#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৩৮
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
গভীর রাত। ঈদের আনন্দে সরগরম থাকা গ্রামটাও অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চারদিকে একরাশ নিস্তব্ধতা। পলাশদের বাড়ির ভেতরেও এখন ঘুমের আবরণ। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ শেষে আমেনা বেগম নিজের ঘরে বিশ্রামে। লুপা দুই ছেলেকে মাঝখানে নিয়ে শুয়ে আছে। পলাশও প্রায় ঘুমের অতলে তলিয়ে গিয়েছে।
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে এলো লুপার কানে। প্রথমবার কেউ গুরুত্ব দিল না। কিন্তু আবার
ঠক ঠক শব্দ এলো আরও জোরে। লুপা আধো ঘুমে চোখ খুলল। বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“এই রাতে আবার কে এলো?”
পলাশ চোখ মেলল কষ্ট করে।
“জানি না।”
“দেখে আসো না।”
আরও একবার দরজায় শব্দ হলো। পলাশ বিরক্ত মুখে উঠে বসল এ পর্যায়ে। চোখ কচলাতে কচলাতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। বাইরে তাকিয়ে বলল,
“কে?”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,
“আমি পাশের বাড়ির লোক ভাই। একটু বিপদে পড়েছি।”
পলাশ এক মুহূর্তও সন্দেহ করল না। গ্রামের মানুষ। এমন রাতে নিশ্চয়ই জরুরি কিছু হয়েছে। সে ছিটকিনি খুলে দরজাটা সামান্য ফাঁক করল। আর ঠিক তখনই এক প্রবল ধাক্কা এসে পড়ল তার বুকে। তিনজন কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোক ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
পলাশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল।
আরেকজন সোজা গিয়ে লুপার বড় ছেলেটাকে কোলে থেকে টেনে নিল। বাচ্চাটা ভয় পেয়ে কেঁদে উঠল মুহূর্তেই।
সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তার গলায় ছুরি ঠেকিয়ে গর্জে উঠল,
“একটা শব্দও না! কেউ চিৎকার করবি না! নইলে আগে এইটারে শেষ করুম!”
মুহূর্তেই জমে গেল সবাই। লুপার মুখ ফ্যাকাসে। সব কিছু এত দ্রুত হলো যে কিছু বুঝে উঠতেই পারছে না সে। যখন বুঝল তখন চিৎকার করে উঠল লুপা,
“না না! আমার বাচ্চাকে কিছু করবেন না!”
সে এগিয়ে যেতে চাইলে লোকটা ছুরিটা আরও কাছে ধরল। উচ্চারণ করল,
“পিছনে! একদম পিছনে!”
ততক্ষণে পাশের ঘর থেকে ছুটে এসেছেন আমেনা বেগম।ঘুম জড়ানো চোখে দৃশ্যটা দেখেই প্রায় বসে পড়লেন।
“আল্লাহ!এইসব কী!”
পলাশ দাঁত চেপে সামনে দাঁড়াল।
“তোরা কারা? কী চাস?”
তাদের মাঝে একজন লোক খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল। বলল,
“বুদ্ধিমান প্রশ্ন। টাকা চাই। যা আছে সব বাইর কর।”
লুপা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমাদের কাছে টাকা নাই ভাই। যা আছে সব সংসারে লাগে। প্লিজ আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দেন।”
লোকটা তাচ্ছিল্য ভরে বলল,
“সবাই এই একই ডায়লগ দেয়। টাকা নাই! বললেই আমরা বিশ্বাস করমু! না জাইনা আইছি নাকি?”
তাদের মাঝে আরেকজন ঘরের আলমারি খুঁজতে শুরু করল। ড্রয়ার খুলছে। কাপড় ছুড়ে ফেলছে। জিনিসপত্র ওলটপালট করছে। পলাশ এগিয়ে যেতে চাইতেই একজন তার বুকের উপর হাত ঠেলে দিল।
“শান্ত থাক। হিরোগিরি করলে ভালো হইব না।”
পলাশের চোখ লাল হয়ে উঠল। কিন্তু ছেলের গলায় ছুরি।
সে চাইলেও কিছুই করতে পারছে না। এদিকে লুপা কাঁদতে কাঁদতে অস্থির। কোন মা’ই বা নিজের সন্তানের এমন একটি পরিস্থিতি দেখতে পারে? সে এগিয়ে এসে বলল,
“আমার গয়না লাগে নিয়ে যান। যা লাগে সব নিয়ে যান।” কিন্তু আমার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দেন।”
লোকগুলো পাত্তাই দিল না। বরং একজন হঠাৎ লুপার খুব কাছে চলে এলো। অশোভন ভঙ্গিতে তাকাল লুপার দিকে। কুটিল হেসে বলল,
“আরে ভাবি, ভয় পাইয়েন না। আমরা তো খুব ভালো মানুষ।”
কথাটা শুনেই পলাশের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল।সে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার কলার চেপে ধরল।
“হারামজাদা!”
পলাশ মুহূর্তেই নাক বরাবর আঘাত করল লোকটির। এতে যেন উল্টো লোকটির আগুনে ঘি ঢালল। শুরু হলো ধস্তাধস্তি, বিশৃঙ্খলা। লোকটা ক্ষেপে গিয়ে হাতের ছুরি উঁচিয়ে দিল। তারপর এক ঝটকায় আঘাত করল পলাশের গলায়। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল পলাশ। কণ্ঠনালি থেকে ছিটকে এলো রক্তস্রোত। চিৎকার করে উঠল লুপা,
“পলাশ!”
আমেনা বেগমও চিৎকার করলেন। ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক। মুহূর্তের মাঝেই কী থেকে কী হয়ে গেল এসব। বাচ্চা দুটো হাউমাউ করে কাঁদছে। যে লোকটা বাচ্চাটাকে ধরে ছিল সে দাঁত বের করে বলল,
“বেশি ত্যাদড়ামি করলে পরেরবার এই পোলার উপর পরব!”
এই ছোট্ট একটা হুমকিতেই জমে গেল সবাই। এ কোন বিপদে পড়তে হলো তাদের। এই পুরো সময়টাতে তৃতীয় লোকটা প্রায় নিশ্চুপ ছিল। লম্বা গড়ন। মুখে কালো কাপড় বাঁধা। দৃশ্যমান বলতে কেবল চোখ জোড়া।আর সেই চোখ জোড়া অস্বাভাবিক রকম অস্থির। হাত কাঁপছে।চোখে ভয়। বারবার যেন কিছু বলতে চাইছে। অবশেষে আর থাকতে না পেরে এগিয়ে এলো।
“এই… এই তোমরা কী করতেছ? এসব তো করার কথা ছিল না। উনি তো… তো…”
গলার ভেতর আঁটকে আসছে প্রত্যেকটি শব্দ। মুখে হাত চেপে বলল,
“য যদি মরে যায়?”
