Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-২৬+২৭

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-২৬+২৭

0
1

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২৬

-“উৎস ভাই”

-“হুম।”

মেহেক হিজাবের এক কোনা আঙুলে পেচিয়ে লজ্জা পাওয়ার মতো করে বলল,
-“আমার না লজ্জা পাচ্ছে।”

উৎস বিস্মিত হয়ে বাইকের লুকিং গ্লাসে তাকায়।ভুতে ধরলো নাকি?লজ্জা পাওয়ার তো কোনো কারণ দেখছে না তাহলে এই কথা বলার মানে কি আছে!তাও জানার জন্য জিজ্ঞেস করলো,
-“কেনো?”

মেহেক উসখুস করতে করতে বলে,
-“ইয়ে মানে বিয়ের পর এক ঘরে কিভাবে থাকবো?একি বাড়িতে আপনার বাবা-মা আবার আমারও!”

সাত সকাল বেলা কানের কাছে ফালতু কথা শোনায় উৎস চটে যায়।যখন তখন আজগুবি কথা বলার মতো ভাবনা মেহেকের মাথায় আসতে পারে।তাই বলে এমন উদ্ভট চিন্তা ঘুরবে মাথায়।ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছে তাই বলে এতোটা নির্লজ্জ হয়ে যাবে!উৎস দাঁতে দাঁত পিষে রাশভারি কন্ঠে বলল,
-“একটু কমনসেন্স বলে তোর কিছু আছে।বোনের বিয়ে আর তুই নিজের বিয়ে নিয়ে লজ্জা পাচ্ছিস।তাও আবার কি নিয়ে রাতের জামাইর সাথে কিভাবে ঘুমাবি এক ঘরে!অবিশ্বাস্য।”

মুখে ভেঙচি কেটে মেহেক প্রতিত্তোরে বলল,
-“অবিশ্বাসের কী আছে?আপনার মধ্যে লজ্জা টজ্জা নাই থাকতে পারে কিন্তু আমার মধ্যে আছে।”

-“তোর মধ্যেই কি আছে নাকি।মেয়ে হয়েছিস লজ্জা পাবি।আমি দুই একটা রোমান্টিক কথা বলবো আর তুই দুই হাত দিয়ে মুখ ডাকবি।তা না করে বেহায়ার মতো স্বামী স্ত্রীর প্রাইভেসি নিয়ে কথা তুলছিস।”

-“আমি বুজতে পারি না আপনি সব কিছুতেই আমার উপর দোষ চাপান কেনো?লজ্জা পেলেও দোষ আবার না পেলে ও!”

উৎস খুবই সাবধানতার সাথে পাশের গাড়িগুলোকে ওভারটেক করে সামনে গিয়ে তিক্ত স্বরে বলল,
-“তুই নিঃসন্দেহে আমার কাঁধে হাত রেখে বসে আছিস আবার পায়তারা করছিস কীভাবে আমার পকেট খালি করা যায়।তার কাছে তো এসব কিছুই না।”

চোখ গোল গোল হয়ে গেলো মেহেকের।তার মনের কথা জানলো কিভাবে?স্রোতের বিয়ের সময় যেভাবে বিশ জোড়া জুতো হাতিয়েছিলো সেভাবেই আজ কাশ্মীরি চুড়ি হাতাবে ভেবেছিলো।কিন্তু এই গোপন কথাও জেনে ফেললো।মেহেককে চুপ থাকতে দেখে উৎস লুকিং গ্লাসে পুনরায় ওর মুখশ্রী দেখে বলল,
-” কী হাতানোর প্ল্যান করছিস?এর আগে তো বিশ জোড়া জুতো হাতিয়েছিলি মনে আছে?”

মেহেক খিলখিল করে বলল,
-“কি যে বলেন না উৎস ভাই,আমি আবার কি হাতাবো!”

