কারণে অকারনে ভালোবাসি০২ পর্ব-২৬+২৭

0
829

#কারণে_অকারনে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

২৬.

— গোসল করলেন এখন আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে আমি সিওর! এই শীতের দিনে ভর সন্ধ্যায় গোসল না করলেও পারতেন।

আরিশের দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো আরু। চাপা কন্ঠে আরিশকে ধমক দিয়ে উঠলো সে। আরিশ তখন ঠান্ডায় ইচ্ছা করে নাক টেনে বলল
— বউ থাকতে ঠান্ডা লাগবে কেন! আর ঠান্ডাই যদি লাগে তাহলে বিয়ে করলাম কেন!

আরু আরিশের দিকে চোখ গরম করে বলল
— ফাজলামি করছেন?

আরিশ চাপা হেসে সামনের দিকে তাকালো। মধু আর মধুর হবুবর স্টেজে বসে আসছে। সবাই একে একে হলুদ দিচ্ছে। আরুর মামী বেশ কান্নাকাটিও করেছিলেন বেশ। আরু এপাশ ওপাশ তাকিয়ে সানা কে খোঁজার চেষ্টা করতেই আরিশ বলল
— আমাকে খোঁজার জন্য এতো এদিক ওদিক তাকানোর কি আছে আমি তো পাশেই আছি।

আরু রাগী কন্ঠে বলল
— সানাকে খুঁজছি। আরাভ ভাইয়াকেও তো দেখছি না।

হঠাৎ অনিকা খানকে সেদিকে আসতে দেখে আরু ওনার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল
— ফুপি সানাকে দেখেছো? ওকে কখন থেকে খুঁজছি আমি।

অনিকা খান এককথায় কাজ সারলেন যেন। সহজ ভাবে বললেন
— নাহ দেখিনি।

আরুর সাথে আর কোনরুপ কথা না বাড়িয়ে উনি আরিশের কাছে গিয়ে বললেন
— আরিশ একটু আয় তো তোর সাথে দরকারী কথা আছে।

আরু কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করে উঠলো
— কি হয়েছে ফুপি?

অনিকা খান আরুর দিকে তাকিয়ে একটা মিথ্যা হাসি হেসে বলল
— নাহ রে মা, আরিশকে তোর ফুপা ডাকছে। এক্ষুনি যেতে বলল।

— ওহহ।

আরিশ হয়তো অনিকা খানের মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারলো তাই সে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে অনিকা খানের সাথে গেল। আরু যেতে নিলেই আরিশ বারন করলো যেতে।

— তুমি বসো আমি সানাকে ডেকে পাঠাচ্ছি।

আরিশ চলে গেল। অনিকা খান আরিশকে ডেকে ঘরের ভিতর নিয়ে গিয়ে দরজা দিয়ে দিলেন। আরিশ ঘরে ঢুকে দেখলো আরুর মা বাবা, সানা আরাভ আর আফজাল খান সহ সবাই উপস্থিত। ওনাদের মুখ থমথমে। হঠাৎ আরিশ অবাক না হয়ে পারলো না। সবার নজর আরিশের দিকে যেন সে বিরাট একটা কিছু করে এসেছে যার জন্য এখন মিটিং ডাকা হয়েছে। আরিশ কৌতুহল বশত বলল
— তোমরা সবাই এখানে যে। হলুদের ওখানে যাওনি?

অনিকা খান আরিশের সব দ্বিধা দূর করতে বললেন
— নাহ যাইনি তবে তোকে এসব প্রশ্ন করার জন্যও ডাকিনি। আরুর বিষয়ে কথা বলতে ডেকেছি তোকে।

আরিশ রাগী চোখে আরাভের দিকে তাকালো। আরাভের সাথে আরিশের চোখাচোখি হতেই আরাভ ইশারায় গা হাত পা ছাড়া একটা ভাব দিয়ে বোঝালো যে সে কিছুই বলেনি। আরিশ চোয়াল শক্ত করে বলল
— হমম বলো কি জানতে চাও!

আফসানা বেগম কিছু বলতে যাবে তার আগে আরিশ বলে উঠলো
— ওয়েট ওয়েট ওয়েট। তার আগে সানা আর আরাভ এই রুম থেকে যা।

ওরা দুজনই অবাক হয়ে বলল
— কেন?

