#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_২১
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
রাত্রি ক্রমশ গভীরতার অতলে ডুবতে শুরু করেছে। ব্যস্ত নগরীর চিরচেনা কোলাহল বহু আগেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। চারিদিক কেমন নিস্তব্ধ, নিস্পন্দ। কক্ষের অভ্যন্তরে কেবলমাত্র ঘুরতে থাকা ফ্যানের একঘেয়ে শব্দে মুখরিত পরিবেশ। বিছানার একপাশ জুড়ে ঘুমন্ত ইয়াশের ক্ষুদ্র বুকটা নিয়ম মেনে ওঠানামা করছে। মাঝেমধ্যেই ছোট্ট নরম হাত দু’টো মুঠোবন্দি হয়ে আসছে, পরক্ষণেই আবার আলগা হয়ে যাচ্ছে। নিষ্পাপ শিশুটির নির্বিঘ্ন নিদ্রার মাঝেও যেনো পৃথিবীর সমস্ত শান্তি আশ্রয় নিয়েছে। অপরদিকে ফ্লোরের পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে জায়নামাজ বিছিয়ে সেখানে স্রষ্টার দরবারে মগ্ন ইনায়া। দীর্ঘ সময় ধরে নতজানু হয়ে আছে সে। যখনই অন্তঃস্থল জুড়ে অশান্তির দহন তীব্র হয়ে ওঠে, যখন বুকের মধ্যে জমে থাকা ক্লান্তি আর বহন করা সম্ভব হয় না, তখনই আল্লাহর দরবারে এসে নিজেকে সমর্পণ করে সে।
এই স্থানটায় মাথা রাখার পর যে প্রশান্তির সন্ধান পাওয়া যায়, সেই প্রশান্তি হয়তো পৃথিবীর আর কোনো প্রান্তে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। স্রষ্টার দরবারে আসা মানেই যেনো ক্ষণিকের জন্য সমস্ত ক্লান্তি, গ্লানি আর দুঃখের ভার নামিয়ে রাখা। নিজেকে যতটা দৃঢ় দেখানোর চেষ্টা করে ইনায়া, প্রকৃতপক্ষে ততটা শক্ত সে নয়। কখনোই ছিলো না। বারবার আয়াশের সম্মুখীন হলে বুকের অন্তরালে চাপা পড়ে থাকা ক্ষতগুলো কেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে। মানুষটার মুখের দিকে তাকালেই মনে হয়, সমস্ত দুঃখ বুঝি একযোগে বুকের মধ্যে উবড়ে পড়ছে। আয়াশের সঙ্গে থাকলে হয়তো স্ত্রী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করতো ইনায়া। সংসারের নিয়ম মেনে চলতো। শরীর হয়তো একটা সংসারে আবদ্ধ থেকে নিজের অস্তিত্বকে মানিয়ে নিতো। কিন্তু মন? মনটা কি কোনোদিন সুখী হতে পারতো? রাতের পর রাত ঘুমহীন কেটে যায় তার। অন্ধকার ঘরের নীরবতা ভেদ করে দীর্ঘশ্বাসের পর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, অথচ সেই দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী হওয়ার মতো কেউ থাকে না।
তার মতো হাজারো মেয়ের জীবনও হয়তো এমন করেই বহমান। সবাই হয়তো আয়াশের মতো নয়, যে ভালো না বাসলেও অন্তত যত্ন নিতে জানে। প্রতিদিন কত নারী স্বামীর অবহেলা, নির্যাতন কিংবা বিশ্বাসভঙ্গের ভার বুকে নিয়ে একই ছাদের নিচে দিন পার করে। কারো স্বামী অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে, কারো সংসার জুড়ে থাকে অশ্রদ্ধা, কারো জীবনে ভালোবাসা নামক অনুভূতিটাই কখনো আশ্রয় পায় না। সবাই তো পারে না সেই মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে। কারো কারো কাছে স্বামীর দায়িত্ব পালন করাটাই ভালোবাসার সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। ভরণপোষণের দায়িত্ব নিচ্ছে, সংসারে প্রয়োজন মেটাচ্ছে, এইটুকুকেই হয়তো বিয়ের পূর্ণতা বলে মেনে নেয় অনেকে। অথচ বিয়ে কেবল দায়িত্বের হিসাব নয়। ইসলামের দৃষ্টিতেও বিবাহের মাঝে রয়েছে সম্মান, মমতা, সহমর্মিতা আর পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধ। একজন মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট বলে অনুভব করার নামও তো সম্পর্ক।
আয়াশ তার দায়িত্বগুলো কখনো অবহেলা করেনি। অথচ স্ত্রী হিসেবে ইনায়ার যে অনুভূতি, যে প্রাপ্তি, যে ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার ছিলো, সেই জায়গাটাই কেমন শূন্য থেকে গেছে।
বিয়ে কেবল সামাজিক কোনো বন্ধন নয়।বিয়ে দু’টো মনের আশ্রয়। যেখানে ভালোবাসা থাকবে। থাকবে একে অপরের প্রতি সম্মান। থাকবে এমন একজন মানুষ, যার কাছে নিজের সমস্ত দুর্বলতা নির্দ্বিধায় মেলে ধরা যায়। অথচ ইনায়ার জীবনে সম্মানের অভাব না থাকলেও ভালোবাসার সেই পূর্ণতাটা কোনোদিন এসে দাঁড়ায়নি। জন্ম থেকে জীবনের চব্বিশটা বছর ভালোবাসাবিহীন কেটে গেছে তার।
বড় কোনো স্বপ্ন কখনো দেখেনি ইনায়া। কখনো বিত্ত, বৈভব কিংবা অসাধারণ কোনো জীবনের আকাঙ্ক্ষাও ছিলো না। তার চাওয়া ছিলো নিতান্তই ক্ষুদ্র। জীবনে যে মানুষটা তার সঙ্গী হয়ে আসবে, সে যেনো তাকে ভালোবাসে। শুধু এইটুকুই। কারণ ইনায়া ভালোবাসার অভাগী। জীবনের এতগুলো বছরেও কারো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তার ভাগ্যে জোটেনি। তাই নিজের স্বামীর ভালোবাসার প্রতি তার লোভটা ছিলো সীমাহীন। হয়তো সেই লোভটাই এতটা বেশি ছিলো যে, ভালোবাসার সেই কাঙ্ক্ষিত অংশটুকুও তার নসিবে জোটেনি।
ইনায়া আবারও ফুঁপিয়ে উঠলো। নিজের মধ্যে প্রতিনিয়ত বয়ে চলা এই দহন এখন তার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। নিজেকে যতবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, ততবারই যেনো নতুন করে ভেঙে পড়ে। পৃথিবীর কাছে কতটা দেখিয়েছে, তার কিছু যায় আসে না! অথচ সত্যিটা ভিন্ন। তার যায় আসে। ভীষণ যায় আসে। তার কষ্ট হয়।
“ আমায় আর একটু দহন সহ্য করার ক্ষমতা দাও আল্লাহ! আমি আর পারছি না! আমার বেলায় কেনো ভালোবাসার ঘরটা খালি রাখলে? একটু কি দেওয়া যেতো না আমায়?”
ফুঁপিয়ে ওঠে ইনায়া। দিন শেষে সে তো কেবল দীর্ঘশ্বাসই ফেলে। এই দীর্ঘশ্বাসেরও যেনো কোনো শেষ নেই।
“ কেনো পাঠালে আমায় তার জীবনে? আর কেনোই বা তার জীবন থেকে তার ভালোবাসার মানুষকে কেড়ে নিলে? তুমি তাকে তোমার কাছে না নিলে, আজ হয়তো সে সুখী থাকতো। আমায় আর না পাওয়ার দহন সহ্য করতে হতো না এখনো সহ্য করছি, কত পরীক্ষা নিবে তুমি?”
