#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত
৪০.
— ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি ম্যাডাম?
আরুকে একপাশ ঘুরে থাকতে দেখে আরিশ বলে উঠলো।
আরু উত্তর দিলো না, কিছুটা রাগ করে আছে আরিশ এর ওপর কারন আজকে আরিশ অনেক লেট করে ফিরেছে। এতোটা লেট করবে আরিশ বলেনি। আরু উত্তর দিলো না। আরুর উত্তর না পেয়ে আরিশ বলল
— পেস্ট্রিটা তাহলে ফ্রিজে রেখে আসি খাবেই না যখন।
আরিশ এর কথা শুনে আরু হুড়মুড় করে তেড়ে উঠে বলল
— পস্ট্রি নিয়ে যাচ্ছেন কোথায় আগে বলুন এতো লেট করলেন কার পারমিশন নিয়ে। চাচা আপনাকে এতো রাতে বাসায় ঢুকতে দিলো কিভাবে? হাউ?
আরুর এমন চিৎকারী কন্ঠস্বর শুনে আরিশ বলল
— এতো রাতে গলা ছেড়ে চেঁচাচ্ছো কেন? সবাই জেগে যাবে তোমার এই বেসুরে আওয়াজ শুনে, সেটা চাও কি?
আরু রাগী চোখে তাকিয়ে বলল
— আমি বেসুরে তাহলে আপনি কি? আপনি তো কাক!
অবস্থা বেগতিক দেখে আরিশ আরুর হাতে পেস্ট্রিটা দিয়ে বলল
— এটা খাও তবুও মাঝরাতে আমার মাথা খেও না আরুপাখি।
আরু পেস্ট্রিটা নিয়ে বিছানার ওপর রেখে বলল
— হ্যাঁ হ্যাঁ এখন তো এমন বলবেন ই, এখন তো আমি দিনদিন পুরোনো হয়ে যাচ্ছি না! আগের থেকেও বেশি গোলুমোলু হয়ে গেছি তাই তো আপনার আর চোখে পড়ি না, এখন তো আর আগের মতো বেসুরে কন্ঠে কথা বললে তো আর ভালো লাগে না তাইনা? আমি মানুষটাই তো আপনার মাথাব্যাথা হয়ে গেছি তাইনা!
আরুর এমন অযৌক্তিক মনগড়া কথা শুনে আরিশ রেগে গেল, মৃদু স্বরে ধমক দিয়ে বলল
— এই মেয়ে কি যা তা বলছো সেই থেকে হ্যাঁ? আমি বলেছি যে আমি আর আগের মতো তোমাকে ভালোবাসি না?
আরু ঠোঁট উল্টে আরিশের দিকে তাকিয়ে থাকতেই আরিশ আরুর হাতটা কাছে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে বাচ্চাদের মতো আরুর কপালে হাত দিয়ে থামানোর চেষ্টা করলো। আরু ও আরিশ কে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।
— আচ্ছা আরুপাখি তুমি যে হুঠহাঠ করে এমন কথা গুলো বলো যেগুলো শুনলে আমি হার্ট হই, তোমার কি একবার ও কষ্ট লাগে না এসব বলতে?
আরু মুখ উঁচু করে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল
— লাবু😙।
আরিশ হেসে ফেলল, আরু আরিশের বুকে মাথা রেখে হাসতে লাগলো।
আরু আরিশ কে ছাড়িয়ে বিছানায় বসে পেস্ট্রিটা আরিশের দিকে বাড়িয়ে বলল
— নিন জলদি হা করুন।
— তুমি খাও।
— খাবেন কি খাবেন না?
ধমকের শুরে বলে উঠতেই আরিশ মুচকি হেসে এক বাইট নিয়ে বলল
— বাই দা ওয়ে এতো রেগে ছিলে কেন?