— আরু পাখি ডাকছে। যা জলদি। নাহলে ও দরজার কাছে এসে কান পাতলে বিষয়টা ভালো হবে না আশা করি।

সানা অবাক হয়ে বলল
— কনভারসেশন টা শুনে যায়।

আরাভ তাল মিলিয়ে বলল
— হ্যাঁ তাই তো। তাছাড়া ভাবী তো আর ওখানে একা নেই, সবার সাথেই আছে।

আরিশ চোখ রাঙিয়ে বলল
— তোরা যাবি নাকি আমিই রুম থেকে বেরিয়ে যাবো কোনটা?

আরিশের এমন কথাতে আফজাল সাহেব বলে উঠলেন
— না না থাক তোকে কোথাও যেতে হবে না। সানা আর আরাভ যাচ্ছে। তোমরা দুজন আরু মার কাছে যাও, মেয়েটার একা থাকা ঠিক হবে না।

বিনাবাক্য ব্যায় করে ওরা বেরিয়ে যেতে নিলেই আরমান সাহেব বললেন
— এরপর কি হবে আরিশ!তুমি কি সত্যিই সিঙ্গাপুর যাবে না?

— হমম। সো হোয়াট।

আরিশের এমন নির্লিপ্ত ভাবভঙ্গিতে আরমান সাহেব কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গেলেন।

— আসলে আরূর হেল্থ কান্ডিশানের কথা ভেবে বললাম আর কি। আচ্ছা ওর কোন বিপদ হবে না তো মানে কোন কম্পলিকেশন দেখা যাবে না তো? ডক্টর তো তোমার সবটা বলেছিলেন তাছাড়া তুমি এ বিষয়ে ভালো জানবে।

আরিশ ওনার এমন কথা শুনে আরিশ বলল
— ওর দেখভাল করার দায়িত্বটা না হয় আমার ওপরই ছেড়ে দিন।

আফসানা বেগম বললেন
— আমি বলছিলাম কি যদি আরু সত্যিই মা হয় তাহলে আরু না হয় কদিন আমাদের বাসায় থাক। আমরা বরং ওকে কদিনের জন্য না হয় নিয়ে গেলাম।

আরিশ কঠিন সুরে বলল
— মামী তুমি কি চাইছো আমি ঘরজামাই থেকে যাই?

উনি থতমত খেয়ে বললেন
— তেমনটা না, তুমি আরু কে চোখের আড়াল করো না জানি। কিন্তু ও এসে তেমনটা থাকেও না, আমাদের ও মন খারাপ করে। তাই আর কি।

— দরকার হলে আমি ওকে নিয়ে গিয়ে কদিনের জন্য ঘুরিয়ে আনবো বাট একা যেতে দেবো না। হোয়াটএভার আমি এখন আসছি।

আরিশ বেরিয়ে গেল। আফজাল খান দম ছেড়ে বললেন
— মনে হয় জন্মের পর ছেলেটার মুখে মধু পড়েনি।

অনিকা খান কিটকিট করে বললেন
— তুমি বাপ, মধু কেনার দায়িত্ব তোমার ছিলো আমার না যতসব।

কিছুখন পর আরিশ গিয়ে আরুর পাশে বসলো।

— কি কথা বলছিলেন এতোখন?

— আমি কি বলছিলাম এতখন সেটার থেকেও বেশি ইম্পরট্যান্ট হলো তোমার আম্মু যে এতো একা ফিল করে আগে বলেন নি তো। তুমি বাসায় নেই তাই তারা দুঃখ পায়। তাই শাশুড়ি আম্মুকে বলো আবার একটা ছোট্ট ভাই বোন পয়দা করতে তাহলে আর একা একা লাগবে না। আমিও ছোট শালিকা পেয়ে না হয় ঘনঘন শ্বশুর বাড়ি যাবো।

কথাটা শুনে আরু আরিশের পেটে একটা ঘুষি মেরে বলল
— মি অভদ্র! এসব নিয়ে মজা করবেন না একদম। কদিন পর যখন তাদের নাতি নাতনি হবে তখন তো আর একা লাগবে না।

কথাটা শেষ করে আরু মুচকি হাসতেই আরিশ অবাক হয়ে বলল
— নাতি নাতনি হবে মানে!

