Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-০৫

তিমিরবসান পর্ব-০৫

0
341

#তিমিরবসান(৫)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

ফাহাদ খুলনা আজ যাবে তাই রেডি হয়ে বসে আছে রুমে। একটু পর বের হবে তাই স্নিগ্ধাকে কড়া এক কাপ চা আনতে বলল। স্নিগ্ধা চা নিয়ে রুমে আসতেই ও বললো,

– কখন থেকে বসে আছি? এতক্ষণ লাগে চা আনতে?

স্নিগ্ধা ঘড়ির দিকে এক পলক তাকালো। আবার ফাহাদের দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল,

– মাত্র আট মিনিট হয়েছে আমি চা করতে গিয়েছি এটা এত সময় হয়ে গেল বুঝি?

– মুখে বুলি ফুটেছে দেখছি খুব! বেশি কথা বললে ফল ভালো হবে না।

স্নিগ্ধা চুপচাপ সরে এসে বিছানা গুছাতে শুরু করলো। এই চুপচাপ থাকাটাই ফাহাদ সহ্য করতে পারছে না। বেশ কয়েকমাস স্নিগ্ধার তেজ কমে গেছে তাই রাগ ঝাড়তে খুব অসুবিধা হয় তার। ও দ্রুত চা খেয়ে উঠে দাঁড়াল, গাড়ি বোধহয় চলেই এসেছে। সে একবার স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেল। ওর চিবুকটা চেপে ধরে মুখটা ওপরে তুলল। বললো,

– এমন ডোন্ট কেয়ার ভাব নিচ্ছো কেন? জামাই যাওয়ার সময় যে একটু কাঁদতে হয় সেটা জানো না? নাকি ভেতরে ভেতরে আনন্দের বন্যা বইছে?

স্নিগ্ধা কোনো জবাব দিল না। ফাহাদের আঙুলের চাপ তার চোয়ালে বসে যাচ্ছে, কিন্তু সে ব্যথায় উফ শব্দটাও করল না। ফাহাদ ড্রয়ার থেকে একটা ফোন বের করে ওর হাতে দিয়ে বললো,

– তোমার আগের ফোন ইউজ করার দরকার নেই ওটা আমি অফ করে দিয়েছি খুঁজে পাবে না ওটা। এইটা রাখো শুধু আমার সাথে কথা বলবে এর বেশি কিছু করার দরকার নেই। এই ফোনের সম্পূর্ণ এক্সেস আমার কাছে সো ভালো হয় আমার কথা শুনো।

এবার স্নিগ্ধা অবাক হলো বটে! কিন্তু যথেষ্ট স্বাভাবিক গলায় বললো,

– আমার ফোন কোথায়? ওইটা আমার লাগবে।

– কেন ওটাই কি আছে? এটা তো ওইটার থেকেও দামি। লেটেস্ট ফোন দিলাম তোমায়! সেই পূরণটাই চাই? কেন?

– আমি আমার বাড়ির লোকদের সাথে কথা বলবো!

ফাহাদ কিছুক্ষণ ভেবে বললো,

– ঠিক আছে আমি এখানে সিম দিয়েছি ওখানে তোমার বাবার নাম্বার সেভ করে কথা বলিও কিন্তু মনে রাখবে সব কিন্তু আমার কাছে আসবে!

– এমন নজর রাখার কি আছে? আমি কি কারও সাথে একটু কথাও বলতে পারবো না??

– পারবে তবে সেটা লিমিটে থেকে। তোমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না আমি এখনো।

স্নিগ্ধা কিছু না বলে ফোন হাতে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাসলো। ফাহাদের গা জ্ব’লে গেল এই হাসি দেখে তবুও চেপে গিয়ে বললো,

– মনে রাখিস স্নিগ্ধা, আমি ঢাকা ছাড়ছি, তোকে ছেড়ে দিচ্ছি না। বাড়ির নিচে জাহিদ আর রনি থাকবে। তুই কখন কি করছিস সব খবর এসে যাবে আমার কাছে। আর ঘরের খবর পেতে দুমিনিট লাগবে না! আর আমার অবাধ্য হলে কি কি করতে পারবো সেটা তো জানিসই!

