গোধূলীতে তুমি প্রিয় পর্ব-২২

0
697

#গোধূলীতে_তুমি_প্রিয়
#পর্ব-২২
#লেখিকা_রুবাইতা_রিয়া

ইহানের কথা শুনে সবাই চুপ করে আছে।কারোর কাছে তার এমন কথার কোনো উত্তর নেই।তবে ইহানের কথাগুলো সবাইকে এটা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে সে মনে মনে ঠিক কতটা অনুতপ্ত।ইহান নিরবে নিজের চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে।তার যে খুব কষ্ট হচ্ছে আজকে।নিজের করা পাপের ফলই ভোগ করছে সে।ইহানকে এভাবে চোখের পানি ফেলতে দেখে ওদের দিদুন তোজি কণ্ঠে বলে উঠলো,

দিদুন—-এখন এতো ঢং করে কেঁদে কি হবে?যা করার তা তো করেই দিয়েছিস তুই।ইথান দাদুভাইকে কত কষ্ট দিয়েছিস আর নিজের বোনের জীবনটাতো নষ্ট করে দিয়েছিস একেবারে।এখন আর নাটক না করে বোনমেরু দিয়ে বোনটার জীবন বাঁচা।আর তারপর এখান থেকে দূর হয়ে যা।তোর এই মুখটা আমরা কেউ দেখতে চাচ্ছিনা আর।

দিদুনের কথাগুলো ইহানের কাছে কাটার মতন বিধলো।অবশ্য দিদুনের বলা কথাগুলো তো তেতো হলেও সত্য ছিলো।ছলছল চোখে তাকালো ইহান দিদুনের দিকে যা দেখে ওর দিদুন মুখ ফিরিয়ে নিলো।ঠিক তখনই লাবিবা সবাইকে অবাক করে দিয়ে বেড থেকে উঠে ওর দিদুনের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে দাতে দাত চেপে কিছুটা জোরে বলে উঠলো,,

লাবিবা—-তোমার উপর আমার প্রচুর ঘৃণা লাগছে দিদুন।তোমার কি একটুও লজ্জাবোধ নেই?তুমি ইহান ভাইয়াকে এসব বলছো কিন্তু তুমি নিজেও কি মায়ের সাথে ঠিক কাজ করেছো?অন্যের ভুল ধরার আগে নিজের দোষগুলো দেখো।আম্মুর বাচ্চা হচ্ছিলো না দেখে তুমি ওনার সাথে এতো বাজে ব্যাবহার করলে।কিন্তু সেদিন যখন তোমার নিজের মেয়ের বাচ্চা হয়নি দেখে ফুপির শাশুড়ী তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো তখন কেনো ফুপির শাশুড়িকে দোষারোপ করেছিলে?নিজের মেয়ের বেলায় সব ঠিক আর পরের মেয়ের বেলায় এমন নিষ্ঠুরতা।যে যা করে সে তা ফেরত পায় জানো তো দিদুন।এইজন্য তুমি মাকে বাচ্চা দেরিতে হওয়া নিয়ে কথা শুনিয়েছো যার জন্য আল্লাহ তোমার নিজের মেয়ের থেকে মা হওয়ার ক্ষমতাটায় কেরে নিয়েছে।

লাবিবার কথা শুনে সবাই জানো স্তব্দ হয়ো গেছে কারন লাবিবা কখনো ওর দিদুনের সাথে এমন উচু গলায় কথা বলেনি।বিশেষ করে লাবিনার শেশের বলা কথাগুলো শুনে সবাই জানো চমকে উঠলো।নিজের মেয়েকে নিয়ে এমন কথা শুনে লাবিবার দিদুনের রাগে শরীর জ্বলে উঠলো।ওনি রাগী স্বরে বলে উঠলো,,

দিদুন—-চুপ কর লাবিবা।ও তোর ফুপি হয়।এইসব বলে তুই কিন্তু ওকে ছোট করছিস।

লাবিবা—-আমি কাউকে ছোট করছি না দিদুন।আমি শুধু তোমাকে সত্যিটা বলছি।আজ ফুপি তোমার মেয়ে বলে তাকে কিছু বললে তোমার গায়ে লাগছে। আর আমার মা তোমার নিজের মেয়ে না বলে তার সাথে তুমি প্রতিনিয়ত মানসির অত্যাচার করে গেলে?তুমি বয়সে বড় বলে তোমাকে সবাই সম্মান করতো আর তুমি তার এই মর্যাদা রাখলে?আসলে তোমাদের মতন মহিলারা শুধু নিজেরটাই বুঝে।আর তুমি কিনা আসছো ইহান ভাইয়াকে দোষী বলতে।নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছো কখনো?

