#ডাকপাড়ি
#পর্ব_২৫
#আফনান_লারা
________
জনাব হাবিবুল্লাহ তার স্ত্রী এবং বোনকে নিয়ে চলে যাবার পর থেকে “হাবিজাবি” বাড়িতে নিরবতা পালন হচ্ছে।কেউই ড্রয়িং রুম ছাড়েনি।যে যার জায়গায় বসে গভীর ভাবনাচিন্তা করছে।এমনটা তারা কেউ আশা করেনি।ফারাজ অনেকক্ষণ বসে ছিল সকলের মন্তব্য শোনার জন্য।কিন্তু কেউ কিছু বলছেনা দেখে সে উঠে চলে যাওয়া ধরতেই দাদাজান অবশেষে মুখ খুললেন।বললেন,’তোমার কি পছন্দ হয় মেয়েটাকে?সব তো শুনলে।আমি এ ব্যাপারে জোর দেবোনা।তোমার জীবন,তুমি একটা মানুষের সাথে সংসার করবে।তোমার মত সবচাইতে জরুরি।বলো তোমার মত’
‘বড়দের বুদ্ধি নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ।আমি আপনাদের মতের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিবো।আর আমি জানি আপনারা আমার জন্য খারাপ কিছু চয়েজ করবেননা”
ফারাজ চলে গেলো কথাটি বলে।দাদাজান বুঝে গেলেন ফারাজের মতামত।মিসেস সোনালী ওনার দিকে চেয়ে আছেন কি হবে তা শুনার জন্য।সোনালীর দিকে চেয়ে এবার বেলায়েত হোসেন বললেন,’এই পরিবার বাদ।আমার হাতে আরও মেয়ে আছে,দেখি।একজনকে ভাল লেগে যাবে
আপাতত এটা বাদ বলতে লোক লাগিয়ে খবর নেবো ঘটনা সত্যি কিনা তারপর সিদ্ধান্ত নিব’
মিসেস সোনালীর মুখে হাসি ফুটলো।তিনি খুশি হয়ে রান্নাঘরে চলে গেছেন।শ্বশুরের উপর ভীষণ খুশি হলেন তিনি।তাই ওনার পছন্দের পাকোড়া বানাবেন এখন।মন ভাল থাকলেই মজার মজার খাবার বানান মিসেস সোনালী।এখনও তাই।
দাদাজান মুখ ভার করে বাগানের দিকে গেছেন।
ফারাজ তার রুমে আসতেই হঠাৎ প্রতিমার কথা মনে পড়ে গেলো।ড্রয়ার খুলে পেন্সিলে আঁকা তার একটি ছবি সামনে ধরে চেয়ে থাকলো ফারাজ।
‘এই মেয়েটিকে দেখলে দাদাজান এক দেখাতেই হ্যাঁ বলে দিতেন।কিন্তু আমার কি ভাগ্য!হাজার চেষ্টা করেও তাকে ধরে রাখায় অক্ষমই রয়ে গেলাম। কেন যে সেই দিনে ওর সাথে জড়িয়ে গেছিলাম।কেন যে আমাদের দেখা হলো।
আচ্ছা!যাকে পাবোনা তার সাথে এত গল্প কেন রটে?যাকে নিজের পাশে দাঁড় করাতে পারবোনা তার সাথে মনের মিল কেন হয়?
কেন একটা মানুষ জীবনে এসে জীবনকে বদলে দিয়ে সেই মানুষটা নিজেই চলে যায়?তাহলে সেই খনিকের আনন্দ জীবনে কেন আসে?আগেই তো ভাল ছিলাম।অল্প সময়ে অধিক আনন্দ জীবনে এসে আবার অল্প সময়েই চলে যায় জীবনকে অন্ধকার করে দিয়ে।
না সেদিন প্রতিমার প্রেমে পড়তাম আর না আজ তার জন্য বুক পুড়তো!
যাকে পাবোনা তাকে নিয়ে কত কল্পনা ছিল।মানুষ কল্পনা করে না পাওয়ার জন্যই।কারণ কল্পনা বাস্তব হয়না বলেই সেটা কল্পনা!’
ছবিটা আগের জায়গায় রেখে ফারাজ চুপ করে বসে থাকলো বিছানায়।কাল একবার পার্কে যাবে।নতুন ছবি আঁকবে।অনেকদিন ছবি আঁকা হয়না।পার্কে যাওয়া ছাড়া ছবিতে মন বসবেনা।
মেঘে ডাক দিলো তখন।ফারাজ বিছানায় উঠে সেই পাশের জানালাটা টান দিয়ে আটকে দিয়েছে।
বাতাসে জানালা বাড়ি খাচ্ছিল।সিরিয়াস সময়ে কোনো কিছুর শব্দ ফারাজের পছন্দ নয়।জানালা বন্ধ করে রুম থেকে বের হয়েছে সে।
পূর্ণতার রুম থেকে কিসের যেন আওয়াজ বের হচ্ছে।ফারাজ কৌতূহল নিয়ে দেখতে গেলো সেদিকে।
এসে দেখলো পূর্ণতা জানালার দ্বারে বসে জানালা ধরে রাখছে জোর দিয়ে যেন না আটকে যায়।এদিকে ফারাজ বন্ধ করে এসেছে আর এদিকে পূর্ণতা চাইছে যেন জানালা না আটকে।মেঘ ডাকার পরেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।পূর্ণতা চোখ দুটো বন্ধ করে জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টির পানিতে ভিজছে।
হাবিজাবির জানালাগুলোর উপর ছাউনি নেই বলে বৃষ্টি হলেই পানির ঝাঁপটা ভেতরে ঢুকে পড়ে।সেই পানিতেই ভিজছে পূর্ণতা।ফারাজ অবাক হয়ে দেখছিল।সেই জায়গা দিয়ে মিসেস সায়না যাচ্ছিলেন তখন।ফারাজকে মূর্তির মন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি নিজে ওর পেছনে এসে দেখলেন ও আসলে কি দেখছে।ভেতরে বসে থাকা পূর্ণতাকে দেখছে বলে তিনি মুচকি হাসলেন।এরপর ফারাজের কান টেনে ধরে বললেন,’আব্বাকে বলবো?’
ফারাজ হকচকিয়ে কাকির দিকে তাকালো।কাকি হাসছেন অনবরত।সে কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না,এদিকে মিসেস সায়না হাসির কারণে কিছু বলতেই পারছেননা।শেষে ফারাজ মুখে হাত রেখে বললো,’এমনি দেখছিলাম এর বাইরে কিছুইনা।কাকি হেসোনা প্লিজ।পূর্ণা জানলে নিজেকে অনেক কিছু মনে করবে। ও আসলে কিছুইনা।বাদামের খোসার মতন একেবারে’
মিসেস সায়না কোমড়ে হাত রেখে বললেন,’তুমি কি জানো ভাজা বাদাম খোসা সহ খেলে আলাদা টেস্ট পাওয়া যায়?’
