“তৃ-তনয়া”
পর্ব- ১১৪
(নূর নাফিসা)
.
.
আল্লাহর রহমতে পরবর্তী দুদিনে মেয়ে বাবুটার উন্নতি হয়েছে। আগের চেয়ে অনেকটা স্বাভাবিক তার অবস্থা। এই ক’দিন নাফিসা তাকে নিয়ে থেকেছে, যত্ন নিয়েছে, ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী কিছুটা নার্সিংয়ের কাজ করেছে। মেয়েটা মায়ের আগে খালামনির যত্ন পেয়েছে! এ যেন নাফিসারই মেয়ে! সবমিলিয়ে মেয়ে বাবুকে পুরো দশদিন রাখা হয়েছে হসপিটালে। নাজিয়া থাকাকালীন ছয়দিন আর এরপরে অতিরিক্ত চারদিন। এরমাঝে নাহিদা মেহেদীর সাথে একদিন এসে দেখে গেছে বাবুকে। আর এমনিতে ফোনে আলাপ।
হসপিটালের ঝামেলা শেষ করে আজ নিয়াজ উদ্দিনের বাসায় সবাই। নাজিয়া মেয়েকে কোলে নিয়ে মহা খুশি! তার ঘর আজ পরিপূর্ণ! আর নাফিসা ছেলে বাবুকে কোলে নিয়ে বসে ছিলো অনেক্ক্ষণ! কেননা গত চারদিন ধরে সে হসপিটালে পড়ে আছে। যার ফলে বাবুকে কোলে নিতে পারেনি! সন্তানের খুশিতে আজ নিয়াজ উদ্দিন ও রুমানা বেগমও খুশি! এতোদিন যেন কারো চেহারায় তাকানোর মতো অবস্থা ছিলো না!
বাবুদের নাম রাখা হয়েছে, আশফাক আহমেদ নির্ঝর এবং আরোহী নুযহাত। ছেলে বাবুর নাম রেখেছে নাফিসা। আর আরোহী ছিলো আরাফের দেওয়া নাম। তার সাথে যুক্ত হয়েছে নুযহাত। নুসরাতের সাথে মিল রেখে নুযহাত রেখেছেন নিয়াজ উদ্দিন। সাথে এটাও নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাদের সাথে মিল রেখে ইমরানের তনয়ার নাম যেন রাখে ইসরাত। নুসরাত, নুযহাত, ইসরাত। নাফিসা ছেলে বাবুর নাম জানতে চাইলে বললো সেটা পরে ঠিক করে নেওয়া যাবে। এখন তো বোন বেশি তাই আরেক বোনের নামও চিহ্নিত করে ফেলেছে।
পরদিন নিশাত ও তার মায়েরা এসে দেখে গেছে সবাইকে। আয়েশা বেগম আরও চারদিন নাতি-নাতনীদের সাথে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কেননা আয়াত চলে যাবে, তার শ্বাশুড়ি ফোন করে চলে যাওয়ার তাড়া দিচ্ছে। আয়েশা বেগম যেমন ছেলের বউকে বাড়ির বাইরে রাখতে চান না তেমনই তার মেয়ের শ্বাশুড়ি। তবে আয়াতের শ্বাশুড়ি খুব যত্নবান ছেলের বউয়ের প্রতি। আর আয়াতও শ্বাশুড়ির আদুরে বউমা। যার ফলে শ্বাশুড়ির ডাকের সাথে সাথেই তার চলে যাওয়ার তাড়া!
তিনি চলে যাওয়ার পর থেকে নাফিসা, আরাফ থাকে এখানে। আশিক দুএক দিন পরপর এসে দেখে যায়। ইমরানও মাঝে মাঝে আসে। নাহিদা এসেছিলো দেখা করতে৷ তারা সবাই জোরপূর্বক রেখে দিলো দুদিন। তাজ কোলে আসার পর সে আর বেড়াতে আসেনি এখানে। কেননা নাজিয়া এখানে। সে যদি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেড়াতে আসে তো তার মায়ের ঝামেলা আরও বেড়ে যাবে। তাই সে এখনও বেড়াতে আসেনি৷ আর এখন তো নাজিয়ার দুই বাচ্চা নিয়েই হুলস্থুল! সে এলে আরও বেশি কোলাহল! সে তো কোনো কাজে আসবেই না বরং আরও ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে এটা নাহিদার ধারণা। যা-ই এসেছিলো আপুকে দেখতে, বাকিরা আহ্লাদে তাকে রেখে দিয়েছে! তারা ঝামেলা পোহাতে রাজি তবুও নাহিদাকে থাকতে হবে। দুদিন পর সে ইচ্ছাকৃতভাবে চলে গেলো আবার। তবে ঝামেলার চেয়ে নিয়াজ উদ্দিন ও রুমানার আনন্দটা বেশি ছিলো তৃ-তনয়াকে একসাথে পেয়ে সাথে নাতি-নাতনি!
নাফিসা ছুটি নিয়ে এসেছিলো এক মাসের! কিন্তু তার ডাক পড়ে গেছে বিশ দিনের মাথায়! আবিদা বেগম তার ভাইয়ের বাড়ি থেকে ফোন করেছে। বাসায় বড়মা আর নিশাত আছে। জেরিন চলে আসবে তাই তাকে বাড়িঘর ঠিকঠাক ভাবে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নিশাত একা পারবে না এতোসব! তার এখন চলে যাওয়া প্রয়োজন। নাফিসার ইচ্ছে ছিলো না যাওয়ার। তবে বিশ দিন থাকতে দিয়েছে বিধায় রুমানা বেগমই বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। ইমরানকে কল করেছিলো। ইমরান বিকেলে এসে নিয়ে গেছে। আর বাড়িতে এসেই নাফিসা কাজে লেগে গেছে। সন্ধ্যার পূর্ব থেকে রাত পর্যন্ত সে আর নিশাত রুমের আসবাবপত্র ধুয়ে মুছে রাখলো। কেননা তারা নাকি সকালে আসবে। তাহলে আর এসব কাজ করবেই কখন! বড় মা বলেছিলো বিকেলে আসতে। আবিদা বেগম জানালো আরমান সকালে তাদের বাসায় পৌছে দিয়ে অফিস যাবে! তাই এতো তাড়া! বড় মা রান্নার দিক সামলে নিয়েছে। তারাহুরো করে এতোসব করে ঘুমানোর সময় নাফিসার হাত ব্যাথায় প্রায় কান্না করার উপক্রম হয়েছে! আর ইমরান তাকে বকাঝকা করতে করতে সেবা করে যাচ্ছে! কেননা ইমরান নিষেধ করেছিলো এতোসব করতে। এতোই যেহেতু তাড়া একটু ঝেড়ে পরিষ্কার করে রাখলেই পারতো। কে বলেছে এই রাতের বেলা বিছানার চাদর, জানালার পর্দা, টেবিল ম্যাট কাচা কাচি করতে! অন্যদিকে নিশাত সুস্থ আছে। কেননা সে নাফিসার হেল্পার হিসেবে কাজ করছিলো বিধায় তার এতোটা পরিশ্রম হয়নি।
পরদিন সকালে আবার লেগে গেছে উঠুন বাড়িঘর ঝাড়ু দিতে! ইমরান বাজার থেকে ফিরে তাকে ঝাড়ু দিতে দেখে রেগে বললো,
“আবার ঝাড়ু ধরছে!”
নাফিসা ইমরানকে দেখে উঠুন অর্ধেক ঝাড়ু দেওয়া বাকি রেখেই ঝাড়ু ফেলে দৌড় দিলো নিজের ঘরে! কেননা গত রাতে ইমরান ঘুমের অর্ধেক সময় নষ্ট করেছে তার সেবা করেই!
ইমরান বড় ঘরে চলে গেলে নাফিসা নিশাতের কাছে এসে বললো বাকিটুকু ঝাড়ু দিয়ে দিতে। আর নাফিসা নিশাতের রুমে বন্দী হয়ে রইলো যতক্ষণ পর্যন্ত না ইমরান অফিসের জন্য রেডি হয়! ইমরান রেডি হয়ে গেলে সে এসে নাস্তা দিয়েছে। অত:পর ইমরান অফিস চলে গেলো! নিশাত, নাফিসা কেউই ভার্সিটি যায়নি বাসায় বাবু আসবে বলে। তারা হসপিটাল গিয়ে দেখে এসেছিলো এরপর আর দেখেনি বাবুকে। কিন্তু আফসোস! সারাদিন অপেক্ষা করেও বাবুর দেখা পেলো না! ইমরান বাসায় ফিরে নাফিসাকে ঘরে দেখে বললো,
– কোথায় তোমাদের বাবু? রাতেই সব কাজের তাড়া! এখন তো সারাদিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে!
নাফিসা মুখটা মলিন করে বললো,
– আমি কি জানি! আম্মা বলছে সকালেই নাকি আসবে!
– হু, আসবে! বেড়াতে গিয়েই কি সকালে কোনোদিন বাড়ি এসেছে!
