কারণে অকারণে ভালোবাসি02 পর্ব-৪৬+৪৭

0
876

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি02
#সুরাইয়া_আয়াত

৪৬.

‘আপনারা আজকেও না আসলে মি অভদ্র কিন্তু আপনাকে যা নয় তাই কথা শোনাতেন। আপনি এসেছেন আপনার ভাগ্য ঢের ভালো।

আরুর কথাটা শুনে আরাভ মৃদু হাসলো। স্বল্প লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
‘না এসে কি করবো বলুন তো ভাবী। আপনার ননদিনী যে তার ভাবী আর মা কে চোখে হারায় সেটা তো আর জানতাম না। হুদায় আমার রোম্যান্স এর চক্করে সে আপনাদেরকে আরও বেশি মিস করেছে।

আরাভের কথাতে আরু প্রানখোলা হাসি দিল। আরাভ ভারী মজার মানুষ তা আরু প্রথম দিন রেস্টুরেন্ট এর আলাপে বুঝে গিয়েছিল। আরাভের কথাতে সানা লজ্জা পেল বেশ। আরাভকে চোখ রাঙিয়ে বলল,
‘ আপনি এতো ঠোঁটকাটা মানুষ কেন বলুন তো। ওটা আমার ভাবী হয় সেটা ভুলে গেছেন। ‘

আরু হাসি থামিয়ে বলল,
‘ থাক আর লজ্জা পেতে হয় না। বিয়ের প্রথম প্রথম একটু আধটু রোমান্স তো চলবেই।’

সানা এবার আরুর কথাতেও বেশ লজ্জা পেয়ে গেল। লজ্জা ভাব কাটাতে আরুকে বলল,
‘ওসব এখন ছাড়, আগে একটু তোকে আর আমার ভাইপোকে জড়িয়ে ধরি। তোদেরকে অনেক মিস করেছি।’

আরাভ নির্বিকারে একরোখা হেসে বলল,
‘তোমরা কথা বলো আমি আসছি। আরিশ একবার ডেকেছিল, না গেলে আর রক্ষে নেই। ‘

আরাভ চলে যেতেই সানা আরুকে জড়িয়ে ধরেই বলল,
‘হ্যাঁ রে মেয়ে হলে না হয় তোর মতোই গোল গোলু পিংকি পিংকি একটা টুইটুই প্রিন্সেস হতো কিন্তু আর্শিয়ান কার মতো হবে? ‘

সানার কথাতে আরু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘আমার ছেলে যেন তার বাবার মতো এমন খাড়ুস আর নিমপাতার ফ্যাক্টরি না হয়। সারাদিন এতো চিল্লাপাল্লা আর ধমকানি দেয় যে আমার কলিজা কাঁপে। ‘

সানা হেসে উঠলো। আরুর গালে হাত রেখে বলল,
‘ভাইয়া ধমক দিক আর যাই করুক, তুই নিজেকে না যতোটা ভালোবাসিস, ভাইয়া তার থেকেও তোকে বেশি ভালোবাসা। তোর ভাষায় যাকে বলে একেবারে উইইইমা টুইটুই ওয়ালা ভালোবাসা। ‘

আরু বাকা চোখে তাকিয়ে বলল,
‘থাক থাক হয়েছে। নিজের ভাইয়ের নামে এতো গুনগান করার কোন দরকার নেই। উনি হলেন জাতীয় অভদ্র।’

সানা আরুর গালদুটো টেনে দিয়ে বলল,
‘তোকে কিন্তু আগেও থেকেও আরও বেশি মায়াবতী লাগছে আরু। গালদুটো কেমন আগের থেকেও গোলগাল হয়ে গেছে আর বেশ গোলুমোলু মাদার ও হয়ে গেছিস। ‘

