“কুহেলিকা”
পর্ব-৩
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
.
.
সাত দিন হয়ে গেছে এখনো পর্যন্ত কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি পুলিশ টিম। গ্রামের কারো এটা নিয়ে মাথা ব্যথাও নেই। কারণ সবারই এই কাহিনী সহ্য হয়ে গেছে। এতদিনেও কেউ যখন খুনের কোনো হদিস মেলাতে পারেনি আর কেউ পারবেও না বলেই বিশ্বাস গ্রামবাসীর। সবাই সবার মতো দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু সবার মাঝেই আছে আতঙ্ক। কে জানে কখন কার গর্দান যায়।
চোখের সামনে প্রতিদিন নন্দিনীকে দেখতে দেখতে প্রেমে পড়ে গেছে রিশাদ। শুধু রিশাদ নয়। অন্য একজনও বোধ হয় না চাইতেই ভালোবেসে ফেলেছে নন্দিনীকে।
রিশাদ, নন্দিনী, তোয়া আর হাসিব একসাথে যায় পুকুর ঘাটে। রিশাদ আর হাসিব পুকুরে নামলেও তোয়া আর নন্দিনী নামেনি। ওরা ঘাটে বসে বসে গল্প করছে। তোয়া বলে,
“তুমি যাবে কবে?”
“কোথায়?”
“এই বাড়ি থেকে।”
“কেন?”
“এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
“আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই আপু। কোনো ব্যবস্থা করতে পারলেই চলে যাব।”
“রিশাদের সাথে তোমার কি কোনো সম্পর্ক আছে?”
“না তো। কেন?”
“ভালোবাসো রিশাদকে?”
“এসব প্রশ্ন করছ কেন?”
তোয়া কিছু বলার আগে হাসিব নন্দিনীকে ডেকে বলে,
“পুকুরে নেমে দেখো পানি কত ঠান্ডা।”
নন্দিনীর উত্তরের আগেই পিঠে কারো ধাক্কায় পানিতে পড়ে যায় নন্দিনী। রিশাদ আর হাসিব তাড়াতাড়ি সাঁতার কেটে নন্দিনীর কাছে আসে। রিশাদ নন্দিনীকে পাঁজাকোলে করে উপরে আনে। পেটে চাপ দিয়ে পানি বের করে। পড়ার প্রায় সাথে সাথেই তুলেছে বলে জ্ঞান হারায়নি। রিশাদ ক্ষেপে গিয়ে তোয়াকে বলে,
“তুই জানিস না ও সাঁতার পারে না? তবুও পানিতে ধাক্কা দিলি কেন?”
“আমি বুঝতে পারিনি রে। হাসিব বলল তাই মজা করে….”
“হাসিব বললেই তোকে মজা করতে হবে। ইচ্ছে করছে থাপ্রে তোর গাল লাল করে দেই।”
এরপর রিশাদ নন্দিনীকে কোলে করে বাড়ির দিকে নিয়ে গেল। তোয়ার চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে। হাসিব তোয়াকে শান্তনা দিয়ে বলে,
“থাক কাঁদিস না। জানিসই তো রিশাদ একটু রাগি।”
“তাই বলে এভাবে বকতে হবে বল?”
“বুঝতেছি না।”
“আমার তো মনে হচ্ছে তলে তলে দুজনে ঠিকই প্রেম করছে।”
“ধুর! এসব কিছুই না। আর হলেই বা কী?”
“আমি রিশাদকে ভালোবাসি হাসিব।”
“কী? কবে থেকে?”
“অনেক আগে থেকেই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে রিশাদ নন্দিনীকে ভালোবাসে। আমার ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে খুন করে ফেলি।”
“নন্দিনীর উপর ক্ষেপছিস কেন বল তো? ওর কী দোষ? ও কিন্তু অনেক সহজ সরল। এত প্যাচ বুঝে না। ওর কোনো ক্ষতি করার কথা ভাবিস না।”
“তুই ওর এত সাফাই গাইছিস কেন?”
“যদি বলি ভালোবাসি তাই?”
“ভালোবাসিস! সত্যি বলছিস?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে প্লিজ রিশাদের থেকে নিয়ে ওকে তোর করে নে।”
“এত পাগল হোস না তো। আরো কয়েকটা দিন যাক। তারপর সময় ও সুযোগ বুঝে ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেবো।
এখন সর বাসায় যাব।”
“আমিও যাব।”
“একটু আগেই না রিশাদের বকা খেলি?”
