#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৫
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
আদিবা অনেকদিন যাবত খেয়াল করছে ইশাতকে মেয়েটা অনেক চুপচাপ হয়ে গেছে। সেদিনের পর আজ এক সপ্তাহ কেটে গেছে। তারা ভার্সটিতে এসেছে ক্লাস করছে। কিন্তু তার কাছে মেয়েটাকে স্বাভাবিক লাগছে না। ইশাতের মাঝের চঞ্চলতা অনুপস্থিত। মনে হচ্ছে যেন সব সময় সে কোনো এক ভাবনায় হারিয়ে থাকছে। ক্লাস শেষ হতেই আদিবা ইশাতকে কমন রুমে নিয়ে গেল। তাকে সোজা দাড় করিয়ে প্রশ্ন করলো।
— কি সমস্যা তোর? সেদিনের পর থেকে মুখ এমন লটকিয়ে রেখে দিয়েছিস কেন? কিছু কি হয়েছে?
ইশাত ঘাড় অন্যপাশে ঘুরিয়ে মুখ লুকিয়ে বলল।
— কই লটকিয়ে রেখেছি?
আদিবা হাত দিয়ে ইশাতের মুখ তার দিকে ঘুরিয়ে বলল।
— আমার থেকে কিছু লুকাস না আমি তোকে দেখেই সব বলে দিতে পারবো। তুই আমার ছোটবেলার বেস্টু।
ইশাত তখন কিঞ্চিৎ উৎকণ্ঠিত হয়ে সব খোলাসা করে বলল।
— আমি জানি না এমন কেন হচ্ছে কিন্তু তার ভাবনা আমি আমার মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারছি না। দিনরাত শুধু তাই কথাই মনে পড়ছে। যেন সেই একটা মুহূর্তে আমার পুরো জীবন থমকে আছে।
আদিবা আশ্চর্য হয়ে গেল ইশাতের মুখে এমন উদ্ভট কথা শুনে। সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো।
— কি আবোল তাবোল বলছিস এসব? কার ভাবনায় আটকে আছিস তুই?
পরমুহুর্তে কিছু একটা ভেবে মুখ বাঁকিয়ে হেসে বলল।
— ওহ আচ্ছা বুঝেছি তুই কি আসিফ ভাইয়ের কথা বলছিস? ওইদিন সে যেভাবে তোর দিকে তাকিয়ে গান করছিল। উফ আমি তো দেখেই ফিদা। নিশ্চয়ই তুইও তার প্রেমে পড়েছিস?
ইশাত চোখে রাগ প্রকাশ করে বলল।
— উল্টো পাল্টা বলবি কথা না ওনাকে আমি ভাইয়ের চোখে দেখি।
— তাহলে কার কথা বলছিস তুই?
— এক সপ্তাহ আগে তোর কাবিনের দিন যখন কনভেনশন হল থেকে বেরিয়ে অটো নিয়ে ফিরছিলাম তখন তাকে দেখেছি আমি। একটা বাচ্চাকে রোড এ’ক্সিডেন্ট থেকে সে বাঁচিয়েছিল। আমি খানিকটা দূরেই দাড়িয়ে ছিলাম। আমি অনুভব করেছি তার মাঝে কিছু একটা ছিল যা আমার হৃদয় ভেদ করে গিয়েছিল।
— এমন কি ছিল তার মাঝে? তোকে তো আজ পর্যন্ত কোনো ছেলেকে নিয়ে এমন আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখি নি। সব সময় ছেলেদের এড়িয়ে চলতি। তাহলে কি সেই ব্যক্তি? এমন কি ছিল তার? বর্ণনা বল তো আমিও একটু শুনি।
ইশাত তখন চোখে আবিষ্টতা নিয়ে বলল।
— সে আমার জীবনে দেখা প্রথম পুরুষ যাকে এক দেখায় আমি থমকে যেতে বাধ্য হয়েছি। আমার মতো কঠোর হৃদয়ের মেয়েকে গলাতে সক্ষম হয়েছে সে আগন্তুক। তার চালচলন, তার কথার ধরন, তার প্রত্যেকটা ভঙ্গিমা, তার রাশভারী কন্ঠস্বর, তার অসম্ভব সুন্দর চোখের রং, তার প্রত্যেকটা পুরুষালি বৈশিষ্ট্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাকে বর্ণনা করতে গেলে ভাষাও কম পড়ে যাবে। সে আমার কাছে অতুলনীয়।
— কি বলিস একবার কাউকে দেখেই কি তার প্রতি এতটা মুগ্ধ হওয়া যায়?