আরু মুচকি হেসে বলল,
‘ তুমহারা টাইম ভি আয়েগা ননদিনী, তাব তো আরও মজা আয়েগা। ‘

সানা লজ্জায় মুখ চেপে হাসতে লাগলো।

।।।।

আরু রুমে বসে বিছানায় হেলান দিয়ে পা দোলাচ্ছে আর মাঝেমাঝে পেটের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলছে। হয়তো আর্শিয়ানের কাছে আরিশকে নিয়ে অভিযোগ করছে আর এটা বলছে যে সে যেন একদম তার বাবার মতো ডেভিল না হয়।
আরিশ ওয়াশরুম থেকে টাওয়াল নিয়ে বেরিয়ে এলো। মাথা থেকে বিন্দু বিন্দু জল টপটপ করে ফ্লোরে পড়ছে। উন্মুক্ত শরীরে জলবিন্দু গুলো চকচক করছে আর অদ্ভুত এক সুঘ্রাণ ভেসে আসছে আরিশের শরীর থেকে। আরিশকে এভাবে এক পলক দেখে আরু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে বোধ হয় নিজের জামাইকে নিজেই নজর দিচ্ছে। এই প্রথম আরিশকে এমন ভাবে দেখছে আরু। আরুর শরীরে হরমোনের ক্রিয়া পতিক্রিয়া পরিবর্তন হচ্ছে। আরু নিজের ওড়নাটা আঁকড়ে ধরলো। আরিশ আরুকে এমন অস্বাভাবিক ভাবে লক্ষ করে মৃদু স্বরে ডেকে উঠলো,
‘ আরুপাখি! তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?

আরু ওপর দিকেই তাকিয়ে বলল,
‘নাহ, আই এম ওকে।’

আরিশ কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো,
‘ ওদিকে তাকিয়ে কি দেখছো? ‘

আরু ওয়াড্রবের দিকে হাত দেখিয়ে বলল,
‘ওখানে দেখুন একটা ব্লু টি শার্ট আছে ওটা পরে নিন। ‘

আরিশ আরুর কথার অমান্য করলো না। আরুর দিকে ভ্রু কুঁচকিয়ে তাকিয়ে ওয়াড্রবের সামনে গিয়ে আবার থেমে প্রশ্ন করলো,
‘ এই আরুপাখি। আরু ইউ ওকে? ‘

আরু মাথা নাড়ালো বিক্ষিপ্তভাবে। আরিশ শার্ট টা এনে বিছানায় রেখে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বডি স্প্রে দিতেই আরু বেশ জোরেই বলে উঠলো,
‘ওটা দিচ্ছেন কেন আবার? আমাকে কি আজ উন্মাদ ই করে দেবেন? ‘

আরিশ সামান্য একটু দিয়েছিল তবে আরও একটু দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আরুর কথা শুনে আর দিল না। আরুর এমন ব্যাবহারের সাথে আরিশ পরিচিত নয় কারন রোজ রোজ তো আরু আর আরিশের এমন রুপ দেখে না তাই হয়তো। আরু এখন অন্যদিকে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে আছে। আরিশ টি শার্ট টা না পরেই হঠাৎ আরুর কাছে গিয়ে আচমকা বসতেই আরু বেশ চমকে উঠল। আরুর এমন চমকানিতে আরিশ দোঁয়া দরুদ পড়ে আরুর মাথায় ফু দিয়ে বলল,
‘ কি হয়েছে তোমার বলোতো? এমন অদ্ভুত আচরন তো তুমি করো না।’

আরু আরিশের ভিজে থাকা চুল আর সমগ্ৰ উন্মুক্ত শরীরের দিকে একবার চেয়ে বেশ থতমত খেয়ে বলল,
‘আপনাকে না টি শার্ট পরতে বললাম। আপনি পরেননি কেন?’

