Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৩৪+৩৫

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৩৪+৩৫

0
533

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৩৪
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

ছুটির আমেজে উৎসুক অফিসের সকলেই। তবে ছুটির আমেজটা সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে অপরূপাকে। কারণ আগামীকাল সে ফিরবে নিজের বাড়ি। নিজের মানুষদের কাছে। মায়ের কাছে। পরিবারের কাছে।

এই কয়েকটা ভাবনাই তার বুকটাকে অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরিয়ে তুলছে। হাতে কিছু ফাইল নিয়ে করিডোর ধরে এগোচ্ছে সে। পিছন পিছন ছোট ছোট পায়ে হাঁটছে পিহু। পিহুর পরনে হালকা হলুদ রঙের ফ্রক। মাথার দুপাশে ছোট্ট ঝুঁটি। হাতে একটা চকলেট। এমন সময় একজন স্টাফ এসে জানাল,

“ম্যাম, স্যার ডাকছেন।”

অপরূপার পা থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর নিজেকে সামলে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা।”

সে এগিয়ে গেল আভিয়ানের কেবিনের দিকে। দরজার সামনে এসে হালকা নক করতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো গভীর, গম্ভীর কণ্ঠ,

“কাম ইন।”

অপরূপা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঢুকতেই তার চোখ গিয়ে থামল আভিয়ানের উপর। লোকটা ডেস্কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কালো শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখের নিচে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে আগের মতোই। তবে আজ তাকে কেমন বেশি রুক্ষ লাগছে। অপরূপা ভেতরে ঢুকতেই আভিয়ানের চোখ উঠল। কিন্তু তার আগেই ডেকে উঠল পিহু,

“ইইইইয়ান!”

পিহু দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল আভিয়ানের পা। মুহূর্তের মধ্যেই আভিয়ানের মুখের কঠোরতা খানিকটা নরম হয়ে এলো। সে ঝুঁকে পিহুকে তুলে নিল কোলে।

“লিটেল কিটেন।”

পিহু গলা জড়িয়ে ধরল তাকে। এ কয়েকটা দিন খুব বেশি একটা সময় তারা একসাথে থাকতে পারেনি। এ নিয়ে পিহুর মনটাও খারাপ থাকে। অপরূপা ফাইলগুলো এগিয়ে দিল।

“এই ডকুমেন্টগুলো সাইন করতে হবে।”

আভিয়ান ফাইলগুলোর দিকে তাকালই না। বরং স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অপরূপার দিকে। কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর ধীরে বলল,

“আপনার সমস্যাটা কী, অপরূপা?”

প্রশ্নটা শুনে জমে গেল পরিবেশটা। অপরূপা ভ্রু কুঁচকাল।শুধালো,

“মানে?”

“গত কয়েকদিন ধরে আমাকে এমনভাবে এড়িয়ে চলছেন যেন আমি কোনো অপরাধ করেছি।”

অপরূপা ঠান্ডা স্বরে বলল,

“আপনি আমার বস। কাজ ছাড়া অতিরিক্ত কোনো যোগাযোগের প্রয়োজন দেখি না।”

আভিয়ান হালকা হেসে ফেলল। তবে সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র আনন্দ নেই। বরং উপহাস।

“ওহ, তাই?”

“জি।”

“তো বউ হয়ে যান আমার।”

থমকে গেল অপরূপা। এ কেমন যন্ত্রণা? হুট করেই বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে গেল তার। চোখ সরিয়ে নিল মুহূর্তেই। কথা এড়িয়ে বলল,

“ফাইল গুলো দেখে নিন, সব ঠিকঠাক আছে কি-না।”

শোনা গেল আভিয়ানের বিষন্ন অসহায় কণ্ঠস্বর,

“কিচ্ছু ঠিক নেই, ঠিক থাকতে দিচ্ছেন না আপনি।”

“মিস্টার আভিয়ান প্লিজ স্টপ।”

কে জানে কী হলো অপরূপার, সে প্রায় ধমকে উঠল আভিয়ানকে। ছোট্ট পিহু ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে তার মা ও তার ইয়ানকে। সে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে এখানে। আভিয়ান ধীরে পিহুকে নামিয়ে দিল মেঝেতে।
তারপর খুব আস্তে ডেস্কের দিকে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
চোখদুটো স্থির। তীক্ষ্ণ।

“আমাকে থামিয়ে দিয়ে পালাতে চাচ্ছেন আপনি? আমার আপনাকে চাই মানে আপনাকেই চাই। বুঝেছেন?”

থমকে যাওয়া মুখাবয়বটা কেমন অসহায় দেখাল অপরূপার। লোকটা তাকে পাগল করে ছাড়বে। কেন বুজতে পারছে না সে বাস্তবতা? এ পর্যায়ে সে কড়া স্বরে উচ্চারণ করল,

“মিস্টার আভিয়ান, আপনি যদি আমাকে বারবার এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতির সম্মুখীন করান তবে আমার এই কোম্পানিতে আর কাজ করা সম্ভব হবে না। আমি রিজাই…..”

অপরূপা পুরো বাক্য শেষ করার আগেই আভিয়ান থামিয়ে দিল অপরূপাকে। বাঁকা হেসে বলল,

“আপনি বলবেন আর আমি মেনে নেব? চুক্তি অনুযায়ী এক বছরের আগে আপনি চাকরি ছাড়তে পারবেন না।”

থেমে গেল অপরূপা। এই লোকটা কী চাচ্ছে ঠিক? বুঝে নাকি না বুঝে? সে চোখ বুজে মাথা নিচু করে নিল। কিছু সময় চুপ থেকে নিচু স্বরে আওড়াল,

“আপনি যেই অনুভূতিটাকে গুরুত্ব দিয়ে এতদূর ভাবছেন, সেটা আসলে সাময়িক আকর্ষণ ছাড়া কিছু না।”

আভিয়ানের চোয়াল শক্ত হলো। রাগ হচ্ছে তার, কিন্তু কেন রাগ হচ্ছে সে জানে না। হয়তো অবহেলাটা নিতে পারছে না। নাকি সঠিক সময় আসার আগেই নিজেকে প্রকাশ করে বসল? জানা নেই ঠিক ভুল কিচ্ছুটি। বরং উচ্চারণ করল,

“রিয়্যেলি?”

