ডাকপাড়ি পর্ব-৪+৫+৬

0
461

#ডাকপাড়ি
#পর্ব_৪
#আফনান_লারা
——–
‘আমি থোমারে থুবি ভালাবাছি, বিসসসসাস করো মতিন’

‘এটা সম্ভব না মিনু’

‘ক্যান?’

‘কারণ বিয়ার সময় হুজুর কবুল বলতে কইলে তুমি কইবা “থবুল’

‘একি থো!’

‘না একি না।আগে উচ্চারণ ঠিক করো।আমি হলাম শিক্ষিত চাকর।আমার লগে কি যার তার জুটি বাঁধবে?’

মিনু ছলছল চোখে চেয়ে থেকে বললো,’আমিও কম চিক্কিত না।আমার যথেষ্ট চিক্কা আছে।কেলাস ১ পাশ আমি’

মতিন মাথায় হাত দিয়ে বললো,’আর আমি ফাইভ পাশ।তুমি অশিক্ষিত।যাই হোক,ওসব সমস্যা না।আমি হাবিজাবি বাড়ির একমাত্র চাকর।তুমি আমারে বিয়া করলে তোমার আমার সাথে রান্নার কাজে হাত দিতে হইবো।সেখানে আরেকটা সমস্যা হলো তুমি নুন চিনির তফাৎই জানোনা।চিনির জায়গায় নুন দাও,নুনের জায়গায় চিনি।আমারে তো নুন দিয়া শরবত বানাই খাওয়াইছিলা।ছেঃ!!এখনও মনে পড়লে মুখটা লবণাক্ত হইয়া আসে’
——-
পুলিশ অফিসার মেয়েটাকে রেখে চলে গেছেন একটা ফাইলের কাজে।মেয়েটা চেয়ারে বসে এদিক সেদিক দেখছিল তখন একজন মধ্যবয়স্ক কন্সটেবল এসে দাঁড়ালো ওর পাশে।মুখে এক গাদা পান পুরে চিবিয়ে যাচ্ছেন আর মেয়েটাকে দেখছেন।মাঝে মাঝে ঠোঁটের কোণা দিয়ে পানের রস বের হয়ে আসা ধরে,তিনি আবার আঙ্গুল দিয়ে রসটাকে ভেতরে পুরে দেন।মেয়েটা ওনার এমন খাচ্চর স্বভাব দেখে ঠিকটাক হয়ে বসে থাকলো।

‘কি কেস?হোটেলে বয়ফ্রেন্ডের সাথে থাকতে গিয়ে ধরা পড়েছো বুঝি?আরে হয় হয়!এমন হয়।ঐ যে দেখছো জেলের ভেতর তিনটা মেয়ে?ওরাও তোমার মতন ধরা পড়েছে।নাইট স্ট্যান্ড হোটেলে মন্ত্রীর ছেলের সাথে ধরা পড়েছে।ছেলে তো জামিন দিয়ে বেরিয়ে গেছে আধ ঘন্টার মধ্যেই।কিন্তু ওদের কে বের করবে?হাহাহাহা। ‘

মেয়েটা ব্র‍ু কুঁচকে বললো,’আমি ওসবের জন্য আসিনি এখানে’

‘তবে কি ব্যাপার?চুরি করেছো নাকি?কি চুরি করছো?দেখে তো ভদ্র ঘরের মেয়ে মনে হয়’।নাকি খুন!!অবশ্য খুন হলে স্যার চেয়ারে বসাতো না তোমাকে।তবে কি করছো?ডাকাতি করছো?’

পুলিশ অফিসার আনিসুর হক এসে বসলেন মেয়েটার সামনে বরাবর।একটা ফাইল খুলে বললেন,’তোমার নাম বলো’

‘সামান্য ডাকবাক্সে হাত ঢুকানোর জন্য এত বড় শাস্তি?আবার ফাইল ও খুলছেন?’

‘এ শহরে অপরাধীর অভাব,ঘুষের ও অভাব।পাকাপোক্ত চোর পেয়ে হাতছাড়া কেন করবো ম্যাডাম?’

মেয়েটা দাঁত খিঁচিয়ে বললো,’তবে যদি তাই হয়, বলে রাখি আমার কাছে একটা টাকা ও থাকেনা।দিন আনি দিন খাই।’

‘মিথ্যে কথা বন্ধ করে অভিভাবক পাঠাও, দশ হাজার টাকা আনতে বলো তবেই ছাড়া পাবে।নাহলে ঐ যে দেখছো,পতিতা তিনটা।ওদের সাথে বসিয়ে রাখবো।আচ্ছা আগে নাম বলো’

মেয়েটা চুপ করে থাকলো।দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অনেক ভেবে
ব্যাগ হাতিয়ে ফোন বের করে একটু দূরে গেলো কথা বলতে।
——
‘হ্যালো প্রেমা,আমি বলছি’

‘কিরে?হঠাৎ এসময়ে।কাজে যাসনি?’

‘না আসলে বিরাট বড় একটা ফ্যাসাদে পড়ে গেছি।একটা ঘুষখোর পুলিশের পাল্লায় পড়েছি।বাঁচা প্লিজ’

‘কি করে বাঁচাবো?’