— জানি না তবে আমি হয়েছি।
— তোকে কারো জন্য এমন উতলা হতে আগে তো দেখি নি। তার পরিচয় নাম কিছু জানিস?
ইশাত হতাশ হলো তবে আশাহত না। সে উত্তরে বলল।
— নাহ।
আদিবা কপাল কুচকালো। চিন্তিত হয়ে বলল।
— কাউকে না জেনেই এভাবে প্রেমে পড়া কি ঠিক হবে? আগে আমাদের তার পরিচয় জানা উচিত।
ইশাত দিশেহারা হয়ে বলল।
— কোথায় খুঁজব তাকে? কোথায় সে আমি কিচ্ছু জানি না।
— তাহলে কিভাবে কি হবে?…
— জানি না তবে আশা রাখি আমাদের আবারো দেখা হবে।
— যদিও বিষয়টা এতটা সহজ না। তবে ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে গেলে তখন জিজ্ঞাসা করে নিস কেমন?
ইশাত মাথা নিচু করে নাকে শব্দ করে বলল।
— হুম।
— এবার আর মুখ লটকিয়ে রাখবি না বলে দিলাম।
— হুম, চল পরের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।
ভার্সিটিতে ক্লাস শেষ করে ইশাত বাড়িতে ফিরে এলো। অন্যান্য দিনের মত আজ আর তার জামাকাপড়ে কোনো ধুলো ময়লা লেগে নেই। তা দেখে আসিয়া বেগম সন্তুষ্ট হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
— কি ব্যাপার আজ বোধহয় কোনো ঝামেলা করো নি তাই না? জামাকাপড় নিয়ে অক্ষত অবস্থায় ফিরেছো।
ইশাত কাধের ব্যাগ রাখতে রাখতে বলল।
— আম্মু তুমি কি মজা নিচ্ছো?
— না আমি তো ভালো কথা বললাম। যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো আমি খাবার দিচ্ছি।
— ঠিকাছে ফ্রেশ হয়ে যুহরের নামাজ পরে আসছি।
মেয়ের কথায় আসিয়া বেগম কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন। সেভাবেই জানতে চাইলেন।
— অন্যদিন তো বলে কয়েও নামাজ পড়াতে পারি না তোমায় আর আজ নিজে থেকেই নামাজের কথা বলছো।
পরমুহুর্তে আপ্লুত হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া করে আবারো তিনি বললেন।
— আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমায় তার একজন মুমিন বান্দা হিসেবে কবুল করুক।
ইশাত মায়ের দিকে স্থির দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— আচ্ছা আম্মু আমি যদি আল্লাহর কাছে নামাজ পড়ে কিছু চাই সে কি আমাকে তাই দিবেন? তুমি তো সব সময় বলো আল্লাহ মহান পরম দয়ালু।
আসিয়া বেগম মেয়ের আগ্রহ দেখে মুচকি হেসে বললেন।
— তোমার উদ্দেশ্য যদি নেক হয় তিনি অবশ্যই দিবেন যা তুমি চাইবে তার কাছে। আল্লাহর কাছে করা দোয়া কখনও বৃথা যায় না। তিনটি পদ্ধটি অলম্বন করে আল্লাহ তাআলা দোয়া কবুল করে থাকেন। যখন কোনো মুমিন ব্যক্তির দোয়ায় কোনো পাপ থাকে না, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না, তাহলে আল্লাহ তিনটি পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে দোয়া কবুল করেন।
ইশাত কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলো।
— কি সেই তিনটি পদ্ধতি?
