Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-১৭

তিমিরবসান পর্ব-১৭

0
269

#তিমিরবসান(১৭)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

– ম্যাম এদিকে দেখুন বাচ্চাদের সুন্দর সুন্দর জামা আছে।

পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে দোকানের ভেতর তাকাল স্নিগ্ধা। সেলসম্যান রূপে লোকটাকে দেখে ধাক্কা খেলো সে। কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়াল সে। আজক ওয়াজেদ স্নিগ্ধা আর আয়াতকে নিয়ে মার্কেটে এসেছে কিছু কেনাকাটা করতে, এদিকে ওয়াজেদের চেয়ে যে সে পিছিয়ে গিয়েছে সেই খেয়াল নেই তার। ওয়াজেদ তার পাশে স্নিগ্ধাকে না দেখে পেছন ফিরলো। স্নিগ্ধাকে আয়াতসহ একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলো। স্নিগ্ধার সামনে এসে বললো,

– এখান থেকে কিছু নিবেন? পছন্দ হয়েছে কিছু?

স্নিগ্ধা একবার ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো। আবার দোকানের দিকে তাকাতেই ওয়াজেদ না বুঝে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো। যা দেখলো তাতে সে ও অবাক না হয়ে পারলো না। সেই সেলসম্যানও তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। সেলসম্যান রূপে অন্য কেউ নয় ফাহাদ জামান! ওয়াজেদ এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হলেও নিজের অভিজ্ঞ আর বুদ্ধিদীপ্ত মনকে দ্রুত সামলে নিল। ফাহাদের থেকে চোখ সরিয়ে সে স্নিগ্ধার দিকে তাকাল। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,

– যেহেতু ভালো লেগেছে চলো এখান থেকেই নিই আয়াতের জন্য?

বলতে বলতে স্নিগ্ধাকে টেনে দোকানের ভেতর নিয়ে গেল। স্নিগ্ধা অবাক হলো ওয়াজেদের ব্যবহারে! ফাহাদের সামনে এমন ভাব করছে যেন সে চিনেই না ফাহাদকে! এদিকে আবার “তুমি” সম্বোধন করেছে! স্নিগ্ধা রোবটের মতো ওর সাথে গেল।

আশেপাশে চোখ বুলিয়ে ওয়াজেদ ফাহাদের দিকে তাকিয়ে বললো,

– বাচ্চাদের কালেকশন দেখান। আমার মেয়ের জন্য আপনাদের দোকান থেকেই কিনবো। সুতির বেস্ট কালেকশন দেখাবেন কিন্তু।

ফাহাদ চোখ নিচু রেখেই কিছু কালেকশন বের করলো। ওয়াজেদ মনোযোগ দিয়ে একটা একটা পরখ দেখছে। স্নিগ্ধা অবাক চোখে ওর কাণ্ড দেখছে। একটা মানুষ এতটা শান্ত কিভাবে থাকতে পারে? সে একটু ইতস্তত করে ফিসফিসিয়ে বললো,

– আমরা… আমরা অন্য দোকানে দেখি?

ওয়াজেদ সেসব শুনলো না। উল্টো বললো,

– কেন স্নিগ্ধা? এখানে কালেকশন ভালোই তো!

একটা গোলাপি রঙের জামা হাতে নিয়ে বললো,

– এটা সুন্দর না? আমাদের আয়াতকে ভালো মানাবে কি বলো?

স্নিগ্ধা আড়চোখে ফাহাদের দিকে তাকালো। সে ওদের দিকেই চেয়ে আছে কিন্তু ওয়াজেদ সেসব পাত্তা না দিয়ে বললো,

– তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? জামা দেখো কোনটা পছন্দ! আমার মেয়েকে আজকে অনেক সুন্দর দামি জামা কিনে দিবো ওকে মাই গার্ল?

আয়াতের গাল টেনে দিয়ে বলে উঠল। স্নিগ্ধা একটা শ্বাস ছেড়ে ছড়িয়ে রাখা জামাগুলোতে হাত দিল। একটা জামা পছন্দ হওয়ায় সে এটা ওয়াজেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

– এটা কেমন?