অপরূপা এবার গম্ভীর হয়ে বলল,

“আপনার জীবন আলাদা। আমার জীবন আলাদা। আমাদের মন মানসিকতা আলাদা। সবচেয়ে বড় কথা আমি একজন সিঙ্গেল মাদার। যে কি-না নিজের মেয়ের জন্যই দাঁড়িয়ে আছে আপনার সামনে। সেখানে আপনি অভিজাত পরিবারের অবিবাহিত পুরুষ। আপনি যেমনটা ভাবছেন কিছুই তেমন হওয়ার নয়। সম্ভবই নয়। সমাজ, পরিবার, বাস্তবতা এসব গল্পের মতো চলে না।”

নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে আভিয়ানের। নিজের দুর্বলতা বেরিয়ে আসছে তার।

“আপনি সমাজের কথা ভেবে পিছিয়ে যাচ্ছেন? এই সো কোল্ড সমাজ আর সমাজের মানুষের ধ্যান ধারণা আমি আভিয়ার কোনো কালেই পরোয়া করিনি, আর না করব।”

“আমি করি, করতে বাধ্য হয়েছি। কী জানেন আমার বিষয়ে? কতটুকু জানেন? এই ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে আমার পথচলা সহজ ছিল না আভিয়ান। পাড়া প্রতিবেশি, এই সমাজ আমাকে কম শোনায়নি। সেসবকে আমিও পরোয়া না করে এতদূর এগিয়েছি। তার কারণটা হলো আমার মেয়ে, আমার পিহু। একজন মা তার সন্তানের জন্য নিজের সবটুকু বিসর্জন দিতে পারে,নিজের আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব সবকিছু। তবে একজন নারী পারে না। আপনার সাথে আমার কখনোই যায় না। আপনি আমার বস আভিয়ান। আজ আপনার সাথে ভালো মন্দ কোনো ভাবে আমি জড়ালে দায় এসে পড়বে আমার উপর। মানুষ আঙুল তুলবে আমার চরিত্রে। জেনে বুঝে আমি চাইব না নিশ্চয় নিজের শেষ সম্বল টুকু খোয়াতে? আর জীবনটা কোনো উপন্যাসের পাতা নয় যে যা খুশি করা যায়। প্লিজ আভিয়ান, এসব নিয়ে আর একটা কথাও বলবেন না। আমি চাই না। এখানেই শেষ দিন সবটা। এসব আবেগে গা ভাসাবেন না, অন্তত আপনার মত একটা মানুষের সাথে বিষয়টা মানানসই না।”

মনোযোগী শ্রোতা হয়ে অপরূপার প্রত্যেকটি কথা শুনে গেল আভিয়ান। মেয়েটা বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারে। যেখানে আভিয়ান নিজেই একটা অগোছালো মানুষ। আসলেই তাদের মাঝে বিস্তুর ফারাক। তবে তার অনুভূতি গুলোকে কখনোই আবেগ বলা চলে না। একদমই না।

“ঠিক বলেছেন, আপনি আপনার খারাপ পরিস্থিতি দেখিনি। আমি দেখিনি লিটেল কিটেনকে নিয়ে আপনার বিষাক্ত পথ চলা। আমি দেখিনি আপনাকে করা অপমান। এন্ড ইয়েস, এর জন্য আমার নিজের প্রতি রাগ হয়। মনে হয় আমি কেন আরো আগে আপনাকে খুঁজে পেলাম না। কেন আমি অপারগ? কেন আমি একটা লুজার? কেন আমার প্রিয় মানুষ গুলো কখনোই আমার থাকে না। কেন?”

বলতে বলতেই অস্থির হয়ে উঠল আভিয়ান। উত্তেজিত হয়ে বাম হাতে সজোরে আঘাত করল দেওয়ালে। মুহূর্তেই হাতের উপরিপিঠের চামড়া ফেটে বেরিয়ে এলো রক্তিম তরল। চমকে উঠল অপরূপা। সবকিছু এতটা দ্রুত হলো যে মস্তিষ্ক সময় মতো ঠাহর করতে পারল না। ছোট্ট পিহু এতটা সময় কেবল দেখেই যাচ্ছিল। এ পর্যায়ে মেয়েটা ভয় পেয়ে কেঁদে উঠল। পিহু দৌড় লাগাল মেয়ের দিকে। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।

“সোনা, আমার সোনা মা, কাঁদে না। কিচ্ছু হয়নি। এইতো সোনা, এইতো আমি আছি না? কাঁদে না মা।”

পিহু কান্নারত অবস্থায় তাকাল আভিয়ানের দিকে। আভিয়ানের চোখ মুখ অসম্ভব রকমের লাল হয়ে উঠেছে। চোখের পাতা, ঠোঁট কাপছে তিরতির করে। রক্ত মাখা হাতটা উঠিয়ে বারবার কান ঘষছে। তা দেখে পিহু আরো বেশি কেঁদে উঠল। অপরূপাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মাম্মা, ইয়ান ব্যতা পেয়েচে। রক্ত, কত রক্ত।”

মুহূর্তেই পিহুর চোখে হাত দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল অপরূপা। আভিয়ানের পুরো ঘাড়টা রক্তে মেখে গিয়েছে। থমকে গেল রমণী। অজানা ব্যথায় জর্জরিত হলো হৃদয়খানা। দ্রুত মেয়েকে চেয়ারে বসিয়ে এগিয়ে গেল আভিয়ানের কাছে। হাতটা টেনে ধরল। দেখতে পেল হাতের মুঠোই চকচকে পেপার কাটার। অপরূপার চমকে উঠল। বিস্ময় নিয়ে তাকাল আভিয়ানের চোখে।

“এই, এই হাত খুলুন। খুলুন বলছি, পাগল আপনি? হ্যাঁ? আভি আভিয়ান প্লিজ হাত খুলুন।”

কোনো কথা আদেও তার কর্ণগহ্বরে পৌঁছাচ্ছে কি-না তা নিয়ে বেশ সন্দেহ আছে। কারণ আভিয়ানের পূরণ দৃষ্টি অপরূপার দিকে। অপরূপার দুইহাত দিয়ে টেনেই একটা আঙুলও ছাড়াতে পারছে না। মানুষের শরীরে এত শক্তি কী করে হতে পারে ভেবে পাচ্ছে না অপরূপা। তবে তার নিজেরও অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত যন্ত্রণা হচ্ছে। খুব বেশি যন্ত্রণা। অথচ এর কারণ তার জানা নেই। সে তাকাল আভিয়ানের চোখে। পুরো শরীর কাপছে। হালকা রঙের শাড়ির আঁচলটা রক্তে মেখে গিয়েছে। অপরূপা ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছেড়ে আগে নিজেকে শান্ত করল। অতঃপর অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,

“পিহু ভয় পাচ্ছে আভিয়ান, হ হাতটা খুলুন। কেন নিজেকে আঘাত করছেন? কষ্ট দিচ্ছেন? পাগল আপনি?”

