Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০১

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০১

0
249

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_১
#Tahmina_Akhter

—ছোট ভাইয়ের বৌকে বিয়ে করতে চাস তোর লজ্জা লাগছে না ফায়েজ!!!

— আম্মা লজ্জার মত ব্যাপার আছে বলে তো আমার মনে হচ্ছে না। আমার মেয়ে পছন্দ হয়েছে এন্ড আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। ছোট ভাইয়ের বৌ বলছো কেন? নির্বাণের সঙ্গে নিশ্চয়ই ওর বিয়ে হয়ে যায়নি!!

ছেলের কথা শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন রোকসানা। ছোট ছেলের জন্য বৌ দেখে এসেছে,, বিয়ের দিন তারিখ ফিক্সড হয়ে গেছে। আর এখন বড় ছেলে বিদেশ থেকে এসে মেয়ের ছবি দেখে বলছে,, এই মেয়েকে সে বিয়ে করবে!!

রোকসানা মাথার ওপর থেকে হাত সরিয়ে আনে। বড় ছেলের দিকে তাকায়। খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেলেকে রোকসানা চিনে না। কারণ,, শান্ত মেজাজের ভদ্র ছেলে হলো ফায়েজ। একটা ডিসিশান নেয়ার আগে একশবার ভাবে। সে নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছাড়া এমন উদ্ভট আবদার করছে না ওর মায়ের কাছে।

— আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। যা বলেছি তাই করতে হবে তোমাকে আম্মা। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে আম্মা। তাছাড়া বড় ভাইয়ের বিয়ের আগে ছোট ভাই বিয়ে করলে লোকে কি ভাববে??

—বড় ছেলেকে বিয়ে করাতে চেয়েছিলাম কিন্তু বড় ছেলে বিয়ে না করে বিদেশ ঘাপটি মেরে বসে ছিল। বড়টার আশায় থাকতে গিয়ে ছোটটা যেন বুড়ো না হয় সেজন্য আমি ছোটটার বিয়ে ঠিক করেছি। কিন্তু,, হলো সেই লাউ আর কদু। ছোট ছেলের জন্য দেখা পাত্রী বড় ভাইয়ের পছন্দ হয়ে গেলো। কত বড় ফাঁটা কপাল আমার!! এখন আমি কি করে সবার সামনে গিয়ে বলব আমার ফায়েজ খেয়াকে বিয়ে করতে চায়। নিবার্ণের সঙ্গে খেয়ার বিয়ে হবে না। ফায়েজের সঙ্গে খেয়ার বিয়ে হবে।

— যেমন করে এইমাত্র বললে ঠিক তেমন করে বলবে। যাও গিয়ে বলো সবাইকে।

কথাটি বলে ফায়েজ ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসে। এদিকে রোকসানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কল লাগায় নির্বাণের নাম্বারে।

মাথার ওপর কাঁঠফাটা রোদ,, আকাশের সঙ্গে যেন আজ ভূমির মনোমালিন্য চলছে। তাই তো তীব্র রোদের মাধ্যমে প্রতিশোধ নিচ্ছে ভূমির কাছ থেকে। সতেজ ফুলগুলো নেতিয়ে গেছে। যেই পাখিগুলোর কলরব শোনা যেত প্রায় তারাই আজ গাছের পাতার আড়ালে নিশ্চুপ হয়ে আছে।

বিশাল আম গাছের নীচে বড় এক দোলনা রয়েছে। সেই দোলনায় দোল খায় বাড়ির বায়জৈষ্ঠ্য থেকে কনিষ্ঠ সদস্যরা। ফায়েজ হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দক্ষিণ দিকে থাকা আমবাগানের দিকে চলে যায়। বড় আম গাছের নীচে এসে দোলনায় বসে চুপটি করে। বহুবছর আগে যেমন বুকে ব্যথা হত। আজ ঠিক তেমনি ব্যথা অনুভূত হচ্ছে ওর বুকে। হারিয়ে যাওয়া অমূল্য সম্পদ যদি বহু বছর পর ফিরে পাওয়া যায় তখন কেমন অনুভূত হয়??

