কারণে অকারণে ভালোবাসি০২ পর্ব-৩৮+৩৯

0
896

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

৩৮.

আরু গাল ফুলিয়ে অন্য দিকে চেয়ে রইলো। মৃদু বাতাসে চুলগুলো আলতো ভাবে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বসন্তের মধ্যে রাতের অপূর্ব এক ঘ্রাণ যেন সমস্ত শরীরকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিচ্ছে। অপরদিকে আরিশের প্রতি রাগ আর এমন একটা অভিমানী পরিবেশে আরুর মাঝের সৌন্দর্যটা যেন বেড়ে গেছে।

আরিশ মেঝের সাথে পায়ের আলতো ঘর্ষন করতে লাগলো। তার একটা বিকট শব্দ হচ্ছে যা রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে দ্বিগুনভাবে ফিরে আসছে।
আরিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো তারপর বলতে শুরু করলো,,,,

সালটা ছিলো ২০০৬ জুন মাসের ২৫ তারিখ,,,,, তখন তোমার সাড়ে তিন বছর বয়স। কাঠফাটা গরম তখন। তুমি তখন প্রায় সাড়ে তিন,মানে বুঝতেই পারছো মুখের বুলি ছিলো অঢেল।

আরিশের কথা শুনে আরু আরিশের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল
— তোওও তো কি হয়েছে! কথা বলতে শিখেছি বলবো না?

আরিশ বেশ শব্দ করেই হাসলো। আরু বিরক্ত হলো না। আরিশ পুনরায় বলল
— আদিবার তখন সাত বছর বয়স। আর আমি তখন আট।

আদিবার নাম শুনতেই আরু যেন কেঁপে উঠলো। আরিশ আরুর কাধে হাত দিয়ে ভরসা দিতেই আরু নিজে থেকেই আরিশের দিকে সরে এলো।

— এভাবেই ভয় পেলে বলবো কিভাবে।

আরু আরিশের কথা শুনে বিব্রত বোধ করলো। বেশ আড়ষ্ট গলায় ধমকের সুরে বলল
— চার বছর পর থেকে বলছেন কেন? আমি শুরু থেকে শুনতে চেয়েছি।

আরিশ শান্ত করানোর সুরে বলল
— আচ্ছা আচ্ছা বলছি।

— হমম।

— আমার যখন আট বছর বয়স তখন আমি জানতে পারি যে আদিবার পরও কোন এক ছোট্ট টুইটুই নাকি আমাদের বাসায় আসতে চলেছে। সবাই চেয়েছিলো আদিবার পর যেন একটা ছেলে হয় তোমার মায়ের কোল জুড়ে তাহলে সুন্দর একটা ম্যাচ হবে ভাই বোনের যেমন আমি আর সানা। পরে যখন জানা গেল যে মেয়ে হবে তখন সবাই কিছুদিন একটু আধটু দুঃখ প্রকাশ করেছিলো।

আরু আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল
— আর আপনি?

আরিশ মুচকি হেসে বলল
— আমি আর কি! আমার কোন কিছুর প্রতি এতো ধ্যান জ্ঞান ছিলো না তখন। কিন্তু সত্যি বলতে শুনে বেশ বিরক্ত হয়েছিলাম যখন শুনলাম যে মেয়ে হবে।

আরু ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো
— কেন কেন? আমাকে নিয়ে আপনার এতো কিসের সমস্যা ছিলো বলুন তো।

আরিশ আরুর কথা শুনে আরুর নাকটা হালকা টেনে বলল
— কারন আমি ভাবতাম আদিবার মতো আর একটা পিচ্চি এসে আমাকে জ্বালাবে আর যেটা আমি একদম চাইতাম না। শুনেছিলাম যে ছোটরা নাকি একটু বেশিই দুষ্ট হয় তাই একটু বেশ বিরক্ত হয়েছিলাম। রাগ করে একবেলা ভাত ও খাইনি তখন, যদিও না খাওয়ার কারনটা কেওই জানতো না। কারন আমি ছোট বেলা থেকেই অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতাম না কারোর কাছে।

আরু আরিশের দিকে একটা শীতল হাসি দিয়ে বলল
— আর সেই আপনিই এখন আমাকে না খাইয়ে নিজে খান না। ভাগ্যের কি লিখন বলুন।

আরিশ আরুর হাতটা ধরে ছাদের কার্নিশ বরাবর গিয়ে দাঁড়ালো। আরিশ নিরব। ঠান্ডা হাওয়া শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে আর ততোই শরীরে এক আলাদাই ভালোলাগা ছেয়ে যাচ্ছে। আরু আরিশের গা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে, আরিশের চুলগুলো মৃদু কম্পমান, আরুর ভীষনরকম ইচ্ছা করছে আলতো করে ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু নাহ! তার যে লজ্জা!