— সেগুলো হলো ১. সে যে দোয়া করেছে, হুবহু তা কবুল করে দুনিয়াতে দেওয়া হয়।
২. তার দোয়ার প্রতিদান পরকালের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। ৩. দোয়ার মাধ্যমে তার অনুরূপ কোনো অমঙ্গলকে তার থেকে দূরে রাখা হয়।’ (মুসনাদে আহমদ: ১১১৩৩)
তবে মনে রাখতে হবে, দোয়া করার সময় তা কবুল হওয়ার বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা জরুরি। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ (দোয়ায়) এমন কথা বলবে না যে হে আল্লাহ! আপনি যদি চান, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি যদি চান, তাহলে আমার ওপর দয়া করুন। আপনি যদি চান, তাহলে আমাকে জীবিকা দান করুন; বরং দৃঢ়তার সঙ্গে (আত্মবিশ্বাস নিয়ে) দোয়া করবে। মনে রাখবে, আল্লাহ যা চান, তা-ই করেন, তাঁকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।’ (বুখারি: ৭৪৭৭)।
তাহলে কি বুঝলে?
মায়ের কথায় ইশাত যেন আশার আলো দেখতে পেল। সে মুখে বিস্তৃত হাসি নিয়ে বলল।
— দৃঢ়তা ও বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করলে সেটা আল্লাহ কবুল করেন।
আসিয়া বেগম মাথা নাড়িয়ে বললেন।
— হ্যা। ঠিক বলেছ।
ইশাত আবারো প্রশ্ন করলো।
— আচ্ছা আম্মু আমি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি আর মনে নেকি নিয়ে দোয়া করি তাহলে কি তিনি আমাকে অসম্ভব কিছু চাইলেও তা দিবেন?
আসিয়া বেগম মেয়েকে আশ্বস্থ করে বললেন।
— অবশ্যই তিনি চাইলে সম্ভব অসম্ভব বলতে কিছু নেই। সবই তার কাছে সম্ভব। তবে আমাদের উচিত কোনো কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেকে পরিবর্তন না করে শুধু মাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নিজেকে পরিবর্তন করা। চাওয়া পাওয়া তো আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার একটা উসিলা মাত্র।
সব শুনে ইশাত আসিয়া বেগমকে চমকে দিয়ে তখন বলে উঠলো।
— তাহলে কাল থেকে আমি হিজাব করবো। আজ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করব। আমার জন্য দোয়া করো আম্মু। এতদিন যে তোমার কথা শুনি নি সেটার জন্য আমাকে মাফ করে দিয়ো। আমি নিজেকে পরিবর্তন করবো। ইনশাআল্লাহ।
হঠাৎ ইশাতের ভাবনার পরিবর্তন দেখে আসিয়া বেগম বললেন।
— এটা তো খুশির কথা। আমি সর্বদাই প্রত্যেক নামাজে আমার সন্তানদের জন্য দোয়া করি। আল্লাহ আজ আমার সেই দোয়া কবুল করেছেন। আমি চেয়েছিলাম যেন তুমি পর্দা করো নামাজ পড়। আজ যখন নিজের মুখেই বলছো আমি অনেক খুশি হয়েছি। তোমার জন্য আমার দোয়া রইলো। কিন্তু এমন কি চাই তোমার যার জন্য তুমি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চাইছ?
ইশাত কোনমতে মায়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে বলল।
— এমনি আম্মু আমি এখন গেলাম। একটুপর মার্কেটে যাবো কিছু হিজাব আর আবায়া নেওয়ার জন্যে। এখন থেকে সেগুলো পড়েই ভার্সিটিতে যাবো।
ইশাত যাওয়ার আগে কিছু একটা ভেবে আবারো দাড়িয়ে চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করলো।
— আমি তো এতদিন আল্লাহর কথা শুনি নি আমার পর্দা আর নামাজ যদি আল্লাহ কবুল না করেন তখন?