– সেটা আমি জানি! আমাকে এভাবে বলো কেন!
– বলবো না! না করা সত্ত্বেও আমার কথা তোমার কান অব্দি পৌছায় না! নিজের মর্জিতে কাজ করে যাও।
নাফিসা চুপ হয়ে আছে। ইমরানও চুপ। নাফিসা আবার নিচু স্বরে বললো,
– ভাইয়া কি অফিস যায়নি?
– হুম।
– কথা হয়েছে, আজ আসবে কি আসবে না?
– অফিস টাইম শেষ করে গেছে। নিয়ে আসবে এখন।
কিছুক্ষণ পরেই তারা এসে গেছে। বাবু ও জেরিন উভয়েই সুস্থই আছে। সিজারিয়ান পেশেন্ট না হওয়ায় জেরিনকে দেখতে অনেক ভালো লাগছে নাফিসার কাছে। আর এসময় তার আপুদের দিকে তাকালে তার কান্না আসে! তারা না পারে কোনো কাজ করতে আর না পারে ইচ্ছে মতো একটু নড়াচড়া করতে। নাহিদার কতদিন পেরিয়ে গেলো, এখনো তাকে বেছে বেছে কাজ করতে হয়!
বাবুর নাম রাখা হয়েছে জিদান। বাসায় নতুন অতিথি এলে সবসময়ই নাফিসার মাঝে অন্যরকম আনন্দ কাজ করে। রান্নাবান্নার কথা যেন সে ভুলেই গেছে। বাবু সজাগ থাকায় অনেক্ক্ষণ যাবত তাকে কোলে নিয়ে রেখেছিলো। জেরিন কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখছিলো আর নিশাত ও নাফিসা বাবুর সাথে দুষ্টুমি। জিহান পড়ে আছে তার চাচ্চুর কাছে! কতকিছু তার নষ্ট হয়ে আছে, তা সব জমা করে রেখেছে চাচ্চু ঠিক করে দিবে বলে। চাচ্চু তার পার্সোনাল মেকার। তার বাবাকে দেখতেও দেয় না কিছু। তার মতে কেবল চাচ্চু পারে আর চাচ্চুই ঠিক করবে সব। চাচ্চু বলবে বাতিল তো সাথে সাথে ময়লায় ছুড়ে ফেলে। আর অন্যকেউ বাতিল বলে ফেলে দিলে চিৎকার করে কান ঝালাপালা করে ফেলে ময়লা থেকে উঠিয়ে এনে দেওয়ার জন্য!
তারা আনন্দে মেতে আছে বিধায় বড়মা একা একাই রান্না করছেন। আবিদা বেগম এসে নাফিসাকে বললো,
– এহন কি বাচ্চা কোলে নিয়াই বইসা থাকবা! বুবু যে একলা রান্না করে, দেখবা না একটু!
রান্নার কথা মনেই ছিলো না বিধায় নাফিসা জ্বিভ কেটে বাবুকে রেখে কিচেনের দিকে অগ্রসর হলো। সে এলে বড়মা মাগরিবের নামাজ পড়তে চলে গেলো। আবিদা বেগম কিচেনে এসে নাফিসার সাথে কাজে হাত লাগালো এবং বললো,
– আরাফের বাচ্চারা কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ। ভালোই আছে।
– হু, আল্লাহ হায়াতে বরকত দিয়া ভালো রাখলেই হয়।
– বউ সুস্থ হয় নাই?
– আগের চেয়ে কিছুটা ভালো।
– চলাফেরা করতে পারে?
– ঘরের মধ্যেই চলাচল করে। এমনিতে কোনো কাজ করতে দেয় না মা।
– যাক, সুস্থ হইয়া যাইবো। তুমিও বাচ্চাকাচ্চা নিয়া নেও।যাতে লেলেপুলে বড় কইরা দিয়া মরতে পারি। ক’দিন আল্লাহ হায়াত রাখছে কে জানে! বড় ছেলের ঘরে নাতি দেখার সুযোগ তো আল্লাহ দান করছে। দুই নাতি দেখলাম।
নাফিসা চুপচাপ তার কাজ করে যাচ্ছে। তার এখানে বলার মতো কিছুই নেই! শুনতেও লজ্জা লাগছে! যদি পারতো মুখের সাথে কানও বন্ধ রাখতো!
নাফিসার ধাক্কাধাক্কিতে ইমরান আবার বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বই হাতে নিয়েছিলো। ডিনার শেষে ইমরান ঘরে চলে এসেছিলো আর নাফিসা কিছুক্ষণ জেরিনের কাছে বসেছিলো। পরে ঘুমানোর জন্য নিশাতের সাথে নিজেদের ঘরে চলে এসেছে। দরজা চাপানো রেখে ইমরান বই নিয়ে পড়ছে। নাফিসাকে রুমে প্রবেশ করতে দেখে ইমরান বললো,
– তোমাকে নিষেধ করেছিলাম জেরিনের কাছ ঘেঁষতে।
– আমি বাবুকে দেখতে গেছি।
– হুম, মানলাম বাবুকে দেখতে গেছো। তবে আবারও মনে করিয়ে দিলাম কথাটা। এমন করে প্রতিদিন বাবুকে দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা তার পাশে পড়ে থাকতে যেন না দেখি। আমিও বাবুকে কোলে নিয়েছি, তাই বলে জেরিনের সাথে আড্ডায় জমে যাইনি।
– ভাবি কিন্তু আগের মতো নেই। ভালো হয়ে গেছে।
– আমি কারো ভালো খারাপ দেখতে চাইনি। তোমাকে সাবধান করাটা প্রয়োজন মনে করেছি তাই করেছি। এবার মানবে কি মানবে না সেটা তোমার ব্যাপার।
– সরি, আর আড্ডা দিবো না।
– পড়াশোনা তো তোমাকে ছেড়ে অনেক দূর চলে গেছে! ধরতে চেষ্টা করবে কবে থেকে? ওবাড়িতে থেকেছো, দুই একটা বই সাথে নিলে কি ফ্রী টাইম পড়াশোনায় কাজে লাগানো যেতো না! এতোটা ব্যস্ত তুমি থাকোনি সেটা তো আমার খুব ভালোই জানা আছে! এতো ফাকিবাজি কেন দেখা যাচ্ছে?
নাফিসা কিছু বললো না। চুপচাপ ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে মাথা আঁচড়ে নিচ্ছে। কি আর বলবে! ফ্রী টাইম থাকলেই কি! এতো মজার মুহূর্তে কি পড়াশোনায় মনযোগ বসে! সেটা একটু বুঝে না কেন পাজি লোকটা! ইমরান পড়া বন্ধ করে বই বুকসেল্ফে রাখতে রাখতে বললো,
– কাল থেকে যেন বই নিয়ে বসতে দেখি।
নাফিসা চুল বিনুনি করতে করতে বললো,
“তুমিও বাচ্চাকাচ্চা নিয়া নেও।যাতে লেলেপুলে বড় কইরা দিয়া মরতে পারি। ক’দিন আল্লাহ হায়াত রাখছে কে জানে! বড় ছেলের ঘরে নাতি দেখার সুযোগ তো আল্লাহ দান করছে। দুই নাতি দেখলাম। ছোট ছেলের ঘরে কবে দেখমু?”
শেষ কথাটা একটু বাড়িয়ে বলে আড়চোখে ইমরানের দিকে তাকালো সে! ইমরান ব্রু কুচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে! তাই সে বললো,
– আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? আমি বলিনি এই কথা। আম্মা বলছে। তোমাকে শোনানোর জন্য একটু রিপিট করলাম। এই আরকি।
– আম্মা বলছে?
– হু।
– আর জবাবে তুমি কি বলছো?
– বলছি, আমার কাছে বলে কোনো লাভ নেই আম্মাজান। আপনার ছেলের কানে পৌছে দিয়েন কথাটা।
ইমরান বিস্ময়কর ভাবে বললো,
– বলছো তো এই কথা?
– হু।
– আচ্ছা।
ইমরান দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। নাফিসা ঝটপট জিজ্ঞেস করলো,
– কই যাও?
ইমরান পিছু ফিরে বললো,
– তুমি যেহেতু বলেছো আমার কানে পৌছে দিতে আমিও তোমার আম্মার কানে পৌছে দিয়ে আসি যে, ছোট বউমার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হলে নাতিনাতনি আসবে।
নাফিসা মুখে বিষন্নতার ছাপ এনে বললো,
– আমি তো মনে মনে বলছি সেই কথা!
ইমরান হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো। নাফিসা দ্রুত দরজার কাছে এসে উঁকি দিয়ে দেখলো সে সত্যি সত্যিই আবার মায়ের কাছে যায় কি-না! ইমরান বাথরুমের কাছে এসে রুমের দিকে তাকিয়ে নাফিসাকে উঁকি দিতে দেখে ফেললো! নাফিসা দ্রুত রুমে চলে এলো। এবং নিশ্চিত হলো সে বাথরুমে যাচ্ছে। ইমরান রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দিতেই নাফিসা তাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে আছে! মুখে তার হাসি বিদ্যমান। ইমরান অবাক হয়ে বললো,
– আরে! হলো টা কি!
