#গোধূলীতে_তুমি_প্রিয়
#পর্ব_২৭
#লেখিকা_রুবাইতা_রিয়া
বর্তমানে লাবিবার হাত ধরে বসে আছে ইথান।একটু আগেই সে ডক্টরের কেবিন থেকে লাবিবার কেবিনে এসেছে।তার মাথায় চলছে হাজারো চিন্তা।ডক্টরকসহ সেই নার্সদেরকেও পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছে সে।কিন্তু এই বিষয়ে দাদি বা পরিবারের কাউকেই কিছু জানতে দেয়নি ইথান।এমনকি ইহান যে বেঁচে আছে সেটাও কাউকে বলেনি সে।এখন এইসব নিয়ে কথা বলে এতোরাতে সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছে না সে।তাছাড়া আজকে সবার উপর এতো ধকল গিয়েছে যে এখন আর নতুন করে কোনো কথা বলতে চাচ্ছে না ইথান।কালকে বাড়ি গিয়ে সে তার দিদুনের সাথে বোঝাপড়া করবে এই নিয়ে।তার মাথায় এটাই আসছে না যে তার দিদুন কেনো ইহানকে মারতে চাইছে।কেনো জানি দিদুনের উপর প্রচুর ঘৃণা লাগছে ইথানের।
লাবিবার জ্ঞান ফেরেনি এখনো।আসলে এতো বড় অপারেশন হয়েছে তাই জ্ঞান ফিরতে একটু সময় লাগছে।ইথান এক দৃষ্টিতে লাবিবার মুখের দিকে চেয়ে আছে।ঘুমালে কত্ত নিষ্পাপ লাগে লাবিবাকে।ইথান আনমনেই বলে উঠলো,
—-শরীরে হাজারো দূর্বলতা,মুখে শত ক্লান্তির ছাপ থাকা সত্তেও আমার এই ঘুমপরীর নিশ্পাপ মুখটা দেখলে যে সব দূর হয়ে যায় প্রিয়তমা।সত্যি ভালোবাসাগুলো হয়তো এমনই হয়!
কথাটা বলেই আনমনে হেঁসে দিলো ইথান।হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজে নিজের ধ্যান থেকে ফিরলো সে।সেদিকে চেয়ে দেখলো ওর দিদুন এবং লিয়া রহমান ওদের দিকে এগিয়ে আসছে।ইথানের ওর দিদুনের মুখটা দেখা মাত্রই গা গুলিয়ে উঠলো ঘৃণায়।শুনেছি মানুষের বয়স হলে তাদের মন নরম হয়ে যায়।মরার ভয়ে তারা ভালো হয়ে যায়।কিন্তু এই মহিলা তো একদমই তার উল্টো।ইথানের চিন্তার মাঝেই ওর দিদুন এসে আলগা আদর দেখিয়ে নরম কণ্ঠে বলে উঠলো,,
—-ইথান দাদুভাই যা হওয়ার তাতো হয়েই গিয়েছে।এখন এসব নিয়ে মন খারাপ না করে থেকে লাবিবার খেয়াল রাখ একটু।ওর কিছু হয়ে গেলে তুই তোরই তো কষ্ট হবে শেষে।ভালো হয়েছে ইহান মরে গিছে।নিজের কর্মের শাস্তি পেয়েছে।অন্যকে কষ্ট দিতে গেলে এমনই হয়।
দিদুনের এমন কথা শুনে ইথানের রাগে কপালের রগ ফুলে উঠেছে তবুও মুখে কিছু বলছে না।এই হস্পিটালেের মাঝে এখন নতুন করে সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছে না সে এতো রাতে।দাঁতে দাত চেপে সব সয্য করছে সে।দিদুনের এমন কথা শুনে লিয়া রহমান বলে উঠলো,
—-মা আপনি এইসব কি বলছেন?ইহানের এখনো দাফন পর্যন্ত হয়নি আর আপনি বলতেছেন ও মরে গিয়ে ভালো হয়েছে।মানছি ও অন্যায় করেছে কিন্তু আপনিও তো কম অন্যায় করেননি ওর সাথে।ছোট থেকে দুইটা বাচ্চাকে দুইভাবে ট্রিট করলে এমন হওয়া অসাভাবিক কিছু না।একবার ফারিহার কথা ভেবে দেখুন।ও ব্যাচারী কি দোষ করেছে যে এতো শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে?আর ইপ্শিতার কথা ভেবে দেখুন একবার।ছেলে হারিয়ে কাটা মুরগীর মতন ছটফট করছে।
লিয়ার কথা দিদুনের একূম পছন্দ হলো না তাই সে খোঁচা মেরে বলে উঠলো,
