তো!

আরিশ মিথ্যা ভাবে ভয় পেয়ে ওঠার চেষ্টা করলো। ওনার দিক তাকিয়ে বললেন
— আসলে কি বলেন তো মামা, আরুপাখির সাথে এই কদিন আমার সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না। এমনকি রাগ করে এখানে চলে এসেছে, আজকে রাগারাগির পরিমানটা বেশি হয়ে গেছে বলে আমি না এসে পারলাম না।

আরমান সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন, তার মেয়ে আর আরিশের যে এতো দীর্ঘ দিন যাবৎ একটা মনোমালিন্য চলতে পারে তা উনি কল্পনাতেও আনেননি।

উনি অবাক হয়ে বললেন
— তা তুমি এসব আমাকে আগে বলোনি কেন আমি তো কিছুই জানতাম না।

— ভাবলাম যে স্বামী স্ত্রীর বিষয় নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়াই ভালো আর তাছাড়া আপনি জানলে আপনি আরুপাখিকে বকাবকি করতেন তাই বলিনি।

উনি মাথা নাড়িয়ে বলল
— নাহ নাহ এটা তুমি কি বলছো। আমি বকাবকি করবো কেন, তোমাদের কি আর বাকাবকি করার বয়স আছে যে বকাবকি করবো! আর তাছাড়া ঝামেলা যখন হয়েছে তা মিটিয়ে নেওয়াই ভালো।

আরিশ আরুর দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল
— আমি আরুপাখিকে বলেছি ওই বাসায় যাওয়ার কথা কিন্তু ও রাজী হয়নি। আপনি একটু ওকে বলুন তাহলে যদি রাজী হয়। কিন্তু এটা বলবেন না যে আমি আপনাকে সবটা জানিয়েছি নাহলে একূল ও যাবে আর ওকূল ও যাবে।
আচ্ছা মামা আমি আসছি, আপনি শীতের মাঝে আর বাইরে থাকবেন না ঘরে যান।

কথাটা বলে আরিশ আর ওনাকে দুইটি বার কিছু বলার সুযোগ দিলো না। যাওয়ার আগে আরুর দিকে একবার চোখ মারলো কিন্তু কেন এমন করলো আরু বুঝতে পারলো না।
আরিশ বিড়বিড় করে বলল
— এই ঢিলে আরুপাখি আর একদিকে আরুপাখির সিকিউরিটি বাপ!

আরিশ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললো
— আমি জানতাম আমি যদি তোমাকে বাসায় ফিরতে বলতাম তুমি হয়তো আমার কথা শুনতে না এখনই, হয়তো কদিন পর ফিরবে বলে আবদার করতে। কিন্তু এটা আমার কাছে ভীষন অন্যায় আবদার হতো। কেন থাকবে আমি তোমাকে ছাড়া দূরে দূরে বলতে পারো?
তোমাকে একটা পলক দেখবো বলে রোজ রাতে গাছে চড়ে আমি তোমার কাছে যাই যাতে সারাটা রাত তোমাকে বুকে জড়িয়ে তোমাকে আগলে রাখতে পারি। আর এখন তো আমার দায়িত্বটা তো আরও দ্বিগুণ হয়েছে তইনা! তুমিও আমাকে ভালোবাসো। আমাকে বোঝার চেষ্টা করো কিন্তু চাইলেও ততোটা বুজে উঠতে পারো না যতোটা আমি তোমাকে বুঝি! আসলে কি বলোতো বয়সের সাথে খাপ খাইয়ে তুমি এখনো আমার ম্যাচিওর আরুপাখি হতে পারোনি। আমি আমার ইমম্যাচিওর আরুপাখিটাকেই বেশি ভালোবাসি! ভীষন থাকে ভীষনরকম। আজকে তুমি ফিরবে। জানো আমি কতো খুশি। আমি জানি তোমার বাবা তোমাকে অনেক জোর করবেন ফেরার জন্য কিন্তু তুমি কিন্তু কিন্তু করলেও উনি কিছু শুনবেন না। ওনাকে সবটা বলতে বারন না করলে উনি হয়তো তোমাকে সবটা বলে দিতেন আর তুমি আমার ওপর রেগে যেতে তারপর হয়তো আবার চলতো মনোমালিন্য। আমি আর এমন কিছু চাইনা। আমি চাইনা আমার আরুপাখিটা আমার থেকে রাগ করে দূরে দূরে থাকুক। ভীষন ভালোবাসি।

কথাগুলো বলে আরিশ নিজের মনেই হেসে উঠলো
— আরুপাখি তুমি যদি আমার কথাগুলো শুনতে! আফশোষ এগুলো শোনার ভাগ্য তোমার কখনোই হবে না কারন কিছু কথা না জানায় শ্রেয়। ইশ আমার টুইটুই আরুপাখিটা!