ইনায়া জানে না, তার পেছনে কখন এসে দাঁড়িয়েছে আয়াশ।
মানুষটা দীর্ঘ সময় ধরে একটাও শব্দ না করে শুনেছে তার বলা প্রতিটি বাক্য। প্রতিটি অভিযোগ। প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস। প্রতিটি না পাওয়ার আর্তনাদ। কতটা দহন জমে থাকলে একজন মানুষ স্রষ্টার কাছে এমন প্রশ্ন করে? আয়াশের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। হঠাৎ করেই নিজের সমস্ত সংযম, সমস্ত দূরত্বের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পেছন থেকে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে সে। প্রশস্ত বক্ষমাঝে এসে পড়ে মেয়েটার ক্ষুদ্র অবয়ব। আয়াশের হৃদস্পন্দন দ্রুতগতিতে ছুটছে। বড্ড অপরাধ করে ফেলেছে সে। অথচ এই সম্পর্কে ইনায়ার কোনো অপরাধ ছিলো না। কোনো ভুল ছিলো না। তবুও মানুষটার অতীতের বোঝা বহন করতে হয়েছে তাকেই। অন্য কারো স্মৃতির শাস্তি পেতে হয়েছে এমন একজনকে, যার একমাত্র অপরাধ ছিলো ভালোবাসা চাওয়া।
“ আ’ম সরি! আ’ম রিয়ালি, রিয়ালি সরি! আমার অতীতের কারণে আপনাকে বঞ্চিত হতে হয়েছে আপনার হক থেকে। আমি কখনো চাইনি আপনি কষ্ট পান! তবুও পেয়েছেন, বিশ্বাস করুন আমি আর অতীতে নেই। আমি আপনাকে নিয়ে বাঁচতে চাই ইনায়া! আমি অতীতের দরজা বন্ধ করে দিয়েছি, যেটা হয়তো আরও আগেই করা উচিৎ ছিলো। বোকা ছিলাম। মাফ করুন! আমায় সুযোগ দিন আপনার কষ্টটাকে লাঘব করার।”
ইনায়া কোনো উত্তর দিলো না। শুধু নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে চললো। ক্ষণে ক্ষণে তার ক্ষীণ দেহাবয়ব কেঁপে উঠছে। সেই কম্পন আয়াশ খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছে নিজের বক্ষমাঝে। তবুও ইনায়ার মুখে কোনো কথা নেই। হয়তো এতদিনের না বলা কথাগুলো শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসার পথ হারিয়ে ফেলেছে।
“ আ’ম সরি! প্লিজ এইবারের মতো আমায় সুযোগ দিন। ভালোবাসি আপনায়, আরও ভালোবাসার সুযোগ দিন। প্রতিদিন ভালোবাসি! প্রতি মিনিট ভালোবাসি!”
ইনায়া এবার নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রয়াস করলো। অস্থির হাতে দূরে ঠেলে দিলো আয়াশকে।আয়াশ জোর করলো না। কোনো অধিকার ফলালো না। ধীরে ধীরে তার পাশেই বসে পড়লো। ইনায়ার গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো নিজের হাতের তালুতে সযত্নে মুছে দিলো। ইনায়া রক্তিম, অশ্রুসজল চোখে তাকালো মানুষটার দিকে। কাঁপা কণ্ঠে বললো-
“এতো বলেন ‘ভালোবাসি’ কিন্তু সেই ভালোবাসিটা কেনো
আমার হৃদয় ছুঁতে পারে না? কেনো অনুভব করতে পারি না আপনার বলা ভালোবাসাটা? বিশ্বাস করুন, আপনার ভালোবাসা আমি চাই, ভীষণ বাজে ভাবে চাই! অথচ আপনার বলা ‘ভালোবাসি’ একবারও অনুভব করতে পারি না। ভালোবাসি না অনুভব করতে পারলে আপনার কাছে ফিরবো কিভাবে? আমায় অনুভব করান,আমি আপনার সঙ্গে মৃত্যু অব্দি থাকতে চাই। অথচ পারছি না থাকতে!”
