#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪৭
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা
_______________________
কেটে গেছে আরও দুটি দিন। আজ বৃহস্পতিবার।সকালের পর থেকেই এহসান মঞ্জিলে বিরাজ করছে ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষটি আভিয়ান। অফিসে যায়নি সে, অপরূপাকেও যেতে দেয়নি। কারণ জিজ্ঞেস করলে শুধু বলেছে,
“আজ ছুটি।”
আর কিছু না। দুপুরে রান্নাঘরের দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে অপরূপা। বহুদিন পর সময় নিয়ে রান্না করেছে সে। একে একে সবার পছন্দের খাবার বানিয়েছে। খাওয়ার সময় সবাই টেবিলে বসলেও সে নিজে বসেনি। নাবিলা এহসান প্রশ্ন করলেন,
“তুমি বসছো না কেন?”
অপরূপা শান্ত স্বরে বলল,
“উনি আসুক। তারপর খাব।”
ইরফান এহসান মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন,
“আভিয়ানের জন্য অপেক্ষা করার অভ্যাস হয়ে গেছে দেখছি।”
অপরূপা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এর মধ্যেই সাইদ বলল,
“পরশুদিন আমরা ব্যাক করছি, আব্বা।”
মুহূর্তেই পরিবেশটা খানিকটা ভারী হয়ে উঠল। ইরফান এহসানের চোখে মুখে স্পষ্ট মলিনতা।
“আরও কটা দিন থেকে যাও।”
সাইদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জবাব দিল,
“অনেকদিন তো থাকলাম। কাজকর্ম জমে আছে।”
নাবিলাও সম্মতি জানাল।
“হ্যাঁ বাবা, আমাদের ফিরতে হবে এবার।”
এরিনা চুপচাপ খাচ্ছিল। অপরূপা হঠাৎ বলল,
“এরিনা থেকে যাক না আর কটা দিন।”
কথাটা শুনে এরিনা চোখ তুলে তাকাল। তারপর ছোট্ট করে হাসল। জবাব দিল,
“না। আমারও যেতে হবে।”
সে গ্লাসের পানি থেকে এক চুমুক নিয়ে বলল,
“ভাবছি এবার বাপির বিজনেসে বসব।”
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল আভিয়ান। হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ। ভ্রমণশেষে ফেরা মানুষের মতো কিছুটা ক্লান্ত, তবু চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক। সে একবার শুধু অপরূপার দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
“উপরে আসুন।”
আর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল আভিয়ান। কয়েক মিনিট পর অপরূপাও এলো। ঘরে ঢুকতেই দেখল আভিয়ান বিছানার কিনারায় বসে আছে। শরীরে কেবল প্যান্ট,আর কিচ্ছু না। উদম শরীরে ঘামের বিন্দু। ফ্যানের বাতাসে তার চুল এলোমেলো হয়ে উড়ছে। অপরূপা এগিয়ে এলো কিছুটা। জিজ্ঞেস করল,
“ডাকছিলেন কেন?”
আভিয়ান ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। তার চোখে সেই পরিচিত দুষ্টুমি। উচ্চারণ করল,
“আগে একটা চুমু দিন তারপর বলছি।”
অপরূপা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ছোট করে ফেলল।
“মজা বন্ধ করুন। এত ব্যাগ কীসের?”
