Home "ধারাবাহিক গল্প ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৩৩+৩৪

ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৩৩+৩৪

0
137

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩৩
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

রাতের আকাশটা আজ পরিচ্ছন্ন থাকায় তারাগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। মাঝে মাঝে মৃদু বাতাস এসে শরীরে ছুঁয়ে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকালেই এক অন্তহীন শূন্যতা অনুভব হচ্ছে। এভিয়ান ছাদে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে তার জ্বলন্ত সি’গারেট। থেকে থেকে সে ঠোঁট দিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া ছুঁড়ছে। বাতাসে সেই কালো ধোঁয়া অনায়াসে মিলিয়ে যাচ্ছে। মাথায় তার ঘুরপাক খাচ্ছে ইশাতের চিন্তা। মনের অজানা অনুভূতিগুলো তাকে দোটানায় ভোগাচ্ছে। বুকের ভেতর একটা চিনচিন ব্যথা অনুভূত হচ্ছে।

অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভূতিগুলোকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েও সে বারবার দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছে। এই পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে সে সি’গারেটের প্যাকেট তুলে ছাদে এসে একের পর এক টান দিয়ে প্যাকেট খালি করে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে প্যাকেট হাতড়ে সে দেখলো প্যাকেটের সি’গারেট ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো সে নিজের মনকে স্থির করতে ব্যার্থ। তখন আকাশের অর্ধ খণ্ডিত চাঁদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে সে আওড়ালো।
— কেন এলে আমার এই অন্ধকার জীবনে? আর কেনই বা নতুন করে বাঁচার লোভ দেখাচ্ছ?

অন্যদিকে দূরে থেকেও একই চাঁদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবনায় বিভোর হয়ে আছে ইশাত। অনেক্ষন যাবত সে আনমনা হয়ে বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। মনের ভেতরটা তার ভার ভার লাগছে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে মায়ের আর ভাইয়ার কথা রাখতে সে আসিফের সাথে বিয়ের জন্য রাজি হয়েছে। কিন্তু তার মন কিছুতেই চাইছে না এভিয়ানকে হারাতে। সে মনের য’ন্ত্রণাকে দমিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে দোয়া করে বলল।
” হে আল্লাহ! ভাগ্যক্রমে সে যদি আমার নাও হয়, তবুও তাকে তুমি হেদায়েত দান করো। আমি চাইনা সে সারাটাজীবন তোমার অবাধ্য থেকে নিজের জন্য জাহান্নামের পথ বেছে নিক। সারাজীবন সে আপনজনদের হাতে অবহেলিত হয়ে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে ক্ষমতার হিং’স্রতাকে বেছে নিয়ে নিজের সরলতা হারিয়েছে। আমি তার অন্ধকার জীবনের সত্য জানি এবং সাথে এটাও জানি আপনজনের দেওয়া য’ন্ত্রণা নিয়ে সে ভেতর থেকে কতটা ভেঙেচুরে আছে। তার খারাপ সময়গুলোতে তাকে সামলানোর কেউ ছিল না। আমি নিজেও অসহায় তাকে ভালোবেসে। তার এই দুর্ভাগ্য আমি মানতে পারি না। অন্তত তাকে হেদায়েতের পথে দেখলে আমি নিজের মনকে বুঝ দিয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। তুমি আমার দোয়া কবুল করো ইয়া রব। অন্তরের খবর একমাত্র তুমি রাখো। আমি নিরুপায় অসহায়। আমার সহায় হও।”

আচমকা ভেতরে বিছানায় রাখা ফোনটা তখন বেজে উঠলো। ইশাত বারান্দা থেকে ভেতরে চলে গেলো। ফোনটা হাতে নিয়ে সে দেখলো জেরিনের কল। সে তুলতেই জেরিন বলল।
— কাল অফিসে আসতে হবে না। কালকে আমাদের এক ক্লায়েন্ট বড় করে পার্টি আয়োজন করেছেন। সেখানে অনেক বড়বড় বিজনেসম্যানরা উপস্থিত থাকবে। তুমি যেহেতু প্রজেক্টে কাজ করেছ তাই তোমাকেও ক্লাবে প্রেজেন্ট থাকতে হবে।

ইশাত ইতস্ততা নিয়ে বলল।
— আপু আমি এতো মানুষের সামনে থাকতে চাচ্ছি না।

— পার্টিটা অফিসের কাজের সাথে জড়িত। যেহেতু তুমি প্রজেক্টটা হ্যান্ডেল করেছ তাই তোমাকে থাকতে হবে।

— কখন আসতে হবে?

— সন্ধ্যায়, যাওয়ার সময় তোমাকে আমি সাথে করে নিয়ে যাব তৈরি হয়ে থেকো।

— ঠিকাছে।

কল কেটে ইশাত মাথাটা খাটের হেডবার্ডে এলিয়ে দিলো। দুশ্চিন্তায় মাথাটা তার প্রচন্ড ব্যাথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। ব্যথায় এক মুহূর্তও আর টেকা যাচ্ছে না। উপায়ন্তর না পেয়ে ইশাত উঠে রান্নাঘরে চলে গেল কড়া করে এক কাপ কফি বানাতে। রান্নাঘরে গিয়ে সে চুলায় পানি গরম করতে বসালো। তখন আসিয়া বেগমও রান্নাঘরে এলেন আহনাফের জন্য খাবার নিতে। ইশাতকে দেখা মাত্র তিনি বললেন।
— তুমি কি এই রাতে কফি খাবে?