আসিয়া বেগম একজন আদর্শ মায়ের মত মেয়েকে পাশে বসিয়ে বুঝিয়ে বললেন।
— আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে কখনো হতাশ হবে না। তিনি ক্ষমাশীল ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। নিজের পাপ ও অক্ষমতার কথা স্বীকার করে তওবা করলে আল্লাহ তায়ালা খুশি হন। বান্দা নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত থাকবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তওবা করবে এটা আল্লাহ পছন্দ করেন। তুমি কি হাদীসের আলোকে এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাও?
— হ্যা আম্মু বলো আমি জানতে চাই আমার শুনতে খুব ভালো লাগছে।
ইশাত মনে মনে ভাবলো এতদিন কেন সে এমন আগ্রহ দেখায় নি? হয়তো তখন তার আল্লাহর কাছ থেকে কিছু প্রয়োজন ছিল না আজ প্রয়োজন বলে এতটা আগ্রহ। সারাবছর নাফরমানী করে প্রয়োজনে রবের দিকে ঝুঁকে পড়ায় নিজের কাছে নিজেই সে লজ্জিত হলো। তার ভাবনার সুতো কাটলো মায়ের কথায়। আসিয়া বেগম হাদিস বর্ননা করে বলতে লাগলেন।
— এক হাদিসে হজরত হারিস ইবনু সুওয়াইদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন :
আবদুল্লাহ রা. অসুস্থ ছিলেন। তার সেবা করার জন্য কোনো এক সময় আমি তার কাছে গেলাম। তখন তিনি আমাকে দুটি হাদিস বর্ণনা করলেন। একটি নিজের পক্ষ থেকে এবং অন্যটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে। তিনি বলেন:
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তায়ালা তার মুমিন বান্দার তওবার কারণে ওই ব্যক্তির থেকেও বেশি আনন্দিত হন, যে খাবার, পানীয় ও সওয়ারীসহ ছায়াপানিহীন আশঙ্কাপূর্ণ বিজন মাঠে ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর ঘুম থেকে সজাগ হয়ে দেখে যে, সওয়ারী কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। তারপর সে সেটি খুঁজতে খুঁজতে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ল এবং বললো, আমি আমার পূর্বের জায়গায় গিয়ে চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে মারা যাব। (এ কথা বলে) সে মৃত্যুর জন্য বাহুতে মাথা রাখল। কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে সে দেখল, পানাহার সামগ্রী বহনকারী সওয়ারীটি তার কাছে। (সওয়ারী এবং পানাহার সামগ্ৰী পেয়ে) লোকটি যে পরিমাণ আনন্দিত হয়, মুমিন বান্দার তওবার কারণে আল্লাহ তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। (সহিহ মুসলি, হাদিস : ২৭৪৪)
কাতাদাহ রহ. বলেন, মহান আল্লাহর বাণী, ‘তোমরা সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর কাছে তওবা করো।’ (সূরা, আত-তাহরীম, আয়াত :৮)
মায়ের মুখে হাদিস দুটো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনে ইশাত বললো।
— তুমি তো অনেক কিছু জানো আম্মু।
— তুমিও জানবে যদি হাসিদ নিয়ে পড়াশোনা কর। আর পবিত্র কোরআন শরীফের তাফসীরের অর্থ বুঝো।
— তুমি তো আমাকে কুরআন পড়া শিখিয়েছ ছোট থেকেই। আমি নিয়মিত না পড়ার কারণে এখন জড়তা কাজ করবে পড়তে গেলে। তোমাকে একটু কষ্ট করে আবারো কুরআন বুঝিয়ে দিতে হবে। আর তোমার হাদিস বইগুলো আমাকে দিয়ো আমি সেগুলো পড়বো। অনেক কিছু জানার আছে আমার।
— ইনশাআল্লাহ। আজ নফল পড়ে আল্লাহকে শুকরিয়া আদায় করবো। তিনি আমার মেয়েকে সঠিক বুঝ দান করেছেন। আমার আর কি চাই।
খুশিতে তার চোখ চিকচিক করে উঠলো আসিয়া বেগম মেয়ের মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দিলেন। ইশাত মায়ের থেকে দোয়া নিয়ে নিজের রুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………………….