ইনায়ার বলা প্রতিটা শব্দে সহসা আয়াশের বুকটা কেঁপে উঠলো। মানুষ ভালোবাসা না পেতে পেতে একসময় হয়তো এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়, যেখানে হাজারবার ভালোবাসি বললেও সেই শব্দ আর হৃদয়ের ভেতর পৌঁছায় না। হাজার রকম ভালোবাসা চোখের সামনে মেলে ধরলেও মন তাকে বিশ্বাস করতে পারে না।ইনায়া হয়তো সেই পর্যায়েই এসে দাঁড়িয়েছে। তবুও আয়াশ হার মানলো না।
ইনায়ার চোখের জলগুলো আবারও সযত্নে মুছে দিলো সে। দু’হাতের মাঝে আলতো করে আঁকড়ে ধরলো ইনায়ার গাল। চোখের গভীরতা দিয়ে যেনো বোঝাতে চাইলো, এবার আর কোনো মিথ্যে প্রতিশ্রুতি নয়। নরম স্বরে বললো-
“ আপনি যা চাইবেন তাই হবে। যেমনটা চাইবেন তেমনটা হবো, যেভাবে নাচাবেন সেই ভাবে নাচবো৷ তবুও বিচ্ছেদ চাইবেন না। আপনাকে হারিয়ে ফেলার দহন এই হৃদয় দ্বিতীয়বার সহ্য করতে পারবে না। একবার বেঁচে গেলেও এবার বাঁচবো না।”
ইনায়া কোনো কথা বললো না। নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো আয়াশের মুখপানে। মানুষটা কি সত্যিই বদলে গেছে?
নাকি এই অনুভূতিগুলোও একদিন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে যাবে?তার এত প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
আয়াশ ধীরে ধীরে ইনায়ার ভেজা গালটা আলতো হাতে পাশ ফিরিয়ে দিতে দিতে বললো-
“ যখন ইচ্ছে তখনই আপনি আমার কাছে ফিরুন। কেউ আপনাকে আর জোর করবে না৷ আপনার জন্য আজীবন অপেক্ষা করবো। তবুও ছেড়ে যাবেন না।”
“ আমার আর ইচ্ছে করে না ওই ঘরে ফিরতে!”
“তাহলে ওই বাড়ি ত্যাগ করবো।”
“অনেকদিন আপনার ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করেছি। এখন আর অপেক্ষা করতেও ইচ্ছে করে না।”
“তাহলে অপেক্ষা করতে হবে না। এবার আমি অপেক্ষা করবো, আপনার সেই পুরোনো অপেক্ষাটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।”
“আপনার কাছে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।”
“তাহলে এবার একটু বিশ্রাম নিন। আমি আপনাকে আগলে রাখবো।”
“আপনার আগলানোর প্রয়োজন আমার ফুরিয়ে গেছে।”
“প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে পারে, অধিকার নয়।”
“আপনার অধিকারও আমি আর অনুভব করি না।”
“অনুভব করতে হবে না। আমি প্রতিদিন এমন কিছু করবো, একদিন অনুভবগুলো নিজেই ফিরে আসবে।”
“আপনার জন্য আমার ভেতরে যে জায়গাটা ছিল, সেটা এখন একদম শূন্য।”
“শূন্য জায়গাগুলোই তো আবার নতুন করে ভরে ওঠে।”
“সব শূন্যতা পূর্ণ হওয়ার জন্য তৈরি হয় না।”
“তাহলে আপনার এই শূন্যতার মাঝেই আমি সারাজীবন দাঁড়িয়ে থাকবো।”
“আমি আর আপনার কাছে কিছু চাই না।”
“চাইবেন না।”
“কিছুই না।”
“তবুও দেবো।”
“কেন?”
“কারণ একসময় আপনি চেয়েছিলেন, আর আমি দিতে পারিনি। এবার আপনি না চাইলেও, আপনার না-পাওয়াগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার দায় আমার।”
“আমি আর আগের সেই মানুষটা নেই।”
“আমি জানি।”
“তাহলে আমাকে আগের মতো করে পেতে চাইবেন না।”
“চাইবো না। আমি নতুন এই আপনাকেই ভালোবাসতে শিখবো।”
“আপনার প্রতি আমার সব অনুভূতি মরে গেছে।”
“তাহলে কবর দেবো না।”
“মানে?”