— হ্যা মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা।

— কাজের বেশি চাপ নিয়ো না। আর কিছুদিন পর বিয়ে হয়ে গেলে তো আর অফিস করতে হবে না। তাই আস্তে আস্তে কাজ কমিয়ে ফেল।

— কেন অফিস করলে সমস্যা কোথায় ?

— বিয়ের পর মেয়েদের স্বামীর কথা মেনে চলতে হয়। আসিফ যদি চায় তো চাকরি করবে, সে না চাইলে করবে না।

ইশাত মনে মনে ভাবলো বিয়ের পর তার চাকরি ছেড়ে দেওয়াটাই ভালো হবে। নাহলে চোখের সামনে এভিয়ানকে দেখে তার দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেটা তাদের কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না। তাই সে মায়ের কথায় মত দিয়ে কফি বানিয়ে রান্নাঘর থেকে চলে যেতে নিলে, আসিয়া বেগম তাকে পিছু ডেকে বললেন।
— ওহ তোমাকে তো বলতেই ভুলে গেছি। একটু আগে কথা হয়েছে আমার আসিফের মায়ের সাথে। ওনারা তাড়াহুড়োয় মধ্যে এই সপ্তাহের মাঝেই বিয়ের কাজটা সারতে চাচ্ছে।

ইশাতের ভেতরটা তখন ধক করে উঠল। সে কাপা কাপা কন্ঠে বলল।
— হঠাৎ এ..এতো তাড়াহুড়োর কি প্রয়োজন?

আসিয়া বেগম তখন কড়া গলায় বললেন।
— প্রয়োজন তো আছেই। বিয়ের বয়সী একটা সন্তানকে বিয়ে না দিয়ে আর কয়দিন এভাবে ঘরে বসিয়ে রেখে দুশ্চিন্তা করবে বাবা মা? তাছাড়া যে বিয়ে লোকসম্মুক্ষে একবার ভেঙে গেছে, সেই বিয়ে এতো ঘটা করে করার কিছুই নেই। এই বিয়ে দ্রুত সেরে ফেলাই উত্তম।

ইশাত অনুভব করলো আসিয়া বেগম কথাটা তাকে শুনিয়ে বললেন। তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে গেল।

——————-

অফিসিয়াল বিজনেস পার্টিতে উচ্চ পদের ব্যবসায়ীদের সাক্ষাৎ জমেছে আজ। এভিয়ান আর রিজভী ড্রিকস হাতে দাঁড়িয়ে সবার সাথে ভাব আদান প্রদানে ব্যস্ত। সিয়ামও এভিয়ানের সাথে সাথে থাকছে। এরই মাঝে পরিচিত অপরিচিত অনেকের সাথে হাত মিলিয়ে কথা বলে ফেলেছে এভিয়ান। সেই সময় এভিয়ান রিজভীর সাথে বিজনেসের বিষয়ে কিছু একটা আলোচনা করছিল। এর মধ্যে হঠাৎ একটা সুপরিচিত হাত তার দিকে এগিয়ে এলো।

এভিয়ান প্রথমে খেয়াল না করে হাত মিলিয়ে সেই ব্যক্তিটির দিকে তাকাতেই দেখলো সে আর কেউ নয় ফেলিক্স। যার সাথে অনেকদিন আগে আমেরিকার ক্যা’সিনোতে তার কথাকাটাকাটি হয়েছিল। এভিয়ান তাকে লক্ষ্য করতেই সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল। ফেলিক্সও বাকা হেসে হাত সরালো। চোখে তার আজও প্রতি’শোধের তৃষ্ণা। ফেলিক্সের সাথে তার গার্লফ্রেন্ড এমাও রয়েছে। সে ফেলিক্সের অগচরে লো’ভাতুর চাহনি নিয়ে এভিয়ানের দিকে তাকিয়ে। যা এভিয়ান ঠিকই বুঝতে পারছে। এদেরও যে এই পার্টিতে ইনভাইট করা হবে সেটা এভিয়ানের ধারণা ছিল না। থাকলে সে নিজেই আসতো না।

তাদের দেখে এখন এভিয়ানের ভালো মুডটা নষ্ট হয়ে গেল। সে রাগে সেখান থেকে সরে বারে গিয়ে খালি গ্লাসে ড্রিংকস ভরলো। গ্লাসটা হাতে নিয়ে সে চুমুক বসাবে এমন সময় তার নজর গেল মূল দরজার দিকে। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে জেরিনের সাথে ইশাত ভেতরে প্রবেশ করছে। ইশাত পার্টিতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সবার মনোযোগ একত্রে তার দিকে চলে গেল। তার মুখে হালকা মেকআপ আর মার্জিত পোশাকে ইতিমধ্যে সে সবার নজরে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সিল্কের সাদা ফুল হাতা লং গাউন আর সাদা হিজাবে তাকে শুভ্রতার প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছে। ভারী মেকআপ আর ওয়েস্টার্ন পরিহিত নারীদের মাঝে তাকে সবার থেকে ভিন্ন আর পবিত্র লাগছে। এভিয়ান তাকে দেখা মাত্র মোহাবিষ্ট চাহনি নিয়ে ঠোঁটে আওরালো একটি নাম।
“হোয়াইট মুন।”

এতজনের ভিড়ে ইশাত শুরুতে অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করে ছিল। জেরিন তখন ইশাতকে নিয়ে এভিয়ানের সামনে এসে উপস্থিত হলো। এভিয়ান ড্রিংকস রেখে চোখের পলক না ফেলে ইশাতের উদ্দেশ্যে বলল।
— আজকে তোমাকে হোয়াইট মুন লাগছে।

জেরিন এমন উক্তিতে সন্দেহ নিয়ে তাকালো। ইশাত ব্যাথাতুর হাসি নিয়ে বলল।
— ধন্যবাদ।

পরক্ষণে এভিয়ানের হাতে গ্লাস দেখে সে জিজ্ঞাসা করলো।
— ওটা কি আপনার গ্লাসে?

