#তিমিরবসান(১২)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী
– বাহ্ স্নিগ্ধা! বাপের বাড়ি গিয়ে খুব তো সতী সেজে উকিল দিয়ে ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়েছ! আর এখানে এসে দেখছি অলরেডি নতুন শিকার ধরে বসে আছ?
ফাহাদের আকস্মিক এমন আচরণে স্নিগ্ধার গা ঘিনঘিন করে উঠলো। আশেপাশের দু-একটা টেবিল থেকে কৌতূহলী চোখগুলো ওদের দিকে ঘুরতেই স্নিগ্ধা ভীষণ অস্বস্থিতে পড়লো। হুটহাট এমন হওয়াতে সে আয়াতকে ওয়াজেদের কোল টেনে নিয়েছিল নিজের কোলে এখনো তাকে বুকে চেপে রেখেছে। কিছু বলতে যাবে তার আগে ওয়াজেদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পিঠ দিয়ে দাড়িয়ে ওদের আড়াল করে ফাহাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সে। পকেট থেকে রুমাল বের করে হাতের চশমাটা মুছে আবার চোখে পরল সে। তারপর পকেটে দুহাত গুঁজে হিমশীতল কণ্ঠে বললো,
– ইফ আই এম নট রং, মিস্টার ফাহাদ জামান রাইট? জামান ফ্যামিলির বিগড়ে যাওয়া ছেলে? সে যাই হোক আপনার তথ্যগত ভুলটা একটু শুধরে দিই, সেহরিশ জাহান স্নিগ্ধা আমাদের এজেন্সির অন্যতম সম্মানিত এবং প্রতিভাবান কর্মকর্তা। কোনো পরপুরুষের দয়ায় নয়, নিজের যোগ্যতা আর আত্মসম্মানের জোরে ওনি এখানে বসে রয়েছে! যেটা আপনার মতো একজন অসৎ এবং ছোটলোকের পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব।
অচেনা একজনের কাছ থেকে এমন কমপ্লিমেন্ট পেয়ে ফাহাদের রাগ উঠে গেল। ওয়াজেদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে বললো,
– আমার সম্পর্কে এসব বাজে কথা বলবেন না! আমার আর আমার ওয়াইফের মাঝে কথা বলবেন না একদম! আপনি কে শুনি? আমার আর আমার বউয়ের মাঝখানে কথা বলার সাহস পান কোত্থেকে? নিজের সীমানায় থাকেন, নাইলে কিন্তু…
ফাহাদের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই শোনা গেল ওয়াজেদের গমগমে সুর।সে এগিয়ে এসে বললো,
– প্রথমত, আমি যতদূর জানি আপনাদের ডিভোর্স এর কার্যক্রম চলছে সো ওনি এখন আর আপনার সীমানার ভেতর পড়েন না। আইনি নোটিশ অলরেডি আপনার ঠিকানায় পৌঁছানোর কথা। দ্বিতীয়ত, আপনার ওই নোংরা আঙুলটা নামান, মিস্টার ফাহাদ। আর তৃতীয়ত, আপনি যদি এই মুহূর্তে ভদ্রভাবে এখান থেকে বিদায় না নেন, তবে রেস্টুরেন্টের সিকিউরিটি আর পুলিশ ডেকে আপনাকে কীভাবে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করতে হয়, সেই লাইভ ডেমোনেস্ট্রেশন আমি এখানেই দেখাব। আমার মনে হয় না আপনার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস এই মুহূর্তে আরও একটা পাবলিক স্ক্যা’ন্ডাল সহ্য করার মতো অবস্থায় আছে।
ফাহাদ নিজের সুপরিচিত দাপট দেখিয়ে বললো,
– কি বলতে চাইছেন কি হ্যাঁ? আপনি এত বড় গলায় আমার সাথে কথা বলছেন কোন সাহসে? আপনি জানেন আমার বাবা কে?
