কারনে অকারনে ভালোবাসি০২ পর্ব-২৮+২৯

0
881

#কারনে_অকারনে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

২৮.

— আইসক্রিম খাবো আমি। এনে দিন।

ঘুমঘুম সুরে আরিশের কাছে আরু আবদার করে উঠলো। আরিশ আরুর কথা শুনে বিষন্ন কন্ঠে বলল

— আইসক্রিম খাবে মানে, রাত কটা বাজে কোন হিসাব আছে? তার ওপর শীতের রাত। চুপচাপ ঘুমাও। আই এম টায়ার্ড এনাফ।

আরু আরিশের বুকে দুটো ঝমাঝম কিল মেরে বলল
— শীত কালে আইসক্রিম খাওয়ার যে আনন্দ সেটা আপনি বুঝবেন কি করে। ওই জন্যই তো ফুপা বলে যে আপনার মুখে জন্মে্র সময় মধু দেওয়া হয়নি নিমপাতা দেওয়া হয়েছিলো।

আরিশ ভ্রু কুঁচকে অবাক হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে বলল
— কি! বাবা এসব বলেছে? আমার মুখে নিমপাতা! ওরা আমাকে নিয়ে এসব ভাবে।

আরু মাথা নাড়িয়ে বলল
— হমম হমম। ওরা আপনার সমন্ধে আরও অনেক কিছুই ভাবে যা আপনিও ভাবতে পারবেন না। যেমন,,,।

কথাটার মাঝে একটা কৌতুহল রেখে দিয়ে আরু আর কিছু বললো না চুপ হয়ে গেল। আরিশ ধমকের সুরে বলল — কি হলো বলো কি ভাবে আর।

আরু মাথা নাড়ালো। — উহু। আপনিই বরং ওদেরকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন যে ওরা বরং কি ভাবে।

আরিশ এবার অনেক জোরে একটা ধমক দিয়ে বলল
— চুপ। একটাও কথা না ঘুমাও। কোন আইসক্রিম হবে না। এক পা নড়ালেও খবর আছে।

আরিশের কথাটা শেষ হতে না হতেই আরু ওর একটা পা ব্ল্যাঙ্কেটের ভিতর থেকে বার করে আরিশের গায়ের ওপর তুলে দিয়ে বলল
— এই দেখুন পা নাড়ালাম না পা বাইরে বার ও করে ফেলেছি। দেখি আপনি কি করেন। হু হু!

আরিশ ফেড আপ হয়ে বলল
— তুমি একটাও কথা শোনোনা আরুপাখি। ডিপ ফ্রিজের মধ্যে আইসক্রিম এর বক্স আছে যাও।আর খেয়ে এসে চুপচাপ ঘুমাবে। কোন কথা না।

কথাটা শুনেই আরু এক ঝটকায় গা থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা ফেলে দিয়ে হুড়মুড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল যেন সে এটার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। আরিশ বিরক্ত সূচক ভঙ্গি নিয়ে বলল
— সবসময় আমার কথার অপোজিটে এই মেয়ের যাওয়ায় লাগবেই। আমি যেটা না করবো সেটাতেই ওনার লম্বা হ্যাঁ!

কথাটা বলে আরিশ মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলো।

গুনে গুনে প্রায় কুঁড়ি মিনিট হতে চলল, ঘড়ির কাটা তিনটে ছুঁয়ে ফেলল। আরিশের ঘুম আসেনি। আরুর জন্যই মূলত অপেক্ষা। হঠাৎ ব্ল্যাঙ্কেটটা মুড়ি দিতে যাবে তখনই একটা বেসুরে মেয়েলি কন্ঠের আওয়াজ পেলো আরিশ।

— গুমনাম হে কোয়ি। বাদনাম হে কোয়ি। কিসকো খাবর কন হে এ। আনজাম হে কোয়ি।

আরিশ বিরক্ত সূচক ভঙ্গিতে বলল
— নো ওয়ান বাট মিস ড্রামা কুইন।

আরিশ ঘুমানোর চেষ্টা করলো কিন্তু গানটা এতো বার করে কানে আসছে যে ঘুমানো অসম্ভব।

আরু আইসক্রিমের বাক্সটা হাতে নিয়ে হাটছে আর খাচ্ছে অনবরত সানার রুমের সামনে পাইচারি করছে।
আইসক্রিম এর বক্স থেকে ঠান্ডা ধোঁয়া উঠছে আরু স্বল্প আলোতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।
মাঝ রাতে এমন গান শুনে সানার গলা শুকিয়ে এলো। ফোনে আরাভকে ফিসফিসিয়ে বলল
— দেখুন না কে যেন গান গাইছে। আমার ভয় লাগছে খুব। কই আমাদের বাসায় এমন ভূতের আসর তো আগে কখনো হয়নি।