“আপনি দিন দিন খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছেন।”
“আর আপনি দিন দিন বেশি অসহ্য হয়ে যাচ্ছেন।”
“বউয়ের কাছ থেকে এটুকু প্রশংসা পাওয়ারই তো অপেক্ষা করছিলাম।”
অপরূপা বিরক্ত মুখে তাকাল। ঠিক এমন সময় এক আকস্মিক হ্যাচকা টানে শিউরে উঠল তার সর্বাঙ্গ। পরমুহূর্তেই একজোড়া উষ্ণ ও রুক্ষ হাত পরম অবাধ্যতায় জড়িয়ে নিল তার কটিদেশ। মসৃণ শাড়ির অন্তরাল ভেদ করে সেই পুরুষালী হাতের উত্তপ্ত স্পর্শ কোমরের নরম ত্বকে পৌঁছাতেই এক তীব্র বিদ্যুতিন কম্পন জেগে উঠল রমণীর শরীরে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার, কিংবা নিজেকে সামলে নেওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়েই আভিয়ান অতর্কিতে আঁকড়ে ধরল অপরূপার ওষ্ঠাধর। স্তব্ধ হয়ে গেল অপরূপা। তার সমস্ত চঞ্চলতা এক লহমায় পাথর হয়ে জমে গেল। আভিয়ানের সেই গাঢ়, মদির স্পর্শের তীব্রতায় নারী-কায়া থরথর করে কেঁপে উঠল। অবশ হয়ে আসা চোখের পাতা দুটো আপনাআপনিই বুঁজে এলো তার। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় আভিয়ানকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো শক্তি বা মানসিক দৃঢ়তা সে নিজের ভেতর খুঁজে পেল না। বরং নিজের অনিচ্ছা আর নীতিবোধের দেয়াল ভেঙে এক অনাহূত অনুভূতির জোয়ার জেগে উঠতে লাগল মনের গহীনে। আভিয়ানের হাতের বাঁধন ততক্ষণে সমস্ত নিয়ম অগ্রাহ্য করে ছুঁয়ে দিতে লাগল অপরূপার অবাধ্য শরীর। সেই স্পর্শের আলোড়নে অপরূপার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে কাঁপন আরও তীব্রতর হলো।
অবশেষে সেই দীর্ঘ, নিবিড় ও তৃষ্ণার্ত চুম্বনের ইতি ঘটিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল আভিয়ান। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে তখন দুজনেরই শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক, উত্তাল। এক তীব্র, অবাধ্য অস্থিরতা ভর করেছে দুজনের বুকেই। আভিয়ান সেখানে আর এক মুহূর্তও ক্ষণক্ষেপণ করল না। সে ভালো করেই জানে, এই মায়াবী আবহে আর কিছুক্ষণ অবস্থান করলে অনুভূতির রাশ টেনে ধরা অসম্ভব হয়ে পড়বে, ঘটে যেতে পারে এর চেয়েও গভীর কোনো উম্মাদনা। দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল আভিয়ান। যাওয়ার আগে দরজার চৌকাঠ থেকে কেবল গম্ভীর, বুজে আসা কণ্ঠে আওড়াল,
“শাড়িটা পরে সুন্দর করে সাজবেন।”
আর কোনো বাক্য বিনিময় হলো না। সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল ওয়াশরুমের দরজা। অপরূপা যেমন ছিল, তেমনই স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝে। তার চোখে-মুখে অতলান্ত বিস্ময়ের ঘোর, মনের গহীনে এক অদ্ভুত, অনাস্বাদিত আলোড়ন। বুকের ভেতরের ধুকপুকুনিটা স্বাভাবিক গতি হারিয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ক্ষণকাল আগে ঘটে যাওয়া এই প্রলয়ঙ্করের তীব্রতা সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। নিজের অজান্তেই হাত দুটো ছুঁয়ে দেখল নিজের ওষ্ঠাধর। তার আঙুলের ডগাগুলো অবাধ্য শিহরণে কাঁপছে এখনো। পরপর তাকাল ব্যাগ গুলোর দিকে। দেখল ভেতরে কালো রঙের ভারি স্টোনের কাজ করা একটি শাড়ি। সাথে একই রকম ব্লাউজ। কিন্তু কেন? সাজতে কেন বলল? সে সিদ্ধান্ত নিল এখনই তৈরি হবে না। আগে দেখা যাক, রহস্যময় মানুষটা আসলে কী পরিকল্পনা করে রেখেছে। মিনিট বিশেকের মাঝেই ওয়াশরুমের দরজাটা ধীর শব্দে খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো আভিয়ান। এক হাতে ধরা সাদা টাওয়াল, অন্য হাতে ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে কয়েক পা এগিয়ে এলো ঘরের ভেতর। সদ্যস্নাত শরীর থেকে ভেসে আসছে সাবানের মৃদু গন্ধ। কপালের কোণে এখনো কয়েক ফোঁটা জল আটকে আছে, যা ঘরের উজ্জ্বল আলোয় চিকচিক করে উঠছে।
চোখে মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি। যেন বহুদিনের ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে কোথাও রেখে এসেছে সে। ঘরের অপর প্রান্তে বিছানার ধারে বসে আছে অপরূপা। তার পাশে সুন্দর করে ভাঁজ করা অবস্থায় রাখা কালো শাড়ি, ব্লাউজ আর কয়েকটি শপিং ব্যাগ। আভিয়ানকে বের হতে দেখেই সে মুখ তুলে তাকাল। তারপর ব্যাগগুলোর দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে আবার আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এসব কেন?”