আরিশের এই মৌনতা ভাঙতে আরু প্রশ্ন করে উঠলো
— আপনি কি আপুর কাজকর্মে খুব বিরক্ত হতেন? না মানে যদিও সে তখন ছোট ছিল, নেহাতই সে বুঝতো না।

আরুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আরিশ বলল
— মনের কোন ইচ্ছাকে অপূর্ণ রাখতে নেই কখনো। তাই ইচ্ছাটা পূরন করতে পারো।

আরু শব্দ করে হেসে উঠলো। মুখে হাত দিয়ে সুন্দরী রমনীদের যে গোপন হাসি হয় তেমনটা হাসলো। আরিশের মাথার চুলগুলোকে স্পর্শ করে বললো
— আপনি কি বুঝলেন যে এখন আমার আপনাকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছা করছে।

আরিশ মৃদু হাসলো, আরুর উত্তরটাকে এড়িয়ে গিয়ে বলল
— আদিবা আমাকে বিরক্ত করতো কি জানি না তবে তার কাজকর্ম গুলোতে আমি বিরক্ত হতাম।

— যেমন?

— যেমন পুতুল খেলা, তার সাথে বসে রান্না বাটি খেলা করা, তাকে সাজিয়ে দেওয়া।

আরু এবার উচ্চস্বরে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো আর বলল
— সে তো আপনি আমার সাথেও এই খেলা গুলো খেলতেন, আমি বউ সাজতে না চইলেও আপনি জোর করে বউ সাজিয়ে দিতেন।

আরিশ আরুর দিকে বেশ ঝুকে গিয়ে বলল
— এই জন্যই তুমি আমার আরুপাখি আর সে আদিবা আজও শুধুই আদিবা।

আরু এবার বাইরের পরিবেশের দিকে তাকালো। আরু চাইনা যে আরিশ আদিবার বিপক্ষ নিয়ে আর কিছু বলুক। তাই সে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে বলল
— তারপর বলুন।

— তারপর আমি বেশ রেগে ছিলাম মেয়ে হবে ভেবে কিন্তু আবার পরেই ভাবলাম যে আর একটা মেয়ে হলে বরং আমরই লাভ, আদিবা আমার পিছু ছাড়বে বোনকে পেয়ে, আমাকে আর এসব খেলার জন্য ডাকবে না, এটা ভেবে তোমাকে আমি ” পিচ্চিপাখি ” নাম ধরে ডেকেছিলাম নিজের মনেই। তখন তো তোমার ছিলো না তাই পিচ্চিপাখি।

— এহেম এহেম এই ব্যাপার তাহলে! আচ্ছা তারপর।

— আদিবার বোন হবে ভেবে আদিবাও ভীষন খুশি ছিল, তবুও আমার পিছু ছাড়তে চাইতো না কখনো, ছোট্ট মেয়ে কিছু বললেই যদি নালিশ জানায় তাই ওকে কখনো বকাঝকাও করতাম না।

আরু গাল ফুলিয়ে বলল
— আপুকে বকাঝকা দেননি আর তার সবটা আমার ওপরেই উষুল করেন আপনি। সারাদিনে দশটা কথা বললে আটটা কথা বকাঝকা দিয়ে বলেন।

আরিশ আরুর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে বলল
— তোমাকে বকা দিতেও আমার ভালো লাগলো তাই বকা দিই, আর আমি সেই জিনিসটা বেশি বেশি করি যেটা করতে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি এবং তা নির্ভর করে আমি সেটাকে বা তাকে কতোটা ভালোবাসি তার ওপর।

আরু আমতা আমতা করে বলল
— হয়েছে হয়েছে। তারপর বলুন।

— তারপর একদিন আদিবা আমার কাছে বউ সাজতে এসেছিলো সেদিন প্রথম আমি ওকে ভীষন জোরে একটা ধমক দিয়েছিলাম তারপর তার সে কি কান্না। সেদিনের পর ভেবেছিলাম কাওকে কখনো ধমক দিয়ে কথা বলবো না কিন্তু তার আর হলো কই এখন তো দেখি ধমক ছাড়া একজন আমার কথাই শুনতে চায় না।

আরু চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল
— মি অভদ্রওওওও!