এপর্যায়ে কিছু না ভেবেই হাত খুলে ফেলল আভিয়ান। কারণটা একটাই, তার লিটেল কিটেন। তার লিটেল কিটেন ভয় পাচ্ছে, ব্যাস এটুকুই। তবে একচুলও নড়ল না সে। আর না দৃষ্টি সরালো। অপরূপা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। চোখ নামিয়ে হাতটা দেখল। বেশ অনেক খানি আঘাত, ক্ষতটাও গভীর। রক্ত এখনো ছুটছে। অস্থির ব্যকুল হৃদয়টা এক ভয়ংকর অনুভূতির মুখোমুখি করাল অপরূপাকে। কী অদ্ভুত ভাবে তার কান্না পেল। ঠোঁট কামড়ে কান্না আঁটকে দ্রুত শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে বেঁধে দিল আভিয়ানের হাতটা। অথচ দৃষ্টির নড়চড় হলো না আভিয়ানের। অস্থিরতা বেড়ে দিগুণ হচ্ছে। অপরূপা শত চেষ্টা করেও নিজের চোখের পানি আটকাতে পারল না। যদিও বা কাঁদতে চায়নি সে। তবে চোখের পানি কপোল গড়িয়ে টুপ করে পড়ল আভিয়ানের কাঁটা হাতের উপর। নিজের কাজে মনোযোগ রেখেই উচ্চারণ করল,

“আপনি যে একটা পাগল, সেটা কি আপনি জানেন?”

“জানি।”

আভিয়ানের তৎক্ষনাৎ নিচু কণ্ঠস্বরের জবাব। রাগটা দপ করে মাথায় চড়ে বসল অপরূপার। ইচ্ছাকৃত গিট বাঁধল শক্ত করে। সুক্ষ্ম ব্যথার টান অনুভব করলেও আভিয়ানের মাঝে দেখা গেল না কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া। তা দেখে রাগের মাত্রা বৃদ্ধি পেল অপরূপার। দাঁতে দাঁত চেপে আওড়াল,

“এত জেদ কীসের আপনার? মাথায় সমস্যা? কেয়ারলেস একটা।”

আভিয়ান নিশ্চুপ, নির্লিপ্ত। অপরূপার রাগ, শাসন বড্ড বিনোদন দিচ্ছে তাকে। ভালো লাগা কাজ করছে তার মাঝে। অপরূপা দু’হাতে ধাক্কা দিল আভিয়ানের বুকে, যদি-ও বা এক চুলও নাড়াতে পারল না। রাগের বশিভূত রমণী হাত দুটো শক্ত করে নিল।

“করব না আমি চাকরি, আসব না আর। অসহ্য একটা লোক, হাত না গলা কাটুন নিজের।”

“ভেবে বলছেন?”

আভিয়ানের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলা কথাটা এবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারা করে ফেলল অপরূপাকে। আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। পিহুর কান্না থেমেছে অনেকক্ষণ। সে পিটপিট চোখে চেয়ে কেবল দেখছিল ঘটমান দৃশ্য। এ পর্যায়ে অপরূপা পিহুকে কোলে তুলে নিল। পা বাড়াল দরজার দিকে। আভিয়ান স্থির নিজের জায়গায়। দৃষ্টি তার পদচারণায়। দরজার হাতলে হাত ঠেকিয়ে থামল অপরূপা। এক পলক তাকাল পেছনে। বলে গেল,

“আপনি আসলেই একটা পাগল।”

আর দাঁড়াল না। বেরিয়ে গেল অপরূপা। ফেলে রেখে গেল আভিয়ানকে। যে কি-না নিজের মাঝেই নেই। প্রবল ভাবে ঘেমে নেয়ে ভিজে এসেছে তার শরীর। কঠোর হয়ে এসেছে চোয়াল। দাঁতে দাঁত চেপে রাখায় জ্বিভটাও রক্ষা পেল না, মুখের ভেতর নোনতা স্বাদ অনুভব করলেও তার কোনো হেলদোল হলো না। বরং অদ্ভুত ভাবে চোখের পলক ঝাপটাল। কপাল থেকে শুরু করে ঘার, হাতের শিরা উপশিরা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। আচমকা মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটো খুলে গেল। ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল আভিয়ানের গোটা শরীর। দুলে উঠল সমস্ত কায়া। তাল সামলাতে একহাত ঠেকাল দেওয়াল। অপর হাত আপনা আপনি চলে গেল চুলে। নিজের চুলগুলোই খামচে ধরল আভিয়ান।

“ফাক!”

গভীর, দমবন্ধ এক গর্জন বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে।
সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। মাথার ভেতর যেন অসহ্য চাপ জমছে। কানে বাজতে লাগল অপরূপার বলা প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ। ছেলেটা একদমই ঠিক নেই, দম আঁটকে এসেছে পুরোপুরি। ঘামের বিন্দু গড়াল কপাল বেয়ে গাল, গাল বেয়ে গলা। ঝাপসা চোখে ভাসছে অপরূপার মুখটা। অজানা ভয়ে রোধ হয়ে আসছে রক্ত চলাচল। সে কি তার স্নো হোয়াইটকে আবারো হারিয়ে ফেলবে? আবারো? আবারো? না! এটা হতে পারে না।

“শিট!”