আরু ঘাবড়ে গিয়ে বলল
— আরে বুঝলেন না? মধুর কদিন পরেই যখন বাচ্চা কাচ্চা হবে তখন তো তারা নানা নানু হবে তো নাকি।

আরিশ কিছু একটা ভেবে বলল
— ওহহ! আচ্ছা আরু পাখি তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?

আরু আরিশের হাত ধরে চেয়ার থেকে উঠে বলল
— একদম না। চলুন ওদেরকে এবার হলুদ দিয়ে আসি।

আরিশকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরু টেনে নিয়ে গেল স্টেজে।

মধু আরু কে দেখে খুশিতে আত্মহারা। আরু কে পাশে বসিয়ে বেশ কয়েকটা ফটো তুললো। একটা সময় মধুর হবু বরের সাথে আরিশের চোখাচোখি হলো। মধুর বর ভোলা চোখ নামিয়ে নিলো। আরিশ তা দেখে ফিক করে হেসে ফেলল কারন তার ও বোধহয় মনে পড়ে গেছে যে আরু ভোলাকে মাঝ রাস্তায় কিভাবে টাইট দিয়েছিলো।

হঠাৎ মধু বলে উঠলো
— আরিশ ভাইয়া তুমিও এসো।

আরিশ ওদের সাথে ফটো তুললো বেশ কয়েকটা।

—-

রাত 12.35

বিয়ে বাড়িতে এই রাত কোন রাত ই না। সব আত্মীয়দের বহু বছর পর এক সাথে দেখা করার উপায় অবলম্বন হলো এই বিয়ে বা এই জাতীয় কোন অনুষ্ঠান। কেও কেও উঠানে চেয়ার পেতে গল্প করছে আবার কেওবা ভোস ভোস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। আরাভ বাড়ি ফিরেছে অনেক আগেই। সানা অন্য ঘরে ঘুমিয়ে আছে। আরু আরিশের বুকের মাঝে রয়েছে। আরিশ আরু্র মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ অরু প্রশ্ন করে উঠলো
— আচ্ছা আপনার ফ্লাইট তো আর পাঁচ দিন পর তইনা?

— হমম। বাট আমি ক্যান্সেল করে দিয়েছি। আমি সিঙ্গাপুর যাবো না।

আরু তড়িৎ গতিতে আরিশের কাছ থেকে সরে এলো। উঠে বসে বলল
— কেন যাবেন না আপনি?

— আমার ইচ্ছা। এবার ঘুমাও।

কথাটা বলে আরিশ ঘুমাতে গেলেই আরু কঠিন স্বরে বলল
— নাহ আপনি যাবেন।

আরিশ অবাক হয়ে বলল
— মানে কি আরুপাখি! তুমি কি চাইছো?

— আমি চাই আপনি যান, এটা আপনার ক্যারিয়ারের প্রশ্ন।

— এই সময় আমার তোমার পাশে থাকা উচিত।

আরু ভ্রু কুঁচকে বলল
— কোন সময়?

আরিশ কিছুটা ভেবে বলল
— মানে এই যে তোমার পড়াশোনার সময় এখন। তুমি সবে ইমপ্রুভ করছো সবকিছুতে। আর আমি ছাড়া তাকে কেও সামলাতে পারে না।

— পারি, আমি পারি নিজেকে সামলাতে। আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আর হ্যাঁ আপনাকে একটা কথা বলতে চাই আমি।

— হমম বলো।

— আপনি যদি আমার জন্য আপনার যাওয়াটা ক্যান্সেল করেন তো ভেবে রাখবেন যে আমি আপনার সাথে কথা বলবো না আর। আর আপনি নিজেও খুব ভালো করে জানেন আপনার যাওয়াটা ঠিক কতোটা দরকারী।

আরু কথাটা বলে শুয়ে পড়লো।

আরিশ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। আরিশ হঠাৎ বলে উঠলো
— আরুপাখি।

— হমম।

— কালকে একটু আমার সাথে ক্লিনিক এ যাবে তুমি। সকাল সকাল।

আরু কোনরকম প্রশ্ন করলো না, উত্তরে বলল
— আচ্ছা।

আরিশ আরু কে জড়িয়ে শুয়ে রইল আর ভাবতে আরুর টেস্ট করালেই বিষয়টা ক্লিয়ার হবে। আর আরিশ জানে যে রিপোর্ট পজেটিভ আসবে তাই তখন সে তাদের বেবির বাহানাতে আর সিঙ্গাপুর যাবে না।

হঠাৎ আরিশের ভাবনার সুতো কেটে আরু বলল
— মি অভদ্র!