লাবিবার কথা শুনে ওর দিূুন চুপ হয়ে গেলো।তার কাছে লাবিবার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই যে।আর থাকবেই বা কি করে কারন লাবিবার বলা প্রতিটা কথা তো সত্যি।সে তো আসলেই অন্যায় করেছে।

লাবিবাকে এভাবে দিদুনের সাথে কথা বলতে দেখে ইহান উঠে ওর কাছে গিয়ে মাথা নিচু করে কাপাকাপা গলায় বলে উঠলো,,

ইহান—লাবিবা আমি মানছি দিদুন ভুল করেছে কিন্তু ওনার বলা কথাগুলোও তো ঠিক।তুই সবটা জানিস না তাই এমন বলছিস।সবটা জানার পর তুই ও আমাকে দিদুনের মতন ঘৃণা করবি।আমার মুখটাও আর দেখতে চাইবি না তুই।

ইহানের কথা শুনে লাবিবা একটুও অবাক হলো না।ওর দিকে শান্ত ভাবে তাকিয়ে ছলছল চোখে বলে উঠলো,,

লাবিবা—-আমি সবটা জানি ভাইয়া।তুমি আমাকে দিনের পর দিন ক্যান্সারের ব্লাড দিয়েছো যাতে আমি মরে যাই আর ইথান আমার শূণ্যতায় কষ্ট পায় তাইনা?আমি জানি এটা।

লাবিবার কথা শুনে ইহান অবাক হয়ে বলে উঠলো,,

ইহান—-তুই কি করে জানলি?

লাবিবা মনে মনে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে উঠলো,,

লাবিবা—-তুমি যখন বিয়ের স্টেজে সবটা বলেছিলে তখন আমি অজ্ঞান ছিলাম না ভাইয়া।তখন শুধুমাত্র আমার চোখদুটোই বন্ধ ছিলো।আসলে রক্ত পরার জন্য আমার অতিরিক্ত খারাপ লাগছিলো এইজন্য হাজার চেষ্টা করেও চোখ মেলতে পারিনি কিন্তু কান দিয়ে সবটা শুনতে পেরেছি।

লাবিবার কথা শুনে ইহানের মনের মধ্যে খচ করে উঠলো।সে কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলো,,

ইহান—-আমাকে ক্ষমা করে দে বোন।আমি অনেক বড় অন্যায় করে ফেলছি।লোভ আর হিংসায় পাগল হয়ে গেছিলাম আমি যার জন্য এমন জঘন্য কাজ করতে দুবারও ভাবিনি আমি।দেখ এখম তার শাস্তি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি আমি।আমি যে ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছি বোন।এখন তুই আমাকে দূরে ঠেলে দিস না বোন তাহলে আমি মরেই যাবো।

ইহান ভেবেছিলো বাকি সবার মতন লাবিবাও ওকে ঘৃণা করবে আর মুখ দেখতে চাইবে না কিন্তু লাবিবা সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইহানকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেদে উঠলো।লাবিবার এমন কাজে সবাই জানো অবাকের শেষ পর্যায়ে চলে গেলো।লাবিবার এমন কাজে সবাই পাথর হয়ে দাডিয়ে রইলো ঠিক তখনই লাবিবা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,,

লাবিবা—-আমি জানি ভাইয়া যে তুমি খুব বড় অন্যায় করেছো।কিন্তু আমি বাকিদের মতন নই যে নিজের দোষ না দেখে অন্যের অন্যায়টা বড় চোখে দেখে তাকে কষ্ট দিয়ে যাবো।আমি জানি ভাইয়া তুমি তোমার কাজের জন্য অনুতপ্ত নাহলে কখনো ফারিহার কথায় আমাকে বোনমেরু দিতে রাজি হতে না।এখন নাহয় জানতে পারলে আমি তোমার নিজের বোন কিন্তু তখন তো না জেনেই আমাকে বাঁচাতে এসেছিলে।তাই তোমার উপর আমি একটুও রেগে নেই।এতোদিন পর ভাইকে পেয়ে কি বোন নিজের রাগ ধরে রাখতে পারে??