‘তিশাকে নিয়ে আয়।ও থাকলে হয়ত বেঁচে যাবো’

‘তিশা জীবনেও পুলিশ স্টেশন আসবেনা।ওর ভয় তো পুলিশকে নিয়েই’

‘কিছু একটা বল, রাজি করানা প্লিজ প্লিজ!১০হাজার টাকা চাইতেছে।আমার কাছে তো দশ টাকার নোট ও নেই।কিছু একটা করনা প্রেমা’
——–
আজ কেন যেন ছবিতে মন বসাতে পারছেনা ফারাজ।এমনিতে ছবি আঁকা চাইলেই হয়না।গভীর মনযোগ দিতে হয়,তবুও কেন যে আজ মনযোগ বসছেনা।সব দোষ ঐ উড়ে এসে জুড়ে বসা মেয়েটার।কি দরকার একটা অচেনা,অপরিচিত মানুষকে ডিস্টার্ব করার।তার জন্য কি দুনিয়ায়ই কেবল আমিই আছি?আর কেউ নেই?সব কিছুতে আমাকে জড়ানো।সারথির বাসায় ও যেতে ইচ্ছে করেনা।গেলেই জামাই আদর শুরু করে।আরেহ আমি সাধারণ, যাকে বলে অতি সাধারণ।মোরগ,পোলাও আমার ভাল্লাগেনা।আমি খাই ধনেপাতার ভর্তা,আলুর ভর্তা দিয়ে ভাত।এগুলো খেয়ে খেয়ে সেই আঠারো বয়স থেকে এখন ছাব্বিশে পা রেখেছি।দু মাস পর সাতাশ হবে।মুখে আমার বড়লোকি খাবার রচেনা।কে বোঝাবে সারথিকে।নিজে তো খায়না।সব আমাকে খাইয়ে শান্তি পায়।বড়লোকেরা কি জানে এই খাবারগুলোর স্বাদ।

‘ভাইয়া!!’

ফারাজ ভাবনা থেকে বের হয়ে সামনে চেয়ে দেখলো একটা মেয়ে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে।বয়স ছয় /সাত বছর হবে।মেয়েটাকে ফারাজ চিনে।এখানে অনেকবার দেখেছে।ফারাজ দীর্ঘ এক বছর ধরে আসছে এই পার্কে।অথচ মেয়েটা আজ পর্যন্ত ওর ধারের কাছেও ঘেঁষেনি।সে শুধু ঘেঁষেছে যাদের পোশাক দামী তাদের পিছু।ফারাজ হালকা পাতলা পাঞ্জাবি পরে সারাদিন পার্কে বসে থাকে,কোনো কাজে যায়না বলে তার কাছে ওকে গরীব মনে হয়।কে জানে কি মনে হয়।তবে ফারাজের এটাই ধারণা।
তবে আজ আসার কারণটা কি!তাই সে আগে পরিচয়টা নিয়ে নিচ্ছে।

‘তোমার নাম কি?’

‘অন্বেষা’

‘কঠিন নাম।কে রাখলো?’

‘একজন দিয়েছিল।’

‘তোমার মা বাবা দেয়নি?’

মেয়েটা মাথা নাড়িয়ে” না “জানালো।ফারাজ এবার ওর হাতে কাঠগোলাপের মালা দেখে বললো,’গন্ধ আছে এমন ফুল বিক্রি করবা।শুধু সুন্দর হলেই হয়না,গন্ধ ও থাকতে হয়।সুন্দরের ভাত নাই।বুঝলে?’

‘কেন ভাত নাই?’

‘কারণ তুমিও সুন্দর,তোমার ভাত আছে?দিনে কয় বেলা খেতে পাও?’

মেয়েটা মাথা নিচু করে ফেললো।ফারাজ তখন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,’আমার পকেটে টাকা নেই।বোনের বাসায় গেলে ও দিবে।এখন আমি ফুল কিনতে পারবোনা।’

‘আমি বেচতে আসিনি।একটা কথা বলতে এসেছি।ঐ যে কিছুক্ষণ আগে এক আপাকে পুলিশে নিয়ে গেলোনা?’

‘হুম।কি হয়েছে তাতে?’

‘আপনি ওনারে বাঁচালেন না কেন?’

‘আমি কোনো সিনেমার নায়ক না।আর আমি ওনার কিছু হইনা,তবে তাকে কেন বাঁচাবো?’

‘আপনে তো আমারেও চিনেননা।তবে ঐ বেঞ্চিতে একটা পাউরুটির প্যাকেট প্রতিদিন কেন রেখে যান?কারণ আপনি জানেন ওটাতে আমি বসি।আমাকেও তো চিনেন না, তাহলে আমার রোজ সকালের খাবারের ব্যবস্থা কেন করেন?’