“মৃত বলে যেটাকে ছেড়ে দেবেন, আমি সেটার পাশেই বসে থাকবো। যদি কোনোদিন আপনার অনুভূতির ভেতর আবার একফোঁটা প্রাণ ফিরে আসে।”
“একদিন আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমি কেঁদেছিলাম।”
“জানি।”
“তখন তো আপনি আমার চোখের জল দেখেননি।”
“সেই ভুলের শাস্তিই হয়তো এখন পাচ্ছি।”
“কি শাস্তি?”
“আপনাকে প্রতিদিন সামনে পেয়েও, আপনার হৃদয়ে আমার জন্য আর কোনো জায়গা না পাওয়া।”
“এখন কেন এত ভালোবাসেন আমাকে?”
“হয়তো যেদিন বুঝেছি আপনাকে হারাতে পারি, সেদিনই ভালোবাসার গভীরতা বুঝেছি।”
“বড্ড দেরি হয়ে গেছে।”
“জানি।”
“তবুও ফিরিয়ে আনতে চান?”
“হ্যাঁ।”
“এতটা নিশ্চিত?”
“আপনি আমার কাছে ফিরবেন কি না জানি না। কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে আর কখনো সরে যাবো না।”
“আমি যদি কোনোদিনও আপনাকে ভালোবাসতে না পারি?”
“তবুও থাকুন।”
“কোন অধিকারে?”
“কোনো অধিকারে না। শুধু আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হয়ে।”
“আর আপনি?”
“আমি আপনাকে ভালোবেসেই যাবো। আপনার ভালোবাসা পাওয়া আমার প্রাপ্তি হতে পারে, কিন্তু আপনাকে ভালোবাসা আমার সিদ্ধান্ত।”
“আমি বদলে গেছি।”
“আমিও।”
“আপনি আগে আমাকে ভালোবাসতেন না।”
“এখন ভালোবাসি।”
“আর আমি আগে আপনাকে ভালোবাসতাম।”
“এখন?”
“এখন পারি না।”
“তাহলে আমরা দুজনেই নতুন করে শুরু করি। এবার আমি আপনাকে ভালোবাসবো, আর আপনি… যখন ইচ্ছে হবে, তখন আমাকে ভালোবাসবেন।”
“আমি যদি কোনোদিনও ফিরে না আসি?”
“তবুও আপনার জন্য দরজাটা খোলা থাকবে।”
“আর যদি আমি অন্য কোথাও চলে যাই?”
“তবুও আপনার ফেরার পথটা আমি বন্ধ করবো না।”
“এত সহজে ছেড়ে দেবেন?”
“ছেড়ে দেওয়া আর অপেক্ষা করা এক জিনিস নয়। আমি আপনাকে বেঁধে রাখবো না, কিন্তু ভালোবাসা থেকে মুক্তিও দিতে পারবো না।”
“আপনি বড় স্বার্থপর।”
“হ্যাঁ। কারণ জীবনে প্রথমবার, আমি আপনাকে নিজের জন্য চাইতে শিখেছি।”
ইনায়া নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো। শব্দ যেনো আচমকাই ফুরিয়ে গেছে তার। কি বলবে আর? কিংবা এই মুহূর্তে আদৌও কি কিছু বলা উচিত? নিজের ভেতরে জমে থাকা অগণিত অনুভূতির ভারে হঠাৎ করেই সবকিছু থেকে ইচ্ছে উঠে গেলো। জীবনটা খরস্রোতা নদীর ন্যায় আপন গতিতে বয়ে চলুক, ইনায়ার আর কিছু করার নেই। বড়ো ক্লান্ত লাগছে নিজের এই জীবনটাকে নিয়ে। দীর্ঘ এই পথচলা, অজস্র প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব, বারবার হারিয়ে গিয়ে আবার নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রচেষ্টা, সবকিছু মিলিয়ে কেমন অবসন্ন লাগে তাকে। কখনো কখনো মনে হয়, যদি সেও তার বাবা-মায়ের সঙ্গে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতো, তাহলে কি এতোটা দীর্ঘ জীবন দেখা হতো? এতোটা পথ পাড়ি দিতে হতো? এতোটা ক্লেশ, এতোটা অপেক্ষা, এতোটা অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় ঘটতো?