চাবি খুঁজতে থাকা লোকটি বিরক্ত হয়ে তাকাল। উচ্চারণ করল,
“আরে মিয়া, মরার কেড়া উঠছে এগোর। এমন টাইট না দিলে টাকা বাইর হয়? তুমি চুপ কইরা থাকো।”
আরেকজন হেসে বলল,
“তুমি মিয়া টাকা খুঁজো। বাকি আমরা বুঝমু।”
লম্বা লোকটা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। যেন সে নিজেই বুঝতে পারছে না কী ভয়ংকর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ তার খেয়াল নেই আমেনা বেগম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছর তার দিকে। বিস্ময় নিয়েন দেখছেন তিনি। এ পর্যায়ে কাঁপতে কাঁপতে সামনে এগোলেন তিনি। চোখ দুটো বড় হয়ে গেছে বিস্ময়ে। ঠোঁট কাঁপছে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। হুট করেও গলা ছেড়ে আওড়ালেন,
“সৈকত?”
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নেমে এলো মৃত্যুসম নীরবতা। লম্বা লোকটার মুখের রঙ উড়ে গেল তৎক্ষনাৎ। তার চোখ বড় হয়ে উঠল আতঙ্কে। আর আমেনা বেগম কাঁপা কণ্ঠে আবারও বললেন,
“সৈকত! তুমি!
আমেনা বেগমের মুখে নিজের নাম শুনে জমে গেল সৈকত। হ্যাঁ, সে-ই। সে এসেছিল টাকা নিতে। তবে এমন কিছু ঘটে যাবে ভাবনার বাইরেই ছিল তার। তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা হঠাৎ কয়েকগুণ বেড়ে গেল।মুখের কাপড়ের আড়ালেও তার আতঙ্ক লুকানো গেল না।
—”সৈকত?”
আমেনা বেগম আবারও উচ্চারণ করলেন। মুহূর্তেই দুজন মুখোশধারী লোক একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর একজন বিরক্ত হয়ে গালি দিয়ে উঠল,
“ধুর শালা, তোমারে তো চিন্না ফালাইছে!”
আরেকজন দাঁত চেপে বলল,
“এইডা ভালো হইল না। এগোরে বাঁচাই রাখলে ঝামেলা হইব।”
সৈকতের বুক কেঁপে উঠল মুহূর্তেই। চেঁচিয়ে উঠল সে,
“না! না না, এসব লাগবে না। টাকা নিয়েই চলে যাব।”
ততক্ষণে পলাশ নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। লুপা তার পাশে বসে কাঁদছে। আমেনা বেগম দুই হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে।
“বাবারা যা নেওয়ার নিয়ে যাও। আর কিছু করো না। আমার নাতিগুলার দিকে তাকাও।”
বাচ্চা দুটো ভয়ে মায়ের গা আঁকড়ে ধরে কাঁদছে। সৈকত চোখ সরিয়ে নিল। সে এই দৃশ্য দেখতে পারছে না। সে টাকা চেয়েছিল। হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাপারটা এতদূর যাবে এটা সে কল্পনাও করেনি। তৃতীয় জন চাবি খুঁজে পেয়ে ছুঁড়ে দিল সৈকতের দিকে। সৈকতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এখন আর পিছু হইটা লাভ নাই। ধরা পরলে তুমিই আগে খাইবা। তুমি মিয়া টাকা বের করো, এদিকে আমরা দেইখা লইমুনি।”
আর কথা বাঁড়াল না সৈকত। কোনো এক ঘোরে আছে সে। এই মুহূর্তে নিজের জান বাঁচানো ফরজ মনে হচ্ছে। সে কাঁপা হাতে আলমারির ভেতর থেকে নগদ টাকা আর কিছু মূল্যবান জিনিস বের করতে লাগল। তার মাথা কাজ করছে না। সবকিছু যেন দুঃস্বপ্ন। বাকি লোক দুজন নিজেদের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছে। চোখে চোখেই সাজিয়ে নিচ্ছে ছক। অতঃপর বাঁকা হাসির ভাজ দেখা গেল দৃষ্টিতেও। প্যান্টের পেছন থেকে বের করল রিভালবার। যা দেখে সৈকত নিজেও হতভম্ব। এরা সাথে করে রিভালবার নিয়ে এসেছে অথচ সে-ই জানে না। এ কোথায় ফেসে যাচ্ছে সে। হুট করেই খেয়াল আসলো অপরূপা আর পিহুর কথা। সবাই তো এখানে, ওরা কোথায়। সৈকত দ্রুত পাশের রুমে উঁকি দিল। না, নেই। তাহলে? তার ভাবনার মাঝেই লোকটা রিভালবার তাক করল বাচ্চা দুটোর দিকে। চিৎকার করে উঠল লুপা, আমেনা বেগম সহ বাচ্চা দুটোও। লুপা এগিয়ে এসে পা জড়িয়ে ধরল। আকুতি মিনতি করল কেঁদে কেঁদে,
“প্লিজ! আমার বাচ্চা দুটো ছোট, ওরা কী করছে? ওদের কিছু করবেন না। আমরা কাউকে কিচ্ছু বলব না, প্লিজ আমাদের আর কোনো ক্ষতি করবেন না। দোহাই লাগে।”
আমেনা বেগমও কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আল্লাহর দোহাই লাগে। আমরা কাউকে কিছু বলব না।”
এসব শুনেও লোক দুটোর চোখে কোনো দয়া নেই। সৈকত এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। কানে তালা লেগে গিয়েছে তার। মাথা ঘুরছে। সব কেমন ঝাপসা লাগছে। সে এগিয়ে এসে লোকটা হাত টেনে ধরল,
“এইসব করো না। চলো যাই। টাকা তো পেয়ে গেছি, চলো।”
লোকটা তার দিকে কড়া চোখে তাকাল। ধমকে উঠল,
“চুপ। যা কইছি তাই করো। ওরা কালকেই থানায় যাইব, আর প্রথম নামটাই লিখব তোমার। বলদ নাকি?”
“বলদ আমি না, খুন করলে পুলিশ আসবে না? তদন্ত করে ঠিকই বের করে ফেলবে। এসব ঝামেলা করো না। এমনিতেও পলাশ ভাই… পলাশ ভাই কি বেঁচে আছে? ভাই তোমরা আমাকে উল্টো ফাঁসাচ্ছ।”
লোকটা কিছু বলবেই নেবে এমন সময় পাশের জন এগিয়ে এলো। বলল,
“উনি ঠিকই কইতাছে। এমনে মারলে সমস্যা। অন্য কাম করা যায়।”
কপালে ভাজ পড়ল লোকটির। জিজ্ঞেস করল,
“কী?”