— তারপর শোনো। তারপর কয়েকদিন আদিবা আমার ধারে কাছেই ঘেষেনি। আমিও চেষ্টা করেছিলাম আদিবার সাথে নরমাল ভাবে মিশতে কিন্তু পারতাম না কোনভাবেই। আদিবার বয়সী ছোট মেয়েরা সাধারনত কি করে? বড়োদের বই খাতা ছিঁড়ে দেয় কিন্তু আদিবা কখনো সেই সাহস দেখাইনি।

আরিশ এর কথার মাঝে আরু বলে উঠলো
— আমি তো আপনার ফেবারিট ফেয়ারি টেল এর বইটা এক বালতি জলের মধ্যে চুবিয়ে টিস্যু বানিয়েছিলাম আর আপনাকে ভিজে নরম রুমাল হিসাবে দিয়েছিলাম তাইনা? আর আপনি আমাকে কিছু বলেননি সেটাও আমার মনে আছে।

আরুর কথা শুনে আরিশ গলায় একটা চিমটি দিয়ে বলল
— এখনও দুঃখ হয় এটা ভেবে যে সেদিন কেন তোমাকে ধমক দিইনি। উল্টে আম্মুকে বলেছিলাম যে ওটা আমার আনফেবা্রিট হয়ে গেছে তাই ওটা না পড়লেও চলবে। কিন্তু পরে আমি পকেটমানি থেকে সেই বই আবার কিনেছিলাম জানো নিশ্চয়ই।

আরু মাথা নাড়িয়ে বলল
— হমম হমম। আমি সেদিন বইটা ছিড়তে একটুও ভয় পাইনি কারন আমি জানতাম আপনি কিছু বলবেন না।

আরিশ আরুকে হাত ধরে কাছে টেনে একপাশ থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল
— হমম তুমি তো আবার সব জানতা তাইনা! আমার ফিউচার প্রেডিক্ট করা বউ।

— প্রাউড অফ মাইসেল্ফ।

— হয়েছে হয়েছে। নিজের তারিফ করতে দিলে থামানো দায়। পরে কি হলো শোনো।

আরু দাঁত মেলিয়ে এক বিকট হাসি দিলো
— হিহি বলুন।

— আদিবাকে সহ্য করে নিলাম আরও কয়েক মাসের জন্য আর অপেক্ষা করতে লাগলাম যে কবে তুমি মামীর পেট থেকে বেরিয়ে আদিবাকে জাপটে ধরে বলবে আপু চলো পুতুল খেলি। আর সেদিন আমি একটা শান্তির নিশ্বাস ফেলবো।

আরু খিলখিল করে হেসে উঠে বলল
— আপনিও না, সদ্যজাত বাচ্চা কিভাবে এরকম করবে?

— গল্পে গরুর যেমন গাছে ওঠে তখন আমার ভাবনাও তেমনি ছিলো। একটু স্বস্তি পাবো ভেবে যা খুশি ভাবতাম।

— তারপর তারপর।

— তারপর আর কি, মার্চ মাসের আঠেরো তারিখে এক টুইটুই এর জন্ম হলো। সেদিন আমি ছিলাম সবথেকে খুশি কারন ওই যে আদিবাবর ভাবনা।

আরু গাল ফুলিয়ে বলল
— আপনি আপুকে এতোটা অবহেলা না করলেও পারতেন।

আরিশ রুক্ষ কন্ঠে বলল
— তাহলে কি তোমার আপুকে বিয়ে করে নিতাম নাকি?

আরু আরিশ এর শার্ট আঁকড়ে বলল
— নাহ তা না। আপুর হায়াত ততদিন তো ছিলো না। সে যতোদিন বেঁচে ছিলো ততদিন না হয়!