প্রচণ্ড রাগে সামনে থাকা দেওয়ালে আবারো ঘুষি মারল আভিয়ান। কাপড়ে পেঁচানো হাতটা আবারো রক্তে মাখামাখি হলো। এই মুহূর্তে আভিয়ানকে কোনো অশরীরী ব্যতিত কিছুই মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো অশীরী ভর করেছে। চোখদুটো লাল হয়ে গেছে। চোখ ফেটে রক্ত বের হবে যেন। অস্থিরতা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। না, এভাবে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। সে কিছুতেই শ্বাস নিতে পারছে না। হাত বাড়িয়ে ডেস্কে ভর দিয়ে দাঁড়াল। ডেস্কের ড্রয়ার খুলল তড়িঘড়ি করে। ভেতর থেকে ওষুধের স্ট্রিপ বের করে কাঁপা হাতে একটা ট্যাবলেট মুখে দিয়ে পানি খেল।

তারপর ধপ করে বসে পড়ল সিটে। মাথাটা সিটে এলিয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল কিছুক্ষণ। সময় পেরোলো। ওভাবেই কাটল মিনিট বিশেক। স্থির সে। অতঃপর ঠোঁট কামড়ে চোখ খুলল, চোখের সামনে দেখা মিলল সিলিং। সে পানেই অপলক তাকিয়ে রইল অনেকটা সময়। বুকের ব্যথায় শব্দ বের হচ্ছে না কোনো। তবুও বিড়বিড় করে আওড়াল,

“আমি ঠিক নেই, স্নো হোয়াইট। একদম ঠিক নেই। আপনাকে হারাতে পারব না আমি, আপনাকে আমার চাই। খুব করে চাই। হয়ে যান না আমার, একটাবার সুযোগ দিয়েই দেখুন। এই গোটা দুনিয়ার যত সুখ আছে সব আমি লিখে দেব আপনার নামে, বিনিময়ে কেবল ওই বুকে একটু জায়গা দিন। জায়গা দিন আমার অপ্সরা।”

আবারো চোখ বুঁজে নিল আভিয়ান। সে সহ্য করতে পারছে না। মেয়েটাকে সে কিছুতেই হারাতে পারবে না। কেন প্রিয় মানুষগুলো বারবার তার থেকে হারিয়ে যায়? কেনই বা সকল যন্ত্রণা ঘিরে ধরে কেবল তাকেই? সে যে ভালো নেই, একদমই ভালো নেই। একদমই না! হাতের ক্ষততে জমাট বেঁধেছে রক্ত। অনুভব করল নাক গলিয়ে ঠোঁট বেয়ে গড়াচ্ছে কিছু একটা। সে জানে এটা কী, তবুও প্রয়োজন বোধ করল না রক্তটা মুছে ফেলার। বরং গড়াতেই লাগল। অধর ঘেঁষে গেল বিষাদময় এক হাসির রেখা। বুক পিঞ্জিরায় বাজল কেবল মনের বলা বাক্য,

“আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন তো? নিন, এই আভিয়ান পৃথিবীর সবচেয়ে ধৈর্যবান ব্যক্তি হয়ে দেখাবে। তবুও দিনশেষে আপনাকে আমার হতে হবে, স্নো হোয়াইট। আপনি আমারই হবেন, এই আভিয়ানেরই।”

_________

#চলবে

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৩৫
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

রাত অনেকটাই গভীর। গ্রামের রাতের এক অদ্ভুত স্বরহীনতা। শহরের মতো এখানে গাড়ির অবিরাম হর্ন নেই, নেই মানুষের তর্ক-বিতর্ক, নেই কংক্রিটের গায়ে প্রতিধ্বনিত যান্ত্রিক শব্দ। চারদিক ঢেকে গিয়েছে বিশাল নিস্তব্ধ আবরণের নিচে।

জানালার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়ছে শীতল বাতাস। বাতাসে মিশে আছে স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ, রাতজাগা ফুলের মৃদু সুবাস আর এক অদ্ভুত বিষণ্নতা। অপরূপার ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ক্ষীণ চাঁদের আলো বিছানার একপাশে মলিন রেখা এঁকে রেখেছে। সেই আধো অন্ধকারের মাঝখানে নিঃশব্দে শুয়ে আছে অপরূপা।

চোখ দুটো বন্ধ। তবুও তার ভেতরে ঘুমের লেশমাত্র নেই।
মস্তিষ্কের গভীরে অগণিত চিন্তা এলোমেলোভাবে ছুটে বেড়াচ্ছে। একটার সঙ্গে আরেকটার সংঘর্ষ হচ্ছে। কোনো ভাবনাই স্থির হচ্ছে না। কেবল এক অস্বস্তিকর মানসিক ক্লান্তি ভেতর থেকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তাকে।

আজ তার আসার কথা ছিল না। আগামীকাল ফেরার পরিকল্পনা ছিল। তবে হঠাৎ করেই আজ চলে এসেছে সে।তার কাছে মনে হচ্ছিল ওফ শহরটার ভেতর আর এক মুহূর্ত থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসত। কিছু মানুষের উপস্থিতি, কিছু দৃষ্টি, কিছু অনুচ্চারিত অনুভূতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়াটা জরুরি হয়ে উঠেছে তার জন্য।

বাসায় ফিরেই পিহুকে আমেনা বেগমের কাছে দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছে সে। তারপর থেকে আর বের হয়নি। আমেনা বেগম, লুপা কেউই তাকে বিরক্ত করেনি। সবাই ভেবেছে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে মেয়েটা হয়তো অবসন্ন হয়ে পড়েছে। কিন্তু শরীরের ক্লান্তির চেয়েও তার মানসিক অবসাদ বহুগুণ বেশি। ভেতরটা যে তার অদৃশ্য কোনো ভারে চেপে আছে। ঠিক তখনই দরজায় খুব মৃদু শব্দ হলো।

“আপু?”

শোনা গেল লুপার কণ্ঠ। অপরূপা চোখ না খুলেই জবাব দিল,

“হুম?”