আরাভ সানাকে শান্তনা দিয়ে বলল
— বেরিয়ে দেখো আসলে কি। দেখো তোমার ভাবী গান করছে হয়তো তোমার ভাইয়াকে জ্বালানোর জন্য। তোমার ভাবীর তো আবার গুনের শেষ নাই।

কথাটা বলে আরাভ হো হো করে হাসতে লাগলো। সানা বিরক্ত হয়ে বলল
— আমার ভয় লাগছে আর আপনি হাসছেন? দেওয়া লাগবে না আপনার সাহস।
কথাটা বলে সানা ফোনটা কেটে দিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো।
আরু আইসক্রিম খাচ্ছে আর সারাবাড়ি গান করতে করতে ঘুরছে।
সানা ফোনটা নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে আরিশকে ফোন করলো। আরিশ ফোনটা দেখেই বুঝতে পারলো যে কেসটা কি। কলটা ধরলো না আরিশ।

বিছানা থেকে নেমে রেগে গিয়ে বলল
— এই মেয়েটা দেখছি রাত বিরেতে শান্তিতে ঘুমাতেও দেবে না।

আরিশ ওয়াশরুম থেকে এক বালতি জল ভরে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সানা ক্রমাগত কল করছে।

আরিশ বালতিটা নিয়ে সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়ালো, উদ্দেশ্যে আরু আসলেই আরুর গায়ে ঢেলে দিবে। এটা হলো রাতবিরেতে কারোর ঘুম নষ্ট করার পানিশমেন্ট। আরিশ বালতিটা হাতে করে নিয়ে দাঁড়ালো।

আরু নীচ থেকে প্রায় চারটে সিঁড়ি ওপরে দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরে আ্যকোরিয়ামের মাছ দেখছে আর বিড়ডিড় করে কিছু বলছে। বালতি থাকে কিছু পরিমান জল চুইয়ে চুইয়ে নীচের সি্ড়িতে পড়তে লাগলো। হঠাৎ ঠান্ডা জল আরুর পায়ে স্পর্শ হতেই আরু চমকে উঠলো। পা দিয়ে জলটা বেয়ে যাচ্ছে। আরু পায়ের দিকে তাকালো। কিছু তরল জাতীয় জিনিস নীচে বেয়ে যাচ্ছে। ভয়ে আরুর হাত থেকে আইসক্রিমের বক্স পড়ে গেল। ভয়ে আরুর গলার শুকিয়ে এল। গড়িয়ে পড়া জলটাকে সে ভাবলো যে কিছুর ঠান্ডা রক্ত। আরু পিছন ঘুরে অনেক সাহস নিয়ে তাকালো। দেখলো রে একটা লম্বা ছায়ামূর্তি হাতে কিছু একটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে কিছু পড়লে। আরুর আর সাহসে কুঁলালো না। জোরে শব্দ করে চেঁচিয়ে উঠলো আর মাথা খানিকটা ঘুরে উঠলেই পা পিছলে চার ধাপ সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল। সানা হঠাৎ উঠে বসলো। আরুর গলার আওয়াজ পেয়ে বলল — আরুর গলা না? আরু আর ভূত!

তারপর আরুর কি হলো তা আর মনে নেই। সকাল বেলা যখন ঘুম থেকে উঠলো তখন দেখলো সে বিছানায় শুঁয়ে আছে আর দূরে সোফায় আধশোয়া হয়ে তার দিকে ড্যাপড্যাপ করে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে আরিশ। আরিশের রাগী চোখ জোড়া দেখে আরু
বিড়বিড় করে নিজেই নিজেকে বলল
— আমিতো ঘুমচ্ছিলাম। হিহি। তাও উনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন যেন মনে হচ্ছে গিলে খাবেন। ওহ আমি তো ভুলেই গেছিলাম যে উনি জন্মগত নিমপাতার ফ্যাক্টরি।

আরিশের চাহনিটা এখনো আগের মতোই। রেগে আছে বেশ। আরু অরিশের দিকে তাকিয়ে হিহি করে হেসে একটা বোকাবোকা ভাব করে বলল
— গুড মর্নিং নিমপাতার ফ্যাক্টরি। সরি মিস্টার অভদ্র!