লাবিবার এমন কথা শুনে ইহান জানো নিজের জান ফিরে পেলো।অন্তত তার বোনটাতো তাকে ক্ষমা করেছে।এবার সে মরলেও শান্তিতে মরতে পারবে।ইহানের চিন্তার মাঝেই লাবিবা ওকে ছেড়ে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে চেচিয়ে বলে উঠলো,,

লাবিবা—-তোমরা সবাই তো ইহান ভাইয়াকে কত দোষারোপ দিচ্ছো কিন্তু তার এমন কাজের জন্য তোমরা প্রত্যেকে যে কোথাও না কোথাও দায়ী তা কি একবারো ভেবে দেখেছো?মানছি ইহান ভাইয়া আমাকে আর ইথানকে কষ্ট দিতে চেয়েছিলো।ওনি ইথানকে হিংসা করতো কিন্তু তার মনে এই হিংসার বিচটাতো তোমরায় পুতে দিয়েছো।ছোটবেলা থেকে দুজনকে সমান আদর না দিয়ে একজন বেশি ভালোবেসেছো।একজনকে টাকায় ভরিয়ে দিয়েছো আরেকজনকে কিছুই দেওনি।তোমাদের এমন ব্যাবহারের জন্যই তো আজকে ইহান ভাইয়া এতো জঘন্য একটা কাজ করেছে।ছোট থেকে যখন দেখে এসেছে যে তার থেকে তোমরা ইথান ভাইয়াকে বেশি ভালোবেসেছো তখন থেকেই তো হিংসা জন্ম নিয়েছে তার মনে।ছোট বাচ্চার মনে তোমরা হিংসা ভরিয়ে দিয়েছো আর যার জন্য আজকে ইহান ভাইয়া এতো জঘন্য একটা কাজ করেছে।আসলে এর মূলে কিন্তু তোমরা প্রত্যেকে দায়ী তাই শাস্তি তো তোমাদেরও পাওয়া উচিত তাই না?ইহান ভাইয়া একা কেনো কষ্ট ভোগ করবে যখন দোষ তোমরাও করেছো?

লাবিবার কথা শুনে উপস্থিত সবাই মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো।তাদের সবার মনে আজকে নিজেকে অপরাধী লাগছে।তাদের এমন কাজের জন্যই হয়তো আজকে এই অবস্হা সবার।আসলে কখনো একু বয়সী বাচ্চাদের দুইভাবে দেখাশোনা করা ঠিক না।তাহলে ফলরূপ এমন ঘটনা ঘটা অবাকের কিছু না।ইথানের দিদুনের কেনো জানি নিজেকে আজকে সবথেকে বঢ অপরাধী মনে হচ্ছে।সেই তো ইথানকে বেশি আদর করতো ছোট থেকে আর ইহানকে সেভাবে চোখে দেখতো না কেনো জানি।তাছাড়া সে লিয়া রহমানের সাথে যেমন ব্যাবহার করেছে সেটাও তো অত্যন্ত জঘন্য অন্যায় ছিলো যার জন্য আজকে লিয়া ইপ্শিতার থেকে ওর মেয়েকে কেরে নিলো।সবথেকে বড় কষ্টে তো ইহানের মা আছে কারন তার নিজের সন্তার তার আরেক সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।তার মাথায় কিছুই আসছে না এখন।সবাই নিরবে চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে।