তার কি ইয়াশকে পাওয়া হতো? না,হয়তো পাওয়া হতো না। আর এই জীবনের সবচেয়ে বড়ো, সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তিটাই তো তার সন্তান! তার ক্ষুদ্র অস্তিত্ব জুড়ে আজ যে প্রাণটা নিঃশ্বাস নেয়, যে প্রাণটার হাসিতে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়, তাকে পাওয়ার জন্য ইনায়া এই জীবনেও শতবার ঝাঁপ দিতে রাজি। দু’বার ভাববে না সে। শত অগ্নিকুন্ডের তীব্রতায় নিজেকে বিসর্জন দেওয়ার বিনিময়েও যদি তার ইয়াশকে পাওয়া যায়, তবে সে শতবার ঝাঁপ দেবে সেই অগ্নিকুন্ডে। প্রতিবারই দেবে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই।
আয়াশ ধীর হাতে ইনায়ার মাথার ওপর থেকে হিজাবটা সরিয়ে দিলো। দীর্ঘ সময় ধরে আবদ্ধ থাকা এলোমেলো কেশরাশিগুলো আঙুলের মৃদু স্পর্শে সযত্নে সরিয়ে দিলো মানুষটা। ইনায়ার মুখের ক্লান্তি বোধহয় তার চোখ এড়ায়নি। অথবা ইনায়ার প্রতিটা নীরবতাকেই আজকাল শব্দের চেয়েও বেশি করে বুঝতে শিখেছে আয়াশ।অতঃপর অত্যন্ত কোমল স্বরে বললো-
“ ঘুমান ইনায়া, কান্ত হবেন না। আমি আছি তো। কান্ত হলে আমার কাঁধে মাথা রাখবেন, যতক্ষণ ইচ্ছে ততোক্ষণ সেখানে মাথা দিয়ে থাকুন। তবুও কান্ত হবেন না।”
কথাগুলো শুনে ইনায়ার সত্যিই মনে হলো তার বিশ্রাম প্রয়োজন। খুব বেশি প্রয়োজন। হয়তো শরীরের চেয়েও অধিক বিশ্রামের প্রয়োজন তার ক্লান্ত মনটার। ধীর হাতে নিজেকে সামলে ইনায়া মাথাটা এলিয়ে দিলো আয়াশের প্রস্তরসম কাঁধে। চোখ দু’টো বুঁজে নিতেই বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ভার যেনো আরও ভারী হয়ে এলো। নীরবেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। আয়াশের কাঁধ ভিজে উঠলো, অথচ মানুষটা নড়লো না।বরং আরও একটু সরে বসলো।যেনো ইনায়ার বিশ্রামে সামান্যতম অসুবিধাও না হয়।কোনো কথা বললো না ইনায়া। কোনো অভিযোগ নয়, কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো উত্তরও নয়। শুধু নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম দিলো। চোখের অন্ধকারে কোথাও একটুখানি শান্তি খুঁজতে লাগলো। সেই শান্তির দেখা আদৌও পেয়েছে কি না, তা নিজেও বুঝতে পারলো না।
সবকিছু কেমন ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেলো।
—-
সময় পেরিয়েছে।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরও তিনটা মাস। সময় কখন, কিভাবে, কোন অদৃশ্য গতিতে মানুষের জীবন থেকে একের পর এক প্রহর চুরি করে নিয়ে যায়, তা বোঝা সত্যিই বড়োই মুশকিল। কিছুদিন আগেও যে দিনগুলো দীর্ঘ মনে হতো, আজ সেগুলো কেমন চোখের পলকেই অতীত হয়ে যাচ্ছে। ইনায়ার অনলাইন বিজনেসটা এখন বেশ জমজমাট। প্রতিদিন ভালোই অর্ডার আসে। অল্প টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন স্যোশাল মিডিয়ায় পরিচিত মুখদের দিয়ে প্রমোশন করানোর যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল, তাতে বেশ ভালো সাড়াই পেয়েছে। একটা হাতে সবকিছু সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে দেখে আয়াশ একজন স্টাফও ঠিক করে দিয়েছে।