— কেন আবার আপনি ফিরতে লেট করেছিলেন তাই।
— আরে আমি তো তোমার রিপোর্ট গুলো আনতে গেছিলাম আর আসার পথে আমার এই ফ্রেন্ড আর তার ওয়াইফের সাথে দেখা তাই সেখানে একটু দেরি হয়ে গেল।
আরু মুখ নাড়তে নাড়তে সরু চোখে তাকিয়ে বলল
— ওই ফ্রেন্ডের ওয়াইফকে কি আমার থেকেও সুন্দর ও দেখতে হু? যদিও আমি জানি যে সে আমার থেকে বেশি সুন্দর কখনোই হতে পারবে না হু😏।
অরিশ বলল
— সে সুন্দর হবে কি করে তার তো আর তোমার মতো দুটো শিঙ, দুটো নাক, চারটে চোখ নেই। তাই সে সুন্দর আর হলো কই!
— এই জন্যই আপনাকে মি অভদ্র বলি, কখনো আমার প্রশংসা করেন না।
— এই জন্যই তোমাকে আমি ড্রামা কুইন বলি।
— আরিশের বাচ্চা😒
আরিশ ধমকের সুরে বলল
— আরুপাখি।
।।।।।
— দেখেন বেয়ান আমি চাইছি যে সানা আর আমাদের বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিতে, কতোদিন আর এভাবে একা একা থাকবো বলুন। তাছাড়া এভাবে অবৈধ ভাবে দুজনের এতোদিন ধরে মেলামেশা করাটাও সমাজের মানুষ বাকা চোখে দেখে।
আরাভের মায়ের এমন কথা শুনে অনিকা খান উৎসাহিত হয়ে বললেন
— আরে না না আপনি তো ঠিক কথায় বলেছেন। আর আপনি এ বিষয়ে কথা বলতে কোনরকম কোন দ্বিধাবোধ করবেন না, আপনার জায়গায় আমি থাকলে আমিও ঠিক এটাই বলতাম। আমরাও ওদের বিয়ে নিয়েই ভাবছিলাম আর কি।
অনিকা খানের এমন কথা শুনে আরু উপরের দিকে তাকালো, সানা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছে আর এদিকে আরাভ মিচকি হাসছে। আরু আর আরিশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অনিকা খানের কথা শেষ হতেই আরু বলল
— ফুপি তোমরা কথা বলো আমি জলখাবার নিয়ে আসি।
অনিকা খান বলে উঠলেন
— তোকে যেতে হবে না তুই এখানে বস, আর এতোখন ধরে একটানা দাঁড়িয়ে থাকাও ঠিক না।
আরু জেদ করেই বলল
— আমি আনছি তুমি বসো তো।
কথাটা বলে আরু কিচেনে গেল। এই বাড়িতে রান্না বান্না করার জন্য কোন কাজের বুয়া নেই কারন অনিকা খান বরাবরই ভীষন সংসারী রমনী। তিনি নিজের সংসার নিজের হাতেই সাজাতে ভলোবাসেন তাছাড়া ওনার হাতের রান্না ছাড়া আফজাল খানের দিন শুরু হয় না। অনিকা খান যেটাকে মাঝেমাঝে মজার ছলে — বউয়ের রান্না প্রেমী পুরুষ বলে ডাকেন।
আরু কিচেনে যেতেই আরিশ বলে উঠলো
— আমি আরুপাখিকে গিয়ে হেল্প করছি তোমরা কথা বলো।
অনিকা খান এবার যেন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
আরিশ কিচেনে ঢুকে দেখলো আরু কেবল এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, কি করে কি করবে তার হতামাথা পাচ্ছেনা। আরিশ গলা পরিষ্কার করে বলল
— এহেম এহেম কি খুঁজছেন মিসেস খান?
আরু ঠোঁট কামড়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল
— বুঝতে পরছিনা কি বানাবো। আচ্ছা কি বানানো যায় বলুন তো।
আরিশ আরুর কাছে গিয়ে আরুর ঠোঁটটাকে হাত দিয়ে ছাড়িয়ে বলল
— এই বদ অভ্যাসটা কবে শিখলে তুমি?
আরু অবাক হয়ে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল
— আচ্ছা আমাকে এমন ঠোঁট কামড়ানো অবস্থায় দেখে আপনার মাঝে কোন অনুভূতি হয়নি?
আরিশ ভ্রু কুঁচকে ধমক দিয়ে বলল
— হোয়াট! কি বলছো এসব?
