চিলেকোঠার প্রেম পর্ব-৩৫+৩৬

0
874

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩৫

স্নিগ্ধ সকালে,ঊষার রবি এক টুকরো সাদা মেঘের আড়ালে উঁকি দিয়েছে। আস্তে আস্তে সে মেঘ ভেদ করে বের হয়ে আসবে। তার আলো বিচরণ করবে গগণ জুড়ে। সায়েনের ঘুমটা হুট করেই ভেঙে গেছে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো সে। পাশ ফিরে দেখতে পেল না কঙ্খিত মানুষটিকে। তারমানে সে ভোরের আলো ফোটার পূর্বেই চলে গেছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল সায়েনের। এই লুকোচুরি আর কতো??না জানি আবার নতুন কোন ঝামেলা পোহাতে হয় সায়েনকে। নিলিমা বেগমকে দেখে মনে হয় তিনি কখনোই সায়েনকে মানতে পারবে না। এটাই স্বাভাবিক,কোন মা চাইবে না সেটা। আরাদ আবার কোন ভুল করলো না তো সায়েনকে বিয়ে করে??সায়েন পারতো বাকি জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে দিতে। কিন্তু মাঝখানে আরাদ এসে সবটা ওলোট পালোট করে দিলো। এখন আরাদ বিহীন থাকা সায়েনের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সব জানার পর যদি নিলিমা বেগম সায়েনকে আরাদের জীবন থেকে চলে যেতে বলে তাহলে সায়েন কিছুতেই না করতে পারবে না। এসব ভেবে মনের মধ্যে অজস্র অজানা ভয় জেঁকে বসছে। চিন্তাগুলো ছাড়তে চাদর সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো সায়েন। পা বাড়ালো ওয়াশরুমের দিকে। ফ্রেশ হয়ে আসতেই কবিতার মুখোমুখি হলো সে। মুচকি হেসে কবিতার সাথে কথা বলে খেয়ে নিল। তারপর রেডি হয়ে আরশি আর তনয়ার সাথে ভার্সিটিতে গেল। কিন্তু আজকে ওরা বোধহয় ক্লাস করতেই পারবে না। কারণ হলো ইফতি। সে আগে থেকেই ওয়েট করতেছে। অগত্যা ওদের পার্কে গিয়ে বসতে হলো। ইফতি গিয়ে বাদাম কিনে আনলো। বাদাম ছিলে মুখে পুরে ইফতি বলল,’সো ভাবি!! আজকে সবটা না বলে কিছুতেই যেতে পারবেন না আপনি। আমরা সবাই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি। শুরুটা হলো কিভাবে বলুন??’

সায়েন তনয়ার মুখের দিকে তাকালো। ওরাও জানতে ইচ্ছুক দেখেই বোঝা যাচ্ছে। দম ফেলে সায়েন বলল,’নভেম্বর মাস,গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। নোট কালেক্ট করার জন্য আমার ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলাম। কিন্তু ফিরতে গিয়ে ঘটলো বিপত্তি। বৃষ্টির প্রকোপ বেড়ে গেল। রেইনকোট গায়ে ছিল আমার। কোনরকমে স্কুটি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ করেই একটা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াতেই স্কুটি থামালাম। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার পুরো শরীর। কিছুটা ভয় পেয়ে তাই আমি। আশেপাশে কেউ ছিল না বিধায় আমাকেই সাহায্য করতে হলো। বাড়িতে নিয়ে গেলাম তাকে।’

‘আর ওই ছেলেটাই আমার ভাইয়া তাই তো??’

বলেই খিলখিল করে হাসতে লাগলো তনয়া। সায়েনও মুচকি হাসলো। ইফতি কপোট রাগ দেখিয়ে বলল,’কথার মাঝে কথা বলো কেন??দেখছো না যে গুরুত্বপূর্ণ লাভ স্টোরি। সো চুপ থাকো!!’

তনয়া চুপ করে গেল। সায়েন আবার শুরু করলো। শুরুতে হাসতে হাসতে সবার পেটে খিল ধরে গেছে। শুরুটা হাস্যকর হলেও শেষেরটা হৃদয়বিদারক। পানি চলে এসেছে আরশি তনয়ার চোখে। সায়েনও চোখের পানি মুছলো। হাসিমুখে সবার দিকে তাকালো সে। ইফতি বলল,’প্রতিটা মানুষের জীবনে একবার হলেও দুঃসময় আসবেই আসবে। সৃষ্টিকর্তা তাদেরই পরীক্ষা নেন যাদের তিনি পছন্দ করেন। হয়তো তিনি আপনাকে তার পছন্দের তালিকায় রেখেছেন বলেই এতো বড় পরীক্ষা নিয়েছেন। তবে শেষটায় কিন্তু আপনিই জিতেছেন।’

প্রতিত্যুরে সায়েন কিছু বলল না। চারজনের কথার মাঝে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আকাশ এসে দাঁড়ায়। চারজনেই দাঁড়িয়ে পড়লো আকাশকে দেখে। আকাশ ইফতির দিকে কড়া চোখে তাকালো। ইফতিও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে কোন ভয় প্রকাশ পেলো না। সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ভয় পেয়ে গেছে আরশি আর তনয়া। আকাশ যদি আরাদকে উল্টাপাল্টা কিছু বলে তাহলে তো ওরা শেষ। আকাশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,’তুমি এখানে কি করছো??তাও ওদের সাথে??’