উৎস জানে মেহেক হাতাবে না বললেও কিছু না কিছু আদায় করেই ছাড়বে।ওকে নিয়ে বের হয়েছে মানে ওর পেটে কিছু ঘুরঘুর করছে।যা না দিলে বড় মার কাছে গিয়ে নালিশের ঝুড়ি খুলবে তারপর বড় মা এনে দিবে।
-“বলছিস কিছু হাতাবি না।”

-“না।কিন্তু”

-“কিন্তু কী?”

-” ভাইরাল চুরি বের হয়েছে।অনেক সুন্দর।নিউজ ফিডে ধুঁকলেই কাশ্মীরি চুড়ি।”

-“নিউজফিড পেলি কোথায়?তোর ফোন তো আমার কাছে।”

মেহেক গর্বিত সুরে বলে,
-“আম্মুর ফোন আছে না”
চট করে জিহ্বে কামড় দিয়ে ধরলো।মুখ ফসকে কি বলে দিলো।মনে মনে নিজেকে বলল ‘আজ তো তোকে মার ডালে গা এই সরষে ভূত’।

-“মেজো মা তোকে ফোন দেয়।”

-“আরে না না আম্মু দেয় না। আমি একটু লুকিয়ে দেখি যখন কাজ করে।”

উৎস ভাব নিয়ে বলল,
-“আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তোর যে চুরি করার রোগ আছে।”

মেহেক আশ্চর্য হয়ে বলে,
-“মানুষ পিছনে ছুড়ি মারে আর আপনি সামনেই মারছেন।”

-“স্বীকার করছিস তুই চুরি করা রোগে ভুগছিস?”

-“মোটেও না।আমি চোর নাকি যে চুরি করবো।”

-“তাহলে চুন্নি হয়ে যা।একটা চোরের সাথে বিয়ে দিবো তারপর চোরের বউ চুন্নি হবি।”

মেহেক উৎসর কথায় রাগে না।সে জানে উৎস তাকে রাগাতেই বলেছে।তাই সে দুষ্টু স্বরে বলল,
-“যদি চোরটা আপনি হোন তবে আমি চোখ বুজে বিয়ে করতে রাজি আছি।”

-“ফালতু অন্ধবিশ্বাস দেখাচ্ছিস!”
তাচ্ছিল্যের স্বরে উৎস কথাটি বললো।কিন্তু মেহেক ফুরফুরে মেজাজে বলল,
-“মোটেও না,গভীর ভালোবাসা দেখাচ্ছি।আপনি তো দেখাবেন না কিপটুস লোক একটা।”

-“আবার এই কিপটুস লোকেরই তো গলায় ঝুলে পড়তে চাচ্ছিস।”

সিজান এক হাতে রোদসীর এক হাত ধরে আছে আর অন্য হাতে ড্রাইভ করছে।কিছুক্ষন পরপর ওর হাতে তার ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিচ্ছে।রোদসীও চোখ গরম করে তাকাচ্ছে।সিজান ওর কথা পরোয়া করলে তো।বেপরোয়া হয়ে বলল,
-“জান আয় না একটা কিস করি।”

রোদসী অবাক হয়ে বলল,
-“এতোক্ষণ ধরে কী করছো?”

সিজান ক্রোধ নিয়ে বলে,
-“তুই এমন কেনো রে আমার ফিলিংস বুঝস না।”

রোদসী কপাল কুঁচকালো।
-“তোমার ফিলিংস বোঝা মানে সাপের লেজে পা দেওয়া।”

রোদসীর হাতে পুনরায় ওষ্ঠ ছুঁইয়ে সিজান বলে,
-“আমাকে সাপ বললি না বিয়ের পর এই সাপের ছোবলই খাবি।রেডি হো।”

———

-“ভাইয়াদের সামনে বউ বউ কম করবেন।”

-“বউ আমার। আমার যেখানে ইচ্ছে করবে সেখানেই বউ বউ করে ডাকবো।”

-“তাই বলে বড়ো ছোটো খেয়াল রাখবেন না?”