ওয়াজেদের ঠোঁটের কোণে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে স্নিগ্ধার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

– তোমার পছন্দ আর আমার অপছন্দ হতে পারে? এটাও প্যাক করে নাও।

না চাইতেও স্নিগ্ধার মুখে হাসি ফুটলো। তা দেখে ওয়াজেদ মনে মনে হেসে নিলো। বিল মিটিয়ে ওয়াজেদ শপিং ব্যাগটা হাতে নিল। ফাহাদের দিকে আর একপলকও না তাকিয়ে সে স্নিগ্ধার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। স্নিগ্ধা কোনো দ্বিধা না করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওয়াজেদের হাত ধরে এগিয়ে গেল। দোকান থেকে বেরিয়ে কিছুদূর আসতেই নীরবতা ভঙ্গ করে ওয়াজেদ হাঁটার গতি কিছুটা কমিয়ে স্নিগ্ধার পানে চাইল। নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,

– কোনো কষ্ট হচ্ছে স্নিগ্ধা?

স্নিগ্ধা হালকা হেসে সুদৃঢ় গলায় বলল,

– না ওয়াজেদ। পেছনে ফেলে আসা ম’রা গাছে বর্ষা এলেও যেমন পাতা গজায় না, ঠিক তেমনি আমার অতীতও আজ একদম মৃ’ত। আমার বর্তমান তো শুধুই আপনি আর আমার আয়াত।

ওয়াজেদ হেসে বললো,

– বাহ উন্নতি হয়েছে দেখছি?

– হু! হওয়া কি উচিত নয়?

– অবশ্যই উচিত! তবে এত সহজে পারবেন ভাবিনি

স্নিগ্ধা চট করে বলে উঠলো,

– একটু আগেই যে আপনি আমাকে তুমি করে বলছিলেন?

স্নিগ্ধার আচমকা এই প্রশ্নে ওয়াজেদের হাঁটার গতি একটু থমকে গেল। তবে পরক্ষণেই ওর মুখে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি।

– কেন? ভালো লাগে নি বুঝি?

– না না তা বলি নি।

– তাহলে কি চান আমি আপনাকে তুমি করেই বলি?

স্নিগ্ধা চুপ হয়ে আছে। ওয়াজেদ থামল না। আবার বলল,

– তাছাড়াও! সবার সামনে আমি আমার স্ত্রীকে কি আপনি আজ্ঞে করবো নাকি? হু? আপনার এক্স-হাসবেন্ডের সামনে নিজের বউকে একটু বেশি ভালোবেসে ‘তুমি’ সম্বোধন না করলে কি আমার সম্মান থাকে?

ওয়াজেদের মুখে এমন কথা শুনে স্নিগ্ধা অপ্রতিভ হয়ে চোখ নিচু করে ফেলল। গাল দুটো মুহূর্তেই ঈষৎ লাল হয়ে উঠল। লোকটা সিরিয়াস মুহূর্তেও কীভাবে এমন নিখাদ রসিকতা করে সব উড়িয়ে দিতে পারে! ওর অবস্থা দেখে ওয়াজেদ হেসে বললো,

– হয়েছে গাল টকটকে লাল হয়ে যাচ্ছে তো! চলুন আরো অনেক কেনাকাটা বাকি তো।

ওয়াজেদের এমন রসিকতা আর বাঁকা হাসি ওর হৃদস্পন্দন এক লাফে বাড়িয়ে দিয়েছে আর ওয়াজেদ স্নিগ্ধার এই মিষ্টি লজ্জা উপভোগ করতে করতে হাঁটতে লাগল। আয়াত তখনও ওদের দিকে তাকিয়ে দেখছে। ওয়াজেদ স্নিগ্ধার দিকে একপলক তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

– না বললেও কিন্তু আমি ধরে নিলাম, ‘তুমি’ ডাকটা আপনার একেবারেই অপছন্দ হয়নি। আর আপনাকে ‘তুমি’ বলার অনুভূতিটা কিন্তু আমারও মন্দ লাগেনি! তাই এখন থেকে এই ডাকটাই ফিক্সড? কি বলেন?