আভিয়ান টাওয়ালটা কাঁধে ফেলে সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল,
“কোনগুলো?’
“এই শাড়ি, চুড়ি, গয়না সবকিছু। কেন রেডি হতে বললেন?”
আভিয়ান বিষয়টিকে অত্যন্ত সাধারণ কিছু হিসেবে দেখল। গম্ভীর মুখেই বলল,
“পার্টিতে যাবেন তাই। দ্রুত করুন।”
অপরূপা আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তার স্বভাবে কৌতূহল বরাবরই প্রবল। তাই কয়েক মুহূর্ত পর আবার বলল,
“কীসের পার্টি?”
“ফুয়াদ দেশ ছাড়ছে, তাই পার্টি।”
“কেন? হঠাৎ…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আভিয়ান ধীর, স্থির পদক্ষেপে তার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল। তার চোখদুটোতে পরিচিত সেই দুষ্টু দীপ্তি। যে দীপ্তি দেখলে বোঝা যায়, মানুষটা এখন কোনো যুক্তির ধার ধারে না।
অপরূপা অজান্তেই চুপ হয়ে গেল। আভিয়ান তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“এরপর যতগুলো শব্দ বের হবে আপনার মুখ থেকে, ততগুলো চুমু এসে পড়বে আপনার ঠোঁটে। তাই প্রশ্ন কম করুন, মিসেস আভিয়ান।’
অপরূপা কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর চোখ গোল করে বলে উঠল,
“অসভ্য!”
শাড়িটা তুলে নিয়ে প্রায় তড়িঘড়ি করেই ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল সে। পেছন থেকে ভেসে এলো আভিয়ানের চাপা হাসির শব্দ। প্রায় চল্লিশ মিনিট ওয়াশরুমের দরজা খুলল। বেরিয়ে এলো অপরূপা।
কালো রঙের শাড়িটা যেন তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। গভীর কৃষ্ণবর্ণ কাপড়ের উপর সূক্ষ্ম স্টোনের কাজগুলো আলো পেয়ে ক্ষুদ্র নক্ষত্রের মতো ঝিলমিল করছে। খোলা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে টাই ঠিক করছিল আভিয়ান। সাদা শার্ট। কালো ওয়েস্টকোট। তার উপর নিখুঁতভাবে পরা স্যুট। হাতে রুপালি ঘড়ি। চুলগুলো সুন্দর করে সেট করা। একেবারে প্রস্তুত সে। কিন্তু অপরূপাকে দেখামাত্রই তার হাতের গতি থেমে গেল। চোখ জোড়া স্থির হলো তার। সে নিজেও বুঝতে পারল না কতক্ষণ তাকিয়ে ছিল। দৃষ্টি সরানোর প্রয়োজনীয়তাই ভুলে গিয়েছে সে। অপরূপা অবশ্য তা খেয়াল করল না। সে সরাসরি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চুলগুলো বেঁধে ফেলার জন্য হাত তুলতেই পেছন থেকে আভিয়ানের কণ্ঠ ভেসে এলো।
“চুল খোলা রাখুন, স্নো হোয়াইট।”
অপরূপা আয়নার ভেতর দিয়ে তার দিকে তাকাল।
চোখে মুখে তার দ্বিধা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর চুল বাঁধল না। খোলা রেখেই ঘুরে দাঁড়াল।
“পিহু তো ঘুমাচ্ছে। ও যাবে না?”
” যাবে। উঠিয়ে রেডি করান।
আভিয়ান বিছানার পাশে রাখা আরেকটি ব্যাগের দিকে ইশারা করল।
“ওর জন্যও ড্রেস আনা হয়েছে।”
অপরূপা মাথা দুলাল। তারপর হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই বলল,
“খাবেন না?”