-“বড়ো ছোটো কারো সামনে না ডাকলে কার সামনে ডাকবো, বউ”

নিশাত আশ্চর্য হয়ে তাকায়।
-“ডাকতে হবে না।”

-“তাহলে কী বলে ডাকবো বউ?”

নিশাত গাল ফুলিয়ে বলল,
-“আবার”

-“সরি বউ”

-“আমি”
নিশাতকে পথিমধ্যে থামিয়ে দিয়ে সাদিফ বলল,
-“হুম জানি তো তুমি আমার বউ।”

নিশাত বিরক্ত হয়ে নাক ছিটকে ঘুরে বসলো।
সাদিফ একটু হেঁসে গানের সুরে বলল,
-” ও বউ,বউ,ও বউ
আমার কাছে আসো না পাখি
ও বউ
রাগ করলে নাকি?
কাছে এসে ভালোবাসো না একটু
রাগ করে না ও আমার বউ
রাগলে দিতে মন চায় চুমু
ও সুন্দরী বউ”

সাদিফের গান শুনে নিশাত না চাইতেই ফিক করে হেসে দেয়।সাদিফ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে বলে,
-“আমার বউটার হাসি মাশাল্লাহ। কারো নজর না লাগুক।”

-“আপনি তো গানের বারোটা বাজিয়ে দিলেন।আপনার এই গান যারা শুনবে তারা আসল গানের লাইন ওই ভুলে যাবে।”

-“তুমি আমাকে মনে রাখলেই হবে।”

পরপর দুটো গাড়ি এসে থামলো শপিং মলের সামনে।সিজান, রোদসী ও সাদিফ, নিশাত গাড়ি থেকে নামে।দুই বোন একে অপরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।উৎস ও মেহেক এখনো আসেনি।সাদিফ ও সিজান গাড়ি পার্কিং করে।মিনিটখানেক বাদে উৎসরা আসে।সাদিফ চোখ মেরে উৎসকে বলল,
-“কিরে দোস্ত তোর তো আগে আসার কথা।বাইকের গতি কি আজ কমে গেলো নাকি?”

-“বউর বড়ো ভাই হই,শালা না। মজা করতে হলে বাসায় গিয়ে এরিদের সাথে করিস।”

-“চটে গেলে তো হবে না। বন্ধু আগে বানিয়েছিস।”

-“এটাই আমার কপাল।যেই কাজে এসেছিস সেটা কর।”

সবাই মিলে আগে দুই কোনের জন্য যাবতীয় সব কিছু কিনে।নিশাত,রোদসী ওদের সাথে সবারটা কেনার কথা বললেও ওরা কেউ শুনেনি।ওদের মাথায় যা আসে সব কিছু নিয়ে নেয়।বাকি যা রয়ে যাবে ওইগুলো বাড়ির তিন গিন্নি মিলে এসে নিয়ে যাবে।তিন ঘন্টা লাগিয়ে সবার জন্য কেনাকাটা করা হয়।সবার হাতে শপিং ব্যাগ।তিন বোনকে এক কর্নারে দাঁড় করিয়ে ওরা তিনজন যায় নিজেদের জন্য কিছু কিনতে। সবাই ক্লান্ত হলেও মুখে তাদের প্রশান্তির ছাপ।বিয়ের আগ মুহূর্তগুলো বিয়ে নিয়ে যেই প্রস্তুতি হয় তা খুবই স্মরনীয় থাকার মতো।কিন্তু সবার মুখে হাসি থাকলে ও মেহেকের মুখ চুপসানো।মন মতো সব কিনে দিলেও কাশ্মীরি চুরির জন্য তার মন ছটফট করছে।সে ভেবেছিলো উৎস কিনে দিবে কিন্তু বলার পরও দেয় নাই।এতে তার মন ভার হয়ে আছে।
ও যা যা বলেছে তাই ওকে দেওয়া হয়েছে।তবু ও ওকে মন মরা থাকতে দেখে নিশাত বলল,
-“মেহেক তোর কি হয়েছে?মন খারাপ কেনো?”