“খাবেন না? সবাই বসেছে।”

“খেতে ইচ্ছে করছে না ম। একটু একা থাকতে দাও।”

লুপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে মেয়েটার গলায় জড়ো হওয়া অস্বাভাবিক ক্লান্তি। নরম স্বরে বলল,

“আম্মা অপেক্ষা করছে তো আপা, আসেন খেয়ে নিন।”

“পরে খাব।”

“একটু হলেও…”

“প্লিজ লুপা।”

কথার শেষাংশে এমন এক অবসন্ন আর্তি মিশে আছে যে লুপা আর জোর করতে পারল না। ছোট্ট শ্বাস ফেলল সে। পরপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল লুপা। আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল ঘরটা। অপরূপা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো অন্ধকার সিলিংয়ের দিকে। কয়েক সেকেন্ড নির্বাক তাকিয়ে রইল সে।

তারপর খুব ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকের গভীর থেকে। আভিয়ান লোকটা এমন করছে কেন?কিসের ভিত্তিতে সে এমন অদ্ভুত আচরণ করছে? পাগলামি করছে? এগুলোর কি অর্থ আছে কোনো? নিশ্চয় লোকটার মাথায় সমস্যা আছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিল অপরূপা।
নিজেকেই যবোঝানোর চেষ্টা করল এসব আবেগ। আজ আছে, কাল থাকবে না। হ্যাঁ, এটাই তো বাস্তবতা। মানুষ বদলায়। অনুভূতি বদলায়।

সময় বদলে দেয় সব সম্পর্কের সংজ্ঞা। আজ যে মানুষ সারাজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়, কাল সেই মানুষই হয়তো অচেনার মতো মুখ ফিরিয়ে নেয়। সৈকতও তো একসময় বলত ভালোবাসে। কত দৃঢ় স্বরে বলত।
শেষটা কী হয়েছিল? চোখ বন্ধ করে ফেলল অপরূপা।
বুকের ভেতর হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ল অস্বস্তিকর এক চাপা ব্যথা। ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল পলাশ। অপরূপা দ্রুত উঠে বসল। পলাশ হালকা হেসে বলল,

“কী রে? ভূত দেখছিস নাকি?”

অপরূপার ঠোঁটেও মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে উঠে গিয়ে লাইট জ্বালাল। মুহূর্তেই হলুদাভ আলোয় ভরে উঠল পুরো ঘর। দেয়ালের ছায়াগুলো সরে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল চারপাশ। পলাশ এসে বিছানার পাশে বসল। তার চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও বোনকে দেখার পর সেই চেনা স্নেহের কোমলতা ফুটে উঠেছে স্পষ্টভাবে।

“একা একা চলে আসলি কেন? আমাকে বলতি, আমি গিয়ে নিয়ে আসতাম।”

“এত ব্যস্ত মানুষকে আবার বিরক্ত করতাম?”

“ঢং করিস না।”

অপরূপা হাসল। শুধালো,

“সে যাইহোক, কেমন আছো?”

“ভালো। তুই?”

“এই তো।”

খুব সাধারণ, স্বাভাবিক কিছু শব্দ। তবুও দুজনেই বুঝল, কেউই পুরোপুরি ভালো নেই। শব্দের আড়ালে অনেক অপ্রকাশিত ক্লান্তি জমে আছে। কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইল। তারপর পলাশের মুখটা খানিক গম্ভীর হয়ে এলো।

“অপু, একটা কথা ছিল।”

“হুম?”

“বিজনেসটা শুরু করব ভাবছি।”

মুহূর্তেই অপরূপার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

“সত্যি? এটা তো খুব ভালো কথা!”

“হুম। তবে…”

সে থেমে গেল। মনে হলো শব্দগুলো গুছিয়ে নিতে চাইছে। পরপর আবার বলল,

“টাকা আরো লাগবে।”

অপরূপা এক মুহূর্তও সময় নিল না।

“কত? আমার কাছে দুই-তিন লাখ আছে। লাগলে নিয়ে নাও।”

অপরূপার কথা শুনে পলাশের মুখ শক্ত হয়ে এলো মুহূর্তেই।

“একদম না।”

অপরূপা বিস্মিত হলো। শুধালো,

“কেন?”

“ওগুলো পিহুর টাকা। ওর ভবিষ্যতের জন্য রাখা। ওই টাকায় হাত দিবি না।”

গাঢ় শ্বাস টানল অপরূপা। এই মানুষটাই তো সবসময় আগলে রেখেছে তাকে। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত। নিজের প্রয়োজনের আগে তার কথা ভেবেছে। পলাশ এবার একটু স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমার লাগবে প্রায় দশ লাখের মতো।”

অপরূপা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

“তাহলে ব্যাংক থেকে লোন নাও।”

“সেটাই ভাবছি। আর আব্বার নামে যে কিছু জমা আছে সেগুলোও তো এখনো তোর নামেই পড়ে আছে। তখন তো আমি দেশে ছিলাম না।”

অপরূপা ধীরে মাথা নাড়ল। বাবার পেনশনের টাকা গুলো পলাশের অবর্তমানে পুরোটাই অপরূপার নামে রেখে দিয়েছিল আমেনা বেগম। এ পর্যায়ে অপরূপা নিজে থেকেই বলল,

“তাহলে কালই যাই।”

“কাল?”

“হুম। পরশু থেকে তো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে।”

পলাশ রাজি হলো। মাথা নেড়ে বলল,

“ঠিক আছে।”

কথোপকথনের মাঝখানে হঠাৎ করেই থেমে গেল অপরূপা। মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল খানিকটা। সে কি সৈকতের ব্যাপারটা বলবে? সবটা? যেভাবে দিনের পর দিন আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে আছে, সেটা কি আর একা বহন করা সম্ভব? ভেতরে ভেতরে দীর্ঘক্ষণ দ্বিধায় ভুগল সে। তারপর অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে ধীরে বলল,

“ভাইয়া আমি আসলে তোমাকে একটা কথা বলতে চাইছিলাম।”

পলাশ তাকাল তার দিকে।

“হুম? বল।”

অপরূপা ঠোঁট ভিজিয়ে নিল ধীরে। বলতে নিল,

“সৈকত….”