অপরজন একটু ভেবে বলল,
“বাড়িতে আগুন লাগাই দেই। সবাই ভাবব দূর্ঘটনা।”
দু’জনের কথোপকথন শুনে সৈকতের চোয়াল ঝুলে পড়েছে। সে হতভম্ব। প্রতিক্রিয়া করতেও ভুলে গিয়েছে। শুধু এটুকু বুঝতে পারছে সে একটা জাল থেকে বের হওয়ার আগে আরেকটা জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর যা ভয়ংকর, অনেক বেশড ভয়ংকর। আর নিচে বসা দুটো মানুষ আতঙ্কিত হয়েই তাকিয়ে আছে। নিজেদের খুন করার পরিকল্পনা তারাই শুনছে। শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে। রিভালবার হাতে লোকটা হাসল। পরিকল্পনা মন্দ নয়।
কেঁদে উঠল লুপা আর আমেনা বেগম। নিজেদের কতটা অসহায় লাগছে যা বলার বাইরে। তার ছোট ছোট বাচ্চা দুটো! কী এমন পাপ করেছিল যে এমন শাস্তি পেতে হচ্ছে তাদের? লোকদুটো কোনো কথায় কানে তুলল না সৈকতের। উল্টো বলল,
” সিলিন্ডার আছে নাকি?”
প্রশ্নটা সৈকতকেই করা হয়েছে। সৈকত মাথা নাড়ল। যার মানে আছে। লোকটা জিজ্ঞেস করল,
“কই?”
“র রান্নাঘরে।”
আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সে। দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে নতুন সিলিন্ডারটা নিয়ে এলো। খুলে দিল মুখটা। মুহূর্তে গ্যাস ছড়িয়ে গেল রুম জুড়ে। সে সৈকত ও অপরজনকে ইশারা করে বলল,
“বাচ্চা দুটোকে কী করব?”
সৈকত চট করে বলে বসল,
“এরা তো ছোট, কিছু বলতে পারবে না। এদের ছেড়ে দিলে হয় না?”
“এত দরদ কীসের তোগো? টাকা নিয়ে বের হ।”
“ভাই….”
লোকটা থামিয়ে দিল সৈকতকে। কোনো কথায় শুনল না। সৈকতের পুরো শরীর হিম হয়ে আসছে। কাঁপছে অনবরত। ইতোমধ্যে গ্যাস ছড়িয়ে ঘরে শ্বাস নেওয়ার অবস্থা নেই।
লোকদুটো এক প্রকার টেনেই সৈকতকে বের করল।সৈকতের পা যেন অবশ হয়ে গেছে। নড়তে চড়তে পারছে না। লোকটা বাইরে এসে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। ঘরের ভেতর চিৎকার করছে লুপা, আমেনা বেগম আর বাচ্চা দুটো। জানালা খুলে হাতজোড় করছে দরজা খুলে দিতে। গ্রামাঞ্চল হওয়ায় বাড়ি গুলো বেশ বড় বড় ও দূরে দূরেই। তাই এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে শব্দ শোনা যায় না বললেই চলে। মানুষ গুলোর আহাজারি শুনে সৈকত স্তব্ধ। অনুতাপ বা মায়া কাজ করছে না, বরং তার বুকের ভেতর জমছে ভয়। নিজের জন্য ভয়। লোক দুটো হাসাহাসি করছে। যেন কিছুই হয়নি। বা খুব স্বাভাবিক সাধারণ কিছু কাজ করছে। মনে হচ্ছে এটা তাদের কাছে নিত্যদিনের ঘটনা। লোকটা পকেট থেকে দেশলাই বের করল। সৈকত ফিসফিস করে বলল,
“না…না, এটা করো না…”
তার কথা কেউ শুনল না। এই মুহূর্তে মানবিকতা, অনুনয় কিংবা করুণার কোনো মূল্যই অবশিষ্ট নেই। কেবল আতঙ্ক আর উন্মত্ততার এক অদৃশ্য স্রোত সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে নিজস্ব গতিতে। লোকটা ধীরস্থির ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটি কাঠি বের করল। অন্ধকারের মধ্যে দেশলাই ঘষতেই ক্ষণিকের জন্য ঝলসে উঠল হলদে আলো। সেই ক্ষুদ্র শিখাটা কয়েক সেকেন্ড তার আঙুলের ফাঁকে কাঁপল। তারপর সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে সে সেটি ছুঁড়ে দিল সামনে। পরমুহূর্তেই আগুনের ফুলকি ছুটল। প্রথমে ছোট্ট একটি শিখা। তারপর মুহূর্তের ব্যবধানে সেটি উন্মত্ত জন্তুর ন্যায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল চারদিকে।
শুকনো খড়, কাঠ, কাপড় যা পাচ্ছে, তাই গ্রাস করছে।
দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল চারপাশ। কমলা আর লাল আগুনের শিখাগুলো রাতের অন্ধকারকে ছিন্নভিন্ন করে আকাশের দিকে লকলক করে উঠতে লাগল। ধোঁয়ার কালো কুণ্ডলী পাক খেতে খেতে উপরে উঠছে। আগুনের তাপে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল মুহূর্তেই। নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে ভেসে এলো মানুষগুলোর আর্তচিৎকার।
হাহাকার। আহাজারি। কারও আতঙ্কিত চিৎকার, কারও সাহায্যের জন্য মরিয়া আর্তনাদ, কারও কান্নাভেজা ডাক।
সেই শব্দগুলো রাতের আকাশে আছড়ে পড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল বারবার।
সৈকত পেছনে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সমগ্র অস্তিত্ব হঠাৎ করেই পাথর হয়ে গেছে। হাত দুটো কাঁপছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। মুখের সমস্ত রক্ত সরে গিয়ে চেহারাটা বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে।
গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এমন তীব্রভাবে আঘাত করছে যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। সে বুঝতে পারছে পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের অনেক দূরে চলে গেছে। অনেক দূরে। যেখানে আর কোনো অজুহাত চলে না। কোনো ব্যাখ্যা কাজ করে না। কোনো ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগও অবশিষ্ট থাকে না।
তার সামনে জ্বলছে আগুন। আর সেই আগুনের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। লোক দুটো ইতোমধ্যে হাঁটতে শুরু করেছে। তাদের চলাফেরায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো অনুশোচনা নেই। যেন এ কেবল আরেকটা সাধারণ রাত। যেতে যেতেই একজন পেছনে না তাকিয়ে সৈকতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চলো। ভাইজানের কাছে লও। আমাগো ভাগটাও দিও।”
কথাগুলো বাতাসে ভেসে এলো। কিন্তু সৈকতের কানে আদৌ সেগুলো পৌঁছাল কি না, তা বোঝার উপায় নেই।সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে নিষ্পলক, নিস্তব্ধ ভঙ্গিতে।
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আগুনের লেলিহান শিখার দিকে। আগুনের প্রতিফলন তার চোখের মণিতে কাঁপছে। কিন্তু সেই চোখে কোনো স্বাভাবিক অনুভূতি নেই।
শুধু বিস্ময়। আতঙ্ক। আর এক গভীর অবিশ্বাস।
তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে ক্রমশ। মনে হচ্ছে চারপাশের বাতাস হঠাৎ ঘন হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
পৃথিবীটা যেন ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করেছে তার চারপাশে। আগুনের শিখাগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
মানুষের চিৎকারগুলো দূরের কোনো অস্পষ্ট প্রতিধ্বনির মতো শোনাচ্ছে। আর ঠিক তখনই তার কানের ভেতর আবার ভেসে উঠল আমেনা বেগমের সেই কাঁপা, অসহায় কণ্ঠস্বর। একটি বৃদ্ধ নারীর আর্ত অনুনয়। সেই কণ্ঠ যেন আগুনের শব্দ, মানুষের চিৎকার, সবকিছুকে ছাপিয়ে বারবার ফিরে আসছে তার কাছে।
সৈকত শুকনো ঢোক গিলল। গলার ভেতরটা কেমন শক্ত হয়ে এসেছে। বুকের গভীরে জমে থাকা আতঙ্ক এবার ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। তার মনে হলো
এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা যাবে না। এক মুহূর্তও না।ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল সে। পা দুটো অবশ। হাঁটু কাঁপছে। তবুও নিজেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
এক পা। তারপর আরেক পা। মনে হচ্ছে শরীরটা নিজের নয়, অন্য কারও শরীর ধার করে হাঁটছে সে। পেছাতে পেছাতেই ভাঙা, আতঙ্কিত স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
“আমাকে পালাতে হবে…এখনই…আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে!”