‘জানিনা তো’
‘তবে খেয়ে দেখবে একদিন তারপর পূর্ণতার মূল্য বুঝতে পারবে,তুমি তো ওরে খোসা বললে।’
ফারাজ লজ্জা পেয়ে মাথার চুল চুলকে চলে গেলো ওখান থেকে।
———–
চায়ের কাপ হাতে সারথি চুপটি করে বসেছিল।আনাফ বাইরে জহিরের সাথে আলাপ করছে সারথিকে নিয়ে।জহির আনাফকে চিনেছে।একদিন পরীক্ষার হলে তাদের সিট পাশাপাশি পড়েছিল।কথায় কথায় জহির জানতে চাইলো সারথির এই হাল কেন হয়েছে। সে ভেবেছে সারথি আনাফের স্ত্রী। আনাফ কথাটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে গেছে।এই টপিক নিয়ে আর আলোচনা করেনি।
এরপর জহিরকে বিদায় দিয়ে আনাফ রুমে ঢুকতেই দেখলো সারথি কাঁদছে। আনাফ কোনো শব্দ করেনি।চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।সারথি আওয়াজ করে কাঁদছিল না মোটেও।আনাফ শুধু ওর চোখ মোছা দেখছে। একটা সময়ে সারথির অশ্রু গড়ানো বন্ধ হলো।সে বাকি চা টুকু খেয়ে টেবিল হাতিয়ে তাতে কাপটা রাখে।আনাফ এবার ওর কাছে এসে বললো,’আমি চাই আপনি আমার সাথে আমার বাসায় চলুন’
‘আমি কোথাও যেতে চাইনা।আমাকে আমার পথে চলতে দিন প্লিজ।আপনার কোনো অধিকার নেই আমার লাইফে ইন্টারফেয়ার করার’
‘একটা মানুষ যখন বারবার মরতে চাই তখন তার মাঝে তার বোধবুদ্ধি বলে কিছু থাকেনা তখন মনুষ্যত্ব দিক দিয়ে অন্য একটা মানুষকেই দায়িত্ব টা নিতে হয় ‘
‘এটা কোথাও লেখা নেই।আমায় একা থাকতে দিন এটাই আপনার করা মহৎ উপকার হবে আমার জন্য’
‘তা হচ্ছেনা।আপনি মেন্টালি দূর্বল হয়ে গেছেন।ডাক্তার হিসেবে আপনাকে ফেলে চলে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। চলুন আপনাকে আপনার বাসাতেই পৌঁছে দিয়ে আসি’
সারথি বিরক্ত হয়ে নামলো বিছানা থেকে।সে তার বাড়িতে যেতেই রাজি।
আনাফ ওর হাতটা ধরে বললো,’সামনে লিফট আছে তাই ধরলাম হাত,অন্য কিছু ভাবিয়েননা’
সারথি আনাফের সাথে চুপচাপ চলছে।গাড়ীতে বসার পর আনাফ ঝুঁকে ওর সিট বেল্টটা লাগিয়ে দিয়ে ঘুরে এসে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসলো।গাড়ী চলছে তার গতিতে।অনেকক্ষণ পর সারথির মনে হলো আনাফ ওকে বাড়ির দিকে নিচ্ছেনা তাই সন্দেহ নিয়ে সে প্রশ্ন করলো এত দেরি কেন হচ্ছে।আনাফের ঠোঁটে হাসি ভাসছে কেবল।সারথি সেটা দেখেনি।আনাফ চুপ বলে সারথি আবারও জানতে চাইলো এক কথা।
আনাফ মোড়ে ঢুকে বললো,’আমরা আমার বাসায় যাচ্ছি,হাবিজাবিতে না’
‘আপনি বলেছিলেন আমাকে আমার বাড়িতে দিয়ে আসবেন।তাহলে কথার খেলাপ কেন করছেন?’
‘সবসময় আপনার কথায় কেন চলতে হবে আমায়?আপনাকে আপনার বাড়িতে রেখে আসলে আবারও সুইসাইড করার চেষ্টা করবেননা তার কি নিশ্চয়তা?’
‘আপনি গাড়ী থামাবেন নাকি আমি চেঁচাবো?’
‘জানালা বন্ধ,গান ও চালিয়ে দিলাম।এবার চেঁচান’
আনাফ হাসিমুখে তার কাজে নিয়োজিত ওদিকে সারথির রাগ বেড়েই চলেছে।চেয়েও কিছু করতে পারছেনা।আসলেই সে বাড়ি ফিরলে পরেরদিন আবার মরতে বের হতো।আনাফ এমন কেন করছে!বয়সে বড় বলে মুখের উপর কিছু বলতেও পারছেনা।এদিকে জোর করে সব করিয়ে নিচ্ছে।একা বাসায় কি করে থাকবে সে।মানুষ কি বলবে!
“সমাজ বোঝেন আপনি?”
‘বুঝি’
‘তাহলে আমায় কেন একা একটা বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন?’
‘একা না তো।ওখানে আমার ছোট বোন পড়াশুনা করে।ওর কলেজ পাশেই বলে সে আমার কেনা নতুন বাসাতে থাকছে এক বছর হলো।ওর সাথেই থাকবেন।ওর সাথে থাকলে এবং পরিবেশ আলাদা বলে আপনার মানসিক ভাবনার উন্নতি ঘটবে’
——–
আনাফের বাসা সারথি যেমন ফাঁকা ভেবেছিল,এসে বুঝলো তার চেয়ে বেশি ফাঁকা।যেন কেউ থাকেনা এখানে।আনাফের উপর আরও সন্দেহ হলো সারথির।হতে পারে আনাফ মিথ্যে বলছে।ওর কোনো বোনই নাই এখানে।তাই সে আনাফের উপর চড়াও হয়ে বলে,’আপনার বোন কই তাহলে?’
আনাফ হাসলো।সে বুঝতে পেরেছে সারথি তাকে বিশ্বাস করতে পারছেনা।তাই সে তার বোনকে ডাক দিয়ে সোফায় এসে বসে।ওর বোনের নাম অধরা।ভাইয়ার ডাক শুনে বই থেকে মুখ তুলে ছুটে আসলো সে।এসে সারথিকে দেখে তার দৌড়ের বেগ কমে গেলো।সারথিকে পা থেকে মাথা অবধি দেখে নিয়ে বললো,’ও কে ভাইয়া?’
