#খুঁজেছি_তোকে (১৫)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
শত বছরের অপেক্ষা যেন শেষ হলো সামিরের। দীর্ঘ দিনের ভালোবাসা অবশেষে পূর্ণতা পেতে চলেছে। সামির আজ খুব খুব খুশি। ভালোবাসার মানুষ কে আজ সে নিজের করে পাবে। এর থেকে খুশি আর কিই বা হতে পারে।
,
নূরা আজ লাল টকটকে লেহেঙ্গা পড়েছে। যেটা সামিরই পছন্দ করে কিনেছে। নূরা কে আজ পার্লারের৷ মেয়ে রা সাজিয়ে দিয়ে গেছে। সামিরের আদেশ নূরা কে আজ সুন্দর করে সাজতে হবে। একদম তার মনের মতো করে। নূরা কে সাজানো হয়ে গেলে পার্লারের মেয়ে দুটো চলে যায়।
নূরা তখন রুমে একা। সবাই নিচে চলে গেছে। কারণ বর আসার খবর পেয়ে সবাই ছুটেছে। সবাই চলে গেলে নূরা বেলকনিতে চলে যায়। নূরার বেলকনি থেকে নিচে বিয়ের গেট স্পষ্ট দেখা যায়। নূরা দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো সব। আজ নূরা’র এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। যে অনুভূতির সাথে আগে পরিচিত নয় সে।
.
.
নিচে বিয়ের গেটের টাকা নিয়ে তর্কাতর্কি চলছে। মেয়ে পক্ষ ও কম নয় ছেলে পক্ষ ও কম নয়। সমান তালে দুই পক্ষ তর্কাতর্কি করেই চলেছে। সামির আজ নিশ্চুপ হয়ে সব কিছু দেখছে কিন্তু কিছু বলছে না। হঠাৎ করে সামিরের চোখ গেলো দোতলার এক পরীর দিকে। সামিরের দৃষ্টি সেখানেই থমকে গেলো। নূরা তো ওদিকেই চেয়ে ছিল সহসা সামিরের তাকানোয় ভড়কে গেলো। দু’জনের চোখাচোখি হলো। কেউ ই চোখ সরালো না। সামির মায়াভরা চোখে প্রিয় মানুষ টা কে মন ভরে দেখতে লাগলো। তখনই সায়নের চোখ গেলো সামিরের দিকে। সায়ন এতক্ষণ গেটের টাকা নিয়ে তর্কাতর্কি করছিল। সেজন্য সামিরের দিকে তার নজর পড়েনি। কিন্তু হঠাৎ করে নজর যায় সামিরের উপর। সামির জিজু কে উপরে তাকিয়ে থাকতে দেখে আপা-আপনি ভ্রু কুঁচকে এলো সায়নের। তারপর সামিরের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। তারপর দুষ্টু হেঁসে বলল,
“- জিজু, পঞ্চাশ হাজার টাকার এক টাকা কম হলেও আমরা আপনাকে ভিতরে যেতে দিবো না। গুণে গুণে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেন তারপর ভিতরে যান। এন্ড আমার বোনকে নিজের করে নেন।
সামির নূরা’র দিকে দৃষ্টি রেখেই জবাব দেয়।
“- হ্যাঁ তোমরা যা চেয়েছো তাই ই পাবে। সামিয়া ব্যাগ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা গুনে দিয়ে দে বোন।
সামিয়া অবাক হয়ে বলল,
“- কিন্তু ভাইয়া?
“- উফস বিরক্ত করিস কেন? যা বলছি তাই কর।
সামিয়া আশ্চর্য হয়ে বলে,
“- আমি তোমায় কখন বিরক্ত করলাম ভাইয়া? এতক্ষণ ধরে বকবক করে কি লাভ টা হলো। সেই তো ওদের দাবিই মেনে নিতে হলো। তার থেকে ভালো ছিল প্রথমেই মেনে নিতাম। সামিয়া ভাইয়ের উপর রাগে গজগজ করতে করতে এক বান্ডিল টাকা বের করে সায়নের হাতে দিলো। সায়ন রা সবাই তো মহাখুশি।
সায়নের পাশে স্নিগ্ধা হা করে তাকিয়ে সব দেখছিল। তাদের দাবি মেনে নেওয়ায় স্নিগ্ধা বেশ অবাক হয়েছে। অবাক হয়ে সায়ন কে গুতা দিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
“- আপনি বললেন আর স্যার আমাদের টাকা দিয়ে দিলো বিষয় টা কেমন হয়ে গেলো না। না মানে এতক্ষণ বকবক করে যেখানে কাজ হলো সেখানে এক কথাতেই পাক্কা পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে দিলো।
সায়ন মুচকি হেঁসে বলল,
“- তোমার ওই ছোট্ট মাথাতে এসব ঢুকবে না।
সায়নের কথা য় রেগে গেলো স্নিগ্ধা। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“- একদম রাগাবেন না আমায়। ভনিতা না করে বলুন তো কাহিনি কি?