আরিশ এবার ওর ঠান্ডা হাত আরুর গালে রেখে বলল,
‘ কোন কারনে ভয় পেয়েছো? ‘

আরিশ আরুর শরীরের সাথে লেপ্টে আছে প্রায়। আরিশের প্রতি আরুর এক আসক্তি গড়ে উঠছে। আরু আরিশের প্রত্যেক টা অঙ্গভঙ্গি লক্ষ করছে। আরিশের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আরিশের বলা প্রত্যেক টা শব্দকে অনুভব করছে। হঠাৎ আরু আরিশের গালে হাত রাখতেই আরিশ অবাক হলো। আরিশ মৃদু স্বরে ডাকলো,
‘আরুপাখি।’

আরু চমকালো না, আরিশের এক ঘোরের মধ্যে যেন ও আটকা পড়েছে আষ্টেপৃষ্ঠে। আরু আরিশের গালে হাত রেখে নিজেই আরিলের ঠোঁটের দিকে এগিয়ে গেল। এই প্রথম আরিশ পাজেল্ড হয়ে গেল যেন আরুর এমন কাজে। হতবুদ্ধি লাগছে নিজেকে। আরিশ চুপ হয়ে গেল। আজ সেও দেখবে আরু কতোদূর এগোতে পারে। আরু ধীরে ধীরে আরিশের ঠোঁটের দিকে এগোতে লাগলো। আরিশ অনুভব করলো যে আরু্র শ্বাস প্রশ্বাস গাঢ় হচ্ছে। আরিশ মৃদু হাসলো। দুজনের মাঝের দূরত্ব নুন্যতম। আরিশের ঠোঁটে আরু ঠোঁট স্পর্শ করতে গেলেই দেখলো আরিশ মৃদু হাসছে। আরু হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আরিশকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে এসে শুকনো ঢোক গিললো। লজ্জায় মুখ দিয়ে কথা বার হচ্ছে না। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,
‘এটা আমি কি করছিলাম।’

আরুর বিড়বিড়ানি আরিশ শুনতে পেয়ে আরিশ মুচকি হেসে সরে গেল সেখান থেকে। গলা পরিষ্কার করে বলল,
‘ ওটা আমিই ছিলাম অন্য কেও না। নিজের জামাইকে লিপ কিস করতে গেলে এতো লজ্জা পাওয়ার দরকার নেই। আমাকে তো জানো যে আমি কতোটা নির্লজ্জ আই মিন অভদ্র। ‘

আরুর নিজেকে ফাকা ফাকা লাগছে যেন। বিছানা থেকে ঝটপট নেমে গিয়ে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
‘আপনি আসুন আমি নীচে অপেক্ষা করছি।’

আরু আর বিন্দুমাত্র দেরি করলো না, রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরিশ আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো। বেশ অনেকটা ধরে নিজের দিকে তাকিয়ে রইলো।
‘মেয়েটা এতো আন রোমান্টিক কেন। অন্য সময় তো আমাকে সব করতে হয়, একদিন যেই এক পা সে নিজে থেকে এগোলো আবার পিছায়েও গেল। ধ্যাত। এই নো মোর ওয়ার্ডস এর চক্করে লাইফটা নো মোর রোমান্স হয়ে গেল। ‘

কথাটা বলে আরিশ নিজেই হেসে উঠলো,
‘মেয়েটার সাথে থাকতে থাকতে আমিও যে কতো আজগুবি ভাবনা ভাবি আল্লাহ ভালো জানে। ‘

আরু নীচে গিয়ে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে রইলো। ভাবতে লাগলো যে ও কি কি করছিলো। আর একটু হলেই। ইশ লজ্জা। আর ভাবতে পারছে না আরু। আরুকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সানা বলল,
‘কি রে কি ভাবছিস? আর ভাইয়া কই? ‘

আরু থতমত খেল। ঘাবড়ে উত্তর দিল,
‘উউউ উনি রেডি হচ্ছেন। গোসল করছিলেন তাই লেট হলো। ‘

সানা আরুকে লজ্জা দিতে বলল
‘সন্ধ্যা হতে না হতেই গোসল। ‘

আরু হাত দিয়ে গোপনে সানার হাতে চিমটি দিয়ে বলল,
‘আরাভ ভাইয়া আছেন। ‘

সানা ও বিড়বিড় করে বলল,
‘ তুমিও যখন আমাদের বলো আমারও তখন এমন লজ্জা লাগে। এভার বোঝ চান্দু। ‘