ঠিক তখনই পলাশের ফোনটা বেজে উঠল। মুহূর্তেই থেমে গেল সব। পলাশ বিরক্ত মুখে ফোনটা বের করল।

“এক মিনিট।”

কল রিসিভ করতেই উঠে দাঁড়াল সে।

“হ্যালো? হ্যাঁ বল…”

অপরূপা চুপ করে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই যেন সাহসটা কোথাও হারিয়ে গেল। অদ্ভুত এক দ্বিধা এসে চেপে বসল বুকে। সে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। থাক। কাল বলবে। কাল তো আছেই। পলাশ কথা বলতে বলতে বারান্দার দিকে চলে গেল। অপরূপা আবার ধীরে বিছানায় হেলান দিল।
চোখের সামনে ভেসে উঠল অবনীর মুখটা।

মেয়েটা মারা যাওয়ার ঠিক দুদিন পর সৈকত নিজের ছেলেকে বাড়ির পেছনে ফেলে রেখে গিয়েছিল। তারপর থেকে সবকিছু অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ। না এখনো পর্যন্ত তার কাছে কোনো ফোনকল। না কোনো হুমকি। না সেই উন্মাদ, ভয়ংকর কণ্ঠস্বর। সবকিছু যেন আচমকাই থেমে গেছে। কিন্তু এই নীরবতাই তাকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলছে। এটা কি সত্যিই স্বস্তি? নাকি ভয়ংকর কোনো ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা?

অপরূপার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। মাথা ভার হয়ে আসছে। চোখজোড়া জ্বলছে অদ্ভুতভাবে।
সম্ভবত জ্বর আসবে। সে ধীরে ধীরে শরীর গুটিয়ে শুয়ে পড়ল। রাত ক্রমশ আরও গভীর হচ্ছে। আর সেই অন্ধকার, নিঃশব্দ ঘরের ভেতর এক অস্থির নারী চোখ বন্ধ করে বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে
সব ঠিক হয়ে যাবে। অথচ আদেও কি সব ঠিক হবে কিনা তার জানা নেই।

_____

শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত পুরোনো গুদামঘরটা দূর থেকে দেখলে মনে হয় বহু বছর আগেই মৃত হয়ে গেছে জায়গাটা।

দিনের আলোয় সেটাকে নিছক ভাঙাচোরা এক ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। মরিচা ধরা টিনের চাল, ফেটে যাওয়া দেয়াল, জায়গায় জায়গায় উঠে যাওয়া পলেস্তারা, শ্যাওলা জমে কালচে হয়ে যাওয়া ইট সবকিছুতেই সময়ের নির্মম ক্ষয়ের ছাপ স্পষ্ট। নদীর স্যাঁতসেঁতে বাতাসে পুরো জায়গাটার ভেতর একধরনের পচা গন্ধ স্থায়ীভাবে লেগে আছে।

কিন্তু রাত নামলেই জায়গাটা বদলে যায়। অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে লুকিয়ে থাকা আরেক পৃথিবী। এক ভয়ংকর, পঙ্কিল, নেশাগ্রস্ত পৃথিবী। গোডাউনের ভেতরে ঢুকতেই কানে আছড়ে পড়ে অসংখ্য মানুষের মিশ্রিত শব্দ। কোথাও মাতালদের উচ্চহাসি, কোথাও গালিগালাজ, কোথাও তাস ফেলার চাপা আওয়াজ, কোথাও টাকার হিসাব নিয়ে চিৎকার। গ্লাসে মদ ঢালার ছলছল শব্দের সঙ্গে মিশে আছে সস্তা সিগারেট আর নেশাজাতীয় দ্রব্যের তীব্র গন্ধ।

লাল আর নীল আলোয় আধো অন্ধকার হয়ে থাকা পুরো জায়গাটা যেন অপরাধের নিজস্ব সাম্রাজ্য। কোথাও গোল হয়ে বসে কয়েকজন তাস খেলছে। চোখেমুখে উন্মত্ত লোভ। কেউ বাজিতে টাকা ছুঁড়ে মারছে, কেউ শেষ সম্বল হারিয়ে দাঁত চেপে বসে আছে। কেউ জিতে বিকৃত আনন্দে হেসে উঠছে, আবার কেউ হেরে গালাগালিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে চারপাশ।

মেঝেতে ছড়িয়ে আছে সিগারেটের ছাই, মদের বোতল, টাকার নোট, ভাঙা গ্লাস। চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা বয়সী কিছু নারী। কারও ঠোঁটে গাঢ় রঙের লিপস্টিক, কারও চোখে অতিরিক্ত কাজল। কৃত্রিম সাজের আড়ালেও তাদের ক্লান্তি স্পষ্ট। কেউ জোর করে হাসছে, কেউ নরম গলায় মাতাল পুরুষদের সঙ্গে কথা বলছে, কেউ আবার কৌশলে কাউকে নির্জন করিডোরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যেন সভ্যতার মুখোশ খুলে এখানে সবাই নিজেদের নিকৃষ্ট রূপে বেঁচে থাকে। পাপের। লোভের।নেশার। অন্ধকার বাসনার। যেখানে ভদ্রতার মুখোশধারী গন্যমান্য ব্যক্তিদেরও দেখা মিলছে। বেশির ভাগই আসে নারী দেহের লোভে। আর কিছু মানুষ আসে মদ ও জোয়ার লোভে। কেউবা জিতে গিয়ে হচ্ছে রাজা, কেউবা হেরে গিয়ে রাস্তার ফকির। এমনটা নয় যে এই নিষিদ্ধ জায়গাটার কথা আইনের কানে পৌঁছায় না,পৌঁছায়। তবে টাকার কাছে তারা পঙ্গু। তাই তো সহজেই রাতের রাজত্য মেতে উঠে নোংরা খেলায়। এক নরকের।

আর সেই গোটা নরকের কেন্দ্রবিন্দুতে, উঁচু কাঠের মঞ্চের মতো জায়গায় চকি পেতে আধশোয়া হয়ে আছে নবাব দিলদার। এই জায়গাটা বর্তমানে তারই নিয়ন্ত্রণে। তাদের জাল বিস্তৃত, এমন বহু জায়গায় তাদের অবস্থান। আর একবার যারা এ জালে জড়িয়ে পড়ে তারা বের হতে পারে না। নবাব দিলবার লোকটাকে দেখলেই শরীরের ভেতর অকারণে অস্বস্তি জাগে। কুচকুচে কালো চামড়া।অস্বাভাবিক বড় ভুঁড়ি। মাথাভর্তি টাক। গালের ডান পাশে পুরনো গভীর কাটা দাগটা তার চেহারাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। ছোট ছোট চোখদুটো ঠিক শিকার ধরার অপেক্ষায় থাকা হিংস্র কোনো জন্তু।