ফারাজ গম্ভীর চোখে চেয়ে আছে মেয়েটার দিকে।কথা বলার ভাষা নেই।কি করে যে ধরে ফেললো মেয়েটা।অথচ ফারাজ খুব ভোরে এসে প্যাকেটটা রেখে যেতো,যখন মেয়েটা বেঞ্চির নিচে চাদর মুড়িয়ে ঘুমন্ত থাকতো।এখন জবাব তো দিতেই হবে।তাই দম ফেলে বললো,’তোমার দুনিয়ায় কেউ নেই বলে তোমার এক বেলার দায়িত্ব নিয়েছি।’

মেয়েটা হেসে মালা গুছিয়ে যেতে যেতে বললো,’খোঁজ নিয়ে দেখেন ঐ আপারও কেউ নাই।কেউ থাকলে আপনার কাছে ছুটে আসতো না বার বার’

কথাটা ফারাজের বুকে গিয়ে আঘাত হানলো।পথশিশুরা মাঝে মাঝে খুব কড়া কথা বলে।একেবারে মাংশপেশি ছেদ করে ভেতরে গিয়ে লাগে।
সেই ছবিটার সবে চুল এঁকেছিল ফারাজ।রাগের বশে সেটা ছিঁড়ে ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করলো।তাতে কিছু একটা লিখলো।লেখাটা হয়ত কারোর ঠিকানা।এরপর চিঠির জন্য একটা পৃষ্ঠা নিয়ে লিখতে বসলো।কাউকে সে চিঠি দিবে।
———–
‘নাম বলবে নাকি ঠাটিয়ে এক চড় দেবো?’

মেয়েটা পানির গ্লাস টা রেখে টেবিলে হাত রেখে বললো,’পূূর্ণতা’

‘আগে পরে কিছু নেই?তুমি তো আচ্ছা বেয়াদব মেয়ে।বড়দের সাথে ঠিক করে কথা বলাও শেখোনি।দেখে তো কচি খুকি মনে হয় না।কমপক্ষে তোমার বয়স তেইশ/ চব্বিশ হবে।একটা কথাও সুন্দর করে বলতেছোনা’

‘আমি ঘুষখোরদের সম্মান দিই না’

‘তবে তোমার বাবা মা আসা পর্যন্ত পতিতাগুলোর সাথে বসো যাও।তোমার শাস্তি এটা।রবিনন্দন ওকে নিয়ে যাও’

চলবে♥

#ডাকপাড়ি
#পর্ব_৫
#আফনান_লারা
________
আনিসুর হক আরামসে পায়ের উপর পা তুলে টাটকা ইলিশ মাছ ভাজি খাচ্ছেন।অফিস টাইমে মাঝে মাঝে ভাজা মাছ খাওয়া তার শখ।এখনও সেই শখ পূরণ করছেন।সোজা মাওয়া থেকে এসেছে এই ইলিশ।গন্ধে চারিদিক ম ম করছে।কন্সটেবল রবিনন্দন এই নিয়ে একশো দুবার তাকিয়েছে।জিভে পানি আসতে আসতে,গড়িয়ে পড়তে পড়তে মেঝেতে সাগর হয়ে গেছে।
পূর্ণতা গালটা ফুলিয়ে নিচে বসে বাইরের দিকে চেয়ে তিশা আর প্রেমার আসার অপেক্ষা করছে।জেলের ভেতর তার সামনে তিনটা মেয়ে বসে ওকেই দেখছে।মেয়েগুলোর গায়ে থ্রি পিস,বেশ আঁটসাঁট করে পরা জামাগুলো।মনে হয় জোর করে শরীরে ঢুকানো হয়েছে।ওড়না গলায় পেঁচানো।ঠোঁটে বালি,ব্রু তে বালি।কেমন একটা দেখতে।পূর্ণতা একবারের বেশি তাকায়নি।বেশি তাকালো যদি কথা শুরু করে।এদের ভয় হয় তার।সাধারণ একটা ছেলের থেকেও এই মেয়েগুলোকে ভয় হয়।এরা কথায় কথায় একটা সাধারণ মেয়েকে নিজেদের সঙ্গী করে ফেলার ক্ষমতা বহন করে।
অনেকক্ষণ যাবত ধরে তিনটে মেয়ে মিলে পূর্ণতাকে দেখলো।তারপর তিনজন মিলে ফুসর ফুসর করে কিসব আলোচনা করলো।আলোচনার সবখানি কথা পূর্ণতা শুনেছে।ছোট বেলা থেকেই তার কানের পর্দা একেবারে মজবুত।এক রুমে বসে তিন রুমের কথা শুনতে পায়,আর এরা তো সামনে বসে ফিসফিস করছে।তারা বলছিল “মেয়েটাকে দেখে ভদ্র ঘরের মনে হয়,কিন্তু এতই ভদ্র হলে জেলে থাকার কথা না।পোশাক দেখে মনে হয় কোনো রুচিশীল ব্যাক্তির পতিতা এই মেয়ে।রুচিশীল ব্যাক্তিরা পতিতা বেছে বেছে নেয়।এরকম ভদ্র দেখতে মেয়ে দেখে তারা রাত কাটায়।এ মেয়েটা মনে হয় সেই রকমইই’

পূর্ণতার রাগ হলো।তাও কিছু বললোনা।কানে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে রাখলো যাতে আর না শোনে কিছু।এরপরই একটা মেয়ে উঠে এসে ওর পাশ ঘেঁষে বসলো,’কোমড়ে সিগারেট আছে তোর?’

‘হ্যাঁ?’

‘আছে কিনা ওটা বল।কানে শুনিস না?’

