কারণে অকারণে সে পর্ব-০৫

0
881

#কারণে_অকারণে_সে
#পর্ব:৫
#লেখক:রিয়ান আহমেদ(ছদ্মনাম)
;
আরশি সাভাশের থেকে নিজেকে দ্রুত ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়।আরশি বিব্রত বোধ করে বলল,
“বাড়ি দেখা হয়েছে না?এবার নিজের বাসায় যান।”
“ধুর বাড়ি দেখতে কে এসেছে?আমি তো এই জ্বীনে ধরা মেয়েটাকে দেখতে এসেছি।”
আরশি চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা আপনি আমাকে নিয়ে এতো উতলা কেন হয়েছেন?চেহারা তো ভালোই মনে হয় ভালো রোজগারও করেন।দেখুন আমি বলবো না আমার চেয়ে ভালো মেয়েকে পাবেন।কারণ আমি জানি আমি মোটেও ভালো মানুষ না তাই অন্য কোনো ভালো মানুষের তুলনা আমার সঙ্গে যায় না।,,,আচ্ছা যান আমি নিজ দায়িত্বে একটা ভালো মেয়ে আপনাকে খুঁজে দেবো।তারপর তাকে বিয়ে করে টুনাটুনি সংসার করবেন কেমন?”

সাভাশ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনে বলল,
“তুমি বললে আমি তোমার জন্য এতো উতলা কেন তাই না?আসলে আমার প্রেমে পড়লে মানুষ অনেক অদ্ভুত কর্মকান্ডই করে থাকে আমিও সেইরকম হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।তুমি রাগী,বদমেজাজি, কিছুটা দেমাগী, সব সময় নিজের কথা চিন্তা করো।কিন্তু এই সবে আমার কোনো কিছুই যায় আসে না।তুমি যেমন আমি তোমাকে তেমনভাবেই ভালোবাসি।তবে কেন ভালোবাসি সেটা জানি না।ভালোবাসার কারণটা কখনোই ব্যাখ্যা করা যায় না।”

আরশি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি আমাকে ইনডাইরেক্টলি অপমান করছেন।”
“আজ আসি,,,নিজের খেয়াল রেখো মাই কিউটি।”
কথাগুলো বলে সাভাশ একটা কিউট হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।আরশি চুপচাপ কথাগুলো শুনে এরপর সাভাশের যাওয়ার পরপরই বলে,
“বাহ্ কথাগুলো তো চমৎকার ছিল।এগুলো রেকর্ড করে যেকোনো মেয়েকে শোনালে সে নিশ্চিত এই লোকের প্রেমে পড়তো।,,কিন্তু আমার কোনো যায় আসে না হুহ।”

আরশি ছাদ থেকে নেমে যায়। রুমে গিয়ে দেখে মোবাইলে ভার্সিটির গ্রুপ থেকে নোটিফিকেশন দিয়েছে কালকে পরীক্ষা।আরশির অবস্থা এটা দেখে যায় যায়।কারণ সে এই কয়দিন তেমন কিছুই ঠিকমতো পড়ে নি আর যেই সাবজেক্টের পরীক্ষা সেটা তো একেবারেই পড়ে নি।
আরশির পড়া শেষ হতে হতে রাত দুটো বেজে যায়।ভোর পাঁচটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে সে আবার উঠে রিভিশন দেওয়ার জন্য।কিন্তু ঘুম তাকে চোখ মেলতে দিচ্ছে না।ফজরের নামাজ শেষ করে ঢুলু ঢুলু চোখে টেবিলের দিকে একবার তাকায় সে তো আরেকবার বিছানার দিকে।অবশেষে অনেক চিন্তা ভাবনা করে বিছানায় গিয়ে সে বই নিয়ে বসে।কিছুক্ষণ পড়ার পরে আবার চোখ ঘুম চলে আসে।
“পাঁচ মিনিট একটু ঘুমাই।তারপর আবার উঠে পড়তে বসবো।”
আরশি বুঝতে পারে নি তার পাঁচ মিনিট কয়েক ঘন্টায় রূপ নেবে।আটটার দিকে ঘুম ভাঙতেই আরশির ঘড়ি দেখে হার্ট অ্যাটাক করার মতো অবস্থা।দশটায় পরীক্ষা এখন আর পড়ার সময় তার নেই তাই যেটুকু পড়েছে ততটুকুর উপরে চোখ বুলিয়ে কোনোমতে রেডি হয়ে নাস্তা করেই কলেজে রওনা হয়।স্কুটারে ফিউল বেশি নেই রাস্তায় কোথাও ফিউল নেওয়ার জন্য থামলে ভার্সিটিতে পৌছাতে লেট হয়ে যাবে।আরহাম আর রিজা আহসান গাড়ি নিয়ে আধ ঘন্টা আগেই অফিস চলে গেছে।তাদেরকে বললে তারা আরশিকে নামিয়ে দিয়ে যেতো ভার্সিটিতে কিন্তু এখন তাও সম্ভব নয়।
আরশি সিএনজি খুঁজতে থাকে।কিন্তু কপাল যখন খারাপ হয় সবদিক দিয়েই খারাপ হয় তাই হয়তো আজ তেমন কোনো সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে না আর যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো যাবে না।তখনই তীব্র নামক ব্যক্তিটির দেখা মেলে।তীব্র গাড়ি থামিয়ে আরশিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
“কিরে আরশি তোর স্কুটার কই এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস যে?তোর না আজকে পরীক্ষা?”
আরশি কপালের ঘাম মুছে বলল,
“সে অনেক কাহিনী।আপনি কিভাবে জানলেন আমার পরীক্ষা।”
“তানহা বলল।আমি তো তানহাকে দিয়ে আসতেই যাচ্ছিলাম তুইও চল তোকে দিয়ে আসি।”
আরশি আর না করলো না।এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে তাই তীব্রর গাড়িতেই উঠে বসলো।

পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে আরশি ফ্রেন্ডদের সাথে প্রশ্ন মিলাচ্ছে।সব হিসাব করে সে ধারণা করলো পরীক্ষা ততটাও খারাপ হয় নি মোটামুটি ভালো নম্বর আসবে।
আরশির বান্ধবী মিলা হতাশ গলায় বলল,
“আরশি দোস্ত তোর বিয়ে ঠিক হলো আর আমাদের একটাবার বললি না?”

আরশি ভড়কে যায় নিশ্চিত সাবিনা এদেরকে বলেছে।মিলার কথা শুনে ফারহিন বলল,
“যা হওয়ার হইছে।হয়তো বেচারি আমাদের বলতে ভুলে গেছে দুলাভাইয়ের কথা চিন্তা করতে করতে করতে।কিন্তু আমরা তো আর ট্রিট নিতে ভুলবো না।কি বলিস সবাই।”

আরশির তিন চারজন ফ্রেন্ড ট্রিট!ট্রিট! করতে থাকে।আরশির মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার কথা কেউ শুনতেই চাইছে।এবার আরশি সবাইকে ধমক দিয়ে বলল,”চুপ একদম চুপ।আমার কথা তো আগে শোন।”
সবাই আরশির ধমক শুনে চুপ হয়ে গেল।আরশি এবার দম নিয়ে বলল,
“বিয়ে টিয়ে কিছুই হচ্ছে না বুঝলি।ঐ ছেলেটা আমার পেছনে পড়ে আছে।,,,আর তোরা আমার কাছে কোনো ট্রিট পাবি না এই জনমে।যদি খাওয়া দাওয়া করতে হয় তাহলে আমার এক লাল শুক্রবারে যখন বিয়ে হবে আমার তখন খাবি।এক এক জনের প্লেটে একটা করে মুরগি থাকবে আর তোদের চারজনের জন্য একটা ছাগল আস্তা রান্না করবো।”
ফারহিন চিন্তিত গলায় বলল,
“বুঝেছি না আসবে লাল শুক্রবার আর না আসবে তোর বিয়ে।”
আরশি হেসে বলল,
“এই তো বুঝতে পেরেছিস তাহলে আমি এখন যাই কেমন।”
;
;
;
আরহাম সন্ধ্যায় অফিস থেকে বের হওয়ার সময় বাবাকে বলল,
“বাবা আমি বন্ধুদের সঙ্গে একটু আড্ডা দিতে যাচ্ছি।তুমি একা বাসায় চলে যেও আর সবাই ডিনার করে নিও।আমার আসতে দেরী হবে।”
রিজা আহসান ছেলের কথায় সায় দিয়ে বললেন,
” আচ্ছা ঠিকাছে কিন্তু বেশি দেরী করো না।”
“ঠিকাছে।”