এভিয়ান গ্লাসের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল।
— তুমি যেটা ভাবছ তেমন কিছুই না, এটা সফট ড্রিংকস।

ইশাত শুনে নিশ্চিন্ত হলো। জেরিন তখন তাকে বাকিদের সাথে পরিচয় করাতে নিয়ে গেল। পার্টিতে ইশাত অত্যন্ত মার্জিতভাবে সকল ক্লায়েন্টদের সাথে নিজের কোম্পানির হয়ে কথা বলল। বড়বড় বিজনেসম্যানরা তার কথার ধরন দেখে এভিয়ানকে ইশাতের প্রশংসায় বলল।
— আপনি অনেক লাকি মিস্টার এভিয়ান, এতো স্মার্ট একটা এমপ্লয় পেয়েছেন।

প্রত্যুত্তরে এভিয়ান ভদ্রতাসুচক হাসলো। তখন তাদের মধ্য থেকে একজন লোক ইশাতের সাথে হাত মিলাতে এলে এভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে ইশাতকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ইশাতের পরিবর্তে সে নিজে হাত মেলালো। দূরে দাড়িয়ে ফেলিক্স এভিয়ানের পাশে দাঁড়ানো ইশাতকে লক্ষ্য করছিল।

অকস্মাৎ তখন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্টেজে উঠে একজন মাইক হাতে নিয়ে বলল।
— আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত আছে নতুন একজন ব্যক্তি। যে এই দুই বছরেই সফল টপ বিজনেসম্যানদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। তাকে স্টেজে ডেকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে এখন। তিনি আর কেউ নয় আসিফ শিকদার।

নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইশাত হকচকিয়ে স্টেজের দিকে তাকিয়ে দেখলো আসিফকে। আসিফ তখন লোকটার থেকে মাইক নিয়ে বলতে শুরু করলো।
— গুড ইভনিং সবাইকে, আপনাদের সকলের মাঝে উপস্থিত হতে পেরে আমি আজ অনেক আনন্দিত। এখানে অনেকের সাথেই আমি পরিচিত। আবার অনেকের সাথে এখনো পরিচয় হয়ে উঠে নি। আশাকরি আজ সবার সাথেই পরিচিত হব। তার আগে আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আপনাদের সামনে ঘোষণা করতে যাচ্ছি। আজ এখানে, এই পার্টিতে, আমার ফিয়ন্সে উপস্থিত রয়েছে। কয়েকদিনের মাথায় তার সঙ্গে আমার বিয়ে। তাকে আমি আজ সবার সামনে প্রপোজ করে মুহূর্তটাকে আরো স্মৃতিঘন করে তুলতে চাই।

আসিফের কথা শেষ হতেই লাইট অফ হয়ে স্পটলাইট ইশাতের উপর গিয়ে পড়লো। তার ভেতরটা তখন ছ্যাঁৎ করে উঠলো। সে কয়েকপা পিছিয়ে গেল। আসিফ তখন তাকে উদ্দেশ্য করে বলল।
— স্টেজে চলে আসো ইশাত।

ইশাত একটুও নড়লো না। সে এভিয়ানের পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। উল্টো মুখ তুলে সে এভিয়ানের দিকে তাকাতেই দেখলো এভিয়ান চোয়াল শক্ত করে আসিফের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইশাতকে এগিয়ে আসতে না দেখে আসিফ তখন তার উপস্থিত একজন নারী এমপ্লয়কে ইশারা করে বলল ইশাতকে নিয়ে আসতে। মেয়েটা আদেশ মান্য করে এভিয়ানের সামনে থেকে ইশাতের হাত ধরে তাকে স্টেজে নিয়ে গেল। জেরিন আর রিজভী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। ইশাত স্টেজে উঠতেই আসিফ স্টেজে হাঁটু গেড়ে বসে পকেট থেকে একটা ডায়মন্ডের রিং বের করলো ইশাতকে পরিয়ে দিবে বলে।

এতক্ষনে এভিয়ানের মনের দ্বিধা ভাঙ্গলো। সে আর কোনোকিছুর পরোয়া না করে দ্রুত পদক্ষেপে স্টেজে উঠে ইশাতের হাত ধরতে গেল। কিন্তু পরক্ষণে থেমে গেলো ইশাতের বলা কথা মনে করে। ইশাত সেদিন বলেছিল বিয়ের আগে নারীদের স্পর্শ করা হারাম। তাই সে সরাসরি হাত না ধরে ইশাতের হাতার বাড়তি কাপড় টেনে ধরে তাকে নিজের সাথে দাড় করিয়ে আসিফের উদ্দেশ্যে হুংকার ছেড়ে বলল।
— এটা একটা অফিসিয়াল বিজনেস পার্টি, ব্যক্তিগত কাজের এনাউন্সমেন্টের জায়গা না।