আরু ঠোঁট উল্টে কপাল চাপড়ানো ভঙ্গি করলো। আরু মাথা তুলতেই দেখলো আরিশ বেরিয়ে আসছে। হাতে একটা লেদারের ওয়াচ যেটা আরুই আরিশকে গিফট করেছিল আরিশের একুশতম জন্মদিনে। খুব ক্যাজুয়াল একটা লুক। আরু নিজের মাথায় চাপট দিলো। বিড়বিড় করে বলল,
‘ এই লোকটা কি আমাকে আজকে শান্তি তে বাঁ’চ’তে দিবে না। আজকে কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে আমার সাথে। উফফ। ‘

আরিশ একটু দম ছাড়লো। বোঝায় যাচ্ছে যে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত গতিতে নেমেছে। ওদের কাছে এসে বলল,
‘তোরা রেডি?’

আরাভ ড্রাইভিং সিটে বসে বলল,
‘হমম একদম। ‘

আরিশ বলল,
‘আমি ড্রাইভ করি। ‘

সানা মাথা নড়িয়ে বলল,
‘একদম না। তুই আর আরু আজকে পিছনে বসবি আর রোমান্স করবি। ‘

আরু অপ্রস্তুত হলো ভীষন। ঠোঁটটা জিভ দিয়ে ভিজিয়ে বলল,
‘সানা আমি আর তুই পিছনে বসি না হয়। দুজনে গল্প করবো। ‘

আরাভ নাছোড়বান্দা হয়ে বলল,
‘ একদম না ভাবী। আমার বউ আমার পাশে। ‘

আরিশ আরুর দিকে স্বাভাবিক ভাবে তাকাল তবে আরিশের দৃষ্টি আজ মুগ্ধ। আরিশ আরুর লাজুক মুখের দিকে চেয়ে রইলো। মেয়েটার সমস্ত শরীরে অপস্তুত ভঙ্গিতে ছাওয়া। আরু আর কথা না বাড়িয়ে পিছনে উঠলো। আরিশ অপরপাশ থেকে আরুর পাশে বসলো। আরিশ উঠতেই আরু সরে গেল। লজ্জায় আরুর মাঝে এক জড়তা কাজ করতে লাগল। আরাভ গাড়ি স্টার্ট দিল। গান বাজতে লাগলো,
‘ভালো বাসবো বাসবো রে বন্ধু তোমায় যতনে।
আমার মনের ঘরে চান্দের আলো চুইয়া চুইয়া পড়ে। ‘

আরিশ দেখলো আরু অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আরিশ আরুর দিকে সরে যেতেই আরু কেপে উঠলো। আর একটু সরে গেল। আরিশ পুনরায় সরে গেল। আরু ও আবার সরে যেতেই আরিশ হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
‘আমার কাছ থেকে তোমার নিস্তার নেই আরুপাখি। ‘

আরু কাঁপা কন্ঠে বলল,
‘মানে? ‘

আরিশ ওর বুকে আরুর মাথা চেপে ধরে বলল,
‘ রিল্যাক্স। এতো জোরে তোমার হার্টবিট চললে তো আমিই হার্ট অ্যাটাক করে যাবো। ‘

আরু আরিশের শার্টের গলার অংশটা খামচে মুঠো করে ধরলো। আরিশ মুচকি হেসে আরুর মাথায় হাত বোলাতে লাগলো।

#চলবে,,,

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

৪৭.