তবে তার বেতন দেয় ইনায়াই। নিজের অর্জনের জায়গাটুকু নিজের কাছেই রাখতে চায় সে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজটাও চলছে। আগের মতো নিজের ওপর অমানুষিক চাপ আর নেয় না ইনায়া। যতটুকু করতে পারে, ততটুকুই কাজ নেয়। সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে নিজেকে ভেঙে ফেলার দিনগুলো বোধহয় সে পেছনে ফেলে এসেছে। এখন তার আয়ের দু’টো মাধ্যম। কোনোটাকেই অবহেলায় ফেলে রাখতে চায় না ইনায়া। সামলাতে পারলে জীবনের দু’টো পথই কাজে লাগাবে সে।
সেদিনের পর থেকে কেউ আর তাকে সেই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য জোর করেনি।কেউ সেই প্রসঙ্গটাও তোলেনি।মান-অভিমানের দেয়ালটা আজো আছে। অতীতের ক্ষতগুলোও রাতারাতি মুছে যায়নি। তবুও জীবন থেমে থাকেনি। আপন গতিতেই এগিয়ে চলেছে।আর সেই চলার পথে একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে ইয়াশ। সারাদিন তার ফোকলা দাঁতের হাসিতে যেনো চারপাশ ভরে থাকে। দাদা-দাদি, আন্টি-আঙ্কেল কিংবা বাবাকে দেখলেই ক্ষুদ্র মুখখানি আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তার খুশি যেনো মুহূর্তেই দ্বিগুণ হয়ে যায়। হাত-পা আপন গতিতেই ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। পুরো দেহাবয়ব জুড়ে এমন এক অস্থির আনন্দের প্রকাশ ঘটে যে, দেখলেই হাসি পায়। আরও একজনের আগমন ঘটবে। সবমিলিয়ে জীবনটা এখন বেশ ভালোভাবেই চলছে।
আর আয়াশ?সে এখনো নীরবে ইনায়ার সবকিছু করে যায়। কোনো প্রত্যাশা নেই। কোনো অধিকার ফলানোর চেষ্টা নেই। কোনো প্রশ্নও নেই। শুধু নিঃশব্দ যত্ন। ফুল এনে দেওয়া। কখনো ইনায়ার পছন্দের খাবার। শাড়ি আনা। শাড়ি জমতে জমতে আলমারির একপাশ ভরে উঠেছে। টিপের পাতার সংখ্যাও বেড়েছে। চুড়ির জোড়াগুলোর হিসাব বোধহয় ইনায়াও জানে না। আয়াশের যত্ন বেড়েছে। আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে মানুষটাও।আজকাল আয়াশের চোখে আর সেই পুরোনো শূন্যতাটুকু খুঁজে পায় না ইনায়া। অতীতের অন্ধকারও যেনো মানুষটার ভেতর থেকে একটু একটু করে মুছে গেছে। আগের আয়াশকে আর খুঁজে পায় না সে।খুঁজে পায় নতুন একজনকে।এই আয়াশ হাসে। ইনায়াকে হাসানোর চেষ্টা করে। আর এই হাসিটা মিথ্যে নয়। ঠোঁটের কোণে জোর করে টেনে আনা কোনো অভিনয়ও নয়। বরং হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক টুকরো প্রশান্তি। ইনায়া কিছুই বলে না।
সেদিন বলা প্রতিটা শব্দ আজ আয়াশ নীরবে বাস্তবায়ন করে চলেছে। কোনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নেই, আছে কেবল প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার অবিরাম প্রচেষ্টা। ভাবতে ভাবতেই ইনায়ার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো বিছানার ওপর।
হাত-পা নাড়িয়ে আপনমনে আনন্দময় সব শব্দ করতে ব্যস্ত ইয়াশ।
“ পপপপহহহ, অ্যাইইই! উম্মমমম! অ্যাইই! তা তা তা তা!”