ওয়াজেদ এক চুলও দমলো না বরং ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললো,
– আপনার বাবা কে, সেটা ওনার কুলাঙ্গার সন্তানের পরিচয় আর ক্ষমতার অপব্যবহার দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনি কে মিস্টার ফাহাদ? বাবার পরিচয়ের সাইনবোর্ড আর ক্ষমতা ছাড়া আপনার নিজের যোগ্যতাটা ঠিক কতটুকু? ওহ্! ভুলে গিয়েছিলাম… কোম্পানির লকার থেকে টাকা সরানোই তো আপনার একমাত্র নিজস্ব কোয়ালিফিকেশন! তাই না?
নিজের পর্দা ফাঁস হচ্ছে এমন অবস্থা দেখে ফাহাদ ভয় পেলেও দমলো না। তেজ দেখিয়ে বললো,
– এই কি বলছেন আপনি? কি বুঝাতে চাইছেন?
– বুঝতে পারছেন না বুঝি?
– এই আপনি সরুন তো! এই মেয়েটার জন্য এত কিসের দরদ আপনার? ও আমার লিগ্যাল ওয়াইফ, আমার ঘরের রিজেক্টেড মা’’ল ওটা! একটা বাচ্চাসহ ঘাড়ের বোঝা টানার এত শখ আপনার? অন্যের ফেলে দেওয়া জিনিসে ভাগ বসাতে লজ্জা করে না?
স্নিগ্ধা রাগে কাঁপতে লাগলো এদিকে ফাহাদের এমন নোংরা কথাটা শোনামাত্রই ওয়াজেদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে আয়াতকে ফাহাদের শার্টের কলারটা খপ করে চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। রাগে হিসহিসিয়ে বললো,
– মুখের ভাষাটা ঠিক করুন ফাহাদ জামান। যে রত্ন আগলে রাখার যোগ্যতা আপনার নেই, সেটাকে ফেলে দেওয়া জিনিস বলার ধৃষ্টতা দেখাবেন না। অহংকার তো খুব আপনার, তাই না? টাকার অহংকার, ক্ষমতার অহংকার! কিন্তু মনে রাখবেন আপনার বাবার ক্ষমতা দিয়ে আপনি স্নিগ্ধাকে কিনতে পারেননি, আর আজ ওনার আত্মসম্মানকেও ছুঁতে পারবেন না। যে পুরুষ নিজের স্ত্রীকে সম্মান দিতে পারে না, সে সমাজের চোখে একটা আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সে এখন আপনার স্ত্রী তো দূর একজন নারী হিসেবেও তো সম্মান দিতে পারছেন না!
ফাহাদ ওয়াজেদের শক্তির কাছে কাবু হয়ে গেলেও নিজের জেদ ধরে রাখার চেষ্টা করল। ওর কলারটা ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে বলল,
– হাত ছাড়ুন! আপনি আমার পারসোনাল লাইফে নাক গলানোর কে? ও আমার বাচ্চার মা! আমার বাচ্চার ওপর আর বাচ্চার মায়ের উপর আমার অধিকার আছে।
এই কথা শুনে ফাহাদের বুকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল ওয়াজেদ। ঠান্ডা স্বরে বললো,
– অধিকার? যে বাবা বাচ্চার জন্মের পর থেকে অবহেলা ছাড়া কিছুই করে নি, মেয়ে বলে তাকে নিজের সন্তান বলতে চায়নি সে আজ অধিকার চাইছে? হাস্যকর! আপনার মতো কাপুরুষের মুখে এসব কথা মানায় না।
ফাহাদ এবার মরিয়া হয়ে রেস্টুরেন্টের লোকজনের দিকে তাকিয়ে চিল্লামিল্লি শুরু করতে চাইল,
– সবাই দেখুন! আমার বউকে ফুসলিয়ে নিয়ে এসে এই লোক…
– এই চুপ!
