কি আশায় বাঁধি খেলাঘর (০২)
মনোয়ারা বেগম রেগে গিয়ে খুন্তি হাতে নিয়ে স্বামীর সামনে এসে বললেন,”বিয়ে হয়েছে ৩২ বছর,সবসময় দেখছি কথায় কথায় তুমি আমার ভুল ধরো।”
হাসনাত সাহেব জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে জবাব দিলেন,”৩২ বছর নয়,৩৪ বছর হবে বিয়ের।”
মনোয়ারা বেগম আরো রেগে গেলেন হাসনাত সাহেব আবারও তার ভুল ধরায়।গরম খুন্তি ছুঁড়ে মারলেন কোন দিকে খেয়াল না করেই।
নিষাদ সিড়ি বেয়ে নামছিলো নিচের দিকে,খুন্তি মুখে লাগতে যাচ্ছে দেখে ধরে ফেললো নিষাদ খুন্তি।
তারপর মা’য়ের সামনে এসে বললো,”কি ব্যাপার মা?
তুমি তো দেখছি আমাকেই ছ্যাঁকা দিতে খুন্তি দিয়ে,বাবার উপর রাগ করে আমাকে শাস্তি দেওয়া!
ভেরি ব্যাড!”
মনোয়ারা বেগম সমান রেগে বললেন,”তা-ও তো বাছা বন্ধুদের সামনে বুক ফুলিয়ে,গর্ব করে বলতে পারতে জীবনে একটা ছ্যাঁকা খাইছি।তোমার যা স্বভাবচরিত্র,প্রেম ট্রেম তো করতে পারলে না একটা।”
হাসনাত সাহেব এতোক্ষণের ঝগড়া ভুলে গিয়ে সুর মেলালেন স্ত্রীর সাথে।ছেলের দিকে তাকিয়ে বলিলেন,”তুমি জানো,তোমার মতো বয়সে আমি কতোবার ছ্যাঁকা খেয়েছি?
তোমার মা ছাড়া আমার বাকী ৭-৮ টা প্রেম সবগুলোতেই আমি ছ্যাঁকা খেয়েছি,ছ্যাঁকা খাওয়া মূল উদ্দেশ্য না,প্রেমে অংশগ্রহণ করাটাই মূল উদ্দেশ্য। আমি তো ৮-৯ বার প্রেমে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি অথচ আমার ছেলে হয়ে তুমি এতোটাই ষ্টুপিড হয়েছ যে একটা প্রেমও করতে পারলে না এই জীবনে!
তোমাদের মেডিকেলে কি কোনো ছাত্রী নেই না-কি?
অন্তত মানুষ ক্রাশ খায়,তুমি তো তাও খেতে পারলে না আজও।আমার তো ক্রাশের সংখ্যাই ছিলো শতাধিক। ”
নিষাদ কিছু না বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলো,হাসনাত সাহেব খেয়াল না করলেও নিষাদ খেয়াল করেছে মনোয়ারা বেগমের মুখ রেগে গিয়ে লাল হয়ে গেছে।
মনোয়ারা বেগম তেড়ে গিয়ে বললেন,”কি বললে তুমি,হ্যাঁ কি বললে এটা তুমি?
আমার আগেও এতো প্রেমিকা ছিলো তোমার?
আর ক্রাশ কি-না ১০০ এর বেশি?
সত্যি কথা এতোদিনে মুখ থেকে বের হলো তোমার? ”
হাসনাত সাহেব নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে যাচ্ছেন বুঝতে পেরে নিষাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”চল রে ব্যাটা,জগিং এর সময় চলে যাচ্ছে। ”
আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেলেন বাসা থেকে।পিছন থেকে হাসতে হাসতে নিষাদও বের হয়ে গেলো দৌড়ে।
.
.
.