— হমম।

— প্রমিস করুন আপনি যাবেন।

— ঘুমাও তুমি।

— আগে বলুন আপনি যাবেন।

— আসলে আমাদের যাওয়াটা ক্যান্সেল হয়ে গেছে কোভিড এর জন্য।

আরু আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল
— মিথ্যা বলবেন না একদম। আপনি না যাওয়ার বাহানা খুঁজছেন।

হঠাৎ আরিশ উঠে গিয়ে ফোনটা নিয়ে একটা দেখিয়ে বলল
— দেখো। ভিসা ক্যান্সেল, কোভিড ঠিক হলে তখন আমারা আবার ভিসা পাবো। সো কোথাও যাচ্ছি না আমি এখন। এবার ঘুমাও।

আরু আরিশ কে জাপটে ধরলো। এসএমএস টা কোনরকম মিথ্যা নয়, তা সত্যি ছিলো আর তা আরু বুঝেছে, এ এম এস এর সময় দেখে, রাত ৯.৩৫ এ এসছে এস এম এসটা। আর তখন থেকেই আরিশকে বেশ খুশি মনে হচ্ছিল কিন্তু আরু কে সারপ্রাইজ দেবে বলে কিছু বলেনি। আরু খুশি হয়ে আরিশকে শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরতেই আরিশ বলল
— গুড নাইট মিস ড্রামা কুইন।

— গুড মর্নিং মি অভদ্র!

— হয়েছে, এবার নো মোর ওয়ার্ডস করে ঘুমাও।

— হি হি হি!

#চলবে,,,,

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

২৭.

— ডক্টর রিপোর্ট কখন পাবো? আই মিন একটু এমারজেন্সি আছে!

নার্সকে বলা আরিশের এই কথাটা আরুর কানে পৌছাতেই আরু চেয়ার ছেড়ে আরিশের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। সরু চোখে আরিশের দশকে তাকাচ্ছে যা এখনও আরিশের দৃষ্টিগোচর হয়নি। আরু হাতে হাত রেখে আরিশের দিকে তাকিয়ে আছে। নার্স একবার আরুর দিকে তাকালো। সে যেন জহুরির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। নার্স খানিকটা ভড়কে গেল। সে দ্রুত গতিতে বলল
— আপনাকে কল করে বলে দেওয়া হবে।

কথাটা আরু শুনতেই ছ্যাত করে বলে উঠলো
— কার নাম্বারে কল করবেন?

নার্সের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে তার বেফাস কথাতে আরু তাকে গিলে খাবে। সে অতি সন্তর্পণে বলল
— ম্যাডাম আপনার নম্বরে।

আরু ভ্রু জোড়া প্রসারিত করে বলল
— হমম।

আরু আরিশের হাতটা পাশ থেকে জাপটে ধরে বলল
— মি অভদ্র চলুন বাসায় যাবো আমার টায়ার্ড লাগে ভীষন।

আরিশ মাথা নাড়ালো। নার্স টা আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল। মি অভদ্র! এটা কেমন নাম!

বেশ মাঝামাঝি গতিতেই গাড়ি চালাচ্ছে আরিশ। আরু সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে আছে। আরিশ সামনে তাকিয়ে বলে উঠলো
— শরীর খারাপ লাগছে নাকি ভীষন?

— হমম। ওরা পুরো এক বোতল ব্লাড নিয়ে নেবে যেন এমন একটা ভাব করছিলো।হাতে ছুচ টাও না জোরে ফুটিয়ে দিয়েছে। নেক্সট টাইম এমন করলে আমি আপনার থেকে রক্ত নিয়ে নিবো বলে রাখলাম হু!

আরিশ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল
— তুমি ০ পজেটিভ আর আমি এ পজেটিভ। তুমি হলে সার্বজনীন দাতা। তুমি সবাইকে রক্ত দিতে পারলেও নিতে পারবে না। আর নিলেও উল্টো রিয়েকশান হবে।

আরু আরিশের দিকে ঘুরে বসলো আর বলল
— রাখুন তো আপনার সায়েন্স। আমি তো এমনি বললাম। শুনুন না।

— হমম বলো।

— আমি আজকে বিয়ে শেষ হলে রাতে বাসায় ফিরে যাবো।

আরিশ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো
— কেন?