আরিশ আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
— ওই ছোট বয়সে আমার আর কিছু মাথায় আসে নি আরুপাখি, নাহলে আদিবাকে আমি আমার কারনে কখনো কষ্ট পেতে দিতাম না।

আরু দীর্ঘশ্বাস ছাড়াও কিছু বললো না। আরিশ আবার বলতে শুরু করলো
— তুমি হওয়ার একদিন পর আমি হসপিটালে তোমাকে দেখতে গেছিলাম, অনেক এক্সাইটমেন্ট নিয়েই গেছিলাম। কিন্তু তারপর যা হলো তারপর থেকে তোমাকে আমি কখনো কোলে নিইনি। কিন্তু এখন কিছু হলেই তোমাকে করে নিয়ে আমাকেই ঘুরতে হয়। বুঝেছি ছোটবেলায় কোলে নিইনি তাই আল্লাহ সারাজীবন বহন করার দায়িত্ব দিয়েছেন। যদিও এই দায়িত্বটা আমার ভালোই লাগে।

— তা ঠিক বলেছেন। আল্লাহ এটা আপনাকে পানিশমেন্ট দিয়েছেন। তা আমি কি করেছিলাম শুনি।

আরিশ আরুর দিকে এগিয়ে বলল
— আমার গায়ে টয়লেট করে দিয়েছিলে।

কথাটা শোনা মাত্রই আরু আরিশ এর বিপরীতে ঘুরে গেল, লজ্জায় মুখটা ঢেকে নিলো। আরিশ আরও লজ্জা দিতে বলল
— আর লজ্জা পেতে হতো না, ভালোই করেছিলে সেদিন, সেই জন্যই তো এখন,,,,

আরিশ আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরু আরিশের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল
— থামুন, আর শুনতে চাইছি না। আমার ঘুম পাচ্ছে ভীষন, ঘুমাবো।

আরুর হাত না সরিয়েই আরিশ কিছু অস্পষ্ট সুরে বলতে লাগলো কিন্তু কি বলল বোঝা গেল না।

আরু আরিশ কে থামানোর জন্য বলল
— রুমে চলুন এক্ষুনি। আমার ঘুম পাচ্ছে। নো মোর ওয়ারডস, একদম নো মোর ওয়ার্ডস।

আরিশ হাতটা ছাড়িয়ে বলল
— শুনবেনা পুরোটা?

আরু রাগ দেখিয়ে বলল
— আপনি থাকুন আমি চললাম।

কথাটা বলে আরু গটগট করে সিঁড়ি দায়ে নেমে গেল, আরিশ কিছুখন একটা দমফাটা হাসি দিয়ে নীচে নামলো। রুমে গিয়ে দেখলো আরু পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে। আরিশ ধীরে ধীরে আরুর পাশে শুয়ে আরুকে ওর দিকে ফিরিয়ে বলল
— আরুপাখি।

আরু চোখ বন্ধ রেখেই মাথা নাড়িয়ে বলল
— উহুম উহুম।

আরিশ আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
— আচ্ছা আবার অন্য কোন দিন বলবো।

আরু মাথা নড়িয়ে বলল
— হমম হমম।

আরিশ আরুকে জড়িয়ে নিয়ে কপালে একটা চুমু দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

#চলবে,,,,

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

৩৯.

— আচ্ছা শুনুন না একটা কথা?

আরিশ জুতোটা পরতে পরতে বলল
— একটাই কথা যেন হয়, তার থেকে যেন একটাও বেশি না হয়।

আরু ঠোঁট উল্টে বলল
— আরে বাবা হ্যাঁ, একটাই বলবো বেশি বলবো না। আমি এমনিতেই কম কথা বলি।

— বলো।

— আজকে বাসায় একটু জলদি ফিরবেন?

আরিশ নির্বিকার সুরে বলল
— কেন শুনি?

— না মানে আজকে ভাবছিলাম একটু রাতে বার হবো।

আরিশ পিছন ঘুরে চোখ ছোট ছোট করে বলল
— সরি আরুপাখি, আজকে আমার ফিরতে দেরি হবে। আমি বরং কালকে নিয়ে যায়?