“ইচ্ছে করছে না।”
“আমি নিজে হাতে রান্না করেছি।”
কথাটা শুনে আভিয়ান থেমে গেল। তার চোখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল। কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে রইল অপরূপার দিকে। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
“তবে তো খেতেই হবে।”
অপরূপার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিটা আভিয়ানের চোখ এড়াল না। সে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“আপনি পিহুকে রেডি করে নিচে আসুন। একসাথে খাব।”
অপরূপা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“আচ্ছা।”
দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে গেল আভিয়ান। যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেছে। কয়েক সেকেন্ড পর ফিরে তাকাল। অপরূপা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
” কী হলো?”
আভিয়ান মুহূর্তেই কয়েক পা এগিয়ে এলো। ঠোঁট ছোঁয়াল অপরূপার ললাটে। উচ্চারণ করল,
“এটা নজর টিকা।”
আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না আভিয়ান। সে ঘুরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দরজা বন্ধ হওয়ার ক্ষীণ শব্দটা মিলিয়ে যেতেই ঘর আবার নীরব হয়ে উঠল। অপরূপা স্থির দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি। সামান্য মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বলল,
“লোকটা মন্দ না।”
_____________
আলো ঝলমলে পরিবেশ। রিসোর্টের পুরো প্রাঙ্গণ মানুষের কোলাহলে মুখর। সুইমিং পুলের নীলাভ জলরাশি চারপাশের আলোকসজ্জার প্রতিফলনে আরও ঝলমলে হয়ে উঠেছে। দূরে লাইভ মিউজিক চলছে। কেউ গল্পে মশগুল, কেউবা ছবি তুলতে ব্যস্ত। সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বসিত। সেই ভিড় থেকে কিছুটা দূরত্বে পুলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল অপরূপা। কালো শাড়িতে তাকে আজ অন্যরকম লাগছে। তার দৃষ্টি মাঝে মাঝে ঘুরে যাচ্ছে সামনের দিকে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আভিয়ান কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছে। কেউ করমর্দন করছে, কেউ শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, কেউ আবার মজা করে কিছু বলছে। অপরূপা এতক্ষণে বুঝে গেছে পার্টিটা ফুয়াদের বিদায় উপলক্ষে হলেও আজ উপস্থিত অধিকাংশ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সে আর আভিয়ান। পিহু আছে নিদ্রার কাছে। তাই আপাতত সে একাই। ঠিক তখনই হঠাং ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠম্বর।
“এখানে একা একা দাঁড়িয়ে কী ভাবছেন, মিসেস আভিয়ান?”
অপরূপা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। দেখতে পেল আভিয়ানকে। পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার সামনেই। অপরূপা জবাব দিল,
“কী আর ভাবব বলুন? আপনি তো খুব ব্যস্ত।”
“মিথ্যা অপবাদ।”
“তাই নাকি?”
“অবশ্যই।”
আভিয়ান নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের উপর হাত রাখল।
“আমি তো প্রতি ত্রিশ সেকেন্ড পরপর আপনার দিকেই তাকাচ্ছি।”
অপরূপা ভ্রু তুলল। শুধালো,
“কাজকর্ম নেই আপনার?”
আভিয়ান ঝুঁকে এলো সামান্য। বলল,
“আমার কাজ আমার ওয়াইফিকে সময় দেওয়া।”
অপরূপা হাসলো। তাকাল আভিয়ানের চোখের দিকে। বলে উঠল,
“আপনি নির্দ্বিধায় আরো ভালো কিছু ডিজার্ভ করতেন আভিয়ান।”
থমকে গেল আভিয়ান। অপরূপা কেন হঠাৎ এমন কথা বলছে। সে এগিয়ে এসে রমণীর বাহুতে হাত রাখল।
“কী হয়েছে স্নো হোয়াইট? কেউ কিছু বলেছে আপনাকে? এমন কথা কেন বলছেন?”
অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সরাসরি কে-ই বা কিছু বলবে? তবে তাকে নিয়ে কানাঘুঁষা ঠিকই চলছে। সে ক্ষীণ হেসে জবাব দিল,
“কেউ কিছু বলেনি। তবে আমাকে বিয়ে করাটা ঠিক হয়নি আপনার। আমার হৃদয়, শরীর একটা সময় অন্যের দখলে ছিল। বিষয়টা আজ না-হয় কাল ঠিকই আপনাকে আফসোসে পোড়াবে। আপনি নির্দ্বিধায় খুব ভালো একটা মানুষ, তবে বাস্তবতা এটাই যে অতীত গুলো কেউই মেনে নিতে পারে না। পিহু আপনার সন্তান নয়। আমাকে নিয়ে কখনো না কখনো আপনার আফসোস ঠিকই হবে।”
চোয়াল শক্ত হলো আভিয়ানের। অপরূপার কথা গিলো তার একদমই পছন্দ হয়নি। এই বুঝল তাকে? সে এমন? অতীত নিয়ে যদি তার এতই সমস্যা থাকত তবে সে বিয়ে করত? মেয়েটা তাকে এখনো ভরসা করে উঠবে পারছে না?