আরু না বোঝার ভান করে বলল
— হ্যাঁ ঠিক ই তো বললাম, আমি একটা মুভিতে দেখেছিলাম যে নায়িকা এমন করলে নায়ক নাকি তখন নায়িকাকে দেখে পাগলই হয়ে যায়। আপনি হাও নিরামিষ।
কথাটা বলে আরুর নুনের কৌটতে হাত দিতেই আরিশ ধমক দিয়ে উঠলো। আরু চমকে উঠলো ধমক শুনে, বুকে তিনবার ফু দিয়ে বলল
— কি হলো! এভাবে হুঠহাঠ ধমক দেন কেন বলুন তো।
আরিশ হাত থেকে লবনের কৌটটা কেড়ে নিয়ে রেখে দিয়ে বলল
— ওটা লবনের কৌট নট ময়দা। আর ওসব মুভি একদম দেখবেনা বলে রাখলাম। আর যদি এইসব আজাইরা মুভি দেখো তো খবর আছে। যতসব আজগুবি ভাবনা।
আরু ধমক শুনে থেমে গেল কোন কথা বাড়ানো না। হঠাৎ করে বলে উঠলো
— আজকে আমি রান্না করবো কি করবো কি করবো। হ্যাঁ পোলাও রান্না করবো আমি।
— ব্রেকফাস্টে পোলাও কে খাই ডাফার। আর পোলাও রান্না করতে কি কি লাগে তুমি জানো?
আরু কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে বলল
— ঠিক আছে ঠিক আছে, ওভাবে বলার কিছু নেই আমিও জানি। ময়দা লাগে?
আরিশ ভ্রু কু্চকে বলল
— আ্য? পোলাও এ ময়দা লাগে?
আরু থতমত খেয়ে বলল
— পাগল হলেন নাকি, পোলাও এ ময়দা লাগবে কেন, পরোটা বানাতে ময়দা লাগে।
আরিশ বিড়বিড় করে বলল
— ক্লাস টু এর বাচ্চাও যানে যে ময়দা লাগে। আমিও পাগল আছি যে ওকে রান্নার কথা জিজ্ঞাসা করছি।
আরিশ আরুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল
— তোমাকে এতো কিছু করতে হবে না আমি করে দিচ্ছি।
আরু জোরালো গলায় বলল
— না তা হবে না, আমি রান্না করবো না হলে আন্টি যদি বলেন যে এ কেমন বউ যে রান্না পারে না।
আরিশ ময়দা ঢালতে ঢালতে বলল
— কাজ করানোর জন্য বিয়ে করলে কাজের বুয়াকে বিয়ে করতাম, যেহেতু তোমাকে বিয়ে করেছি তারমানে কাজ করানোর জন্য করিনি নিশ্চয়ই।
আরু ভ্রু নাচিয়ে বলল
— তাহলে কিসের জন্য বিয়ে করেছেন বলুন বলুন।
আরিশ আরুর মাথায় টোকা মেরে বলল
— ওসব তোমার মাথায় ঢুকবেনা।
— নাহ আমি আজকে না শুনে ছাড়াও না যে আপনি আমাকে কেন বিয়ে করছেন। বলুন।
আরিশ চোখ ছোট করে বলল
— মন দিয়ে রান্নাটা অন্তত করতে দাও আরুপাখি। আচ্ছা বেশ, তুমি তাহলে বলো যে তুমি আমাকে কেন বিয়ে করেছো।
আরু বাকা চোখে তাকিয়ে বলল
— আমি আপনাকে আবার কখন বিয়ে করলাম। আপনিই তো রাতের বেলায় কাজী ঢেকে আমাকে ধমক দিয়ে কবুল বলতে বললেন। আর আপনি তো আমার জন্ম গ্ৰহনের পর থেকেই আমাকে বিয়ে করার কথা ভাবছেন তাহলে আমি করলাম কই?
— জোর করে করেছি কিন্তু তোমার অমতে তো আর করিনি। যাই হোক মাঝেমাঝে নিজেকেই বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ডাফার মনে হয় কারন তোমাকে আমি এমন প্রশ্ন করি।
আরু মুচকি হাসলো।
— ইউ আর রাইট।
আরিশ চুপ করে রইলো। হঠাৎ বলে উঠলো
— আমি সব করে দিচ্ছি আর রান্না হয়ে গেলে আন্টিকে বলবে তুমি করেছো। বুঝলে?