ইনায়া হেসে ফেললো। পরমুহূর্তেই ছেলের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো। মাকে নিজের পাশে শুতে দেখতেই যেনো ইয়াশের আনন্দ আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। হাত-পা দ্রুত গতিতে ছোটাছুটি করতে লাগলো। ক্ষণে ক্ষণে মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে। ক্ষুদ্র, মায়াময়, আদুরে চোখ দু’টোতে আলাদা এক আনন্দের দীপ্তি জ্বলজ্বল করছে।
“ আইই আইইই! তাতততততা তাতততা!”
“ হুম এতো সুখি আমার আব্বাটা বুঝি? কি করে আমার আব্বাটা? আমার তোতাপাখি!”
বলেই ছোট্ট ছোট্ট আদরে ছেলেকে মুড়িয়ে দিতে লাগলো ইনায়া। মায়ের স্পর্শে ইয়াশের আনন্দ যেনো আরও বেড়ে গেলো। হাত-পা ছুটিয়ে চললো সে। ছোট্ট ছোট্ট হাতের মুঠোয় কখনো মায়ের জামা, আবার কখনো দীর্ঘ চুল ভরে নিচ্ছে। ইনায়া ছেলের ক্ষুদ্র নাকের সঙ্গে নিজের নাকটা আলতো করে মিশিয়ে দিতে দিতে বললো-
“ ওরে বাবা। মায়ের স্ট্রং বয়! মায়ের তোতাপাখি!”
ইনায়ার মনে হলো এই মুহূর্তগুলো বন্দী করে রাখা উচিত। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সময়গুলোই তো একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে। ইয়াশ আরও বড়ো হবে। আজকের এই অস্পষ্ট বুলি, এই অকারণ হাসি, হাত-পায়ের অস্থির ছোটাছুটি, সবকিছু একদিন বদলে যাবে। মাথার কাছে পড়ে থাকা ফোনটা তুলে নিলো ইনায়া। ক্যামেরা অন করে ভিডিও চালু করলো। তারপর নিজের বড়ো মাথাটা ইয়াশের ছোট্ট মাথার সঙ্গে একত্রে রাখলো। ইয়াশ আনন্দের সঙ্গে ছটফটিয়ে হাত-পা ছোটাছুটি করছে,আর হাসছে।ইনায়া ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললো-
“ ইয়াশ কুটু, এই দিকে তাকাও। কুটুপাখি তাকাও!”
ইয়াশ গলগলিয়ে উঠলো।
“ ইগগ! ইইই! তাততা তাতততা!”
ইনায়া ছেলের দেখাদেখি একই ভঙ্গিতে বলে উঠলো-
“মায়ের বাবাটা তাতা তাতা পাখি! ইয়াশ একটা তাতা পাখি! মায়ের ছোট্ট তোতাপাখি। তা তা তা!” তা তা ইয়াশ তাতা তা তা। মায়ের তাতা পাখি, তাতা তাতা! তা তাতা!
মায়ের কণ্ঠ শুনে ইয়াশও যেনো কথোপকথনে অংশ নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে লাগলো।
“ তাততত তাতততত! আইই! তততততা!”
ইনায়া হেসে দিলো। কেমন এক অদ্ভুত, নির্মল হাসি। পরমুহূর্তেই ছেলেকে আরও কাছে টেনে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। অজস্র ছোট্ট ছোট্ট আদরে ভরিয়ে দিলো ক্ষুদ্র দেহটা। মায়ের বুকে মাথা রেখে ইয়াশ আপনমনে হাত-পা নাড়াতে থাকলো। ইনায়ার ঠোঁটের কোণে হাসি রয়ে গেলো। এই তো তার পৃথিবী। এত ঝড়, এত অশ্রু, এত না পাওয়া আর হারিয়ে ফেলার ভয় পেরিয়ে আজ তার বুকের মধ্যে শুয়ে আছে তার সমস্ত প্রাপ্তি। তার ইয়াশ! তার ক্ষুদ্র তোতাপাখি!
#চলবে