চলন্ত গাড়িটার গতি ধীর হতে লাগলো। গাড়িটা এসে একটা লেকের ধারে থামালো আরাভ। সানা পিছন দিকে তাকিয়ে দেখে আরু আরিশের বুকে মাথারত অবস্থায়। আরুর সাথে সানার চোখাচোখি হতেই আরু আরিশের কাছ থেকে সরে আসার জন্য ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে গেল। সানা আর আরাভ গাড়ি থেকে নেমে বিড়বিড়িয়ে বলল,
‘ভাইয়া আর আরু মেড ফর ইচ আদার তাইনা? ‘

আরাভ গাড়ির মধ্যে আরিশ আর আরুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
‘হম একদম। তোমার ভাইয়া তোমার ভাবীকে তার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। ‘

সানা আরাভের কাছে সরে এসে বলল,
‘আরু নিজে না নিজের যতোটা কেয়ার করে, ভাইয়া তার তুলনায় বেশি কেয়ার করে ওকে। ‘

আরাভ সানার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
‘দোয়া করি ওরা সারাজীবন এভাবেই থাকুক। চলো আমরা ওদিকে যাই ওরা ততখনে ধীরে সুস্থে আসুক। ‘

গাড়ির মধ্যে আরু আরিশের থেকে দূরে সরে এলো। আরু কে এতো লজ্জা পেতে দেখে আরিশের মোটেই ভালো লাগছে না কারন এ এমন লজ্জা যার জন্য দুজনের মাঝে ঝগড়া বা রোমান্স কোনটাই হচ্ছে না। আরিশ কিছু বলতেও পারছে না আরুকে। আরু কিছুটা দূরে সরে এসে আরিশকে মিনমিনে কন্ঠে বলল,
‘আপনি আমার ওড়নার ওপর বসেছেন। ‘

আরু চোখ নামিয়ে নিল। আরিশ গাড়ি থেকে নেমে আরুর দিকের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো। দরজাটা খুলে আরু নামতে গেলেই আরিশ বলল,
‘ওয়েট।’

আরু অবাক চাহনিতে তাকালো। ঠোঁট কাঁপাতে কাঁপাতে বলল,
‘কি হয়েছে? ‘

আরিশ ওর হাতে থাকা একটা গোলাপী রঙের ঘন পশম ওয়ালা চাঁদর এনে আরুর গলা থেকে কনুই বরাবর জড়িয়ে দিল।
আরু সামান্য চোখের ইশারায় প্রশ্ন করলো,
‘আপনি এটা কখন আনলেন? ‘

‘আসার আগে গাড়িতে রেখে গেছিলাম। ‘

আরু অবাক হলো না। কারন সে জানে মানুষ টা তার কোনরকম কোন অযত্ন হতে দেয় না আর প্রেগন্যান্সি র পর থেকে আরিশ আগের থেকে আরও বেশি সচেতন,একসাথে দুটো মানুষের খেয়াল রাখতে হয় আরিশকে। লেক এর ধারের ঠান্ডা হাওয়ায় আরু স্বল্প কাঁপছিল। আরিশ ঠিক সময়ে ঠিক কাজটাই করেছে।
আরিশ আরুর হাত ধরে গাড়ি থেকে নামলো। আরিশ আরুকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে হাটতে লাগলো।আরু মাঝেমাঝে আরিশের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। আরিশ গোপনে হেসে বলল,
‘ রাস্তায় অনেক পাথর। সামনের দিকে তাকিয়ে হাটো।পরে আমাকে দেখার অনেক সময় পাবে।

আরু চোখ মুখ কুঁচকে নিল। নিরবে ধরা খাওয়ার লজ্জাটা একটু যেন বেশিই হয়। আরু মিনমিনিয়ে বলল,
‘সরি। ‘

আরু কখনো আরিশকে সরি বলে না। এতদিন যে একবার দুবার সরি বলেছে তা আরিশের রাগ ভাঙানোর জন্য। আকাশে ধুমকেতু দেখা যেমন বিরল তেমনি আরুর মুখের সরিটাও আরিশের কাছে বিরল। তবে আরিশের ব্যাপারটা ভিন্ন। আরিশের কথায় তার মধ্যে নাকি সরি বলার ফিচার্সটাই নেই। আরু কখনো আরিশকে সরি বলতে বললে আরিশ বলে,
‘ আমি কখনো সরি বলিনা। ‘