আরিশ আরুর কথার ভ্রূক্ষেপ না করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরু ভ্রু কোঁচকালো।
–যাহা বাবা। আমি আবার কি করলাম! নামটা বোধহয় পছন্দ হয়নি। আসলে একসাথে এতো নাম যে কোনটা নেবে আর কোনটা রাখবে খুশিতে হয়তো বুঝে উঠতে পারছে না। 💁‍♂️

আরিশ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সকাল এগারোটা বাজে। আরু বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে তখনই হঠাৎ পুরো শরীর জুড়ে ব্যাথা অনুভব করতেই আহ করে ধীমে কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো। সোজা হয়ে বসে ব্ল্যাঙ্কেটটা সরাতেই দেখলো পায়ে ব্যান্ডেজ করা। মাথায় হাত দিয়ে দেখলো কপালেও ব্যান্ডেজ করা। হাতে কিছু কিছু জায়গায় আছড়ে গেছে আরু শুকনো ঢোক গিলে হাত পা চেক করতে নিলেই সানা রুমে এলো। সানা কে আসতে দেখে আরু চমকে গেল। সানার মুখে গম্ভীরতার ছাপ। আরু মাথা নীচু করে আছে। কথা বলছে না কোন। সানা নিস্তব্ধতা ভেঙে ড়লল
— ভাইয়া কথা বলছে না নিশ্চয়ই?

আরু মুখ তুলে মাথা নাড়ালো।

সানা একটু জোরেই চেঁচিয়ে বলল
— বলবেও না তো। কি করেছিস তোর হিসাব আছে? কাল রাতে আমাকে কতোটা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলিস সেটা জানিস?

আরু মিনতির সুরে বলল
— সরি।

— সরি! আমি তো ভাবলাম বাসায় ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপর কিছুখন পর যখন যার গলার আওয়াজ শুনতে পায় তখন দেখি তুই ফ্লোরে পড়ে আছিস আর ভাইয়া তোকে ডাকছে তোর কোন সাড়া না পেয়ে। তারপর তোকে নিয়ে রুমে আসে।
ভাইয়া অনেক রেগে আছে কাল রাত থেকে, নাস্তা অবধি করেনি এখনো। মাঝে মাঝে এমন কাজ কেন করিস যেটা দেখে ভইয়া রেগে যায়।

আরুর গলা ধরে এলো। ও বুঝতে পারেনি এমন কিছু হবে। আসলে বিয়ে বাড়ি গিয়ে হলুদের দিন মধুর একটা দশ বছর বয়সী কাজিনের কাছে শুনেছিল যে একদিন সে নাকি মাঝরাতে ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য একা একা হেটে যেতে গিয়ে ভূত দেখতে পেয়েছিলো আর সেই পিচ্চি কাজিন আরুকে বলেছিলো যে সে যদি এমন করে তাহলে সে ও দেখতে পাবে। বাচ্চারা সবসময় সত্যি কথা বলে এই ধারনাটা নেওয়াই আরুর বড়ো ভুল। তাই আরুও এজন্য একা একা সারা বাসা ঘুরে ঘুরে দেখ ছিলো কোথাও কোন ভূত আছে কি। কিন্তু তারপর ও যা দেখলো তাতে একেবারে অঞ্জান হয়েই পড়েই গেল সিঁড়ি থেকে।

আরু কথাগুলো নিজের মনের মাঝেই দমিয়ে রাখলো সানা কে কিছু বললো না। চুপ থাকতে দেখে সানা বলল
— পায়ের কি অবস্থা। হাটতে পারবি?

আরু চোখের জলটা মুছে বলল
— হম। তুই বস আমি ওয়াশরুম থাকে ঘুরে আসি।

— আমি হেল্প করছি। একা কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। ভাইয়া শুনলে আমাকে ঝাড়ি দিবে।

আরু নীতু কন্ঠে বলল
— নাহ তুই থাক আমি পারবো।

সানা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল
— তুই ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি নাস্তা নিয়ে আসি। ভাইয়া কোথায় গেল আর বলল তোকে খাইয়ে দিতে।

আরু মাথা নাড়িয়ে আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলো না।

সানা নাস্তা আনতে চলে গেল।

–ভাইয়া কোথায় তুই? জলদি বাসায় আয়।

— আমি ড্রাইভ করছি। আর দশ মিনিট লাগবে আসতে।

— হ্যাঁ তাড়াতাড়ি আয়। আরু ওয়াশরুমে সেই একঘন্টা আগে ঢুকেছে এখনো বার হচ্ছে না। কেঁদেই চলেছে একনাগাড়ে। আমি অনেক ডাকছি শুনছে না।

আরিশ নরম কন্ঠে বলল
— হমম আসছি।

#চলবে,,,,,

#কারণে_অকারণে_ভালোবাসি০২
#সুরাইয়া_আয়াত

২৯.