‘নাম সারথি,আমার হবু বউ’
সারথি এ কথা শুনে মেজাজ দেখিয়ে বললো,’আন্দাজে কথা বললে আমি একা একা বের হয়ে চলে যাবো।আমাকে তো চেনেন আপনি!’
অধরা হা করে চেয়ে রইলো সারথির দিকে।তারপর আনাফের পাশে বসে ফিসফিস করে বললো,’সত্যি তোমার হবু বউ?’
‘একেবারে সত্যি।কেমন আছিস সেটা বল।বাসায় ঢুকে প্রথমে আমাদের অতিথীর তো মনে হয়েছিল বাসাটাই ফাঁকা’
‘তুমি তো জানো আমার সামনে পরীক্ষা তাই পড়তেছিলাম।তা এই আপুটার ব্যাপারে আম্মু জানে?
‘নাহপরে জানাবো।তোকে এই দায়িত্ব নিতে হবেনা।বুয়াকে বল খাবার দিতে।আমার খিধে পেয়েছে’
‘সন্ধ্যা হয়ে গেছে।এখন কি খাবে?ডিনার তো বানানো হয়নি’
‘যা আছে তাই দিতে বল।’
অধরা আবারও সারথিকে দেখতে দেখতে চলে গেছে।সারথি যেমনি দাঁড়িয়ে ছিল তেমন করেই দাঁড়িয়ে আছে।আনাফ ওর কাছে এসে হাত ধরে সোফায় বসিয়ে বললো,’ভয় নেই,আমি থাকবোনা এখানে।আমার বোনের সাথে থাকবেন।মন ভাল হয়ে যাবে আপনার’
সারথি সোফায় হাত রেখে বললো,’ডান পাশে কি বারান্দা?বাতাস আসছে বারবার’
‘নাহ,ওহ আরেকটা কথা।ভুলেও ডান পাশে যাবেননা।এখানে বড় দরজা।সেটা পের হলেই নিচে সুইমিং পুল।আমি তো সবসময় থাকবোনা আপনাকে বাঁচাতে।অধরা একা একা আপনাকে পানি থেকে তুলতেও পারবেনা।সুতরাং এটা থেকে দূরে থাকবেন।’
এই কথা বলে আনাফ নিজের কপালে নিজে চড় মারলো
“””পাগলকে সে বলেছে সাঁকো না নাড়াতে।”””
পাগল তো নাড়াবেই।সারথি মরতে চায় সে সুযোগ খুঁজবে মরার জন্য।ধুর ধুর!!”
——–
পূর্ণতা বৃষ্টি দেখা শেষে রুম থেকে বের হতেই দেখে সিয়াম প্যান্টের চেইন খুলতে খুলতে ছাদের দিকে যাচ্ছে।
বাচ্চা ছেলেদের ছোট কাল থেকে শাসন না করলে বড় হয়ে আরও শয়তান হবে।পূর্ণতা এই টাইপের ছোট বাচ্চাদের পিটিয়ে কিংবা লজিক দিয়ে সোজা করেছে অনেকবার।এখন মনে হয় এই বাড়ির বাচ্চাদেরও ঠিক করতে হবে।বাধ্য হয়ে কাঠের স্কেলটা খুঁজে সে সিয়ামের পিছু নিলো।সিয়াম সবসময়কার মতন টাংকিতে হিসু করতে এসেছে।টাংকির পাশেই চেয়ার একটা দাঁড় করিয়ে সেটাতে উঠে দাঁড়াতেই দুম করে পিঠের উপর স্কেলের বাড়ি খেয়ে ভয় পেয়ে পেছনে তাকালো।পূর্ণতা কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,”নামো ওখান থেকে।নাহলে এমন পিটা পিটবো যে হিসু আসাই বন্ধ হয়ে যাবে”
সিয়াম ভয় পেয়ে নিচে নামলো।পূর্ণতা ওর কান টেনে ধরে চললো দাদাজানের রুমের দিকে।তার কাছে গিয়ে আজ বিচার করবে এই শয়তানির’
চলবে♥
#ডাকপাড়ি
#পর্ব_২৬
#আফনান_লারা
________
সিয়ামকে টানতে টানতে দাদার রুমের সামনে এনে থামে পূর্ণা।সিয়াম ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।এতদিন বাড়ির সকলে সিয়াম আর অনন্তের কুকীর্তি চাপা দিয়ে রেখেছিল।হয়ত দাদাজান নিজেও জানেননা এ ব্যাপারে। সিয়াম ভয়ে শেষ।উনি এসব জানলে সিয়ামকে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন।সিয়ম মনে মনে কল্পনা করছে বাড়ি থেকে বের করে দিলে তাকে তো রাস্তায় থাকতে হবে,তখন খিধা পেলে ব্রেড ছাড়া আর কি পাওয়া যাবে?ঠাণ্ডা লাগলে কি গায়ে দেবে?এ বয়সে সে কি করে টাকা কামাই করবে?এত কিছু ভাবতে ভাবতে দেখলো পূর্ণতা দরজায় নক দিয়ে ফেলেছে।দাদাজান সেসময় নামাজ পড়ছিলেন,এশার নামাজ।
কোনো সাড়া না পেয়ে পূর্ণতা “আসছি” বলে দরজাটা একটু ফাঁক করলো।ভেতরে চেয়ে দেখলো দাদাজান নামাজ পড়ছেন।
তখনই সিয়াম এক দৌড়ে পালানো ধরতেই পূর্ণতা খপ করে ওকে আবার ধরে বললো,’মাথায় স্কেলের বাড়ি খেয়েছো কখনও?’
‘নাহ’
‘আমি আমার অনেক ছাত্রর মাথায় স্কেলের বাড়ি দিয়েছি।মাথায় মারলে কি হয় জানো?দুনিয়াদারি অন্ধকার হয়ে যায়।মগজ নড়ে ওঠে।মনে হয় এর চেয়ে ব্যাথার আর কিছু নাই।তুমি যদি আর দুষ্টামি করো তাহলে তোমার মাথায় স্কেলের বাড়ি দিবো।আমি কিন্তু সিরিয়াস’
সিয়াম ঢোক গিলে দাঁড়িয়ে রইলো।মনে মনে শপথ করেছে আর পালাবেনা।
পূর্ণতা ওর থুঁতনি টেনে দিয়ে বললো,’গুড বয়।এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকো।দাদাজানের নামাজ শেষ হলে তোমার বিচার হবে,মোক্ষম বিচার।দাদাজান আজ এর একটা বিভেদ করবেনই’
——-
দাদাজানের নামাজ শেষ হবার পর তিনি উঠে বিছানায় বসে বললেন,’পূর্ণা??সিয়াম?তোমরা দরজার বাহিরে কি করো?’