আরুর মুখে সরি শুনে আরিশ বলল,
‘ আরু পাখি কি বললে শুনতে পেলাম না।’

আরু বুঝতে পারলো যে আরিশ ইচ্ছা করে এমনটা করছে তাই সে আর দ্বিতীয় বার কোন টু শব্দটাও কিছু করলো না।

আকাশটা আজ ঝকঝকে পরিষ্কার। আকাশে হলুদ, স্বল্প লাল সবরকমের তারাদের আনাগোনা। উষ্নতার তারতম্য অনুযায়ী তারাদের ও ভিন্ন ভিন্ন রঙ হয়। গোলাকার চাঁদটা চমকালো রঙের আর তাকে সম্পূর্ণ পরিপূর্ণতা দিতে আছে তার চন্দ্র কলঙ্ক। গরমে ঠাসা ভাবসা পরিবেশে লেকের ধার ছাড়া ভালো জায়গা আর কোথাও হয় বলে মনে হয় না। রাতটাও নেহাত বেশি গভীর নয় তাই কমবেশি অনেক মানুষ লেকের ধারে এসে উপচে পড়েছে। সবুজ ঘাসের গালিচায় কেও বা শরীর এলিয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখছে আবার কোথাও কোথাও প্রেমিক যুগলদ্বয় ঘাসের ওপর বসে গল্পগুজব করছে। বেঞ্চ ও আছে বেশ কয়েকটা তবে তাতে বসার সুযোগমাত্র নেই। আরু আর আরিশ দেখলো সানা একটা অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় বসে হাত উচিয়ে তাদেরকে ডাকছে। আরাভকে অবশ্য কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আরুকে নিয়ে সেখানে নিয়ে সানার পাশে বসিয়ে দিতেই পিছন থেকে আরাভের ডাক এলো,
‘আরিশ এদিকে আয়। ‘

সানা আরিশকে বলল,
‘ ভাইয়া উনি চা আনতে গেছেন, উনি একা পারবেন না, হেল্প কর। ‘

আরিশ আরুর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে চলে গেল আরাভের কাছে। আরিশ যেতেই সানা আরুর কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘ কি হয়েছে রে তোদের আজকে? তোরা দুজন এতো শান্ত কেন। গাড়িতেও একটাও কথা বলছি না। এখনও দেখি চুপচাপ। ‘

আরু অপ্রস্তুত হলো বেশ বৃথা হাসি দিয়ে কথা দমানোর চেষ্টা করতেই সানা বলল,
‘আরে বলনা কি হয়েছে। রোমান্স টোম্যান্স এর চক্কর নাকি। নাকি ভর সন্ধ্যায় রোমান্স এর ওভারডোজ পড়ে গেছে তাই সামলাতে পারছো না। ‘

আরু বুঝলো ভাই বোন দুজনেই সমান ভাবে অভদ্রতার চরম সীমায়, দুজনেই লুচু। আরু বিষম খেলো যেন।
‘ওসব রোমান্স টোমন্স তো খামখেয়ালিপনা মাত্র। আজকে ঝগড়া করার মুড নেই তাই করছিনা। নাথিং এলস।’

সানা আরুর কথা মানতে নারাজ। তবে সে আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরিশ আর আরাভ চলে আসতেই আর বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পেলো না সানা। দুজনেই পিনপতন নিরবতা নিয়ে চুপ হলো যেন এই এক বাতাস সমুদ্র গিলে খেয়েছে তারা। আরাভ চা আর ঝালমুড়ি এনে সামনে রাখল। আরিশ একটা জলের বোতল আর অপর হাতে হাওয়াই মিঠাই এর প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সানা আরিশের হাতে হাওয়াই মিঠাই দেখে আরাভকে বলল,
‘হাওয়াই মিঠাই আনতে বলিনি তো। ‘