‘না নেই’

‘খাবি,সিগারেট অনেক ভালো জিনিস।খাইতে খুব মজা,টান দিতে আরও মজা,ধোঁয়া বের করতে হেব্বি মজা।একবার খেয়ে দেখবি,এরপর দেখবি আর ছাড়তেই মন চাইবোনা।খাইতে খাইতে একদিন মরে যাবি’

পূর্ণতা সরে বসলো।মেয়েটার কথাবার্তা এমন কেন!
————-
সারথির ফোন বাজছে,ফোনটা সে চারদিন আগে ওয়ারড্রবের উপর রেখেছিল।ফোন ব্যবহার করা তার পছন্দ না।সারাদিন বাগান আর টিভি নিয়েই তার দিন।ফোন যেখানে রাখে ওখানেই পড়ে থাকে।কেউ তাকে কল করেনা,একমাত্র সজীব ছাড়া।তাও সজীব কল করে মাসামাসি।ততদিন ফোন ওরকমই থাকে।চার্জ শেষ হয়না।চারদিন পর চার্জে দিতে হয়।তারপর আবার ফোন রেখে দেয় সে।
ফোন বাজার আওয়াজ পেয়ে মনে হলো সজীব কল করেছে।তাই ছুটলো সে।ছুটতে গিয়ে খাটের সাথে পায়ে আঘাত পেয়ে থেমে গেলো।নিচু হয়ে হাত দিয়ে পায়ের পাতা ঘঁষে আবারও ছুটলো।ওয়ারড্রবের উপর থেকে ফোনটা হাতিয়ে বের করে নিলো।তারপর স্ক্রিনে হাত দিয়ে ডানে টাচ করে কানে ধরলো।

‘””””কিছু কথার পিঠে কথা
তুমি ছুঁয়ে দিলেই মুখরতা
হাসি বিনিময় চোখে চোখে
মনে মনে রয় ব্যাকুলতা “””””
শুভ অপরাহ্ন!!!এই সুন্দর কলার টিউনটি সেভ করতে ডায়াল করুন *১২#’

সিম কোম্পানির কল।মন খারাপ করে ফোনটা রেখে সারথি চলেই যাচ্ছিলো তখন আবারও কল আসলো।বিরক্ত হয়ে রিসিভ করে কানে ধরলো আবার।ওপাশ থেকে শোনা গেলো একটি শব্দ।

‘সারথি?’

সারথির চোখে পানি এসে গেছে।সজীবের গলা।খুশিতে কিছু বলতে পারছেনা সে।
সজীব আবার বললো,’কেমন আছো?’

‘ভালো নেই।আপনি কবে আসবেন?আমার এখানে ভাল লাগেনা।আপনি একবার আসুন।’

‘আমি কেমন আছি জানতে চাইবে না?’

‘ওহ হ্যাঁ,আপনি কেমন আছেন?’

‘ভাল।আমি এই মাসেও হয়ত আসতে পারবোনা।দেখি পরের মাসে আসতে পারি কিনা।মা এসেছে?’

‘কাল আসার কথা ছিল,আসেনি।ল্যান্ড লাইন থেকে কল করেছিলাম।বললো আজ আসবে’

‘মাকে বলবে শপিং মলের সব চাইতে দামী নেকলেসটা যেন কিনে।আমি টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।তুমি চেকে সাইন করে দিও।চাইলে তুমিও যেতে পারো মায়ের সাথে’

সারথি গম্ভীর গলায় বললো,’আমি গেলেই বা কি?আমি তো পছন্দ করে দিতে পারবোনা।তার চেয়ে বরং মনিশা আপু আর আন্টি যাক।ওনারা পছন্দ করে কিনে আনবেন।সব চাইতে জরুরি হলো মনিশা আপুর পছন্দ হওয়া।কারণ বিয়েটা তো তার’

‘তা ঠিক বলেছো।আমি কিছু টাকা বাড়িয়ে দিয়েছি।নিজের জন্য শপিং করে নিও।মনিশার বিয়েতে পরবে’

‘কেন আপনি আসবেননা?আপনি আসলে নাহয় কিনবো’

‘আচ্ছা রাখছি।আমার কাজ আছে’

সজীব লাইন কেটে দিলো।সারথি মন খারাপ নিয়ে ফোনটা রেখে আবার হাসার চেষ্টা করলো।ফারাজ আসবে যেকোনো সময়ে।মুখে হাসি রাখবে যাতে ফারাজ কিছু না বলে সজীবকে নিয়ে।ফারাজকে সে কিছু বুঝতে দেয়না তাও কিভাবে যে বুঝে যায়!’
————
ডাকবাক্সে একটা চিঠি ফেলে ফারাজ দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ ধরে।ঝালমুড়িওয়ালা ওর দিকে ঝালমুড়ি ধরে বললো,’ভাই এই নিয়ে পঞ্চান্নটা চিঠি ফালাইলেন।কারে জানতে পারি?’

‘আছে কেউ’

‘নাম কি?’

ফারাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে যেতে যেতে গান গাওয়া শুরু করে।

“””তুুমি আমার চোখেতে
সরলতার প্রতিমা!!
আমি তোমাকে গড়ি,ভেঙ্গে চুরে শতবার!!!
রয়েছে তুমি বহুদূরে!!
আমাকে রেখে চলোনা..
এ হৃদয়!ভেঙ্গে গেলে জানো কি তা?
লাগেনা,লাগেনা জোড়া!!”””””