স্নিগ্ধা অন্য দিকে তাকিয়ে বললো,

– আমি কি না করেছি?

ওয়াজেদ পাল্টা জবাব দিলো,

– আপনি তো হ্যাঁ-ও বলেন নি!

স্নিগ্ধা কথার মা’রপ্যাচে ফেঁ’সে গিয়ে বললো,

– ধ্যাত! আপনার সাথে কথা বললেই এমন করেন!

ওয়াজেদ হেসে ফেললো। হাত বাড়িয়ে আয়াতকে নিজের কোলে ডাকলো। আয়াতও হাত বাড়িয়ে ওয়াজেদের কোলে যাওয়ার জন্য রেডি।

– এই মা? তুমি আর কি কিনবে?

স্নিগ্ধা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো,

– আরো কি? ওর জামা জুতো কত সেট কিনেছেন গুনেছেন আপনি?

ওয়াজেদ ভ্রুকুটি করে বললো,

– তো?

– ওকে আপনি একদম মাথায় তুলে ফেলছেন, ওয়াজেদ। কদিন পর বড় হয়ে আর কাউকেই পাত্তা দেবে না সে!

ওয়াজেদের তৎক্ষণাৎ জবাব এলো,

– থাক, আমার মেয়ে কাউকে পাত্তা না দিলে তো আমারই আনন্দ!

স্নিগ্ধা আগে আগে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

– যা মন চাই করুন!

ওয়াজেদ হেসে আয়াতকে বললো,

– কি হলো লিটল লেডি? তোমার মা রেগে গেল কেন? চলো চলো!

.

ফাহাদ একা একা রাস্তায় হাঁটছে। মাত্রই কাজ শেষ হলো তার। দুই সপ্তাহ হলো এই চাকরিটা নিয়েছে। তার বাবার কাছ থেকে এখন কিছুই পায় না সে। বরং পুরো ফ্যামিলির নাম খারাপ হয়ে গেছে। তার জন্য তার বাবা তাকেই দায়ী করছে। টাকা সরানোর কেসটা ধামা চাপা দিলেও পরবর্তীতে আবেগের বশে আরও অনেক ভুল গু’ন্ডামি করেছে যা ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি স্নিগ্ধার মতো মেয়ে ওকে ছেড়ে আসার কারণ হিসেবেও অনেকে ওর কাজ কর্ম আর চরিত্রের দিকে আঙুল তুলেছে। তার ওপর ব্যবসায় বড়সড় লোকসান খেয়ে বাবার অর্পিত সম্পত্তিও প্রায় নিলামে ওঠার জোগাড় হয়েছিল। একটা সময় তার মা অসুস্থ হয়ে পড়ল। গুরুতর অসুস্থতা সেইদিকে টাকা ঢেলেও সুস্থ করতে পারে নি এখনো শয্যাশয়ী। মাঝে মাঝে আফসোস করে নিজের একটা মেয়ে নেই ভেবে। তাহলে তাকে নিশ্চয় সেবা করতো? হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মেয়ে কী জিনিস!

ফাহাদ নিজের ভুলগুলো যখন থেকে বুঝতে শুরু করল, ততদিনে জীবনের অনেকটা সময় আর সম্মান সে হারিয়ে ফেলেছে। অগত্যা টিকে থাকার তাগিদে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবেই পোশাকের দোকানের এই সামান্য কাজটা নেওয়া। কিন্তু আজ স্নিগ্ধাকে ওই অবস্থায় দেখার পর তার বুকের ভেতরটা দ’গ্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিজের সকল কাজের কথামনে পড়ে যাচ্ছে তার। এমনকি আয়াতকে দেখে তার খুব ইচ্ছে হয়েছিল একটাবার কোলে নিতে! মেয়েটা তো তারই তাই না? স্নিগ্ধার বিয়ের খবর সে পেয়েছিল কিন্তু কিছু বলার বা করার ছিলো না আর না তো সে চায় কিছু করতে।

ফাহাদ রাস্তার পাশের একটা ফাঁকা বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়ল। দুহাতে নিজের মুখটা ঢেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একসময় যে মেয়েটা তার অবহেলা আর কটু কথা মুখ বুজে সহ্য করত আজ সেই স্নিগ্ধাই কত উজ্জ্বল, কত নিশ্চিন্ত!