ইতোমধ্যে টের পেল আশে পাশের মানুষজন জেগে উঠেছে। পাশের বাড়িতে লাইট জ্বলে উঠেছে। আর থামল না সৈকত। দৌড় লাগাল সুনশান রাস্তায়। চেপে বসল বাইকে। পরপর কোনো দিক না দেখেই অদূর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে।
_____
রাত তখন ঠিক দুটো পেরিয়েছে। বিয়েবাড়ির রঙিন আলোকসজ্জাগুলো এখনও নানান বর্ণের দীপ্তি ছড়িয়ে উঠোন, বারান্দা আর আশপাশের গাছপালাকে এক অদ্ভুত উৎসবমুখর আবহে মুড়ে রেখেছে। তবে কয়েক ঘণ্টা আগেও যে জায়গাটা মানুষের হাসি, কোলাহল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর শুভেচ্ছাবার্তায় মুখর ছিল, এখন সেখানে সেই ছাপটা কমে এসেছে।
অপরূপার চোখ দুটো জ্বালা করছে ভীষণ। সারাদিনের নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততা, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলা, অনুষ্ঠান , বাচ্চা সব মিলিয়ে শরীরের প্রতিটি অস্থি-মজ্জায় ক্লান্তি জমাট বেঁধে আছে তার। মাথার ভেতরটা ভারী লাগছে। পিহু অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে।বাড়ির ভেতরের একটি বড় ঘরে আরও কয়েকজন শিশুর সঙ্গে তাকে শুইয়ে দিয়ে এসেছে অপরূপা। এই মুহূর্তে ছাঁদনাতলার কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপা। নিয়ম অনুযায়ী রিচুয়াল করা হচ্ছে। সেসবই দেখছে। এমন সময় ফোনটা কেঁপে উঠল তার।
রাতের নিস্তব্ধতায় শব্দটা অস্বাভাবিক স্পষ্ট শোনাল।অপরূপা ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। আর সঙ্গে সঙ্গেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার।স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটাই নাম, আভিয়ান। অপরূপা কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেদিকেই। এত রাতে কল কেন করেছে? লোকটার আবার কী হলো? সারাদিনের ক্লান্তি আর বিরক্তির মিশেলে ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো তার। কোনো কথা না বলে ওভাবেই রেখে দিল ফোনটা। রিসিভ করল না। অগত্যা কিছু সময় পর এমনিতেই কেটে গেল কল।
কিন্তু মিনিটখানেকও পেরোয়নি। আবার ফোন কেঁপে উঠল। একই নাম, একই মানুষ। অপরূপার বিরক্তি এবার আরও বাড়ল। সে একবার চারপাশে তাকাল। একটু সরে এসে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কল রিসিভ করল।
“হ্যালো…”
কথাটা শেষ করারও সুযোগ পেল না সে। ওপাশ থেকে ঝড়ের বেগে ভেসে এলো পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর। কিন্তু আজ সেই কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যা আগে কখনও শোনেনি অপরূপা। ভয়, উৎকণ্ঠা, উন্মত্ত ব্যাকুলতা আর অসহায় আতঙ্ক।
“স্নো হোয়াইট!”
অপরূপা চমকে উঠল! আভিয়ানের শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো। শো শো শব্দ শোনা যাচ্ছে। যা চিনতে ভুল হলো না তার, এটা বাইকের শব্দ। সে কি এত রাতে বাইক রাইড করছে? সেই অবস্থাতেই আবার কল করেছে? তার উপর কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছ ে এমন কোনো সংবাদ শুনেছে, যা তার সমস্ত সংযম ভেঙে দিয়েছে।
“এই অপরূপা, ঠিক আছেন আপনি? আমার লিটেল কিটেন কোথায়? ও ঠিক আছে তো? কিছু হয়নি তো আপনাদের? কথা বলুন অপ্সরা! এই বলুন কিছু! আপনি ঠিক আছেন বলুন!”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলল আভিয়ান। তার কণ্ঠ কাঁপছে। ভীষণ রকম কাঁপছে। শব্দের আড়ালে স্পষ্ট ধরা পড়ছে এক অদ্ভুত আতঙ্ক। মনে হচ্ছে বহুক্ষণ ধরে বুকের ভেতর শ্বাস আটকে রেখেছিল সে। অপরূপা হতভম্ব হয়ে গেল। লোকটা এমন আচরণ করছে কেন? কী হয়েছে?
“আমি… আমি ঠিক আছি। হঠাৎ এমন কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন?”
ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর এলো দ্রুত প্রশ্ন,
“সত্যি ঠিক আছেন?”
“মিথ্যা হবে কেন?”
“পিহু কোথায়? আমার লিটেল কিটেন কোথায়, স্নো হোয়াইট?”