আরহাম তার বাবাকে যেই কথাগুলো বলেছে সেগুলো একদমই সত্যি না।সে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে নয় psychiatrist অথবা মনোচিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে।আরহাম চায় নিজের রাগটাকে নিজের কন্ট্রোলে আনতে তাই সে মন করে এর জন্য মানসিক রোগের ডাক্তার দেখালে ভালো হয়।তবে এই বিষয়টা সে সবার থেকে লুকাতে চাইছে।আরহামের ধারণা যদি কেউ জানতে পারে সে মানসিক রোগের ডাক্তার দেখায় তাহলে তারা তাকে পাগল উপাধি দেবে।

অদ্ভুত হলেও সত্য আমাদের দেশে সব ধরনের মানসিক রোগীদের পাগল বলা হয়।মানসিক রোগ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে এর মানে এই নয় এতে আক্রান্ত লোকেরা পাগল।আমরা অনেক সময় হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে ট্রল করি এই বলে,”আরে এই ছেলে/মেয়ে তো ঢং করে মানুষের এটেনশন পাওয়ার জন্য।”
কিন্তু এই কথাগুলো বা এরকম আচরণ মানসিক রোগীদের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর।আমরা কেউই টেনশন করতে চাই না তবুও করি কারণ মস্তিষ্ক আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সবসময় চলে না।
;
;
;
আজকে আরশিকে সাভাশের পরিবার দেখতে এসেছে।আরশি সোফায় সবসময়ের মতো আরাম করে বসেছে যদিও আজ পা উঠায় নি।আয়েশা বেগম মেয়েকে বার বার চোখের ইশারায় ঠিক হয়ে বসতে বলছেন কিন্তু আরশি তার কথা শুনলে তো।সে সাভাশের পরিবারের সকলের সামনে নিজের একটা বেড ইম্প্রেশন তৈরি করতে চাইছে যেন ওনারা ওকে রিজেক্ট করে দেয় পুত্রবধূ হিসেবে।সাভাশ আজকে আসে নি সে একটা কেসের জন্য ঢাকার বাইরে গেছে।সাভাশের মা তাসনিম বেগম বললেন,
“মা তোমার শখ আহ্লাদ কি?”
আরশি ফটাফট জবাব দিল,
“এই তো আন্টি সারাদিন খাই,ঘুমাই আর কখনো কখনো মন চাইলে নিজের নাস্তা টাস্তা বানাই আসলে আমি নিজের জন্যই সবসময় কাজ করতে পছন্দ করি।”
সাভাশের পরিবারের প্রায় দশজন এসেছিল সবাই আরশির কথা শুনে কিছুক্ষণ হা হয়ে তাকিয়ে রইলো এরপর হা হা করে হেসে দিল।সাভাশের বাবা সাদমান চৌধুরি হাসতে হাসতে বললেন,
“রিজা ভাই আপনার মেয়ে তো আমার ছেলের মতো একেবারে।সবাইকে হাসাতে পারে।ওদের জুটি খুব ভালো জমবে।”

সাভাশের চাচাতো বোন বলল,
“আপু তোমার চশমার পাওয়ার কতো?”
“বেশি না তিনশো পঁচিশ আর তিনশো পঞ্চাশ।তোমারটা কতো।”
“আরে ভাবি আমারও স্যাম।”

আরশি হতাশ হলো সবার সঙ্গে কথা বলে।এদের কিছু বলেই অসন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না।সবাই বিকালের দিকে কথা পাকাপোক্ত করে চলে গেল।সাভাশের ছোট ভাই একজন ইঞ্জিনিয়ার আর রিসার্চার।সে কিছুদিনের জন্য বিদেশে গেছে সাতদিন পরে ফিরবে সে ফিরলেই আরশি আর সাভাশের এংগেজমেন্ট করানো হবে।

আরশি রাতে বারান্দায় বসে বসে ভাবছিল,
“শেষ পর্যন্ত সাভাশের সঙ্গেই আমার বিয়েটা ঠিক হলো।আমি বুঝতে পারি না লোকটা এতো অদ্ভুত কেন।সে আজ পর্যন্ত আমার খারাপ গুন ছাড়া কিছুই দেখে নি তবুও আমাকে এতো পছন্দ করে। হুয়াই?”