হোস্টেলের মাঠে মেয়েরা সবাই লাফাচ্ছে।হোস্টেলের মেট্রন নিজেও মেয়েদের সাথে ব্যায়াম করছেন।এই হাড় কাঁপানো শীতেও প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হয়,মাঠে দৌড়াতে হয়।সবার পিছনে চন্দ্র ধুপ করে বসে পড়লো ভেজা ঘাসের উপর।
শরীর আর মানতে চাইছে না কিছুতেই এই কসরত।
ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে চন্দ্রর।
মেট্রনের বাঁশির হুইসেলের সাথে মেয়েরা সবাই মাঠে উপুড় হয়ে পড়লো প্ল্যাঙ্ক করতে।
ক্লান্ত চন্দ্র দেখলো ও না মেয়েরা সবাই প্ল্যাঙ্ক করছে একা ও বসে আছে মাঠে।
খেয়াল করলো মেট্রন যখন এসে ওর সামনে দাঁড়ালো তখন।
ভয়ে লাফ দিয়ে উঠে গেলো চন্দ্র।
মেট্রন আবার হুইসেল দিতে সব মেয়েরা উঠে দাঁড়ালো।
চন্দ্রকে সবার সামনে নিয়ে মেট্রন জিজ্ঞেস করলো,”খুব টায়ার্ড হয়ে গেছো না এক্সারসাইজ করতে করতে? ”
চন্দ্র জবাব দিলো না কোনো।এই প্রচন্ড শীতেও টের পেলো ধরধর করে ঘামছে ও।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে মেট্রন বললো,”তোমরা সবাই আমার সাথে আসো।আর চন্দ্র,তুমি আমার সাথে আসো।”
মনে মনে চন্দ্র নিজেকে ১০১ টা গালি দিলো নিজের এই বোকামির জন্য।
চন্দ্র জানে এখন একটা কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে ওর জন্য।
মেয়েরা সবাই ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো।
সবাইকে নিয়ে মেট্রন হোস্টেলের নিকটবর্তী পার্কে গেলো।বিশাল বড় এই পার্কে সকাল বেলা এই এলাকার অনেক মানুষ জগিং করতে আসে।
একটা বেঞ্চে নিজে বসে চন্দ্রকে বললো,”এই পুরো পার্কটা তুমি ঘড়ি ধরে ১ ঘন্টা দৌড়াবে।
১ সপ্তাহ দৌড়াবে এখানে এসে,এটাই তোমার শাস্তি। মেয়েরা তোমরা সবাই পুরো পার্ক ঘেরাও দিয়ে দাঁড়াও,চন্দ্র এক সেকেন্ডের জন্য থামলেই আমাকে ইনফর্ম করবে।সবাই দেখে নাও চন্দ্রর শাস্তি,দ্বিতীয় বার কেউ যদি এই ভুল করো তবে তাকে আমি টানা ১ মাস এই পার্কে চক্কর দেওয়াবো”
চন্দ্রর ইচ্ছে করলো সেখানেই লুটিয়ে পড়তে অজ্ঞান হয়ে শাস্তি শুনে।কিন্তু পারলো না।অজ্ঞান কিভাবে হয় চন্দ্র জানে না।অজ্ঞান হতে জানার ভান কিভাবে করে তাও জানে না।জানলে অভিনয়টা করতে পারতো।
অগত্যা শাস্তি মেনে নিয়ে দৌড়ানো শুরু করলো। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ছয়টা। সাতটায় সোহান ফোন দিবে চন্দ্রকে,আজ আর কথা হবে না।সপ্তাহে এই একদিন শুক্রবারে চন্দ্রর সুযোগ হয় সোহানের সাথে কথা বলার,আজকে সেই সুযোগ ও মাটি হয়ে গেলো চন্দ্রর।
নিজের কষ্টের কথা ভুলে গিয়ে চন্দ্র কাঁদতে লাগলো সোহানের জন্য।কবে আবার কথা হবে সোহানের সাথে!
সারা সপ্তাহ চাতকিনীর মতো চন্দ্র অপেক্ষা করে শুক্রবারের। শুক্রবার আসলেই ১৫-২০ মিনিট সুযোগ পায় চন্দ্র প্রেম করার।
এসব ভাবতে ভাবতে চন্দ্র চোখ মুছতে লাগলো।
চোখ মুছতে গিয়ে হঠাৎ চন্দ্রর মনে হলো সে একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেয়েছে।ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলো।
মাটিতে পড়েই চন্দ্র ভাবলো এখন কি সে অজ্ঞান হবার অভিনয় করবে?