— আমার থাকতে ভালো লাগছে না। কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে। আর এমনিতেও আমি সবাইকে বুঝিয়ে বললে কেও না করবে না।

আরিশ আর কোন কথা বলল না। আরিশ কে চুপ থাকতে দেখে আরু প্রশ্ন করলো
— কি হলো আপনি কিছু বলছেন না যে! আপনি থাকতে চান! আপনি থাকতে চাইলে আমি থেকে যাবো।

আরিশ হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিল। গাড়ির ব্রেকে আরুর মনোস্থির হলো না। আরিশ গাড়ি থেকে নেমে গেল।
আরু অবাক হলো। হঠাৎ করে রাস্তার মাঝে এভাবে গাড়ি থামানোর বিষয়টা ওর মস্তিষ্ককে ছুঁতে পারলো না। আরু ও দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। বাইরে কুয়াশায় ঢাকা। সকাল নটার মতো বাজে। নেহাতই আজকে শীতের প্রভাবটা অন্য দিনের তুলনায় বেশি কিছুটা হলেও। সকালের কুয়াশা ভাবটা পুরোপুরি কাটেনি। আরু গাড়ি থেকে নেমে আরিশ এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। অনেকখন আরিশ এর পাশে দাঁড়িয়ে রইলো সে তবে আরিশ অনুভূতি শূন্য। তার চাল চলন যেন থমকে গেছে। সোয়েটারের পকেট থেকে হাতটা বার করে আরিশ এর কাধে হাত দিতে গেলেই আরিশ খপ করে হাতটা ধরে ওর মুঠিবদ্ধ করে নিয়ে আরুর হাত সহ নিজের হাত ওর সোয়েটারের পকেটে ডুকিয়ে নিল। আরু মৃদু হাসলো। আরুর হাসির রেশ কাটলো না, আরিশ ততখনে বলে উঠলো
— একটা সত্যি কথা বলবো? বিশ্বাস করবে তো?

আরু মুচকি হাসলো। আরিশ এর কথা যেন তাকে অবাক করতে পারলো না এমন সেই হাসি।

— আপনিও মিথ্যা কথা বলেন হু?

আরিশ সামনের দিকে তাকিয়ে নির্বিকারে বলল
— মানুষ তো। ফেরেস্তা তো নয় যে মিথ্যা বলবো না।

আরু এবার আরিশ এর সামান্য গা ঘেষে দাঁড়িয়ে রইলো।

— তা ঠিক। তা এমনও সত্যি হয় যেটা শুনলে মিথ্যা মনে হবে।

আরিশ ফিচেল হাসলো। যে হাসিতে ফুটে উঠলো তার বলা মিথ্যার প্রতি এক বিরক্তি।

— আমিও মিথ্যা বলি। আমি যে তথাকথিত ভালো মানুষ সাজার অভিনয় করি এটাও একটা বড়ো সত্যি! আমি মানুষটাই তো মিথ্যা দিয়ে!

আরিশ হয়তো আরও কিছু বলতে চাইলো কিন্তু আরু বলতে দিলো না। আরু রেগে ধমক দিয়ে বলল
— ব্যাস! অনেক হয়েছে। আর কিছু শুনতে চাইছি না। আপনি মিথ্যা না সত্যি তা প্রমাণ আমার কাছে করার দরকার নেই। সেটা উপরওয়ালা বুঝে নেবেন। আর মানুষ মিথ্যা কথাটা শখে বলে না। পরিস্থিতি মানুষকে মিথ্যা বলতে শেখায়। যাই হোক আপনার যদি এইসব কথা বলার থাকে তাহলে আমি শুনতে চাই না। বাসায় চলুন। আমি টায়ার্ড।

কথাটা বলে আরু এক পা পেছাতেই অরিশ বলল
— আরু পাখি শোনো।

— আরু জবাব দিলো না। আরিশ এর চোখের দিকে তাকালো। শান্ত আর শীতল চাহনি। আরু রেগেও রাগটাকে লাঘব করলো। অপরদিকের মানুষ টা যখন এতো শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় তখন চাইলেও রেগে থাকা যায় না, সে বন্ধু হোক আর শত্রু। আরুর চাহনি আরিশকে জানিয়ে দিলো যে সে যা বলতে চায় যেন বলতে পারে।

আরিশ সামনের দিকে তাকিয়ে বলল
— ওই যে সামনের দিকে তাকাও। বলোতো ওখানে কি আছে?