আরশি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় তীব্রকে শেষবারের মতো নিজের ভালোবাসার কথা বলবে।আরশি নিজের প্রতি অবাক।ও কি সেই মানুষ যাকে কেউ একবার কোনো জিনিসের জন্য নিষেধ করলে সে সেটার দিকে ফিরেও তায় নি? ছোটবেলা আরহামের রুমে গিয়ে ভুল করে একবার আরহামের প্রিয় একটা শো পিস ভেঙ্গে ফেলেছিল আরশি।আরহাম এতোটাই বকেছিল আর রেগে গিয়েছিল যে আরশিকে সে একটা লাঠি দিয়ে হাতি দুইবার আঘাত করে বলেছিল আর যেন আরশি তার ঘরে না আসে।সত্যিই আরশি তার ঘরে যায় নি।এরপর আরহাম আরশির কাছে বহুবার সরি বলার পরেও আরশি মাফ করতে চায় নি।এরপর আরহাম কোলে করে আরশিকে নিজে রুমে নিয়ে গিয়ে আরশির হাতে সেই লাঠি দিয়ে বলেছিল আরশি যেন তাকে মারে।আরশি সত্যিই তাই করেছিল আরহামের দুই হাতে মেরে বলেছিল,”এবার হয়েছে আমার মনে শান্তি।আমি যেমন তোমার ঘরে এক সপ্তাহ আসি নি তুমিও আমার ঘরে,বাবা মার ঘরে এক সপ্তাহ আসবে না।”

আরশি মনে মনে বলে,”ভালোবাসা মানুষকে বেহায়া,বেপরোয়া বানিয়ে দেয়।,,,নাহ্ তীব্র ভাইকে আর জ্বালাবো না সে থাকুক নিজের মতো।তার খোঁজও আর রাখবো না।কিভাবে যে ওনাকে ভালোবাসার মতো বড় অপরাধটা করে ফেললাম?”
আরশির মনে পড়ে তীব্রকে নিয়ে প্রথম যেদিন তার হৃদয় অন্যরকম কিছু ভেবেছিল।আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগের ঘটনা।তীব্র তখন ভার্সিটির একজন ছাত্র।ভার্সিটির এক বন্ধু তীব্র আর আরহামের সঙ্গে আরশির বাসায় এসেছিল।ছেলেটার নাম কি তা আরশির ঠিক মনে নেই।কিন্তু ছেলেটা ওকে দেখে কোনো একভাবে পছন্দ করে ফেলেছিল।আরশির স্কুলের সামনে রোজ দাঁড়িয়ে থাকতো সে।রাস্তায় পর্যন্ত ফলো করতো।আরশি প্রথমে ততটা পাত্তা না দিলেও পরে দিতে বাধ্য হয়।আরশি কয়েকদিন ভদ্র ভাষায় নিষেধ করে পিছু নিতে কিন্তু ছেলেটা শুনে না।এদিকে আরশি নিজেও কিছু বলতে পারছিল না বাসায় কারণ আরহাম জানতে পারলে ছেলেটাকে নিশ্চিত খুন করে ফেলবে।আরশি এমন কিছু চায় না।তাই তীব্রেকেই সাহস করে ব্যাপারটা বলে।তীব্র এর পরেরদিন আরশির স্কুলে গিয়ে ঐ ছেলেকে সাবধান করে কিন্তু ছেলেটা উল্টো তীব্রর সঙ্গে তর্কবিতর্ক শুরু করে দেয়।এভাবে এক কথায় দুই দুজনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়।তীব্র একটু আধটু মার খেলেও ছেলেটা একটু বেশিই খায়।আরশির এক বান্ধবী তখন বলেছিল,”দোস্ত এই হ্যান্ডসাম ছেলে কি তোর বয়ফ্রেন্ড।”
আরশি তীব্রকে নিজের জন্য মারামারি করতে দেখে আর বান্ধবীর এই কথা শুনে তীব্রর প্রতি পুরাই ফিদা হয়ে যায়।নিজেকে তার তখন মুভির নায়িকা মনে হচ্ছিলো আর তীব্র নায়ক যে ওর জন্য ভিলেনের সঙ্গে মারামারি করছে।
এরপর দিন যায় মাস যায় আর তীব্রর প্রতি তার অনুভূতি গাড়ো থেকেও গাড়ো হতে শুরু করে কিন্তু কখনো মুখে আর বলার সময় হয়ে উঠে না।কিন্তু যখন আরশি নিজের মনের কথা মুখে বলে তখন তীব্রর আর সেই কথাগুলো বুঝার সময় হয় না।
;
#চলবে!