ইফতি মুচকি হেসে পকেটে হাত গুজে বলল, ‘এটা থানা নয় আর আমাকে রিমান্ডে আনেননি যে আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আমাকে দিতে হবে।’
ত্যাড়া জবাবে আকাশের রাগটা আরো বেড়ে গেল। সে ঝেড়ে গলায় বলল,’খুব শিঘ্রই সেটা হবে। তবে এরপর আর ভুল হবে না।’

‘চেষ্টা করে দেখুন পারেন কি না??’

আকাশ এবার ইফতির থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো। সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমরা ক্লাস রেখে এখানে বসে অন্য ছেলের সাথে গল্পে মেতেছো আরাদ জানে??’

ভয়ে ওদের গলা শুকিয়ে গেছে। সায়েন জবাব দিলো না। আকাশ আবারো বলল, ‘বাড়িতে যাও।’

ওরা তিনজনে যেতে নিলে ইফতি বাঁধা দিয়ে বলল,’আমার গার্লফ্রেন্ড বাদে দুজন চলে যাও।’
আকাশসহ সবাই অবাক। এখানে ইফতির গার্লফ্রেন্ড আবার কে?? সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইফতি মিটিমিটি হাসছে। আকাশ জিজ্ঞেস করে,’গার্লফ্রেন্ড!!!’

‘আপনি জানেন না??আরশি তো আমার গার্লফ্রেন্ড!!’

আরশির মাথায় যেন বাজ পড়লো। মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো ওর। তনয়া সায়েনেরও একই অবস্থা। এই ইফতি কি পাগল হয়ে গেছে নাকি?? উদ্ভট কথা বলছে কেন?? ঠোঁট টিপে হেসে ইফতি চোখ মারে তনয়াকে। চোখের ইশারায় সে আকাশ আর আরশিকে নিয়ে কিছু বলল তনয়াকে। কিছু পল নির্বাক চোখে ইফতির দিকে তাকিয়ে থেকে তনয়া বুঝতে পারলো যে ইফতি ঠিক কি বোঝাতে চাইছে। ঠোঁটে হাসি ফুটলো তনয়ার ও। শুধু বুঝলো না সায়েন আরশি। ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইল ওরা। তনয়া তাল মিলিয়ে বলল,’হ্যা তো আরশি আর ইফতি গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড।’

‘কি???তনয়া তুইইই,,,,’

হাত খামচে ধরে আরশিকে চুপ করালো তনয়া। বোকার মতো তাকিয়ে রইল আরশি। তনয়া খানিকটা কান্নাস্বরে বলল,’প্লিজ ভাইয়াকে বলবেন না। আসলে ইফতি তো কোন কাজ করে না। চাকরি পেলেই বিয়ের প্রপোজাল পাঠাবে আমাদের বাড়িতে। ততদিন পর্যন্ত এই বিষয়ে কাউকে কিছু জানাইনি আমরা। ভাইয়া জানলে তো মেরেই ফেলবে।’

তনয়ার কথার মাঝে ইফতি ফোড়ন কেটে বলল,’আরশি বেইব,চলো ওদিকটায় ঘুরে আসি। আমাদের তো পার্সোনালি সময় স্পেন্ড করতে হবে। কালকে আমরা সিনেমা দেখতে যাব কেমন??’
আরশির মনে হচ্ছে ও এবার সত্যিই জ্ঞান হারাবে। একবার তনয়ার দিকে তো একবার ইফতির দিকে তাকাচ্ছে সে। তনয়া ইশারায় যেতে বলল আরশিকে। আকাশ থামিয়ে বলল,’ওয়াট রাবিশ আরশি!!এই ছেলেটাকে তুমি চেনো??আই ক্যান্ট বিলিভ ইট। তুমি এই ছেলেটার সাথে রিলেশন করতেই পারো না।’

‘পারে না কি আবার। রিলেশন করে ও আমার সাথে। জিজ্ঞেস করে দেখুন পারলে।’
ইফতির কথাগুলো রাগ বাড়িয়ে দিলো আকাশের। অসহ্য লাগছে ওর। তনয়া আরশির হাত ধরে হ্যা বলতে বলছে বারবার। ওদের টানাহেঁচড়ায় আরশি শুধু মাথা নাড়ে। রাগট তরতর করে বেড়ে গেল আকাশের। রেগেমেগে ওখান থেকেই চলে গেল সে। তনয়া আর ইফতি হাই ফাইভ করে হাসতে হাসতে বসে পড়লো। আরশি রেগে কিল বসিয়ে দিল ইফতির পিঠে।

‘তোমরা দুই বোন শুধু শুধু আমাকে মারো কেন বলোতো??’