থেমে গেল অপরূপার কণ্ঠস্বর। কেমন অদ্ভুত ব্যকুলতা আভিয়ানের মাঝে। অপরূপা বুঝে উঠতে পারল না কিচ্ছুটি। কেবল নরম স্বরে বলল,
“ও ঘুমাচ্ছে।”
স্বস্তি মিলল আভিয়ানের। একটা দীর্ঘ, ভারমুক্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল সে। যেন কোনো ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন থেকে ফিরে এসেছে কেউ।
“থ্যাংকস গড…”
আভিয়ানের বলা এই ছোট্ট শব্দটুকুর ভেতর এমন স্বস্তি মিশে ছিল যে অপরূপার বুকেও অকারণে একটা অস্বস্তি জন্ম নিল। শুধালো সে,
“কী হয়েছে?”
এবার সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল সে। আভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। মনে হলো নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করছে। কিছু একটা গোপন রাখছে। অথবা কীভাবে বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। অবশেষে ধীরস্বরে প্রশ্ন করল,
“আপনি এখন কোথায় আছেন?”
“একটা ফ্রেন্ডের বিয়েতে।”
“লোকেশন?”
“কেন?”
“লোকেশন দিন।”
“কিন্তু…”
“লোকেশন দিতে বলেছি আমি।”
ধমকে উঠল আভিয়ান। অপরূপা স্থির হয়ে গেল। তার চোখে মুখে অপার বিস্ময়। বলল,
“হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার করছি।”
বলেই লোকেশন শেয়ার করল সে। আভিয়ান চেক করে নিয়ে বাইকের গতি বাড়াল। আজ হেলমেট পর্যন্ত পরেনি সে। পরনে রাতের পোশাকই। এলোমেলো অবস্থা একদম।
“আমি আসছি।”
“কীহ! এই রাতে?”
“হ্যাঁ।”
এবার কণ্ঠটা বদলে গেল। আগের আতঙ্কের জায়গায় নেমে এলো কঠিন দৃঢ়তা।
“আমি আসার আগ পর্যন্ত যেখানে আছেন, সেখান থেকে এক পা-ও নড়বেন না। বুঝতে পেড়েছেন আমার কথা?”
থতমত খেয়ে গেল অপরূপা। বুকটা ধুকপুক করছে তার। হঠাৎ কী হলো? সে ডেকে উঠল,
“মিস্টার আভিয়া…”
তবে পুরো বাক্য আর শেষ করার সুযোগ মিলল না। কল কেটে গেল। অপরূপা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে। মনের ভেতর জমছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। লোকটার কী হয়েছে? এভাবে আচরণ করছে কেন? কেন বারবার তার আর পিহুর খোঁজ নিচ্ছিল? চারপাশে দৃষ্টি বুলাল সে। সবকিছু তো স্বাভাবিকই। অকারণে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি জন্ম নিতে শুরু করল। যেন অদৃশ্য কোনো বিপদ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। স্ক্রিনে কোনো নাম নেই। শুধু সংখ্যার সারি। প্রথমে ধরতে ইচ্ছে করল না তার। কিন্তু পরপর দুবার বাজতেই অবশেষে রিসিভ করল।
“হ্যালো?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা নেই। শুধু ভারী শ্বাস।দমবন্ধ করা এক উৎকণ্ঠার শব্দ। তারপর মএকজন পুরুষের কণ্ঠ। আর সে মানুষটা পরপর যা বলতে শুরু করল সেগুলো শুনতেই মুহূর্তের মধ্যে যেন পৃথিবী থেমে গেল অপরূপার। চোখ জোড়া বিস্ফারিত হয়ে উঠল তার।মুখের সমস্ত রক্ত সরে গেল এক নিমিষে। অপরূপার শ্বাস আটকে এলো বুকের ভেতর।
“না…না!
মাথার ভেতর শুধু কয়েকটা শব্দ আছড়ে পড়তে লাগল,
আগুন, পলাশ, আম্মা, লুপা তারপর…. বাচ্চা দুটো! না!অপরূপার ফোনটা হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। তার চোখে মুখে ভয় নেই, আছে শুধু এক অসহনীয় আতঙ্ক, অবিশ্বাস। ভেঙে পড়ার পূর্বমুহূর্তের নিঃশব্দ যন্ত্রণা। তার ঠোঁট কাঁপছে। শরীর কাঁপছে। তার পরিবার নাকি ঝলসে গিয়েছে, একদম পুড়ে গিয়েছে। না, এসব নিশ্চয় মিথ্যা।
” আমার মা! আমার ভাই!”
মুহূর্তেই হাঁটু দুটো ভেঙে এলো মেয়েটার। সবটাই কেমন দুঃস্বপ্নের মত লাগছে। তার কাছে মনে হচ্ছে মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে। সে মাথা নাড়তে লাগল উন্মাদের মতো।
“না না এটা মিথ্যা।”
একটি ফোনকলের কয়েকটি বাক্য অপরূপার সমগ্র পৃথিবীটাকে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার করে দিল।
যেন সুখের সমস্ত রঙ এক নিমিষে মুছে গিয়ে চারপাশ ঢেকে গেল শুধুই আতঙ্ক, শোক আর অনিশ্চয়তার ঘন অন্ধকারে। অতঃপর একটি অভিশপ্ত রাতে পরিনত হলো তার জীবনে। ঝাপসা চোখ জোড়া বুঁজে আসতে নিল। শরীরটা ঢলে পড়ল নিচে। সব কিছুই স্বপ্ন হোক, ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন!