-“…..”

রোদসী মেহেককে ধাক্কা দিয়ে বলল,
-“কোন জগতে হারিয়ে গেলি?”

-“কিছু না।বাসায় চলো।ভালো লাগতাছে না।”

নিশাত অশান্ত হয়ে মেহেকের শরীর ধরে বলে,
-“অসুস্থ লাগছে?জানতাম আমি।বারবার বলেছিলাম পেট ভরে খেয়ে তারপর চল।শুনলে তো এখনো দুর্বল লাগছে।তোর জ্বালায় আমি শেষ হয়ে যাবো।”

রোদসী এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা টুল দেখতে পেয়ে বলল,
-“আপু চলো ওইখানে বসি।ওদের কতোক্ষণ লাগে বলা তো যায় না আমাদেরই তিন ঘন্টা লেগে গেছে।মেহেককে দাঁড়িয়ে রাখা ঠিক হবে না।”

-“হুম আয় বসি।”

বিশ মিনিট পর ওরা তিন জন আসলো।যেখানে ওদের অপেক্ষা করতে বলে গিয়েছিল সেখানে এসে দেখলো মেহেক নিশাতের কাঁধ মাথা দিয়ে রেখেছে।আর নিশাত এক হাতে মেহেককে জড়িয়ে ধরেছে।সিজান চিন্তিত হয়ে বলে,
-“নিশাত মেহেকের কী হয়েছে?”

সাদিফ ও বলল,
-“যাওয়ার আগে তো ভালোই দেখে গেলাম।মেহেক শরীর খারাপ লাগছে?”

-“আপনাদের হয়ে গেলে চলুন। বাসায় যাবো।”

উৎস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো মেহেকের ভাবভঙ্গি।

-“আমাদের হয়ে গেছে চলো তাহলে যাওয়া যাক।”

নিশাত অবাক হয়ে বলল,
-“এতো তাড়াতাড়ি শেষ?”

সাদিফ হেসে বলল,
-“আমরা মেয়ে না ছেলে।ওলোয়েস ফাস্ট।”

-“মেহেক আমার সাথে যাবে।”

-“হুম নিয়ে চলো। বাইকে রিক্স আছে হেলেদুলে পড়ে গেলে আমার শালিকে কেউ তো ধরবে না।”

মেহেক অভীমানি স্বরে বলল,
-“ঠিক বলেছেন ভাইয়া।দেখা যাবে আমাকে ফেলে রেখেই চলে যাবে।”

-“নাটক কম করে তোরা বাসায় যা আমরা আসছি।”

সিজান বলে,
-“ওরা একা যাবে কেনো?আর আমরা কেনো পড়ে যাবো?”

-“যার যার বউকে নিয়ে সে সে বিদায় হো।”

সাদিফ ফুরফুরে মেজাজে বলল,
-“বউ নেওয়ার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছি।কিন্তু যার যার বউ নিলে মেহেক।ও তো কারো বউ না।”

-“তোর শালি সাহেবার শপিং করে মন ভরেনি তাই অসুস্থের বাহানা।”

সবাই আৎকে উঠে মেহেকের দিকে তাকায়।পা থেকে মাথা পর্যন্ত যা যা বলেছে তাই তো ওকে কিনে দেওয়া হয়েছে তারপরও আবার মন ভরেনি!নিশাত ছোট করে জিজ্ঞেস করলো,
-“এটা কি সত্যি তোর অসুস্থতার কারণ?”

মেহেক মাথা তুলে বসে।
-“আমি কি বলেছি আমার অসুস্থ লাগছে।”

নিশাত বিস্ফরিত হয়।সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে যাচ্ছে নয়তো থাস করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিতো।শাসন না করতে করতে মাথায় উঠে গিয়েছে।রেগে কটমট করে নিশাত বলল,
-“কতো কিছু কিনে দেওয়া হয়েছে আবার কি লাগবে তোর? তুই কি বাচ্চা?বড়ো হয়েছিস বুদ্ধি সুদ্ধি কবে হবে তোর?”