“তাতে কী? ভালোবাসার মানুষটার বকাও ভালো লাগে।”
হাসিব হেসে বলে,
“চল।”
বাড়িতে গিয়ে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খায় তোয়া। হাসিব ওর রুমে গেছে। আর তোয়া রিশাদের রুমে। কিন্তু রিশাদ রুমে ছিল না। তাই নন্দিনীর ঘরে যায়। নন্দিনী ঘুমিয়ে আছে। আর রিশাদ নন্দিনীর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। ভালোবাসার মানুষটা অন্য একজনকে ভালোবাসছে এই কষ্টটা অসহ্যকর। রাগে নিজের উড়না চেপে ধরেছে তোয়া। গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে পেছনে ঘুরে তাকায়। হাসিব ইশারায় বলে,
“কাঁদছিস কেন?”
তোয়া মুখে কিছু না বলে নিজের জায়গায় হাসিবকে দাঁড় করায়। এই দৃশ্য দেখার জন্য হাসিব মোটেও অপেক্ষা করছিল না। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রুমে চলে যায়। পেছন পেছন আসে তোয়াও। রুমে গিয়ে হাসিবের উদ্দেশ্যে বলে,
“কী করবি এখন?”
“কিছু তো একটা করতেই হবে।”
“যা করার তাড়াতাড়ি কর হাসিব। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। রিশাদ কেন ভালোবাসবে নন্দিনীকে?”
“কাঁদিস না তো। আমার কষ্ট হচ্ছে না? তোর একাই হচ্ছে?”
“আন্টিকে জানাব?”
“না। আন্টিকে বললে নন্দিনীকে বের করে দিতে পারে।”
“তাতে তো তোরই ভালো। তুই ওকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবি।”
“বোকার মতো কথা বলিস না। রিশাদের সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ হোক এটা চাচ্ছিস?”
“জানিনা আমি কিছু। তুই যা করার কর। নন্দিনীর কথা ভেবে যদি তুই গুটিয়ে থাকিস তাহলে এর শেষটা আমিই দেখব বলে রাখলাম।”
কথাগুলো বলেই তোয়া বাড়ি থেকে চলে যায়। হাসিব ভাবতে থাকে কী করা যায়!
.
.
ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। তারা আছে কিন্তু চাঁদ নেই। মৃদু বাতাসে কানের পেছনে গুঁজে রাখা চুলগুলো সামনে এসে পড়ছে নন্দিনীর। উঠোনে একটা চেয়ার পেতে বসে আছে। বারবার তোয়ার কথাগুলো কানে বাজছে। আমি কি ওদের মাঝখানে চলে এলাম? চোখের কাঁটা কারো? কিন্তু আমি তো কারো চোখের কাঁটা হতে চাই না। আমাকে চলে যেতে হবে এখান থেকে। এবং সেটা আজই। অন্ধকার রাতে যেতেও ভয় করছে। কিন্তু কোনো উপায় নেই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গুটিগুটি পায়ে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যায়। বারান্দা থেকে নন্দিনীকে যেতে দেখতে পায় রিশাদ। দুবার ডাকেও নাম ধরে। কিন্তু নন্দিনী থামেনি। দ্রুত পায়ে নিচে নামে রিশাদ।
হাঁটতে হাঁটতে একটা বাগানের মধ্যে এসে পড়েছে নন্দিনী। ঝিঝি পোকার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দূরের কোথাও কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। ভয়ে নন্দিনী কেঁপে কেঁপে উঠছে। হাঁটতে হাঁটতে আরো গহীনে চলে যায়। কিন্তু বাগান শেষ হয় না। এবার নন্দিনীর আরো ভয় হতে থাকে। একটু দূরের থেকে ভেসে আসে,
“এসেছ তুমি? তোমার অপেক্ষাই তো করছিলাম এতক্ষণ। এসো আমার সাথে এসো।”
ভয়ে পুরো শরীর কাঁপছে। শুকনো পাতার মর্মর শব্দ শোনা যাচ্ছে। ক্রমশ সেই শব্দ আরো কাছ থেকে আসতে লাগল। ভয়ে গাছের গোড়ায় মাটিতে বসে পড়ল নন্দিনী। হাঁটুতে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আমায় মেরো না প্লিজ মেরো না আমায়।”
কাঁধে শীতল হাতের ছোঁয়া পেতেই আরো জোরে কান্না শুরু করে নন্দিনী।
“মেরো না প্লিজ। মেরো না।”
“নন্দিনী! তাকাও আমার দিকে। আমি রিশাদ। কেন মারব আমি তোমায়?”