—-ইপ্শিতার কথা ভাবতে বলছো আমায় তুমি।মনে আছে যখন তুমি ওর মেয়েকে মৃত বলে নিজের কাছে ছিনিয়ে নিয়েছিলে তখনও এমনভাবে কাটা মুরগীর মতনই ছটফট করেছিলো সে।
শাশুড়ীর এমন কথায় চুপ হয়ে গেলো লিয়া।আসলেই তো সে এটা করেছিলো তখন।নিজের সুখের জন্য অন্যের সন্তানকে কেড়ে নিয়েছিলো।ইথান এবার আর চুপ থাকতে পারলোনা তাই দিদুনের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপেই বলে উঠলো,
—-তার জন্যও তো তুমিই দায়ী দিদুন।তুমি যদি মেজো কাকিয়া কে ওমন ভাবে নিজের ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা না বলতে তাহলে কাকিয়া এমন কাজ কখনোই করতো না।তোমাদের মতন কিছু শাশুড়ীরা আছে যারা বিয়ের পর বাচ্চা না হলেই এমন অশান্তি শুরু করে সংসারে।কটু কথা বলে।একবারো বুঝে না যে সেই মেয়েটা কতটা কষ্ট ভোগ করছে।কেউই নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্যকারোর সাথে সইতে পারে না বুঝলে।সেখানে তুমি কাকাইয়ের দ্বিতীয় বিয়ের কথা বললে কাকিয়া সংসার বাচানোর জন্য এমন একটা কাজ করেছে।এই দোষটা আমি কাকিয়াকে নয় বরং তোমাকেই দিবো।
ইথানের এমন কথা শুনে বেশ বিরক্ত হলোনতার দিদুন।সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই কেবিনে ইথানের আব্বু প্রবেশ করে বলে ছলছল চোখে বলে উঠলো,
—-সব ফর্মালিটি শেষ।এখন ইহানের ডেডবডিটা বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে।কিন্তু আমি ইহানের বাবাকে এই কথা কোন মুখ নিয়ে বলবো যে ইহান আর নেই।বিদেশ যাওয়ার আগে আমাকে বলে গিয়েছিলো আমি জানো ওর ছেলেটাকে দেখে রাখি।তোদের বিয়ের সময়ও আসতে পারেনি আমাদের বিদেশের কোম্পানিটাই অনেক কাজ পরে যাই হুট করে।এইকয়দিনে যে এতো ঘটনা ঘটে গেছে তাও বলিনি আমি ওকে যাতে ও বেশি চিন্তা না করে।কিন্তু এখন আমি ওকে ফোন করে কোন মুখ নিয়ে বলবো ওর ছেলেটা আর নেই।
—-বাবা ছোট কাকাইকে কিছু বলার দরকার নেই।শুধু এইটুকু বলো যাতে তিনদিনের মাঝে টিকিট কেটে বাড়ি ফিরে আসে।আর এই তিনদিন ইহানের ডেডবডিটা মর্গেই রাখা হক।বরফের মাঝে থাকলে বডি পচবেনা।বাড়ি নেয়ার প্রয়োজন নেই।কাকাই আসলে বাড়িতে নিবো আর তকন সবটা নাহয় বলবো।
ইথানের এমন কথা শুনে বেশ অবাক হলো ওর বাবা।তবুও মুখে কিছু বললো না তার কাছে ইথানের কতা শোনাটাই এই মুহূর্তে শ্রেয় মনে হলো।তার শক্তি নেই একজন বাবাকে ফোন করে বলার যে তার ছেলে মারা গিছে।
এতে অবশ্য ইথানের দিদুন বেশ বিরক্ত হলেন।তার মতে আপদ যত তাতারি বিদায় হয় ততই ভালো।
ইথান একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।এই কয়েকদিন এট লিস্ট সে ইহানকে সেভ করে রাখতে পারবে ওর দিদুনের থেকে যতদিন না ও সম্পূর্ণ ভাবে সুস্হ হয়।ইথান জানে ওর দিদুন খুব জেদি তাই যদি সে একবার জানতে পারে ইহান বেঁচে আছে তাহলে আবারো নিশ্চয় ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।ইথান ওর বাবার উদ্দেশ্যে আবারো বলে উঠলো,,