সাদিফ নিশাতকে শান্ত স্বরে বলল,
-“নিশাত ওকে বকছো কেনো?ও ছোটো,বুজে না।”

-“বোঝার মতো জ্ঞান হতে হবে।”

মেহেক করুন স্বরে বলল,
-“আমি তো বেশি হয়ে গেছি সবার কাছে তাই না।তাই তো চুরি কিনে দেওয়ার পয়সা টুকু কারো নাই।”

পরের কথাটা মেহেক উৎসকে ইঙ্গিত করে বলে।উৎসর ও বুঝতে বাকি রয় না।কিন্তু বাকিরা অবাক হয় সামান্য চুরির জন্য থম মেরে বসে থাকবে।

-“আগে বলবি তো তোর চুরি লাগবে।শুধু শুধু আপুকে রাগাস তুই।”

মেহেক বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। উৎসর দিকে তাকিয়ে বলে,
-“রোদ আপু আমার লাগবে না চুরি। আর আমার জন্য যা নিয়েছো সব ফিরত দিয়ে আসতে বলো।”

সিজান মেহেকের পাশে এসে দাঁড়ায়।ওর মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহ ভরা কন্ঠে বলে,
-“বোন রাগ করিস না।তুই তো আমাদের বলিস নাই তাহলে জানবো কিভাবে?এখন আয় কিনে দেই।”

-“তোমরা তোমাদের বিয়ের শপিং নিয়ে ব্যস্ত তাই যে ফ্রি ছিলো তাকে বলেছি।কিন্তু আমি তো ভুলে গিয়েছিলাম আমি সবার কাছে বেশি হয়ে গেছি।”

উৎস অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
-“জালানোর জন্য আমাকেই পাবি।”

#চলবে

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২৭

-“বাসায় যাবো।”
মেহেকের কন্ঠ স্বর তেজি হলো।

উৎসও রুক্ষ গলায় বলল,
-“আমি বলার আগে এক পা নাড়া তারপর দেখ তোকে কী করি।”

উৎসর ধমকের পরোয়া না করে মেহেক প্রশ্ন ছুড়লো
-“ওদের সাথে আমাকে যেতে দিলেন না কেনো?”

উৎস চুলে হাত দিয়ে বলল,
-“আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই।”

-“আমারও এখন ইচ্ছে হয়েছে বাসায় যাবো।”

-“থাপড়িয়ে সোজা করবো।”

-“সোজাই তো আছি।বাসায়ই তো যেতে চেয়েছি আর তো কিছু চায়নি।”

-“আমার সহ্য শক্তির পরীক্ষা নিস না এর ফল ভালো হবে না।বাসায় যাবো কথাটা আমার কানে যেনো আর এক বার না আসে।”

মেহেক গুটিয়ে এলো।মুখ ভোঁতা করে পলক ঝাপটায়।উৎস মেহেকের হাত চেপে ধরে।হাত চেপে ধরে কিন্তু কোনো ব্যথা অনুভব হয় না।কমল ছোঁয়ার স্পর্শ পেতেই মেহেক বাহুডোর কেঁপে উঠে। মেহেক উৎসর চোখে চোখ মিলায়।উৎস মুখের কাঠিন্যো দূর করে বিনয়ী হয়ে সুধালো,
-“তোর কাশ্মীরি চুড়ির কথা আমার মনে ছিলো।পুরো মার্কেটে এই চুরি নাই তাই দেই নাই কিনে।নিউ মার্কেট যেতে হবে সেখানে আছে।অকারণে ক্ষেপে যাওয়ার বদঅভ্যাস ত্যাগ কর।”