আরু মন খারাপ করলো না। বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলল
— আচ্ছা ঠিক আছে কালকে নিয়ে যাবেন।

আরিশ আরুর কপালে ভালোবাসার পরশ একে বলল
— সাবধানে থাকবে আর বাইরে যাবে না বেশি। বাসার বাইরে তো একদমই না। আর যদি দেখ যে খুব বমি হচ্ছে তো অল্প খাবে। আর জ্বর হলে ওষুধ খেয়ে নেবে আর সবসময় আম্মু আর সানার সাথে সাথে থাকবে। আপনার তো আবার মাথা ঘুরে পড়ার রেকর্ড আছে।

আরু রাশভারী কন্ঠে বলল
— ব্যাস! হয়েছে হেয়েছে। বুঝে গেছি আমি। আপনার লেট হচ্ছে না এবার!

আরিশ আরুর গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল
— নাহ দেরি হচ্ছে না।

আরুর গাল টেনে দেওয়াই আরু ‘আহহ ‘ শব্দ করে উঠলো। আরিশ গালে আলতো স্পর্শ করতেই আরু বলল
— এই আপনি যান। নইলে আমার রাগ হয়ে গেলে আজ আপনি শেষ।

আরিশ দরজার কাছে গিয়ে বলল
— দিনের শুরুতেই একেবারে শেষ হতে চাই না। আচ্ছা বাই।

আরু উত্তর দিলো না।
— বাই এর রিপ্লাই তো দিতে পারো অন্তত।

— আসার সময় পে্ট্রি নিয়ে আসবেন।

— হাহ! এলিয়েন।

আরিশ চলে গেল, আরু ফিক করে হেসে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে অনিকা খানের নাম্বারে কল করতেই কল ধরে অনিকা খান বলে উঠলেন
— কি রে তুই কি আরিশ এর সঙ্গে বাইরে বার হয়েছিস?

আরু ফিসফিসিয়ে বলল
— শাশুড়িআম্মু শোনো না। একটু আমার রুমে আসবে?

অনিকা খান বকুনি দিয়ে বললেন
— এটা বলার জন্যও কল করতে হয়! একটা জোরে ডাক দিলেই তো হয়, আমি তো নিচেই আছি।

আরু হি হি করে হেসে বলল
— এই জন্যই তো মি অভদ্র আমাকে ওয়ার্ল্ড এর দা গ্ৰেট লেজি বলে।

অনিকা খান হেসে উঠলেন।
— লেজিরা কবে থেকে দা গ্ৰেট হলো হমম?

— হিহি, তুমি তো জানোই তোমার ছেলেকে, ওনার কাছে পসিবল!

— তাই ই। আচ্ছা ২ মিনিট অপেক্ষা কর আমি এক্ষুনি আসছি। সানা বোধহয় এখনো ঘুমাচ্ছে। মেয়েটার তাড়াতাড়ি শ্বশুর বাসায় পাঠাতে হবে এবার।

— হমম হমম ঠিক বলেছো, আমারও রোজ একটা ছোটখাটো আউটিং হয়ে যাবে ননদিনীর বাসায় উইথ মাই সুইট সিক্সটিন শাশুমা।

অনিকা খান হেসে ফেললেন।

— পাগল মেয়ে আমার।

— তড়াতাড়ি আসো, আর কালকে রাতে শ্বশুরবাবা যে বিরিয়ানি এনেছিলো আমার জ্বর ছিলো বলে দাওনি, তুমি তো ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলে ওটা আনো প্লিজ, ক্ষুদা লেগেছে।

— একদম না। এই সময় বাসি খাবার একদম বাদ। দরকার হলে আজকে আবার আনতে বলবো, আমি অন্য কিছু নিয়ে যাচ্ছি।

আরু মুখ গোমরা করে রইলো। কলটা কেটে দিয়ে ব্যালকনিতে গেল, আরিশ দারোয়ান চাচার সাথে এখনো দাঁড়িয়ে কথা বলছে। কি বলছে সেটা আরুর হয়তো অনেকটাই জানা।
— আরুপাখি বাসা থেকে বার হওয়ার আবদার করলে আমাকে কল দিবেন চাচা।

আরু বিড়বিড় করে বলল
— নিঘ্ঘাত এটাই বলবে। অভদ্র একটা।

পিছন থেকে অনিকা খান বলে উঠলেন
— আমার ছেলেটা কতোটা অভদ্র রে?

