#খুঁজেছি_তোকে (২০/শেষ)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
দেখতে দেখতে সময় যেন খুব তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে।
এই তো কিছুদিন আগের কথা। নূরা বাবা’র বাড়ি যাবে বলে জেদ ধরে বসে ছিল। নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ। এদিকে সামিরের যাওয়ার মতো সময় ছিল না। তবুও বউয়ের আবদার রাখতে তাকে রাত নয়টা ছুটতে হয়েছিল শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্য। সেদিনের কথা ভাবলেই নূরা’র হাসি পায়। রাতে নূরা রুম গোছাচ্ছিল সামির তখন নিচে বাবা’র সাথে কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। তাই নূরা রুমে চলো এসেছে। রুম টা একটু অগোছালো তাই ঠিকঠাক করছিল। সামির কখন রুমে এসেছে খেয়াল করেনি। হঠাৎ করে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরায় কিছু টা ভড়কে যায় নূরা কিন্তু পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয়। কারণ এই স্পর্শ তার চেনা। খুব চেনা। সামির ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে দুষ্টুমি করে বলে,
“- বউ!
সামিরের ডাক টা মোটেও ভালো মানুষির না।নূরা ঠিকই বুঝতে পেরেছে সামিরের মাথায় কোনো দুষ্টু বুদ্ধি এসেছে। নূরা চোখ ছোটো ছোটো করে বলে,
“- কাহিনি কি ভাই?
সামির ছ্যত করে উঠে। নূরা ছেড়ে রাগী গলায় বলে,
“- আমি তোমার ভাই লাগী? কোন কালের ভাই উহু?
রাগের কারণে সামিরের নাকের ডগা লাল হয়ে গেছে। সামান্য ভাই ডাকায় যে এভাবে রেগে যাবে ভাবেনি নূরা। নূরা ও কম যায়নি। সামির কে আরেকটু রাগানোর জন্য বলে,
“- আরে ভাই আপনি রাগ করছেন কেন?
“- থাপড়িয়ে তোমার গাল আমি লাল করে দিবে?
“- এত রাগ কিন্তু ভালো না মাস্টার মশাই। আমি কিন্তু একসময় আপনাকে ভাই বলেই ডাকতাম। এখন মাঝে মধ্যে ডাকলে সমস্যা কোথায়?
“- আগে ডাকতে তখন সম্পর্ক আলাদা ছিল কিন্তু এখন আমাদের সম্পর্ক বদলেছে। আমরা এখন স্বামী স্ত্রী। তাই মনের ভুলেও তুমি আমায় ভাই ডাকবে না। ভাই ডাকলে ছাদে নিয়ে টুপ করে নিচে ফেলে দিবো কিন্তু।
“- ছাদ থেকে ফেলতে পারবেন তো সামির?
সামির দমে গেলো কারণ সে কখনোই এমনটা করতে পারবে না। নূরা তার পৃথিবী। নূরা’র কিছু হয়ে গেলে সে বাঁচতে পারবে না। সেখানে নিজ হাতে ছাদ থেকে ফেলা অসম্ভব। নূরা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সামিরের গলা জড়িয়ে ধরে। কপালে নিজের উষ্ণ ঠোঁট ছোঁয়ায়ে বলল,
“- জানি তো পারতাম না। আমি মজা করছিলাম। আসলে রাগলে আপনাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে। একদম স্ট্রবেরির মতো। টুপ করে খেয়ে ফেলতে মন চায়।
সামির চোখ বড় বড় তাকালো। কারণ সাধারণত নূরা এমন লাগামহীন কথা বলে না। সেখানে আজ মুখে যা আসছে তাই বলছে। নূরা সামিরের শার্টের দুটো বোতাম খুলে উন্মুক্ত বুকে আঁকিবুঁকি করতে। সামির চোখ ছোটো করে সব দেখছে। আসলে নূরা কে বোঝার চেষ্টা করছে। নূরা’র ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি। নূরা কিছু বলতে গিয়েও বারবার থেমে যাচ্ছে। বিষয় টা সামির লক্ষ্য করে বলল,
“- আমার বউ কি কিছু বলতে চাই আমায়?
“- আপনি কি করে বুঝলেন?
সামির মৃদু হাসল। তারপর বলল,
“- পুরো তুমি টায় তো আমার। সেখানে তোমার মনে কি চলছে সেটা আমি বুঝবো না। এমনটা কি করে হয় প্রিয়?