নাফিসার কোনো জবাব নেই। ইমরান তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে সে আরও আঁকড়ে ধরে রইলো! ইমরান শান্ত গলায় ডাকলো,
– নাফিসা?
এবার নাফিসা চোখ বন্ধ রেখেই ফিসফিস করে বললো,
– সবার ঘরেই বাবু আছে। আমাদের ঘরে নেই কেন? আমাদের ঘরেও তো বাবুর প্রয়োজন।
– মাথায় চেপে গেছে বুঝি ভুত!
– হু, আমি কিন্তু সিরিয়াস।
– আমাদের ঘরেও আসবে ইনশাআল্লাহ চারপাঁচ বছর পরে।
নাফিসা মাথা তুলে ব্রু কুচকে তার দিকে তাকিয়ে বললো,
– চারপাঁচ বছর পরে কেন?
ইমরান তার নাক টেনে বললো,
– বাবুর মা কে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করতে হবে আগে।
– বাবু এলে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা যাবে না?
– অন্তত তোমার পক্ষে সম্ভব না।
– কেন?
ইমরান এবার গম্ভীর হয়ে বললো,
– ফার্স্ট ইয়ারে সেকেন্ড ক্লাস পাইছো, মনে আছে? এতো সুবর্ণ সুযোগ থাকতেও পারোনি পড়াশোনায় একটু মনযোগী হয়ে ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে আসতে, আবার বাবু!
– প্লিজ, এইবার পারবো।
– কোনো প্রয়োজন নেই তো! আগে পেরে দেখাও।
নাফিসা গোমড়া মুখু হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
– এখন কি বাবু আসবে না?
– না।
নাফিসা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হনহন করে বিছানায় যেতে যেতে বললো,
– হুহ্, দেখবো নে ক’দিন থাকে এমন! এসে গেছে না বাড়িতে! পাশের ঘরে যখন দুইটা টেও টেও একসাথে বাজবে তখন দেখবো নিজের এমন সিদ্ধান্ত ক’দিন স্থির থাকে!
ইমরান মুখ টিপে হাসলো তার কথায়। অত:পর লাইট অফ করে ঘুমানোর সময় নাফিসাকে টাচ করলেই নাফিসা তার হাতে এক ঘা মেরে দিলো। ইমরান তাকে হাত পা দ্বারা নিজের সাথে গুটিয়ে নিয়ে বললো,
– আমার ঘরে এই টেও টেওয়ের জ্বালায়ই তো বাঁচি না! আরো টেও টেও এলে আমি কাকে রেখে কাকে সামলাবো!
– ছাড়ো! একদম টাচ করবে না আমাকে!
– বাবুর মা আরেকটু বড় হোক, পড়ে বাবুদের চিন্তাভাবনা। নড়াচড়া করলে মাইর দিবো কিন্তু এখন। চুপচাপ ঘুমাও।
নাফিসা জানেই তার শক্তির কাছে হার মানতে হবে তাই আর অযথা নিজের শক্তি খরচ করলো না।
সকালে জেরিন জিহানকে ভাত খাওয়াচ্ছিলো। আর নিশাত জিদানকে নিয়ে হাটছে ঘরের ভেতরেই। ইমরান মাত্র নাস্তা করেছে। নিশাতকে আবিদা বেগম ডাকলে সে ইমরানকে বললো,
– ভাইয়া, ধরো তো একটু।
ইমরান ফোনে কথা বলছিলো তার কোনো এক ফ্রেন্ডের সাথে। সে ফোন কাধে চেপে হাত বাড়িয়ে ধরতে যাবে এমনি নাফিসা এসে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজে কোলে নিয়ে বললো,
– সরো, বাবুদের একদম টাচ করবে না তুমি!
ইমরান হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে! নাফিসার কথায় জেরিন তাকিয়েছিলো তাদের দিকে। নাফিসাকে গোমড়া মুখু হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে জেরিন বললো,
– কি হয়েছে?
– কিছু না। জাস্ট ওর বাবু কোলে নেওয়া নিষেধ।
নাফিসার মুখভঙ্গি দেখে জেরিন মুখ টিপে হেসে নিজের কাজে মনযোগ দিলো। ইমরান বেরিয়ে যাওয়ার সময় বললো,
“থাক, না ই বা নিলাম আমি। তুমিই নাও বেশি বেশি। বইটাও যেন কোলে নিতে দেখি।”
সন্ধ্যায় দুইভাই টিভিতে নিউজ দেখছিলো। আরমান বাইরে যাবে তাই জেরিনকে ডাকলো কোলে থাকা জিদানকে নেওয়ার জন্য। জেরিন নিজের রুমে কিছু করছিলো যার ফলে দুই মিনিট সময় চাইলো। তাই ইমরান তার কাছ থেকে নিজে কোলে নিয়ে বসে রইলো। আরমান বেরিয়ে গেলো। নাফিসা এসে দেখলো সোফায় বসা ইমরানের কোলে জিদান, একহাতে ফোন, অন্যদিকে টিভিও চলছে, আর খাটে জিহান এলোমেলো হয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ইমরানের মনযোগ ফোনের দিকে। হঠাৎই নাফিসার মাথায় দুষ্টুমি চাপলো! সে সিটি বাজাতে শুরু করলো। ইমরান আড়চোখে তার দিকে একবার তাকিয়েছিলো। আশেপাশে কেউ না থাকায় সিটি বাজানোর কারণে কিছু বললো না। আবার নিজের কাজে মনযোগ দিলো। নাফিসার সিটি বাজানোতে এদিকে জিদানও তার কাজ সেড়ে নিলো! জিদানের কাঁথা ভেজা অনুভব করতে পেরে ইমরান চমকে দাড়িয়ে গেলো! আর কাজ হয়ে যাওয়ায় নাফিসা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো! কাথা তো ভিজেছেই, ইমরানের লুঙ্গিও গেছে! একটু পর ইশার নামাজ পড়তে যাবে, এখনই এমন কিছু হওয়াটা প্রয়োজন ছিলো! সে এতোক্ষণে বুঝতে পারলো নাফিসা কেন সিটি বাজিয়েছে! তাকে দাত কিড়মিড়িয়ে তাকাতে দেখে নাফিসা গান ধরলো,
“তেরিহি, মেরিহি, তেরি মেরি… তেরি মেরি কাহানী…! হিহিহি…!”
ইমরান জিদানকে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
– নামাজ পড়তে যাবো, এমনটা না করলেই কি পারতে না! যাক, আমার কি! এগুলো ধুয়ে দিবে কে? হুম?
নাফিসা ব্রু কুচকে বললো,
– একদম পারবো না আমি।
– না পারো। আমিও পারবো না। পড়ে থাকুক!
নাফিসার রাগান্বিত মুখ দেখে এবার সে-ও গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে গেলো, “তেরি হি, মেরি হি, তেরি মেরি…! তেরি মেরি কাহানী….!”
“তৃ-তনয়া”
পর্ব- ১১৫
(নূর নাফিসা)
.
.
নাফিসা বাবুর কাথা চেঞ্জ করতে জেরিনের কাছে গেলো। হঠাৎই চোখ পড়লো বাবুর কোমরের দিকে! তাবিজ বাঁধা আছে কোমড়ে। নাফিসা বললো,
– ভাবি, এসব তাবিজ কেন ব্যবহার করেন!
– এগুলো নজরের তাবিজ।
– এসব ব্যবহার ঠিক না। এগুলো পাপ। এগুলো আল্লাহর বিপক্ষে চলে যায়! এগুলো শিরক করা হয়ে যায়!
– বিপদ আপদ থেকে বাচতে বাচ্চাদের দেওয়া লাগে।
– আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন, আর বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করার মালিকও তিনি। সেজন্য তাবিজের প্রয়োজন নেই। এগুলো শিরকের আওতাভুক্ত। আর আপনি বাচ্চার কপালেও টিকা লাগান। এসব একদমই জায়েজ না। আমার আপুদের বেরির ক্ষেত্রেও কখনোই এসব ব্যবহার করে না। কপালে টিকা লাগায় ফেরাউনের অনুসারীগণ।
নাফিসা কথা বলতে বলতে এখানে বড়মা হাজির হয়েছে। নাফিসা তাবিজের কথা বলতেই তিনিও ফেলে দিতে বললেন। আল্লাহর সৃষ্টি আল্লাহ নিজেই রক্ষাকারী। এরজন্য তাবিজে বিশ্বাস করা কিংবা কপালে, পায়ে, কানের পেছনে কালা টিকা লাগানো ঠিক না। শিরককারীর অবস্থান জাহান্নামে। জেরিন দোটানায় পড়ে গেলো! আরমানও নিষেধ করেছিলো এসব পড়াতে। তাহলে কি তার ফেলে দেওয়া উচিত! কিন্তু তার মা যে দিলো! ফুপুও তো রাখতে বললো! তবে নিষেধকারীর সংখ্যাই বেশি। তারও না দেওয়া উচিত! বড়মাও যেহেতু না দেওয়ার জন্য সাপোর্ট করলো জেরিন তাবিজ খুলে ফেললো। অত:পর বললো,
– বড়মা, কপালের কালো টিকা তো সৌন্দর্যের জন্যে দেওয়া হয়।
বড়মা জবাবে বললেন,
– কিসের সৌন্দর্য! আল্লাহ যেমন বানিয়েছেন সেটাই প্রকৃত সৌন্দর্য। যদি তার সৌন্দর্যের জন্য টিকা দেওয়া লাগতো তবে আল্লাহ তায়ালা ই দিয়ে দিতেন। জিহানের সময়ও না নিষেধ করলাম টিকা লাগাতে!