অনিকা খানের কথা শুনে আরুর ইচ্ছা হলো যে সকাল সকাল ওনাকে বিরক্ত করবেন কারন আরিশকে আজকে বিরক্ত করতে পারেনি ও।

আরু ওনার দিকে উচ্ছাসের সথে তাকিয়ে বলল
— হেই ডারলিং গুড মর্নিং।

অনিকা খান চোখ পাকিয়ে বললেন
— মার খাবি কিন্তু।

আরু হাসতে হাসতে রুমে এসে বিছানায় বসলো পা ভাজ করে। অনিকা খান প্লেটে নুডলসটা নাড়াচাড়া করে ঠান্ডা করছেন।

আরু কৌতূহল দেখিয়ে বলল
— এটা কি খুব গরম?

— হমম, আমি ঠান্ডা করে দিচ্ছি।

আরু ওনার নিরবতাতে প্রশ্ন করলো।
— আচ্ছা ফুপি আদিবা আপু কি ওনাকে খুব বিরক্ত করতেন ছোট বেলায়?

অনিকা খান নুডলসটা ঠান্ডা করতে করতে বললেন
— হঠাৎ এই আদিবার কথা যে। কিছু কি হয়েছে নাকি?

— তেমন কিছু না, আসলে কালকে আমিই ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে উনি আমাকে কবে থেকে ভালোবাসেন এসব। তো উনি ছোট বেলার সব কথা বলছিলেন তাই এটাও বললেন যে আপুর কাজকর্মে নাকি উনি ভীষনরকম বিরক্ত হতেন আর আমি হওয়াতে উনি নাকি অনেক খুশি হয়েছিলেন কারন আমাকে পেলে আপু ওনাকে আর জ্বালাবে না তাই।

অনিকা খান ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে তুললেন।

— হ্যাঁ! আরিশ সেদিন ভীষন খুশি ছিলো, এতো খুশি ও ক্লাস ওয়ানে ফার্স্ট হওয়াতেও বোধহয় হয়নি।

— তাই নাকি? তারপর?

— তোকে দেখতে যাবে তার কি এক্সাইটমেনট। আমি ভীষন অবাক হয়েছিলাম আরিশ কে দেখে কারন আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো তোকেও সহ্য করতে পারবে না আদিবার মতো। আরিশ বরাবরই চাপা স্বভাবের, সে তার বিরক্তির কথা কখনো আমাকে বলেনি, কিন্তু আমি তো মা, নই বললেও ঠিক বুঝে যেতাম। পরে ভাবতাম ছোট বাচ্চা তাই মনের মাঝে আদিবার প্রথম এমন বিপরীত অনুভূতি পুষে রেখেছে, বড়ো হলে সময়ের সাথে এমনিই ভালোবাসা হয়ে যাবে।

আরু হাটু ভাজ করে হাত রেখে বসে আছে আর স্থির হয়ে ওনার কথা শুনছে। ওনার কথা শেষ হতেই না হতেই আরু বলল
— উনি বললেন যে ভালোবাসাটা হলো এক অদ্ভুত অনুভুতি যা কেবল একজনের জন্যই হয় সবার জন্য হয়না। তাহলে ওনারও কি আপুর প্রতি সেই অনুভূতি চলে আসতো সময়ের সাথে?

অনিকা খান দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন আর বললেন
— নাহ! আমি ভুল ছিলাম আর ভুল ছিল আমার ধারনা।

আরু ভ্রু কোঁচকালো হয়তো ওনার কথা বোঝার চেষ্টা করছে। অনিকা খান আবার বললেন
— আসলে এতো বছরের জীবনে এই জিনিসটা খুব করে বুঝেছি যে যার প্রতি আমরা প্রথম থেকেই অনুভূতি শূন্য হয় তার প্রথম ভালোবাসা আনা খুব কঠিন একটা কাজ। আরিশও হয়তো পারতো না আদিবার বেচেঁ থাকলে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো আদিবা বেচেঁ থাকলে হয়তো সম্পর্কগুলো এখন যেমনটা স্থিতিশীল ততটা স্থিতিশীল ও হতো না। তখন আদিবার হয়তো তোকে আর আরিশ কে কখনোই মেনে নিতে পারতো না। তুই আর আরিশ একে অপরের জন্যই দুনিয়াতে এসেছিস সেখানে আদিবা চাইলেও অনধিকার চর্চা করতে পারতো না তবে তোর আর আরিশ এর সম্পর্কে বেশ জটিলতা তৈরি হতো আদিবাকে ঘিরে।