আসিফ তখন উঠে দাঁড়িয়ে চোখে আক্রোশ নিয়ে বলল।
— ইশাত আমার ফিয়ন্সে, ওকে আপনি এভাবে আমার কাছ থেকে সরাতে পারেন না।

এভিয়ান বেপরোয়া ভঙ্গিতে বলল।
— আমি সেই অধিকার রাখি। যা অন্য কেউ রাখে না।

পরিস্থিতি বিগড়ে যাচ্ছে দেখে ইশাত এভিয়ানকে অনুনয় করে বলল।
— প্লীজ থামুন! পাবলিক প্লেসে আর কোনো ঝামেলা আমি চাচ্ছি না।

এভিয়ান জেদ ধরে বলল।
— ঠিকাছে, আমি গেলে তোমাকে নিয়েই যাবো।

এভিয়ান তার গাউনের হাতা ধরে রাখা অবস্থাতেয়ই ইশাত সমেত স্টেজ থেকে নেমে এলো। আসিফ পেছনে রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কটমটিয়ে দাড়িয়ে রইলো। ফেলিক্স এই দৃশ্য দেখে পৈশাচিক হাসলো। এতদিন সে এভিয়ানের পেছনে লাগার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না। তবে আজ ইশাতের প্রতি তার দুর্বলতা লক্ষ্য করে সে মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ পেল। অন্যদিকে ইশাত তার হাতের কাপড় থেকে এভিয়ানের হাত ছাড়িয়ে বলল।
— কি করছেন এসব? আমাকে কেন এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন? সবাই দেখছে, তারা কি বলবে? আসিফ ভাইয়া গিয়ে আম্মু আর ভাইয়াকে এসব বলে দিলে বুঝতে পারছেন আমার কি অবস্থা হবে?

জেরিন তখন পরিস্থিতি সামলাতে ইশাতকে এভিয়ানের কাছ থেকে সরিয়ে দূরে নিয়ে গেল। এভিয়ানের হাবভাব দেখে রিজভী কৌতুহল দমাতে না পেরে আড়ালে প্রশ্ন করেই বসলো।
— এভি তুই কি কোনোভাবে ইশাতকে ভালোবেসে ফেলেছিস?

এমন অনাকাক্ষিত এক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে এভিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হৃদয়ের অতল থেকে উঠে আসা অযাচিত আবেগগুলো তরঙ্গের মতো উত্তাল হলো। যে তরঙ্গ আছড়ে পড়লো বিরামহীন কোনো এক গহীনে। যা কেবল তটরেখাকেই স্পর্শ করলো না, বরং তার পুরো অস্তিত্বটাকেই কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। এভিয়ান শুধু শূন্য দৃষ্টি নিয়ে মনের অজান্তে আওড়ে গেল।
” শুধু ভালোবাসা বললে ভুল হবে। ইশাত আমার অ্যাডিকশন। ইশাত আমার নে’শা, আমার আ’সক্তি, আমার উন্মাদনা। যাকে আমার যে কোনো মতে চাইই চাই!!”

এভিয়ানের কথা শুনে রিজভী যেন আকাশ থেকে পড়লো। এভিয়ানের রাগের সুযোগ নিয়ে ফেলিক্স তখন এসে তার ঘাড়ে হাত রাখলো। এভিয়ান তাকে দেখে ঘাড় ঝাড়া দিল। ফেলিক্স তাকে শান্ত করতে বলল।
— একটা ম্যাচ হয়ে যাক? হয়তো রাগ কমতে পারে?

এভিয়ান কিছু বলল না। ফেলিক্স তখন আবারো কু’প্রস্তাব দিয়ে বলল।
— ঠিকাছে এজ ইওর উইশ। তবে পাশের রুমেই ব্যবস্থা রয়েছে।

এভিয়ান তখন রিজভীকে জেরিন আর ইশাতের কাছে পাঠিয়ে দিল। রিজভী যেতেই সে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে মন ঘুরাতে সেই রুমের দিকে পা বাড়ালো। ফেলিক্স রহস্যময় হেসে তার পিছু গেল। ভেতরে বিশাল একটা টেবিলের মধ্যে কিছু কার্ড রাখা। এভিয়ান গিয়ে বসতেই ফেলিক্স তাকে কার্ড ভাগ করে দিয়ে বলল।
— আজকে বাজি টাকা দিয়ে নয়। অন্যকিছু দিয়ে হবে।

এভিয়ান গম্ভীর স্বরে জবাব দিল।
— কি দিয়ে?

— জেতার পর বলবো।

— জিততে পারলে তো।

এভিয়ান ড্রিংকস অর্ডার করলো। ফেলিক্সের ইশারায় এভিয়ানের ড্রিংকসে অগচরে ওভার ডো’জ মিশিয়ে দেওয়া হলো। এভিয়ান গ্লাসে সিপ নিতে নিতে চাল চালতে শুরু করলো। ওভার ডো’জের কারণে কিছুক্ষণ পর খেলার মাঝে এভিয়ানের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। বারবার তার চোখ বুজে আসতে চাইছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফেলিক্স সহজেই জিতে গেল। এভিয়ান তখনও অর্ধেক হুসে আছে। ফেলিক্স সেটার সুযোগে এমাকে বলল ইশাতকে এভিয়ানের নাম বলে এখানে ডেকে আনতে।