– মা বললো দিয়ে রাখতে তাই দিয়েছিলাম এই কয়দিন। আজ দেই নাই।
– তোর মা বলুক। কখনোই দিবি না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখবি সবসময়।
নাফিসা তার ঘরে এসে দেখলো ইমরান গোসল সেড়ে নিয়েছে। আর লুঙ্গি নিজেই ধুয়ে বারান্দায় নেড়ে দিয়েছে। নাফিসাকে দেখে বললো,
– এই রাতের বেলা অযথা গোসল করিয়ে ছাড়লে!
– হুহ্! এটুকুর জন্য গোসল করা প্রয়োজন ছিলো! পোশাক পাল্টে নিলেই পারতে!
.
আজও নাফিসা গোমড়া মুখু হয়ে ঘুমালো। তবে ঘুম ভেঙেছে অদ্ভুত শব্দে! চমকে উঠে চোখ খুলে দেখলো লাইট জ্বালিয়ে ইমরান আধশোয়া অবস্থায় থেকে সামনে একটা লাভ শেপ বেলুন ধরে রেখেছে। তাহলে বেলুন ফাটিয়ে তার ঘুম ভাঙিয়েছে! নাফিসাকে চোখ খুলে তাকাতে দেখে সে বললো,
– শুভ বিবাহ বার্ষিকী, বউ।
ইমরান কপালে ঠোঁট ছুয়ে দেওয়ার সাথে সাথে নাফিসার ঘুমঘুম চেহারায় হাসি ফুটে উঠলো। নাফিসা বেলুনটা ইমরানের হাত থেকে নিলো। অত:পর ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরে কপালে কোমল স্পর্শ দিয়ে বললো,
“শুভ বিবাহ বার্ষিকী প্রিয় বর। ভাবা যায়, এই কুট্টুসের সাথে একটা বছর কাটিয়ে দিয়েছি!”
অত:পর ইমরানের মাথার পেছনে রেখেই খামচি দিয়ে বেলুনটা ফাটিয়ে দিলো! ইমরান এক হাতে নিজের কান চেপে ধরে বললো,
– কানের পর্দা ফাটানোর ব্যবস্থা করছো!
নাফিসা খিলখিলিয়ে হেসে বললো,
– তো এই মধ্যরাতে আমার ঘুম ভাঙিয়েছ কেন!
ইমরান তার গালের সাথে গাল লাগিয়ে এক বালিশে শুয়ে বললো,
– হার্টবিটকে উইশ করার জন্য।
– তো আমি এবার বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে গিফট চাই? দিবা না?
– আমি বোধহয় জানি তুমি কি গিফট চাইবে। তাই আগে আমার কথার উত্তর দাও, তুমি পড়াশোনা করবে কি করবে না?
নাফিসা গোমড়া মুখু হয়ে আড়চোখে তাকালো। ইমরান আবার বললো,
– বলো?
– করবো।
– তাহলে এখন ওসব চিন্তা করছো কেন?
– আশেপাশের সবার ঘরে পূর্ণতা আছে আমার ঘর কেন শূন্য থাকবে!
– তোমার ঘরেও পূর্ণতা আসবে যখন সময় হবে। তোমার ইচ্ছে করছে এটা তোমার দোষ না। বিয়ের পর মেয়েদের মাঝে মাতৃত্বের স্বাদ জন্মে এটা প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু তুমি শুধু সংসার করবে না, তোমার পড়াশোনা আছে। নিজেকে একটা নির্দিষ্ট স্তম্ভে দাঁড় করার লক্ষ্য আছে। সেটা পূর্ণ না করে কেন এখনই শুধুমাত্র সংসারে মনযোগী হয়ে পড়ছো! তুমিই দেখো, পড়াশোনায় যদি এইটুকু ফাকি না দিতে তাহলে কি ফার্স্ট ক্লাস আসতো না? নিজের হেয়ালিপনার কারণে রেজাল্ট খারাপ করলে! আর সবার সাথে যে তুলনা করছো, তুমি কি তাদের সবার সমান? না বয়সে না যোগ্যতায়, কোনো দিক থেকেই তুমি তাদের সমান না। আর আমাদের বিয়েটাও তো এতো তারাতাড়ি হতো না। আমিও সমস্যায় না পড়লে বিয়ে করতাম না আর সমস্যা ব্যতিত তোমাকেও এখন বিয়ে দিতো না। সেটা তুমি জানো না? বিয়ে না হলে কি সংসারের জন্য এমন পাগল হতে এখন! সবার কোলে সন্তান দেখে কখনো কি এমনটা ভাবতে যে, “ইশ! যদি আমার কোলেও সন্তান থাকতো!” কি ভাবতে? যেখানে নিজের বিয়ের কথা নিয়েই কখনো ভাবোনি!
নাফিসা চুপ করে আছে। ইমরান একটু থেমে আবার বললো,
– আমার ঘরে এসেছো তো কি হয়েছে, তাই বলে তোমার বয়স বিয়ের অজুহাতে বেড়ে যায়নি। সময়টাকে এখন অন্যরকমভাবে উপভোগ করো। নিজের স্তম্ভকে পাকাপোক্ত করো। আমিও চেষ্টা করি আমার অবস্থানটা আরেকটু ভালো জায়গায় স্থানান্তর করতে। নেক্সট জেনারেশনের জন্য আলাদা একটা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমাদের পরিবারে আরেকটু সচ্ছলতার প্রয়োজন আছে। একটা বাচ্চার পেছনে কত খরচ প্রয়োজন হয় সেটা আশেপাশে দেখছো না তুমি? তো সেভাবে প্রিপেয়ার না থাকলে কিভাবে সামলে নিবো! তাছাড়া আমার বাবুদের জন্য উচ্চ শিক্ষিত মায়ের প্রত্যাশা করি আমি। তোমার আর দু-তিন বছর প্রয়োজন গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার। এইসময়টুকু কি মাতৃত্বের স্বাদ স্থগিত রাখা যায় না? আপুদের দিকেই তাকিয়ে দেখো, তারা সংসারী হয়েছে কি তোমার বয়সে? তাছাড়া ম্যাচিউর থাকা সত্ত্বেও কত সমস্যায় ভুগছে। সেখানে তুমি তো একটা বাতাসী!
– আমি বাতাসী?
ইমরান শরীর কাপিয়ে হেসে বললো,
– উহুম, হবু বাবুর মা। এখন আমাদের প্রেমের বয়স, আমরা প্রেমের সময়টা কেন বাচ্চাদের পিছু দৌড়ে নষ্ট করবো! আগে প্রেম করি, ইনশাআল্লাহ পরে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার করবো।
– আম্মা নাতিনাতনির কথা আবার বললে শুনবে কে?
– এক কান দিয়ে প্রবেশ করিবে, অন্য কান দিয়ে বাহির হইয়া যাইবে। হু?
– উহ! মাঝ রাতে ঘুম ভাঙিয়ে জ্ঞান দিতে আসছে! ঘুমাও চুপচাপ।
– আচ্ছা, দিবো না আর জ্ঞান। আমার সাধ্যে উপস্থিত অন্য কোন গিফট চাও।
– ভেবে নেই।
– ওকে।
একটু পর নাফিসা ইমরানকে ঠেলে বললো,
– ঘুমিয়ে গেছো?
– হু?
– পিকনিক যাবো।
ইমরান ব্রু কুচকে ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে বললো,
– কিসের পিকনিক?
– ফ্যামিলি পিকনিক।
– ফ্যামিলি পিকনিক! হানিমুনে যেতে চাইলেও তো নিয়ে যেতাম। ফ্যামিলি পিকনিকে কে যাবে?
– কেন! আমরা সবাই।
– সবাই নিজের জীবন নিয়ে দৌড়ায় আর তুমি আছো পিকনিক নিয়ে! মাঝরাতে মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার! ঘুমাও।
– বেশি কথা বলবা, খুন করে ফেলবো। আমি পিকনিক যাবো, এটাই আমার চাওয়া গিফট। সেই কবে থেকে বলছি, ফ্যামিলি পিকনিক আর যাওয়া হয় না! ছোট থাকতে যা-ই বাবা-মা বেড়াতে নিয়ে যেতো একটু বড় হলাম পরে আর সুযোগই হয় না! এর স্কুল চালু, এর কোচিং আছে, তার কলেজ আছে! বাবার অফিস আছে! সে অসুস্থ! এমন একটা না একটা ঝামেলা লেগেই থাকে সবসময়! এখন বিয়ে হয়েছে, ভাবলাম আপুরা ভাইয়ারা মিলে যাবো এখানেও উনার আপত্তি!
