#চিলেকোঠার_প্রেম
#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)
#পর্ব_৩৭
বাতাসের তীব্রতার সাথে সাথে ভয়টা বাড়ছে সায়েনের। আজকে বাড়িতে ফিরে কি দেখবে কে জানে??বেলাও গড়িয়েছে তা সূর্যের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেছে সায়েন। জানালা দিয়ে দূরন্ত বাতাস বারবার ছুঁইয়ে দিচ্ছে সায়েনকে যা সায়েনের অসহ্য লাগছে খুব। ওদিকে আরাদের কোন ভাবান্তর নেই। একহাত বারবার মুখের সামনে নিয়ে হাই তুলছে যার অর্থ বোঝায় আরাদের ঘুমে পোষায়নি। তবে সায়েনের চিন্তিত মুখ দেখে বারবার হাসছেও সে। বিরক্ত হয়ে আরাদের বাহুতে কিল বসিয়ে দিল সায়েন বলল,’হাসছেন কেন এভাবে??আমি ঘুমিয়ে পড়েছি বলে আপনিও ঘুমিয়ে পড়বেন??’
‘আমি তো জেগেই ছিলাম। তোমাকে দেখেছি, কিন্তু আর কতক্ষন জেগে থাকা সম্ভব বলো। তাই আমিও ঘুমিয়ে পড়েছি।’
‘আশ্চর্য!! আপনি তখন আমাকে ডেকে তুললেন না কেন??’
‘তোমাকে দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না তাই আর ডাকিনি।’
‘মাফ চাই আপনার কাছে। কথায় পারবো না কোনদিন।’
সায়েন মুখ ঘোরালো আরাদ শব্দ করেই হাসতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছে গেল ওরা। সায়েন গাড়ি থেকে নেমে কোন দিকে না তাকিয়েই সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। শাড়ির আঁচলটা টেনে পিঠ গলিয়ে সামনে এনে হাঁটতে লাগলো। আরাদ ওর পিছু পিছু যাচ্ছে। হঠাৎ করেই ইমজাদ ওয়াহেদের সামনে পড়ে গেল সায়েন। ভয়ে সে জমে গেছে। এখন আবার কি বলবে তা ভেবে পাচ্ছে না সায়েন। পিছন ফিরে আরাদের দিকে তাকালো সে। ইশারায় আরাদ মাথায় ঘোমটা দিয়ে দিতে বলে মুচকি হাসলো। ভ্রু কুচকালো সায়েন,তবে প্রতুত্যরে কিছু না বলে ঘোমটা টেনে সামনে ফিরে তাকালো। ইমজাদ ওয়াহেদ হাসলেন, পরম আদরে সায়েনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,’ভালো আছো?? সবসময় চিলেকোঠার ঘরে বসে থাকবে না। নিচে এসে আমাদের সাথে সময় কাটাবে দেখবে ভালো লাগবে।’
অবাক হলো সায়েন। হেসে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলল। চলে গেলেন ইমজাদ ওয়াহেদ। সায়েন এখনও থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরাদ ওর কাছে এসে বলল,’মা আসছে দেখে ফেলার আগে ভাগো!!!’
ব্যস সায়েনকে আর পায় কে??দুহাতে শাড়ি একটু উঁচু করে তুলে ধরে দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে গেল। সায়েনের এভাবে চলে যাওয়া দেখে হাসতে লাগলো আরাদ। আগের থেকে আরো বেশি ভিতু হয়ে গেছে সায়েন। আগে ওর মা’কে ভয় পেতো আর এখন আরাদের মা’কে।
চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে বড় একটা শ্বাস ফেলে সায়েন। আজকে বড় বাঁচা বেঁচে গেছে ও। আরাদের মা’কে খুব ভয় পায় ও। কিন্তু কেন তা জানে না। সায়েন তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নিলো। ব্রেকফাস্ট শেষ করে আরশি আর তনয়ার সাথে ভার্সিটিতে চলে গেল। তবে আজকে ওরা কেউ ইফতির দেখা পেল না। তনয়া বারবার গেইটের দিকে তাকিয়ে ইফতির অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ইফতি এলো না। মন খারাপ করেই সে ক্লাসে চলে গেল। ক্লাস শেষে তিনজনেই বের হলো। গাড়িতে বসার জন্য তনয়া যেই না দরজায় হাত দিয়েছে অমনি একটা হাত এসে ওর হাত ধরলো। চকিতে তাকাতেই ইফতির হাসিমুখটা দেখলো সে। মুহূর্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল তনয়ার।
‘আজকে কোথায় ছিলেন? সকালে তো দেখলাম না?’
তনয়ার কথা সম্পূর্ণ এড়িয়েই ইফতি বলল, ‘আরশি কোথায়??পুলিশ আসছে এদিকে।’
হা হয়ে গেল তনয়া। ছেলেটাকে পেয়েছে কিসে? সবসময় আরশি আর আকাশকে নিয়ে পড়ে থাকে?