এমা কথা মতো গিয়ে আড়ালে ইশাতকে এভিয়ানের কথা বলে ডেকে নিয়ে এলো। ইশাত এমার সাথে এসে দেখলো এভিয়ান টেবিলে মাথা রেখে চোখ বুঝে আছে। ইশাত এভিয়ানকে এমন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে ভয় পেয়ে গেল। সে এভিয়ানের কাছে গিয়ে তাকে ডাকতে লাগলো। তখন পেছন থেকে ফেলিক্স এসে অট্ট হেসে বলল।
— সে আর উঠবে না। এভিয়ান তোমাকে আজ আমার কাছে বাজিতে হেরেছে। এরমানে আজ রাত তুমি আমার।

ফেলিক্সের কুৎসিত কথায় ইশাতের মনে ঘৃণা ধরে গেলো। তার থেকেও বেশি ইশাত অবাক হলো তাকে নিয়ে এভিয়ানের বাজি ধরার কথা শুনে। সে তখন টেবিলে পড়ে থাকা কার্ডগুলো দেখে বলল।
— এভিয়ান এমনটা কখনো করবে না।

ফেলিক্স তখন এমাকে দেখিয়ে বলল।
— এইযে দেখছো এটা আমার গার্লফ্রেন্ড, ওকে জিজ্ঞাসা করো এভিয়ান ওর সাথে কি করতে চেয়েছে? সে আমার গার্লফ্রেন্ডের সাথেও সুযোগ নিতে চেয়েছে। আজ আমি তার সাথে সেই প্রতি’শোধের সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ হাত ছাড়া হতে দিব না।

এমা এভিয়ানকে ইশাতের প্রতি আগ্রহী দেখার পর থেকে সেও এখন ইশাতকে সহ্য করতে পারছে না। তাই সে ঈর্ষায় বাহিরে থেকে দরজা আটকে দিলো। ইশাত যেন তার সাথে ঘটা কোনো কিছুই মেনে নিতে পারছে না। এদিকে ফেলিক্স বাকা হাসি নিয়ে ধীরে ধীরে ইশাতের দিকে এগিয়ে আসছে। ইশাত এমন মুহূর্তে আতঙ্কিত হয়ে পড়লো। সে চিৎকার করে এভিয়ানকে ডেকে যাচ্ছে। অবিশ্বাসে তার হাত পা কিছুই চলছে না। ফেলিক্স তখন একেবারে কাছে এসে ইশাতের জামায় হাত দিলো। ইশাত সরে যেতে নিলে ফেলিক্স তার গাউনের নিচের অংশ আরও জোড়ে টেনে ধরলো। তখন অতি টান খাওয়ায় ইশাতের জামার এক কোনার কাপড় ফেটে গেলো।

ইশাত ছটফট করতে লাগলো। ফেলিক্সের হাত থেকে ছুটতে গিয়ে সে পা মচকে ভারসাম্য হারিয়ে ফ্লোরে আছড়ে পড়লো।ফেলিক্স তার হিজাব খুলতে গেল। ইশাত হাত দিয়ে মাথা ডেকে ফেলল। এমন সময় হঠাৎ ফেলিক্স অনুভব করলো তার হাত কেউ পেছন থেকে আটকে ধরেছে। ফিরে তাকাতেই সে দেখলো সেটা এভিয়ান। ভয়ে সে পিছিয়ে গেল। এভিয়ান তাকে টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে উন্মা’দের মতো বেধড়ক পে’টাতে শুরু করলো। ফেলিক্সের নাক মুখ ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে ছোটার জন্য হাসফাস করছে। এভিয়ান তবুও তাকে ছাড়ছে না। নি’কৃষ্ট গা’লি দিতে দিতে তাকে অনবরত মে’রেই যাচ্ছে। এই মূহুর্তে তার মাথায় খু’ন চেপে আছে। আরো কিছুক্ষন এমন চলতে থাকলে এভিয়ান তাকে জা’নেই মে’রে ফেলবে।

চোখের সামনে এমন ভয়া’নক দৃশ্য দেখে ইশাত সাহায্য চেয়ে জোড়ে দরজায় বাড়ি দিতে লাগলো। ইশাতের চিৎকার তখন বাহিরে সবার কানে পৌঁছালো। জেরিন তার কণ্ঠ চিনে দৌড়ে সেই রুমের দিকে গেল। রুমের দরজা বাহিরে থেকে লাগানো দেখে সে সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দিল। ততক্ষণে উপস্থিত সকলে এসে সেখানে জড়ো হয়েছে। রিজভী দ্রুত এভিয়ানকে ধরে থামালো। পেছনে আসিফ ইশাতের এমন অবস্থা দেখে আতকে উঠলো।

ইশাত আর এক মুহূর্ত সেখানে দাড়ালো না। সে দৌড়ে ক্লাব থেকে বেরিয়ে গেল। জেরিনও তাকে আটকাতে পারলো না। বাসায় পৌঁছে সে কারো সাথে কথা না বলে রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলো। বাড়ির মানুষ তার এমন আচরণে আশ্চর্য হলো। একদিকে সে নামাজে দাড়িয়ে সারারাত আল্লাহর কাছে কেঁদে কেটে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে লাগলো। অন্যদিকে এই ঘটনা রাতারাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো।সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব নিয়ে লিখালিখি হয়ে ভরে গেলো।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩৪
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