— একদম না, আপনি করেছেন আর ক্রেডিট আমি নেব কেন। আমি তো কফি ছাড়া আর কিছু তেমন পারি না।
— আমি বলেছি তাই বলবে। নো মোর ওয়ার্ডস।
আরু আচমকাই আরিশের গাল ধরে টেনে বলল
— গুলুগুলু।
আরিশ অবাক হয়ে বলল
— এটা আবার কি?
— ও আপনি বুঝবেন না।
আরিশ নিজের কাজে মন দিলো। আরু চেয়ার টেনে আরিশের কাছে বসলো। আরিশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমের ঘোরে হেলে পড়লো বলতে পারে না।
আরিশ আরুর দিকে তাকিয়ে দেখলো আরু ঘুমিয়ে পড়েছে। আরিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
— মিস টুইটুই হ্যাভ আ আধা ঘন্টার গুড ড্রিমস।
#চলবে,,,,
#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি02
#সুরাইয়া_আয়াত
৪১.
— আগে চোখেমুখে জল দাও তারপর আন্টির সামনে যাবে।
আরু গালে হাত দিয়ে ঘুমন্ত সুরে প্রশ্ন করলো
— কেন কি হয়েছে?
আরিশ আরুর চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিয়ে বলল
–এই যে তোমাকে এখনো যে ঘুমন্ত লাগছে আর এভাবে সমনে গেলে ওরা এমনিই ভাববে যে তুমি ঘুমিয়ে ছিলে।
আরু বেশ কিছুখন আরিশের দিকে তাকালো তারপর কিছু না বলে আচমকাই আরিশ কে জড়িয়ে ধরে বলল
— আপনি এতোটা কিউট কেন? পুরো টুইটুই লাগে আপনাকে।
কথাটা বলতেই আরিশ ঠোঁট জোঁড়া প্রসারিত করে বলল
— তোমার ঘুমের ঘোরে এখনো কাটেনি, অনেকখন হয়ে গেছে কিচেনে এসেছো আম্মু একবার জরুরি তলব করে গেছে।
আরু আরিশ কে ছেড়ে বলল
— ওহহ আচ্ছা।
আরিশ আরুর হাতটা ধরে বেসিনের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল
— নাও জল দাও।
আরু মাথা ঝাঁকালো যার অর্থ আরু কাজটা করবে না।
আরিশ জল নিয়ে আরুর মুখে ঝাপটা দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলল
— আপনি নিজেই বিশ্ব ঘাড়ত্যাড়া আবার আমাকে বলেন।
আরু চোখ খুলে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল
— আপনি তো নিমপাতার ফ্যাক্টরি, মি অভদ্র, ডেভিল, আর আর আর কি কি হতে পারেন আপনি? আপনার আরও কিছু নাম প্রয়োজন।
আরিশ আরুর মুখটা এক হত দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে বলল
— কেন যে আমি তোমাকে এতো বকবক করার সুযোগ দিই, হাও স্টুপিড আই এম। কথা না বলে চলো।
আরু হাতটা ছাড়িয়ে বলল
— আপনি স্টুপিড সেটা আমিও জানি তাই বলে বারবার এভাবে নিজেকে অপমান করবেন সেটা ঠিক না, আমারও তো শুনতে খারাপ লাগে তাইনা যে আমার জামাই সে নিজেকেই স্টুপিড বলে।
আরিশ রেগে গিয়ে ধমক দিয়ে বলল
— আরুপাখি বাড়াবাড়ি হচ্ছে এবার।
আরু এবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো তারপর দ্রুত আরিশ কে কিছু বুঝতে না দিয়ে আরিশের গালে একটা চুমু দিয়ে বলল
— আপনার থেকে এতো টুইটুই জামাই আমি আজ অবধি দেখিনাই। ভালোবাসি নট।
আরিশের রাগ পানি পানি। দুজন মিলে খাবার নিয়ে গেল টেবিলে।
আরুকে খাবার আনতে দেখে অনিকা খান এগিয়ে গেলেন খাবার গুলো আনলো।
আরিশ কিচেন থেকে রুমে গেল যাতে আরাভের মায়ের মনে হয় যে সবটা আরু করেছে।
আরিশ এসে টেবিলে বসলো। সানাও টেবিলে বসে আছে চুপচাপ, গাল দুটো গোলাপী আভা ধারন করেছে আর বেশ লাজুক চেহারা।