‘তো কি হয়েছে??’
‘কি হয়েছে মানে?আরশি কোথায় ডাকো?’
‘গাড়িতে বসেছে।’
ইফতি গিয়ে আরশিকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে। বিরক্ত হয়ে গেল আরশি। বলল,’একি আমাকে টানছেন কেন??’
‘আমাদের তো সিনেমা দেখার কথা ছিল তাই না??চলো চলো সিনেমা দেখতে যাই।’
আরশি এবার অবাক না হয়ে পারলো না। সে বলল,’উফফ আমি কি বলেছি যে আমি সিনেমা দেখতে যাবো??আমি যাব না।’
‘তুমি না গেলে তো হবে না। তোমার পুলিশ বাবু দেখতে আসছে যে তুমি এখন কোথায়??’
‘আমি পারব না যেতে আপনি বরং তনয়াকে নিয়ে যান আপনার বাইকে বসিয়ে। আর হ্যা মাথায় হেলমেট পরাবেন যাতে আকাশ ভাইয়া বুঝতে না পারে যে ওইটা তনয়া আমি না। প্লিজ আমি যাব না। মাথাটা ভিশন ব্যথা করছে।’
ইফতি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,’ওকে ওকে। কিন্তু যদি ধরা পরে যাই??’
আরশি গিয়ে নিজের ওড়না তনয়াকে দিলো আর তনয়ার ওড়না ও নিলো বলল,’এইবার চিনতে পারবে না।’
তনয়া ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ও কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইফতি মৃদু চেঁচিয়ে বলে উঠলো,’আরে তাড়াতাড়ি করো ওই যে পুলিশ বেটা চলে এসেছে।’
আরশি তড়িঘড়ি করে তনয়ার মাথায় হেলমেট পরিয়ে দিলো। আর নিজে গিয়ে গাড়িতে সায়েনের পাশে বসে পড়লো। ইফতি বাইক স্টার্ট দিয়ে বের হলো আকাশের সামনে দিয়ে। আকাশ অবাক হয়ে সেদিকে তাকালো। খয়েরি রঙের ওড়নাটা ওর চেনা চেনা লাগছে। এটা তো কয়েকদিন আগেও সে আরশির গায়ে দেখেছে। তারমানে আরশি ইফতির সাথে সত্যি সত্যি সিনেমা দেখতে যাচ্ছে। কালকে থ্রেট দেওয়ার পরেও আরশি ইফতির সাথে যাচ্ছে। আকাশ ইফতির বাইকের পিছু নিলো। আজকে দুটোকে ধরে আচ্ছামতো ধোলাই দেবে সে। আর ইফতিকে জেলে নেওয়ার নতুন চেষ্টা করছে আকাশ। কিন্তু এখন ওকে কোন বারে বা ক্লাবে দেখাই যায় না। প্রমাণ তো দূরের কথা।
বাইকের আয়নায় আকাশকে স্পষ্ট দেখছে ইফতি। মনে মনে সে বলতে লাগল,’মিস্টার আকাশ!!অনেক দৌড় করিয়েছো আমাকে এবার তোমার পালা। দৌড়াও,দেখি কতো দৌড়াতে পারো তুমি?এই ইফতির পিছনে লাগা তোমার মতো পুলিশের কাম্য নয়।’
হাসলো ইফতি। তনয়া ওর কাঁধে হাত রেখে বসে আছে। মাঝেমধ্যে পিছন ফিরে আকাশকে দেখে নিচ্ছে সে।
‘আকাশ ভাইয়া তো পিছু নিয়েছে এবার কি করবেন??’