কিন্তু,, ফায়েজ জানে না সে আদৌও কি হারিয়ে যাওয়া তাকে পাবে কি না?? কি যেন নামটা? ও হ্যা মনে পরেছে “খেয়া” । খেয়া কিংবা নির্বাণ কেউ যদি রাজি না হয় তখন কি হবে?? ফএখন যেমন সে ছন্নছাড়া ঠিক তেমনি রয়ে যাবে চিরতরের জন্য ।

আকাশ পানে তাকিয়ে ফায়েজ বিড়বিড় করে বলল,,

“ভালোবাসা না পাওয়ার হাহাকারে শুকিয়ে যাওয়া হৃদয়ে কভু খেয়া নামের বৃষ্টি ঝরবে না ফায়েজের বুকে??”

_______________

সময় রাত বারোটা,,,

ফায়েজ নিজের ঘরে বসে আছে জানালার ধারে। হাতে কারো ছবি? সেই ছবির দিকে তাকিয়ে আছে পলকহীনভাবে। এমনসময় দরজায় নক হয়। ফায়েজ হাতের ছবিটা আজ আড়াল করে না। অন্যসময় হলে ঠিকই আড়াল করে ফেলত।

ফায়েজের ছোট ভাই নির্বাণ দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করে। ফায়েজ তাকায়নি কিন্তু নির্বাণের উপস্থিতি টের পেয়েছে । ফায়েজের এমন আচরণের সঙ্গে নির্বাণ বেশ পরিচিত। কিন্তু আজ অবাক হচ্ছে। কারণ এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার ভাইটা সেই আগের মতোই রয়েছে। এতটুকুই বদলায়নি।

—কিছু বলতে এসেছিস তাই না নির্বাণ???

নির্বাণ হাসে। নির্বাণের হাসি দেখে ফায়েজ ভ্রু কুঁচকে ফেলে। কারণ,, নির্বাণকে এমন কোনো কথা তো সে বলেনি যে হাসতে হবে!!

— ভাই তোমার সেই ছোটবেলা থেকে অভ্যাস আছে আমার প্রিয় কিংবা পছন্দের জিনিসে হাত বাড়ানো। বড় হবার পর ভেবেছিলাম হয়ত বয়সের সাথে সাথে ঠিক হয়ে গেছে তোমার বদঅভ্যেস। কিন্তু,, না কিছুই বদলায়নি। এতগুলো বছর তুমি ভীনদেশে পরে রইলে না বিয়ে করলে, না পরিবারকে দেখতে আসার প্রয়োজনবোধ করলে। কিন্তু,, গত পনেরো দিন আগে তোমাকে শুধুমাত্র আমার পছন্দের পাত্রীর একটা ছবি দিতেই তুমি দেশে এসে হাজির। কারণটা তাহলে আমি কি ধরে নেব ভাই?? অফিসের কাজে আজ আমি সুনামগঞ্জে ছিলাম কিন্তু মায়ের কথা শুনে না এসে পারলাম না। তুমি কি চাও আসলে?? সমাজের কাছে আমাদের রেপুটেশন কমে যাক?

— ভালোবাসা এসব রেপুটেশনের থিওরি বুঝে না। কখনো ভালোবেসে ভালোবাসার কাঙাল হলে বলবি রেপুটেশনের গু*লি মারি। হৃদয়কে ভালো রাখতে হলে ভালোবাসা দরকার। হৃদয় ভালো থাকলে আমি আছি,, আমি থাকলে না আমার রেপুটেশন কোন কাজে লাগবে। ভালোবাসা না থাকলে আমার রেপুটেশনের দরকার নেই।

ফায়েজের কথা শুনে নিবার্ণ অবাক হয়। ভীষন অবাক যাকে বলে। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ওদের। ওরা জানে সমাজে চলতে গেলে রেপুটেশনের কি প্রয়োজন? এই রেপুটেশনের গেঁড়াকলে পরে দু’ভাই দিন নেই রাত নেই কেবল পড়াশোনা আর অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছে। যাতে এই সমাজের বুকে তারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। হয়েছেও তাই নির্বাণ ব্যাংকে জব করছে। ফায়েজ কানাডায় ছিল এতদিন। এই যে তাদের দু’ভাইয়ের এত সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার পেছনের গল্পে কেবল মাত্র ওদের বাবা-মায়ের অবদান এবং আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি রয়েছে। এতকিছু তবে কেন করলো তারা? রেপুটেশনের জন্য নয় কি?