আরু গিয়ে আরিশের পাশে বসলো। আরাভ আর আরিশ পাশাপাশি বসে আছে।
অনিকা খান সবার প্লেটে প্লেটে খাবার দিলেন। আরাভ এক লোকটা মুখে খাবার তুলে আরিশকে বেশ জোরেই বলল
— দোস্ত ভাবী এতো ভালো রান্না করে বলিসনি তো।
আরিশ মুচকি হাসলো উত্তর দিলো না। আরাভের কথা শেষ হতেই আরাভের মা বললেন
— সত্যিই আরু মা অনেক ভালো রান্না করেছে। এতো ভালো রান্না কোথা থেকে শিখলি মা।
অনিকা খান আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই আরু ঠোঁটে হাসি ধরে রেখে বলল
— আমি তো কিছু রান্না করিনইনি আন্টি। যা করেছে সে তো আমার জামাই করেছে। রান্নার কোন ক্রেডিটই আমার না সবই ওনার।
আরিশ অরুর দিকে তাকালো বেশ রাগী চোখে। চোখের ইশারায় বোঝাতে চাইলো — এটা বলার দরকার ছিলো না।
আরু আরিশের সমস্ত চাহনি উপেক্ষা করে বলল
— আসলে আন্টি আমি কিছুই পারিনা, ওনার কফি ছাড়া। উনি হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরলে আমাকেই তো কফি বানিয়ে দিতে হয় তাই ওটা একটু আধটু শিখে রেখেছি। আর সত্যি বলতে আমার অনেক ইচ্ছা করে রান্না শেখার, আর পাঁচ জনের মতো রান্নায় পটু হয়ে সবাইকে রেধে খাওয়ানোর কিন্তু আমার শাশুড়িআম্মা আর আমার হিটলার জামাইয়ের জন্য সেটা হয়ে ওঠে না। একবার পোলাও রাখতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলেছিলাম তারপর থেকে কিচেন আমার জন্য হনটেড প্লেস বলে মনে করেন এই দুজন।
আরুর কথা শুনে আরাভের মা প্রশান্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন
— আমি মনে করি তোমার শাশুড়িআম্মু আর আরিশ একদম ঠিক কাজ ই করেছে। যখন আরাভের বাবা বেঁচে ছিলেন তখন তিনি আমাকে কাজ করতে বারন করতেন কিন্তু যৌথ পরিবার তো তই অল্প অল্প কাজ করতে হতো। তারপর উনি মারা গেলে তখন সব কাজ আমাকেই করতে হতো, অনেক কষ্ট করেছি আমি দুই ছেলে মেয়েকে মানুষ করতে গিয়ে। আমি আমার মেয়েকে এখনো কোন কাজ করতে দিই না তাছাড়া ও এমনিতেও এখনও অনেকটাই ছোট। আমি অসুস্থ হওয়ার পর আরাভের কথায় বাসায় এক বুয়া আসেন তিনিই সব কাজ করে দেন। সানা ওই বাসায় গেলে ওকে ইনশাআল্লাহ কিছু কাজ করতে দিব না যতদিন আমি বেঁচে আছি।
অনিকা খান প্রশান্তির সাথে বললেন
— আরুকে আমি সানার থেকে কোন অংশে কম মনে করি না। আমার সানা কে আমি যেমনটা ভালোবাসি ওকেও ঠিক তেমনই ভালোবাসি, আমার ভাতিজা বলে নিজের মেয়ের সাথে ওর পার্থক্য করি না। আমি যতদিন বেঁচে আছি ওকে কিছুই করতে হবে না, আরিশও ওকে কখনো কাজের জন্য জুলুম করবে না আশাকরি।
আরু উঠে দাঁড়িয়ে অনিকা খানকে ওর পাশের চেয়ারে বসিয়ে বলল
— ফুপি তুমিও বসো।
অনিকা খান মানা করার সুরে আরুর কথায় নাকচ করতে গেলেই আরাভ বলল
— আন্টি আপনিও বসেন আর যাই হোক আমরা একটা পরিবার।
অনিকা খান ও বসলেন একই সাথে। আরিশ আরুর বাম হাতটা ওর হাতের সাথে মুঠিবদ্ধ করে আরুর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল
— তা মিস টুইটুই আপনার জামাই যে এতো ভালো রান্না করে বলেননি তো।
আরু আরিশের দিক থাকিয়ে বলল
— কার জামাই দেখতে হবে তো।
আরিশ মুচকি হেসে বলল
— তাহলে তো আপনার জামাই আরও বেশ কয়েকটা বউ ডিজার্ভ করে। তাইনা?