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৬
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
ইশাত ভার্সিটির ভেতর প্রবেশ করতেই তাকে দেখে সবাই থ হয়ে দাড়িয়ে গেছে। এতদিন যে ইশাতকে তারা ফ্যাশনেবল হয়ে চলতে দেখেছে সে মেয়ে নাকি আজ হিজাব আর আবায়া পড়ে ভার্সিটিতে এসেছে। আসিফ ক্যাম্পাসের মাঠে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল হঠাৎ ইশাতকে এমন পোশাকে দেখে সেও ভ্যাবাচেকা খেয়ে পড়ে যেতে নিয়ে নিজেকে সামলে বলল।
“এই মেয়ে শুরু করলোটা কি, আমার মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে ও।”
তার কথা শুনে পাশের বন্ধুরা হাসতে হাসতে তাকে বলল।
“মামা তুই দেখি ফাইসা গেছস ফান্দে।”
আসিফ হতাশ হয়ে বলল।
“আমাকে সেদিন ও প্রোপোজ করার আগেই প্রত্যেখান করে দিয়েছে। আমি কি করবো?”
বিপরীতে তার বন্ধুদের মাঝে একজন ভাবুক হয়ে বলল।
— বুঝেছি তোর টিপস লাগবে এরে পটানোর জন্য।
আসিফ মনে এক চিলতে আশা নিয়ে বলল।
— তোর মনেহয় ও পটবে আমার কাছে?
আসিফের আশায় এক বালতি পানি ঢেলে তার বন্ধু কৌতুক করে বলল।
— অবশ্যই! তুই এক কাজ কর ডিস্কো বলমবলম বাবার কাছে যা সে ভালো লাভ টিপস দেয় তুই বললে তার নাম্বার দেই তোরে আমি?
আসিফ কোনো যুক্তিযুক্ত উত্তরের আশায় ছিল বিপরীতে এমন উত্তর আসাতে তার মাথায় দপদপ করে রাগ চড়ে গেলো। সে রেগেমেগে তাদের সেখানে ফেলে রেখে উঠে অন্যদিকে হেঁটে চলে গেলো। পেছন থেকে অনেকবার ডাক পড়লেও সে আর ফিরে তাকালো না।
অপরদিকে আদিবা তো ইশাতকে দেখে ছুটে এসে বলেই ফেলল।
“অবিশ্বাস্য বিষয়! তুই হঠাৎ হিজাবে?”
ইশাত মুচকি হেসে তাকে আগে সালাম দিয়ে উত্তরে বলল।
“এখন থেকে বাহিরে বের হলে এভাবেই বের হবো। পর্দা করবো।”
আদিবা আশ্চর্য হয়ে সালামের উত্তর নিয়ে বলল।
— তোকে তো আজ পুরোনো ইশাত লাগছেই না। একদম অন্যরকম লাগছে। খুবই সাদামাটা মনে হচ্ছে আমার সামনে এক ভিন্ন ইশাত দাড়িয়ে আছে।
— তাই নাকি! হিজাব মানেই তো সৌন্দর্য আড়াল করা। এভাবে যদি আমাকে আগের ইশাত না লেগে থাকে তাহলে আমি সফল। আমি বলবো তুইও পর্দা করা শুরু করে দে।”
— কি বলিস! এখনই তো বয়স স্টাইল করার। পর্দা নাহয় আরেকটু বয়স হলে করবো আরো কত সময় পড়ে আছে। এখন পর্দা করলে মানুষ বুড়ো বলবে না?
— এটা আমাদের ভুল ধারণা। হায়াত আর মৃ’ত্যুর কথা আমরা কেউ কখনো বলতে পারি না। পরবর্তীতে নিজেকে পরিবর্তন করার জন্য হায়াত আর সুযোগ যদি না পাস তখন? তাছাড়া নারীদের প্রাপ্ত বয়সের পর থেকে যেমন নামাজ ফরজ তেমন পর্দাও ফরজ। পর্দা আমরা করব আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় অন্যেরা এতে কি বলল কি ভাবলো তাতে কি আসে যায়!