__

ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও, আরিশ কে ফোন করে বলে দাও রাতে আসতে। দুজনে ডিনার করে তারপর যাবে।
আরু মৌনসুরে বলল– হমম।

অনেকদিন এই বাসায় থাকায় মায়াটা বেড়ে গেছে, এখন মায়া কাটিয়ে যেতে কষ্ট হবে ভীষনরকম।

আরু ফোন করলো আরিশ কে।

— আপনি হসপিটাল এ?

— হমম, একটু পর একটা অপারেশন আছে রেডি হচ্ছি।

— ওহ সরি সরি, তাহলে আমি পরে ফোন করছি।

আরিশ ধমকের সুরে বলল
— আরুপাখি!

আরু হেসে ফেলল হাজরো গম্ভীরতার মাঝেও।
— রাতে এসে আমাকে নিয়ে যাবেন। আর একসাথে ডিনার করবো মনে থাকে যেন।

আরিশ মুচকি হাসলো। — হমম। রেডি থেকো।

আরু কলটা কেটে দিল। অপারেশন এর আগে আরু আরিশের সাথে এতো বেশি কথা বলে না কারন তার কোন কথায় যদি আরিশের খারাপ লাগে তো কনসানট্রেশন ব্রেক হবে। আরু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ব্যালকনিতে গেল। কৃষ্নচুড়া গাছটার পাতাগুলো হাওয়াই দুলছে, হালকা কুয়াশায় পাখিদের অবাধ আনাগোনা চলছে। শীতকালে যদি ভুলবশততার দরুনও কৃষ্নচুড়া ধরতো তাহলে আরু বোধহয় সারাটা দিন গাছের নীচে বসেই সময় কাটিয়ে দিতো আরিশের কাধে মাথা রেখে অথবা আরিশের হাতে হাত রেখে।

#চলবে,,,,,

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

৩৭.

— মুখে আর একটু জলের ছিটা দেবে?

আরুর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল আরিশ। আরু আরিশের দিকে ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। শরীর আর দৃষ্টি উভয়ই ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়েছে প্রায়। আরিশ আরুকে শক্ত করে চেপে ধরে আরুর দুবাহু ধরে পাছে জ্ঞান হারিয়ে না পড়ে যায়। আরু ক্লান্ত সুরে বলল
— শুনুন না।

আরিশ ব্যাকুল হয়ে উত্তর দিলো
— হয় বলো আরুপাখি।

আরু আরিশের শরীরের ওপর ভর ছেড়ে দিয়ে বলল
— আমাকে একটু বিছানায় শুইয়ে দেবেন। আমি আর পারছি না।

আরিশ তৎক্ষণাৎ আরুকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো, আরু অবচেতন প্রায় তবে আরিশের হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। আরিশ আরুর গায়ে চাঁদর টেনে দিয়ে আরুর কপালে ঠোঁট ছুইয়ে বলল
— আমি মেডিসিন দিচ্ছি ঠিক হয়ে যাবে তুমি এক্ষুনি।

আরু এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। আরিশের বুকের ভিতরটা মোঁচড় দিয়ে উঠলো আরুর কান্নাতে। তবে এটা আরিশের কাছে নতুন কিছু নয়। আরু যখনই অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন নিজেকে সাহস জোগানোর পরিবর্তে কাঁদে অসুস্থতার কষ্টটা সহ্য করতে না পেরে।

আরিশ মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
— কিছ্ছু হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো, আমি আছি তো।

আরুর চোখ দিয়ে নোনা জল গড়াচ্ছে। আরিশ আরুর চোখটা মুছিয়ে দিয়ে বলল
— আমি ঔষধ আনি। ওয়েট।

আরিশ উঠতে গেলেই আরু হাতটা আরও শক্ত করে হাতটা ধরলো। আরিশ বাধা পেয়ে আরুরদিকে তাকিয়ে ফিচেল হেসে বলল
— হাতটা না ছাড়লে আমি ওষুধ টা আনবো কি করে বলোতো আরুপাখি।

আরু নাক টেনে আধো স্বরে বলল
— প্লিজ একা রেখে কোথাও যাবেন না প্রমিস করুন।

আরিশ আরুর আরুর গালে হাত রেখে বলল
— দু পা হেটেই ওষুধ রয়েছে বক্সে। এক সেকেন্ড ও লাগবে না।

আরু হাতটা শিথিল করলো। আরিশ ওষুধটা নিয়ে আরুর পাশে বসলো আর প্রশ্ন করলো।

— আরুপাখি আমি জিজ্ঞাসা করবো হ্যাঁ অথবা না বলবে মাথা নাড়িয়ে ওকে?

— আচ্ছা।

— গলা ব্যাথা করছে? সারা শরীরও কি ব্যাথা জ্বরের কারনে?