পরনে কালো পাঞ্জাবি, সাদা টুপি আর চেক লুঙ্গি। তার সামনে খোলা লোহার বাক্স। ভেতরে স্তূপ করে রাখা টাকার বান্ডিল। দু ঘন্টার মাঝেই বক্স ভরে গিয়েছে টাকায়। সে একটার পর একটা নোট গুনছে ধীর, অভ্যস্ত ভঙ্গিতে। তার কাছে মানুষের জীবন, মৃত্যু, কান্না সবকিছুর মূল্যই এই টাকার হিসাবের ভেতর সীমাবদ্ধ।

পাশে বসে থাকা দুটো মেয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে তাকে। আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন বিশালদেহী লোকের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। তাদের চোখেমুখে কেবল নিষ্ঠুরতার স্থির ছাপ। ঠিক তখনই গোডাউনের ভেতরের করিডোর থেকে দুজন লোক টেনে হিঁচড়ে কাউকে নিয়ে এলো। লোকটার মুখ কালো কাপড়ে বাঁধা।

হাত দুটোও শক্ত দড়িতে বাঁধা। তাকে প্রায় ছুঁড়ে ফেলা হলো দিলদারের সামনে। দিলদার টাকা গুনতে গুনতেই বিরক্ত স্বরে বলল,

“কোন মাল এইডা?”

ওদের একজন দাঁত বের করে হাসল।

“ওইযে বত্রিশ লাখ বাজিতে হাইরা যেই মদনায় গা ঢাকা দিছিল। আঠারো লাখ জমা দিছে, বাকি গুলার খবর নাই।”

দিলদারের হাত থেমে গেল। তার ব্যবসায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়। প্রতিটা মুখ মনে রাখার প্রয়োজন পড়ে না। সে ধীরে মাথা কাত করল।

“মুখ খোল। দেখবার দে।”

কালো কাপড়টা সরিয়ে দেওয়া হলো। মুখটা দেখা যেতেই হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাস নিল সৈকত। চোখের নিচে কালি জমেছে। মুখ শুকিয়ে কঙ্কালসার। অগোছালো দাড়ি গজিয়েছে। জামাকাপড়ে ময়লা আর ঘামের দাগ।কয়েকদিনের আতঙ্ক, পালিয়ে বেড়ানো আর নেশা তাকে প্রায় ভেঙে ফেলেছে। সে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল,

“ভাই, আমি এমনিতেই আসতাম। আমি পালাইনি।”

হ্যাঁ, এই নরকের জালে আটকা পড়েছে সৈকত নিজেও। তবে সবটাই নিজের দোষে। নারী, নেশা আর টাকা তাকে লোভে অন্ধ করে তুলেছিল। তাই তো সব হারিয়ে আজ সে নিঃস্ব। জোয়া বাজিতে প্রথম কয়েকমাস ব্যাপক হারে জিতে টাকার লোভ বেড়ে গিয়েছিল সৈকতের। পরবর্তীতে লোভই তাকে শেষ করল। লোভেন তাড়নায় বড় অংকের বাজি ধরেছিল সে, আর এখানেই সব কিছু শেষ। এক দানেই হেরে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি, জায়গা জমি সব বিক্রি করেও টাকা শোধ করার মুরদ হয়নি। শেষে নিজের জান বাঁচাতে নিজের প্রিয় মানুষ, নিজের স্ত্রীকে ব্যবহার করেছে। যদিও তার মাঝে আদেও কোনো অনুশোচনা আছে কি-না সন্দেহ, কারণ এই মুহূর্তে সে পুরোপুরি উন্মাদ। যার মাঝে কোনো ঠিক ভুল বিচার করার ক্ষমতাটাও নেই। হবেই বা কী করে? এই টাকা শোধ না করতে পারলে তাকে মরতে হবে, বাঁচার সম্ভাবনাই নেই। আর নিজের জীবনের মায়া কারই বা নেই?

ভাবনার নেশ কাটল সৈকতের। দুদিন ধরে সে নেশা করতে পারছে নক, পাগলের মতো হয়ে উঠেছে এতেই। রক্ত গুলো শরীরের ভেতরেই যেন টগবগ করে ফুটছে। আজ বাধ্য হয়ে নিজ থেকে ধরা দিতে হলো, কেবল এই ড্রাগসের নেশার কারণে। এই ছটফটানি তাকে মৃত্যু এনে দিত না হয়। এ পর্যায়ে দিলদার ধীরে উঠে বসল। শান্ত স্বরে ডাকল সৈকতকে,

“এইদিকে আয়।”

ঘোর কাটল সৈকতের। ইতস্তত করল সে। তার বুকের ভেতরটা আতঙ্ক কাঁপছে স্পষ্ট। তবুও ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। আর পরের মুহূর্তেই সজোরে একটা লাথি এসে আঘাত করল তার বুকে। সৈকত ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ে কাশতে লাগল। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেন। দিলদার দাঁত চেপে গালি দিল,

“ভুদাই নাকি আমি? আসার হইলে গা ঢাকা দিলি ক্যান? জানডা বড় হইয়া গেছে তোর!”

দিলদারে চোখের ভেতর তখন কেবল হিংস্রতা। সে পেছনের লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এইডারে ডাক্তারের কাছে পাঠাই দে। ভিতরের জিনিসপাতি বেইচাও মেলা টাকা আইবো। শালা চোর বাটপার।”

দিলদারের কথাটা শুনেই শরীরের সমস্ত রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল সৈকতের। ভয়ে কুঁকড়ে গেল সে। তার মনে হলো আজই শেষ। এই নোংরা নেশা, জুয়া, লোভ সবকিছু মিলিয়ে সে নিজ হাতেই নিজের জীবনটাকে ধ্বংস করেছে। সৈকত হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে এসে দিলদারের পা জড়িয়ে ধরল।

“ভাই প্লিজ! আরেকটু সময় দেন। আমি টাকা জোগাড় করছি। জায়গা জমি বাড়ি যা ছিল সব বিক্রি করে দিয়েছি। বাকি আর কিচ্ছুটি নেই। আমাকে সময় দিন কয়েকটা দিন। এই মাসেই বাকি টাকাও দিয়ে দেব। প্লিজ ভাই!”