নূরা লজ্জায় মুখ নুইয়ে নেয়। ফ্লোরে পায়ের বুড়ি আঙুল দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে আমতা আমতা করে বলে,
“- সামির…!
সামির নূরা’র থুঁতনি উঁচু করে মুখের সামনে এনে বলে,
“- পুরো আমি টায় তোমার। সেখানে তুমি মাথা নিচু করে কিছু বলবে বিষয় টা কেমন লাগে না? তুমি সবসময় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চাইবে। যাতে আমি না করতে না পারি।
আজ সামিরের দিকে তাকাতেও লজ্জা করছে নূরা’র। তবুও সামিরের চোখের দিকে তাকালো নূরা। তারপর হঠাৎ সামিরের বুকে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে।
“- আমাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি এসেছে সামির।
সামির চমকে উঠল। তৃতীয় ব্যক্তি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য জন্য সামিরের নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। সামিরের চোখে মুখে হাজারো ভয় এসে জেকে বসলো। তৃতীয় ব্যক্তি বলতে তার নূর কি বোঝাতে চাইছে। সামির কাঁপা গলায় বলল,
“- মানে..? তৃতীয় ব্যক্তি! তুমি কি বলছে চাইছো নূর?
সামিরের আচরণে বড়কে গেলো নূরা। অবাক হয়ে বলল,
“- আপনি বুঝতে পারছেন না সামির ?
“- না। তুমি ক্লিয়ার করে বলো।
নূরা সামিরের ডান হাতটা নিয়ে নিজের পেটে চেপে ধরে সামিরের চোখের দিকে তাকিয়ে করুন গলায় বলে,
“- আপনি এখনো বুঝতে পারছেন না সামির?
সামির আবারও চমকে উঠল। নূরা ওর পেটে হাত দিচ্ছে। তৃতীয় ব্যক্তি মানে তাদের বাচ্চা। সামির অবাক হয়ে বলল,
“- নূর তুমি মা হতে চলেছো?
নূরা লজ্জা পেয়ে সামিরের বুকে মাথা গুঁজে বলে,
“- হ্যাঁ। আর আপনি বাবা।
মুহুর্তেই যেন সামিরের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক দেখা দিলো। সামির খুশিতে চেচিয়ে বলে,
“- তুমি সত্যি বলছো নূর? আমি বাবা হতে চলেছি?
“- হ্যাঁ। আপনি বাবা হতে চলেছেন।
সাথে সাথে সামির নূরা কোলে তুলে নিলো। নূরা ভয়ে সামিরের গলা আঁকড়ে ধরল। সামির নূরা ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
“- আমি খুবউউউ খুবউউ খুশি নূর। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ লাগছে। তুমি আমাকে বাবা হওয়ার স্বাদ দিলে। আই এম সো হ্যাপি।
“- আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি আগে আমায় নামান।পরে যাবো তো।
সামির সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলো। নূরা বিছানায় বসিয়ে বলল,
“- আজ থেকে তুমি পুরো দমে রেস্ট নিবে। একদম দৌড়াদৌড়ি করবে না।
নূরা ইনোসেন্ট ফেস করে সামিরের দিকে তাকিয়ে আছে। সামির তা দেখে বলল,
“- এভাবে তাকালে লাভ হবে না জান। তোমাকে আমার কথা মানতেই হবে।
“- ঠিক আছে।
“- এখন আর রাত জাগা যাবে না। ঠিক করে শুয়ে পড়ো।
“- আপনি না আসলে ঘুম হবে না তো.!
সামির মুচকি হেঁসে বলল,
“- আসছি।
অতঃপর সামির বিছানায় শুয়ে নূরা কে নিজের কাছে টেনে নিলো। নূরা বিশস্ত বুক পেয়ে আরামে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে গেলো।
.
.