– আপত্তি না। আপুদের বাচ্চা নিয়ে তোমার সাথে পিকনিক যাবে এখন!
– এহ! বাচ্চা নিয়ে যেন আর কেউ যায় না! আর আমি এখনকার কথা বলছি না তো! প্রয়োজনে আর কিছুদিন পরেই যাবো৷ তবুও যাবো।
– ওকে, আমার তরফ থেকে আমি রাজি। এবার কে যাবে না যাবে তার ব্যবস্থা তুমি করবে। এখন আমরা ঘুমাবো। আর কোনো কথা হবে না।
.
নিশাতের জন্মদিনে আশিক হলুদ ড্রেস গিফট করেছে! এ নিয়ে তিনটা ড্রেস গিফট করলো আর তিনটাই হলুদ! ড্রেস খারাপ না কিন্তু বার্থডেতেও কি হলুদ দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো! সে আশিককে কল করলো,
– আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম।
– ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা আর আজ বার্থডেতেও হলুদ কেন! শপিংমলে কি অন্য কালার অভাব ছিলো?
আশিক খুব শান্ত গলায় জবাব দিলো,
– হলুদ আমার প্রিয় রঙ। তাইতো নিজের রানীকেও হলুদ পরী বানাতে চাই।
এই কথার উপর কোনো কথা বলার নেই নিশাতের। তার পছন্দ অবশ্যই সে ভালোবেসে গ্রহণ করবে। সারাজীবন তাকে হলুদে ডুবিয়ে রাখুক, তবুও আপত্তি করবে না। অত:পর সে মিষ্টি কন্ঠে বললো,
– ড্রেসটা খুব ভালো লেগেছে৷ দেখবে কবে?
– যেদিন দেখা দিবে।
– আজ পড়বো?
– এজ ইউর উইশ।
– আসবে তুমি?
– উহুম।
এভাবেই চললো কিছুক্ষণ তাদের আলাপন।
.
দেড় মাস নানাবাড়ি কাটিয়ে বাচ্চারা নিজেদের বাড়িতে এসেছে আজ। নাজিয়া অনেকটা সুস্থ আছে এখন। এতোদিন পর নিজের ঘরে এসে যেন সব এলোমেলো লাগছে! বাচ্চাদের দাদুর কাছে রেখে সে ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করে নিলো ঘরের আসবাবপত্র। সাথে হেল্প করেছে আরাফ ও আশিক। কেননা আসবাবপত্র একটু নাড়াচাড়া করতে হয়েছে বাবুদের দোলনা ও কাপড়চোপড়ের র্যাকের জন্য। কাজ শেষে তারা হাফ ছেড়ে বাঁচলো! হাতমুখ ধুয়ে তারা ফ্রেশ হয়ে নিলো। আরাফ ঘরে এসে দেখলো নাজিয়া বাবুদের কাপড়চোপড় ভাজ করে আলমারিতে রাখছে। নাজিয়া আজ তাঁতের শাড়ি পড়েছে। কোমড়ে আঁচল গুজে কাজ করছিলো এতোক্ষণ। ওবাড়ি থেকে এতোক্ষণ যাবত চোখের সামনে থাকলেও আরাফ এইমাত্র তাকে অন্যরকমভাবে লক্ষ্য করলো। দরজাটা ভেতর থেকে লক করে নাজিয়াকে জড়িয়ে ধরলো। নাজিয়া চমকে উঠে বললো,
– আরে! হচ্ছে কি!
– কোথায় কি হচ্ছে?
– কাজ করছি, দেখছো না।
– তো করো। নিষেধ করেছে কে?
– এভাবে ধরে রাখলে কিভাবে করবো!
– আমি তোমার হাত ধরেছি নাকি!
নাজিয়া আবার কাজে হাত লাগিয়েও থেমে গেলো। হবে না এখন তার দ্বারা কাজ। আরাফের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো,
– দেরি হচ্ছে না এভাবে? বাবুরা কান্না শুরু করলে কিন্তু আর পারবো না করতে।
– শাড়িতে তোমাকে ভীষণ ভালো লাগছে।
নাজিয়া মুচকি হেসে পা উঁচু করে আরাফের ডানপাশের কানের নিচে কোমল স্পর্শ দিয়ে বললো,
– হয়েছে? এবার কাজ করি?
আরাফ তার কপালে ঠোঁট ছুয়ে দিয়ে বললো,
– আল্লাহ যা করেন, সবটা আমাদের ভালোর জন্যই করেন। দেখেছো, একসাথেই দুইটা বাবু দিয়েছেন আমাদের।
– আলহামদুলিল্লাহ।
– হুম, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের প্রয়োজনটা একবারেই পূর্ণ করে দিয়েছেন এক তনয় এবং এক তনয়া দিয়ে।
– কেন, পরে আবার প্রত্যাশা করা যেতো না বুঝি!
– আবার! হুহ্! যে পরিমাণ কষ্ট করতে দেখেছি তোমাকে, দ্বিতীয়বার ভাবতামই না!
– তুমিও তো কষ্ট করেছো! তুলনামূলক আমার চেয়ে বেশি। সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালার। আল্লাহ আমাদের কষ্টের সফলতা দান করেছেন।
– জ্বি। শোকর-আলহামদুলিল্লাহ।
এমনি বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। নাজিয়া চোখ পাকিয়ে বললো,
– ওইযে, এবার ভালো হয়েছে না!
আরাফ বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,
– আমি যাচ্ছি তো! তুমি কাজ সাড়ো। হারি-আপ!
.
ইমরানের কথায় নাফিসা এখন পড়াশোনায় মনযোগী হয়ে উঠেছে। নির্ঝর, আরোহীর ছয় মাস পরিপূর্ণ হয়ে গেছে আর তাজের নয়মাসের বেশি। ক’দিন যাবত নাফিসা আপুদের বলে বলে পাগল করে ফেলছে দূরে কোথাও ফ্যামিলি পিকনিক যাবে। নাহিদা বলে দিয়েছে কোথায় যাবে তা সিলেক্ট করে জানাতে। আজ নাফিসা কল করেছে। মেহেদী তাজকে কোলে নিয়ে রুমে ছিলো আর নাহিদা কিচেনে। নাফিসা কল করলে মেহেদী রিসিভ করলো,
– আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম, ভাইয়া। কেমন আছেন?
– আলহামদুলিল্লাহ। তোমরা কেমন আছো?
– আলহামদুলিল্লাহ।
– তাজমনি কি করে?
– তাজমনি মারামারি করতে শিখে গেছে। ইদানীং জব্বর মাইর দেয়।
নাফিসা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো! মেহেদী বললো,
– মাইর দেওয়া তুমি শিখিয়ে দিয়েছো না?
– আমি!
– তা নয়তো কি! আমি তো মারি না। তোমার আপুও মারে না! তাহলে আর কে শিখাবে! এখানে তো মারামারি শেখানোর মতো কেউ নেই! আমি নিশ্চিত তুমি শিখিয়ে দিয়েছো!
– হু, ভালো হইছে। আমিই শিখাইছি। আপনাদের শাসন করতে পারবে।
– শাসন! সে দুষ্টুমি করলে যদি তোমার আপু বলে মারবে, তো সে মেরেই বসে! এ কেমন শাসন!
নাফিসা হাসতে হাসতে বললো,
– ভাইয়া এরা ডিজিটাল বাচ্চাকাচ্চা, বুঝতে পেরেছেন! আপনারা যা করার জন্য ভাববেন, তারা বিনা ভাবনায় সেটা করেই বসবে! আপনাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। যেমনটা আপনারা আপনাদের পিতামাতার চেয়ে একধাপ এগিয়ে আছেন।
মেহেদী হেসে উঠলো। নাফিসা বললো,
– আপু কোথায়?
– কিচেনে। নাহিদা….
মেহেদীর হাকে নাহিদা কিচেন থেকে সাড়া দিলে মেহেদী তাজকে সহ কিচেনে যেতে যেতে বললো,
– তারাতাড়ি এসো, নাফিসা চিল্লায়… আর বলে তাজকে সে-ই মারামারি শিখিয়ে দিয়েছে।
ওপাশ থেকে নাফিসা বললো, “আপু, মিথ্যে কথা! আমি চিল্লাই না!”