পরক্ষণেই মনে পড়লো অজ্ঞান হলে কেমন করতে হয় সেটাই তো চন্দ্র জানে না।মেট্রন যদি বুঝতে পারে এটা চন্দ্রর অভিনয় ছিলো তবে হয়তো ওকে আরো ২ সপ্তাহ শাস্তি দিবে।
চোখ খুলে তাকালো চন্দ্র দেখার জন্য কী গাছের সাথে ধাক্কা লেগেছে ওর।কিন্তু কোনো গাছ খুঁজে পেলো না এক জোড়া পা ছাড়া।
বিষয়টা বুঝে উঠতে চন্দ্রর ১ মিনিট সময় লাগলো। তারপর বুঝলো গাছের সাথে না,ধাক্কা লেগেছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির সাথে।
কিছু বলতে গিয়েও চন্দ্র বললো না,ইতিমধ্যে অনেকক্ষণ দেরি করে ফেলেছে ও মাটিতে পড়ে।হোস্টেলের একটা মেয়ে তাকিয়ে আছে চন্দ্রর দিকে,এখন যদি চন্দ্র লোকটার সাথে কথা বলতে যায় আরো দেরি হবে,আর দেরি হলে আরো শাস্তি বাড়বে!
কিছু না বলেই চন্দ্র দৌড় লাগালো।
নিষাদ হতভম্ব হয়ে গেলো মেয়েটাকে এভাবে দৌড় দিতে দেখে।নিষাদের মনে হলো মেয়েটা হয়তো ওকে ভয় পেয়েছে।কিন্তু কেনো ভয় পেয়েছে মেয়েটা ওকে?
মনে মনে ভাবতে লাগলো নিষাদ,”আমাকে এভাবে ভয় পাবার কী আছে,আমি কি অসুন্দর দেখতে?
নাকি আমাকে বনমানুষ ভেবেছে মেয়েটা?”
ফোন বের করে একটা সেলফি নিলো নিষাদ,ততক্ষণে চন্দ্র দৌড়ে নিষাদের পিছনে চলে এলো।
ছবিটি দেখতে গিয়ে নিষাদ দেখতে পেলো ছবিতে পিছনে সেই মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে।আর নিষাদকেও দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত সুপুরুষ সে,ছবি তো তাই বলে।তবে মেয়েটা এরকম দৌড়ালো কেনো?
মাটিতে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় নি তো মেয়েটা?
সেই আঘাতের থেকে ব্রেইনে ইফেক্ট পড়ে নি তো?
মেয়েটা কি প্রচন্ড শক থেকে এভাবে দৌড়াচ্ছে?
হায় হায়!শেষ পর্যন্ত ওর কারণে একটা মেয়ে পাগল হয়ে গেলো!
নিষাদ চন্দ্রর পিছনে ছুটতে লাগলো হন্তদন্ত হয়ে।
চন্দ্র দৌড়াতে দৌড়াতে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো গাছের মতো ছেলেটা ওর পিছন পিছন আসছে দৌড়ে,চন্দ্র দৌড়ের গতি আরো বাড়িয়ে দিলো।
নিষাদের দৌড়ের গতি কমে গেলো চন্দ্রর চাহনি দেখে।
নীল চোখা মেয়েটা সাদা ট্রাক সুট পরনে,মুহুর্তের জন্য নিষাদের মনে হলো এই সেই মুখ যে মুখটা নিষাদ কল্পনায় এঁকে রেখেছিলো।
মনে পড়তেই নিষাদের মনে হলো,আহারে,এতোদিনে যাও তাকে খুঁজে পেলাম তাও সে পাগল হয়ে গেলো আমার সাথে ধাক্কা লেগে!
ওকে তো আমার সুস্থ করতেই হবে!
দৌড়ের গতি বাড়িয়ে নিষাদ ছুটলো চন্দ্রকে ধরার জন্য।
হাসনাত সাহেব এক পাশে দাঁড়িয়ে জাম্পিং জ্যাক করছিলেন,ছেলেকে এভাবে দৌড়াতে দেখে প্রথমে অবাক হলেন তারপর নিজেও ছুটলেন কি ঘটেছে সেটা জানার জন্য।
বাবাকে পিছনে দৌড়ে আসতে দেখে নিষাদ জিজ্ঞেস করলো,”বাবা,তুমি এভাবে দৌড়াচ্ছ কেনো?”