— ইশাত তুই তো এসব বিষয়ে আগে এতো সিরিয়াস ছিলিস না হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারণ কি?
ইশাত মুচকি হেসে বলল।
— বিশাল একটা কারণ আছে বলতে পারিস আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ পড়ে নাহয় জানতে পারবি।
— আরে এখন বললে কি সমস্যা?
ইশাত আদিবাকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে ক্লাসের ভেতর নিয়ে যেতে যেতে বলল।
— প্রফেসর এসে গেছেন ক্লাস শুরু হয়ে যাবে জলদি আয়।
______________________________________________
আজ বাহিরের আবহাওয়াটা বেশ সুন্দর। বিকেলের নির্মল ঠান্ডা বাতাস শরীরে এসে ছুঁতেই ইশাতের মনে সতেজতা ছেয়ে গেলো। যেন এতটুকুরই প্রয়োজন ছিল তার উদাসীন মনকে চাঙ্গা করে তুলতে। কফি হাতে ইশাত সানন্দে বারান্দায় বসে ক্যানভাসে আরবী ক্যালিগ্রাফি আর্ট করছে। ইউটিউব দেখে এই ক্যালিগ্রাফি আঁকানো শিখেছে সে। আর্ট আর ক্রাফটের প্রতি অন্যরকম একটা ঝোঁক তার পূর্বের থেকেই ছিল। সেই ঝোঁক থেকেই সে অবসর সময়ে নানান কারুকাজ করে নিজের রুম সাজিয়ে তুলতে পছন্দ করে। দেখতে গেলে এসব বিষয়ে মেয়েটা ভীষণ গুনি। তাইতো তাদের পুরো ফ্ল্যাটের মধ্যে তুলনামূলক তার রুমটা বেশ নজরকাড়া।
তবে সে ইদানিং নিজের রুমে কিছু পরিবর্তন এনেছে। কিছুদিন আগে যে দেয়ালে তার আঁকানো জীবন্ত প্রাণী আর মানুষের স্কেচ টাঙানো ছিল সেগুলো সরিয়ে তার পরিবর্তে সেখানে ক্যালিগ্রাফি একে টানিয়ে রাখছে সে। এর মূল কারণ কিছুদিন আগে যখন মায়ের কাছ থেকে আনা হাদিস বইগুলো সে পড়ছিল তখন সেখানে কিছু হাদিস এমন ছিল যে।
আব্দুল্লাহ্ বিন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “নিশ্চয় যারা এই ছবিগুলো বানায় কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে এবং বলা হবে: তোমরা যা সৃষ্টি করেছ সেগুলোকে প্রাণ দাও।”
[সহিহ বুখারী (৫৬০৭) ও সহিহ মুসলিম (২১০৮)]
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “কিয়ামতের দিন সর্বাধিক শাস্তিপ্রাপ্ত মানুষ হবে যারা আল্লাহ্র সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য তৈরী করে।”
[সহিহ বুখারী (৫৬১০) ও সহিহ মুসলিম (২১০৭)]
হাদিসগুলো তার চোখে পড়ার সাথে সাথে সে নিজের আঁকা জীবন্ত প্রাণীর ছবিগুলো সরিয়ে ফেলেছে। এখন থেকে ইশাত ঠিক করেছে নিজেকে সে সকল দিক থেকে পরিবর্তন করবে যেগুলো থেকে তার রব বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। নিজের মধ্যে যে ভুল ত্রুটি রয়েছে সেইসব কিছু সে একেক করে সংশোধন করবে। আসিয়া বেগম মেয়ের চেষ্টা দেখে বারবার মুগ্ধ হচ্ছেন। যে মেয়ে আগে নামাজ রোজার নামে পালিয়ে বাঁচতো সেই মেয়ে কিনা এখন নিজে থেকেই এসব পালন করছে যা তার নিকট আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার সমতুল্য। তিনি আল্লাহকে শুকরিয়া করে অবসর পাচ্ছেন না।
যেহেতু ইশাতের আগে থেকেই কুরআন শেখা ছিল কিন্তু নিয়মিত না পড়ার কারণে আরবী উচ্চারণে জড়তা কাজ করছিল তাই এই কয়েকদিনের মাথায় সময় বের করে সে মায়ের কাছে কুরআন অধ্যয়ন করেছে। ফলস্বরূপ এখন সে কোনো প্রকার সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে শুদ্ধ ভাবে কুরআন পড়তে সক্ষম।
আপাতত পেইন্ট ব্রাশের সাহায্যে ক্যালিগ্রাফিতে রং ভরার কাজে ইশাতের গভীর মনোযোগ। ঠিক এমন সময় কেউ বাহিরে দরজায় বেল বাজাচ্ছে। ইশাত ভাবলো হয়তো এই মুহূর্তে তার মা কক্ষে শুয়ে আছে তাই নিজে থেকেই উঠে দরজা খুলতে গেলো। দরজা খোলার আগে মাথায় হিজাবটা ঠিক করে পড়ে নিলো। দরজা খুলতেই সে অবাক হলো বিপরীতে আসিফ আর তার আম্মুকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তার পেছন থেকে আসিয়া বেগম এগিয়ে এসে মুখে বিস্তৃত হাসি নিয়ে বললেন।
“আরে রোকসানা তুই?”