‘মার তো খাবেনই। আকাশ ভাইয়ার সামনে এসব কি বললেন!!!যদি ভাইয়াকে বলে দেয় তো??’

‘আমার মনে হয় না তা ওনি করবে। কারণ সে জেলাসি ফিল করছে।’

আরশি বুঝলো না ইফতির কথা। এবার তনয়া বলল,’আরে এটা এ্যাক্টিং ছিলো। আমরা দেখলাম আকাশ ভাইয়া কি রিয়্যাক্ট করে। দেখলি না কিরকম রাগ করে চলে গেল।’
আরশি এবার সায়েনের দিকে তাকালো। সায়েন এগিয়ে এসে বলল,’তোমার উচিত ছিল আরো আগে সব জানানো। ইন্সপেক্টর আকাশ তখন কিছুতেই তোমাকে ফিরিয়ে দিতে পারতো না। তবে উনি খুব ভালো মানুষ।’
তনয়া আরশিকে চোখ দিয়ে বলতে বারণ করলো। কারণ সায়েন এখনও জানে না যে আকাশ ওকে ভালোবাসে। আরশি অন্যদিকে ঘুরে চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছলো। তারপর বলল,’এসব করে কি লাভ??কিছুই হবে না। তার থেকে উনি ওনার মতো চলুক আমি আমার মতো।’

‘তুমি তোমার মতো কষ্ট পাও তাই তো??শোন সবার মনে ভালোবাসা থাকে না। অপরজন কে তা সৃষ্টি করতে হয়। তুমি চাইলে ইন্সপেক্টর আকাশের মনে ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারো। কিন্তু তুমি তো আগেই হাল ছেড়ে বসে আছো।’
সায়েনের কথা শুনে চকিতে তাকালো আরশি। সায়েন তো জানেই না যে আকাশ ওকে ভালোবাসে। কিন্তু আরাদ কি আরশিকে আকাশের হাতে তুলে দেবে?? কখনোই নয়। আকাশ তো আরশিকে ভালোবাসতেই পারবে না। সায়েন আরশির হাত ধরে বলল,’সত্যি ভালোবাসা কখনো বিফলে যায় না। হয়তো সবার ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। আচ্ছা ইন্সপেক্টর আকাশ নাকি অন্য কাউকে ভালোবাসে??কে সে??’

আরশি মুখ খোলার আগেই তনয়া বলল, ‘আছে একটা মেয়ে। আমরা চিনি না তবে শুনেছি মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে।’
চোখ বন্ধ করে ফেলে আরশি। বুকের ক্ষতটা জাগ্রত হয়ে গেছে। কান্না পাচ্ছে ওর খুব। সামলে নিলো সে নিজেকে।

‘তাহলে তো কোন প্রবলেম নেই। আমি নিজে কথা বলব,,,,,’

কথার মাঝেই সায়েনকে আরশি থামিয়ে দিয়ে বলল,’তার দরকার নেই। আমি চাই না ওই মানুষটাকে। অনুভূতি গুলো আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। একসময় পুরোটাই সরে যাবে।’

কথা শেষ করেই হাটা ধরলো আরশি। কেউ বাঁধা দিলো না। আরশিকে ওরা ক্ষনিকের জন্য একা ছেড়ে দিলো। এতে নিজের মনকে নিজেই সান্তনা দিতে পারবে। ইফতি বলে উঠলো,’কঠিন প্রেম। এদের এক না করা পর্যন্ত আমার পেটের ভাত হজম হবে না।’

‘কিন্তু আকাশ ভাইয়া আপনাকে তখন কি বলল??আমি কিছুই বুঝলাম না।’

ইফতি কিছুক্ষণ তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কে জানে?? তোমাদের সাথে দেখে হয়তো জেলাস ফিল করেছে তাই বলেছে।’
সবটা এড়িয়ে গেল ইফতি। মেয়েদের সামনে এভাবে তো মানসম্মান জলাঞ্জলি দেওয়া যায় না।

‘কি প্ল্যান করলেন?? কিভাবে আকাশ ভাইয়াকে আরশির প্রেমে ফেলবেন??’

‘এখনি কি প্ল্যান মাথায় চেপে বসেছে নাকি??ভাবতে তো সময় লাগবে।’

বাড়িতে ফিরতেই নিলিমা বেগমের মুখোমুখি হলো সায়েন। নেকাব খুলতে খুলতে আসছিল সায়েন। নিলিমা বেগমকে দেখে থমকে যায় সে। সালাম দিয়ে চুপ করে গেল সে। নিলিমা বেগম ও জবাব দিলেন। অতঃপর তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন সায়েনকে। কালো রঙের বোরখা পড়েছে সায়েন। সায়েনকে চুপ থাকতে দেখে তিনি বললেন, ‘সারাক্ষণ চিলেকোঠার ঘরে পড়ে থাকতে এসেছো নাকি??এখানে থাকছো খাচ্ছো বাড়ির লোকজন কে কি করে তার কি খেয়াল রাখতে ইচ্ছে করে না নাকি??’