ফাহাদের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ওয়াজেদের সেই ব্যক্তিত্বপূর্ণ চেহারা আর স্নিগ্ধার প্রতি তার আগলে রাখার দৃষ্টিভঙ্গি। ওয়াজেদ আজ এক স্বাভাবিকতা আর সম্মানের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে স্নিগ্ধা আর আয়াত এখন তার রাজত্ব যেখানে ফাহাদের স্মৃতি বা অস্তিত্বের কোনো স্থান নেই। আয়াতকে ওয়াজেদ যেভাবে ‘আমার মেয়ে’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল সেই দৃশ্যটা ফাহাদের হৃদয়ে তীরের মতো গিয়ে বিঁ’ধছে। যে সন্তানকে সে কখনো বাবা হিসেবে নিজের অধিকার দেয়নি, আগলে নেয়নি, আজ অন্য এক পুরুষ সেই র’ক্তহীন সম্পর্ককে নিজের সর্বোচ্চ সম্মান আর ভালোবাসা দিয়ে আগলে নিয়েছে।

– আমি সত্যিই সব হারিয়েছি…

ফাহাদ বিড়বিড় করে বলে উঠল।

নিজের অহংকার, নিজের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল যে তাকে এভাবে দিতে হবে, সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। অনুশোচনার বি’ষাক্ত এক অনুভূতি তার গলা চেপে ধরল। কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে এখন আর ক্ষমা চাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই, আর সেই অধিকারটুকুও সে বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে।

মাথা নিচু করে রাতের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল ফাহাদ। আজ তার চারপাশের এই অন্ধকার শুধুই রাতের নয় এ যেন তার নিজের তৈরি করা ভুলের তিমির, যার কোনো সহজ অবসান নেই।

.

বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। স্নিগ্ধা আর ওয়াজেদের সম্পর্কের বেশ উন্নতি হয়েছে। স্নিগ্ধা খুব একটা অফিসে যায় না এখন সে এখন পুরোপুরি সংসারী তবে দরকার হলেই ছুটে যায়।

সকালেস্নিগ্ধা তোশকের ওপর কয়েকটা কোলবালিশ দিয়ে চারপাশ নিরাপদ করে তার মাঝখানে আয়াতকে বসিয়ে রেখেছিল। আয়াত ইদানিং টুকটুক করে হেলতে-দুলতে বসতে শিখছে। শরীরটা মাঝে মাঝে একদিকে গড়িয়ে পড়তে চায়, কিন্তু ও আবার নিজেকে সোজা করে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। পরনে হালকা হলুদ রঙের একটা ফ্রক। নিজের ছোট্ট দুটো পা ছড়িয়ে বসে সে একমনে একটা কাপড়ের পুতুল নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল।

ঠিক তখনই অফিসে যাওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট রেডি ওয়াজেদ। পরনে ইস্ত্রি করা গাঢ় নীল শার্ট, হালকা ছাই রঙের প্যান্ট, হাতে ঘড়ি আর পরিপাটি আঁচড়ানো চুল। হালকা পারফিউমের মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরে। ওয়াজেদ স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে ঘড়ির দিকে নজর দিল। বেরোনোর সময় হয়ে এসেছে। তবে দরজার কাছ থেকে সোজা বিছানার দিকে পা বাড়াল সে। যাওয়ার আগে তার ছোট রাজকন্যাকে একনজর না দেখলে যে সারাটা দিনই অসম্পূর্ণ থেকে যায়!

ওয়াজেদ বিছানার ধারে এসে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আয়াতের সামনে নিজের মুখটা আনল।

– কি খবর, মাই লিটল লেডি? আজকেও তো বেশ সোজা হয়ে বসতে শিখে গেছ দেখছি, মাশাআল্লাহ মাই প্রিন্সেস! বিগেস্ট অ্যাচিভমেন্ট, প্রাউড অব ইউ!