—-বাবা দিদুনসহ সবাইকে নিয়ে বাসায় চলে যাও।দিদুনের বয়স হয়েছে এতো রাত জাগা ঠিক হবে না শরীরের জন্য।আর এতো ধকল গিয়েছে তাই সবাইকে বাসায় গিয়ে রেস্ট নিতে বলো।ইপ্শিতা কাকিয়ার একটু খেয়াল রেখো।অনেক ভেঙে পরেছে কাকি।আর আম্মু আর মেজো কাকিয়াকে রেখে যাও ফারিহার কাছে থাকার জন্য।ফারিহার আজকে রাতটা এখানে থাকতে হবে কারন ওকে স্লাইন দেয়া হয়েছে শরীর দূর্বল তাই।আর লাবিবার কাছে আমি আছি।
ইথানের কথা শুনে বাবা রাজি হয়ে গেলেন।যদিও দিদুনের যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো না।তার একবার নিজের চোখে ইহানের লাশটা দেখার ইচ্ছা ছিলো।
সবাই গাড়িতে উঠলেও ইপ্শিতা উঠছেনা।সে তার মৃত ছেলেকে এখানে কিছুতেই রাখবে না।কান্না করতে করতে চোখ ফুলে গিয়েছে তার।সে ইথানের কাছে এসে হাত আকড়ে ধরে বলে উঠলো,,
—-ইথান তুই তো সব বুঝিস।তুই বল আমি কি করে আমার ছেলেকে এই মর্গে ঠান্ডার মধ্যে রেখে বাড়িতে গিয়ে নরম বিছানায় আরাম করে ঘুমাবো?আমার যে ওই নরম বিছানাটাও কাটার মতন লাগবে।আমি আমার ছেলেটাকে একবারও দেখিনি ওটিতে যাওয়ার পর থেকে।একটাবার ওর লাশটা একটু দেখা।আমার উপর এইটুকু দয়া কর।
ইপ্শিতার এমন কান্নামিশ্রিত মায়াভরা কণ্ঠে নিজের ছেলের আর্তনাদ শুনে সবার চোখে জল চলে এলো।ইথানেরও কষ্ট হচ্ছে খুব।মন চাচ্ছে ইপ্শিতাকে সব বলে দিতে কিন্তু এখানে এসব বলা যাবে না।ইথান ওর বাবাকে বলে উঠলো,,
—-বাবা এই অবস্হায় কাকিয়াকে বাড়িতে নিলে আরো ভেঙে পরবে।তার থেকে তোমরা চলে যাও আমি কাকিয়াকে ইহানের লাশের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসি একবার।
ইথানের কথা শুনে কেউ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওর দিদুন বলে উঠলো,
—-আমিও আমার নাতির লাশ দেখবো।ওকে যে বড্ড দেখতে ইচ্ছা করছে।ইথান আমাকেও ইপ্শিতার সাথে নিয়ে চলনা একটু।
দিদুনের এমন কথা শুনে লিয়া বেশ অবাক হলো।একটু আগেও তো ইহান মরে গেছে ভালো হয়েছে বললো।আবার এখন তাকেই দেখতে চাচ্ছে।কি সাংঘাতিক মহিলা।লিয়ার চিন্তার মাঝেই ইথান ওর দিদুনের চিন্তায় এক বাটি পানি ঢেলে দিয়ে বলে উঠলো,,
—-তোমার বয়স হয়েছে দিদুন।এতো রাত জেগে হস্পিটালে থাকা ঠিক হবে না।তাছাড়া এখন এতো রাতে লাশ দেখলে তোমার ভয় লাগবে।কেউ না জানুক তুমি তো জানো ওর মৃত্যুটা সাভাবিক ছিলো না।যদি ও ভুত হয়ে এসে পরে আবার তোমার ঘাড় মটকে দেয়।
শেষের লাইন দুটো দিদুনের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে গিয়ে বলে উঠলো ইথান।ইথানের এমন কথা শুনে বেশ ঘাবড়ে যায় দিদুন।সে ভয়ে ভয়ে বলে উঠে,,
—-না মানে অপারেশন থিয়েটারেই মৃত্যু।কাটাকাটি করেছে অনেক ডক্টর।তাই লাশটা দেখতে ভয়ংকর হয়ে গিয়েছে।তুমি দেখলে ভয় পাবে অনেক।তাছাড়া তুমি তো ভুতের ভয়ও পাও খুব।তাই বললাম।
ইথানের কথা শুনে ওর দিদুন একটা ঢোক গিললো।আসলেই সে ভুতের ভয় পায় তাই তাতারি কটে গাড়িতে উঠে গেলো।সবাই চলে যেতেই একজন ওয়ার্ড বয় দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলো,,
#চলবে?