ধমকে উঠল ওয়াজেদ। আবার বললো,
– আপনার বিরুদ্ধে যে কতগুলো অপরা’ধের রেকর্ড আছে সেসব আমি জানি না ভাববেন না! সব জানি! যেসব অপ’রাধ ক্ষমতার জোরে চাপা দিয়েছেন সেসব টেনে বের করে আনতে বাধ্য করবেন না!
ফাহাদ ওয়াজেদের পেছনে উঁকি দিয়ে স্নিগ্ধাদের দেখে বলল,
– স্নিগ্ধা তুই তো ভালোই ছেলে জুটিয়েছিস…যে তোর মতো…
ওয়াজেদ পকেট থেকে ফোন বের করে বলল,
– লাস্ট ওয়ার্নিং, মিস্টার ফাহাদ। আপনি যদি এই মুহূর্তে ভদ্রভাবে এখান থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে চলে না যান তবে এই রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ আর আপনার সকল নোংরা হ্যা’রাসমে’ন্টের ভিডিও দিয়ে আপনাকে সোজা হা’জতে পাঠানোর ব্যবস্থা আমি করছি। আপনার প্রভাবশালী বাবার ক্ষমতা ঢাকা শহরের পুলিশের হাত থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারবে না সব ব্যবস্থা আমি করবো। নাউ চয়েস ইজ ইয়োরস।
ফাহাদ চুপ করে গেল দেখে ওয়াজেদ আবার বললো,
– একদম ভাববেন না ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছি! স্নিগ্ধাকে করা সকল অত্যাচারের রেকর্ড আর প্রমাণ আমার কাছে আছে সো ইউ নো না?
ওয়াজেদের নিখুঁত চাল বোধহয় কাজে দিল! তার এমন কনফিডেন্স দেখে ফাহাদের মুখ চুপসে গেল। এতক্ষণ বাবার ক্ষমতার যে দাপট সে দেখাচ্ছিল ওয়াজেদের হাতে সব প্রমাণ থাকার কথা শুনে সেই দাপটের বেলুন ফুটো হয়ে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে খুলনার জালি’য়াতির কেসটা কোনোমতে ধামাচা’পা দেওয়া হলেও সেটা যদি আবার নতুন করে আইনত সামনে আসে তাহলে তার প্রভাবশালী বাবাও তাঁকে বাঁচাতে পারবে না আর পারলেও বাবা আর সাহায্য করবে না!
চরম অপমান, ক্ষো’ভ আর অপদস্থতার গ্লানি নিয়ে ফাহাদ স্নিগ্ধার দিকে একবার বি’ষাক্ত চোখে তাকাল। তারপর আঙুল উঁচিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– আমি দেখে নেবো তোকে স্নিগ্ধা! আর আপনিও বেশি উড়বেন না মিস্টার। আমি কি করি তা তো দেখবেনই!
কথাটা বলেই ফাহাদ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। নিজের অপমানের তপ্ত আঁ’চ বুকে নিয়ে দ্রুত পায়ে প্রায় পালিয়ে যাওয়ার মতো করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল। ওর সাথে আসা লোকটাও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওর পেছন পেছন দ্রুত কেটে পড়ল।
ওয়াজেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পেছন ফিরে দাঁড়াল। স্নিগ্ধা আয়াতকে নিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। এদিকে আয়াত এখনো ভয়ে আছে। রুবি ওয়াশরুম থেকে এসেছে অনেকক্ষণ সে ও সবটা দেখেছে যার কারণে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে। ওয়াজেদ ঝুঁকে আয়াতের গালে হাত দিয়ে বললো,
– লিটল লেডি? ডোন্ট ক্রাই হু?