“এই চিনলেন আপনি আমাকে?”
“আপনি ভুল বুঝছেন। বিষয়টা চেনা জানার নয়। বিষয়টা বোঝার। বাস্তবতার।”
অপরূপার শীতল কণ্ঠস্বর। আভিয়ান আরো খানিকটা এগিয়ে এলো। উচ্চারণ করল,
“যদি এটা বাস্তবতা হয়ে থাকে তবে এই বাস্তবতা পরিবর্তন করে দেখাব আমি। বাস্তবতার কাছে হেরে যাওয়ার ছেলে আমি নই। জিতে আমি দেখাবই।”
অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ছেলেকে বোঝানো দুষ্কর। সে তাকাল সামনের দিকে। এমন সময় আভিয়ানের ডাক পড়ল। সে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“আমি আসছি, এখানেই দাঁড়ান।”
পা বাড়াল আভিয়ান। অপরূপার ভালো লাগছে না এসব। মনের মাঝে যেই দ্বিধা তা হাজার চেয়েও সরাতে পারছে না সে। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সে পুলের পাশ ধরে হাঁটতে লাগল। চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছিল।
এমন সময় তার কানে ভেসে এলো কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মেয়ের কথোপকথন।
“ও-ই না আভিয়ানের ওয়াইফ?”
“মনে হয়।”
“সিরিয়াসলি বলছি, আমি এখনও অবাক।”
“কেন?”
“আভিয়ানের মতো একটা ছেলে! শেষ পর্যন্ত বাচ্চাসহ একজন মেয়েকে বিয়ে করল!”
“আমিও ভাবিনি।”
“আমি হলে লাইফটাইম রিগ্রেট করতাম।”
“আভিয়ানের রুচি নিয়ে আমার যথেষ্ট প্রশ্ন আছে।”
প্রতিটি শব্দ বাতাস কেটে এসে লাগল অপরূপার বুকে।অপরূপা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। কথাগুলো কানে এসেছে যদিও কিন্তু গুরুত্ব দেওয়ার ইচ্ছে হলো না। মানুষের মুখ বন্ধ করার ক্ষমতা তার নেই। তবে নিজের মর্যাদা ধরে রাখার ক্ষমতা তার আছে। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল এক অচেনা যুবক। হাতে পানীয়ের গ্লাস। মুখে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হাসি।
“হ্যালো, মিস। আভিয়ানের ওয়াইফ, রাইট?”
অপরূপা ভদ্রভাবে তাকাল। জবাব দিল,
“জি।”
“আমি রাদাফ চৌধুরী। আভিয়ানের ক্লাসমেট ছিলাম সাথে ফুয়াদের কাজিন।”
রাদাফ ছেলেটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। যেভাবে তাকাচ্ছে, সেটা অপরূপার মোটেও ভালো লাগল না। রাদাফ বাঁকা হাসল। উচ্চারণ করল,
“আভিয়ানের চয়েস বরাবরই ভালো। বাই দ্য ওয়ে, আপনার নামটা?”
অপরূপার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল মুহূর্তেই। সে সৌজন্য বজায় রাখতে জবাব দিল,
“অপরূপা। আমি… আমি একটু আসছি।
অপরূপা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু রাদাফ আবার সামনে এসে দাঁড়াল। অনুমতি ছাড়াই আঁকড়ে ধরল অপরূপার হাত। চমকে উঠল অপরূপা।
“আরে মিস, রিল্যাক্স।
অপরূপা ভ্রু কুঁচকাল। হাত ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে লাগল সে।
“আমাকে যেতে দিন।”
“এত তাড়া কিসের?”
অপরূপার অস্বস্তি বাড়তে লাগল। রুক্ষ হয়ে এলো তার কণ্ঠস্বর,
“আমি এসবে অভ্যস্ত নই, হাত ছাড়ুন আমার।”
” আরে, আমরা আমরাই তো। চলুন, একটু ডান্স করি?”