আরুর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। আজ আদিবার জন্য কোথাও না কোথাও বুকের মাঝে একটা চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করছে। সত্যিই কি আদিবা তার থেকে আরিশ কে বেশি ভালোবাসতো।

অনিকা খান আবার বললেন
— আদিবার অসুখের কথা শুনেও আরিশ এর মনে আদিবার জন্য কোন নরম জায়গার তৈরি হয়নি কিন্তু যেদিন আদিবা মারা যায় সেদিন আরিশ সারাটা দিন চুপ ছিলো কোন কথা বলেনি ও। সেদিন আমি ওকে একাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, তুই তখন সবে তিন বছর বয়সী, তোর তো আর আরিশ কে বোঝার মতো ক্ষমতাও ছিলো না।

আরুর চোখ থেকে জল গড়াচ্ছে। নিজেকে ও কোনভাবেই দোষারোপ করতে চায়না কারন জন্ম মৃত্যু আর বিয়ে সবটাই সৃষ্টিকর্তার বিধান।

আরুর চোখে জল দেখে অনিকা খান একটু ঘাবড়ে গেলেন। আরুকে ঠিক করার জন্য উনি বেশ উচ্ছাসের সাথে বললেন
— আর জানিস কি হয়েছিলো! আরিশ যখন তোকে দেখতে গিয়েছিল তখন তুই ওর কোলে টয়লেট করে দিয়েছিলিস তারপর থেকে ও তোকে কোলেই নেয়নি।

আরু তবুও হাসলো না এই কথা শুনে, চাপা কান্না বুকের ভিতর কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আরু মাথা তুলে অনিকা খানকে জাপটে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো, অনিকা খানের গলা ধরে এল, অজান্তেই মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলল নাতো?

আরু অনিকা খানকে জড়িয়ে ধরে বলল
— আমি সত্যিই জানি না আপু বেঁচে থাকলে ওনাকে কতোটা ভালোবাসতেন আর ওনার ওপর আপুর পরিবর্তে আমি অনধিকার চর্চা করছি কিনা, তবে আমি ওনাকে খুব ভলোবাসি। ভীষনরকম। হয়তো উনি আমাকে যেমনটা বাসেন আমি কখনোই তেমনটা পারবো না তবে আমি ভালোবাসি। আমি নিজেকেও কখনো এতোটা ভালোবাসিনি হয়তো যতোটা ওনাকে বেসেছি। আমি কোন ভুল করিনি ফুপি। আর যাই হোক ভালোবাসা পাপ না।

অনিকা খান আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
— নাহ তোর কোন দোষ নেই মা, কারোরই কোন ভুল নেয়।আসলে ভুল হলো কি, আমাদের এক্সপেকটেশন এর, আমরা অনেক সময় এমন অনেক কিছুই ভেবে ফেলি যেগুলো আমাদের ভাবা উচিত নয়।

আরু ওনাকে ছেড়ে সরে এসে চোখ মুছে বলল
— তুমি ওনাকে এসব বলো না প্লিজ যে আমি ওনাকে নিয়ে এসব বলেছি।

উনি আরুর কপালে চুমু দিয়ে বললেন
— তুই না বললেও আরিশ বোঝে, আর এগুলো হলো আমাদের মা মেয়ের টপ সিকরেট।

আরু চোখ মুছতে মুছতে বলল
— তাই ই! তোমার ছেলে আবার আমাকে বলে সব জানতা, হাহ!

অনিকা খান বেশ উচ্চস্বরে হেসে বললেন
— তোরাও না। সারাদিন এতো ঝগড়া করিস কিন্তু নিজেরাই জানিস না যে একে অপরকে কতোটা ভালোবাসিস। তোর শ্বশুরবাবার মতো ভাগ্যিস আরিশ হয়নি না হলে নিঘ্ঘাত নিরামষ হতো ছেলেটা।

আরু একটা গগনবিদারী হাসি দিয়ে বলল
— তোমাদের কাহিনী বলো ফুপি।

–আচ্ছা বলছি আগে তুই খা।

— তুমি খাইয়ে দিলে খাবো।

— আচ্ছা হা কর।

— তুমি বলা স্টার্ট করো না হলে কিন্তু আমি খাবো না।

— আচ্ছা বলছি বলছি। পাগল মেয়ে একটা।

____

— কি করছো?