স্নিগ্ধা শুধু পলকহীন চোখে চেয়ে রইল। তার এই ভাবলেশহীন শান্ত রূপ ফাহাদকে কিছুটা বিরক্ত করল। সে স্নিগ্ধাকে সরিয়ে দিয়ে নিজের লাগেজটা টেনে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে অবজ্ঞার সুরে বলল,

– আসছি। নিজের সীমানার মধ্যে থাকিস।

একটু পরেই দেখা গেল, নিচে কালো রঙের দামি গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে জামান ভিলার মেইন গেট পেরিয়ে চলে গেল।
গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই স্নিগ্ধার বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘমেয়াদী পাথর যেন নেমে গেল। সে দুই হাত দিয়ে জানালার গ্রিলটা শক্ত করে ধরল। বহু মাস পর সে বুক ভরে একটা মুক্ত বাতাস টেনে নিল ফুসফুসে। এই প্রথম তার মনে হলো, ঘরের ভেতরের বাতাসটায় ফাহাদ নামক সেই দমবন্ধ করা বি’ষাক্ত গন্ধটা নেই।

ফাহাদ যাওয়ার কয়েকদিন কেটে গেছে। ফাহাদের অবর্তমানে তার মায়ের ব্যবহার জঘন্য! তিনি নিজের সকল রাগ উগরে দিচ্ছেন যেন। ও রান্না করছিল তখনই ফাহাদের মা এসে কর্কশ কণ্ঠে বললো,

– কিরে স্নিগ্ধা? এখনো রান্না শেষ হয়নি তোমার? আমরা কি এখন দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?

স্নিগ্ধা কোনরকম অনুভূতিই দেখালো না। ডেক্সির ঢাকনা দিয়ে বললো,

– হয়ে এসেছে। আর পাঁচ মিনিট লাগবে।

সুলতানা জামান নাক সিঁটকে তপ্ত উনুনের চারপাশটা একবার দেখে নিলেন। উনার মূলত খাওয়ার তাড়া ছিল না, ছিল স্নিগ্ধার ওপর নিজের জমানো আক্রোশ ঝাড়ার তাড়া। ফাহাদ বাড়ি থাকার সময় তিনি চাইলেও সব সময় স্নিগ্ধাকে খাটাতে পারতেন না কারণ ফাহাদ নিজের মতো করে ওর ওপর অত্যা’চার চালাত। কিন্তু ফাহাদ যাওয়ার পর এই কয়েকটা দিন সুলতানা জামান যেন এই বাড়ির রানীর মতো আচরণ করছেন।

– এখনো পাঁচ মিনিট লাগবে? নবাবজাদীর পাঁচ মিনিট মানে তো এক ঘণ্টা! বাপের বাড়ি থেকে তো শুধু গিলতেই শিখেছ কাজের ছিরি তো মাশাল্লাহ! ফাহাদ তোমাকে মাথায় তুলেছে বলেই আজ তোমার এত বড় সাহস।

– পাঁচ মিনিটেই হয়ে যাবে। আপনি গিয়ে বসুন।

সুলতানা জামান আঙুল উঁচিয়ে বললো,

– এই একদম মুখে মুখে তর্ক করবে না! কি যোগ্যতা আছে জামান বাড়ির বউ হওয়ার? কি আছে তোমার মধ্যে? বাপের বাড়ি থেকে কিছু শিখিয়ে পাঠায় নি তোমাকে?

স্নিগ্ধা স্তব্দ হয়ে রইলো এখনো মাত্র দুপুর সাড়ে বারোটা বাজে এখনি এমন করছে ইনি!

তার চুপ থাকা দেখে সুলতানা জামান আরও বেশি চড়ে বসলেন। মুখটা কুৎসিতভাবে বেঁকিয়ে বললেন,

– কী রে, কথা বের হয় না যে এখন? বাপের কথা শুনতেই গায়ে ফো’স্কা পড়ল? কী এক ফকিরের ঘরের মেয়েকে ভালো লেগেছিল ফাহাদের, জেদ করে এই আপদটাকে ঘরে তুলল! নিজেরা তো দুবেলা ঠিকমতো খেতে পারিস না, জামান বাড়ির টাকা দেখে তোদের পুরো বংশের লোভ সামলানো যায়নি, তাই না? একটা কানাকড়ি যৌতুক দেওয়ার মুরোদ নেই, আবার নবাবজাদীর মতো মুখে মুখে উত্তর দেওয়া হয়! তোদের মতো ছোট’লোকদের চা’বকে সোজা করা উচিত।