হাসনাত সাহেব দৌড়াতে দৌড়াতে জবাব দিলেন,”আমি কি জানি না-কি কেনো দৌড়াচ্ছি,জানলে তো দৌড়াতাম না।আমি তো দৌড়াচ্ছি তোকে দৌড়াতে দেখে এভাবে,কি হয়েছে তোর,একরকম হরিণের মতো ছুটছিস কেনো?”
নিষাদ আরো গতি বাড়ালো দৌড়ের,তারপর বাবাকে বললো,”ভুল বললে বাবা,হরিণের মতো না তো,বাঘের মতো দৌড়াচ্ছি হরিণ ধরার জন্য,আমার সোনার হরিণ আমার আগে দৌড়াচ্ছে দেখতে পাচ্ছো না বাবা?
আমি এতোদিনে ক্রাশ খেয়েছি বাবা।”
হাসনাত সাহেব ছেলের কথা শুনে খুব রেগে গেলেন। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,”হতভাগা এতোদিনে ক্রাশ খেলি একটা মেয়ের উপর,তাও তাকে দৌড়ে ধরতে পারছিস না?
ধর ধর পাগলা,জানিস না রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,একবার ছেড়ে গেলে সোনার গৌড় আর তো পাবো না,খ্যাপা ছেড়ে গেলে সোনার গৌড় আর পাবো না,না,না…..”
চন্দ্র ভয়ার্ত চোখে আবার পিছনে তাকালো,তাকিয়ে আরো বড় ধাক্কা খেলো।এতোক্ষণ দেখেছে গাছের মতো একটা লোক দৌড়াচ্ছে ওর পিছনে এখন দেখছে তার পিছনে আরেক লোক।শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে দৌড়াতে লাগলো চন্দ্র,মনে মনে ধন্যবাদ দিলো মেট্রন কে,প্রতিদিন যদি মেট্রন এক্সারসাইজ না করাতো তবে এভাবে হরিণের মতো ছুটতে পারতো না চন্দ্র আজ।
নিষাদ কোনোমতে চন্দ্রকে ধরতে পারলো না।নিষাদের মাথা চক্কর দিচ্ছে দৌড়াতে দৌড়াতে। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে যেতে নিষাদ বাবাকে বললো,”বাবা আমি তো ভালো মতো ক্রাশ খেয়েছি বাবা,মেয়ে তো নয় গরিবের উসাইন বোল্ট যেনো!”
তারপর নিষাদ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলো। হাসনাত সাহেব থামলেন না,চিৎকার করে বললেন,”হাঁদারাম,তোর এখনই ঘুমাতে হলো,একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছে,কোথায় গিয়ে নামধাম জিজ্ঞেস করবে,আমরা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবো তা না,উল্টো চিৎ হয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে!
আর বুড়ো বাপকে রেখে গেছে মেয়ের পিছনে দৌড়ানোর জন্য,ব্যাটা প্রেম করার বয়স তোর,আর তোর জন্য মেয়ের পিছনে দৌড়াচ্ছি কি-না আমি!
এই দিন ও আমার জীবনে আসবে আমি কি ভেবেছি কোনোদিন?
আহা কপাল আমার।তাও যদি মেয়েটার ঠিকানা জানতে পারি।”
১ ঘন্টা হতেই মেট্রন হুইসেল দিলো বাঁশিতে।চন্দ্র থামতে গিয়ে দেখলো বয়স্ক লোকটা এখনো তার পিছনে আসছে।কোনো দিকে না তাকিয়ে চন্দ্র দৌড়ে বের হয়ে গেলো। তারপর বাহিরে জগিং করতে করতে বাড়িতে ফেরা মানুষের সাথে মিশে কিছুদূর দৌড়ে ঢুকে গেলো হোস্টেলের গেইটের ভিতর।
হাসনাত সাহেব কিছুদূর এসে হারিয়ে ফেললেন মেয়েটাকে।এক বুক হতাশা নিয়ে ছেলের সাথে গিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে গেলেন।
ভীষণ আফসোস হলো তার ছেলেটার জন্য।মনে মনে আফসোসে করে তিনি তিন বার বললেন,
আহারে!
আহারে!
আহারে!
চলবে……?
লিখা:জাহান আরা।