______________
#চলবে
#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৩৯
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
আকাশটা শোকের চাদরে মোড়া। সকাল থেকে সূর্য উঠেছে বটে, কিন্তু তার আলো মেঘের স্তূপ ভেদ করে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারছে না। চারদিক জুড়ে কেবল বিবর্ণ ধূসরতা। বাতাসে বৃষ্টির পূর্বাভাস, অথচ বৃষ্টি নেই। প্রকৃতিও বুঝি আজ অপেক্ষা করছে একটি ভাঙা পরিবারের শেষ বিদায়ের সাক্ষী হওয়ার জন্য। উঠোনজুড়ে মানুষের ভিড়। চেনা-অচেনা কত মুখ।
কারও চোখে জল, কারও মুখে গভীর বিষণ্নতা।
উঠোনের মাঝখানে পাশাপাশি রাখা দুটি খাটিয়া।
সাদা কাফনে মোড়ানো দুটি নিশ্চল দেহ। দুটি প্রাণ। দুটি সম্পর্ক। দুটি আশ্রয়। যারা একসময় এই বাড়ির প্রাণকেন্দ্র ছিল। আজ তারা নিথর, নিঃশব্দ, চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন। একটি খাটিয়ায় শুয়ে আছে পলাশ। যে মানুষটি নিজের সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে ছোট্ট বোনটির জন্য এক আকাশ সমান ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর পর যে কাঁধে পুরো সংসারের ভার তুলে নিয়েছিল। যে কখনো ভাই ছিল, কখনো অভিভাবক, কখনো বন্ধু। কখনো আবার পিতার শূন্যস্থান পূরণ করার ব্যর্থ অথচ আন্তরিক চেষ্টা। অন্য খাটিয়ায় শুয়ে আছেন আমেনা বেগম। সংসারের মমতার শেষ আশ্রয়। সারা জীবন সন্তানদের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দেওয়া এক নারী। যার হাতের স্পর্শে ঘর মানে ছিল নিরাপত্তা।
যার উপস্থিতিতে দুঃখও কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠত।
আজ সেই হাত দুটো নিস্তব্ধ। সেই মমতা আজ চিরতরে নিশ্চুপ। আর তাদের মাঝখানে বসে আছে অপরূপা।অদ্ভুত নিশ্চুপ, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। তার চারপাশ জুড়ে চলছে কান্না, আহাজারি, মানুষের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু তার নিজের ভেতর আজ কোনো শব্দ নেই। চোখদুটো তার শূন্য, অবসন্ন, নির্জীব। কোনো অশ্রু নেই সেখানে। নেই
কোনো চিৎকার, নেই কোনো ভেঙে পড়া।
মনে হচ্ছে সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত আর্তনাদ, সমস্ত কান্না তার হৃদয়ের গভীরতম কোনো প্রাচীরে গিয়ে জমাট বেঁধেছে। এতটাই জমাট বেঁধেছে যে তা আর অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ কখনো কখনো এমন শোকের মুখোমুখি হয়, যেখানে কান্নাও পথ খুঁজে পায় না। অপরূপা ঠিক সেই অবস্থায় বসে আছে।
নির্বাক, নিষ্প্রাণ।
তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান। দীর্ঘদেহী অবয়বটা যেন আজ আরও বেশি কঠোর হয়ে উঠেছে।মুখাবয়ব গম্ভীর। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখের নিচে স্পষ্ট অনিদ্রার ছাপ। কিন্তু তার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও অপরূপার দিক থেকে সরছে না। সেই দৃষ্টিতে প্রকাশ পাচ্ছে সতর্কতা, উদ্বেগ। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবকিছু ভেঙে পড়লেও সে কেবল একজন মানুষকেই লক্ষ্য করে দাঁড়িয়ে থাকবে। অপরূপাকে।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে নিদ্রা ও জাওভান। নিদ্রার কোলে পিহু। ছোট্ট মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারছে না।
সে কেবল বুঝতে পারছে সবাই কাঁদছে। সবাই তাকে আটকে রাখছে। আর তার মাম্মা অনেক দূরে বসে আছে।
বাড়িতে মোট দুটো দরজা ছিল। একটা পলাশের ঘরে। আরেকটা অপরূপার ঘরে। ওটা ভেতর থেকে লাগানো ছিল। লুপা তার বাচ্চা দুটোকে তৎক্ষনাৎ ওখান দিয়ে বের করে দিয়েছিল। তবে সিলিন্ডার ব্লাস্ট করায় পুরো আগুনটাই লাগে আমেনা বেগমের শরীরে। লুপা অনেক চেষ্টা করেছিল তাদের বের করার। পলাশকে কোনো রকম টেনে আনলেও ততক্ষণে বেশ ভালো মতোই ক্ষত হয়ে গিয়ে ছিল তার। তবে আমেনা বেগমকে বের করতে পারেনি। শেষে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আগুন নেভায়। বের করে আমেনা বেগমকে। নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে। তবে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পলাশের ব্লিডিং এবং বার্ন অনেক বেশি ছিল, আমেনা বেগমেরও। তার উপর তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। কিছু মুহূর্তের মাঝেই সব থেমে গেল। এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু।
অপরূপা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখদুটো অন্যমনস্কভাবে স্থির হলো আমেনা বেগমের মুখের দিকে।
আগুনের ভয়াবহতা অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। মুখের অধিকাংশ অংশ সযত্নে কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
তবুও কিছু দাগ রয়ে গেছে। কিছু নির্মম চিহ্ন। কিছু নীরব সাক্ষ্য। যা চোখে পড়ার মতো নয়, অথচ হৃদয় ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এক মুহূর্তে অপরূপার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তার আঙুলগুলো কাঁপল সামান্য। তারপর ধীরে হাত বাড়াল সে। কী ভীষণ ধীর সেই হাতের গতি। সে ভয় পাচ্ছে। সে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ভাবছে হয়ত, হাত বাড়ালেই কেউ বলে উঠবে,
“আমি আছি মা।”
কিন্তু কেউ বলল না। নীরবতা আগের মতোই স্থির রইল।
অপরূপার কাঁপতে থাকা হাত গিয়ে স্থির হলো মায়ের কাফনের উপর। সাদা কাপড়ের উপর তার আঙুলগুলো থমকে রইল। সেই স্পর্শে কোনো উষ্ণতা নেই। কোনো সাড়া নেই। কোনো স্নেহমাখা হাত এসে তার হাতের উপর রাখা হলো না। এক মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সে মায়ের কাফনের উপর হাত রাখল। ফিসফিস করে বলল,
“মা?”
কেউ উত্তর দিল না। অপরূপার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“মা, তুমি তো বলেছিলে আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। বলেছিলে না পিহুকে বড় হতে দেখবে। বলেছিলে আমি যত বড়ই হই না কেন, তোমার কাছে সেই ছোট্ট মেয়েটাই থাকব। তাহলে চলে গেলে কেন বলো তো?”
থামলে অপরূপা। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, কণ্ঠনালীতে আটকে আসছে প্রত্যেকটি বাক্য।
“আমাকে এতিম করে দিলে কেন? আমি এখন কাকে মা বলে ডাকব? কার কাছে গিয়ে মন খুলে কাঁদব? কার আঁচলে মুখ লুকাব?”
অপরূপার দৃষ্টি সরল পাশের খাটিয়ার দিকে। পলাশ, তার ভাই। তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা। এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত। আচমকাই যেন বুকের ভেতরের বাঁধ ভেঙে গেল। সে ঝুঁকে পড়ল ভাইয়ের খাটিয়ার পাশে। কাঁপা কণ্ঠে ডাকল,
“ভাইয়া তুমি না বলেছিলে আমি কখনো একা হব না? বলেছিলে পৃথিবীর সবাই ছেড়ে গেলেও তুমি থাকবে।বলেছিলে কেউ আমাকে কষ্ট দিলে তার আগে তোমার সামনে দাঁড়াতে হবে। তাহলে তুমি কোথায় গেলে? এভাবে চলে গেলে কীভাবে? একবারও আমার কথা ভাবলে না? পিহুর কথা ভাবলে না? আমাকে কার কাছে রেখে গেলে? আমি এখন কার কাছে যাব বলো?”