রুমে নিরবতা কাটলো লাবিবার কাশির শব্দে।হুট করেই লাবিবা কাশতে শুরু করলো সবার মাঝে।ইথান দৌড়ে এসে লাবিবাকে বিছানায় বসিয়ে দিলো।আর ইহান লাবিবার দিকে পানি এগিয়ে দিলো।ইথান লাবিবার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে কেনো জানি তার খুব ভয় হচ্ছে।কাশতে কাশতে আগের মতোন লাবিবার নাক দিয়ে রক্ত উঠতে শুরু করলো যা দেখে ভয়ে সবার কলিজার পানি শুকিয়ে গেলো।ইথানের বাবা লাবিবার ব্লাড পরিষ্কার করে তাতারি ওর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দিলো।ফারিহা দৌড়ে গিয়ে ডাক্তার কে ডেকে আনলো।ডাক্তার আসতেই ইথানের বাবা তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,,

ইথানের বাবা—-আপনি এখনই ওটির ব্যাবস্হা করুন।লাবিবা মায়ের অবস্হা খুব খারাপ।এমন অবস্হা আমাদের আর কোনো উপায় নেই অপারেশন ছাড়া।গো ফাস্ট!

ইথানের বাবার কথা শুনে ডাক্তার তাতারি চলে গেলেন অপারেশন থিয়েটার রেডি করার জন্য।ইথান লাবিবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।স্পেশাল রুম হওয়ায় এসি থাকা সত্তেও প্রচুর ঘামছে সে।ইহানের চোখে পানি চিকচিক করছে।নিজের বোনকো এতো বছর পর পেয়েও কি হারিয়ে ফেলার ভয়।

ইথান লাবিবার দিকে ছলছল ভাবে তাকিয়ে বলে উঠলো,,

ইথান—-কিছু হবে না তোমার লাবুপাখি।তুমি ঠিক ফিরে আসবে আমার কাছে আমি জানি।কথাটা বলেই লাবিবার কপালে একটা ভালোবাসার পরশ একে দিলো।লাবিবা ইথানের হাতটা আকড়ে ধড়লো।

প্রায় আধ ঘণ্টা পর লাবিবাকে ওটিতে নেয়া হলো।ইথান বাহিরে দারিয়ে কাটা মুরগির মতন ছটফট করতে লাগলো যা দেখো ইহানের মনটা বিষন্নতায় ভরে গেলো।ইথানের এমন কষ্ট দেখার জন্যই তো সে এতোকিছু করেছিলো তাহলে আজকে কেনো তার এতো কষ্ট হচ্ছে।ইহান কিছুক্ষণ ইথানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ফারিহার কাছে এসে মায়াভরা কন্ঠে বলে উঠলো,,

ইহান—-আমি জানি ফারিহা তুমি আমাকে খুব ঘৃণা করছো এখন।তোমার প্রাণপ্রিয় বেস্টুর আজ এই দশা শুধু আমার জন্য।

ইথানের কথা শুনে ফারিহা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঘৃণার কণ্ঠে বলে উঠলো,,

ফারিহা—-আপনি যা করেছেন তার ক্ষমা হয় না।একজন মানুষের থেকে তার ভালোবাসার মানুষটাকে আলাদা করে তাকে কষ্ট দিতে চেয়েছিলেন।আমার তো ইচ্ছা করছে আপনাকে ফেলে রেখে অন্যকাউকে বিয়ে করে দেখিয়ে দিতে যে প্রিয় মানুষটাকে অন্য কারোর সাথে দেখার কষ্ট ঠিক কতটা।

ফারিহার কথা শুনে ইহান নিজের মনে মনে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে উঠলো,,

ইহান—-তা কোনো প্রোয়জন নেই প্রিয়।কারন আমি কখনো তোমাকে অন্যকারোর সাথে সয্য করতে পারবো না।আমি জানি আমি ঠিক কতটা অন্যায় করেছি।তবে হতেও তো পারে তোমার এই ঘৃণার মানুষটাই তোমাকে মুক্ত করে দিবে তার এই ভালোবাসার খাঁচা থেকে।হতেও তো পারে এটাই আমাদের শেষ দেখা।তাই পারলে ক্ষমা করো প্রিয়তমা।

কথাগুলো বলেই সেখানে আর একমুহূর্ত না দাড়িয়ে চোখ ভর্তি পানি আর বুক ভর্তি অভিমান নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো ইহান।

অন্যদিকে ইহানের বলা শেষের লাইন দুটো শুনে ফারিহার হৃদপিণ্ডটা ধক করে উঠলো,,,,

#চলবে??