সায়ন বাঁকা হেসে বলল,
“- উপরে তাকাও।
সায়নের কথা মতো স্নিগ্ধা উপরে তাকালো। নূরা কে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যা বোঝার বোঝা হয়ে গেলো তার।
,
গেইটের সব ঝামেলা শেষ করে নতুন বর কে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর খাতির যত্ন করা হলো।
,
,
,
,
অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতিক্ষণের সময় এলো। নূরা’র বিদায়। প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনে এমন একটা দিন আসে। যেটা খুব বেদনাদায়ক। বিদায়ের সময় নূরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। প্রেয়সীর চোখের পানি তে সামিরের বুক টা ফেটে যাচ্ছে। যথাসম্ভব নূরা কে সামলানোর চেষ্টা করছে। একপাশে দাঁড়িয়ে নীরবে কেঁদে চলেছে সায়ন আর নিহাল। সাবা নাবা দুবোন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। নূরা বাবা’র কাছ থেকে কাঁদতে কাঁদতে এবার দুই ভাইয়ের কাছে এলো। এতক্ষণ দুই ভাই নীরবে কাদলেও এবার আর নিজেদের কে ধরে রাখতে পারলো না। শব্দ করে কেঁদে দিলো। নূরা দু হাতে দুই ভাই কে জড়িয়ে ধরে ভাইয়া বলে কেঁদে উঠলো।
ভাইবোনের সম্পর্ক টা খুব স্পেশাল। হাজারো মারামারি ঝগড়া, রাগ করে কথা বন্ধ করে দেওয়া অথচ দিনশেষে আবার মিলে যাওয়া। একে অপরের সাথে কথা না বলে থাকতে না পারা। সবটা যেন আজ খুব মনে পড়ছে তাদের। নিহাল সবার বড়ো। অথচ সে পাগলের মতো কান্না করছে। নূরা’র বাবা নিঃশব্দে কাঁদছেন। একমাত্র মেয়ের বিদায়ে তার বুক টা ফেটে যাচ্ছে। তবুও হাসি মুখে বিদায় দিতে হচ্ছে।
সামিরের বাবা আলতাফ চৌধুরী এগিয়ে এলেন তিনজনের দিকে। তিনি নিহালের কাঁধে হাত রেখে বলেন,
“- নিহাল, সায়ন না হয় ছোটো কিন্তু তুমি তো বড়ো। তুমি এভাবে কাঁদলে নূরা মা সায়ন কিভাবে নিজেদের কে সামলাবে বলো? তুমি এখন সবার ভরসা। বড়ো ভাই হিসেবে তুমি নিজেকে সামলাও।
আলতাফ চৌধুরী র কথা শুনে নিহাল কান্না থামিয়ে দেয়। ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে। তারপর বোনের মাথায় আলতো করে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলে,
“- নূরা বোন আমার কাঁদিস না। আমরা তো তোর কাছে পিঠেই আছি সোনা। কাঁদলে কিন্তু তোর সাজ নষ্ট হয়ে যাবে।
তবুও নূরা’র কান্না থামলো না। সায়ন নিজেও কান্না থামিয়ে বেস্টফ্রেন্ডের সমান বোনকে হাঁসানোর জন্য বলল,
“- এই পেত্নী, এমন ভাবে মরা কান্না জুড়েছিস কেন? এমন ভাবে কাঁদছিস যেন বাড়িতে কেউ মরেছে ?
নূরা কান্নারত অবস্থায় রাগী গলায় বলল,
“- ভাইয়া একদম মজা করবে না তুমি।
“- আচ্ছা বাবা করলাম না কিন্তু তোর এই মরা কান্না তুই থামা বইন। তুই কি জানিস তোর এই কান্নার শব্দ শুনে আমার কান ঝা ঝা করছে। মনে হচ্ছে কানের ভিতরে বড়ো মাছি ঢুকে ভো ভো করে শব্দ করছে। উফস কি বিরক্তিকর!
সায়নের কথা শুনে নূরা’র কান্না থেমে গেছে। বেচারি নূরা কান্নার বদলি রেগে গেলো। রেগেমেগে সায়নের পিঠে কিল ঘুষি মেরে বলে,
“- জীবনে ভালো হবে না তুমি।
সায়ন পিঠ ডলতে ডলতে বলল,
“- বড়ো ভাই সবার সামনে মারছিস লজ্জা করে না তোর? আশেপাশে তাকিয়ে দ্যাখ কতশত মানুষ আর তুই আমায় মারলি?
নূরা মাথা কাত করে একবার ডানদিকে তো আরেক বার বাম দিকে তাকালো। তারপর জিভে কামড় বসিয়ে বলল,
“- সরি ভাইয়া। আসলে আমি ভুলে গেছিলাম।
নূরা’র ইনোসেন্ট ফেস দেখে সায়ন সহ বাকিরা হেসে ফেলল।। সামির তো বউয়ের বাচ্চামি দেখে রীতিমতো হা হয়ে গেলো। যা দেখে সামিয়া ভাইয়ের কাছে এসে বলল,
“- ভাইয়া মুখ টা বন্ধ করো নয়তো মাছি ঢুকে যাবে।
সামির মুখ বন্ধ করে বোনের দিকে তাকায়। সামিয়া হেঁসে বলল,
“- তোমার জীবন তেজপাতা ভাইয়া। বলে হেঁসে উঠল। সামিরও মনে মনে হেঁসে বলে, আমি জানি তো। এই মেয়ে টা আমার সাথে থাকলে আমার জীবন টা তেজপাতা হবে। তবুও আমি শুধু এই মেয়ে টাকেই চাই। দিনশেষে শুধু তার হাসিমুখ টা চাই। যেই হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবো। অনেক খুঁজে তাকে পেয়েছি। কখনো হারাতে দেবো না। খুব যত্নে সংগোপনে হৃদয় মাঝে লুকিয়ে রাখবো। ভালোবাসি বউ!
চলবে~