— আরুপাখি বেরিয়ে এসো ওয়াশরুম থেকে। কতখন ধরে ডাকছি তোমার কানে যাচ্ছে না?

দরজায় কড়াঘতের শব্দ তীব্র। দরজা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। আরুর কান্নার শব্দ দরজা ভেদ করে আসছে। আরুর দরজা খোলার নামমাত্র নেই তাতে আরিশের রাগ আর বিরক্তি দুই ই বেড়ে চলেছে। অপরদিকে আরু নির্বাক। আরিশের সানা আর গলার উচ্চস্বরে সানাও খানিকটা ভয় পেয়ে গেল। আরিশের সাথে সেও ডাকতে লাগলো।

— আরু দরজা খোল। দেখ ভাইয়া কতোখন ধরে ডাকছে তোকে। আরু দরজা খোল। কাঁদছিস কেন এমন। দেখ তোর শরীর খারাপ আরও শরীর খারাপ করবে।

আরিশ একটা লম্বা শ্বাস নিলো। রাগটাকে কমানোর প্রানপনে চেষ্টা চালাচ্ছে সে। সানার প্রচেষ্টাকেও ব্যার্থ প্রমান করলো আরু। আরিশ সানার দিকে শান্ত তাকিয়ে তাকিয়ে বলল
— সানা তুই এখন যা আমি দেখছি।

সানা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
— নাহ আমি আছি। আরূ আগে বার হোক তারপর না হয় আমি যাচ্ছি।

আরিশ চোখ বন্ধ করে রাগী ভাব নিয়ে বলল
— সানা আমি নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছি দয়া করে আমার রাগটাকে আর বাড়াস না। আরুপাখি বার হলে আমি নিজেই তোকে ডেকে নেবো তুই এখন যা।

সানা আরিশের চোখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারলো না। সেখান থেকে নির্বিকারে চলে গেল। আরিশ দরজায় হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল
— আরুপাখি! কি হয়েছে? কাঁদছো কেন? আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি? না আমি তোমাকে বকাঝকা করেছি আর না চড় থাপ্পড় মেরেছি তো দরজা খুঁলছো না কেন?

এবার অপর পাশ থেকে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দের সাথে আধো আধো স্বরে আরু বলল
— আপনি চলে যান এখান থেকে। প্লিজ আমাকে একা থাকতে দিন। আমি আর বাঁচতে চাই না।

হঠাৎ আরুর মুখে এমন কথা শুনে আরিশের মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। তড়িৎ গতিতে শিরা উপশিরার মধ্যে যেন আগুনের ঝলকানি বয়ে গেল। গগনবিদারী একটা চিৎকার দিয়ে বলল
— এই মেয়ে একদম চুপ। আর একটাও বাজে কথা বললে আমিই তোমাকে শেষ করে নিজেই শহীদ হয়ে যাবো। তাই বলছি আজাইরা কথা না বলে আর আমার রাগ না বাড়িয়ে বেরিয়ে এসো।

আরুর থেকে কোন পতিক্রিয়া এলো না।

— শেষ বারের মতো বলছি দরজা খুলবে নাকি আমি দরজা ভাঙবো কোনটা?

আরুর কান্নার আওয়াজ বেড়ে গেল। আরিশ এবার দরজা ধাক্কা দিতে শুরু করলো। বেশ কয়েকবার দরজা ধাক্কা দিতে লাগলো, সে ভাবলো যে এই বুঝি আরু ভয় পেয়ে দরজা খুলবে কিন্তু তেমনটা কিছুই হলো না। আরিশ এবার সজোরে একটা ধাক্কা দিতেই দরজা ভেঙে গেল। সে নিজেও তাল সামলাতে না পেরে খানিকটা হুমড়ি খেয়ে পড়লো আবার নিজেকে সামলেও নিলো। আরিশ আরুর দিকে তাকিয়ে দেখলো আরু ফ্লোরে গুটিশুটি মেরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আরিশের রাগটা দ্বিগুণ হলো। আরুর দু বাহু টেনে ধরে একপ্রকার টেনে হিছঁড়ে দাঁড় করালো। আরুর কান্না থামছে না। আরিশ আরুর মুখটা চেপে ধরে বলল
–সমস্যা কি! কথা কানে যায় না? কখন থেকে ডাকছি শুনতে পাও না।