তাদের কথাবার্তায় হেসে নাহিদা ফোন হাতে নিয়ে নাফিসার সাথে কথা বললো। নাফিসা জানালো সে কক্সবাজার যেতে চায়। কিন্তু নাহিদা নিষেধ করে দিলো। কক্সবাজার বাদে অন্যকোথাও যেতে হবে। কারণ জানতে চাইলে বলে দিলো কক্সবাজার তার ভালো লাগে না। অন্যকোথাও হলে সে যাবে। নাফিসার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কোথায় যাবে তা নিয়ে তাকে আবার ভাবতে হবে! নাহিদার মতামত শুনে রুমে এসে মেহেদী বললো,
– তারা যেতে চাইছে তো সমস্যা কি তোমার?
– তারা যাক। আমি যাবো না।
– কারণটা কি শুনি?
– আমি গিয়েছি না! আর ভালো লাগে না।
– তুমি গেলেই কি! নাফিসা তো আর যায়নি। তোমার জন্য আবার প্ল্যান চেঞ্জ করবে! আমিও তো কয়েকবার গিয়েছি, তবুও তো আমার ভালো লাগে যেতে।
– এতো কিছু বুঝি না। আমি যাবো না।
– এভাবে প্ল্যান নষ্ট করা কি ঠিক হবে?
নাহিদা মেহেদীর দেহে হেলান দিয়ে বললো,
– ভয় লাগে আমার।
মেহেদী বিষ্ময়কর ভাবে বললো,
– কিসের ভয়!
– আমি দুঃস্বপ্ন দেখেছি এই কক্সবাজার নিয়ে!
– ধুর! দুঃস্বপ্ন কেন বাস্তব জীবনে টানছো। ভাগ্যে যা হবার কেউ রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। ইনশাআল্লাহ, সব ঠিক থাকবে।
– আমি তোমাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখেছি।
– ওসব ভেবে ভয় পেও না তো! আল্লাহ আছেন আমাদের সাথে। আমরা সাবধানে থাকবো। হুম? প্ল্যানটা নষ্ট করো না এভাবে। রাজি হয়ে যাও তনয়ার আম্মু।
মেহেদীর কোলে থেকে তাজ বিড়বিড় করতে করতে নাহিদার মাথায় আলতো ভাবে থাপ্পড় দিচ্ছে! যার ফলে হাতে চুল প্যাচিয়ে যাচ্ছে! চুলে টান পড়ায় নাহিদা বিরক্ত হয়ে বললো,
– উফ্! তাজ!
মেহেদী হেসে চুলের প্যাচ খুলতে খুলতে বললো,
– দেখো, মেয়ে ও তোমাকে রাজি হয়ে যেতে বলছে!
– মেয়েটা না জানি কত মাইর খায় আমার হাতে! বড্ড বেশি নড়ে হাতটা!
– একবার হাত তুলে দেখো, খবর নিয়ে ছাড়বো তোমার!
– হুহ্!
নাহিদা তাকিয়ে দেখলো তাজ গোমড়া মুখু হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাই সে বললো,
– ইশ! বাপের আস্কারাই এখনই মাথায় চড়ে বসেছে! একটা দিবো মাইর পাজি মেয়ে!
কথাটা বলার সাথে সাথেই কেঁদে উঠলো তাজ! তার মুখভঙ্গি দেখে নাহিদা হেসে উঠলো আর মেহেদী নাহিদাকে শাসিয়ে আদুরে কথা বলে তাজের কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগলো। নাহিদা তাজকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগলো। তাজের কান্না কমে এলে নাহিদা কপালে চুমু দিলো। তাজ গোমড়া মুখু হয়ে তাকিয়ে আছে নাহিদার দিকে। এমন ভাব দেখে মেহেদী তুলে ধরলো, “পুরো তার মায়ের মতো কিউট অভিমানী!”
নাহিদা নাকে চুমু দিলে তাজ গোমড়া মুখু হয়েই নাহিদার ঠোঁটে তাকিয়ে আছে! অত:পর নাহিদা ঠোঁটে চুমু দিলে তাজ দুই দাত বের করে হেসে উঠলো! সাথে তাজের আব্বু আম্মুও শব্দ করে হেসে উঠলো। এবার নাহিদার উক্তি, “পুরোই তার বাবার মতো পাজি!”
.
অত:পর নাফিসার বহুদিনের ইচ্ছে পূরণে আজ তারা কক্সবাজার। নিয়াজ উদ্দিন, রুমান বেগম ও তাদের তৃ-তনয়ার পরিবার। নাজিয়া ও নাফিসার পরিবার থেকে এসেছে তারাসহ আশিক ও নিশাত। আর নাহিদার পুরো পরিবার। অর্থাৎ জহিরুল ইসলাম, মেহেরুন এবং বাচ্চাদেরসহ মেহতাজ ও আসিফ। তারা ভ্রমণ মিস করে না কখনোই। নিয়াজ উদ্দিন ও রুমানা বেগম আসতে চায়নি, জহিরুল ইসলাম জোর করে নিয়ে এসেছেন। ফ্যামিলি পিকনিকে যদি ফ্যামিলির সবাই না থাকে তাহলে কিভাবে হবে! বাকিদের বলেছে কিন্তু তারা আসেনি। তাদের মাঝে এতো শখ জেগে নেই। তাই আর জোর করলো না তাদের। আর বাড়ি ফাঁকা রেখে এভাবে যাওয়াও যায় না। আয়াতকে আহ্বান করা হয়েছিলো কিন্তু আয়াত প্রেগন্যান্ট। তাই এবারের মতো সে মিস করলো। তাছাড়া একবছর পূর্বে সে তুর্যের সাথে এসেছে এখানে।
তিনদিনের সফরে এসেছে তারা। নাহিদা সারাক্ষণ মেহেদীকে চোখে চোখে রাখে। তারা ছেলেরা স্পিডবোটে ঘুরতে চাইলো। সবারই পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। তবে মেহেদী তাদের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ। অথচ মেহেদীরই যাওয়া নিষেধ! নাহিদা তাকে যেতে দিবে না! তারা সবাই যাচ্ছে, মেহেদীরও ইচ্ছে করছে খুব! তাই নাহিদার ধারে ধারে ঘুরছে কিন্তু নাহিদা বারবারই নিষেধ করছে! তার ভয় করে, সে সমুদ্রের ধারেও যেতে দিবে না তাকে। সবার সামনে তো আর বলে না কিন্তু ভাবভঙ্গিতে নিষেধ করেই যাচ্ছে! সে না করতে করতেও যেন বিরক্ত হয়ে পড়েছে! মেহেদীর উদ্দেশ্য তাকে বিরক্ত করে হলেও যাবে। আসিফের পিছু নিয়েছে আয়াশ! বাবার কোল থেকে তাকে নামানো দায়! সে যাবে সাথে! এদিকে নাফিসা ইমরানকে টেনে ধরে রাখছে! যেতে দিবে না তাকে। তার কারণ ভয় নয়, শর্ত একটাই তাকে সাথে নিয়ে যেতে হবে। ইমরান বিরক্ত হয়ে বললো,
– আরে! তুমি গিয়ে কি করবে সেখানে! আমরা সব পুরুষ মানুষ যাবো!
– এতোসব বুঝি না আমি! আমি না গেলে তোমার যাওয়া নিষেধ!
– কি আশ্চর্য! আপুরা যাওয়ার জন্য বলেছে একবার? তো তুমি যাবে কেন!
– আপুদের কোলে বাচ্চা আছে তাই আপুরা যাবে না। আমার কোলে বাচ্চা আছে?
এবার হয়েছে মহা জ্বালা! বাচ্চা থাকলেও ঝামেলা! না থাকলেও ঝামেলা! অত:পর ইমরান বললো,
– নিশাতও তো যাওয়ার জন্য একবার বললো না! তুমি এমন করছো কেন!
– নিশাত বাচ্চা মানুষ, তাই ভয় পায়। আমি ভয় পাই না।
– ধুর! যাও! যাবোই না।
অত:পর তাদের যাওয়া ক্যান্সেল! তারা দুপুরের পূর্বে যখন রিসোর্টে ফিরে এলো কিছুক্ষণ পরেই সব ছেলেরা গায়েব! এটা কি হলো! কোথায় গেলো সব! নাফিসা বাকিদের খোঁজ নিয়ে কাউকেই না পেয়ে বুঝে গেছে তাদের গোপনে প্ল্যান ছিলো স্পিড বোটে করে দ্বিপে যাওয়ার! নাফিসা রেগে আগুন! নাহিদার ভয়ে ভয়ে কাটছে সময় আর বাকিরা স্বাভাবিক!