‘আসতে দাও। দেখি কত দৌড়াতে পারে সে আজকে। এভাবে প্রতিদিন দৌড়ালে ওনার চাকরি যাবে আমি নিশ্চিত।’
বলেই হাসলো ইফতি সাথে তনয়াও। কিন্তু আকাশ তো রেগে ফেটে যাচ্ছে। একটু পরেই ওরা সিনেমা হলের সামনে আসলো। দু’জনেই বাইক থেকে নেমে পড়লো। তনয়া ওড়না দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে নিলো। ইফতি শক্ত করে চেপে ধরল তনয়ার হাত। এক প্রকার টেনে নিয়ে গেল হলের ভেতরে। ওদের জন্য বরাদ্দ সিটে গিয়ে বসলো। আগে থেকেই টিকিট কেটে রেখেছিল সে। কিন্তু সিনেমা দেখার কথা দু’জনেই বেমালুম ভুলে গেছে। ওদের দৃষ্টি আকাশের দিকে। আকাশ এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে ওদের খুঁজে যাচ্ছে। পুলিশ বিধায় ওকে হলে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। ইফতি তনয়া মাথা নিচু করে বসে আছে। আকাশ ওদের সিট পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। হলরুম অন্ধকার থাকায় কারো মুখই স্পষ্ট নয়। ফলে আকাশ চিনতেও পারছে না। সামনে এগিয়ে যেতেই ইফতি তনয়ার হাত ধরে উঠে পড়লো। এক দৌড়ে বের হয়ে গেল হল থেকে। তনয়া কিছুই বলতে পারছেনা। সে শুধু ইফতির কান্ড দেখছে। মাঝেমাঝে মুচকি হাসছেও। ছেলেটার সাথে তো ক’দিন আগেই কতো ঝড়গা হলো অথচ আজ সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তবে তনয়ার ক্ষেত্রে তা অন্যরকম। সে ইফতিকে বন্ধু ভাবে না তার থেকে বেশি কিছু ভাবে। কিন্তু সেটা কেমন সম্পর্ক তা জানা নেই। ও শুধু জানে ইফতিকে ওর ভালো লাগে।
আকাশের বুক চিড়ে বৃষ্টির বড়বড় ফোঁটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে ওদের। ভালোই লাগছে হঠাৎ বৃষ্টি আসায়। একহাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরে সে ইফতিকে। এতে অপ্রস্তুত হয়ে যায় ইফতি। ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক দেখে নেয় তনয়াকে। তনয়া গগন পানে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। ইফতি কিছু বলল না। তনয়ার বাড়ির সামনে বাইক থামায়। তনয়া তখন শীতে কাঁপছিল। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে তনয়ার ভেতরে। তাই সে দেরি না করেই দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। ইফতি আর দেরি করলো না কারণ আকাশ ওর পিছু নিয়েছে। তাই সে আকাশের চোখে ধুলো দিয়ে কেটে পড়লো।
____________
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে সায়েন আর তনয়া।আরশি গালে হাত দিয়ে ওদের হাসি দেখতেছে। আজকে আকাশ বেচারাকে বেশ ঘুরিয়েছে ওরা। তনয়া বলছে আর হাসছে। অবশেষে হাসি থামিয়ে সে বলল,’আকাশ ভাইয়া যে আরশির প্রতি সিরিয়াস সেটা আমি বেশ বুঝে গেছি। নাহলে এভাবে বেচারা দৌড়াতো না। আর ইফতি তো খুব ভালো রাইডার। কৌশলে বাইক চালিয়ে আকাশ ভাইয়াকে পল্টি দিয়ে দিলো আমি তো ভাবতেই পারছিলাম না। এবার না সোজা বিয়ের প্রপোজাল করে বসে??’
মলিন হেসে আরশি বলল,’ভাইয়া কি আদৌ মেনে নেবে??তুই খুব ভালো করেই জানিস যে,,,’
আরশির হাত চেপে ধরলো তনয়া। বারবার বলা সত্ত্বেও সে সায়েনের সামনে মুখ খুলেই ফেলে। তবে সায়েন বুঝলো না ওর কথার মানে সে বলে উঠলো,’আমার মনে হয় তোমার ভাইয়া বুঝবে। কারণ ভালোবাসা হারানোর কষ্টটা সে বোঝে। দীর্ঘদিন ধরে সে কষ্টে ভুগেছে তাহলে তোমার কষ্টটা সে অবশ্যই বুঝবে আরশি। তুমি শুধু বলে দেখো।’
কথাটা সায়েন আরশির হাতের উপর হাত রেখেই বলে। জলভরা চোখে আরশি সায়েনের দিকে তাকালো। কোন দিকে যাবে ও নিজেই বুঝতে পারছে না। আকাশ কি আদৌ কখনো ওকে ভালোবাসবে?নাকি এইভাবে দূরে সরে থাকবে??বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হলো আরশির। মেসেজ টোনে ফোনের দিকে তাকালো। আরাদের মেসেজ। এখন সায়েনকে যেতে হবে। রাতটা বেশি হয়ে গেছে। এমনিতেই আরাদের সাথে বেশি সময় কাটাতে সে পারে না। তাই সে বাহানায় উঠে চলে গেল।
চিলেকোঠার ঘরে পা রাখতেই গানের সুর ভেসে আসলো। কিন্তু গলাটা আরাদের নয় ফোনে গান চালিয়ে শুয়ে আছে আরাদ। সায়েনকে দেখেই গান বন্ধ করে দিলো সে। সায়েন এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। বইখাতা গুছিয়ে রেখে এগিয়ে গেল ড্রেসিং টেবিলের দিকে। তবে যেতে অক্ষম হলো সে। আরাদ তার আগেই ওর ওড়না টেনে ধরেছে। সায়েন পিছনে ঘুরতেই ইশারায় কাছে আসতে বলে সে। বিনা দ্বিধায় ধীরপায়ে এগিয়ে এসে খাটের উপর বসলো সে। আরাদ ওর হাত টেনে নিজের পাশে শুইয়ে দিলো। কাত হয়ে সায়েনের দিকে ফিরে তাকালো।
‘তুমি খুব খারাপ সায়েন। আমাকে এতো অপেক্ষা করাও কেন বলোতো??এই মন আর অপেক্ষা মানছে না।’
সায়েন প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,’আমি কোথায় অপেক্ষা করালাম??পড়তে গিয়েছিলাম এতেও কি দোষ??’