আয়াত বাবার কণ্ঠ শুনেই হাত থেকে পুতুলটা ফেলে দিল। তারপর গোল গোল চোখ করে ওয়াজেদের পরিপাটি শার্ট আর চকচকে টাইয়ের দিকে তাকাল। ওয়াজেদ ঝুঁকে এসে ওর নরম তুলতুলে গালে নিজের থুতনি আলতো করে ঘষে দিল।

– বাবা এখন অফিসে যাবে, সোনা। একটা ফ্লাইং কিস দাও তো দেখি!

কিন্তু আজ আর ফ্লাইং কিস বা হাসিতে কাজ হলো না। আয়াত বুঝতে পেরেছে এই সাজগোজের অর্থ বাবা এখন চলে যাবে!

আয়াত দুই হাত বাড়িয়ে দিল। ওয়াজেদ হাত বাড়িয়ে ওকে একটু আগলে ধরতেই আয়াত আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। নিজের খুদে দুটো হাত দিয়ে ওয়াজেদের ইস্ত্রি করা টাই আর শার্টের কলারটা শক্ত করে জাপটে ধরল! তারপর মুখটা সোজা ওয়াজেদের কলারের ভাঁজে গুঁজে দিয়ে ছোট ছোট পা দুটো শূন্যে ছড়াতে লাগল। মুখে এক অদ্ভুত আদুরে শব্দ “আআআ… উউননন!”

ওয়াজেদ তো থমকে গেল! সে হেসে ফেলে বলল,

– আরে! আরে! লিটল লেডি, কলার ছাড়ুন! শার্ট কিন্তু পুরো দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যাবে!

স্নিগ্ধা ওকে নিয়েই বসে ছিল পাশে। আয়াতের এই কাণ্ড দেখে হেসে ফেলে এগিয়ে এলো।

– আরে আয়াত! ছাড়ো বাবা তো কাজে যাবে সোনা! নামো, মায়ের কাছে এসো।

স্নিগ্ধা হাত বাড়িয়ে আয়াতকে কোল থেকে নিতে গেল। কিন্তু আয়াত আরও শক্ত করে ওয়াজেদের শার্ট আঁকড়ে ধরল। কিছুতেই ছাড়বে না! ওয়াজেদের বুকের সাথে লেপ্টে থেকে ছোট ছোট আঙুল দিয়ে ওয়াজেদের টাইটা টেনে দুমড়ে ফেলল।

ওয়াজেদ স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে বলল,

– দেখলে তো স্নিগ্ধা? মেয়ে কিন্তু আমাকে ছাড়বে না। আজকে মনে হচ্ছে আমার অফিসে যাওয়া ক্যানসেল করতে হবে, অথবা এই ছোট্ট সিকিউরিটি গার্ডকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে!

– আপনি ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলেই ও এত নাটক করছে!

স্নিগ্ধা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল।

আয়াত স্নিগ্ধার হাত দেখেই ওয়াজেদের গলার কাছে আরও শক্ত করে মুখ লুকাল। ওয়াজেদ একহাতে আয়াতের পিঠে আদরে হাত বোলাতে বোলাতে স্নিগ্ধার দিকে তাকাল।

– ওকে লিটল লেডির জন্য দশ মিনিট লেট করে যাওয়ায় যায়!

আয়াত যেন বাবার কথাটা বুঝতে পারল। মুখ তুলে ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে নিজের দুটো ছোট্ট দাঁত বের করে একগাল হাসি দিল। ওয়াজেদের সুবিন্যস্ত শার্টের কলার আর টাইটা ততক্ষণে দুমড়ে গিয়ে ভাজ নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু ওয়াজেদের একটুও বিরক্তি হলো না।

স্নিগ্ধা বিছানায় হেলান দিয়ে এই দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে রইল। জীবনের সব ঝড় শেষে এই যে নিশ্চিন্ত ভালোবাসার একটা আশ্রয় পাওয়া এর চেয়ে বড় পূর্ণতা আর কী-ই বা হতে পারে!

#চলবে…?