নূরা গভীর ঘুমে আসন্ন। সামির নূরা’র চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবতে লাগলো সেদিনের কথা। যা সে নূরা কে জানায় নি। সেদিনের সেই আননোন নাম্বার থেকে আসা মেসেজ। যা সম্পূর্ণ কাকতালীয় ভাবে সামিরের ফোনে এসেছিল। পরদিন সেই নাম্বার থেকে কল করে সামিরের কাছে ক্ষমা চায়। সামির তাকে মাফ করে দেয় এবং সতর্ক করে দেয়। যেন এমন ভুল আর না হয়।
,
,
দেখতে দেখতে কয়েকমাস কেটে গেলো। নূরা’র এখন সাত মাস চলছে। চৌধুরী বাড়ির সবাই নূরা কে মাথায় করে রাখে। নূরার শাশুড়ী তো নূরা কে চোখে হারান। সামির এখন তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরে। শুধু ভার্সিটিতে থাকার যে টাইম টুকু। এর বেশি সে টাইম ওয়েস্ট করে না। এই সময় তাকে নূরা’র প্রয়োজন।
প্রত্যেকদিনের মতো ভার্সিটি থেকে বাসায় ফেরে সামির। নূরা সামিরের জন্য এক গ্লাস পানি এনে দেয়। যা দেখে রাগ করে সামির। সামিরের রাগ দেখে বলে,
“- এই আপনি সবসময় এমন কেন করেন? আমি কি ছোটো বাচ্চা ঠিক করে এক গ্লাস পানি ও আনতে পারব না।
সামির কোনো কথা না বলে নূরা কে নিজের কাছে টেনে কপালে গভীর চুম্বন খেলো। তারপর বলল,
“- তুমি একটু বসো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
.
.
রাত তখন নয়টা। সামিরে বুকে ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে নূরা। আর সামির নূরা’র চুলে বিলি কাটে। তখন নূরা কে বলে,
“- একটা গান শুনবে?
“- হু, শোনান।
সামির হালকা কেশে সুর তুলে।
খুঁজেছি তোকে রাত বেরাতে জ্বলেনি আলো স্বপ্নে
লুকিয়ে চিঠি তোকে লেখা, তুলে রেখেছি যত্নে।
মনের অলি গলি, হয়ে কেন পালালি,রাতেও মরিচিকা দেখছি একা একা।
গিয়েছি ঘুম উড়ে,বুক পুড়ে,ছাই উড়ে,ট্রালা লা লা লা।
খুঁজেছি তোকে রাত বেরাতে জ্বলেনি আলো স্বপ্নে।
লুকিয়ে চিঠি তোকে লেখা
তুলে রেখেছি যত্নে।
মনের অলি গলি, হয়ে কেন পালালি,
রাতেও মরিচিকা দেখছি একা একা।
গিয়েছে ঘুম,উড়ে বুক,পুড়ে ছাই উড়ে, ট্রালা লা লা
ও হো হো হো…..
ও হো হো হো…( ২)
খেয়ালে খোয়াবে ভরা নৌকা ভাসে যদি,
ভোরের তরীতে চড়ে কাল কেউ আসে যদি। (২)
মনের অলি গলি, হয়ে কেন পালালি।
রাতেও মরিচিকা দেখছি একা একা।
গিয়েছে ঘুম উড়ে, বুক পুড়ে,ছাই উড়ে,ট্রালা লা লা লালা।
ও হো হো হো হো (৪)
ধোঁয়াটে কুয়াশা ভরা রাস্তার মাঝখানে,
কেন যর দাড়িয়ে প্রেম হাতড়াস কে যানে।(২)
মনের অলি গলি, হয়ে কেন পালালি।
রাতেও মরিচিকা দেখছি একা একা।
গিয়েছে ঘুম উড়ে, বুক পুড়ে,ছাই উড়ে,ট্রালা লা লা লালা।
ও হো হো হো হো (৪)
নূরা মুগ্ধ হয়ে শুনল। তারপর বলল,
“- বাহ্ আপনার গানের গলা তো মারাত্মক সুন্দর। কিন্তু এই গান টা…!
সামির মুচকি হেঁসে বলে,
“- আমি যেদিন প্রথম অনুভব করি আমি তোমার প্রেমে পড়েছি সেদিন থেকে এই গান নিজের ভিতরে জমিয়ে রেখেছি। তোমাকে অনেক আগেই শুনাতে চেয়েছিলাম কিন্তু শোনানো হয়নি।
“- ভালোবাসি সামির !
সামির চমকালো। নূরা’র মুখে প্রথম ভালোবাসি শব্দ টা শুনল। সামির শক্ত করে নূরা কে জড়িয়ে ধরে বলল,
“- ভালোবাসি! ভালোবাসি! ভালোবাসি বউজান! সারাটাজীবন তোমায় বুকে নিয়ে বাঁচতে চায়।
[সমাপ্ত ]