আরো কিছুক্ষণ কথা শুনিয়ে সুলতানা জামান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে গেল। স্নিগ্ধা খাবার রেডি করে সব দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। দরজা বন্ধ করতেই অনুভূতিহীন স্নিগ্ধার সব অনুভূতি যেন বেরিয়ে এলো। সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। তাঁকে নিয়ে তো বললই সাথে তার পরিবারকে কেন টানলো? ফাহাদ জোর করেছে তার পরিবার তো জোর করেনি! ও ফোন হাতে নিল। ফাহাদের কাছে তার এক্সেস আছে এই তোয়াক্কা করলো না। সোজা ফোন দিল তার মাকে। দুই রিং হতেই ওপাশ থেকে হাসি মুখে কণ্ঠ ভেসে এলো,

– কেমন আছিস স্নিগ্ধা?

স্নিগ্ধা ফুঁপিয়ে উঠে বললো,

– ভালো নেই মা! আমি ভালো নেই আমাকে নিয়ে চলো না এখন থেকে! আমি আর থাকতে পারছি না এখানে! ওরা… ওরা তমা..

ওকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ওর মা বললো,

– তুই আবার শুরু করেছিস? এতদিন তো ঠিক ছিলো আবার কি হলো তোর?

– মা, তুমি আমার কথা শুনছো না কেন? আমি বলছি আমি ভালো নেই! ওরা আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, বাপের বাড়ি নিয়ে নোংরা কথা বলে, আমাকে দিয়ে দাসীর মতো খাটায়! আমি সবার অত্যা’চার না হয় সহ্য করেছিলাম, কিন্তু মা, এরা আমার বাবা আর তোমাদের নিয়ে যে ভাষায় কথা বলে, আমি সেটা আর নিতে পারছি না! মা, তুমি কেন বুঝছো না, আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি!

স্নিগ্ধার মা বিরক্ত স্বরে বললো,

– বিয়ের পর সব সংসারে একটু-আধটু মান-অভিমান, কথা কাটাকাটি থাকেই। তুই এসব কী শুরু করেছিস? ফাহাদ তোকে বিয়ে করেছে, কত বড়লোক বাড়ি! আর তুই কি ভেবেছিলি বিয়ের পর বাপের বাড়ির মতো আদর-যত্ন পাবি? শ্বশুরবাড়ি মানেই তো একটু সয়ে নেওয়া। আর ফাহাদ তোকে এত কিছু দিয়েছে, ওসব কি তুই চোখে দেখিস না?

স্নিগ্ধা হতবাক হয়ে ফোনটা কানে ধরে রইল। তার কান্না থেমে গেল। ওর মা আবার বললো,

– তোর কোনো অশান্তি হলে সেটা নিজের বুদ্ধিতে সমাধান কর। তুই এখন হুট করে চলে আসবি মানে কী? লোকজন কী বলবে? আর ফাহাদই বা কী বলবে? তুই কি চাস আমাদের সব সম্মান ধুলোয় মিশুক? ফাহাদ চলে যাওয়ার পর তোর মন খারাপ হচ্ছে, তাই এসব উল্টোপাল্টা চিন্তা করছিস।

– সমাজ কি বলবে লোকজন কি বলবে এসব ভাবছো তুমি?

– অবশ্যই! বিয়ে হয়ে গেলে একটা মেয়ের জন্য শশুরবাড়িটাই আসল যেমনই হোক সহ্য করতে হয়। মাথা ঠাণ্ডা কর স্নিগ্ধা, বড়দের দুটো কথা গায়ে মাখতে নেই। ফোন রাখছি এখন…

কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই খট করে লাইনটা কেটে গেল। স্নিগ্ধা কান থেকে ফোনটা আস্তে আস্তে নামিয়ে আনল। তার ভাষা হারিয়ে গেছে। তার পরিবার যদি এমন করে সে যাবে কোথায়?

কল রাখার দশ মিনিটের মাথায় তার ফোনের রিং বেজে উঠলো। স্নিগ্ধা ফোন হাতে নিতেই দেখল ফাহাদের ফোন। সে ভাবলেশহীনভাবে রিসিভ করে ফোন কানে ঠেকাল। ওপাশ থেকেই প্রথম আওয়াজ শোনা গেল,

– খুব তো আমার বিরুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করছো, তা কোনো লাভ হলো?

স্নিগ্ধা বুঝতে পারলো এতক্ষণে সব কথা ফাহাদ শুনে নিয়েছে তবুও সে বললো,

– মানে? কি বলতে চাইছেন?