আসিফের আম্মুও পরিবর্তে একটা হাসি উপহার দিয়ে বললেন।
“তোর কথা মনে পড়ছিল তাই ছেলেকে নিয়ে চলে এলাম। এমনিতে আমার ছেলে আমার সাথে কারো বাসায় যেতে রাজি হয় না কিন্তু আজ ওকে যখন বললাম ইশাতদের বাসায় যাব তখন ঝটপট রাজি হয়ে গেল। তাই ওকেও নিয়ে এলাম সঙ্গে করে।”
মায়ের এমন সোজাসাপ্টা কথায় লজ্জায় পড়ে মাকে থামিয়ে আসিফ বলল।
“না না তেমন কিছু না আন্টি আজ একটু ফ্রি ছিলাম তাই চলে এলাম আপনাদের দেখতে।”
আসিয়া বেগম খুশি হয়ে তাদের ভেতরে নিয়ে লিভিংরুমে বসালেন। ইশাত রোকসানা বেগমের সাথে টুকিটাকি কথা বলে রান্নাঘরে চলে গেলো কফি বানিয়ে আনতে। আসিফের চোখ বারবার শুধু ইশাতকেই অনুসরণ করছে। ইশাত এসে টেবিলে কফি আর নাস্তা রেখে নিজের রুমে চলে গেলো। আসিয়া বেগম আর রোকসানা বেগম নিজেদের আলাপে ব্যস্ত। এমন সময় আসিফ ভনিতা না করে বলেই ফেলল।
— আন্টি আমি কি ইশাতের রুমটা ঘুরে দেখে আসতে পারি?
আসিয়া বেগম উত্তরে কিছু বলবেন তার আগেই রোকসানা বেগম ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন।
— তুই আমাদের মাঝে থেকে আর কি করবি যা নাহয় ইশাতের সাথেই গিয়ে কথা বল।
আসিফকে ছেলে হিসেবে ভালো লাগলেও আসিয়া বেগম মনে মনে আপত্তি করলেন। তার মতে বিয়ের আগে দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়ের একান্তে কথা না বলাই ভালো। তিনি মুখে বললেন।
— বাবা তুমি বসো আমি ইশাতকে ডেকে দিচ্ছি এখানে বসেই নাহয় কথা বলো।
কিন্তু আসিফ আসিয়া বেগমকে অজুহাত দেখিয়ে বলল।
— আন্টি আপনি বসুন, আপনার কষ্ট করতে হবে না আমিই ওকে ডেকে আনছি।
আসিয়া বেগম আর কিছুই বলতে পারলেন না। ওইদিকে আসিফ ইশাতের রুম কোনটা সেটা তখনই খেয়াল করেছিল যখন তাকে রুমে যেতে দেখেছিল। সে ইশাতের রুমের বাহিরে দাড়িয়ে দরজায় দুএকবার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেলো। দরজার বাহিরে আসিফকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ইশাতের ব্রুদয়ের মাঝখানে সূক্ষ্ম কয়েক ভাঁজ পড়লো। আসিফ তখন ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল।
— তোমাকে ডাকতে এসেছিলাম। আন্টি ডাকছে তোমাকে।
— তো আম্মু নিজে কেন আসলো না?