— সানার সাথে টিভি দেখছি। আপনি কি করছেন?

— বাবা আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে শুনি? আমি তো দেখলাম পূর্ব দিকেই, আমি কি তাহলে ভুল কিছু দেখলাম।

— ভুল না ভুল না ঠিক ই দেখেছেন বাট বারবার এই কথাটা বলার কারন কি হম হম হম?

— তুমি কি একটা কথা একবার বলতে পারো না? তিনবার বলা চায়! এলিয়েন কোথাকার।

— আপনি ডাইনোসর। সারাদিন ডাইনোসর এর মতো আমার দিকে তেড়ে আসেন।

পাশ থেকে সানা বিড়বিড় করে বলল
— বউ হো তো এইসি! ভয় ডর হীন এলিয়েন। ভাইয়াও পারে বাবা।

আরু সানার দিকে তাকিয়ে বলল
— তুই কি আমার নামে কিছু বলছি হমম?

আরিশ ফোনের ওপারে বলল
— কি আর বলবে, এলিয়েন ই বলেছে।

সানা মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো।

আরু ধমক দিয়ে বলল
— খামোশ, আপনারা দুই বোন ই আমার এনিমি নাম্বার ওয়ান। যাই হোক, আপনি তখন ওটা বললেন কেন?

— বলবো না বলছো? কোনদিন তো জিজ্ঞাসা করো না যে আপনি কি করছেন, আজকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করছো যে তাই আর কি।

আরু কিউট একটা স্মাইল দিয়ে বলল
— এটা ভালোবাসা, তাও বুঝেন না নাকি!

— এহেম এহেম, হাও লাকি আই এম। আমি কি সত্যিই সৌভাগ্যবান যে আমার বউ আমাকে ভালোবাসবে?

— হয়েছে হয়েছে। কাজের কথায় আসি, এতো রোমান্টিক কথা বলতে বলতে আমার জ্বিহ্বা টায়ার্ড হয়ে গেছে, আর মুখ টাও এনার্জিলেস হয়ে গেছে।

— ড্রামা কুইন।

আরুও বলে উঠলো
— নিম পাতার ফ্যাক্টরি।

— কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো আমাকে রাউন্ডে যেতে হবে।

— যেখানে খুশি যান বাট বাট বাট, বাসায় ফেরার সময় পেস্ট্রি আনতে ভুলবেন না, আর তার সাথে বিরিয়ানি ও এড হলো। শ্বশুরবাবা আজকে বাসায় আছে তাই আপনি আনবেন, না হলে শ্বশুরবাবাই এনে দিতো।

— এতখন এতো মিষ্টি মিষ্টি কথা না বলে এটা বললেই হতো যে বিরিয়ানি আর পেস্ট্রি খাবে। আমিও যে কেন ভাবতে যাই যে তুমি নরমাল ওয়াইফ দের মতো কিউট।

আরিশের এই কথা শুনে আরু চিৎকার দিয়ে বলল
— এই আমি আ্যাবনরমাল হ্যাঁ? আমাকে আ্যাবনরমাল বলা! আমি আনকিউট?

আরিশ চোখ খিঁচে ফোনটা কেটে দিলো।
— বউ তো নয় ফায়ার। আল্লাহ আরও ধৌর্য দাও, শক্তি দাও।

আরু ফোনটা কেটে পাশে তাকিয়ে দেখলো সানা বিড়বিড় কান চেপে ধরে আছে।

সানা বলল
— কখনো তো চিল্লাপাল্লা না করে কথা বল, কি সুন্দর দুজনেই রোমান্টিক হয়ে কথা বলছিলেস।

— আমি কি করবো উনি আমাকে এমন বললে।

সানা টিভির দিকে মন দিয়ে বলল
— ভাইয়া ভুল কিছু তো বলেনি।

আরু কুশনটা ছুড়ে সানার গায়ে ছুড়ে মারলো।

— শাশুড়ি আম্মু তুমিও কি তোমার ছেলে আর মেয়ের মতোই ডেভিল? বলো বলো! এই শাশুড়িআম্মু কোথায় তুমি?

#চলবে,,,