হাসলো আরাদ,সায়েনকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে নাকে আলতো করে চুমু এঁকে দিয়ে বলল,’উহু তোমার কোন দোষ নেই সব দোষ আমার। তোমাকে এখনও সবার সামনে আনতেই পারলাম না। আগে কেসটা সামলাই তারপর সব হবে।’
‘আচ্ছা সামিউক্তা আর ওর ভাইয়ের কি হলো? ওরা কি ছাড়া পেয়েছে?’
‘নাহ,এতো তাড়াতাড়ি? ওদের সাজা না পাওয়া পর্যন্ত জেলেই থাকতে হবে বুঝেছো? আমার এইসব সুন্দর মুহূর্তে ওদের ডেকে এনো না।’
আরাদের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল ওকে। সায়েন উঠে বসে চুলগুলো হাতখোপা করতে ব্যস্ত হয়ে বলে,’সুন্দর মুহূর্ত পকেটে রাখুন। আমার ইন্টারেস্ট নাই।’
কথা শেষ হতেই সায়েনকে আবারও টেনে বিছানার উপর ফেলে হাত দুটো চেপে ধরে আরাদ।
‘কিন্তু আমার ইন্টারেস্ট আছে। তোমার এখন না থাকলেও পরে হয়ে যাবে।’
‘হবে না ছাড়ুন আমার হাত।’
আরাদ হাত ছাড়লো না। তার বদলে আরো শক্ত করে চেপে ধরে ওর হাত। ছোটাছুটি করে কোন লাভ হবে না তাই সায়েন ছোটার চেষ্টাও করলো না। আরাদ সায়েনকে জড়িয়ে রেখেই বলল,’ভালোবাসো??’
‘হঠাৎ এই প্রশ্ন??’
‘সেদিনের পর তো আর বললে না। শুধু আমিই বলে গেলাম ভালোবাসি।’
সায়েন এবার নিজেই জড়িয়ে ধরলো আরাদকে। বুকে মুখে গুঁজে সে বলল, ‘ভালোবাসি,এই কথাটাতেই যে শুধু ভালোবাসা থাকে তা নয়। ভালোবাসি কথাটা সবাই বলে কিন্তু ভালো রাখতে কি সবাই পারে? কখনোই না। ভালোবাসি কথাটাতে ভালোবাসা প্রকাশ হয় না। ছোট ছোট কেয়ার গুলোতে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে তা মনচক্ষু দিয়ে দেখতে হয়। আর আমার মনে হয় না যে আপনি দেখেননি আমার ভালোবাসা। কিন্তু তবুও বলছি খুব ভালোবাসি আপনাকে। ছেড়ে থাকা অসম্ভব। আমি হারাতে চাই না আপনাকে।’
কথা শেষেই আরাদেল ওষ্ঠজোড়া গভীর ভাবে স্পর্শ করলো সায়েনের কোমল ওষ্ঠে। মুখ তুলে আরাদ শুধায়,’আর হারাতে দেব না তোমাকে। কখনোই না, এইভাবে সারাজীবন আঁকড়ে ধরে রাখব। তুমি শুধু আমার হাতটা ধরে রেখো এতেই হবে। আমাকে প্লিজ ভুল বুঝো না। কোন কথা তোমার কানে আসলে সর্বপ্রথম আমাকে জিজ্ঞেস করবে তুমি। কারণ যত প্রশ্ন করবে তত উওর পাবে। আর ভুল বোঝাবুঝি তত তাড়াতাড়ি মিটবে। আমি চাই না তুমি আর আমাকে ভুল বুঝো।’
আরাদের আঙ্গুলের ভাজে নিজের আঙ্গুল ডুবিয়ে দিলে উঁচু হয়ে আরাদের কপালে গভীর চুম্বন করে মুচকি হাসলো। তারপর সপ্তবর্ণে জড়িয়ে নিলো নিজের প্রিয় মানুষটিকে। বেঁধে নিলো নিজের বাঁধনে যে বাঁধন কখনো ছেঁড়া অসম্ভব।
#চলবে,,,,,,,,,,,
#চিলেকোঠার_প্রেম
#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)
#পর্ব_৩৮
সকালের সূর্যের রশ্মি চোখে পড়তেই ঘুমটা হালকা হয়ে গেল সায়েনের। কাটার মতো বিঁধছে এই রশ্মি। কাচের দেয়াল ভেদ করে আলো এসে ঢুকছে। কালকে পর্দাগুলো টেনে দেওয়া হয়নি। এই জন্যই আলো এসে ঢুকছে।
