#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৫
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
মাঝে কেটেছে আরো দুটো দিন। আজ শুক্রবার। ছুটির দিন। পিহুকে নিয়ে একটি পার্কে ঘুরতে এসেছে অপরূপা। মেয়েটা কিছুদিন ধরেই বায়না করছিল ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাই আজ সময় করে নিয়েই এসেছে পিহুকে। লুপাকেও বলেছিল, তবে সে এলো না। সে গিয়েছে বোনের সাথে বাপের বাড়ি। লুপার ভাই বিয়ে করেছে, মেহমান আসবে ভাবির বাপের বাড়ি থেকে। তাই লিতি ও লুপাও গিয়েছে। সকাল থেকেই রোদটা বেশ নরম, মিষ্টি একটা বাতাস বইছে চারপাশে। এই সুন্দর আবহাওয়াটাকেই কাজে লাগিয়ে পিহুকে নিয়ে কাছের একটা পার্কে চলে এসেছে অপরূপা। পার্কে ঢুকতেই সবুজ ঘাস, দোলনা, স্লাইড সবকিছু দেখে পিহুর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। কিন্তু সবকিছুর আগে তার নজর আটকাল ছোট্ট একটা শিশুদের ট্রেনে। রঙিন, খেলনার মতো ট্রেনটা ধীরে ধীরে ঘুরছে পুরো পার্ক জুড়ে। উজ্জ্বল হলো পিহুর মুখশ্রী। আঙুল উঠিয়ে ইশারা করে দেখাল অপরূপাকে।
“মাম্মা! মাম্মা! পিহু ওই টেনে উঠবে!”
পিহু লাফাতে লাফাতে অপরূপার হাত টেনে ধরল।
অপরূপা হেসে বলল,
“আচ্ছা, উঠবে। কিন্তু ভয় পাবে না তো আবার?
পিহু চোখ বড় বড় করে তাকাল অপরূপার দিকে। দুদিকে মাথা দুলিয়ে বলল বলল,
“না, পিহু তো ব্রেভ গাল! পিহু এত্তুও ভয় পাবে না।”
“ব্রেভ গাল?”
অপরূপা ভ্রু তুলে হাসলো। পিহু অপরূপার কথায় সাই জানিয়ে উপর নিচ মাথা দুলাল। আধো স্বরে বলল,
“হ্যাঁ! পিহু কুব কুব ব্রেভ!”
অপরূপা হাসলো। মেয়ে যা চাচ্ছে তা-ই বরং হোক। কথা মতো টিকিট কেটে পিহুকে ট্রেনে তুলে দিল অপরূপা। ছোট্ট সিটে বসে দুই হাত দিয়ে বারটা শক্ত করে ধরে আছে পিহু। পিহুকে খুশি দেখাচ্ছে, হাসছে খুশিতে। তবে মায়ের মন তো একটু খুঁত খুঁত করেই। সে পিহুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“শক্ত করে ধরে রেখো কিন্তু।”
পিহু আবারো মাথা দুলাল বাধ্যমেয়ের মতো। মুখে বলল,
“আচ্চা।”
ট্রেনটা চলা শুরু করতেই পিহু খিলখিল করে হেসে উঠল। অপরূপা একটু দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইল বের করে ভিডিও করতে লাগল। ক্যামেরার ওপাশে পিহুর হাসিটা প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে অপরূপার। ট্রেনটা খুব আস্তে আস্তে চলছে। আবারো ঘুরে আসতেই পিহু খুশিতে আত্মহারা হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“মাম্মা! মাম্মা, দেখো! পিহু যাচ্ছে, পিহু একদম ভয় পায় না।”
অপরূপা মেয়ের হাস্যজ্জ্বল মুখটা দেখে নিজেও হাসলো। কোনো জবাব না দিয়ে দেখল মেয়ের হাসিখুশি মুখটা। পিহু পেছনে তাকিয়ে আবারো ডেকে উঠল,
“মাম্মা, তুমিও আসো না।”
অপরূপা হেসেই বলল,
“আমি গেলে তো ট্রেন ভেঙে যাবে, মাম্মা।”
পিহু একটু থেমে ভেবে বলল,
“হুম… তাহলে তুমি চিকন হও!”
অপরূপা এবার জোরে হেসে উঠল।
“এই দুষ্টু! আমি মোটা?”