সানার কথা শেষ হতে না হতেই আরিশ আরুর দিকে হাওয়াই মিঠাই বাড়িয়ে দিল। আরু আবাক হয়ে কিছুখন চেয়ে রইলো তারপর হাত বাড়িয়ে ওগুলো নিল। কিছুখনের মধ্যেই গড়ে উঠলো একটা ছোটখাটো গল্পের আসর। একে অপরকে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করতে লাগল। হঠাৎ আরুকে আরাভ প্রশ্ন করতেই আরু বেশ দমে গেল। আরাভ কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলো,
‘আরিশ তো তোমাকে সেই ছোটবেলা থেকে ভালোবাসে সেটা কম বেশি সবাই জানে। কিন্তু ভাবী তুমি আরিশকে কবে থেকে ভালোবাসেন?’

আরু কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। বেশ আমতা আমতা করে বলল,
‘আসলে ভাইয়া আমার মনে নেই ঠিক সময়টা।’

আরাভ তবুও বললো,
‘তাও কতো বছর হবে বলে মনে হয়? ‘

আরিশ আরুর দিকে তাকালো না একটি বারের জন্যও। সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আরু চোখ উঁচু করে আরিশের দিকে তাকালো। তাকে দেখে সম্পূর্ণ রুপে ভাবলেশহীন লাগছে। আরুর বুকটা কেঁপে উঠলো। তার এই নিরবতা আর নিরুত্তর কি আরিশকে হার্ট করে ফেলল অজান্তেই? আরুর শরীরটা হালকা কাঁপতে লাগলো। হঠাৎ পরিবেশ একটু থমথমে হতেই সানা জোরে বলল,
‘ আচ্ছা এখন এই প্রশ্নটা থাক, এর উত্তর আমরা পরে আরুর থেকে শুনে নেবো যখন আরুর মনে পড়বে। ‘

আরাভ সম্মতি দিয়ে বলল,
‘ঠিক আছে তাহলে এটা না হয় ভাবীর কাছে পরেই শুনে নেব। ‘

আরু কাঁপাকাঁপা হাতে আরিশের হাতটা একপাশ থেকে জাপটে ধরে মৃদু সুরে বলল,
‘অনেক রাত হয়েছে, চলুন বাসায় যায়। ‘

আরুর কথাটা আরাভের কানে যেতেই আরাভ ঘড়ির দিক তাকিয়ে বলল,
‘হ্যাঁ সাড়ে নয়টা বাজে প্রায়। আমাদের বাসায় ফেরা উচিত। তাছাড়া ভাবী এতখন বাইরে থাকলে ভাবীর শরীর খারাপ হতে পারে। ‘

আরিশ নির্বিকারে ঘাসের ওপর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আরুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই আরু কাঁপাকাঁপা হাতে আরিশের হাতটা ধরে উঠে দাঁড়ালো।

সানা আর আরাভ গাড়ির দিকে যেতে লাগলো। আরু লক্ষ করলো আরিশ তার দিক তাকিয়ে আছে। আরুর হৃদস্পন্দন বাড়তে লাগলো, হার্টবিট ১১০ কি ১২০ ছুঁয়ছুঁয়। আরুর ঠোঁটজোড়াও কাঁপতে লাগলো। হঠাৎই আরিশ আরুকে জড়িয়ে ধরলো ওর বুকে। আরুর মাথা আরিশের বুকে। আরিশের হুদস্পন্দন স্বাভাবিক। আরু মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে লাগলো। আরিশের শার্টটা জাপটে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে ও। বড়ো বড়ো শ্বাস নিচ্ছে। হঠাৎ আরিশ বলে উঠলো,
‘কাঁপছো কেন আরুপাখি? ভয় পাচ্ছো? ‘