এক রাতের ব্যবধানে ইশাতের জীবনে ভ’য়ানক এক বি’পর্যয় নেমে এলো। তার ফোন অনবরত কল আর ম্যাসেজে ভরে গেলো। সেখানে সবচেয়ে বেশি কল ছিল এভিয়ানের তারপর জেরিনের। ইশাত সেসব দেখে ফোন দূরে ছুঁড়ে মা’রলো। তার সাথে রাতে ঘটা ঘটনার কথা জানার পর আসিয়া বেগম তেরেমেরে এসে ইশাতের রুমের দরজায় কড়া নাড়তে লাগলেন। ইশাত যখন দরজা খুলল তখন দেখা গেল তার চোখ মুখ ফুলে বাজে অবস্থা। সারা রাত কান্নার ফলে এমন দশা হয়েছে তার। আসিয়া বেগম অমনি ঠাস করে চর বসিয়ে দিলেন ইশাতের গালে। মায়ের হাতে চর খেয়ে গালে হাত দিয়ে ইশাত করুন দৃষ্টিতে তাকাতেই আসিয়া বেগম তিক্ততা নিয়ে কাদতে কাদতে বললেন।
— কি মেয়ে জন্ম দিয়েছিলাম আমি এটা!! সমাজে আমার সম্মান কিছুই আর বাকি রাখলি না। তোর মায়ের পরিচয় দিতেও এখন আমার ঘৃ’ণা কাজ করছে। মন চাইছে তোকে গলা টিপে এখনই মে’রে ফেলি। এরপর আমি নিজেও ম’রে যাই। এই মুখ আমি সমাজে কি করে দেখাবো? এই কলঙ্ক নিয়ে তোকে বিয়ে কি করে দেব?

আসিয়া বেগম কথাগুলো বলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একেরপর এক চর মেরে যাচ্ছেন ইশাতকে। ইমরান তখন পেছন থেকে এসে মাকে থামালো। সানজিদাকে বলল মাকে ঘরে দিয়ে আসতে। ইশাত তার রুমে গিয়ে ফ্লোরের এক কোণে বসে অঝোরে কেঁদতে লাগলো। ইমরান গিয়ে ইশাতকে ফ্লোর থেকে তুলে খাটে বসিয়ে রক্তিম চোখে চেঁচিয়ে বলল।
— ওরা তোর সাথে কি করেছে ইশাত বল!! আমি কারো কথায় কান দেব না। শুধু তোর মুখ থেকে সত্যটা শুনতে চাই।

ইশাত কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না, শুধু ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। ইমরান তখন রাগে যন্ত্র’ণায় তাকে ধমকে উঠতেই, ইশাত নিজের কান্না আটকে বলল।
— এভিয়ানের পরিচিত একজন লোক উনার সাথে শ’ত্রুতা করে উনাকে কিছু একটা খাইয়ে, আমার সাথে জোরজবরদস্তি করতে চেয়েছে।

ইমরান চোয়াল শক্ত করে মনে আতঙ্ক নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— এরপর?

ইশাত ধীর কন্ঠে বাকিটা বলল।
— সেই মুহূর্তে সব মিলিয়ে আমি এতটাই আতঙ্কিত আর স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলাম যে আত্মরক্ষাও করতে পারছিলাম না। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এভিয়ান আমাকে লোকটার হাত থেকে রক্ষা করে।

ব্যাস এটুকু শুনে ইমরান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
— আমি ওদের কাউকে ছাড়ব না।

ইশাত তখন কাদতে কাদতে বলল।
— বিশ্বাস করো ভাইয়া, আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারি নি কীভাবে কি হলো আমার সাথে এটা?

ইমরান এবার ক্ষিপ্ত হয়ে বলল।
— তোকে অনেকবার বারন করেছিলাম এই মরীচিকার পেছনে না ছুটতে। কি অবস্থা করেছিস নিজের একবার দেখ। আম্মুকে এখন কি জবাব দিব? খুব তো বলেছিলি নিজের খেয়াল রাখতে পারবি। তুই কি ভেবেছিলি এভিয়ানকে ওর অন্ধকার জগত থেকে বের করে আনতে পারবি? কিন্তু বাস্তবতা এতো সহজ না। ওকে উদ্ধার করতে গিয়ে তুই নিজেই এই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছিস।

ইমরান থেমে কিছুক্ষণ ভেবে বলল।
— এবার বুঝলাম এভিয়ান সেদিন আমাকে কেন বলল যে সে বড় কিছুর জন্য ছোট কিছু ছাড়ছে। ও আমার সাথে প্রতি’শোধ তুলতে এমনটা করেছে। ও তোর বিশ্বাস অর্জন করে তোর ক্ষ’তি করতে চেয়েছে। কিন্তু তুই চিন্তা করিস না, আমার বোনকে কষ্ট দেওয়া প্রত্যেককে আমি দেখে নেব। অনেক হয়েছে আর না। এতক্ষনে হয়তো আসিফও জেনে গেছে। ও কি ভাববে? একবার ভেবেছিস?

ইশাত মাথা নিচু করে বলল।
— আসিফ ভাইয়াও সেখানে উপস্থিত ছিল। তাকেও পার্টিতে ইনভাইট করা হয়েছিল।

ইমরান এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— কিন্তু আমাকে তো ও ফোন করে কিছুই বলল না।

ইশাত চুপ রইলো। ইমরান তখন বলল।
— তুই রেজিগনেশন লেটার তৈরি কর আমি এভিয়ানের অফিসে গিয়ে জমা দিয়ে আসব। আর এর দফারফা করে দিয়ে আসব।

ইশাত তাকে হাত ধরে থামিয়ে বলল।
— তোমার কিছু করতে হবে না। আমি নিজে গিয়ে জমা দিয়ে আসব। আর শেষবারের মতো কিছু কথা বলে দিয়ে আসবো।

ইমরান আশ্চর্য হয়ে বলল।
— এতো কিছুর পরেও তুই আবার ওর অফিসে যেতে চাচ্ছিস?