ঝালমুড়ি ওয়ালা তার এক কাস্টমারকে ঝালমুড়ি ধরিয়ে দিয়ে বললো,’বুঝলেন ভাইজান,এই পোলায় দীর্ঘ এক বছর ধরে মাসে কয়েকটা করে চিঠি পাঠায় কাউকে।পার্কে বসে সময় নিয়ে লেখে তারপর খামে ভরে ডাকবাক্সে ফেলে।আজকালকার যুগে ফোন থাকতে এসবের কি দরকার বলেন??’

যুবকটি ঝালমুড়ি খেতে খেতে এক গাল হেসে বললো,’কিছু ভালোবাসা ফোনে হয়না।সেই ভালোবাসা চিঠিতে হয়।যারা চিঠি দেয়-নেয় তারাই বোঝে।একটা কথা কি জানেন?ফোন থেকে দেয়া মেসেজে গন্ধ থাকেনা।হাতে লেখা চিঠিতে গন্ধ থাকে।যে মানুষটা পায় সে কেবল লেখা পড়তে চিঠি হাতে নেয়না।চিঠিটা নাকে লাগিয়ে প্রাণভরে গন্ধটাও নিয়ে নেয়।ফোন কি সেটা দিতে পারে?’
————
আনিসুর সবে মাছ খেয়ে হাত চাটছিল ওমনি সামনে একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো।গায়ে গোলাপি রঙের ওয়েস্টার্ন ড্রেস।মেয়েটা এসেই টেবিলের উপর উঠে বসে গেছে গোল হয়ে।আনিসুর ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।

‘আরে আসুন বসুন।আপনাকে দাঁড় করাতে আসিনি।বসিয়ে রেখে সব করতে এসেছি’

আনিসুর থতমত খেয়ে বললো,’বসে রেখে সব করতে এসেছো মানে!কি করতে এসেছো?’

মেয়েটা গলায় হাত দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আঁকিবুকি করতে করতে বললো,’আমার খুব গরম লাগছে।ফ্যানটা বাড়িয়ে দিননা।কম কিছু আমার ভাল লাগেনা’

‘এই মেয়ে তুমি কে?নিচে নামো,এটা কেমন বেয়াদবি?’

‘এটা বেয়াদবি?ভালোবাসা বুঝোনা বুইড়া বেটা!’

আনিসুর শার্টের কলার ঠিক করে এদিক সেদিক তাকালো।তারপর হালকা কেশে বললো,’নিচে নামো মা।এটা পুলিশ স্টেশন’

‘মা??মা হবে আপনার আন্টি।আমি হলাম আপনার ২য় বউয়ের মতন।আই মিন আপনার বউয়ের বয়সী।বডি দেখছেন নিজের?কখনও আয়নার সামনে যান না?কি হ্যান্ডসাম আপনি সেটা জানেন?আপনি দুইটা কেন!দশটা বউ ডিজার্ভ করেন’

‘সত্যি?তুমি হইবা আমার বউ?’

‘হবো মানে আমি আপনার বউ হয়েই গেছি।আপনি আমার স্বামী’

‘ঢং বহুত করছো,এবার টেবিল থেকে নেমে বলো কিসের জন্য এত ধামাকা করতেছো’

আনিসুরের কঠিন ডায়ালগ শুনে তিশা টেবিল থেকে নামলো।তারপর কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,’বউকে আইসক্রিম খাওয়ান,চকলেট ফ্লেভার’

‘আগে বলো তুমি কে?’

‘আমি তিশা,পুরুষ মানুষ যাকে দেখে হয়ে যায় বিদিশা’

আনিসুর হক কপালের ঘাম মুছে বললো,’রবিনন্দন এই গরম চিলি চিকেনটাকে ঘাঁড় ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দাও।’

‘আপনি হলেন আমার রাইতা!দুটো মিলে বেস্ট কম্বিনেশন ‘

‘চুপ থাকো মাইয়া!তোমার পরিকল্পনা কি বলোতো!উড়ে এসে জুড়ে বসছো কেন?’

তিশা ন্যাকামু করে বললো,’আমায় কি আপনার মনে ধরে নাই?’

আনিসুর পুনরায় সিটে বসে বললো,’আমার অলরেডি ২টা বউ আছে।দুই ঘরে পাঁচটা ছেলেমেয়ে।কি করে তোমার দায়িত্ব নিবো?’

‘আরেহ বিয়ে করলে তো কেউ না খেয়ে থাকেনা।সংসার এমনিতেই চলে যাবে’

আনিসুর বুঝলো এই মেয়েটা সত্যি সত্যি বিয়ে করতে চায়।দেখতে তো বেশ সুন্দরী।তবে মনে হয় চরিত্র ভাল না।তাও কি হয়েছে।ওনার নিজেরও বা চরিত্র কেমন!!চালিয়ে নেয়া যাবে ঠিক করে আনিসুর তিশার হাত ধরে চেয়ারে বসিয়ে রবিনন্দনকে আইস্ক্রিম আনতে পাঠালো।’

‘শুনুন আমি কিন্তু কালই বিয়ে করবো ব্যস’

‘আচ্ছা তুমি আমার খবর পেলে কই?’