আরু টেবিল থেকে কাটা চামচ নিয়ে আরিশের দিকে ধরে বিড়বিড় করলো
— আর চামচ আপনার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিবো একদম। চুপ করে খান, খাওয়ার সময় এতো কথা বলেন কেন?
আরিশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
।।।।
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে এলো। সানা আরু আর অনিকা খান তিনজন মিলে হাটতে বেরিয়েছেন বাইরে। অনেক দিন হলো একসাথে সবার কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়না তাই অনিকা খানই বলে উঠলেন আজকে সবাই মিলে বাইরে যাওয়ার কথা।
হাটতে হাটতে আরু বলে উঠলো
— ফুপি সানার বিয়ের জন্য অনেক শপিং করা লাগবে। আমি কিন্তু এবার অনেক শপিং করবো। লাইক অনেক শপিং। জামাইয়ের টাকা নষ্ট করা ইজ ইম্পরট্যান্ট।
আরুর কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো।
আরও কিছুটা হেটে গিয়ে অনিকা খান বললেন
— তোরা ফুচকা খাবি? অনেক দিন খাওয়া হয় না, সেই ভার্সিটি লাইফে কতো ফুচকা খেয়েছি বন্ধুদের সাথে তারপর আমার সব ফ্রেন্ডদের কে তোর ফুপা আগে ফুচকা ট্রিট দিয়েছেন অনেকবার।
সানা মুচকি হেসে বলল
— তোমাদের তো ভার্সিটি লইফের প্রেম তাইনা আম্মু।
— নাহ, কলেজ লাইফের।
হঠাৎ আরু বলে উঠলো
— হঠাৎ ফুচকা শাশুড়িআম্মু? গুড নিউজ নাকি হমম হমম?
অনিকা খান আরুকে বকা দিয়ে বলল
— আরু মার খাবি এবার। ফাজিল কোথাকার।
ওরা তিনজন ফুচকার দোকানে গেল, সবাই এক এক প্লেট করে ফুচকা নিয়ে গাছের নীচের বেঞ্চে বসলো। আজ অনেক দিন পর অনিকা খানকে এতো প্রানচ্ছল মনে হচ্ছে আরুর।
ওদের খাওয়ার মাঝে হঠাৎ কেও একজন সানকে ডেকে উঠতেই সানা যেন উঠে গেল। আরু ছেলেটাকে সম্ভবত চেনে কারন সেই ছেলেটা সানার থেকে তিন ইয়ার সিনিয়র আর আরুর ও।
অনিকা খানকে আজ অনেকদিন পর এতো প্রাণোচ্ছল হতে দেখল আরু। আর ওর ফুচকার প্লেট থেকে একটা ফুচকা ওনার মুখের সামনে ধরে বলল
— ফুপি আ করো।
উনি আরু কে বাধা দিয়ে বলল
— নাহ তুই খা। তোর এ এখন বেশি বেশি এবং খেতে মন চায় তাইনা। তুই আ কর আমি তোকে দিই।
আরু ধমকের সাথে বলল
— তুমি আ করবে কি না।
অনিকা খান হো হো করে হেসে বললেন
— ওরে আমার মা এলেন যে।
আরু ওনাকে খাইয়ে দিলেন।
হঠাৎ আরু অনিকা খানকে জিজ্ঞাসা করলো
— ফুপি যে টেস্ট গুলো করিয়েছিলাম রিপোর্ট ভালো আসছে, ডক্টর বলেছেন যে ঠিক মতো চলাফেরা করতে যেটা তো আমার দ্বারা হয় না তুমি ভালো করে যানো। তাই তোমার ছেলেকে তুমি বলে দিবে যে এখন যেন আমাকে যেন আর সে বেশি বকাঝকা না করে।
অনিকা খান হাসলেন। হঠাৎ করে ছেলেটা আর সানা ওদের দিকে এগিয়ে এলো। ছেলেটা অনিকা খানকে সালাম দিয়ে আরুকে বললেন
— কেমন আছো?