ইশাত অনুভূতি শূন্য গলায় বলল।
— শেষবারের মতো!!

__________________

এভিয়ান অফিসে এসে ইশাতের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাকে বেশ অগুছালো আর অশান্ত দেখাচ্ছে আজ। অন্যদিকে ইশাতও সবে মাত্র অফিসে এসে পৌঁছালো। ইশাতকে দেখে বাকি এমপ্লয়িরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু ইশাত করো সাথে কোনো কথা না বলে সোজা এভিয়ানের কেবিনে চলে এলো। এভিয়ান তার সামনের এক্সিকিউটিভ ডেস্কে মাথা নামিয়ে রেখেছিল। এমন সময় দরজায় নক পড়ায় সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকিয়ে ইশাতকে দেখার পর অস্থির হয়ে বলল।
— আমি জানতাম তুমি আসবে। তোমার অপেক্ষায়ই ছিলাম আমি।

ইশাত ভেতরে ঢুকে তার সামনে রেজিগনেশন লেটারটা রেখে বলল।
— আমি আর আপনার অফিসে কাজ করব না।

এভিয়ান লেটারটা সরিয়ে বলল।
— তোমাকে কাজ করতে হবে না তুমি শুধু আমার হয়ে থাকো।

পরক্ষণে ইশাতের দিকে সে ভালোমত তাকিয়ে বলল।
— এক রাতে এটা নিজের কি হাল করেছো?

ইশাত চোখে অশ্রু নিয়ে প্রশ্ন করলো।
— কাল রাতে এমন পাগলামি কেন করলেন? আর লোকটা যে কথাটা বলেছিল সেটা কি সত্যিই? আপনি কি সত্যিই উনার গার্লফেন্ডকে….

বাকিটা কথা উচ্চারণের আগেই এভিয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল।
— তুমি কি এসব কথায় বিশ্বাস করছো? তুমি কি জানো না আমি কেমন?

ইশাত নিশ্চুপ দাড়িয়ে রইলো। এভিয়ান তার মনের অনুভূতির কথা আর আড়াল রাখলো না। সে নেশাতুর চাহনি নিয়ে বলল।
— আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি ইশাত, বিয়ে করতে চাই তোমাকে।

ইশাত বিস্ময়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। পরক্ষণে নিজেকে সামলে সে বলল।
— সম্ভব না। আমি একজন মুসলিম পরিবারের মেয়ে আর আপনি অন্য ধর্মের।

এভিয়ান তার ভুল ধারণা সংশোধন করে বলল।
— তোমাকে কে বলেছে আমি অন্য ধর্মের? আমি কোনো ধর্মেই বিশ্বাসী না।

ইশাত হতভাগ হয়ে বলল।
— আস্তাগফিরুল্লাহ, আপনি কীভাবে ভাবলেন মুসলিম হয়ে আমি একজন না’স্তিককে বিয়ে করবো?

— কেন পারবে না? আমার মম তো করেছিল।

— আপনার মা মুসলিম মেয়ে হয়েও আপনার বাবাকে বিয়ের জন্য খ্রি’স্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এটা ছিল একটা দুর্ভাগ্য। তারা কেউ খুশি হতে পারে নি।

— তাহলে এখন কি করবো?

— আপনার সাথে আমার বিয়ে জায়েজ না।

— তুমি কি চাইছ আমি ইসলাম গ্রহন করি?

— আমি চাইলেই কি করবেন?

— অসম্ভব!! আমি যেটা বিশ্বাস করি না সেটা কেন করবো? আমি কখনোই ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে পারব না। আমার মম ড্যাডকে যেমন বিয়ের জন্য ধর্ম পরিবর্তন করে সুখী হতে পারে নি, নিশ্চয়তা কি আমরাও যে পারব? বিয়েটা আমি তোমাকে সারাজীবন নিজের করে রাখার জন্য করব। এতে আমার ধর্ম গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই।

এভিয়ানের এমন মতামত শুনে ইশাত রেগে গিয়ে বলল।
— ভুল ধারণায় বসবাস করা বন্ধ করুন। আপনার বাবা মা সুখী হতে পারেনি কারণ আপনার মা মুসলিম হয়েও ইসলাম ত্যাগ করেছিলেন। আর আপনি যেভাবে আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন এভাবে বিয়ে বাতিল বলে গণ্য হবে। আর আমার কাছে আমার ধর্ম আগে, আমার রব আগে, তারপর বাকিসব।

এভিয়ান তাকে আশ্বাস দিয়ে বলল।
— বিয়ের পর তুমি তোমার ধর্ম পালন করবে এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