— ভাই তুমি পাগল হয়ে গেছ? কি সব বলছো তুমি নিজেও জানো না। আমার বিয়ে ফিক্সড হয়ে গেছে খেয়ার সঙ্গে। তাছাড়া…

— খেয়া কি তোকে পছন্দ করে নাকি তুই খেয়াকে পছন্দ করিস??

একেবারে শান্তসুরে প্রশ্নটি করলো ফায়েজ। নির্বাণ কেবল না বলল। আর কিছুই বলল না। বিষয়টা কেমন যেন ঘোলাটে লাগছে তার কাছে?

— নির্বাণ একটা কাহিনি শুনবি??

ফায়েজের এবারের বলা কথায় আরও একদফা অবাক হয় নির্বাণ। অবাকের রেশ কাটে ফায়েজের কথায়। ফায়েজ ওর হাতদুটো ট্রাউজারের পকেটে রেখে বলতে শুরু করলো সেই কাহিনী। যেই কাহিনির আজ একমাত্র শ্রোতা হবে নির্বাণ।

— বিদেশ যাওয়ার আগে পাসপোর্ট নিয়ে ঝামেলা হলো তোর নিশ্চয়ই মনে আছে? পাসপোর্টের ঝামেলা মিটিয়ে বাইক নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হচ্ছিলাম ঠিক সেই সময় রৌদ্রময় আকাশটায় কালো মেঘেরা এলো। পুরো শহর জুড়ে বইতে থাকলো শীতল বাতাস। এরপর নামলো মুষলধারে বৃষ্টি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিজে যাওয়ার ভয়ে বাইকে থামিয়ে চায়ের টংয়ের দোকানের ভেতরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার জন্মকাল থেকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সেই দোকান অব্দি দাঁড়িয়ে থাকা পর্যন্ত আমি শুধুই ফায়েজ ছিলাম। কিন্তু সেই পরমূহুর্ত থেকে আমি হয়ে গেলাম সম্পূর্ণ অন্য একজন। যার কেবল দেহটা ছিল,, দেহের মাঝে একখান প্রাণ ছিল কিন্তু হৃদয়টা ছিল না । কারণ,, হৃদয়টা সেদিন নিয়ে গেছে কেউ একজন। ফেরত নিতে পারিনি। কি করে ফেরত পাব?? তার নাম? সে কি এই শহরের? কিছুই জানতাম না আমি। কেবল আমি জানতাম,, নীল ও সাদা মিশেলে থ্রীপিছ পরা এক কন্যাকে। বর্ষার আকাশের ঘন কালো বৃষ্টির মাঝে তার নীল রঙের উপস্থিতি আমার কাছে মনে হয়েছে বিধাতার এক অনন্য সৃষ্টি।
সে ছাতা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে কারো জন্য হয়তো অপেক্ষা করছিল। এরই ফাঁকে আমি তার কয়েকটি ছবি আমার মোবাইলে ক্লিক করে রেখেছিলাম। সে টের পায়নি কারণ তার থেকে আমার দূরত্ব প্রায় তিন ফুটের। তাছাড়া, এত মুষলধারের বৃষ্টির মাঝে কে এত খেয়াল রাখে? কিছু সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর একজন মধ্যে বয়স্ক পুরুষ আসে বাইক নিয়ে। মেয়েটি সেই বাইকে উঠে চেপে বসতেই রওনা হলো।
সে চলে যাচ্ছে কথাটি আমার মস্তিষ্কে পৌছানো মাত্রই আমি

“তবে কি আমি তাকে হারিয়ে ফেললাম?”

মনে কেবল এই একটি বাক্যই চলছিল।
সেদিন বাড়িতে ফিরে এলাম এক ভগ্নহৃদয়,ভেতর থেকে গুড়িয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে। কেউ দেখতে পেলো না আমি ঠিক ভেতর থেকে কিভাবে ভেঙে পড়েছিলাম?