ভুত দেখার মতো চমকে গেল সায়েন। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিলো সে। আরশি তনয়া আগেই নিজেদের রুমে চলে গেছে। নিলিমা বেগম সেদিন বলেছিল সায়েন যেন চিলেকোঠার ঘর থেকে বের না হয় আর তিনিই আজকে বলছে বের হতে। এতো অবিশ্বাস্য,সায়েন মাথা নাড়িয়ে বলল,’জ্বি আপনার ছেলে বলেছে বের না হতে তাই,,,,’

নিলিমা বেগম বিরক্তিভাব ফুটিয়ে বললেন, ‘ওই ছেলেটাও হয়েছে একটা। যা বলবে তাই করে ছাড়বে। যাও যাও তাহলে আর বের হওয়ার দরকার নেই ওখানেই ঘাপটি মেরে বসে থাকো।’

সায়েনের পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন নিলিমা বেগম। সায়েন এক পলক সেদিকে নিজের কক্ষে চলে গেল। বোরখা খুলে ফোন হাতে নিতেই দেখলো আরাদের মিসড কল। এতো গুলো মিসড কল দেখে সায়েন অবাক। আড্ডা দিতে দিতে ফোন রিসিভ করতে ভুলেই গেছে সায়েন। দ্রুত কল ব্যাক করলো সে। কিন্তু আরাদ রিসিভ করলো না। সায়েন পরপর কয়েকবার ফোন করলো কিন্তু আরাদ ধরলো না। হয়তো কাজে ব্যস্ত আরাদ। সায়েন শাওয়ার নিতে চলে গেল।

সন্ধ্যায় আজকেও তনয়ার রুমে গিয়েছে সায়েন। আজকেও আরশি ঘুমাচ্ছে। আসার পর কেঁদেছিলো খুব। এখন মাথাব্যথা নিয়ে ঘুমাচ্ছে সে। সায়েন তনয়ার সাথে কথা বলছে তখন একটা পরিচিত কন্ঠে দু’জনেই চমকে তাকালো। এই সময়ে আকাশকে ওরা একদমই আশা করেনি। অনেকটা হতাশ লাগছে আকাশকে। ফরমাল ড্রেসে এসেছে আকাশ। তনয়া ভাবলো নিশ্চয়ই আরাদের কাছে বিচার দিতে এসেছে আকাশ। কিন্তু আকাশ ওদের অবাক করে দিয়ে বলল সে আরশির সাথে কথা বলতে চায়। তনয়া মেকি হাসি দিয়ে আরশিকে ডাকলো। মাথা চেপে ধরে আরশি উঠতে উঠতে বলল,’ডাকাডাকি করছিস কেন??ঘুমিয়েও শান্তি নেই।’

বলতে বলতেই আরশির চোখ আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির দিকে। ও আকাশকে দেখে আরও অবাক হলো। সায়েন ততক্ষণে রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। আকাশ যখন আরশির সাথে কথা বলতে চায় তাহলে ওর ওখানে কি দরকার। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ছাদের সিঁড়িতে পা রেখে। একজোড়া বলিষ্ঠ হাত ওর হাত টেনে ধরে। কিছু বোঝার আগেই সায়েনকে কোলে তুলে নিলো আরাদ। সায়েনকে নিয়েই নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো সে। আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনা হজম হলো না সায়েনের। এদিক ওদিক তাকালো সে। যদি কেউ দেখে নেয় তো সব শেষ। হাতের বইটা দিয়ে মুখট ঢেকে ফেলল সে। সায়েনকে বিছানার উপর ঠাস করে ফেলল আরাদ। তারপর কোমড়ে হাত রেখে বলল,’এবার বলো কি শাস্তি দেওয়া যায় তোমাকে??’

‘শাস্তি!!কিসের শাস্তি??কি করলাম আমি??’

আরাদ একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, ‘আমার ফোন রিসিভ না করে বড় অন্যায় করেছো তুমি। তার শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।’

আড়ষ্ট গলায় সায়েন বলল,’দ দেখুন আমি খেয়াল করিনি। পরে তো কল ব্যাক করেছিলাম আপনি ও তো রিসিভ করেননি।’

‘তখন আমি কাজে ছিলাম। ওসব বাদ এবার বলে কি শাস্তি চাও তুমি??’

সায়েন উওর দিলো না। হাতের বইটা চেপে ধরে বসে আছে। না জানি আরাদ আবার কি শাস্তি দেয় ওকে!! ভাবতেই গলা শুকিয়ে এসেছে। আরাদ ওর দিকে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,’এটুকুতে গলা শুকিয়ে গেল। শাস্তিটা কি তা শুনলে কি হবে তোমার??’
পানিটুকু খেয়ে নিলো সায়েন। তারপর বলল, ‘কি শাস্তি দেবেন??’