আরু আরিশের দিকে এবার চোখে চোখ রেখে তাকালো, চোখ থেকে অশ্রুধারা গড়াচ্ছে আর লাল আভায় চোখটাকে যেন কেও অতিরঞ্জিত করে দিয়েছে। আরিশ আরুর চোখের দিকে তাকিয়ে আরুর মুখ থেকে হাত সরালো, বুকের পাশে এক চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করছে সে। আরু নির্বাক।

আরিশ আরুর দিকে ঝুকে নীচু স্বরে আর শান্ত ধারায় বলল
— আরুপাখি কথা বলো!

আরুর চোখের জলটা চোয়াল গড়িয়ে পড়ার পর তারপর যেন সে চোখে আর জল না নিজের প্রতি রাগ আর ঘৃনা ফুঁটে উঠলো। আরুর দৃষ্টি হতে লাগলো হিংস্র। আরিশ আরুর মুখের বুলি ফোটাতে বলে উঠল
— কথা বলো না হলে কিন্তু আমি এবার সত্যি সত্যিই সিঙ্গাপুর চলে যাবো।

হঠাৎ আরুর মাঝে তীব্র হিংস্র ভঙ্গি ফুঁটে উঠলো। আরিশকে গায়ের সমস্ত শক্তি উজাড় করে একটা ধাক্কা মারলো। আরিশ ছিটকে পড়লো দূরে।

আরু রাগী চোখে আরিশের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিশ মেঝেতে পড়ে আছে আর অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।

আরিশ ফিচেল কন্ঠে বলল
— আরুপাখি!

আরু আবার নীচে বসে পড়লো, হাত পা গুজে মুখ ঢেকে নিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল
— আপনি চলে যান। চলে যান আপনি। যে মেয়ে একটা ছোট্ট প্রানকে রক্ষা করতে পারে না তাকে একা করে সবার ছেড়ে চলে যাওয়াই ভালো।

আরুর কন্ঠস্বরে তীব্র বেদনা। আরুর কন্ঠস্বর ঝিমিয়ে আসছে। আরুর কথা শুনে আরিশের কন্ঠস্বর কাঁপতে লাগলো। মেয়েটা কি বলছে এগুলো!

আরিশ উঠে নিজেকে কোনরকম সামলে উঠে আরুর কাছে ছুটে গেল। হাটু গেড়ে আরুর কাছে বসে আরুর গালে হাত রেখে বেশ কাঁপা কন্ঠে একটা মিথ্যা হাসি ফুঁটিয়ে বলল
— আরুপাখি তুমি কি বলছো এসব? কিছু হয়নি তোমার।

আরু কাঁদছে তবে শব্দহীন কান্না, যে কান্নায় বুক ফাটে তবে মুখ ফোটে না।
আরু কাঁদতে কাঁদতে বলল
— আমার মনে হয় এই পৃথিবীতে আপনার মতো আনলাকি পুরুষ আর দ্বিতীয় টি হয়না। যে পৃথিবীর সব ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্যতা রাখলেও শুধুমাত্র আমার মতো একটা মেয়ের জন্য কিছু পায়না।

আরিশ মৃদু ধমকে বলল
— এই মেয়ে থামবে! চুপ, একদম চুপ। তোমার জন্যই আমি এই পৃথিবীতে নিজেকে সবচেয়ে লাকী মনে করি তাই এইসব বলা বন্ধ করো আর কি হয়েছে বলো।

আরু ওরাল থেকে আরিশের হাত নামিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগলো
— না আপনি আনলাকি ভীষন আনলাকি আর শুধু আমার জন্যই। আমি নিজেই নিজের বেবিকে বাঁচাতে পারি না সে আপনার জীবনে ভালো কিছু আনবে সেটা কি করে ভাবলেন আপনি।

আরিশ অবাক হলো অনেকটাই।

— কি বলছো এসব?