মেহেকের ঠোঁটের কোণায় হাসিরা এসে জমা হলো।সাথে নিজের উপর রাগও হলো।উৎসর ভালোবাসা এখনো সে বুঝতেই পারলো না!বোকাদের মতো হেঁসে উৎসর হাত পেঁচিয়ে ধরলো।উৎস তপ্ত স্বরে বলল,
-“ফিল্মি ডায়লগ যদি এখন দিস তাহলে খবর আছে তোর।”

মেহেক জিহ্বে কামড় দিয়ে অবুঝের মতো দুপাশে মাথা নাড়ায়।
-“ফিল্মের নায়কই সামনে দাঁড়িয়ে।”
মেহেক উৎসর হাত ধরেই হেঁটে বাইকের কাছে যায়।উৎস হ্যালমেট মেহেককে পড়িয়ে দিতে নিলে মেহেক ‘আহ’ করে একটা শব্দ করে।উৎস ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে?মেহেক ব্যাথাতুর স্বরে বলে,
-“হিজাবের পিন গেঁথেছে।”

-“কোথায়?”

মেহেক হাত দিয়ে মাথায় দেখায়।উৎস মেহেকের দেখানো মতো পিনটা আস্তে করে উঠায়।
-“এতো টাইট করে লাগিয়েছিস কেনো?”

-“খুলে যায় তাই।”

উৎস পিনটা তার মানিব্যাগে রেখে দেয়।তারপর হ্যালমেট পড়িয়ে দেয়।মেহেক বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“পিনটা দিয়ে কি করবেন?”

-“সব জায়গায় তো তোকে নিয়ে যেতে পারবো না তাই তোর পিনটাকেই সাথে রাখবো।”

হাইওয়ের রাস্তায় বাইক সর্বোচ্চ গতিতে ছুটছে।মেহেক নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে উৎসকে শক্ত করে জরিয়ে ধরেছে।মেহেকের উষ্ণ ছোঁয়া উৎসর বক্ষপট কেঁপে উঠে।উৎসর পিঠে মাথা রেখে কমল স্বরে ডাকলো
-“উৎস ভাই।”

-“….”

-“আমাকে অনেক ভালোবাসেন তাই না।”

-“একটুও না।”

মেহেক জোরে চিমটি দেয়।উৎস দাঁত খিঁচে বলে,
-“হাত অনেক বড়ো হয়ে গিয়েছে।ছোটো করতে হবে।”

-“আপনার সাহস ও বেরে গেছে।কলিজা টুকরো টুকরো করে ভুনা করে কুকুরকে খাওয়াবো।”

উৎস বাইকের স্পিড আরো বাড়িয়ে দেয়।মেহেক আরো শক্ত করে চেপে ধরে।
-“ভয় পাই না।”

-“তাহলে না ধরে বস।”

-“আপনাকে না ধরলে ভালো লাগে না।”

-“চল বিয়েটা করে ফেলি।”

-“হুম ভালোই হবে।একসাথে সবার বিয়ে হবে।”

-“পালিয়ে বিয়ে করবো। করবি?”

মেহেক বিভ্রান্ত হয়ে বলে,
-“কী?”

-“করবি বিয়ে?আমার অনেক দিনের ইচ্ছে পালিয়ে বিয়ে করার।চল করে ফেলি।”

-“বাসায় জানলে কি হবে ভেবেছেন?”

-“সবার চিন্তা করলে ভালোবেসেছিস কেনো?”

-“আপনার রুপে পাগল করেছেন?”

-“আমার রুপ দেখে পাগল হয়েছিস?”