পূর্ণা ডাক শুনে সিয়ামকে টেনে নিয়ে গেলো দাদার কাছে।তারপর গাল ফুলিয়ে বললো,’আপনি জানেন এই বাঁদরটা কি করে সবসময়?’
‘কি করে?’
‘টাংকিতে হিসু করে।ছিঃ ছিঃ!কতবড় খবিশ হলে এমনটা করতে পারে।পুরো এলাকা এ ব্যাপারে জানে।আর আপন জানেননা?’
‘কে বলেছে আমি জানিনা?আমি সব জানি।না জানার ভান ধরে থাকি’
‘আপনি কি প্রশয় দিচ্ছেন?’
‘মোটেও না।আগে তো বিচ্ছুগুলো খাটের তলায় এই কাজ করত।এখন সেটা বন্ধ হয়েছে।টাংকিতে করে তো ওর বাপ মায়ে খায়।আমার কি?আমি তো সাপ্লাই আর পুকুরের পানিতে নিত্যদিনের কাজ করি।’
পূর্ণতা সিয়ামের কান বরাবর একটা চড় দিয়ে বললো,’শাসন না করলে আরও বিগড়ে যাবে।এটা এক প্রকার বেয়াদবি।আপনার উচিত শাসন করা’
‘কারোর থেকে সম্মান আশা করলে তাকে সম্মান করতে হয়,তার কথা মানতে হয়।নিজের দাপট সবসময় থাকেনা।দাপট বজায় রাখার এটাই একটা পন্থা।আমি মানিক আর সুমনের বাবা।তাদের এবং তাদের বউদের, বাচ্চাদের,নাতিদের কিছু জিনিস আমায় ছাড় দিতে হবে তা নাহলে আমি এই বাড়িতে টিকতে পারবোনা।যেহেতু আমি তাদের পয়সায় তিন বেলা ভাত খাই,তারা আমায় মাথাায় করে রাখে সেহেতু তাদের কিছু জিনিস আমাকেও মেনে চলতে হবে, তাই নয় কি?’
‘আপনি ওদের বাবা মায়ের সাথে সামনা সামনি এ ব্যাপারে আলোচনা করে দেখুন।বিষয়টা মিটে যেতে পারে’
‘আলোচনা করার আসলে সময় হয়ে উঠেনা।আমি যেহেতু পানিটা ব্যবহার করিনা সেহেতু আমার কিছু যায় আসেনা।তাও তুমি যখন বলছো, কাল একবার আলোচনা করবো।’
‘এখন সিয়ামকে কিছু বলুন।ওই যত নষ্টের গোড়া’
দাদাজন সিয়ামের দিকে গাল ফুলিয়ে চেয়ে বললেন,’তোমার মুসলমানির কথা মনে আছে সিয়াম?’
সিয়াম ঢোক গিলে এক দৌড় দিয়েছে সাথে সাথে।আর পেছনে ফিরে তাকায়নি।পূর্ণতা মিটমিট করে হাসতে হাসতে চলে গেলো।
———–
সারথি সোফায় যেমন বসেছিল তেমনই বসে আছে।আনাফ ডাইনিং থেকে ওকে দেখতে দেখতে পাউরুটি গিলছে।অধরা এতক্ষণ এইসব দেখে শেষে বললো,’কি হলো?বউ হতে না হতেই চোখে হারাচ্ছো?’
‘চোখের হারানোর মতন হলে তো হারাবোই।চেহারা দেখেছিস?ওকে মিস ওয়াল্ডে যাওয়া উচিত ছিল।আন্ডারগ্রেটেড বিউটি’
অধরা ফিক করে হেসে বললো,’তবে পরেরবছর নিয়ে যেও।সময় তো আছেই ‘
‘নাহ।বিয়ের আগে যা করেনাই বিয়ের পরে তা কেন করবে?না থাক।পরে আবার অন্য কেউ এসে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে’
‘বিসিএস ক্যাডার ছাড়া আর কে নেবে?হাহাহা’
আনাফ অধরার কান টেনে ধরে বলে,’আমার বউ এই প্রথম বাসায় আসলো,বুয়াকে বল ভাল কিছু বানাতে’
‘তুমি রাতে থাকবে?’
‘হ্যাঁ,তবে তুই সারথিকে সেটা বলবিনা’
‘বলবোনা মানে?সে কি নিজের চোখে দেখবেনা?’
‘না।সে চোখে ভাল মানুষ ছাড়া আর কিছু দেখেনা’
‘আজব কথা বলতেছো!আমরা কি ভাল না?’
‘নাহ,আমরা সবাই খারাপ মানুষ।তুইও খারাপ।আমরা জীবনে একটা না একটা খারাপ কাজ করেছি যার কারণে সারথি আমাদের দেখবেনা।তার আলাদা ক্ষমতা আছে।সে তার চোখ দিয়ে কেবল ভাল মানুষ,ভাল জিনিস দেখে’
‘এটা কেমন কথা!কি খারাপ কাজ করলাম আমি?তুমি নাহয় করেছো।কিন্তু আমি কি করলাম?’
‘তুই ছোটকালে বাবার পকেট কেটে টাকা চুরি করেছিস,মনে আছে?বিশ আগস্ট ২০১১’
অধরা জিভে কামড় দিয়ে ফেললো।আনাফ আরেকটা পাউরুটি মুখে পুরে দেখলো সারথি সোফায় বসে সোফার কভার খাঁমচাচ্ছে। আনাফ এবার ফোন বের করে কাকে যেন ফোন দিলো।অর্ডার দিলো রড,সিমেন্ট, বালু’
অধরা আরেকটু কাছে এসে জানতে চাইলো এসব দিয়ে কি করবে।
‘এই কাঁচের দরজা পুরা বন্ধ করে দেয়াল তুলে দিব’
‘কি বলছো ভাইয়া!ড্রয়িং রুমটা সুন্দর করছে একমাত্র এই দরজা।এটা বন্ধ করলে কেমন লাগবে জানো?পুরা অন্ধকার’
‘আঠারো ওয়াটের দুইটা লাইট বসিয়ে দিবো।আলো আর আলো দেখবি।তর্ক করবিনা।আমি যেটা বললাম সেটাই হবে’
আনাফ পানির বোতল নিয়ে সারথির সামনে দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে নিচে পুলের দিকে তাকালো।তার খুব শখ ছিল বিয়ের পর বউ যখন ভোরে এই জায়গায় এসে দাঁড়াবে সে ঘুম ঘুম চোখে এগিয়ে এসে কোমড়ে জড়িয়ে তার কাঁধ মাথা রেখে আরও পাঁচ মিনিট ঘুমাবে চোখ বন্ধ করে।
সারথিকে দিয়েও সেটা পূরণ হতে পারে কিন্তু অনুভূতিটার চেয়েও জরুরি সারথির নিরাপত্তা। আর তাই তার সেই ইচ্ছা ভঙ্গ করে সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।কি দরকার সেই ভাললাগার যেটা আসল মানুষটারই ক্ষতি করবে?নাহয় অন্য কিছু দিয়ে অনুভূতিটা পূরণ করে নিবো’
আনাফ নদীতে গোসল করার পর থেকে তার গায়ের থেকে আতরের গন্ধ আসেনা।সারথি বুঝতে পারেনা তার আশেপাশে আনাফ আছে কিনা।
অধরার সন্দেহ লাগলো সারথিকে।সে কাছে এসে সারথির চোখের সামনে হাত নাড়ালো অনেকক্ষণ। ওর হাতের ব্রেসলেটের একটা ঝুনঝুনি লাগানো ছিল বলে আওয়াজ হচ্ছিল।সারথি সেটা শুনে বললো’কে?’