ইশাত তাকে বোঝাতে ব্যার্থ হয়ে বলল।
— আসছি আপনি আমার মুখ আর কখনো দেখবেন না।

ইশাত রাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল। এভিয়ান অনেকবার তাকে পিছু ডাকলো কিন্তু ইশাত আর ফিরে তাকালো না। সে অফিস থেকে সোজা বাসায় এসে পড়লো। আসিয়া বেগম সেবারের মতো ইশাতের সাথে কোনো কথাই বলছে না। সানজিদা ড্রয়িং রুমের টিভি ছাড়তেই একটা সংবাদ মাধ্যমে ইমরানের সাক্ষাৎকার দেখা গেল। সেটা দেখে সানজিদা সবাইকে ডাকলো খবরটা দেখার জন্য। টিভিতে ইমরান একটা খু’নের বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে। ইশাতও নিউজটা দেখতে দাড়িয়ে পড়লো। এমন সময় ইমরানের সাক্ষাৎকার শেষ করে খু’নের স্থান আর যাকে খু’ন করা হয়েছে সেটা দেখানো হচ্ছে। ইশাত খেয়াল করতেই দেখলো খু’নের জায়গাটা কালকে রাতের পার্টি ক্লাব আর খু’ন হয়েছে ফেলিক্স। তাকে এমন নি”শংস ভাবে মা’রা হয়েছে যে তার লা’শ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। সেটাকে ঘোলাটে করে দেখানো হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে তাকে অনেক কষ্ট দিয়ে মা’রা হয়েছে। এটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মা কেঁপে উঠলো।

———————–

রাতে ইমরান এভিয়ানের বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হলো সে তার টিমসহ ভেতরে প্রবেশ করবে এমন সময় গার্ডরা তাদের বাধা দিলো। ইমরান তার পরিচয় দিল। কিন্তু তবুও গার্ডরা তাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। এমন সময় সে এভিয়ানকে কল করে বলল।
— আপনার বাড়ির বাহিরে আছি, গার্ডদের বলুন আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিতে।

— কল স্পিকারে দিন।

ইমরান কল স্পিকারে দিতেই এভিয়ান আদেশ করলো ইমরানকে ঢুকতে দিতে। গার্ডরা তাকে ছেড়ে দিল। ইমরান ভেতরে চলে গেল তার টিম সমেত। তারা হল রুমে এসে দাঁড়াতেই এভিয়ান নিচে নেমে এলো। ইমরান এভিয়ানকে দেখা মাত্র জেরা করে বলতে শুরু করলো।
— ফেলিক্স আজ সকালে মা’র্ডার হয়েছে।

— হ্যা নিউজ দেখেছি। কিন্তু সেটা আমার বাসায় এসে আমাকে কেন বলছেন?

— কাল শেষবারের মতো ক্লাবে ভিকটিমের সাথে আপনার ঝামেলা হয়েছিল।

— আপনি কি বলতে চাইছেন আমি মে’রেছি ওকে?

— এছাড়া আর কি দাঁড়ায়?

— ঠিকঠাক ইনফোমেশন নিয়ে এসেছেন? আমি সকালে অফিসে ছিলাম।

— হতেও তো পারে মানুষ দিয়ে করিয়েছেন।

এভিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।
— সেদিন রাতেই ওকে মা’রতে চেয়েছিলাম এবং মারতামও যদি আমাকে আটকানো না হতো। নিজের কাজ কেন মানুষকে দিয়ে করাতাম?

— আপনি কি মা’র্ডার স্বীকার করতে চাইছেন না? এখনো সময় আছে সা’রেন্ডার করুন শাস্তি কম হবে।

— আপনার টিম কি কাজ করে? কোন প্রমাণের ভিত্তিতে আমার কাছে আ’রেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছেন? আর ওই মার্ডা’রটা যেহেতু আমি করি নি তাহলে স্বী’কার কেন করবো?

ইমরান তাকে হুমকি দিয়ে বলল।
— আমি চাইলেই সবাইকে বলে দিতে পারি সেইসব অ’বৈধ ফ্যাক্টরির মালিক যে আপনি ছিলেন।

এভিয়ান তাচ্ছিল্য হেসে বলল।
— আপনি এক বিষয়ের মধ্যে আরেক বিষয় টানছেন। আইন আমিও জানি। আইন কোনো প্রমাণ ছাড়া মুখের কথায় কার্যকর হয় না। আমি যে ফাইলগুলো আপনাকে দিয়েছি ওইসব ফাইলে আমার নাম কোথাও উল্লেখ নেই। তাহলে আপনার কাছে মুখের কথা ছাড়া প্রমাণ কোথায়? আর ধরেই নিলাম, আজ রাতে আপনি আমাকে কোনভাবে সে’লে নিয়ে আটকে রাখলেন, সে ক্ষেত্রে পরেরদিনই আমি আমার ক্ষমতার জোড়ে বেরিয়ে আসার ক্ষমতাও রাখি। তাই আপনার ভালোর জন্য বলছি আমার পেছনে না লেগে খু’নির প্রমাণ জোগাড় করুন। আমার কথা শেষ, এখন আসতে পারেন আপনারা।

এভিয়ান তার কথা শেষ করে উপরে চলে গেল। এভিয়ানের কথায় ইমরান কিছুই মেলাতে পারলো না। সে কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে টিমকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। তবে ইমরানের হাতে এখনও একটা প্লাস পয়েন্ট আছে সে সকালের নিউজে একটা ক্লু দিয়েছিল। খু’নি নিউজটা দেখলে ঠিকই ধরতে পারবে। ইমরানের বিশ্বাস খু’নি নিশ্চই সেই ক্লু মুছতে গোপনে সেখানে যাবেই। আর সেও ওৎ পেতে থাকবে।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………..