আরু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো।

— ওকে! কিছু খেতে ইচ্ছা করছে?

আরু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো।

আরিশ দুষ্টু হেসে বলল
— আইসক্রিম খেতে নাকি?

আরু মুখ গোমরা করে ভাঙা গলায় বলল
— খেতে পারবো না বলে মজা করছেন?

আরিশ আরুর দিকে তাকিয়ে বলল
— একদম না। অবশ্যই খেতে পারো আইসক্রিম।

আরু ভ্রু কুঁচকে বলল
— আর ইউ কিডিং।

আরিশ ওঠে যেতে যেতে বলল
— নেহাতই তোমার মুখ স্বাদ নেই আর কিছু খেলেই বমি হয়ে যাচ্ছে তাই এলাও করছি। তবে আইসক্রিম খাওয়ার পরই মেডিসিন খেতে হবে। এজ আ ডক্টর আমার এটা বলা একদম উচিত না তবুও বলতে হচ্ছে।

আরু হাসতে হাসতে বলল
— আপনি এতো কিউট কবে হলেন মিঃ অভদ্র?

আরিশ চোখ মেরে সিঁড়ির কাছে গিয়ে বলল
— আমি তো জন্মগতই কিউট শুধু তুমিই আমাকে আনকিউট ভাবো! হাহ দুঃখ!

আরু হেসে ফেলল। আরিশও হাসতে হাসতে নীচে নেমে গেল।

আরিশ যেতেই আরু কল করলো একটা নম্বর এ। বেশ কয়েকবার রিঙ হওয়ার পরও কলটার উত্তর এলো না। এমনটাই হয় ক্লিনিক গুলোতে। দরকারে ফোন করলে আর পাওয়া যায়না। লাস্টবারের মতো আর একবার ট্রাই করতেই কলটার ধরলো। আরুশি বলে উঠলো
— আমি ধানমন্ডি থেকে আরুশি খান বলছিলাম, ডক্টর আবরার আরিশের ওয়াইফ।

ওপর পাশ থেকে ক্লিনিকের স্টাফ বলে উঠলেন
–হ্যাঁ ম্যাডাম বলুন।

— আসলে আমার যে এক মাসের প্রেগন্যান্সি টেস্ট এর ডেট ছিলো। আজকের টেস্ট টা করাতে পারবো না। আমি অসুস্থ আছি একটু। সুস্থ হলে আবার কবে যেতে হবে বলুন।

— না না ম্যাডাম আপনাকে আসতে হবে না। আরিশ স্যার ফোন করে জানিয়েছেন আমাদেরকে। আমাদের একজন স্টাফ সকাল বারোটা নাগাদ আপনার ব্লাড আর ইউরিন স্যাম্পল টা নিতে যাবে। আপনাকে আসার দরকার নেই।

— আচ্ছা ধন্যবাদ আপু।

কলটা কেটে আরু ফোনটা পাশে রেখে দিলো। আরিশ আইসক্রিম নিয়ে রুমে ঢুকলো। আরু অবাক হলো ভীষনরকম তবে খুশিও হয়েছে এটা ভেবে ওর অন্যায় আবদারটা আরিশ এতো সহজে মেনে নিয়েছে।

আরিশ রুমে ঢুকতেই আরু বলল
— শুধু এটাতে হবে না। আইসক্রিমের সাথে আপনাকেও খাবো। আই এম হাঙ্গ্ৰি এনাফ।

আরিশ হো হো করে হেসে উঠে বলল
— আরুপাখিটা দেখি জম্বি হয়ে গেছে।

আরু মুচকি হেসে বলল
— না না আপনার হাম্বি। যে শুধু আপনাকেই কামড়াতে চায়, অন্য কারোর প্রতি ইন্টারেস্ট নেই আমার।

আরিশ ভ্রু উচিয়ে আরুর কাছে বসলো। আরুর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল
— নাও কামড়াও।

আরু ভ্রু কুঁচকে বলল
–সত্যিই কামড়ে দিলে তখন আমাকে দোষারোপ করতে পারবেন না।

— ট্রাই ইট না!

আরু জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁটটা ভিজিয়ে আরিশের গলার কাছে গেল, তারপর আরিশের গলায় আলতো স্পর্শে ঠোঁট ছোঁয়াতেই আরিশ বলল
— কামড়াতে বলেছি, ঠোঁট ছোঁয়াতে বলিনি, ওটার জন্য আমি আছি।

আরু লজ্জা পেয়ে সরে গেল। আরিশ আইসক্রিম আরুর সামনে ধরে বলল
— নাও!

আরু আআআ করতেই আরিশ বলল
— আমাকেই খাইয়ে দিতে হবে?