‘আপনাকে কত দেখেছি রাস্তাঘাটে!’

‘তোমার জন্য তো আরও ভাল ছেলে অপেক্ষা করে থাকতে পারে।আমার মতন ৪৬বছর বয়সী পুরুষের কাছে কেনোই বা আসতে গেলে?’

‘আমি ক্রাশ খেয়েছি আপনার ভূড়ির উপর।কি সুন্দর ফুটবলের মতন দেখতে।ইচ্ছা করে সকাল- বিকাল লাত….!না না!আমি বলতে চাইছি ধরে টেনে দিতে ইচ্চা করে।কিউট তো!!ভূড়ি তেই কিন্তু ছেলেদের বেশি ভাল লাগে।’

চলবে♥

#ডাকপাড়ি
#পর্ব_৬
#আফনান লারা
________
তিশা আনিসুরের কোলে বসে পা দুলাতে দুলাতে আইসক্রিম খাচ্ছে মজা করে।আনিসুর হা করে ওকে দেখছে।কি সুন্দর দেখতে মেয়েটা।রবিনন্দন ও হা করে দেখছিল।আনিসুরের পছন্দ করা সব কিছু তার ও পছন্দ হয় সবসময়।
খেতে খেতে তিশা বললো,’বিয়ের আগে সৎ কাজ করলে মঙ্গল হয় জানেন?’

‘না তো’

‘আজ জেনে নিন।আমি চাই আপনি একটা সৎ কাজ করুন।এবং সেটা আজই’

‘কি সেটা?’

‘জেলের একটা মেয়েকে ছেড়ে দিন,যার দোষ গ্রহণযোগ্য ‘

আনিসুর অনেক ভেবে রবিনন্দনকে বললো পূর্ণতাকে ছেড়ে দিতে।সেটা বলেই তিশার হাত মুঠো করে ধরে বললো,’চলো আজই বিয়ে করে ফেলি’
———-
পূর্ণতা জেল থেকে বেরিয়ে ডাকবাক্সটির কাছে এসে গোল হয়ে মাটিতে বসে সেটার ভেতর হাত ঢুকিয়ে চিঠি বের করছে এক এক করে।
সবার আগে তার হাতে আসলো ফারাজের চিঠি।

চিঠিটা কোলে রেখে সে আরও কটা চিঠি বের করছে।এমন করতে করতে সে তার নিজের চিঠিটা পেয়ে গেলো।
মুচকি হেসে সেটা নিজের কাছে রেখে কোমড়ে আটকে রাখা আসল চিঠিটা ডাকবাক্সে রেখে কোলের সব চিঠি এক এক করে ভেতরে রাখছে এবার।
ফারাজের চিঠিটা শেষে রাখতে গিয়ে থমকে গেলো সে।তাতে নামের সাথে ব্যাকেটে লেখা “আমার অঙ্গীকারিণী”

‘অঙ্গীকারিণী?বাহ দারুণ নাম তো।চিঠিটা কি পড়া উচিত?’

মানুষের চিঠি পড়া মোটেও ঠিক কাজ নয় তাও পূর্ণতার বেশ আগ্রহ জন্মালো এটা পড়ার।এমন আকর্ষনীয় নাম দেখলে কার না পড়তে মন চাইবে।ডানে বামে তাকিয়ে পূর্ণতা ওখানে বসেই চিঠিটা খুললো।
চিঠিটা যতটা আগ্রহ নিয়ে খুলেছিল ভেতরটা দেখে আগ্রহ মাটি হয়ে কাদা হয়ে গেছে।পুরো পৃষ্ঠা খালি,সাদা কাগজ মুড়িয়ে খামে পুরা।তবে এটা পোস্ট করলো কে?কোন পাগলে??
পূর্ণতা বিরক্ত হয়ে কাগজটা ভাঁজ করে খামে পুরে থুথু দিয়ে আটকে ডাকবাক্সে ফেলে চললো।
এখন বিকাল সাড়ে চারটা বাজে।পূর্ণতা হাতের ঘড়ি ঠিক করতে করতে হলে ফিরে এসেছে।বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ভাবছে আজকের সারাদিনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা।কাঁধ প্রচণ্ড ব্যাথা করছে।মন চাইছে সেটাকে ছিঁড়ে এনে নিজের দুহাত দিয়ে টিপে ব্যাথা দূর করতে।
প্রেমা পূর্ণতার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চশমা ঠিক করে হাতের বইগুলো টেবিলে ধপাস করে রেখে বললো,’তিশার খবর জানিস?’

পূর্ণতা চোখ বন্ধ রেখে কোলবালিশটা বুকে জড়িয়ে বললো,’পুলিশ অফিসারের কোলে বসে আছে দেখেছিলাম।এসে পড়েবে।ওকে নিয়ে আমার চিন্তা হয়না’

‘তুই এতবড় ঝামেলায় পড়লি কি করে?’