ওপাশ ফিরে গায়ের চাদরটা আরো ভালোভাবে জড়িয়ে নিলো। কিন্তু কিছু একটা ভেবে সে তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে তাকালো। আরাদ এখনও ঘুমাচ্ছে। হকচকিয়ে উঠে বসলো সায়েন। আরাদ এখনও নিজের রুমে যায়নি!! এদিকে তো সকাল হয়ে গেল। আরাদকে জাগাতে গিয়েও জাগালো না। নিষ্পাপ শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে। মুচকি হেসে আরাদের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে উঠে পড়লো সে।
ফ্রেশ হয়ে এসে আরাদকে দেখলো না। তারমানে আরাদ চলে গেছে। খাটের উপর বসে পড়লো সায়েন। আরাদ একদম অন্যরকম। হুটহাট করে আসে আবার হুটহাট করে চলে যায়। সায়েন ঠিক করলো আজকে আর ভার্সিটিতে যাবে না। ভালো লাগছে না আজকে। তাই সে তনয়া কে ফোন করে জানিয়ে দিলো।
ইমজাদ ওয়াহেদের কথামতো আজকে সায়েন চিলেকোঠার ঘর থেকে বের হলো। ওড়নাটা মাথায় ভালো করে টেনে দিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো। সায়েন জানে আরাদ অফিসে চলে গেছে। বাড়িতে এখন আরাদের কাকিমনি মা আর কাজের লোক ছাড়া কেউ নেই। তাই একটু ভয় হচ্ছে সায়েনের। নিচে নেমে এসে সে কাউকেই দেখতে পেল না। সে এগিয়ে গেল ডাইনিংয়ের দিকে। খুব সুন্দর দেখতে কাঁচের টেবিলটা। মাঝখানে একটু উঁচু সেখানে খাবারের বাটিগুলো রাখা হয় আর নিচু অংশে প্লেট সাজানো। সায়েন টেবিলে হাত বুলিয়ে একটা স্পুন হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো।
‘এই মেয়ে তুমি এখানে কি করো??’
ভয়ে যেন বিদ্যুৎ বয়ে গেল সায়েনের সারা শরীরে। হাত থেকে স্পুনটাও পড়ে গেল। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল হাসি বেগম দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে সায়েনের দিকে। সায়েন দ্রুত স্পুন তুলে আগের জায়গায় রেখে দিলো। হাসি বেগম এগিয়ে এসে সায়েনের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘তুমি চিলেকোঠার ঘর থেকে এখানে কেন এসেছো??’
সায়েন আমতা আমতা করে বলল,’আ আঙ্কেল বলেছে আমি যাতে চিলেকোঠার ঘরে বসে না থাকি। বাইরে বের হলে ভালো লাগবে তাই,,,,’
‘তাই তুমি এইখানে এসে ঘুরঘুর করছো??’
সায়েন মাথা নিচু করে ফেলল। হাসি বেগম কিছুক্ষণ সায়েনকে ভালো করে পরখ করে দেখে বলে,’এসেছো যখন চলো রান্নাঘরে। আমাকে সাহায্য করবে। বসে বসে শরীরে মরচে ধরে যাবে। চলো,,,’
হাসি বেগম রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায়। সায়েন ও পিছু পিছু যায়। যদিও সে রান্না করতে পারে না তবুও। হাসি বেগম সবজি ধরিয়ে দিলেন। বললেন কাটতে,সায়েন ছুরিটা হাতে নিলো। একটা বেগুন হাতে নিয়ে ঘোরাতে লাগলো। কিভাবে কাটবে তা ভেবেই পাচ্ছে না সায়েন। হাসি বেগম তা খেয়াল করে বললেন,’কি হলো?? বেগুন কাটতে জানো না??’
সায়েন মাথা নাড়িয়ে বলে,’আমি রান্না করতে পারি না। আসলে মা কখনো আমাকে রান্নাঘরে যেতে দেয়নি।’
‘বুঝেছি একমাত্র মেয়ে বলে শুধু খাওয়াতেই শিখিয়েছে। অবশ্য তোমাকে কি দোষ দেবো?আমিও তো আমার মেয়েকে কিছুই করতে দেই না। শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে কি করবে কে জানে??’
সায়েনের হাত থেকে ছুরি টেনে নিয়ে তিনি বেগুন কাটতে লাগলেন আর সায়েন মন দিয়ে দেখছে। হাসি বেগম আবারো বললেন,’সবজি কাটতে জানো না অথচ একজনের গলায় ছুরি চালিয়ে দিলে!!অবাক কান্ড!!’