আরু মাথা নাড়িয়ে বলল
— ইয়েস ইয়েস ইয়েস! ইটস ম্যানডেটারি।

____

— শুনুন না আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবেন!

আরিশ আরুর গায়ে চাদর জাড়িয়ে বলল
— এই মাঝরাতে অন্যায় আবদার গুলো বাদে সব রাখতে পারি। বলো।

— এখন তো আমি কিছুটা সুস্থ সকালের তুলনায়। আমার এই ঘরের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসছে। চলুন না বাইরে কোথাও যায়।

আরিশ আরুর হাতে হাত রেখে বলল
— ছাদে যেতে পারি কিন্তু বাসার বাইরে নট এলাও।

— হমম হমম তাই চলুন।

— আসো।

কথাটা বলে আরিশ আরুর হাতটা ধরলো তারপর গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলো।

শীতকাল শেষ হয়েছে অনেক আগেই, বসন্তের শুরুর দিক, বাতাসে কুয়াশা কেটে বসন্তের ঘ্রান বইছে। শহরের রাস্তাটার গাড়ি ঘোড়াগুলোর ডিউটি যেন এখনো শেষ হয়নি। কোন ঘরে আলো জ্বলছে আবার কেও বা গভীর নিদ্রায় মগ্ন।

আরু ছাদে গিয়ে দোলনায় বসে পড়লো। আরিশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল
— আমার পাশে বসুন না।

আরিশ ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে একটা শীতল হাসি দিল। আরিশ আরু পাশাপাশি বসে আছে। আরু আরিশের কাছে আরও সরে গিয়ে দুজনের দূরত্বটা মিইয়ে দিয়ে আরিশের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল
— মি অভদ্র!

আরিশ মৌন সুরে বলল
— হমম বলো!

— আপনার বসন্ত কেমন লাগে?ভালো না খারাপ?

আরিশ জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো
— আগে বলো তোমার কেমন লাগে?

আরু ঠোঁট উল্টে বলল
— আপনি সবসময় এমন করেন, কথা এড়িয়ে যান। আমার বসন্ত ভালো লাগতে বিশেষ করে ফাল্গুন সাজে সাজতে।

— হমম কিন্তু এবার তুমি ফাল্গুনের সাজে সাজানি কেন? শাড়ি এনে দিয়েছিলাম তো।

— ইচ্ছা হয়নি তাই। সে কথা বাদ দিন। আমার আর একটা প্রশ্নের উত্তর দিন।

— হমম বলো।

— আপনি সব কথার আগে আমার উত্তর নিয়ে তারপর নিজের উত্তর কেন দেন বলুন তো।

আরিশ এবার একটু উচ্চস্বরেই হাসলো। আরু আরিশের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল
— এ এক জটিল প্রশ্ন।

— নাহ জটিল না, খুব সহজ। উত্তর দিন।

আরিশ আরুর চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল
— তোমার কিছু পছন্দ হলেই সেটা আমারও পছন্দ হয়ে যায় তাই, পছন্দ না হলেও সেই জিনিসটার প্রতি ভালোলাগা আনার চেষ্টা করি।

আরু মুখ চেপে হাসলো।

— আপনিও না সত্যিই!

আরিশ আরু কে পাশ থেকে জড়িয়ে নিলো। দুজনেই নিরব।

বেশ কিছুখন পর নিরবতা ভেঙে আরু আরিশের দিকে মায়াবী চাহনিতে তাকিয়ে বলল
— আপনি আমাকে কবে থেকে ভালবাসেন মি অভদ্র!

আরিশ নির্বাক। উত্তর দিলো না কোন। আরু সামনের দিকে তাকিয়ে বলল
— আপনি সবসময় বলেন যে আপনি আমাকে আগে থেকে ভালোবাসতেন কিন্তু কবে থেকে সেটা কখনো বলেননি। আজ আমি জানতে চায় যে আপনি ঠিক কবে থেকে আমাকে ভালোবাসতেন।

আরিশ হঠাৎ করে বলে উঠলো
— যেই বয়সে তুমি ফিডার খেতে সেই বয়স থেকে।

আরু আরিশের হাতে একটা বাড়ি মেরে বলল

— আপনি কখনো সোজা উত্তর দিতে পারেন না। অলওয়েজ কথা ঘোরান। থাক বলতে হবে না আপনাকে।

আরুর অভিমানী সুর শুনে আরিশ দীর্ঘশ্বাসের সাথে হেসে বলল
— শুনবে?

আরু উত্তর দিল না, অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ আরিশ বলতে শুরু করলো
— সালটা ছিলো ২০০৬ জুন মাসের ২৫ তারিখ,,,,, তখন তোমার সাড়ে তিন বছর বয়স। কাঠফাটা গরম ছিলো সেদিন,,,,,,

#চলবে,,