‘আমি অধরা।আপু তুমি আমায় সত্যি দেখোনা?’
‘নাহ’
‘তার মানে আমি এত খারাপ?এতটাও খারাপ না!
‘তুমি খারাপ সেটা কে বললো?’
‘ভাইয়া বললো তুমি নাকি শুধু ভাল মানুষ চোখে দেখো।খারাপদের দেখোনা’
সারথির রাগ হলো আবারও আনাফের উপর।
সব কিছু নিয়ে মজা করে লোকটা।বিরক্তি নিয়ে সারথি বললো,’আচ্ছা ডাক্তাররা এত বাঁদর হয়?’
‘আনাফ ভাইয়া ছোট থেকেই ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিল।কিন্তু আব্বু আম্মু জোর করে মেডিকেলে পড়িয়েছে।তাই ইচ্ছে করেই বাঁদরামি বন্ধ করে নাই।ডাক্তার দের যে গাম্ভীর্য থাকে তা ভাইয়ার নাই।জোর করে পড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত করলে এমনই হয়’
‘ওনাকে দিয়ে রোগীর ক্ষতি হবেনা তো?’
‘আরেহ না কি বলো!ভাইয়া মেডিকেলে ভাল মার্কস পেতো সবসময়।ভাইয়ার মেধা ভাল বলেই আব্বু আম্মু জোর করে মেডিকেলে ঢুকিয়ে দিয়েছে।তারা চেয়েছিল মেধাটাকে এই লেভেলে ইনবেস্ট করুক।
যদিও ইঞ্জিনিয়ারিং লেভেল ও খারাপ না কিন্তু আব্বুর স্বপ্ন ছিল তার একমাত্র ছেলে ডাক্তার হবে।’
———–
ফারাজ আজ পার্কে এসে চুপচাপ ছবি আঁকছিল।আজ কেন যেন ছবিতে কিছুতেই মন আটকাতে পারছেনা সো।বারবার মন অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে।সেদিনের ঐ ভদ্রলোকের কথাগুলো মাথার চারদিক দিয়ে ঘুরছে।
লোকটা সামান্য কয়েকটা লাইনে কত কি বুঝিয়ে গেলো।
ছবিতে মন না বসলে ঐ ছবি আর ছবি হয়ে ওঠেনা।অসম্পূর্ণ থেকে যায় সব দিক দিয়ে।খাতাটা ব্যাগে পুরে ফারাজ আকাশের দিকে চেয়ে রইলো।অন্যসময়ে গলা ছেড়ে তার সবচেয়ে প্রিয় গানটা বারবার করে গাইতো ফারাজ।
আর আজ চেয়েও গলায় সেই গানটার সুর আনতে পারছেনা।কি অদ্ভুত মানুষের জীবন রেখা।
কবে কোন মূহুর্তে একটা মোড় নিয়ে নেয়, মানুষ তার আগেরদিনও বুঝতে পারেনা।কি সুন্দর প্রতিমাকে মনে করে সবকিছু ঠিক চলছিল,কি থেকে কি হয়ে গেলো।পার্কে আসার পর থেকে শুরুতে মনে হচ্ছিল ফারাজ এখনও আগের ফারাজ আছে।বসবে,ছবি আঁকবে।মন জুড়ে প্রতিমাকে নিয়ে ভাববে।আর এখন যেন প্রতিমাকে নিয়ে ভাবাটাই দোষের!
ব্যাগটা গুছিয়ে রাখতেই ফারাজের ফোন বেজে ওঠে।দাদাজানের কল।দাদাজান অতি গুরুত্বপূর্ণ নাহলে কখনওই ফারাজকে কল দেননা।তার মানে কিছু একটা হয়েছে নাহয় হতে যাচ্ছে।ভয়ে ভয়ে ফারাজ রিসিভ করলো।
‘তুমি কোথায়?বলবেনা যে পার্কে আছো’
‘হ্যাঁ,ওখানেই আছি’
‘বাড়ি ফিরবে জলদি,ফেরার পথে ভাল দেখে কমলা কিনে আনবে’
‘কেনো?’
‘আজ আরেকটা পরিবার আসবে’
‘ছেলেকে মেয়েরা কেন দেখবে?আগে তো ছেলেরা মেয়েকে দেখে’
‘তোমার জন্য যতগুলো মেয়ে বাছাই করে রেখেছি এদের সবাইকেই আমি স্বচক্ষে দেখেছি যার কারণে ঘটা করে গিয়ে তাদের দেখার প্রয়োজন নেই বলেই তারা আসছে আমাদের দেখতে’
——
ফারাজ ফোন রেখে চললো ফলের দোকানের দিকে।কি ঝমেলা!প্রতিমা চলে যাবার পর এমন ভাবে বিয়ের জালে ফেঁসে যেতে হবে কে জানতো!চারিদিকে শুধু বিয়ে আর বিয়ে।সবখানে বিয়ে নামক শব্দটা তিরিংবিরিং করে যাচ্ছে ঠিকই তবে বিয়েটা আর হয়ে উঠছেনা।
বিয়ে বলতে যতটা সহজ আসলে কিন্তু ততটাই কঠিন।
‘ তা বিয়েতে না নামলে জানতাম না।আজ আবার কারা আসছে কে জানে।কমলা আমি নিতাম কেন?মেয়েরা আসার সময় কমলা আনবেনা?জনাব হাবিবুল্লাহ তো আপেল আনছিলেন।ওগুলা কেটে এদের খাইয়ে দিলেই হয়।মাঝখান দিয়ে আমার তিনশ বিশ টাকা বেঁচে যাবে’
কমলা কিনে ফারাজ বাড়িতে ফিরেছে।মতিন এসে ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে চলে গেলো।ফারাজ গায়ে ফু দিয়ে ফ্যান চালিয়ে সোফায় বসে। খুব গরম আজকে।একটু শরবত খেলে ভাল হতো।কিন্তু হাবিজাবি বাড়িতে শরবত আশা করা একটা মানুষের জন্য মস্ত বড় ভুল।
হঠাৎ সে দেখলো সিয়াম এক গ্লাস শরবত নিয়ে আসছে ফারাজের দিকে।ফারাজ ভাল করে সব দেখে বললো,’আমি এই শরবত খাচ্ছিনা’
‘জেঠিমণি সাপ্লাই পানি দিয়ে বানিয়েছে।নাও খাও’
‘সত্যি তো?’