রুবি এগিয়ে আসলে স্নিগ্ধা একবার মাথা তুলে ওদের দুজনের দিকে তাকালো। আবার মাথা নামিয়ে নিয়ে ইতস্তত করে আওড়ালো,
– আই অ্যাম রিয়ালি স্যরি, আমার পারসোনাল লাইফের নোংরা ঝামেলার জন্য আপনাদের আজ এরকম একটা অকওয়ার্ড সিচুয়েশনে পড়তে হলো। আমার জন্য আপনাদের আজকের দিনটা নষ্ট হলো।
ওয়াজেদের চোখ জোড়া স্নিগ্ধার ফ্যাকাশে মুখের দিকে স্থির। সে দৃঢ় গলায় বলল,
– স্নিগ্ধা অপ’কর্ম আর নোং’রামি যে করে, লজ্জা পাওয়ার কথা ওনার, আপনার নয়। আপনি আপনার আত্মসম্মানের সাথে লড়াই লড়ছেন আর সেটায় আপনার লজ্জিত হওয়ার কিচ্ছু নেই। নিজেকে অপরাধী ভাবা বন্ধ করুন।
স্নিগ্ধা কিছু বললো না। কিছুক্ষণ সবাই চুপ থেকে ওয়াজেদ বললো,
– আপনারা লাঞ্চ সেরে নিন।
স্নিগ্ধা বললো,
– না আমি কিছু খাবো না। আপনারা খেয়ে নিন।
রুবি ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে বললো,
– না স্যার আমিও কিছু খাব না।
ওয়াজেদ একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
– আচ্ছা আমি পার্সেল করে দিতে বলছি এগুলো।
সে উঠে চলে গেল। স্নিগ্ধা নিজের ভেতরের অস্থিরতা কাটানোর চেষ্টা করছে। এতদিন সব হালকাভাবে নিলেও আখ্য তার চিন্তা হচ্ছে ফাহাদ কি কি করতে পারে! আয়াত ওর বুকে মাথা ঠেকিয়ে ছোট ছোট শ্বাস ফেলছে। রুবি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মন খারাপ করো না স্নিগ্ধা। এই ধরনের মানুষগুলো এমনই হয়। নিজেদের অন্যায় ঢাকতে অন্যের ওপর কাদা ছেটাতে দ্বিধা করে না।
স্নিগ্ধা শুধু মাথা নাড়ল। রুবি আবার বললো,
– তবে স্যার যেভাবে আজ তোমাকে প্রটেক্ট করলেন অন্য কেউ হলে হয়তো পার্সোনাল ঝামেলা বলে এড়িয়ে যেতো। এই দিক দিয়ে স্যার আমাদের খুব সম্মান করেন!
স্নিগ্ধা একটা ম্লান হাসি হাসল। এর মধ্যে ওয়াজেদ ফিরে এলো। পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করতে করতে বললো,
– খাবার পার্সেল করে দিয়েছে। চলুন যাওয়া যাক।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় আশেপাশের দু-একটা চোখ ওদের দিকে তাকালেও ওয়াজেদ এমনভাবে হাঁটছিল যেন কিছুই হয়নি। ওর এই স্বাভাবিক থাকা স্নিগ্ধার ভেতরের অস্বস্তি কিছুটা হলেও কমিয়ে দিল। পুরো সময় গাড়িতে কেউ কিছু বলল না। স্নিগ্ধা জানলা দিয়ে বাইরের ছুটন্ত ঢাকা শহরের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর বারবার মনে হচ্ছিল, ফাহাদ আজ ওনাকে সবার সামনে ছোট করতে এসে নিজেই কতটা ছোট হয়ে ফিরে গেল। আর সবচেয়ে বড় কথা, ওয়াজেদ সরওয়ার নামের এই মানুষটা ওর অতীত আর বর্তমানের সব খবর কীভাবে রাখেন? মানুষটা কি তবে শুরু থেকেই ওর ওপর নজর রাখছিলেন? মনে প্রশ্ন চেপে না রেখে সে একটু কেঁশে নিয়ে বললো,
– স্যার কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
ওয়াজেদ লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে বললো,
– হ্যাঁ কোনো হেজিটেশন ছাড়ায় বলতে পারেন।
– স্যার, আপনি ফাহাদের খুলনার জালি’য়াতির কেসটার কথা বললেন… এমনকি ও আমার ওপর আগে কী কী করেছে, সেসব প্রমাণও আপনার কাছে আছে বললেন। আপনি আমার অতীত আর বর্তমানের সব খবর এতটা নিখুঁতভাবে কীভাবে জানেন স্যার? প্রমাণ তো আমার কাছেই নেই আপনি কি করে পেলেন!