তিন-চার ঘন্টা পর তারা ভিজে গোসল সেড়ে এসেছে। সবাই হাসিখুশি। তবে আয়াশ তার বাবাকে দেখে ফ্লোরে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে তাকে নিয়ে গেলো না কেন! জহিরুল ইসলাম শত চেষ্টায়ও মানাতে পারছে না। অত:পর আসিফ নিজেই ভেজা কাপড় চেঞ্জ করার আগে ছেলেকে কোলে নিয়ে বেড়িয়ে গেলো শান্ত করার উদ্দেশ্যে! ইমরান নাফিসার দিকে তাকিয়েই মস্ত বড় অভিমানের পাহাড় দেখতে পেয়েছে সাথে ভেজা চোখের কোটর। আর মেহেদীর হাসিমাখা মুখটা মলিন হয়ে গেছে নাহিদার মুখে ভয়ের ছাপ দেখে! ইমরান রুমে গেলেও নাফিসা রুমে গেলো না৷ এদিকে নাহিদা তাজকে তার দাদুর কোলে দিয়ে চলে গেলো মেহেদীর পোশাকাশাক এগিয়ে দিতে। নাজিয়াও বাচ্চাদের রেখে নিজের রুমে চলে গেছে। আসিফ ছেলেকে নিয়ে আবার সমুদ্রে গোসল সেড়ে এসেছে।
মা-বাবার জন্য নেওয়া রুমে নাফিসা বসে বসে চার বাচ্চার সাথে সময় কাটাচ্ছে। আর পাশে বসে গল্প করছে মেহেরুন ও রুমানা বেগম। তাজ সবার সাথেই মিশে। এখানেও শান্ত হয়ে বসে খেলা করছে। আরোহী নাফিসাকে দেখলেই যখন তখন হেসে ওঠে! সে নাফিসার সাথে সময় কাটাতে বেশ পছন্দ করে। অনেকে বলে এ তো নাফিসারই মেয়ে। নাজিয়াও বলে তার আগে সে নাফিসার কোলে উঠেছে, পছন্দ তো করবেই। কিন্তু মায়ের পাগল দুজনেই! তবে আরোহী সবার কোলে গেলেও নির্ঝরটা সবার কোলে যায় না। মাকেই চোখে হারায় বেশি বেশি! তাছাড়া বাকি দুজনকে যদি সারাদিন নাফিসার কাছে রেখে দেওয়া হয় তো থাকবে সেই ব্যাপার মোটামুটি নিশ্চিত সবাই। নির্ঝর খেলায় তেমন মনযোগী হচ্ছে না। একটু পরপর চিৎকার করে মাকেই ডাকে। আর আরিশা তাকে শান্ত করতে এগিয়ে যায়। কিন্তু এতে শান্ত হওয়ার চেয়ে আরও বেশি অশান্ত হয় আর তখন নাফিসা চেষ্টা করে শান্ত করার। নাফিসার কাছে বেশ ভালো লাগছে তাদের আচরণ ও খেলামেলা! ইমরানের প্রতি যে রেগে আছে সেটা মনে ছিলো না ক্ষণিকের জন্য। তবে মনে পড়েছে যখন লাঞ্চ করতে যাচ্ছে তখন। ইমরান যে তার সাথে একটু কথা বলবে সেই সুযোগটাই দিচ্ছে না তাকে!
রেস্টুরেন্টে এতোবড় পরিবার দেখে অনেকে হা করে তাকিয়েছিলো তাদের দিকে! পাশাপাশি টেবিলে অবস্থান করে সবাই খাওয়াদাওয়া ও আড্ডায় জমে গেছে। মেহেদী নাহিদার ভয় দূর করে তাকে স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে। নাফিসা অভিমানে ইমরানের টেবিল ত্যাগ করেছে। বেচারা ইমরান দূর থেকে বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু নাফিসার মাইন্ড আপাতত “ডোন্ট কেয়ার”! এখানে ম্যাজিক চলছিলো কেবল আয়াশ আর আরিশার মধ্যে! আয়াশ ইচ্ছে করে আরিশার খাবার নিয়ে টানাটানি করছে। যাতে আরিশা কাঁদে! মেহতাজ তাড়া করলে সে নানাভাইয়ের কাছে চলে গেছে। আর বাকিদের নিয়ে চলছে ঝামেলা! তাজ বারবার খাবারে হাত দিচ্ছে! বাঁধা দিলেই সামনে যা পায় তাতেই হাত নেড়ে মারামারি! সাথে কান্না! মেহেরুন নেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু তাজ যাবে না এখন। নাহিদা বিরক্ত হয়ে মেহেদীর কাছে দিয়ে দিলো তাজকে! আরোহী রুমানার কোলে ঘুমাচ্ছে আর নির্ঝর আরাফের কোলে থেকে কান্নাকাটি। তার বসে থাকা পছন্দ না। তাকে নিয়ে সারাদিন হাটাহাটি করলেই কেবল সে খুশি! নাফিসা খাওয়া রেখে ঘুরেফিরে বাচ্চাদের কান্ডকারখানা দেখছে! রুমানা বেগম কয়েকবার ধমক দিলো তার খাওয়া চলে না বলে! লাঞ্চ শেষে তারা একসাথেই হাটছে গল্পগুজব করছে। তবে আশিক ও নিশাত দল ছেড়ে সমুদ্রের দিকে চলে গেছে। ইমরান একটু দূর থেকে ফোন দেখিয়ে ডাকলো নাফিসাকে। এই বলে যে, বড়মা কথা বলবে তার সাথে। নাফিসা গোমড়া মুখু হয়ে তার কাছে এলে সে ফোন তো দিলোই না, নাফিসার হাত মুঠোয় ধরে সমুদ্রের দিকে চলে গেলো। নাফিসা যেতে চাইছিলো না, ইমরান তাকে টেনে টেনেই নিয়ে গেলো। সাথে অভিমান ভাঙাতে জ্ঞানী লোকের জ্ঞান দান! কোনো মেয়ে যায়নি তাদের সাথে তাহলে তাকে কি করে নিবে! আর নাফিসার অভিযোগ, সে তাকে নিয়ে আলাদা বোটে উঠতো! আর ইমরানের যুক্তি ছেলেদের ঘুরাফেরায় আলাদা মজা। মেয়েরা নিজেও পারবে না মজা করতে আর তার জন্য হয়তো ছেলেদের মজায়ও ব্যাঘাত ঘটবে। আর স্পিড বোটে উঠতে বড্ড বেশি সাহসের প্রয়োজন হয়। মেয়েদের হার্ট দুর্বল যার ফলে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে! সাথে নানান কথা শুনিয়ে মানানোর চেষ্টা।
এদিকে ঘটলো মহা বিপত্তি! কথা বলতে বলতে সমুদ্রের তীরে আসতেই দেখলো আশিক আর নিশাত স্পিড বোটে ঘুরছে! নাফিসা আবারও রেগে আগুন! স্পিড বোটে উঠতে যদি এতো সাহসের প্রয়োজন হয় তাহলে নিশাতের মতো একটা মেয়ে এতো আনন্দ উপভোগ করছে কি করে! নিশাত এতো আনন্দিত, আর তাকে যা তা বলে আসছে ভয় দেখাতে!
ইমরান এই মুহূর্তে আশিককে নাগালে পেলে নোনা পানিতে চুবানি দিতো! এবার আর কোনো উপায় নেই। ইচ্ছে না থাকলেও নাফিসাকে নিয়ে স্পিড বোটে চড়তে বাধ্য! আশিক ও নিশাত ঘুরেছে দশ মিনিট! আর নাফিসা আধঘন্টার কাছাকাছি! ইমরান নিজেই বেশিক্ষণ সময় নিয়েছে। তবে কোনো দ্বিপে যায়নি। আশপাশ ঘুরেছে তারা। অত:পর আবার গোসল! এবার নাফিসা খুব খুশি! তার খুশিতে ইমরানও খুশি। তবে সর্দির আভাস পাওয়া গেছে দুজনের মধ্যেই! বিকেল থেকে সন্ধ্যা যার যার মতো ঘুরেছে তারা। কেউ একক ভাবে কেউ দলবদ্ধ ভাবে।
রাতে ডিনার শেষে যে যার রুমে অবস্থান করছে। তাজ এতোক্ষণ যাবত ঘুমাচ্ছিলো, এখন জেগে উঠেছে। মেহেদী তাজকে কোলে নিয়ে নাহিদার উদ্দেশ্যে বললো,
– বলতে পারো, তোমাকে আমি ফার্স্ট কবে দেখেছি?
– পারবো না কেন! ভুলে যাইনি, ভার্সিটি থেকে কিডন্যাপ করে কাজী অফিসের সামনে নিয়ে গেছো। সেদিনই তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা।
মেহেদী হেসে বললো,
– উহুম।
– উহুম মানে! তাহলে এর আগেও দেখেছো আমাকে?
– এর পরে দেখেছি।
এবার নাহিদা হেসে বললো,
– তাহলে সেটা আবার ফার্স্ট হয় কিভাবে?