থমকে গেল সায়েন। তবে কোন কথা বলল না। চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইল সে। অতীত সম্পর্কে সে আগাবে না কিছুতেই না। তাই হাসি বেগমের কথার পিঠে জবাব দিলো না।
‘শুনেছি তোমার মাও নাকি সেদিন মারা গিয়েছে?? কিভাবে তা তো জানি না?? কিভাবে কি হলো??’
বারকয়েক চোখের পলক ফেলে চোখের পানি আটকালো সায়েন। হালকা হেসে বলল,’মাকে বাঁচাতে গিয়েই তো এক্সিডেন্টটা ঘটলো। কিন্তু তারপরও তো মা’কে বাঁচাতে পারলাম না।’
‘ওহহহ!! খারাপ ছিল বুঝি ছেলেটা??’
‘হুম,ড্রাগস্ সহ আরো বাজে নেশা করতো। আমি প্রথমে জানতাম না। পরে জানতে পারি খারাপ ব্যবসাও করে সে।’
হাসি বেগম আর কিছু বললেন না। চুপচাপ রান্নায় মন দিলেন। সায়েনের স্থানে এই মুহূর্তে তিনি তনয়াকে রেখে ভাবছেন। তার মেয়ে হলে তিনিও পজেটিভ চিন্তা করতেন অথচ পরের মেয়ে বলে যতসব উল্টাপাল্টা কথা মাথায় আসে তার। তিনি সায়েনকে সুন্দর করে রান্না শিখিয়ে দিলেন। হাসি বেগমের এরকম ব্যবহারে অবাক হলো সায়েন। প্রথম দিন উনিও সায়েনের এখানে থাকা নিয়ে অমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু এখন সময়ের সাথে সাথে তিনিও সবটা মানিয়ে নিতে শিখেছেন। রান্না শেষ করে সায়েন আর হাসি বেগম টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন।
‘কাকিমনি!!!’
সায়েনের ডাকে চকিতে তাকালেন হাসি বেগম। সায়েনের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেও পারলো না। ভাবলো মেয়েটার মুখে কাকিমনি ডাকটা বেশ মানিয়েছে তাই তিনি হেসে বললেন,’হুম বলো??’
‘দুপুরে বোধহয় কেউই বাড়িতে খায় না। আন্টি কোথায় উনি খাবেন না??’
‘আরাদের মায়ের কথা বলছো??’
সায়েন মাথা নাড়তেই তিনি বললেন,’ভাবির শরীর টা একটু খারাপ রুমে শুয়ে আছে।’
সায়েন চট জলদি জবাব দিলো,’আমি গিয়ে দেখে আসি??’
হাসি বেগম ছোট ছোট চোখে তাকাতেই সায়েন নিচু গলায় বলে,’না ম মানে,,,,।’
‘গিয়ে দেখো!!যদি শরীর বেশি খারাপ থাকে তাহলে খাবার রুমে দিয়ে এসো।’
মাথা নেড়ে সায়েন নিলিমা বেগমের রুমে গেলো। গায়ে চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছেন নিলিমা বেগম। সায়েন জড়তা কাটিয়ে ডাকলো নিলিমা বেগমকে কিন্তু তিনি সাড়া দিলেন না। হাল্কা কাঁপছে নিলিমা বেগম। নিলিমা বেগমের কপালে হাত রেখে চমকে ওঠে সায়েন। ভিশন জ্বর ওনার। দ্রুত কথাটা হাসি বেগমকে বললো সায়েন। বাড়িতে কেউ নেই। দু’জনই মেয়ে,কি করবে তা কেউ ভেবে পাচ্ছে না। সায়েন কয়েকবার আরাদকে ফোন করলো কিন্তু রিসিভ করলো না। হয়তো কাজে ব্যস্ত আছে। তাই সে তামিমকে কল করে ডক্টর আনতে বলে। বন্ধুদের সাথে ঘোরাফেরা আড্ডা দেওয়া ছাড়া তো তামিমের কোন কাজই নেই। তাই তামিম ডক্টর নিয়ে আসে। ডক্টর চেকআপ করে ওষুধ লিখে দিয়ে যায়। হঠাৎ করেই জ্বর এসেছে তাই সবাই একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ডক্টর চিন্তা করতে বারণ করেছে।
সন্ধ্যায় ইমজাদ ওয়াহেদ বাড়িতে আসলেন। আজকে সায়েন চিলেকোঠার ঘরে যায়নি। শুধু গোসল করার সময় গিয়েছিল। হাসি বেগমের সাথে ঘুরঘুর করেছে সে। হাসি বেগম স্যুপ বানিয়ে সায়েনকে দিয়ে পাঠালো। নিলিমা বেগম খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে। আগের থেকে শরীরটা একটু ভালো লাগছে ওনার। ইমজাদ সাহেব চেয়ারে বসে নিলিমা বেগমের সাথে কথা বলছেন। সায়েনকে আসতে দেখে তিনি হাসলেন। টি টেবিলের উপর স্যুপের বাটিটা রেখে নিলিমা বেগমকে খেতে বলল। ইমজাদ সাহেব বললেন,’তুমি বানিয়েছো??’