পিহু গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল,
“না তো, তুমি সুন্দর। আমার মাম্মা সুন্দর।”
এই একটুখানি কথাতেই অপরূপার বুকটা প্রশান্ত হলো। সে ক্যামেরা নামিয়ে শুধু তাকিয়ে রইল মেয়ের দিকে। ট্রেনটা দুই চক্কর ঘুরে থামতেই পিহু দৌড়ে এসে অপরূপার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। “মাম্মা পিহু আবার উতবে।”
“না, আগে একটু বসি। তারপর দেখা যাবে।”
পিহু ঠোঁট উল্টাল। বায়না ধরল আবারো ট্রেনে চড়ার। অপরূপা কোলে তুলে নিল পিহুকে।
“মাম্মার কথা শুনবে না তুমি?”
পিহু উপর নিচ মাথা দুলিয়ে বলল, “শুনব তো। পিহু সব শোনে।”
“হু গুডগার্ল। চলো এবার।”
পার্কের একটা বেঞ্চে বসলো দুজন। পিহু এখনও উত্তেজনায় থামছে না। সে পা দুলিয়ে আশে পাশে নজর বুলাচ্ছে। পরনে তার আকাশী রঙের ফ্রক। চুলে ম্যাচিং হেয়্যারব্যান্ড। পিহু চারদিকটা একবার দরখে অপরূপার দিকে তাকালো। ছোট্ট হাতটা উঠিয়ে হাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে অপরূপার বাহুতে খোঁচা দিতে লাগল।
“মাম্মা, শোনো না।”
অপরূপা ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল মেয়ের দিকে।
“বলো।”
“মাম্মা, আমরা কি কালও আসবো?”
অপরূপা মৃদু হেসে বলল,
“প্রতিদিন আসা যায় না সোনা।”
“কেন?”
“কারণ মাম্মার অফিস আছে।”
পিহু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“অফিস খারাপ।”
“ওমা! অফিস খারাপ কেন?”
“অফিস মাম্মাকে নিয়ে যায়।”
অপরূপা একটু থমকাল। তারপর পিহুর গালে হাত রেখে বলল,
“কিন্তু অফিস না থাকলে পিহুর জন্য চকোলেট কে কিনে দেবে?”
পিহু একটু ভেবে বলল,
“হুম… তাহলে অফিস একটু ভালো।”
অপরূপা হেসে ফেলল। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল তার। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘স্যার’। অপরূপা একটু সোজা হয়ে বসে কল রিসিভ করল।
“হ্যালো স্যার।”
ওপাশ থেকে ভদ্র কণ্ঠ কর্ণকুহর হলো অপরূপার।,
“মিস অপরূপা, আপনার সাথে একটু জরুরি কথা ছিল।”
“জি স্যার, বলুন।”
“আপনার রিকোয়েস্টটা আমরা কনসিডার করেছি। আপনি বাচ্চাকে সাথে নিয়ে জয়েন করতে পারবেন। কোনো সমস্যা নেই।”
অপরূপার চোখ বড় হয়ে গেল। বিস্মিত হলো, একই সাথে খুশিও হলো। পরপর আবারো ভেসে এলো ওপাশ থেকে,
“আরেকটা কথা। আপনার জয়েনিং ডেট আগামী মাসের ১ তারিখ। তবে আপনাকে পঁচিশ তারিখের মধ্যে কুমিল্লায় রিপোর্ট করতে হবে।”
অপরূপা চুপচাপ শুনছে। আজ বাইশ তারিখ। পঁচিশ তারিখের মাঝে কী করে রিপোর্ট করবে? কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে আবারো ভেসে এলো,
“আপনার থাকার জন্য একটা ছোট দুই রুমের ফ্ল্যাটও আমরা অ্যারেঞ্জ করে দিয়েছি। ঠিকানা আর ডকুমেন্টস সব অফিসে এসে কালেক্ট করে নেবেন। তারপর সরাসরি জয়েনিং প্রসেস শুরু করবেন।”
অপরূপার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। যাক চিন্তামুক্ত হওয়া গেল। মনে মনে বার কয়েক আলহামদুলিল্লাহ বলে নিল। অতঃপর সৌজন্যতা বজায় রেখে জবাব দিল,
“থ্যাংক ইউ স্যার। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।”
“ওয়েলকাম, অপরূপা। আশা করছি এখানে তোমার পারফরম্যান্স যতটা ভালো ছিল ওখানেও ততটাই ভালো হবে।”
অপরূপা লম্বা টানল।
“চেষ্টা করব আরো ভালো করার।”
সন্তুষ্ট হলো অপরপাশে থাকা ব্যক্তিটি। শুভকামনা জানিয়ে বলল,
“বেস্ট অফ লাক।”
“থ্যাংক ইউ স্যার।”
অতঃপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। কল কেটে যেতেই কয়েক সেকেন্ড নিরবতায় কাটল অপরূপার। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। তারপর হঠাৎই পিহুকে কোলে তুলে নিল। দুগালে বেশ কয়েকটা চুমু খেয়ে নিল।
“পিহু!”