— কারণ আমি এসেছি।
আসিফ কিছু একটা লক্ষ্য করে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করে আবারো বলল।
— বাইদ্যাওয়ে, তোমার গালে রং লেগে আছে কেন?
ইশাত হাতের সাহায্যে গালের রং মুছতে মুছতে বলল।
— সেটা কিছু না একটু আর্ট করছিলাম।
— সত্যি! আমি কি দেখতে পারি?
ইশাত নাকচ করে বলল।
— দুঃখিত, আমি আমার ব্যক্তিগত রুমে কাউকে প্রবেশ করার অনুমতি দেই না।
— কিন্তু আমরা তো ফ্রেন্ড তাই না?
— আপনাকে কবে বললাম আমরা ফ্রেন্ড? আপনি আমার ভার্সিটির বড় ভাই হন। এখানে ফ্রেন্ড হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
— তাহলে সেই হিসেবে হলেও তো আমরা সুপরিচিত তাই না?
— আংশিক।
আসিফ হাল না ছেড়ে কথা বাড়িয়ে বলল।
— ঠিকাছে তাহলে দেখাও তুমি কি আর্ট করছিলে।
ইশাত বুঝতে পারলো আসিফ এমনি এমনি যাবে না। তাই সে আসিফকে কিছুক্ষণের জন্য অনুমতি দিল ভেতরে আসার। আসিফ সুযোগ পেতেই খুশিতে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে দেখলো ইশাতের রুমের দেয়াল জুড়ে দৃষ্টিনন্দন আর্ট সারিবদ্ধ ভাবে ফ্রেম করে টানানো। বেডের পাশে গোল্ডেন রঙের ফেইরি লাইটের সাথে লতানো আর্টিফিসিয়াল মানি প্ল্যান্ট পাতাগুলো অর্গানাইজড করে সাজানো। এমনকি রুমের সিলিং পর্যন্ত কটন ক্লাউড থিম করা তার মাঝে আবার রয়েছে এলিডি লাইট। লাইটের আলোর প্রতিফলনের সাথে আর্টিফিসিয়াল মেঘ গুলোও আলোকিত হয়ে উঠেছে। যা দেখে মনে হবে এটা কোনো জীবন্ত মেঘের দৃশ্য। রুমের প্রত্যেকটা কোনায় এমন আরো ভিন্ন ভিন্ন কারুকাজ। আসিফের চোখ ধাঁধিয়ে গেলো ইশাতের এমন লুকানো প্রতিভা দেখে। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল।
— তোমার রুমে এসে মনে হচ্ছে যেন আমি অন্য এক জগতে পা রেখেছি। অসম্ভব সুন্দর তোমার কারুকাজ। সত্যিই অনেক ইমপ্রেসিভ।
— জাযাকাল্লাহু খায়রান।
— আচ্ছা একটা প্রশ্ন করতে পারি?
— হুম।
— কিছুদিন যাবত তোমার মাঝে অনেকটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। এই ধরো তোমার চালচলন আর কথার ধরনে। তবে আমার কাছে তোমাকে সব ভাবেই ভালো লাগে।
ইশাত কাঠকাঠ জবাবে বলল।
— এসব নিজেকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা মাত্র। আমি চাইব আপনি আমার দিকটা বুঝে নিজের চিন্তাধারাকে সংযত রাখবেন। আমি কারো দৃষ্টিতে ভালো লাগার জন্য নিজের মাঝে এমন পরিবর্তন আনছি না বরং নিজেকে আড়াল করতে আমার এই ক্ষুদ্র চেষ্টা। চলুন বাহিরে যাওয়া যাক আম্মু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
আসিফ মাথা দুলিয়ে বাহিরে চলে গেল। ইশাতও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাহিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………….