আরূ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকালো। কপাল কুঁচকে বিরক্তি ভাব নিয়ে বলল
— রাস্তা হবে হয়তো।

আরিশ এক নিমেষে জবাব দিল
— না!

আরু কপালের ভাজ মেলে বলল
— তবে!

–ওখানে একটা পুকুর আছে!

আরু অবাক হয়ে বলল
— কি করে বুঝলেন? দেখা যাচ্ছে না তো কুয়াশায়!

আরিশ মাটি থেকে একটা ঢিল ছুড়ে পুকুরে ফেলতেই টপ করে আওয়াজ হলো
— তাই তো!

আরিশ এবার মুচকি হেসে বলল
— হমম এবার চল।

আরু অবাক হলো। গাড়িতে বসলো দুজনেই। আরিশ গাড়ি স্টার্ট দিতেই আরু বলল
— আপনি হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন করলেন কেন?

— আসলে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমরা অনেক সময় কোন জিনিস যাচাই না করেই সহজেই আন্দাজ করে নিয়ে মনের মধ্যে তা নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারনা পুষে রাখি যার সত্যতা যাচাই করি না যে আমরা যেটা দেখছি সেটা আদেও ভুল বা ঠিক কি না।

আরু আরিশের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। সত্যিই তাই। আমরা অনেক সময় যাচাই না করেই অনেক কিছু বিশ্বাস করে ফেলি যা আমাদের কষ্ট দেয়। তাই যাচাই না করে কোন কল্পনা জল্পনা করা উচিত না।

—-

মধুর বিয়েটা শেষ হলো! যাওয়ার সময় অনেক কান্নাকাটি করেছে মধু। সবাই কম বেশি কান্না করেছে। মধু এই বাড়ির এক মাত্র মেয়ে। আজ আরুর নানা ভাই বেঁচে থাকলে কতো খুশি হতেন।

— ফুপি, আম্মু আমি আসছি। আমি আর উনি বাসাতে যাচ্ছি পৌছে ফোন করে দেবো।

অনিকা খান ব্যাস্ত হয়ে বললেন
— আমি যাই না মা। দেখ তোরা একা একা সামলাতে পারবি না সব।

— নাহ তোমরা থাকো। এমনিতেও তো তারা পরশু দিন ফিরছোই। আর আমার কারনে তো তুমি কোথাও যেতেও পারো না তাইনা। আর সানা তো যাচ্ছেই আমার সাথে চিন্তা করো না।

কোনরকমে ওনাদেরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নামে নামে বিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। গাড়ি চলছে আর আরু আরিশকে বলল
— আপনি রেডি তো মিঃ অভদ্র!

আরিশ ভ্রু কু্চকে তাকিয়ে বলল
— কেন? কিসের জন্য?

আরু আরিশের কাছে গিয়ে কানে কানে বলল
— বাসায় চলেন বুঝতে পারবেন।

আরিশ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল
— ব্যাপারটা কি?

— বেশি কিছু না। বাসায় শুধু আপনি আর আমি! মানে বুঝছেন?

আরিশ অবাক হয়ে বলল
— কি রোমান্স করবা? তা আপনি এতো রোমান্টিক হলেন কবে শুনি মিস টুইটুই!

আরু একটা ডেভিল স্মাইল দিয়ে বললো
— রোমান্টিক কে হবে। আমি তো আপনাকে কালকের দিনের জন্য আমার এসিসটেন্ট বানিয়ে রাখবো। যাকে বলে পি এ।
আপনাকে শেখাবো কালকে হাউজ হাজব্যান্ড কাকে বলে! 😉

আরিশ একটু বিষম খেলো আরুর এমন কথা শুনে। আরুর কথার রেশ কাটলো না ড় গাড়িটা একটু তাল হারালেই আরু বলল
— সাবধানে সাবধানে। এতো অবাক হলে হবে? আগে আগে দেখো হোতা হে ক্যায়া।

#চলবে,,,