দিলদার আবারও লাথি মারল তাকে। তার ভেতরে দয়া বলে কিছু নেই। মানুষ মারা তার কাছে প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা। কয়েকদিন আগেই মাত্র দুই লাখ টাকার জন্য একজনকে খুন করিয়েছে সে। আর সৈকতের এখনো চৌদ্দ লাখ টাকা বাকি। দিলদার গর্জে উঠল,

“আগে টাকা, তারপর কথা! পাঁচমাস ধরে তোকে বাল ছিড়বার রাখছি? আর প্রথমবার হারছস তো হারছস দ্বিতীয় বার কোন আক্কেলে আবার খেলতে আইছস মাদা****দ? যাইক, তোগো মতো মদনা দুই একটা আছে বলেই আমাগো টাকার পাহাড় উঁচা হয়। ”

সৈকতের কানে বা মাথায় কোনো কথায় ঢুকল না। এতবার হারার পর সে এখন আর সাহস পায় না খেলার। আবার যদি হারে তখন? তখন কী হবে? তার তো কেবল ফিরিয়ে দেওয়ার অংক বাড়বে। এ পর্যায়ে মস্তিষ্ক তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রথমত তার ড্রাগসের প্রয়োজন, আর দ্বিতীয়ত জান বাঁচানো। সে কাঁপা গলায় বলল,

“একটু সুযোগ দেন ভাই., বলছি তো ফিরিয়ে দেব। একটা মাস ভাই।

দিলদার পাশেই থুতু ফেলল।

“টাকা নাই তো খেলতে আইসছ ক্যান? মাইয়াগো টাকাও বাকি। তোগো মত ফকিন্নিগোর লাইগা এই কুঠি বানাই নাই। আইসছ মরতে মর!”

চারপাশে কয়েকজন শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসির ভেতরে করুণা ছিল না, ছিল কেবল বিদ্রুপ। সৈকত মুখ নিচু করে বসে রইল। অপমান, ভয়, লোভ সব মিলেমিশে তার চেহারাটাকে আরও বিকৃত করে তুলেছে। ধীরে আশেপাশে তাকাতে লাগল সে। বলে উঠল,

“ভাই আমাকে একটা ইনজেকশন দেন, মাথা ফেটে যাচ্ছে। মরে যাব একদম। টাকা আমি ফিরিয়ে দেব কসম।”

দিলদারের তেমন হেলদোল হলো না। টাকা পেলেই হলো। দিয়ে দিল সময়। একজনকে ইশারা করে বলল,

“দে ওরে ওর বিষ। শালা এত জাউড়া, অভারডোজ নিয়াও মরে না।”

সৈকতের কানে বাজল সকলের হাসির শব্দ। সে তবুও নিশ্চুপ। মস্তিষ্ক সহ পুরো শরীর জ্বলছে তার। মুহূর্তেই একজন তার দিকে ছুঁড়ে দিল একটি ইনজেকশন। সৈকত বুঝি প্রাণ ফিরে পেল। উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল মুখজুড়ে। দ্রুতে কোনো কিছু না ভেবে শার্টের হাতা গুটিয়ে পুরোটা সুই ডুবিয়ে দিল নিজ শিরায়। পরপর রক্তে মিশে গেল কঢ়া ডোজের ড্রাগস। পরপর খামে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে অনেকটা সময় বসে রইল সে। পরপর নিজের পুরো শরীরটা স্বাভাবিক হতেই চোখ খুলল। চোখ জোড়া রক্তিম, পুরো শরীর জ্বলছে। তার দৃষ্টি আপনা আপনি ফিরে গেল অদূরে দাঁড়ানো নারীদেহের দিকে। দৃশ্যগুলো অস্পষ্ট হলেও বড্ড কুৎসিত হাসি আটল তার ঠোঁটে

চোখে সেই পুরোনো নোংরা লালসা ফিরে এসেছে আবার।
কোন মেয়েটা সুন্দর। কাকে পাওয়া যায় এটাই ভাবছে সে।দিলদার সেটা বুঝে হো হো করে হেসে উঠল।

“যা, ফ্রিতেই দিলাম আইজকা। যেইডা মন চায় হেইডা নে।”

সৈকতের চোখে সঙ্গে সঙ্গে লোভের ঝিলিক ফুটে উঠল।তার মাথার ভেতর দ্রুত হিসাব চলতে লাগল। যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করতে হবে। একবার এই দেনা শোধ করতে পারলেই আর কখনো এসবের কাছে ফিরবে না। নিজেকে এমন মিথ্যা আশ্বাস বহুবারই দিয়েছে সে। আর এখন তার মাথায় ঘুরছে একটাই নাম। অপরূপা। কিছু একটা ভেবেই ঠোঁট বাঁকিয়ে কুটিলভাবে হাসল সৈকত।

ঠিক তখনই এক মেয়ে এগিয়ে এলো তার সামনে। মুখে জোর করে টেনে রাখা হাসি তার। চোখে মুখে ক্লান্তি। সে এসে সৈকতের দিকে ঝুঁকল। আঙুল চালাল সৈকতের ঠোঁটে,

“যাবেন?”

সৈকত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বাক্য ভুলেছে সে। একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। কেবল মেয়েটার পিছু পিছু অন্ধকার করিডোরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সে এখন নেশায় বুধ হয়ে আছে, দিন দুনিয়া ভুলে সে এখন ভেবে নিচ্ছে এটাই তার স্বর্গ। আর এই স্বর্গে সে হুর পেয়েছে, হুর। অতঃপর মুহূর্তেই দুটো অস্তিত্ব আঁধারে মিলিয়ে গেল, ঢুকে গেল দুতলার কোনো এক ফাঁকা ঘরে। নরকের বাহকরা কি আর জানবে স্বর্গ ভেবে তারা নরকের দারেই ফিরছে। যেখানে সবটাই আগুন, আর আগুন তো একদিন না একদিন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করবেই।

_______

#চলবে