অবশেষে কান্নাটা বেরিয়ে এলো। অসংযত। অপ্রতিরোধ্য।
হৃদয়বিদারক। একজন মানুষের কান্না, যে একদিনে নিজের সমস্ত আশ্রয় হারিয়েছে। আভিয়ানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার নিজেরও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
তবুও সে নিজেকে সংযত রাখল। ঠিক তখনই ঠাস করে
একটি তীব্র শব্দে চারপাশ থমকে গেল। অপরূপা বিস্মিত হয়ে মুখ তুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে লুপা।
চোখ দুটো অসম্ভব রকমের লাল হয়ে আছে তার। মুখ অশ্রুসিক্ত। চুল গুলো এলোমেলো। হাতে ব্যন্ডেজ। ঠোঁট জোড়া কাঁপছে তিরতির করে। মনে হচ্ছে সেও নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। কাঁপতে কাঁপতে সে বলে উঠল,
“সবকিছুর জন্য আপনি দায়ী।”
অপরূপা নির্বাক। সে দায়ী? কেন? সে কেন দায়ী হবে?লুপা কাঁদতে কাঁদতেই বলে চলল,
“আপনার জন্য আমার সংসার শেষ হয়ে গেছে। আমার সন্তানেরা তাদের বাবাকে হারিয়েছে। আজ তারা এতিম হয়ে গেল। সব আপনার জন্য।”
জাওভানের মোটেও পছন্দ হলো না লুপার এসব কথা।সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো সে। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আপনি কী বলছেন, বুঝতে পারছেন? আপনার শোক আমরা বুঝি। কিন্তু উনার অবস্থাটাও দেখুন।”
লুপা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। উচ্চারণ করল,
“আমি যা বলছি, সত্যিই বলছি। আপনারা যতই অস্বীকার করুন, সত্য বদলাবে না। যে মানুষটি আমাদের বাড়িতে আগুন দিতে এসেছিল, সে কার জন্য এসেছিল? আমাদের জন্য নয়। তার লক্ষ্য ছিল অপরূপা। কারণ সেই মানুষটাই তো তার প্রাক্তন স্বামী। তার উপর জেদ আমাদের উপর বর্তাল!”
অপরূপার মুখ থেকে সরে যেতে লাগল সমস্ত রক্ত। লুপা থামল না। অবিরত চলল তার মুখ,
“সংসারে কত নারী কষ্ট সহ্য করে। কত অপমান, কত প্রতারণা সহ্য করেও সংসার টিকিয়ে রাখে। আপনিও যদি তা করতেন তাহলে আজ আমার স্বামী বেঁচে থাকত। আমার সন্তানদের মাথার উপর বাবার ছায়া থাকত।”
লুপার বলা প্রতিটি শব্দ তীরের মতো গিয়ে বিঁধছে অপরূপার বুকে। সে চোখ নামিয়ে তাকাল নিচের দিকে। আওড়াল,
“হয়তো…হয়তো সত্যিই আমার দোষ। মেয়েদের এত কিছু ভাবা উচিত নয়। সংসার টিকিয়ে রাখাই উচিত ছিল। আমি পারিনি। আমি ব্যর্থ। আমার কারণেই…সবকিছু আমার কারণেই…”
এতটা সময় মুখ বুজে সবটা শুনে গেলেও এ পর্যায়ে বজ্রধ্বনির মতো গর্জে উঠল আভিয়ান।
“যথেষ্ট!”
মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল পুরো উঠোন। তার চোখ দুটো রক্তিম। নাক বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু সে সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করল না। জাওভান দ্রুত তার হাত ধরল।
“আভি, শান্ত হ।”
আভিয়ান ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল জাওভানের হাত।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের মানুষের দিকে তাকাল।
কণ্ঠস্বর ভয়ংকরভাবে স্থির।
“আর একজন মানুষও যদি অপরূপার দিকে আঙুল তোলে, তবে আমি চুপ করে থাকব না। আপনার স্বামী মারা গেছেন। আমি আপনার শোককে অসম্মান করছি না। কিন্তু এই মেয়েটির মা মারা গেছেন। এই মেয়েটির ভাই মারা গেছেন একই রাতে। একই ঘটনায়। একজন মানুষ তার পুরো পৃথিবী হারিয়েছে। তবুও আপনারা তাকে দোষারোপ করছেন?”
সে সরাসরি লুপার দিকে তাকাল।
“কিছু বলার আগে অন্তত একবার ভাবুন। শোক শুধু আপনার একার নয়। আপনার ক্ষতি হয়েছে, ঠিক। কিন্তু তার ক্ষতি আপনার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। একটি প্রতারক, অপরাধপ্রবণ মানুষের অপরাধের দায় তার প্রাক্তন স্ত্রীর উপর চাপানো যায় না। এটা অন্যায়। এবং আমি সেই অন্যায় সহ্য করব না।”
জাওভান আবারো এগিয়ে এলো। এমন শোকাহত পরিস্থিতিতে আভিয়ানকে না থামালে চলবে না। তবে আভিয়ার গুরুত্ব দিল না। তার কণ্ঠ আরও কঠিন হলো,
“আপনি নারী বলেই এখনো সম্মান দেখিয়ে কথা বলছি। কিন্তু আর একবার কেউ যদি অপরূপাকে দোষারোপ করে…”
থামল সে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল আরো বেশি। ধীরে, স্পষ্ট উচ্চারণে বলল,
“তাহলে আমি ভুলে যাব যে আজ এখানে শোকের পরিবেশ।”
মুহূর্তেই লুপার মা আর ছোট বোন দ্রুত এগিয়ে এসে লুপাকে ধরে ফেলল। মেয়েটা তখন আর নিজের মধ্যে নেই। চোখ-মুখ ফুলে গেছে কান্নায়। বারবার এক কথা বলছে,
“আমার কী রইল? আমার মানুষটা কোথায়? ওকে একবার ডাকো, একবার শুধু চোখ খুলুক।
তার মা তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“শান্ত হ মা, শান্ত হ।”
কিন্তু শোক কি কখনো যুক্তির ভাষা বোঝে? লুপার বুকফাটা আর্তনাদ ভেঙে ফেলল সকল নিস্তব্ধতা। সেই কান্না শুনে উপস্থিত অনেকেই চোখ মুছতে লাগল।
অথচ এসবের মাঝেও অপরূপা অদ্ভুত শান্ত। না, শান্ত নয়। সে শূন্য। মানুষ যখন সহ্যের শেষ সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তখন হয়তো আর কাঁদতেও পারে না।
সে মাটির দিকে তাকিয়ে বসে রইল স্থির। চোখদুটো স্থির, নিষ্প্রাণ।
কিছু না ভেবেই আভিয়ান এসে বসল তার পাশে। কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। হঠাৎ অপরূপা মুখ তুলে তাকাল।
সরাসরি আভিয়ানের চোখে। অনুভূতি শূন্য হয়ে শুধালো,
“সব দোষ আমার, তাই না?”