আরাদ চিন্তিত ভঙ্গিমা করে কিছু ভাবলো তারপর বলল,’শাড়ি পড়তে হবে তোমাকে এখন।’
হাফ ছাড়লো সায়েন। যাক বাঁচা গেল। শাড়ি পড়া তো তেমন কাজ নয়। সহজ শাস্তিই দিলো তাহলে আরাদ। তাই হাসলো সায়েন। আরাদ কাবার্ডের দিকে এগোতে এগোতে বলল,’অতো হাসির কিছু নেই শাড়িটা আমি পড়িয়ে দেব এটাই তোমার শাস্তি।’
সায়েন খাট থেকে নামতে যাচ্ছিল। আরাদের কথা শুনে আবার খাটের উপর ধপ করে বসে পড়লো। আরাদ শাড়ি পড়িয়ে দেবে!!বিষয়টা হজম হলো না সায়েনের। জড়সড় হয়ে বসে রইল বিছানার উপর।

#চলবে,,,,,,,,,

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩৬

নারীহৃদয়ে যদি কোন পুরুষ তির্যকভাবে গেঁথে যায় তাহলে তার মন থেকে সেই পুরুষকে বের করা দুষ্কর। নারীরা ভালোবাসলে মন দিয়ে বাসে আর ঘৃনা করলেও মন দিয়ে করে। নারীর ভালোবাসা আর ঘৃণার পরিমাণ একই। শুধু শব্দদুটোর পার্থক্য। আর তা নিবিড় ভাবে দেখলেই বোঝা যায়। তেমনি ভাবে আরশির মনে গেঁথে যাওয়া পুরুষটিকে এখনও সে মন থেকে বের করতে পারেনি। হাজার চেষ্টা করেও পারেনি আকাশকে ভুলতে। ভুলবে কিভাবে??দূরে থাকলে একসময় ভোলা যায় কিন্তু চোখের সামনে ঘুরঘুর করা ব্যক্তিটিকে ভুলবে কিভাবে??ঘুম ভাবটা এখনও চোখ থেকে সরেনি আরশির। ফুলে আছে চোখদুটো। আজকের প্রহরটা আরশির বিষাক্ত মনে হচ্ছে কোথাও কোন বাতাস নেই।আকাশেও চাঁদের দেখা নেই। পরিবেশটা বেশ গম্ভীর,মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল আরশির। তার উপর আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। এখনও আকাশের আখিপটে চোখ রাখেনি সে। বারান্দার গ্রিল ধরে বাড়ির গেইটের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশের বাইকটা সেখানে দাড় করানো। সেটার দিকেই তাকিয়ে আছে আরশি। আকাশের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছে না। মনও চাইছে না এই পুরুষটির দিকে তাকাতে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আকাশ গলা ঝেড়ে বলে,’আমার বাইকটা পুরাতন এতো দেখে লাভ নাই। তোমার ভাইকে বলো নতুন একটা বাইক কিনে দিতে সারাদিন শুধু দেখবে।’
আরশি দৃষ্টি মেলে দিলো আকাশের দিকে। ফুস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে,’এটা বলতে এসেছেন??’

‘ইফতিকে কতদিন ধরে চেনো তুমি???’

আকাশের প্রশ্নে অবাক হলো না আরশি। এরকমটাই আশা করেছিল সে। উওর দিলো না আরশি। আকাশ আবারো বলল,’ইফতির সাথে কি সত্যি তোমার রিলেশন আছে??’

মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো আরশি। চোখের সামনে আসা চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে আকাশের দিকে তাকালো বলল,’সেটা তো ইফতি বলেই দিলো আবার আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন??’

‘তুমি জানো ইফতি কেমন??ওর সম্পর্কে সব ইনফরমেশন জানো??’

আরশি এবার বিরক্ত হচ্ছে খুব। তখন থেকে ইফতি ইফতি করেই যাচ্ছে। ও বলল,’আপনি একরকম করে বলছেন কেন??আমি কি রিলেশনে জড়াতে পারি না??নাকি আমার সেই বয়স হয়নি??আমি সব বুঝি।’