ওয়াজেদ হেসে ফেললো কেন যেন। পরক্ষণেই হাসি থামিয়ে বললো,
– এরকম সমস্যা সল্ভ করতে গেলে মাথা খাটাতে হয় স্নিগ্ধা।
স্নিগ্ধা বুঝতে পারলো না। ও রুবির দিকে তাকাতেই রুবি মাথা নাড়ল অর্থাৎ সে ও বুঝতে পারে নি। ওয়াজেদ হেসেই বললো,
– প্রমাণ থাকার কথা আপনার কাছে কিন্তু আপনার কাছেই নেই সেখানে আমার কাছে কি করে আসবে?
– তাহলে…
– আপনি এতদিন ফাহাদের সাথে ছিলেন আর এইটুকু বুঝতে পারেন নি সে কেমন? কতটা বোকা? বাবার ক্ষমতার জোর ধরে সে এতদূর এসেছে। তার সামনে কনফিডেন্স নিয়ে কথা বললেই ও চিন্তায় পরে যাবে কারণ অলরেডি সে টানাপোড়েনে আছে। তার করা জালি’য়াতির নিউজ অনেক জায়গায় প্রচার হয়েছে। সেই হিসেবে এখন সে ভয় পাবে স্বাভাবিক।
এইটুকু বলে থামলো ওয়াজেদ। স্নিগ্ধার মাথায় বিষয়টা খেলে যেতেই তার হাসি পেল। ফাহাদ যে কতটা ফাঁপা আর কাপুরুষ, সেটা ওর চেয়ে ভালো আর কে জানে! কিন্তু সেই দুর্বলতাকে ঠিক সময়ে এভাবে পুঁজী করে যে একটা মানুষকে পুরোপুরি ধ’সিয়ে দেওয়া যায়, তা ওর ভাবনার বাইরে ছিল।
ওয়াজেদ গাড়ি ড্রাইভ করতে করতেই শান্ত গলায় বললেন,
– অপরাধী মানুষের মনে সবসময় একটা চো’রা ভয় কাজ করে স্নিগ্ধা। ফাহাদ যখন আমার সামনে এসে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছিল ও আসলে ভেতরে ভেতরে কাঁপছিল। ওর বাবার পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে জালি’য়াতির খবর মিডিয়াতে ওভাবে না এলেও, করপোরেট সার্কেলে ওটা ওপেন সিক্রেট। আমি শুধু সেই সূত্র ধরে ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে ওনার নিজের অপরাধবোধটাকে উস্কে দিয়েছি। ব্যস, ও নিজের ছায়া দেখেই ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে।
রুবি পেছনের সিট থেকে হালকা হেসে বলল,
– বাহ্ স্যার! একেই বলে একেবারে ক্লিন বোল্ড। আপনার এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়। আমরা তো সত্যিই ভেবেছিলাম আপনার কাছে সব ডকুমেন্ট আছে!