“হুঁ?”
“আমরা কুমিল্লা যাচ্ছি!”
পিহু চোখ বড় বড় করে বলল,
“কুমিল্লা মানে?”
“নতুন জায়গা। নতুন বাড়ি। তুমি আর আমি একসাথে থাকবো।”
পিহু না বুঝে জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু কেন?”
অপরূপা মেয়ের নাকে নাক ঘঁষে জবাব দিল,
“তোমার মাম্মার আরো ভালো চাকরি হয়েছে।”
পিহুর চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ, সোনা।”
“নানুমনিও যাবে আমাদের সাথে?”
অপরূপা একটু থামল, তারপর মৃদু হেসে বলল,
“নানুমনি মাঝে মাঝে আসবে।”
পিহুর মন খারাপ হলো। ছোট থেকেই তো সে নানুমনির সাথে বেশি সময় কাটিয়েছে। এখন তাকে ছেরে থাকতে হবে ভেবে শিশুমনটা খারাপ তো করবেই। সেই খারাপ লাগা বুঝল অপরূপা। মেয়ের মুখটা উঁচু করে বলল,
“মাম্মা পিহুকে প্রত্যেক ফ্রাইডেতে ঘুরতে নিয়ে যাবে, কেমন?”
পিহু খুশি হলো।
“সত্যি?”
“সত্যি।”
পিহু আবার জিজ্ঞেস করল,
“ওখানে টেন আছে?”
“হ্যাঁ, আরও বড় ট্রেন আছে।”
“পার্ক আছে?”
“অনেক অনেক পার্ক পার্ক আছে।”
পিহু খুশিতে হাততালি দিল,
“ইয়াই! পিহু যাবে!”
অপরূপা মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“আর পিহু থাকবে মাম্মার সাথে, সবসময় থাকবে।”
পিহু গলা জড়িয়ে ধরল অপরূপার। নিজেও চুমু খেল অপরূপার দু গালে। অপরূপার দু গালে হাত রেখে বলল,
“পিহু মাম্মাকে অনেক গুলো ভালোবাসে।”
অপরূপা হাসলো। আসলেই সৃষ্টিকর্তা যা করেন ভালোর জন্যই করেন। এইতো সে ভালো আছে। তার মেয়েকে নিয়ে যে অনেকটা ভালো আছে। আর কী চাই তার? অপরূপা জড়িয়ে ধরল মেয়েকে,
“পিহুর মাম্মাও পিহুকে অনেক গুলো ভালোবাসে।”
“স্কাই এর মতো?”
পিহুর প্রশ্নে হাসিটা গাঢ় হলো অপরূপার। উঠে দাঁড়াল বেঞ্চ ছেড়ে। হাঁটা ধরল খোলা রাস্তা ধরে। যেতে যেতে বলল,
“মাম্মা তোমাকে সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবাসে।”
_____
আজ পঁচিশে এপ্রিল। ভোরবেলা নিজ শহর ছেড়ে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল অপরূপা। খুব বেশি কিছু সঙ্গে নেয়নি সে। কয়েকটা ব্যাগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আর পিহুর ছোট ছোট জিনিসপত্র। বাসের জানালার পাশে বসে আছে অপরূপা, পাশে আছে পিহু। পিহুর জন্যেও সিট নিয়েছে সে। রাস্তা যত এগোচ্ছে, তত বদলে যাচ্ছে দৃশ্য। উঁচু দালান কমে গিয়ে জায়গা নিচ্ছে সবুজ মাঠ, দূরের গাছপালা, মাঝেমধ্যে ছোট ছোট দোকান। আবারো পালাক্রমে সবুজের বাহার অদৃশ্য হয়ে দৃশ্যমান হলো ইটপাথরের তৈরি এক যান্ত্রিক শহরের। পিহু জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে বাইরেটা দেখছে। হাতে তার আধখাওয়া ক্যান্ডি। সে অপরূপার দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল,
“মাম্মা, আর কত দূর?”