নন্দিনী এবার মুখ তুলে তাকায়। রিশাদ ফোনে ফ্লাশ ধরে রেখেছে। রিশাদকে দেখে জড়িয়ে ধরে নন্দিনী। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“একটু আগেই আমি কার কণ্ঠে যেন শুনলাম আমায় ডাকছে। বলছে আমার জন্য নাকি অপেক্ষা করছে।”
“কে বলেছে? আমি তো শুনিনি কিছু। তোমার মনের ভুল হয়ত।”
“না। আমি স্পষ্ট শুনেছি।”
“আচ্ছা ঠিকাছে। এখন এখান থেকে বের হতে হবে আমাদের।”
নন্দিনীর হাত ধরে বাগান থেকে বের হয়ে আসে রিশাদ। রাস্তায় এসে বলে,
“এখন বলো তো তুমি এত রাতে বের হয়েছে কেন?”
“বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছিলাম।”
রিশাদ অবাক হয়ে বলে,
“কেন?”
“আমি কারো পথের কাঁটা হতে চাই না।”
“কার পথের কাঁটা তুমি?”
“তোয়া আপুর। আমার মনে হয় তোয়া আপু আপনাকে ভালোবাসে।”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
নন্দিনী অবাক হয়ে তাকায় রিশাদের দিকে। অন্ধকারে মুখটা অস্পষ্ট। নন্দিনীকে চুপ থাকতে দেখে রিশার ওর হাত ধরে বলে,
“প্রথমদিন থেকেই তোমায় আমার ভালো লাগে নন্দিনী। আমি তোয়াকে না। তোমাকে ভালোবাসি।”
“কেন ভালোবাসেন আমায়? আমার পরিবার নেই, বাড়িঘর নেই। কিচ্ছু নেই। এসব জেনেও কেন আমায় ভালোবাসেন?”
“জানিনা। শুধু জানি ভালোবাসি।”
“ভুল করছেন আপনি।”
“হোক ভুল। তবুও আমি তোমাকেই ভালোবাসি। তুমি ভালো না বাসলেও তোমাকেই ভালোবাসি। এখন সোজা আমার সাথে বাসায় যাবে।”
নন্দিনীকে আর কিছু বলতে না দিয়েই টানতে টানতে বাসায় নিয়ে যায়। বাড়ির উঠোনে পৌঁছাতেই বারান্দা থেকে ছোট মা দুজনকে দেখতে পায়। রিশাদ নন্দিনীর হাত ধরে আছে। রসিকতা করতে করতে আসছে। এত রাতে দুজন একসাথে। সিঁড়ির দিকে আসতেই ছোট মা রুমে চলে যান।
.
সকালে নন্দিনীর ঘুম ভাঙার পর একটা চিরকুট পায় বালিশের কাছে। চিরকুট খুলে দেখে তাতে লেখা,
“মরতে না চাইলে রিশাদের থেকে দূরে থাকো। আর এমনিতেও তোমাকে তো মরতে হবেই। এবং সেটা আমার হাতেই।”
সকাল সকাল এমন হুমকি বার্তা পেয়ে ভয়ে ঘামতে থাকে নন্দিনী। একবার ভাবে রিশাদকে দেখাবে। আবার কী ভেবে যেন বিছানাতেই রেখে দেয়। ভয়কে লুকিয়ে বাহিরে যায় ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে রিশাদ ওর রুমে বসে আছে। হাতে সেই চিরকুট। নন্দিনীকে দেখে বলে,
“এটা কী নন্দিনী? কে দিয়েছে?”
“জানিনা আমি। ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমার বালিশের কাছে রাখা।
বিছানা গোছাতে গোছাতে উত্তর দেয় নন্দিনী। রিশাদ বলে,
“অদ্ভুত তো! এমন হুমকি বার্তা কে দিতে পারে? আর কেনই বা দেবে?”
নন্দিনী রিশাদকে ডেকে বলে,
“দেখুন।”
রিশাদ নন্দিনীর হাতের দিকে লক্ষ করে তাকায়। নন্দিনীর হাতে একটা সূঁচ আর শুকনো জবা ফুল।
“কোথায় পেলে এগুলো?”
“আমার বালিশের নিচে।”
“আমার জানামতে এসব দিয়ে কালো যাদু করা হয়!”
চলবে…..