– তুমি কি করতেছো না করতেছো সব খবর আমার কাছে আসছে তাই চালাকি করার চেষ্টা করবে না।

স্নিগ্ধার ভাবলেশহীন প্রশ্ন,

– চালাকি করে কি হবে? কি করব আমি?

– পালানোর চেষ্টা করবে।

– পালিয়ে যাবো কোথায়?

ফাহাদ ওপাশ থেকে বোধহয় হাসল। সেভাবেই বলল,

– তাও ঠিক তোমার পরিবার তো তোমাকে রাখার মতো সামর্থ্য নেই! তোমাকে বোঝাই ভাবে তাই আমার কাছে যেইটুকু আছো এইটুকুর জন্য তোমার আমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত!

স্নিগ্ধা বিরক্ত হয়ে বললো,

– আপনার আর কিছু বলার আছে? থাকলে বলেন নাহয় ফোন রাখলাম।

– এত তাড়া কিসের? হ্যাঁ? কার সাথে কথা বলবে? ফোন দিয়েছি সব এক্সেস কিন্তু আমার কাছে আছে বলে দিলাম!

– আপনার এইসব কথা শোনার মতো এনার্জি আমার নেই। যখন এনার্জি ফুল থাকবে তখন নাহয় এইসব শুনবো?

ফাহাদ রাগলো না বরং হেসে বললো,

– কেন? তোমার মায়ের আসল রূপ দেখে এনার্জি ফুঁস বুঝি? তোমাকে তো আগেই বলেছিলাম স্নিগ্ধা, জামান বাড়ির বউ হওয়ার পর তোমার পরিবারের কোনো মুরোদ নেই তোমাকে আমার হাত থেকে টেনে তোলার। তোমার ফোনের এক্সেস আছে আমার কাছে তাই তুমি কি কথা বলছো কার সাথে কথা বলছো সবটাই আমি জানি। তোমার মা-ই সমাজ আর সম্মানের দোহাই দিয়ে তোমাকে আমার কাছে ফেলে রাখতে চায়, তখন তুমি কোন সাহসে ডানা মেলার স্বপ্ন দেখো, হ্যাঁ?

স্নিগ্ধা নিস্পৃহ গলায় বললো,

– সবই তো শুনলেন। তাহলে আর নতুন করে জিজ্ঞেস করার কী আছে?

এরকম উত্তর ফাহাদের ঠিক হজম হলো না। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

– তেজ এখনো কমেনি দেখছি! মনে রাখিস, আমি ঢাকা ফিরতে কিন্তু বেশি দিন সময় নেব না। এই কয়েকটা দিন মায়ের সামনে একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো থাকবি। আমার মা যা বলবে তাই করবি। যদি এর পর কোনোদিন শুনি তুই মায়ের ওপর মুখে মুখে তর্ক করেছিস কিংবা আবার বাপের বাড়ি জন্য ঘ্যানঘ্যান করেছিস, তবে তোকে আমি দেখে নিবো। আমার কথার এদিক সেদিক করবি না মনে থাকবে?

– মনে থাকবে।

স্নিগ্ধার সংক্ষিপ্ত উত্তর।

– গুড। নিজের লিমিটের মধ্যে থাকিস।

বলেই ফাহাদ খট করে লাইনটা কেটে দিল। স্নিগ্ধার মনে কি চলছে সেটা বোধহয় সে নিজেও জানে না। কেমন অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
এভাবেই কাটতে থাকলো একটা, দুটো করে দীর্ঘ কয়েকটা মাস। ফাহাদ প্রতি মাসে দুবার কিংবা একবার করে আসার সুযোগ পায়। সে যখনই আসে, স্নিগ্ধার জীবনে আবার সেই দমবন্ধ করা কালো মেঘ নেমে আসে। এদিকে স্নিগ্ধাকে যে যা বলে সে তা সহ্য করে নেয় যেন এসব তার গায়েই লাগে না! সে একটা পুতুলের মতো হয়ে গেছে, যার কোনো অনুভূতি নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই। যেই স্নিগ্ধা ভেবে নিলো তার বোধহয় মুক্তি নেই তাকে এভাবেই কাটাতে হবে সারাজীবন। আশার আলো হারিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিলো অন্ধকারে তখনই যেন ছোট্ট একটা আলোর দেখা মিললো! হুম? নিয়তিতে বোধহয় অন্য কিছু লেখা ছিলো!

#চলবে…?