‘সবই নিয়তি।সামনে আবার পড়বো।গ্রামের যে ঝামেলা জানিস তো!আমি তৈরি হচ্ছি জেলের ভাত খাওয়ার জন্য।এই জমি না পেলে খুনখারাবি হয়ে যাবে এরপর এমনি এমনি জেলে যাবো’

‘ভাল উকিল ধর’

‘টাকা কই?আমার যে আয় তাতে আমারই চলেনা আবার উকিল পুষবো? ‘
———
সারথি দরজা খুলে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।তার শাশুড়ি আর ননদ যেকোনো সময়ে এসে পড়বে তা ভেবে অপেক্ষা করছে ওখানে।আনাফ ব্যাট বল হাতে সিঁড়ি দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ছাদের দিকে যাচ্ছিল তখন সারথিকে দেখে থেমে গেলো।নিশ্চুপ হয়ে সে দূর থেকে সারথিকে দেখছে।মেয়েটাকে দেখলে শুধু দেখতেই ইচ্ছা করে।সারথি তখন দরজায় হাত রেখে বাঁকা হাসি দিয়ে বললো,’আনাফ?’

আনাফ থতমত খেয়ে বলে,’আপনি কি করে জানলেন?’

‘গায়ের গন্ধ চিনি। কথা বলছেন না যে?আমি চোখে দেখিনা বলে না জানিয়েই আমায় দেখবেন?’

আনাফ মাথা চুলকে লজ্জিত কন্ঠে বললো,’না তা নয়।আসলে আমি ভাবছিলাম আপনি হঠাৎ দরজার বাইরে কি করেন’

‘আমার শাশুড়ি আসবেন,তার অপেক্ষায় আছি।আচ্ছা একদিন আঙ্কেল আন্টিকে নিয়ে বিকালে আসবেন বাসায়।আমার বুয়া নুডুলস খুব ভালো বানায়।খেয়ে যাবেন।’

‘আচ্ছা!’

আনাফ কি বলবে না বলবে ভেবে ছুটে চলে গেছে।

সারথি হাসছে ছোটার আওয়াজ পেয়ে।আনাফের গায়ের থেকে কেমন একটা আতরের গন্ধ বের হয়।ভালোই।খারাপ না।তাতেই ও চিনে যায় এটা আনাফ।১ম দিন সে যখন ছাদে ঘুরছিল,ঘুরার ঠিক এক মিনিট আগে সে এই গন্ধটা পেয়েছিল।
লুকিয়ে ওকে দেখার স্বভাব আনাফের বেশ পুরোনো।
———-
ফারাজ ব্যাগ থেকে পঁচিশটা লাইন লেখা একটি চিঠি বের করে সামনে ধরলো।ইচ্ছে করেই সাদা কাগজ পোস্ট করে এসেছে।আর লেখা চিঠিটা সে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।এটাও পোস্ট করবে।তবে কোনো একদিন।আজ না,কাল ও না।কিংবা এই সপ্তাহ তেওনা।
খানিক হেসে চিঠিটা সে আবার ব্যাগে পুরে দোকানের ভেতর ঢুকে চারটা চকলেট কিনে একটা রিকশায় উঠলো।রিকশাওয়ালা মামা জানতে চাইলেন কোথায় যাবে।

‘হাবিজাবি ম্যানশন’
——–
‘বুঝলে সোনালী,আমার এই ২টা ছেলের মতন আরও একটা ছেলে ছিল।নাম অরিন্দম কর্মকার।আমাকে বাবা ডাকতো।ছেলেটাকে সামনে রেখে কতবার যে সকালের নাস্তা করেছি।ওর স্কুলের ফিস তো আমিই দিতাম।বাপ ওর সারাদিন মদ খেয়ে শুয়ে বসে থাকতো।আর ওর মা গার্মেন্টসে কাজ করতো,টাকা মিলিয়ে পারতোনা।আহারে ছেলেটা বিয়ের পরেই কোথায় যে হারিয়ে গেলো।হারিয়ে যাবার অবশ্য কারণ আছে।বউয়ের শর্ত ছিল ঘরজামাই থাকতে হবে।তাই চলে গেলো ঢাকা থেকে নেত্রকোনা। এর অনেক বছর পর দেখা হয়েছিল বৈকি।ছেলেটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিলো।শুনেছি ওর বউয়ের কি যেন অসুখ।তার খরচাপাতি জোগাড় করতেই ওর খাওয়া উঠে গেছে।
ছেলেটাকে এরপর আর দেখিনি।ওর বউকেও না।’

‘আচ্ছা বাবা আজ পোস্ট অফিস থেকে যে চিঠিটা পাঠানো হয়েছে ওটা কি ওনার লেখা?’

‘হ্যাঁ।ওরই লেখা।জানি না কেন!এতগুলো বছর পর সে আমায় চিঠি পাঠালো।তার একটি মেয়ে আছে লিখলো।ঠিকানা দিলো ওকে কোথায় পাওয়া যাবে।তাকে কদিনের জন্য আমার কাছে রাখতে বলেছে,অনুরোধ করেছে।
অরিন্দম এখনও আমায় চেনেনি,নাকি চিনেও না চেনার ভান করে।ওর মেয়েকে নাকি আমি কদিনের জন্য রাখবো।সারাজীবন হলে সারাজীবনের জন্য রেখে দিবো।ও কি চিনলো আমায়!’

‘মেয়েটাকে আনতে যাবে কে বাবা?’