আরু উত্তর দিলো না। ভয়ে চোখে জল চলে এসেছে, চোখ জোড়া ছলছল করছে। আরিশ মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
‘আমি নিজে কখনো তোমার কাছে জানতে চায়নি তুমি আমাকে ভালোবাসো কি। আর কখনো জানতেও চাইবো না। হোক না আমার একতরফের ভালোবাসা আমার তাতেও কোন অভিযোগ নেই। তুমি তো আমার কাছে আছো। ব্যাস। ‘

আরু মাথা নাড়িয়ে না জানতে চাইলো যে আরিশের ভাবনা সত্যি না। সেও আরিশকে ভালোবাসে কিন্তু আরুর মুখ থেকে কোন কথা বার হচ্ছে না। আরুর চোখ থেকে জল গড়ালো। অজানা কারনে আরুর ভীষন কাঁদতে ইচ্ছা করছে। চেয়েও আরিশকে ওর মনের কথা বলতে পারছে না। আরু চোখ মুছে আরিশের কাছ থেকে সরে এসে বলল,
‘আমাকে গাড়িতে নিয়ে চলুন। আমার শরীরটা খারাপ লাগছে ভীষন। ‘

আরিশ আরুর হাতটা ধরে গাড়ির কাছে নিয়ে গেল। এই মুহূর্তে কোলে নেওয়াটা একটু রিস্কের তাই ধীরে ধীরে আরুর হাত ধরেই নিয়ে গেল আরিশ। আরু গাড়িতে আরিশের বুকের মাঝে স্হান দখল করে রইলো। আরুর মনের মাঝে অনেক কথা জমে আছে কিন্তু সে আরিশকে কিছুই বলতে পারছে না। এই অপরাধবোধ তাকে কষ্ট দিচ্ছে।

রাত১১ প্রায়,

বাসায় ফেরার পর আরু আর আরিশের মুখোমুখি হয়নি। সাহস পাচ্ছে না আরিশের সামনে যাওয়ার। কোন মুখে যাবে সে। যেখানে আরিশ তাকে তার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে আর সে সামান্য তার ভালোবাসার কথা আরিশকে জানাতে পারেনি। রাত এগারোটা বাজে প্রায়। খাওয়া দাওয়া শেষ করে যে যার ঘরে গেছে। আরিশ রুমে এসেছে কিছুখন আগে। আরু রুমে ঢুকে দেখলো আরিশ টিভিতে আরুর ফেভারিট কার্টুন দেখছে। আরু টিভির দিকে এক পলক তাকিয়ে আরিশকে বলল,
‘ বলছিলাম কি আজ রাতে ফুপি কে এই ঘরে ঘুমাতে বললে আপনার কি কোন সমস্যা হবে? না মানে ফুপির কাছে আজকে ঘুমাতে ইচ্ছা করছিল তাই আর কি। ‘

আরিশ আরুর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল,
‘তুমি আজ রাতে আম্মু রুমে থাকো। কোনরকম কোন সমস্যা হলে আমাকে ডাকবে। ‘

আরু অবাক হলো বেশ। আরিশ আগে কখনো এমন পারমিশন দেয়নি ওকে। আজকে দিলো। না জানি আরিশ কি ভেবে কথাটা বলল তা আরু আন্দাজ করতে পারলো না। আরু আর কথা না বাড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে গেল। আরিশ পিছন থেকে বলল,
‘Saranghaeyo Arupakhi’

আরু এই কথাটা শুনে থমকে গেল। আরিশের দিকে তাকিয়ে দেখলো আরিশ ঠোঁট চেপে মুচকি হাসছে। আরু এবার হেসে ফেলল। আরুর বুকের মাঝের অপরাধবোধের বিরাট পাথরটা এক নিমেষেই সরে গেল আরিশের বলা একটা শব্দে আর আরিশের মুখের হাসিতে। ‘

আরিশের কথার আরু উত্তর দিলো না। মুচকি হেসে হাত দিয়ে কোরিয়ান স্টাইলে লাভ শেপ করে দেখালো আরু। আরু চলে গেল অনিকা খানের রুমে এক বুক প্রশান্তি ভরা অনুভুতি নিয়ে।

#চলবে,,,