‘একদম।বিশ্বাস না হলে গিয়ে জিগাও’
ফারাজ গ্লাসটা নিয়ে এক ঢোক খেলো।খোয়ে আবারও সিয়ামের দিকে চেয়ে বললো,’এটা পূর্ণা বানিয়েছে?’
সিয়াম থতমত খেয়ে বলে,’তুমি কিভাবে জানলে?’
‘মা শরবতে ইসবগুলের ভুষি দেয়না।এটা পূর্ণা ছাড়া আর কারোর কাজ না এই বাড়িতে’
‘ধীরে বলো,পূর্ণা ম্যাম বলেছে ওনার কথা বললে দাদাজান রেগে যাবেন’
চলবে♥
#ডাকপাড়ি
#পর্ব_২৭
#আফনান_লারা
________
শরবতটাকে সন্দেহ হলো ফারাজের।কিন্তু কি আর করার।এত স্বাদের শরবত তাও আবার এত গরমে তো হাত ছাড়া করা বোকামি।যদি পঁচা পানি দিয়ে বানিয়ে রাখে তো আল্লাহ বিচার করবে ওর।
শরবতটা খেয়ে শান্তি মতন দম ফেলে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে ফারাজ।
সিয়াম খালি গ্লাস নিয়ে পূর্ণার কাছে চলে এসেছে।
পূর্ণতা সিয়ামের কাছে জানতে চাইলো ফারাজ শরবতটা খেয়েছে কিনা।আসলে শরবতটা পূর্ণতা সাপ্লাই পানি দিয়েই বানিয়েছিল।ফারাজ শরবত খেয়েছে শুনে সে খুশি হয়ে দেয়ালে হাত রেখে দরজা দিয়ে উঁকি দিলো দেখার জন্য।তাকাতেই ফারাজের সাথে চোখাচোখি হলো তার।ফারাজ ও এদিকেই তাকিয়ে ছিল।
ফারাজের চোখে চোখ পড়তেই পূর্ণতা লজ্জা পেয়ে মুখ সরিয়ে নিলো।
এভাবে তাকাতেই ফারাজকে দেখবে তা ভাবেনি সে।ফারাজ ও ভাবেনি পূর্ণতা এমন করে উকি দেবে।
দুজনেই এখন বিড়ম্বিত।
সিয়ামের আরেকটা বাজে স্বভাব আছে।আর তা হলো সে দুটো ব্যাক্তির মাঝে প্যাঁচ লাগাতে নাম্বার ওয়ান।
তাকে কেউ কোনো কিছু গোপন রাখতে বললে সে ঐ কথা ঐ ব্যাক্তির সামনে গোপন রাখার নাটক করে,তারপর দিনশেষে সেই কথা গিয়ে লাগিয়ে দেয়।
এখন সে চলেছে দাদাজানের কাছে।পূর্ণতা ফারাজকে শরবত বানিয়ে খাইয়েছে,এটা বলতে হবে।
দাদাজান সেসময় তফসি নিয়ে বসেছিলেন।
দরজার কড়া নেড়ে সিয়াম ধীরে ধরে দরজা ফাঁক করে চেয়ে দেখে দাদাজান ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
‘আসবো দাদু?’
‘এসো’
‘একটা জরুরি কথা বলার আছে’
‘বলো’
‘পূর্ণতা ম্যাম কি করেছো জানো?উনি ফারাজ ভাইয়াকে শরবত বানিয়ে খাইয়েছেন এবং সেটা তোমায় বলতে নিষেধও করেছে’
দাদাজনের মেজাজ গেলো বিগড়ে।সিয়াম মিথ্যে বলছেনা এটা নিশ্চিত তিনি।কারণ ওদের মাঝে যে কিছু একটা চলছে তা নিয়ে দাদাজান নিজেও অবগত।রাগ হচ্ছে ভীষণ।অরিন্দমকে খুব জলদি খবর দিতে হবে।তফসি রেখে ড্রয়ার খুলে একটা খাতা আর কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসলেন তিনি।
অরিন্দমকে পাঠাবেন।জরুরি কথা লিখছেন অক্ষরে অক্ষরে।সিয়াম ভেজাল লাগিয়ে চলে গেছে তার অন্য কাজে।দাদাজান গোটা চিঠিটা লিখে মতিনকে ডাক দিছেন।
মতিন আসার পর তার হাতে চিঠিটা দিয়ে তিনি বললেন পোস্ট করে আসতে।ঠিকানায় লিখেছেন অরিন্দমের শেষে পাঠানো চিঠিটার ঠিকানায়।
মতিন তার আদেশমতে চলে গেছে।দাদাজান মনে মনে ভীষণ খুশি।অরিন্দম আসলেই এই বিষয়ে একটা পথ বের হবে, আপাতত ফারাজের জন্য মেয়ে দেখা চালু থাকুক।
ফারাজ সোফাতেই লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে।পূর্ণতা ডাইনিং টেবিলে খাবারের প্লেট সাজাতে গিয়ে ওকে ঘুমন্ত দেখে ডানে -বামে তাকিয়ে দেখে নিলো দাদাজান আছেন কিনা।যেইনা সে উপরে তাকালো ওমনি দাদাজানকে দেখলো দাঁড়িয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
পূর্ণতার মুখ ভর্তি ভয়ের ছাপ এসে গেলো,গলা শুকিয়ে গেলো।হাতের কাঁচের প্লেটটা শক্ত করে ধরে সে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু।দাদাজান মুখ ঘুরিয়ে চলে গেছেন আবার।পূর্ণতাকে যেন আভাস দিয়ে গেলেন বিপদ সংকেতের।সে আর এক মিনিট ও ওখানে দাঁড়িয়ে থাকেনি।এক দৌড়ে পালিয়েছে,আর পেছনেও ফিরে দেখেনি।
ওদিকে ফারাজের ঘুমটা ভেঙ্গে গেছিল মশার কামড়ে।চোখ খুলতেই পূর্ণতাকে দৌড়ে যেতে দেখলো সে।মাথায় আসলো সে কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করেনি তো??অনেকসময় দেখা যায় ছেলেরা ঘুমিয়ে থাকলে মেয়েরা ধরে মেকআপ করিয়ে দেয়।সেই ভয়ে ফারাজ নিজের গালে হাত দিয়ে,ঠোঁটে হাত দিয়ে সব চেক করে উঠে আয়নার দিকে ছুটলো।পূর্ণাকে একটুও বিশ্বাস নেই।এই কাজ আর কেউ না পারুক সে অবশ্যই পারবে।
আয়নার সামনে এসে নিজের মুখটা ঠিকঠাক দেখে দম ফেলে ফারাজ।তাহলে পূর্ণতা দৌড় দিয়েছিল কেন?