আকাশ কিছু বলতে উদ্যত হতেই নিচের দিকে চোখ গেল। আরশিও সেদিকে তাকালো। দুজন যুবক যুবতীর দিকে নজর গেল দু’জনের। আসমানী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটার দুহাত ভর্তি সেইম রঙের চুড়ি। তার একহাত ধরে আছে যুবকটির বলিষ্ঠ হাত। একপ্রকার টানছে সেই মেয়েটাকে। আকাশ হাসলো সায়েনকে এভাবে টানতে দেখে। সায়েন আরেকহাতে নিজের শাড়ির কুচি ধরে এগোচ্ছে আরাদের পিছু পিছু। ভয়ার্ত নজরে আশেপাশের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ দেখে ফেললে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। গাড়ির সামনে গিয়ে আরাদ সায়েনের হাতটা ছেড়ে দিল। ছাড়া পেতেই নিজের চুলগুলো ক্লিপ দ্বারা বদ্ধ করে দিলো সায়েন। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। সায়েন যেই না গাড়ির দরজায় হাত দেবে ঠিক তখনই আরাদ ওর চুলের ক্লিপটা খুলে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। সায়েন রাগন্বিত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গাড়িতে বসে পড়লো। ওদের কান্ড দেখে আরশি-আকাশ হাসছে। গাড়ি যতক্ষন পর্যন্ত না বাইরে বের হয় ততক্ষণ পর্যন্ত ওরা তাকিয়ে রইল সেদিকে। আরাদের গাড়ি চলে যেতেই আকাশ মুখ খুলল। দৃষ্টি বাড়ির গেইটের দিকে নিবদ্ধ করেই বলল, ‘আমি সায়েনের মতো নই আরশি। যে কারো চোখের ভাষা বুঝতে পারবো না। আর যদি সেটা হয় ভালোবাসা। সায়েন বুঝবে কিভাবে??সে তো কখনোই আমার চোখের দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। সেখানে চোখের ভাষা পড়া তো হাস্যকর। আরাদের সাথে ওর মনমালিন্য থাকা সত্ত্বেও প্রথম যেদিন আরাদকে দেখেছিল চোখে চোখ রেখেছিল আরাদের। কিন্তু দেখো,আমার দিকে কখনো ফিরেও তাকায়নি সে। তবে তোমার চোখে কয়েকবার আমার চোখ পড়েছিল আরশি। সায়েনের মতো করে দৃষ্টি কন্ট্রোল করতে আমি পারি না। তুমি কি ভেবেছো আমি ব্যর্থ তোমার চোখে থাকা অনুভূতি বুঝতে??’

হুস ফিরলো আরশির চকিতে তাকালো আকাশের দিকে। ওর চোখে সৃষ্ট অনুভূতি কি তাহলে আকাশ জানে?? বুকের ভেতর উথাল পাথাল শুরু হয়ে গেল আরশির। এতক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এখন সে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। কি বলবে সে এখন?? অজানা ভয় এসে জেঁকে ধরলো আরশিকে। আকাশ বলল,’কিছু বলিনি বলে এই না যে আমি কিছু জানি না। তোমার চোখে আমার জন্য অনেক আগেই ভালোবাসা দেখেছি আমি কিন্তু তখন আমি আরেকজনের মুগ্ধতায় আটকে গিয়েছিলাম।’

কথাটা বিষের মতো লাগলো। গায়ে জ্বালা ধরানোর মতো। ঠোঁট কামড়ে সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,’আর এখন??’

আকাশ এবার শব্দ করেই হাসলো। হাসতে হাসতে আরশির দিকে তাকিয়ে বলল,’নেই!!!কি বলোতো,যেখানে সায়েন আরাদ দুজন দুজনকে ভালোবাসে সেখানে আমি কেন তৃতীয় ব্যক্তি হবো?? সেদিন আমি আরাদকে না ডেকে নিজেই সায়েনকে বিয়ে করতে পারতাম। স্বার্থপর হতে পারতাম কিন্তু তা আমি করিনি। কারণ আমি তখন সায়েনর মুগ্ধতা কে হার মানিয়ে উঠতে চেয়েছি। অনেকটা পেরেছিও। দ্বিতীয় বার আর সেই মুগ্ধতাতে আটকাতে চাই না। তাছাড়া সায়েন মুখে না বললেও আমি বুঝেছি ও আরাদকে কতটা ভালোবাসে। যেদিন আরাদের মুখে প্রথম সব শুনি সেদিনই পিছুটান ফেলে চলে আসি। আর আজ আরাদকে সায়েনের সাথে খুশি দেখে আমিও খুশি।’

‘আপনি বারবার মুগ্ধতা বলছেন কেন??ভালোবাসতেন ভাবিকে আমি তা জানি।’

‘নাহ,যদি আমি নিজের মুগ্ধতা সায়েনের কাছে মেলে ধরতে পারতাম তবেই বুঝতাম যে আমি ওকে ভালবাসি। তাই আমি অন্তত এটা মানতে পারছি না।’

‘তার মানে আপনি এখন মুভ অন করতে চাইছেন।’

‘সেটা তো বলিনি। তবে মুভ অন তো একদিন না একদিন করতেই হতো।’

আরশি এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে আকাশের মুখপানে তাকালো। বলল,’আমি ভালোবাসতাম আপনাকে কিন্তু এখন না। আপনার মতো আমিও আমার মতামত চেঞ্জ করেছি। আমি কি মুভ অন করতে পারি না?? আমিও তো মানুষ।’

‘আমি সেটা বলিনি আরশি। অবশ্যই তুমি মুভ অন করবে। তবে ইফতির সাথে নয়। ছেলেটা ভালো না। তুমি জানো ইফতি,,,,,’