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল আভিয়ানের।
সে আলতো করে হাত তুলে অপরূপার গালে রাখল।
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“একদম না, একদম এসব ভাববেন না। আপনি কোনো দোষ করেননি। আপনি নির্দোষ। নিজেকে দোষ দেবেন না, প্লিজ।”
অপরূপা কিছু বলল না। আবার সামনে তাকাল।
চারপাশের মানুষ তাদের দিকে কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। কেউ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এ পর্যায়ে একসময় কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ এগিয়ে এলেন। তাদের একজন মৃদু স্বরে বললেন,
“আর কতক্ষণ রাখা যায়? দাফনের ব্যবস্থা করা উচিত। মৃতদের শান্তি দেওয়া প্রয়োজন।”
কথাগুলো শুনে অপরূপা আবার তাকাল প্রথমে মায়ের দিকে। তারপর ভাইয়ের দিকে। দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে।
মনে হলো সে তাদের মুখগুলো হৃদয়ে গেঁথে নিতে চাইছে।
হঠাৎ তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটল। ভাঙা, বিষন্ন হাসি।
“আমাকে একা ফেলে তোমরা শান্তিতে ঘুমাতে যাচ্ছ?আমার কথা একবারও ভাবলে না? আমি যে এতিম হয়ে গেলাম, তোমরা ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব? আমার মেয়েটার কী হবে?” ও তো এখনো জানেই না তার নানুমণি আর মামা আর ফিরবে না।”
আভিয়ানের গলা শুকিয়ে এল। সে ধীরে ধীরে অপরূপার কাঁধে হাত রাখল।
“উঠুন।”
অপরূপা প্রথমে নড়ল না। তারপর হুট করেই যন্ত্রচালিত মানুষের মতো উঠে দাঁড়াল। খাটিয়া দুটো যখন উঠিয়ে নেওয়া হলো, তখন লুপা আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“আমাকে একা রেখে যেও না, আমার ছেলেগুলোর দিকে একবার তাকাও।”
তার দুই ছোট্ট সন্তান বিস্মিত চোখে চারপাশ দেখছে।তারা বুঝতে পারছে না। শুধু মায়ের কান্না দেখে ভয় পাচ্ছে। অপরূপার চোখ বেয়েও এবার নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কোনো শব্দ নেই। শুধু জল। ধীরে ধীরে খাটিয়াগুলো দূরে সরে যেতে লাগল। অপরূপা তাকিয়ে রইল যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ। দৃষ্টি সীমানা পার হতেই বিড়বিড় করে উঠল অপরূপা,
“আমার আর কেউ রইল না, কেউ না। রাস্তায় পড়ে থাকলেও আর কেউ এসে বলবে না, কী হয়েছে। একুল-ওকুল সব হারিয়ে আমি নিঃস্ব। আমার মেয়েটাও নিঃস। কেউ নেই, আর কেউ নেই।”
ধপ করে বারান্দায় বসে পড়ল অপরূপা। আভিয়ান চুপচাপ শুনল। প্রতিটি শব্দ তার বুকেও আঘাত করছে। সেও বসল মেয়েটার পাশে। দূরত্ব রইল কিছুটা। আভিয়ান অতি সহসাই অপরূপার হাতটা নিজের মুঠোয় নিল।অপরূপা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে। চোখদুটো অবসন্ন। আভিয়ান শান্ত স্বরে বলল,
“কে বলেছে আপনি নিঃস্ব? কে বলেছে আপনার মেয়ের কেউ নেই?”
অপরূপা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।জিজ্ঞেস করল,
“কে আছে?”
এক ফোঁটা রক্ত আবার গড়িয়ে পড়ল আভিয়ানের নাক থেকে। সে হাতের পিঠ দিয়ে মুছে ফেলল। তারপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমি আছি।”
মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সময়। অপরূপা তাকিয়ে রইল স্থির চিত্তে। শুধু তাকিয়েই রইল। তারপর আচমকা সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল তার। মুখে হাত চেপে কেঁদে উঠল।
হিচকি তুলে মেয়েটা। নিঃশ্বাস আটকে আসা কান্না। কণ্ঠনালী রোধ হলো। মনে মনে বিড়বিড় করে গেল,
“সব দোষ আমার, সব। আমারই মরে যাওয়া উচিত ছিল। তাহলে আজ আমার মা, আমার ভাই এভাবে চলে যেত না।”
আভিয়ান কোনো বাধা দিল না। মেয়েটা কাঁদুক। সে হাত উঠিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল অপরূপার। ধীরে, স্নেহে, নীরবে। সে জানে শোককে থামানো যায় না। কিছু কান্নাকে বেরিয়ে আসতেই হয়। হয়তো তাতেই মানুষ বেঁচে থাকে। হঠাৎ আভিয়ানের নিজের চোখের সামনে ভেসে উঠল আগুন। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা শিখা। অতীতের কিছু ক্ষত। কিছু হারানোর স্মৃতি। কিছু অসহায় মুখ। তার বুকের ভেতর হঠাৎ তীব্র চাপ অনুভূত হলো।
সে দ্রুত চোখ বন্ধ করল। একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। তারপর আবার চোখ খুলে অপরূপার দিকে তাকাল। কণ্ঠস্বর দৃঢ়, কিন্তু অদ্ভুত কোমল।
“কাঁদুন। যত ইচ্ছে কাঁদুন। কিন্তু নিজেকে দোষ দেবেন না, স্নো হোয়াইট। নিজেকে অপরাধী মনে করে বেঁচে থাকাটা কতটা কষ্টকর, কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা আমি জানি। এই ঘটনার দায় আপনার নয়। আপনি নির্দোষ। আপনি ভুক্তভোগী, অপরাধী নন।”
অপরূপা কেঁদেই চলল। আভিয়ান তার হাত আরও শক্ত করে ধরল। নিজ মনেই আওড়াল,
“আমি কথা দিচ্ছি, আমার স্নো হোয়াইট। আজ যে আপনার চোখে কান্না এঁকেছে, একদিন তার জীবনেই লেখা হবে অনুতাপের ভয়ংকর দীর্ঘতম এক অধ্যায়।”
___________
#চলবে