ওয়াজেদ চশমার ফ্রেমটা আঙুল দিয়ে একটু ঠিক করে স্মিত হাসলেন। ওনার সেই স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বললেন,
– সবসময় সব যুদ্ধের জন্য অ’স্ত্রের প্রয়োজন হয় না রুবি, মাঝে মাঝে প্রতিপক্ষের দুর্বল মানসিকতাটাই তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। ফাহাদ আজকে যা করে গেল, ওটার পর ও আর সহজে আপনার সীমানায় আসার সাহস পাবে বলে মনে হয় না স্নিগ্ধা। ও এখন নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত থাকবে।
সবাই চুপ হয়ে গেলে ওয়াজেদ আবার বললো,
– আপনার অতীত সম্পর্কে আমাকে সিফাত আগেই জানিয়েছিল তাই অনেক কিছুই আমার জানা তাই কাজ আরো সহজ হলো।
গাড়ি ততক্ষণে গন্তব্যে এসে গেছে। এখানে থেকে যে যার বাড়ি ফিরে যাবে।
– আজ আপনারা বাড়ি ফিরে যান। তেমন কাজ বাকি নেই, কাল থেকে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করবেন।
স্নিগ্ধা গাড়ি থেকে নেমে হেসে বললো,
– ধন্যবাদ স্যার। আজ আপনি শুধু ফাহাদকে জবাব দেন নি আমাকেও একটা মস্ত বড় সত্যি শিখিয়ে দিলেন। নিজের ভয়ের মুখোমুখি কীভাবে দাঁড়াতে হয় সেটা আজ আপনার কাছ থেকে শিখলাম।
– ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই স্নিগ্ধা। নিজের আত্মসম্মান ধরে রাখার জোরটা নিজের ভেতরেই থাকে। এখন থেকে এই ভয়হীন স্নিগ্ধাটাকেই আমি অফিসে দেখতে চাই।
আয়াতের দিকে হাত নেড়ে বললো,
– টাটাহ লিটল লেডি! আবার দেখা হবে?
আয়াত মুখে আঙুল দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সেটা দেখে ওয়াজেদ হেসে হাত নাড়িয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো।
স্নিগ্ধা বাসায় ফিরে গেল। পরের কিছুদিন কাটল ব্যস্ততায়। ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে ঘরে আনন্দের জোয়ার এসেছে। এভাবে বিয়েও চলে এলো। তবে বিয়েতেও স্নিগ্ধাকে শুনতে হয়েছে অনেক কটূ কথা।
“মেয়ের তো ডিভোর্স হয়ে গেছে, এখন বাপের বাড়ি এসে বোঝা হয়ে বসে আছে”
“স্নিগ্ধা নাকি নিজেই স্বামী শশুরবাড়ি চলে এসেছে”
এরকম বহু কথা শুনেছে। কিছু কথার জবাবও দিয়েছে কিছু কথা শুনেও না শুনার ভান করে থেকেছে। এক প্রকাশ হয়রান লাগছে তার এসব শুনে!
বিয়েতে ওয়াজেদও হাজির হয়েছে। সিফাত আর স্নিগ্ধার স্পেশাল দাওয়াত উপেক্ষা করতে পারেনি। ওয়াজেদ সবার সাথে কুশল বিনিময় করতে করতেই ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ঘরের কোণায় বসে থাকা স্নিগ্ধাকে ঠিক খুঁজে নিলেন। সে ও বেশ কিছু গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর শুনেছে। আয়াতকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে গোমরা মুখে বসে থাকা স্নিগ্ধার দিকে চেয়ে বললো,
– শামিয়ানা যত রঙিন হোক না কেন, কিছু মানুষের মনের অন্ধকার তার চেয়েও বেশি কালো হয়। ওনাদের সস্তা মানসিকতার আলো দিয়ে আপনার ভেতরের আলোকে নিভে যেতে দেবেন না। আজ আপনার ভাইয়ের আনন্দের দিন, মাথা উঁচু করে হাসুন। আপনি কোনো বোঝা নন, আপনি নিজের পরিচয়ে একজন সম্মানী মানুষ। তিমিরের অন্ধকার যখন শেষ হতে শুরু করে তখন মেঘ একটু বেশিই ডাকো। এসব পাত্তা দিলে চলে না তিমিরবসান কিন্তু খুব কাছে!
#চলবে…?