পূর্ণতা রান্নাঘরে বাটিতে ডাল নিচ্ছিল।দরজার কাছে এসে ফারাজ বললো,’আপনি ড্রয়িং রুমে কি করছিলেন?’
‘কিছু করিনি তো’
‘তাহলে দৌড় দিলেন কেন?পালানো তো চোরের লক্ষণ, নিশ্চয় কিছু একটা করেছেন।তা নাহলে দৌড় দেয়ার কারণ তো পাচ্ছিনা’
‘ঐ আসলে এমনি দিছিলাম।মাঝে মাঝে দৌড় দেয়া ভাল।রক্ত সঞ্চালন ঠিক থাকে’
‘ওহ। তাই আমার সামনে দিয়ে দৌড় দেবেন?আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেন?’
‘চলে যান।দাদাজান দেখলে বিয়ে পরিয়ে দিবে’
‘এত সহজ না’
পেছন থেকে দাদাজান এসে ফারাজের ঘাঁড়ে হাত রেখে বললেন,’খুব সহজ।শুধু মসজিদে গিয়ে বিয়ে পরিয়ে দিব। এর চেয়ে সহজ আর কিছু নেই’
———-
আনাফ চলে যাবার নাটক করে বসে আছে সারথি থেকে দশ হাত দূরে।
আনাফ চলে গেছে ভেবে সারথি সোফা থেকে উঠে দেয়ালে হাত রেখে অধরাকে বললো ওকে একটা রুম দেখিয়ে দিতে।
অধরা সেসময় আনাফের দিকে তাকায়।আনাফ ইশারা করে বলে সারথি যেন নিজে পছন্দ করে।
‘আপু তুমি নিজেই পছন্দ করে নাও না’
‘কি করে?আমি তো দেখতে পাইনা’
‘আমি তোমায় কি কি আছে বলে দিচ্ছি,তুমি বলবে কোন রুম তোমার পছন্দ হয়।
সামনে দুটো রুম আছে,একটাতে বারান্দা বড়,আরেকটাতে ছোট।ছোট বারান্দায় আবার গ্রিল নাই,বড় বারান্দায় গ্রিল আছে।ছোট বারান্দার রুমটা আবার বড়।অপরদিকে অন্য রুমটা ছোট।
বাকি ফার্নিচার সব সেম।
বলো কোনটাতে থাকবে?’
‘ছোট বারান্দা যেটাতে ওটাতে থাকবো।আমাকে দিয়ে এসো।মুখ ধুবো আমি’
অধরা ওর হাত ধরে সেই রুমটাতে দিয়ে এসেছে।সারথি দেয়াল ধরে ধরে ওয়াশরুমের দিকে চললো।আনাফ তখন সেই রুমে ঢুকা ধরতেই অধরা তাকে আটকে বললো,’তোমাদের এখনও বিয়ে হয়নি’
‘তো?আমি কি রোমান্স করতে যাচ্ছি নাকি?বউ আমার যদি পা পিছলে পড়ে যায়?’
‘এক কাজ করো,বিছানায় বসিয়ে তুমি পানি এনে মুখ ধুইয়ে দাও’
‘দরকার হলে সেটাই করবো।তোর কি?যা বুয়া কি বানায় দেখে আয়।আমি আমার বউ পাহারা দিচ্ছি’
অধরা বিড়বিড় করতে করতে চলে গেছে।
আনাফ যে জায়গায় ছিল সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।হঠাৎ করে সারথির জন্য তোয়ালে লাগবে ভেবে আলমারিটা খুলে তোয়ালে নিয়ে বিছানায় রেখে আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকলো আনাফ।সারথি বেরিয়েছে।বিছানার কাছে এসে বসতেই হাতের কাছে তোয়ালে পেয়ে খুশি হয়ে মুখ মুছে নিলো।আনাফ আয়নার দিকে চেয়ে থেকে সারথিকে দেখছে।একটা মানুষ এত সুন্দর কেমনে হয়!এমন একটা মেয়েকে সজীব উপেক্ষা করে!!শুধুমাত্র মেয়েটা অন্ধ বলে?এটা ঠিক করেনি সজীব।একদিন পস্তাবে।
সারথি বিছানায় হাত দিয়ে চাপ দিয়ে বললো,’এত শক্ত!এই বিছানায় তো জীবনেও ঘুম আসবেনা।’
কথাটা শুনে আনাফ অন্য রুমে গিয়ে তার পরিচিত এক ফোমের দোকানদারকে কল দিয়ে বললো এক ঘন্টার মধ্যে ফোম নিয়ে আসতে।এরপর আবার সে রুমে গেলো দেখতে।এসে দেখলো সারথি দেয়াল ধরে ধরে রুমের প্রতিটা ফার্নিচারের অবস্থান চেক করছে।আনাফ ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল সেসময় ওর গায়ের সাথে লেগে ফুলের টব একটা পড়ে যাওয়া ধরতেই আনাফ সাথে সাথে ধরে ফেললো সেটা।কিন্তু আওয়াজ হওয়ায় সারথি থেমে গিয়ে পেছনে ফিরে বললো,’কে?’