— যা বলছি ঠিক বলছি। আমি এতদিন যানতাম যে আমি মা হতে পারবো না কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমি অনেক আগেই জানতাম আমি মা হতে পারবো। ডক্টর মিতাই আমাকে বলেছিলেন। উনি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন আমার জোরাজুরিতে, উনি এটাও বলেছিলাম কন্সিভ করলে আমার অনেক কম্পলিকেশন আসবে কিন্তু আমি তা জানা স্বত্তেও একটা বেবি চেয়েছিলাম, নিজের জন্য না শুধু আপনার জন্য। আমি জানি আপনি বাচ্চা ভীষন ভালোবাসেন আর আপনার জন্য এটা কতোটা কষ্টদায়ক আমি বুঝি। আমি নিজের জীবন দিয়ে হলেও আমার সন্তানকে এই পৃথিবীতে আনতাম শুধু আপনার জন্য, আপনার হাতে তুলে দিয়ে না হয় আমি হারিয়ে যেতাম।

আরিশের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাত মুঠিবদ্ধ করে নিলো।
আরু তখনও বলতে লাগলো।

আর সেদিনের জন্য গিলটি ফিল করেন কিন্তু আপনি সেদিন আপনার দ্বারা সেই ভুলটা করতে আমিই বাধ্য করেছিলাম। আমি জানতাম যে এবার নিশ্চয়ই ভালো খবর আসবে। কিন্তু কি হলো দেখুন। কালকে অযথা ভূত দেখার চক্করে আমি মাঝরাতে এতো রঙ্গতামাশা করলাম আর সকালে উঠে যখন ওয়াশরুমে ঢুকলাম তখন দেখলাম ব্লিডিং শুরু হয়েছে। এখন তো আমার মনে হচ্ছে আমি আসলে কনসিভ ই করিনি। আমার মনেও হয় না যে কনসিভ করার ক্ষমতাও আমার মাঝে আছে। এতদিন মিথ্যা আশা নিয়ে আমি বেঁচে ছিলাম। আমি যতোই বলি আমি স্ট্রং কিন্তু আমি ভিতর থেকে ততোটাই দূর্বল। বিশ্বাস করুন আপনি অনেক ভালো কিছু ডিজার্ভ করেন। আমার মতো একটা মেয়েকে আপনার জীবনে রেখে আর ভুল করবেন না। আমার আর এসব ভালো লাগছে না। আমি আপনাকে প্যারা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারলাম না।

আরুর কথাটা শেষ হতে না হতেই সজোরে আরুর গালে একটা থাপ্পড় দিলো আরিশ। গালটা চেপে ধরে বলল
— চাইলেও তোর আমার থেকে মুক্তি নেই সে তুই যতো যাই করিস না কেন। তুই আমার ছিলিস আর আমারই থাকবি।

কথাটা বলে আরুর হাত টেনে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ছুড়ে ফেললো।
আরু গিয়ে বিছানায় হুমড়ি খেয়ে পড়লো। মুখ উঁচু করে তাকাতেই দেখলো কিছু রিপোর্ট রয়েছে বিছানায়। আরু মুখ ঘুরিয়ে আরিশের দিকে তাকালো। আরিশ জোরে একটা ধমক দিয়ে বলল
— পড় রিপোর্ট এ কি লেখা আছে।

আরু কেঁদে দিল। আরিশ রিপোর্টটা নিয়ে আরুর হাতে ধরিয়ে বলল
— এমন জোরে পড়তে হবে যেন পাশের বাসার আন্টি অবধি রিপোর্ট এ কি আছে জানতে পারে।

আরু আরিশের এমন রুপ দেখে ভয় পেয়ে গেল। রিপোর্ট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল
— প্লিজ আপনি শান্ত হন।

আরিশ বিছানায় ধাক্কা দিয়ে আরুকে ফেললো। রিপোর্ট গুলো মেঝেতে ফেলে বলল
— এই বাচ্চাও আমার লাগবে আর এই বাচ্চার মা কেও আমার জীবিত চাই এট এনি কস্ট। আর তুমি ততদিন আমার কাছে আসবে না যতদিন না নিজের জন্য বাঁচতে শেখ আর নিজেকে ভালোবাসতে শেখ।
এন্ড আই হেট মাইসেল্ফ।

কথাটা বলে আরিশ বেরিয়ে গেল। আরু বিছানায় ওভাবেই পড়ে রইলো কতখন তা বলতে পারে না। সময় তার নিয়মেই চলছে তবে আরুর চোখের জলের এ সমাপ্তি আর ঘটলো না সেদিন।

#চলবে,,,,