অপরূপা মৃদু হেসে মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিল,
“আরেকটু অপেক্ষা করো। এসেই পড়েছি।”
“আমার না কুব মন কারাপ।”
অপরূপা চিন্তিত চিত্তে শুধালো,
“কেন?”
পিহু মুখটা মলিন করে বলল,
“আসার সময় নানুমনি কত কাঁদল।”
অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারও তো খারাপ লাগছে। কিন্তু কিছু তো করারও নেই। অপরূপা হাত বুলিয়ে দিল পিহুর মাথায়।
“মন খারাপ করে না।”
পিহু একটু ভেবে বলল,
“নানুমনি আসবে তো মাজে মাজে?”
“আসবে, অবশ্যই আসবে।”
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে তারা কুমিল্লায় পৌঁছাল। শহরটা অপরূপার কাছে অচেনা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে শান্ত। একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে নতুন শহরে। অফিস ও বাসার ঠিকানা নিয়ে এসেছে সে। তাই প্রথমেই সে অফিসে যাওয়ার জন্য রওনক হলো রিকশায় চেপে। ইতোমধ্যে ঘড়ির কাটা দুপুর বারোটা ছুঁই ছুঁই। রিকশা থামল একটি বিশাল বড় এরিয়া জুড়ে তৈরি অফিসের সামনে। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এগারোতলা বিল্ডিং। বিস্তৃত জায়গা জুড়ে করা নিখুঁত কাজের বিল্ডিংটা চোখ জুড়ানো। গেটের উপরে কোম্পানির লগো খচিত। সাথে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, “এহসান গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিড লিমিটেড।”
চোখ সরিয়ে নিল অপরূপা। দারোয়ানকে কার্ড দেখাতেই গেট খুলে দেওয়া হলো। গেট থেকে বিল্ডিং এর গেট পর্যন্ত পাকা রাস্তা। দুপাশে মার্ভেল টাইলস দ্বারা বাঁধ। যার দু প্রান্তে সারিসারি ফুলের বাগান। মুগ্ধ হলো অপরূপা। পিহুও অবাক নয়নে দেখছে আশেপাশটা। অপরূপার এক হাতে ফাইল, আরেক হাতে পিহুর ছোট্ট হাত। হাতটা শক্ত করে ধরে ভেতরে ঢুকল অপরূপা। রিসেপশন থেকে জানানো হলো স্যার আজ আসেননি। অপরূপার ভ্রু কুঁচকে গেল। একটু দ্বিধা নিয়েই ম্যানেজারের রুমে ঢুকল। ম্যানেজার ভদ্রলোক ফাইলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনি কি মিস অপরূপা?”
“জি।”
“আমি অভ্র সরকার, এই কোম্পানির ম্যানেজার।”
অপরূপা সৌজন্য মূলক হাসল কেমন। অভ্র লোকটা বেশ পরিপাটি। বয়স ত্রিশ হবে হয়তো। সে হেসেই বলল,
“স্যার আপনার ব্যাপারে আগে থেকেই বলেছেন।”
অপরূপার ভেতরটা হালকা হলো। ভদ্রলোক ফাইলটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন,
“স্যার আজ জরুরি কাজে বাইরে আছেন। তবে আপনি চিন্তা করবেন না, আমি সবকিছু দেখে নিচ্ছি। উনি আসলেই আমি তাকে আপডেট করে দেব।”
“জি, ধন্যবাদ।”
পিহু ততক্ষণে অপরূপার আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ম্যানেজার হেসে তাকাল,
“এটা আপনার মেয়ে?”
অপরূপা মৃদু হেসে বলল,
“জি।”
“বাহ, কী মিষ্টি।”
পিহু মুখ লুকিয়ে ফেলল অপরূপার আঁচলে। তা দেখে হাসল অভ্র। সবকিছু শেষ করে তারা বেরিয়ে এলো। বাইরে দাঁড়িয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল অপরূপা। যেন একটা বড় দায়িত্ব শেষ হলো। এবার বাসায় উঠতে হবে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার। ঠিকানাটা দেখে রিকশা নিয়ে তারা পৌঁছাল নতুন ফ্ল্যাটে। দোতলার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট। দরজা খুলতেই একধরনের ফাঁকা গন্ধ নাকে এসে বাঁধল। অপরূপা অবাক হলো ভেতরটা দেখে। কারণ ভেতরে প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে। সোফা, আলমারি,ছোট্ট ডাইনিং টেবিল। দরজা আঁটকে অপরূপা প্রথমেই এলো কিচেনে। সেটাও বেশ গোছগাছ করা। আর কী লাগে তার? অপরূপার ক্লান্তি নিমিষেই ওধাও হলো। পরপর বেডরুমে আসতেই হাসির পরিমাণটা বৃদ্ধি পায়। বেডরুমটাও সুন্দর। সব কিছুই আছে। আর যা দরকার সেসব সে-ই আস্তেধীরে কিনে নেবে। অপরূপার পিছু পিছু পিহুও এসেছে। পিহু চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা আমাদের বাসা?”