কথাটা বলেই রাদাফ টেনে আনল অপরূপাকে। জড়িয়ে ধরল কোমর। শরীরটা রিরি করে উঠল অপরূপার। সে চড় বসিয়ে দিল রাদাফের গালে। মুহূর্তেই রেগে গেল রাদাফ। চেপে ধরল গাল,
“ইয়্যু ইডিয়েট, স্টুপিড গার্ল। তোর সাহস কী করে হয় আমাকে চড় মারার? এমনিতেই তো খাওয়া মাল, দয়া মায়া করে বিয়ে করেছে আভিয়ান। আবার তেজ তো মাথার উপর।”
অপরূপা ধাক্কা দিল রাদাফকে। একটা অপরিচিত ব্যক্তি কী করে তার সাথে এমনটা করতে পারে? কোথায় আভিয়ান? এই মুহূর্তে যে আভিয়ানকে তার দরকার। খুব করে দরকার। কান্না পাচ্ছে রমণীর। কণ্ঠস্বর কাঁপছে।
“ছ ছাড়ুন আমাকে। আমি কিন্তু চিংকার করব।”
কিছুটা দূরেই চলে এসেছে সে। ভেতের ফুল স্পিডে গান বাজছে। চিৎকার করলেও শুনবে কিনা সন্দেহ। রাদাফ ছেলেটা ঠোঁট কামড়ে হাসল। উচ্চারণ করল,
“ওকে সেক্সিগার্ল, লেটস স্ক্রিম। তোমার মুখে চিৎকারটা সেক্সি শোনা….”
বাক্য শেষ করার সুযোগ পেল না রাদাফ। পরের মুহূর্তেই একটা প্রচণ্ড আঘাতে সে পেছনে হোঁচট খেল। রাদাফ তাল সামলে সামনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল
আভিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে ভয়ংকর রাগ। মুহূর্তেই বজ্রধ্বনির ন্যায় গর্জে উঠল সে,
“তোর সাহস কী করে হয় আমার ওয়াইফকে টাচ করার? তোর ওই হাতটা যদি আমি না ভেঙেছি তবে আমার নামও আভিয়ান এহসান নয়।”
বলতে বলতেই আভিয়ান আরেকটা আঘাত বসাল রাদাফের মুখে। ছিটকে পড়ে গেল রাদাফ। মুখ ঘুরিয়ে পেছনে ঘোরার সময় টুকুও সে পেল না। তার আগেই একের পর এক আঘাত এসে পড়ল তার শরীরে। এক পর্যায়ে আভিয়ান তার চুল চেপে ধরে আঘাত করল মেঝের সাথে। তৎক্ষনাৎ মাথা ফেটে গলহল করে বের হতে লাগল তাজা রক্ত। চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখে হাত পা কাঁপছে অপরূপার। মুহূর্তের মাঝেই কী থেকে কী হয়ে গেল। মুখ ফুটে যে কিছু বলবে সেই শক্তি বা সাহস টুকুও পেল না। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল।
“ইউ আর ফাঁকিং বাস্টার্ড, মাদারফাঁকার। তোর সাহস কী করে হয় আমার ওয়াইফের দিকে হাত বারানোর? মরার সাধ জেগেছে তোর? তুই কিনা আমার স্নো হোয়াইটের হাত ধরেছিস?”