হঠাৎ অরুকে এভাবে বলায় আরু বেশ হকচকিয়ে বলল
— আলহামদুলিল্লাহ ভালো আপনি।
— আমিও আছি আলহামদুলিল্লাহ। বাই দা ওয়ে তুমি আরু সানার কাজিন না? মানে ওর মামার মেয়ে?
আরু ভ্রু কুঁচকে সানার দিকে তাকিয়ে বলল
— সানা কি শুধু কাহিনী বলেছে নাকি অন্য কিছুও বলেছে?
ছেলেটা বেশ অবাক হয়ে বলল
— তুমি তো ওর কাজিনই তাছাড়া আর কি বলবে, ভাবী তো আর নও। যাই হোক, আমি আহানাফ, সানার থেকে তিন ইয়ারের সিনিয়র। তোমাদের ক্যাম্পাসে যাবো পরশু। তুমি যদি সবটা দেখিয়ে দিতে ভালো হতো।
অনিকা খান মুচকি হাসছেন তবে প্রকাশ করছেন না কিছু, আরুর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কতোটা দোটানায় আছে। আরু বলে উঠলো
— ঠিক আছে নো প্রবলেম।
ছেলেটা হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল
— আন্টি, সানা আর এই যে মিস সানার কাজিন বাই, পরে দেখা হবে আবার।
কথাটা বলে আহানাফ চলে গেল। আরু সানার দিকে বাকা চোখে তাকিয়ে বলল
— তুই ওনাকে বলিস নাই যে আমি তোর ভাবী? আর আমার একটা হিটলার জামাই আছে।
সানা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল
— আমি কেন বলবো হু? আর বললেও কি আহানাফ ভাইয়া বিশ্বাস করতো নাকি? তোকে দেখে কখনোই বোঝা যায় না যে তুই বিয়াত্তা মহিলা।
— তই বলে তুই বলবিনা?
সানা হেসে উঠলো। আরু রেগে বলল
— এবার হাসছিস কেন?
— আরে আহনাফ ভাইয়া মজা করছিলেন, উনি জানেন যে তুই আমার ভাবী। আর তোর ওই হিটলার জামাইকে কে না চেনে। ভাইয়া দের একবার ফুটবল ম্যাচ এর কম্পিটিশন ছিল আমাদের কলেজে তারপর থেকে ভাইয়াকে কে না চিনে। তাছাড়া আরাভ ভাইয়া আর আরিশ ভাইয়া বন্ধু সে সূত্রেও সবাই চেনে।
আরু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
— একটা হ্যান্ডসেট জামাই থাকলেও সমস্যা আর না থাকলেও সমস্যা?
অনিকা খান বললেন
— আচ্ছা সে সব পরে দেখা যাবে। সামনে আর একটু ঘুরে তারপর বাসায় ফিরবো তাই তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ কর দুজনেই।
।।।
বাসায় গিয়ে দেখলো আরিশ ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছে তা কার্টুন জতীয় তবে দূর থেকে তা দেখা যাচ্ছে না। আরু গুনগুন করে গেয়ে উঠলো
— মেরে সামনে ওয়ালি কলেজ মে এক চান্দ কা টুকরা রেহতা হে।
পাশ থেকে হঠাৎ ধম করে ল্যাপটপ টা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেয়ে আরু বিড়বিড় করলো
— এবার দেখেন আপনাকে কিভাবে রাগায়, আমাকে বলেন যে আপনি আরও বউ ডিজার্ভ করেন হু। বেটা অভদ্র!
#চলবে,,