‘নাহ,কাকিমনি বানিয়ে দিয়েছে। আমি রান্না করতে পারি না।’
‘ওহ!!তো কি পারো??’
সায়েন মৃদু হেসে বলে,’চা কফি বানাতে পারি। নুডুলস পাস্তা আরর,,,’
‘থাক আর বলা লাগবেনা। তুমি বরং আমার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসো। নতুন স্বাদ কেমন হয় দেখি??’
সায়েন মাথা নেড়ে প্রস্থান করলো। সায়েন চলে যেতেই ইমজাদ সাহেব নিলিমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলেন,’মেয়েটাকে খারাপ ভেবো না। আসলেই মেয়েটা কি খারাপ??মা হারিয়ে অনেক কষ্ট পেয়েছে সেই। মা হয়ে তুমি অন্তত এটুকু বোঝো?? ফুলের মতো নরম মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলো না।’
বিনিময়ে নিলিমা বেগম কোন কথা না বলে স্যুপ খাওয়ায় মন দিলো। সায়েন চা বানিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হতেই দেখলো আরাদ সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। সায়েনের মুখে হাসি ফুটলো। চায়ের কাপ দ্রুত ইমজাদ সাহেবকে দিয়ে বের হয়ে এলো। কয়েক সিঁড়ি উঠতেই দেখলো আরশি ভয়ার্ত মুখে আরাদের রুমে যাচ্ছে। একটু দাঁড়িয়ে থেকে সায়েন তনয়ার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে হয়ে কি??তনয়াকেও ভয় পেতে দেখা যাচ্ছে। সে কম্পিত কন্ঠে বলল,’আজকে ইফতির সাথে আবার আকাশ ভাইয়ার ঝগড়া হয়েছে। আমাদের সামনেই। শয়তান ছেলেটা কি বলেছে জানো?? আকাশ ভাইয়াকে বলেছে যে ও নাকি দুদিনের মধ্যেই বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে। এটা যে ডাহা মিথ্যা কথা সেটা তো আমরা জানি কিন্তু আকাশ ভাইয়া তো জানে না। উনি বারবার বলছে ইফতি ছেলেটা নাকি ভালো না। এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছে আজকে। আকাশ ভাইয়া মনে হয় ভাইয়াকে সব বলে দিয়েছে। ভাইয়া আরশিকে নিজের রুমে ডেকেছে। না জানি আজকে আরশির কি হয়??’
‘ইফতি ওদের ভালো করতে গিয়ে খারাপ করে দিলো না তো??’
দু’জনে বসে গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে পড়লো আর আরশির অপেক্ষা করতে লাগলো। কিছুক্ষণ বাদেই আরশি ফিরে এলো। তনয়া ভেবেছিল আরশি কাঁদতে কাঁদতে আসবে কিন্তু হলো তার উল্টো। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রুমে এলো সে। এদিক ওদিক পায়চারি করছে আর হাত কচলাচ্ছে সে। সায়েন চেয়ে চেয়ে দেখেছে আরশিকে। শেষে অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেই বসে,’কি হয়েছে আরশি? এমন করছো কেন তুমি?? তোমার ভাইয়া কি বলেছে?’
রাগে গমগম করে আরশি বলে,’সাহস কত বড় এর মধ্যেই বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দিলো?’
তনয়া দাঁড়িয়ে পড়লো অবাক কন্ঠে বলল, ‘তার মানে ইফতি সত্যি সত্যি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে??’
আরশি দাঁড়িয়ে গেল বলল,’ইফতি পাঠাবে কেন??পাঠিয়েছে ওই পুলিশ।’
তনয়ার কিছু পল চুপ করে থেকে চিৎকার দিয়ে আরশিকে জড়িয়ে ধরে বলল,’জাদু!!তুই রাগ করছিস কেন?এর থেকে খুশির খবর তো আর হয়ই না।’
ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে দিলো তনয়াকে আরশি। রেগেই বলল,’ওনার এই দয়া আমার চাই না। আমি এখুনি যাব ওনার সাথে দেখা করতে। আজকে তো ওনাকে ছাড়বোই না।’
পার্স হাতে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো আরশি। তনয়া বাঁধা দিতে গেলে সায়েন ওকে আটকে দেয়। আজকে দুজনের একান্ত কথা বলা উচিত। কিন্তু তনয়ার একটু সন্দেহ হলো। সবটা জানা সত্ত্বেও আরাদ এসব মেনে নিলো কিভাবে??