সময় অতিবাহিত হতে লাগলো,
আমি ভেবেছিলাম এক দেখায় তাকে হয়ত একটু ভালো লেগেছিল। কয়েকদিন পর ঠিক হয়ে যাব।
এই আশ্বাস নিজের মনকে দিয়েছিলাম। কিন্তু,,এত চেষ্টার পরও আমি তাকে ভুলতে পারিনি। আমারই ভাবনার মাঝে ভুল ছিল, নির্বাণ। আমি আমার মনকে বুঝিয়েছি তাকে আমি পছন্দ করি। আসলেই কিন্তু তা নয়। তাকে আমি এক পলক দেখার পর থেকেই ভালেবেসেছি।

তার চলে যাওয়া আমার জীবন কিছুর প্রভাব পরেনি। শুধু আমার হৃদয় টুকু মাঝে মাঝে উপলব্ধি করিয়ে দেয় ফায়েজ তোমার হৃদয় তোমার নেই, অচেনা কেউ একনজরে তোমার সবকিছু লুট করে চলে গেছে। যার ঠিকানা কিছুই তোমার জানা নেই কিভাবে আদায় করবে তোমার হারিয়ে যাওয়া হৃদয়? এই শহরে কোথায়? কোন অলিগলিতে করবে তোমার হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি?

জানিস নির্বাণ ওর যেই ছবিটি আমি লুকিয়ে তুলেছিলাম, তার অস্তিত্ব বলতে আমার জীবনে সেই মূহুর্ত,আর সেই ছবি ছাড়া আর কিছুই নেই।

সেই ছবি, আর সেই মূহুর্তের স্মৃতিখানি নিয়ে আমি বিদেশ পাড়ি জমালাম। বিদেশের মাটিতে যখন তাকে ভেবে ক্লান্ত হতাম। তখন আমার ভগ্ন হৃদয় কেবল ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলতো,,

“কখনো তুমি জানতেও পারবে না কেউ তোমায় ভালোবেসে অপেক্ষার আগুনে জ্বলে পুড়ছে। অপেক্ষায় আছি কিছু চমৎকারের আশায়, যেখানে হয়তো থাকবে প্রাপ্তির শ্বাস। তাই আজও অপেক্ষা করছি বসে তোমারই ফিরে আসার”

নির্বাণ,,, আমি জানতাম না বিধাতা এত চমৎকারভাবে তার খোঁজ আমাকে এভাবে দিবে!! তোর হবু স্ত্রী হিসেবে!! যাকে প্রতিমূহুর্তে ভালোবেসে না পাওয়ার যন্ত্রণায় হৃদয় হাহাকার করতো। সেই তাকে খুঁজে পেলাম কিন্তু…

এতটুকু অব্দি বলে ফায়েজ চুপ হয়ে গেছে। নির্বাণ স্তব্ধ হয়েই আছে। পুরো ঘর যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। নির্বাণ কি বলবে? মেয়ে মানুষ হলে হয়তো এমন কাহিনি শুনে কাঁদত কিন্তু নির্বাণ তো ছেলে। কারো দুঃখ শুনে চোখে পানি আসার মতো নরম মনের মানুষ তো সে নয়। কিন্তু আজ চোখের পানি বের হয়ে আসতে চাইছে। তার ভাইয়ের জন্য। দীর্ঘ সাতটি বছর ধরে তার ভাই “হৃদয় না সইবে” এমন ব্যথা নিয়ে ঘুরছে। অথচ,, তারা একটুও টের পেলো না।

” ভালোবাসায় কি তবে এতটা জোড় আছে যে সবার চোখের আড়ালে ভালোবাসাকে আড়ালে করে রাখা যায়?”

—শুধু খেয়াকে আমার করে দে। আমার যা কিছু আমি সব তোকে দিয়ে দেব। বিনিময়ে কেবল খেয়াকে আমার চাই। শূন্য হৃদয়টা হাহাকার করছে রে নির্বাণ! খেয়াকে দিয়ে দে না ভাই আমাকে।

ফায়েজের বলা শেষের কথাটি শুনে নির্বাণ আর সহ্য করতে পারে না। উঠে চলে যায় ফায়েজের ঘর থেকে। জীবনের এমন একটা মোড়ে এসে ওরা দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে কাউকে না কাউকে খালি হাতে অবশ্যই ফিরতে হবে। হয়তো নির্বাণ কিংবা ফায়েজ শূন্য হবে।

চলমান……