আরশি থামিয়ে দিল আকাশকে বলল,’থাক আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না। নিজে তো ভালোবাসবেন না। তাহলে যখন আমি নিজের ইচ্ছায় কাউকে ভালোবেসেছি তখন নাক গলাতে কেন এসেছেন??আমি আপনার কথা শুনছি না।’

আরশির কথার মাঝেই তনয়া ফোন হাতে ছুটে চলে এলো। আগ বাড়িয়ে আরশির দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,’তোর ইফতি ফোন করেছে। ঘুমিয়ে ছিলি তো তাই এখন কথা বলতে চায়।’
আকাশ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো জানেমান দিয়ে ইফতির নম্বর সেভ করা। সাথে দুটো লাভ ইমোজিও রয়েছে। এতক্ষণ স্বাভাবিক থাকলেও এখন রাগ লাগছে আকাশের। ছোঁ মেরে ফোনটা নিয়ে রিসিভ করে বলল,’সমস্যা কি তোমার??এতো রাতে ওকে ফোন করেছো কেন??’

আকাশ সম্পর্কে সবটা তনয়া বলেছে। তাইতো ফোন নিয়ে এসেছে সে। ইফতি হাসি চেপে ধরে বলল,’আমি আমার জানেমান কে ফোন করেছি। আপনি এতো রাতে আমার হবু বউ এর ঘরে কি করছেন?? পুলিশ বলে কি কেউ কিছু বলবে না তা তো হয় না।’

আকাশের রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। বেশ রাগি গলায় বলল,’এই তুমি হবু বউ কাকে বলছো?? একবার থানায় নিতে পারলে তোমার অবস্থা,,,,’

‘বারোটা বাজাবেন তাই তো??ওসব আমি ভয় পাই না। আপনি আমার হবু বউ এর রুম থেকে চলে যান আর আরশির কাছে ফোনটা দিন কুইক।’

‘তোমার সাথে আরশির বিয়ে হবে ভাবলে কি করে তুমি??’

‘তাহলে কে বিয়ে করবে আরশিকে শুনি? আপনি??’

‘হ্যা,,,আ,,ব,নাহ। তবে তোমার সাথে বিয়ে হতে দেব না।’

‘আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করব দেখি কিভাবে আটকান আপনি। আরশিকে ফোন দিন।’

‘জাস্ট শাট আপ। নেক্সক্ট টাইম ওদের সাথে তোমাকে দেখলে,,,,’

‘আমাকে ধমকাচ্ছেন কেন??আমি কি ওদের ডাকি??ওরাই তো আসে। পারলে নিজের বাড়ির মেয়েদের আটকান।’

ইফতি ফোন কেটে দিলো। আকাশ রেগে মেগে ফোনটা আরশির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘নেক্সট টাইম তোমাদের ইফতির সাথে যেন না দেখি। ফল ভালো হবে না।’

বলেই আকাশ চলে গেল। আরশি বোকার মতো আকাশের চলে যাওয়া দেখলো। তনয়া হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে বলল,’কালকে তো ফল আরো খারাপ হবে ভাইয়া। আগে আগে দেখো হোতা হ্যায় কেয়া!!’

‘ইফতির নাম্বার জানেমান দিয়ে তুই সেভ করেছিস??’

‘অফ কোর্স। দেখলি না তাই তো কাজে দিলো।’
আরশি নিজের ফোন নিয়ে রুমে চলে গেল। তনয়া গ্রিলে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। চোখের সামনে ইফতির মুখটা ভেসে ওঠে তার। দিনে দিনে ইফতিকে ভালো লাগছে তনয়ার। ইফতির করা প্রতিটা পাগলামো সহ্য হয়ে গেছে তনয়ার। ছেলেটা একদম অন্যরকম। কথা বলার ধরন হাসি মজা সবকিছু। ওকে দেখলে কেমন অদ্ভুত ফিল হয় তনয়ার। সেটা কিসের তা তনয়া কিছুতেই ভেবে পায় না। কি আছে ছেলেটার যে এতো টানে তনয়াকে। ভাবনার মাঝেই আরশির ডাক পড়ে। তনয়া তড়িঘড়ি করে রুমে চলে গেল ‌

________________

আরাদ ড্রাইভ করছে আর সায়েন চুলগুলো সামনে এনে তা মুঠ করে ধরে আছে। অসহ্য লাগছে ওর খোলা চুলে। গাড়ির জানালা খোলা তাই হুড়হুড় করে বাতাস আসছে। বাতাসে চুল খোলা রাখতে নেই। বাতাসে চুল নষ্ট হয়ে যায় এটা সায়েনের মা বলতো। তাই তো সে চুল আটকাতে চেয়েছিল কিন্তু আরাদ তা দিলো কই??ক্লিপটা নিয়ে গেছে। একটু আগে লজ্জা পেলেও এখন রাগ হচ্ছে সায়েনের। লজ্জার মূল কারণ অবশ্য আরাদ। কারণ সে জোর করেই নিজের হাতে সায়েনকে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। লজ্জায় তখন সায়েনের মুখে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছিল। বারণ করা সত্ত্বেও আরাদ শোনেনি। উল্টে হুমকি দিয়েছে সে। তাই বাধ্য হয়েই আরাদের থেকে শাড়ি পড়তে হলো। এখন আবার বায়না ধরেছে আজকে যেন সায়েন চুল খোলা রাখে। আরাদ বলল, ‘এভাবে চুলগুলো ধরে না রেখে ছেড়ে দাও ভালো লাগবে।’

সায়েন বিরক্তিকর সুরে বলল,’খুব তো বলতেন আমাকে সব সাজেই ভালো লাগে তাহলে এখন চুল খুলতে বলছেন কেন??’