বলেই শক্ত হাতে রাদাফের নাক বরাবর ঘুষি মারল আভিয়ান। সাথে সাথে রাদাফের নাক দিয়ে গল গল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ল শুভ্র টাইলসে। যতটুকু জ্ঞান ছিল অবশেষে সেটুকুও হারাল। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রইল ফ্লোরে। ওদিকে অপরূপা তাকিয়ে আছে কেবল আভিয়ানের দিকেই। লোকটাকে এভাবে রেগে যেতে সে কখনই দেখেনি। সব সময় দেখে এসেছে গম্ভীর, শান্ত ধাঁচের। তার উপর লোকটার চোখ মুখ রাগে লাল হয়ে আছে একদম। কপালের, হাতের রগ গুলো ফুলে উঠেছে। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে পড়েছে অনেকটাই।
“আর কোথায় টাচ করেছিস বল? বল বলছি? তোকে তো আমি আজ মেরেই ফেলব। তুই আমার কলিজায় হাত দিয়েছিস শুয়োরের বাচ্চা।”
এতক্ষণে হুঁশ ফিরল অপরূপার। সম্পূর্ণ শরীর তার কাঁপছে থরথর করে। চোখ বেয়ে গড়াচ্ছে অশ্রু। এমন খারাপ মানুষও হয়? চেনে না জানে না এমন নোংরা আচরণ! আভিয়ান উঠে দাঁড়াল। রাদাফ অচেতন। তার বুক বরাবর লাথি মারল আভিয়ান। ছুটে এলো অপরূপার কাছে। মেয়েটাকে কিছু না বলেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। এতটাই শক্ত করে ধরেছে যে অপরূপার দম আঁটকে আসছে। তবুও অপরূপা ছাড়াল না। বরং নিজেও জড়িয়ে ধরল আভিয়ানকে। শক্ত মেয়েটা কেঁদে উঠল শব্দ করে। আভিয়ানের বুকে মুখ লুকিয়ে খামচে ধরল তার পিঠ। কাঁপা গলায় থেমে থেমে বিড়বিড় করল,
“কেন আমার সাথেই এমন হয়? কেন?”
অস্থির হয়ে উঠল আভিয়ান নিজেও। শরীর কাঁপছে রাগে। অনুভব করল নাক থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। সে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল। অপরূপার দুগালে হাত রেখে পুরো মুখশ্রী ভরিয়ে দিতে লাগল ঠোঁটের স্পর্শে। অস্থির চিত্তে আওড়াল,
“এই অপ্সরা, শুনুন না। কাঁদবেন না আপনি, একদম কাঁদবেন না। ওকে মেরে ফেলি হ্যাঁ? বলুন না? আপনি শুধু একবার অনুমতি দিন, শুধু একবার।”
অপরূপার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সে কেঁদেই চলেছে। চোখ তুলে তাকানোর শক্তিটুকুও হারিয়েছে রমণী। অথচ আভিয়ান একদমই সহ্য করতে পারছে না তার স্নো হোয়াইটের এই ক্রন্দনরত মুখটা। তার হৃদয়টা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আসছে। বারবার ঘাড় বাঁকাচ্ছে ছেলেটা।
“এই, কথা বলুন। কথা বলুন স্নো হোয়াইট, ওকে মেরে ফেলি? কোথায় ছুঁয়েছে বলুন না?”
অপরূপা নিজেও নিজের মাঝে নেই। সে নিজের কান চেপে ধরল। পরপর বুঁজে এলো তার চোখ। অস্পষ্ট হয়ে এলো সবকিছু। রমণী ঢলে পড়ল আভিয়ানের বুকে। আভিয়ান জাপ্টে ধরল। হৃৎস্পন্দন থেমে গেল বুঝি। কী হলো তার অপ্সরার? আভিয়ান উন্মাদ হয়ে উঠল। সে অপরূপার গাল স্পর্শ করল। ডাকল,
“স্নো হোয়াইট, এই শুনছেন? তাকান? তাকান?”
না, অপরূপা তাকাচ্ছে না। কোনো সাড়া নেইরতার, অপরূপার চোখদুটো বন্ধ। মুখশ্রী অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।
চারপাশের পৃথিবী আচমকা অর্থহীন হয়ে উঠল আভিয়ানের কাছে। তার নাক বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের স্রোতটাও তখন আর গুরুত্ব পেল না। এক হাতের পিঠ দিয়ে দ্রুত মুছে ফেলল সে। কোনো সময় নষ্ট না করে অপরূপাকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট করে চুমু খেল তার ঠোঁটে। পরপর হাঁটা ধরল গাড়ির দিকে। চোখেমুখে তখন একটাই কথা স্পষ্ট ভয়। নির্মম, অস্থির, অসহায় ভয়।
বুকের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন আছড়ে পড়ছে।
কী হয়েছে অপরূপার? কেন এমন হলো? আর কেন আজ তার নিজের শরীরটাও অদ্ভুতভাবে সাড়া দিচ্ছে না?সে ঠিক নেই। তার স্নো হোয়াইটও ঠিক নেই। এই মুহূর্তে কিছুই ঠিক নেই।
________
#চলবে