বেলায়েত হোসেন গম্ভীর ভাবে ভাবছেন।তখনই মতিন ছুটে এসে বললো,”নানা ফারাজ ভাইয়ে চইলা আইছে’

বেলায়েত হোসেন একটা কাগজ নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বসলেন।অনেক কিছু ভাবার আছে।ভাবতে ভাবতে কলম চালালেন।
সোনালী তার শ্বশুরের রুম থেকে বের হয়ে চলে গেলো।ফারাজ সিয়াম,পিয়ালি,অনন্তের হাতে তিনটা চকলেট ধরিয়ে বাকি চকলেটটা পকেটেই রেখে দিয়েছে।সোনালী এসে ফারাজের কান টেনে বললেন ‘চৌদ্দটা দিন পর ফিরলি।তোর কি মায়ের মুখ দেখতে ইচ্ছে করেনা?’

‘করে,সেজন্যই এলাম’

‘তাই বলে এতদিন পর?বাইরে কি খেতি কেমন করে থাকতি, সেসব আমাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করলিনা?তোর বাবা কি ভাবছে তোকে নিয়ে সেটা জানিস?তোর বাবার কথা বাদ দিলাম,তোর দাদা কি ভাবছে সেটা তো জানার কথা তোর’

ফারাজ পুরো বাড়িতে চোখ বুলিয়ে বললো,’অর্ক কোথায়?ওর চকলেটটা তো দেয়া হলোনা’

‘পড়ছে,ওরের মাস থেকে ওর পরীক্ষা।আগে আমার কথার জবাব দে’

ফারাজ কিছু বলার আগেই দাদার ডাক পড়লো।হাতের ব্যাগটা টেবিলে রেখে সোফা ডিঙিয়ে দাদার রুমের দিকে চললো সে।সিয়াম ফারাজের ব্যাগ হাতাতে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।ফারাজের ব্যাগটাকে ওর কাছে একটা বিশাল আলমারি মনে হয়।এই ব্যাগে থাকে খাতা,কলম,পেন্সিল,মোম রঙ।শত শত খাম,সাদা কাগজ আর জ্যামিতি বক্স।সে জানে কি কি থাকে তাও দেখে।দেখতে ভালো লাগে।নতুন কিছু পাওয়া যাবেনা তাও দেখে’
—————
দাদা জানের রুমটা ভীষণ রকমের ভৌতিক।যেমন তার দরজা খোলার সময় একটা আওয়াজ হয়।ক্রেএএএএএএ করে আওয়াজটা শোনা যায়।যেন রাতটা খুব গভীর,আশেপাশে কেউ নেই,অস্তিত্ব কেবল ভূতের।এরপর দরজা খুলে ভেতরের মেঝেটাকে উঁচু মনে হলেও যখন পা রাখা হয় তখন হোচট খেয়ে পড়তে হয়।অর্থাৎ মেঝে খুব নিচে।এটা গেলো ২য় ভৌতিক লক্ষণ।
পরের ভৌতিক লক্ষণ হলো দাদাকে ডাক দিলে তিনি এমন ভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান যেন সামনের মানুষটাকে হুরমুরিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিবেন।
এখনও তেমন করে চেয়ে আছেন দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে।ফারাজ ঢোক গিলে শুরুতে সালামটা সেরে নিলো।
সালাম নিয়ে দাদা হাতের কাগজটা সামনে এগিয়ে ধরলেন।ফারাজ ওনার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে মনে মনে পড়ছে।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,রোকেয়া হল’

এই এক লাইনটা পড়ে মাথা তুলে তাকালো সে।দাদা বালিশের তলা হাতিয়ে কিছু একটা খুঁজছেন।খুঁজে তফসি বের করেছেন।এরপর জিকির শুরু করেন।
দশবার আল্লাহু,দশবার আল্লাহ আকবর,দশবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ‘

ফারাজ ধীর গলায় জানতে চাইলো কাগজটা দিয়ে কি করবে।

দাদা জানালার দিকে চেয়ে থেকে বললেন,’কাল যাবে এই ঠিকানায়।গিয়ে আমাকে ফোন করবে।আমি বলে দিবো।এখন যাও অর্ককে গণিত বুঝিয়ে দাও।তার গণিতে ৯৫নম্বর এসেছে।আগে একশোতে একশো আসতো।পাঁচ কম এসেছে অনন্ত,পিয়ালের পাল্লায় পড়ে।ওকে ঠিক করো।সামনে ওর আবার ফাইনাল আছে’

‘আমি তো গণিতে কাঁচা দাদাজান’

‘তুমি যেটা পড়াও সেটাতেই ও একশো পেতো।বুদ্ধিমান মানুষ নিজেকে গর্দভ মনে করে,সবার থেকে নিজেকে নিচু ভাবে,মনে করে তার এখনও অনেক কিছু জয় করা বাকি।অথচ তারা জয়ের শিখরে পৌঁছে গেছে তা আশেপাশের সবাই বোঝে,সে বোঝেনা।তুমি সেই কাতারে আছো।এত ভালো মাথা,তাও কোনো স্কুলে মাস্টারি করতে পারোনা।এর পেছনে দোষ একমাত্র তোমার গাম্ভীর্য। মানুষ মেধা পায়না,আর তুমি পেয়েও অবজ্ঞা করছো!’

চলবে♥