________________
ইফতির সাথে ঝামেলা করার পর আর ডিউটিতে যায়নি আকাশ। ফ্ল্যাটে চলে আসে। চারতলায় থাকে সে। একাই থাকে, পুলিশের চাকরি সুবাদে পোস্টিং চেঞ্জ হওয়ায় পরিবার থেকে দূরে সে। তাই একাই থাকতে হয়। রান্নাঘরে সে কফি বানাতে ঢুকেছে মাত্র। চুলায় পানি বসাতেই কলিং বেল বেজে উঠল। এসময় কে আসতে পারে তার কোন ধারণা নেই আকাশের। টাউজার পরা আর খালি গায়ে সে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে শার্ট গায়ে জড়িয়ে নিলো। বোতাম লাগাতে লাগাতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। এখনও দুটো বোতাম লাগানো বাকি। দরজা খুলে সে বোতাম লাগাতে লাগাতে সামনে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল সে। এসময় আরশিকে সে মোটেও আশা করেনি। আরশি ভেতরে ঢুকলো আকাশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে,’তুমি এই রাতের বেলা??’
‘আপনি আসতে বাধ্য করলেন। সমস্যা কি আপনার??’
টাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ উওর দিলো,’কই কোন সমস্যা নেই তো??’
‘মিথ্যা বলছেন কেন?? ভাইয়ার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন কেন??’
‘তোমার মোটা মাথায় সেটা ঢুকবে না। কতবার বলেছি ইফতি ছেলেটা ভালো না। কতো বুঝিয়েছি তবুও মানলে না। তোমার ভালোর জন্য আমি এটা করলাম।’
রাগে চোখে জল এসে গেছে আরশির। দয়া সে একদম পছন্দ করে না। সে বলল,’দয়া করছেন আমাকে?কে বলেছে আমার ভালো করতে?ইফতি ভালো হোক আর খারাপ হোক তাতে আপনার কি?সে অন্তত ভালোবাসতে জানে।’
‘আর আমি??’
আরশি থেমে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ ভেবেই সে বলল,’পারবেন ভালোবাসতে??পারবেন না!! আপনার থেকে তা আশা করাই যায় না কারণ আপনি তো,,,’
‘অতীত টানবে না আমি তোমাকে সব বলেই দিয়েছি। আরাদকেও সব বলেছি। সেজন্যই আরাদ রাজি হয়েছে।’
‘তাতে কি হয়েছে আমি তো রাজি না। এই বিয়েটা হলে আপনি আমি কেউ সুখি হবো না। তাহলে বিয়ে করে কি লাভ।’
আকাশ দুকদম এগিয়ে গেল আরশির দিকে।তর্জনি আঙ্গুল দিয়ে আরশির চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,’আমি তোমাকে সুখে রাখার চেষ্টা করব না। আমি সুখে রাখব তোমাকে। আর রইলো ভালোবাসার কথা। ভালোবাসতে সবাই পারে কিন্তু ভালো রাখতে সবাই পারে না। আমি না হয় তোমাকে ভালো রাখব। ভালোবাসতে একটু সময় লাগবে। এতো দিন আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছো আর এইটুকু সময় অপেক্ষা করতে পারবে না??’
ছলছল নয়নে আকাশের দিকে তাকালো আরশি। এরপর সে কি বলবে তা জানে না। সোফায় বসে মাথা ধরে চোখের পানি ফেলছে সে। কিছুক্ষণ পর আরশি ওর পাশে কারো অস্তিত্বের টের পেলো তবে ঘুরে তাকালো না।
সায়েনের অস্থির লাগছে খুব। আরশি তো এখনো আসছে না। ওদিকে কি হচ্ছে তাও বুঝতে পারছে না। চিলেকোঠার ঘরে সে বসে আছে। কবিতা আজকে আসেনি। ওর ছেলের শরীর খারাপ। খাওয়ার কথা সে ভুলেই গেছে। রুমে বসে বসে দাঁতে নখ কাটছে সে। আরাদ যে কখন এসেছে তা সায়েন টেরও পায়নি।
‘মিস ভাবুক কুমারী। আপনার ভাবনা শেষ হলে এই প্রজাকে একটু সময় দিবেন কি??’
সায়েন চমকে তাকালো আরাদের দিকে বলল,’আপনি কখন এসেছেন??’
‘সাত মিনিট চল্লিশ সেকেন্ড যাবত খাবার এনে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু তোমার কোন পাত্তা নেই। কি ভাবছো??’
‘কিছু না!!’
আরাদ সায়েনের পাশে বসে বলল,’ঘোর অপরাধ করেছো তুমি। এজন্য কি শাস্তি দেওয়া যায় তোমাকে??’
কাঁদো কাঁদো ফেসে সায়েন আরাদের দিকে তাকালো। এই ছেলেটা কি শাস্তি ছাড়া কিছু বোঝে না নাকি?? আবার কি শাড়ি পরিয়ে দেওয়ার মতলব আটছে??সায়েন মনস্থির করে রেখেছে আজকে সে কিছুতেই শাড়ি পরবে না।
#চলবে,,,,,,,,,,