“হ্যাঁ।”
অপরূপা সবটাই ভালো মতো দেখে নিল। দুটি রুম, ছোট্ট ড্রইং স্পেস, আর একটা রান্নাঘর। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা ছিল রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা। পিহু দৌড়ে বারান্দায় চলে গেল।
“মাম্মা! মাম্মা! এখানে আসো!”
অপরূপা ব্যাগ নামিয়ে তার পিছু নিল। বারান্দা থেকে সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল একটা খোলা মাঠ। বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে, কেউ ফুটবল খেলছে, কেউ দোলনায় বসে আছে। পাশে ছোট ছোট ফুড কার্ট। ফুচকা, আইসক্রিম, চটপটি ইত্যাদির। অনেক গুলো বেঞ্চও ফেলা, সেখানে অনেকেই বসা। পিহুর চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল। উৎফুল্ল হলো মন।
“মাম্মা! এখানে তো পার্ক আছে!”
“হ্যাঁ সোনা, আছে।”
পিহু খুশিতে লাফাতে লাগল,
“পিহুও খেলবে!”
অপরূপা হেসে বলল,
“আগে ফ্রেশ হয়ে আসো, তারপর দেখা যাবে।”
“না, এখনই যাবো!”
“না, আগে ফ্রেশ।”
পিহু মাথা নাড়ল জোরে জোরে,
“না! পিহু যাবে!”
অপরূপা কৃত্রিম রাগ দেখাল।
“খিদে পায়নি তোমার?”
পিহু গাল ফুলিয়ে জবাব দেয়,
“পেয়েছে তো।”
“তাহলে ফ্রেশ হবে চলো। তারপর খেতে যাব আমরা।”
“আর ওখানে?”
“বিকেলে।”
“না, এখনই।”
“তুমি ফ্রেশ হতে যাবে নাকি আমি একাই যাব?”
পিহু তৎক্ষণাৎ অপরূপার হাত আঁকড়ে ধরল,
“না! তুমি যাবে না!”
অপরূপা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল,
“মাম্মার কত কাজ আছে সোনা, এসো তাড়াতাড়ি।”
অপরূপা পিহুকে রেখেই ভেতরে এসে ব্যাগ খুলে দুজনার জামাকাপড়গুলো আলমারিতে রাখল, প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গোছালো। মাঝেমধ্যে তাকিয়ে দেখছে পিহুকে। মেয়েটা রেলিং ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। সব গুছিয়ে সে আবার বারান্দায় এলো। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল পিহুকে।
“কী দেখছো?”
“মাম্মা…”
“হুম?”
“তুমি অপিসে গেলে পিহু তো একা হয়ে যাবে। তকন পিহু কীভাবে থাকবে?”
অপরূপার চোখ জোড়া নরম হয়ে এলো। সে পিহুর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“পিহু একা হবে না, পিহুও অফিসে যাব তার মাম্মার সাথে।”
শিশু মনটা আবারো ফুরফুরে হলো। অপরূপা বসল পিহুর সামনে। পিহু গলা জড়িয়ে ধরল অপরূপার। চুমু খেল গালে।
“আমিও অপিস করব?”
“হুঁ, করবে।”
“পিহু বড় হয়ে গিয়েছে।”
“হ্যাঁ খুব। এবার চলুন ফ্রেশ হবেন। খেতে হবে না?”
পিহু গাল ভরে হাসলো। উপর নিচ মাথা দুলিয়ে জবাব দিল,
“হবে তো। পিহু হাঙরি, পেটে বড় একটা মাউস রান করছে তো।”
অতঃপর মেয়েকে নিয়ে তাড়া লাগাল অপরূপা। ফ্রেশ হয়ে তাদের খেতে যেতে হবে। টুকটাক বাজার সদাই ও তো করতে হবে। পিহু নিজেও আর দুষ্টুমি করল না। সে শুনল তার মায়ের সব কথা, বাধ্য মেয়ের মত শুনল।
____________
#চলবে