আনাফ চুপ করে আছে।
সারথির সন্দেহ হলো।সে এদিকেই আসছে এবার।আনাফ যেতে যেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।সারথি ওর একদম সামনে এসে হাত বাড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলটা ধরে দেখে আবার চলে গেছে।আনাফের বুকের ভেতর ডিপডিপ করছিল।আর একটুর জন্য ধরা খেতো সে।আর থাকা যাবেনা বুঝতে পেরে চলে আসলো আনাফ।
মা বারবার কল করছে।এবার রিসিভ করতেই তিনি হাজারটা বকা দিয়ে তারপর ক্ষান্ত হলেন।আনাফ ধীরে ধীরে বললো সে অধরার কাছে আছে।এবার মা আর কিছু বলেননি,বরং খুশি হলেন।অধরা কেমন আছে জানতে চাইলেন।আনাফ ফোন অধরাকে ধরিয়ে পুনরায় সারথিকে দেখতে আসে।সে তখন বারান্দাতে।আসলেই বারান্দাটা আকারে ছোট। আট কদম হাঁটলেই জায়গা শেষ।রেলিংয়ে হাত রেখে সারথি ভাবছে এর উচ্চতা কেমন হতে পারে।আনাফের আবার ভয় হলো।না জানি কবে ঝাঁপ দেয় এই মেয়ে।নিচে তাকিয়ে তার কলিজা কেঁপে উঠেছে।দোতলা বলে কম উঁচু না।ভালই উঁচু।
পড়লে মৃত্যু না হলেও হাঁড়গোড় ভাঙ্গতে পারে।কি করা যায়!!
সারথির বারবার মনে হচ্ছে তার আশেপাশে কেউ না কেউ আছে।কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছেনা,এমন কেন মনে হয়।অধরা তো থাকলে কথা বলতো।আর কে হতে পারে?
দেয়ালে হাত রেখে সারথি এগোতে এগোতে আবারও জানতে চাইলো ওখানে কে।আনাফ এবার কোথায় যাবে!সারথির সাথে সাথে সেও ছোট বারান্দায় ফেঁসে গেছে।এদিকে সারথি কদম ফেলছে আর জানতে চাইছে কে আছে এখানে।আনাফ পিঠ দেয়ালে লাগিয়ে ভয়ার্ত চোখ নিয়ে সারথিকে দেখছিল।সারথি আর এক কদম ফেললেই আনাফের বুকের সাথে লেগে যাবে তখনই অধরা এসে ওর হাত ধরে বললো,’আমি আপু।আমি আছি এখানে’
এই কথা বলে সে আনাফকে সরিয়ে ফেলে।আনাফ ও দম ফেলে চলে যায় ওখান থেকে।
———–
লেভেনের বাবার সাথে আজ সকালের নাস্তা খেতে যাওয়ার কথা সজীবের।ওনার সাথে দেখা করার কথা উঠলেই সজীবের সেই রাতে আর ঘুম হয়না।চিন্তায় চিন্তায় রাত কেটে যায়।উনি বড়ই কঠোর মনের মানুষ,তার ব্যবহারে গম্ভীরতা বেশি।ওনার করা প্রশ্নে সজীব প্রায় সময় এলোমেলো হয়ে পড়ে।ভুল হলেই তার এক কথা “সজীব লেভেনের যোগ্য না।”
এত এত চিন্তা মাথায় নিয়ে সজীব তৈরি হলো।লেভেন বলেছে সে বাবার কাছেই থাকবে।
লেভেনের বাবার অফিসে ঢুকতেই সজীব দেখলো সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে। হঠাৎ এই কাজের মানে মতলব না বুঝে সজীব ওনার অফিস যে ফ্লোরে সেটার দিকে চললো।উপরের তলা বলে সে আর লিফটে ওঠেনি। লেভেনের বাবার অফিসের বাইরেও গার্ড দুজন দাঁড়িয়ে আছে। তারা সজীবকে চেক করতে নিতেই লেভেন এসে বললো প্রয়োজন নেই।গার্ডরা তাই সজীবকে যেতে দিলো।
সজীব ভেতরে ঢুুকে গুড মর্নিং বলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লেভেনের বাবা জনাব কিয়াম মাথা তুলে বললেন,’বোসো’
সজীব বসলো।তিনি এবার হাত ভাঁজ করে একটু হেলান দিয়ে বসে বললেন,’কেমন আছো?’
‘ভাল আছি স্যার’
‘লেভেনকে শেষবার কবে দেখেছো?’
‘কাল’
‘তারমানে রীতিমত তোমাদের দেখা হয়’
‘জ্বী।’
‘আমি যে কাজ তোমায় দিয়েছি সেটা কি পূরণ করতে পেরেছো?’
‘আর স্বল্প বাকি’
‘ভাল।এক বছরের বেশি সময় আমি দিতে পারবোনা।লেভেনের জন্য তো ছেলের অভাব নেই।হাত বাড়ালেই লাইন ধরো যাবে।তোমাকে সেটা বুঝতে হবে।পরিশ্রম করো।’
‘অবশ্যই স্যার।আচ্ছা বাইরে এত গার্ড দেখলাম।কি হয়েছে?’
‘আমার উপর হামলা হয়েছিল।তাই সিকিউরিটি জোরদার করেছি।তোমরা সাবধানে থেকো।যে ক্ষতি করার সে সবার একসাথে ক্ষতি করে।’
‘স্যার আমি আগেই ব্রেকফাস্ট অর্ডার করছি।চলুন একসাথে খাবো’
‘ওটা ক্যানসেল করে দাও।আমি এখন আর বাইরের খাবার খাইনা।কে জানে কোথায় বিষ মিশিয়ে রাখবে।বোঝোই তো! এত এত প্রোপার্টি।সবার লোভ এই সম্পত্তির দিকে।’
সজীব ফোন নিয়ে অর্ডারটা ক্যানসেল করে লেভেনের দিকে এক নজর তাকালো।জনাব কিয়াম সেটা দেখে বিরক্ত হলেন।সজীবকে তার একটুও পছন্দ না।একমাত্র লেভেনের কারণে মুখে তালা দিয়ে বসে আছেন।তা নাহলে কবেই লেভেনের বিয়ে দিয়ে দিতেন অন্য জায়গায়।
এখন না পারছেন সহ্য করতে আর না পারছেন পিছু হটতে
———–
একটা ছেলে সেই চা দোকানদারের কাছে এসে চায়ের কথা বলে অনেকক্ষণ যাবত “হাবিজাবি ‘ বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।তাকে ওমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে দোকানদার জানতে চাইলো সে কি এই বাড়িতে যাবে নাকি।
তখন ছেলেটা বললো,’আচ্ছা এ বাড়ির তো অবিবাহিত একটা ছেলে আছে,নাম ফারাজ।তার ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন?’
‘ফারাজ কে আমি সেই কাল থেকে চিনি যেই কালে তার ভেজা কাঁথা তার মা ছাদে শুকায়তে দিতো।আহা কি সুন্দরী রমনি!!হলুদ শাড়ী পরে ছাদে আসতো জামাকাপড় শুকায়তে দিতে।রুপ যেন বাইয়া বাইয়া পড়তো।’
‘আপনি আমার কথা বুঝেন নাই।আমি তো ছেলের ব্যাপারে জানতে চাচ্ছি।ছেলের মায়ের ব্যাপারে না’
চলবে♥