মেহেদী তার কাছে এসে বললো,
– হুম, সেটাই ফার্স্ট। তোমাকে ফার্স্ট দেখেছি এখানে। এই রিসোর্টে, কোনো এক রাতে যখন তুমি ভুল করে ওয়াইন খেয়ে ফেলেছিলে আর আমার চোখে চোখ রেখে মাতলামোর সাথে জবাবদিহিতা চাইছিলে! আমার নামে এতো এতো অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছিলে আমার কাছেই। তখন আমি প্রথম দেখেছি তোমায়, হারিয়েছি দৃষ্টিতে। অজানা এক ফিলিংস ঘিরে ধরেছিলো আমায়, যা আগে কখনোই পারিনি ফিল করতে! কেননা এভাবে কারো দৃষ্টিতে তাকায়নি আমি। সেটাই প্রথম ছিলো। কোনো মেয়ের দিকে আমি এতোটা লক্ষ্য করিনি কখনোই। অনেকবার দেখেছি এমন কারো চেহারার বর্ননা চাইলেও দিতে পারবো না আমি। কেবল সামনে এলেই মনে করতে পারি তার ব্যাপারে। তোমার ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছিলো সেদিনের পূর্ব পর্যন্ত। কিন্তু সেদিন যেভাবে দেখেছি, একেবারে মুখুস্ত হয়ে গেছে। শুধুমাত্র এই দৃষ্টি দেখেই তোমার বর্ননা পুরো মুখুস্ত আমার। তাহলে কোনটা প্রথম দেখা?
নাহিদা এতোক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে শুনছিলো কথা। এবার মুচকি হেসে মেহেদীর বুকের একপাশে মাথা রেখে হেলান দিয়ে বললো,
– একটা কথা বলার ছিলো।
– কি?
– আমি না, সেদিন ওয়াইন খাইনি। ওটা জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলে গ্লাস ধুয়ে পানি খেয়েছিলাম শুধু!
– হোয়াট! তাহলে মাতলামো করলে যে!
মেহেদী চমকে উঠায় নাহিদা তাকে ছেড়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো এবং বললো,
– তোমাকে একটু লাইনে নিয়ে আসার জন্য যত প্রচেষ্টা! অভিনয়ও বাদ রাখিনি!
– অভিনয়? বমি কি অভিনয়ে আসে?
– জ্বিভের শেষ প্রান্তে হাত দিয়ে দেখো বমি আসে কি-না!
– বাহ! দারুণ! তোমাকে তো অভিনেত্রী হিসেবে নোবেল দেওয়া উচিত!
নাহিদা খিলখিল করে হেসে উঠলো এবং বললো,
– আসলেই তখন নিজের প্রতি প্রাউড ফিল হয়েছিলো যখন দেখলাম তুমি বুঝতে পারোনি আমি অভিনয় করছি। ভাবলাম অভিনেত্রী হয়ে গেলাম না-কি!
মেহেদী এক হাত বাড়িয়ে তাকে নিজের সাথে চেপে ধরে বললো,
– দেখে তো মনে হয় ভোলাবালা! মিসেস তো দেখছি চরম দুষ্ট! আমাকে কতটাই না ইনোসেন্ট বানিয়ে দিয়েছে! একেবারে প্রেমে ফেলতে বাধ্য করেছে! সেদিনই তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছি আমি!
নাহিদা হাসছে। তাজ এতোক্ষণ তার বাবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে একবার আবার তার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে একবার! আর কি বলে যাচ্ছে শুধু সে-ই বুঝে! তাজকে নাহিদার দিকে তাকিয়ে বকবক করতে দেখে নাহিদা হাত বাড়িয়ে দিলো। তাজ যেন লাফিয়ে চলে এসেছে তার কোলে। মায়ের কোলে এসে খুশিতে এরপর শুরু হলো তার বাবার সাথে দুষ্টুমি।
নাজিয়ার রুমে যাওয়ার সময় নাফিসার চোখ পড়লো নাহিদার রুমের দিকে। দরজা চাপানো ছিলো বিধায় দরজার ফাঁকে দেখতে পেল নাহিদার কোলে তাজ। আর পেছনে দাড়িয়ে আছে মেহেদী। বাবা-মেয়ে নাহিদাকে মাঝখানে রেখে লুকোচুরি খেলছে! মেহেদী ডান কাধের দিকে উঁকি দেয় তো তাজও তার বাবাকে দেখতে এদিকে উঁকি দেয়, মেহেদী বামপাশে উঁকি দেয় তো তাজ সেদিকেই খোঁজে! আর দেখতে পেলেই হেসে উঠে! তাজমনি এভাবে এপাশ-ওপাশ খেলতে মজা পেয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে! নাফিসার কাছে বেশ ভালো লাগলো দৃশ্যটা! পেছনে ইমরানকে আসতে দেখে টেনে নিয়ে তাদের দিকে দেখিয়ে বললো,
“দেখো, তারাও খুব সুখে আছে।”
ইমরান নাফিসার চোখে হাত রেখে ঠেলতে ঠেলতে চলে এলো এবং বলতে লাগলো,
“বউ দেখছি খারাপ হয়ে যাচ্ছে! অন্যের রুমে উঁকি দেয়!”
“হুহ্! উঁকি দিয়েছি? এদিকে আসার সময় চোখে পড়ে গেছে!”
তাকে রাগাতে পারলে ইমরানের হাসি পায় খুব। তারা দুজন কিছুক্ষণ আরাফের রুমে আড্ডা দিয়ে নিজেদের রুমে চলে এলো। এতো ছোট ছোট রুম, যেন তিনটা একত্রিত করলে তাদের বাসার রুমের সমান হবে! আর বেডের কথা না বললেই নয়! যেন সিঙ্গেল বেড!
খুব ভোরে নাফিসাকে ডেকে তুললো ইমরান। নিরিবিলিতে হাটবে তারা, সুর্যোদয়ও দেখবে। নাফিসার ঘুম যেন কাটছেই না। ইমরান এক প্রকার ঠেলে ধাক্কিয়ে ওয়াশরুমে পাঠালো। নতুবা এখন ঘুম ভাঙবে না, আর একটু পর তার ঘাড় মটকাবে কেন সে ডেকে তুললো না! দুজন সমুদ্রের তীরে চলে এলো। মানুষ যে একেবারে নেই, তা নয়। তাদের মতোই কয়েকজন আশেপাশে ছিটিয়ে আছে। তাদের মধ্যে চোখে আটলো দুজনকে! আশিক আর নিশাতের মতো দেখা যাচ্ছে! নাফিসা অনেক্ক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিলো আর এখন ইমরানেরও চোখ পড়লো সেদিকে। সে বললো, “আশিকের মতো দেখা যাচ্ছে না? নাকি?”
বলতে বলতে সেদিকে পা বাড়ালে নাফিসা তার টিশার্ট ধরে টেনে অন্যদিকে ঠেলতে ঠেলতে বললো,
“আশিকের মতো না, ওটা আশিকই। ওদিকে কই যাও! নতুন দম্পতি চুপি চুপি বেরিয়েছে, এতো ডিস্টার্ব কেন করো!”
ইমরান তাকে একহাতে নিজের সাথে চেপে ধরে হাটতে হাটতে বললো, “বড্ড বেশি কথা বলতে শিখে গেছে! বাসায় ফিরে কমাতে হবে কথার স্পিড। আর ভালোবাসার পরিমাণটা বাড়াতে হবে। ইদানীং আমার প্রতি তুমি নজর কম দিচ্ছো!”
নাফিসা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। নাফিসা এক পলক পিছু ফিরে দেখলো আবছা অন্ধকারে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আশিক নিশাতকে দু’হাতে জড়িয়ে নিয়েছে। এবং এইমাত্র কপালে চুম্বন করলো! নিশাতও চুপচাপ দাড়িয়ে আছে আশিকের কাধে হাত রেখে। বিয়ের পর আজ পর্যন্ত আশিক রাত কাটায়নি শ্বশুর বাড়িতে। নিশাতও বেড়াতে গিয়ে রাতে থাকেনি আশিকের বাড়িতে। তবে এখানে বেড়াতে এসে প্রথমবারের মতো এক রুমেই আছে দুজন।
বিশাল সমুদ্র, আর আছে তার আছড়ে পড়া তরঙ্গ! ধূসর লালচে আকাশ আর ভুবনে বইছে শিহরিত বাতাস!চারিপাশ দেখে নাফিসার মনে প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেলো। পাশে থাকা ইমরানের প্রতিও যেন আকর্ষণটা হুট করে আরও বেড়ে গেলো। একে অপরের পেছনে এক হাত রেখে তারা তাল মিলিয়ে কদমে কদমে বালি উড়িয়ে হাটছে আর কথা বলছে। কিছুদূর এগিয়ে তারা বালিতে বসে পড়েছে। ইমরানের উপর হেলান দিয়ে নাফিসা বসে আছে সাথে চলছে তাদের খুনসুটিময় ভালোবাসা। কিছুক্ষণ পরেই উদিত হলো লাল সূর্য। এসময় তার পরিবারের সবাই উপস্থিত সমুদ্রের তীরে। হাসিঠাট্টা, মজা মাস্তিতে তারা মুহুর্তগুলো খুব উপভোগ করেছে।
সফর শেষ করে তারা সুস্থভাবে ফিরে এসেছে নীড়ে।
হবে যার ঠাঁই যেথা, সেথাই পড়ে আছে সবে।
ভালোবেসে যদি থাকে প্রত্যেকে প্রত্যেকের তরে,
তৃ-তনয়ার সজ্জিত সংসার হয়তো এমনই রয়ে যাবে।
.
(শুভ সমাপ্তি)