‘ভালো লাগে তো!!আমি তো না বলিনি। আজকের শাড়িটার সাথে খোলা চুল ভালো লাগবে বলেই বললাম। অনেক বলেছি,আর বলব না আমার ইচ্ছে যদি তোমার ভাল না লাগে তাহলে এই নাও তোমার ক্লিপ বেঁধে ফেল চুল।’

আরাদ সায়েনের দিকে ক্লিপটা এগিয়ে দিলো। সায়েন চেয়ে রইল আরাদের দিকে। বিন্দু বিন্দু অভিমান দেখতে পাচ্ছে সে। ক্লিপটা নিয়ে জানালা দিয়ে ছুড়ে মারল সায়েন। আরাদ সামনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। কিছুদূর গিয়ে ব্রেক কষে আরাদ। আচমকা ব্রেক করাতে সায়েন কিছুটা ঝুঁকে পড়ে সামনের দিকে। আরাদকে নামতে দেখে সায়েন ও নেমে পড়লো। গাড়ির সামনে এসে দুজনে মুখোমুখি হলো। আরাদ বলে উঠলো, ‘জুতো খোলো!!!’

‘কি??’অবাক গলায় বলল সায়েন। আরাদ কপাল কুঁচকে আবারো জুতো খুলতে বলল। সায়েন বিষ্ময়ে জুতো খুলতেই আরাদ সায়েনের কোমড় ধরে শূন্যে তুলে গাড়ির উপর বসিয়ে দিলো। সায়েন বেশ অবাক হলো। আরাদও উঠলো, তবে সে সায়েনের হাত ধরে সাবধানে গাড়ির ছাদে উঠে বসলো। টান হয়ে শুয়ে পড়লো গাড়ির ছাদে। এক হাত মেলে দিয়ে সায়েনকে ইশারায় ওর হাতের উপর শুতে বলল। বিনা দ্বিধায় আরাদের হাতের উপর মাথা রেখে চুলগুলো মেলে দিয়ে শুয়ে পড়ল সায়েন। তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আরাদ বলল,’আমার চাঁদকে দেখে আকাশের চাঁদটা হিংসা করেছে। তাই তো লুকিয়ে আছে সে।’
আরাদের কথা শুনেই আকাশের দিকে তাকালো সায়েন। আজকে চাঁদের দেখা নেই। কালো কুচকুচে গগনে তারাগুলো চিকচিক করছে। মুক্তোর মতোই। যার আলো ওই আকাশেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু চাঁদ থাকলে তার আলো এসে পড়তো জমিনে।

‘ওই আকাশটা ভালো না। খারাপ প্রকৃতির।’

আরাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে সায়েন বলল, ‘কেন??’

‘দেখছো না কতজনকে নিজের বুকে জায়গা দিয়েছে। কিন্তু আমার বুকে শুধু আমার চাঁদকেই জায়গা দিয়েছে। অন্য কেউ নট এলাও।’

বলেই সায়েনকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো সে। সায়েনের হাতের আঙুলের ভাজে নিজের হাতের আঙ্গুল গলিয়ে দিয়ে বলল,’তুমি ছাড়া আমার জীবনে কাউকে আমি জায়গা দিতে পারিনি সায়েন। সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আমার ভাগ্যে রেখেছিল বলেই আমার মনে অন্য কাউকে জায়গা করতে দেননি।’

মুচকি হেসে আরাদকে জড়িয়ে নিলো সায়েন। দুজনে নানা কথায় সময় কাটাতে লাগলো। হাসি মজা দুষ্টুমির মধ্যে দিয়েই সময় কেটে গেল। সায়েন ঘুমিয়ে পড়েছে আরাদের হাতের উপর মাথা রেখেই। ঘুম ভাঙল চোখে সূর্যের আলোকরশ্মি পড়তে। চোখ মেলে সায়েন এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে গাড়ির ছাদেই আবিষ্কার করলো। আরাদ ওভাবেই ঘুমিয়ে আছে। ধড়ফড়িয়ে উঠলো সায়েন। আরাদকে ঠেলে ওঠালো। সকাল হয়ে গেছে এখন ও ওরা বাড়িতে ফেরেনি। সবাই জানলে কি হবে????

#চলবে,,,,,,