মেহেক চটপটে উত্তর দেয়
-“তা নয় তো কী?আপনার মতো কিওয়ারিং, হ্যান্ডুসাম,ডেশিং ফেসিং বেডাকে হাত ছারা করা মানে ডায়মন্ড হারানো।”

মেহেক প্রশংসা করলো না খোঁচা মেরে অপমান করলো। কথায় কথায় যেহেতু খোঁচা মারার স্বভাব আছে তার মানে খোঁচাই মেরেছে।

-“খোঁচাখোঁচি করা বুড়ো মহিলাকে বিয়ে করলে আমার জীবনটাই নষ্ট হবে।দেখ তো কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখতে পাস কি না আমার জন্য।আমার বিয়ের ঘটকালি তোকে দিয়েই করাবো।”

-“আইসে যেই না পটোলের মতো চেহেরা আবার শখ জাগে সুন্দরী মাইয়ার।আপনার কপালে দাঁত ফোকলা,কানা,লুলা,বয়রা বউ জুটবে বদদোয়া দিলাম।”

মেহেকের কথায় উৎস হতভম্ব।এই মেয়ে নাকি ওকে ভালোবাসে!সবচেয়ে অবাক করা বিষয় তার চেহারা পটোলের মতো বললো!উৎস ও কম যায় না সে মেহেকের উপর বেদনার্ত হয়ে বলল,
-“তোর থেকে তো বাঁচবো।তুই বিয়ে করলে আমার জীবনটাই শেষ হয়ে যেতো।ওই কানা,লুলা,ফোকলা মেয়েকে ভালোবাসলে আমার জীবন ধন্য হবে।আদর সোহাগ ওই মেয়েই করবো।তোর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।”

মেহেক কটমট করে বলল,
-“আলগা পিরীত দেখাবেন না।ওই মেয়েরে বাড়ির দরজা থেকেই ঝাড়ু পিটা করবো।আর আপনাকে,আপনার জীবন ত্যানাত্যনা করে ছাড়বো।”

মেহেকের কথায় উৎস হেঁসে দিলো।উৎসর হাসির হালকা শব্দ পেতেই মেহেক ও হেঁসে দেয়।

_____________
উৎস নিউমার্কেটের একটা কাশ্মীরি চুড়ির দোকানে নিয়ে আসে।দোকান ভর্তি কাশ্মীরি চুড়ি।অন্য ধরনের ও চুড়ি আছে কিন্তু বর্তমানের চাহিদা অনুযায়ী কাশ্মীরি চুড়ি বেশি রাখা।মেহেক তার পছন্দ মতো চার মুঠো কাশ্মীরি চুড়ি এক সাইড করে।এগুলো সবই তার পছন্দ হয়েছে। পছন্দ বলতে তাকে যদি সব কিনে দেওয়া হয় সবই নিবে।কিন্তু সব গুলো তো কেনা সম্ভব না তাই খুব বেশি পছন্দ গুলো আলাদা করে রাখে।এখন এই চার মুঠো চুড়ি কিনে দেয় কিনা সন্দেহ।মেহেক মুখে মিষ্টি হাসি এটে খিলখিল করে বলল,
-“আমার না এইগুলো পছন্দ হয়েছে। সবগুলো কিনে দিবেন।”

চুরির দিকে তাকিয়ে উৎস আদেশের স্বরে বলল,
-“কম হয়ে গিয়েছে এক ডজন নিয়ে নে।”

মেহেক নির্লিপ্ত চাহনিতে চেয়ে থাকে।কিপটে বেডার মুখে ফুলের ছোঁয়া!যাই হোক উৎস যেহেতু বলেছে নিয়ে নেওয়াই ভালো।
-“আপনি যখন বলেছেন নিয়েই নেই।আমি আবার সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে জানি।হাত ছাড়া করলে আমারই লস।”

-“পকেট খালি করার চিন্তা যার মাথায় ঘুরে সে সুযোগ খুঁজে ফকির করার।”

মেহেক উৎসকে কথায় কথায় খোঁচা মারার ফলে উৎসও একি কাজ করে।কেউ কাউকে ছার দেওয়ার পাএ নয়।খোঁচা দিয়ে কথা না বললে ওদের হজমই হয় না।আবার একে অপরের প্রতি কি অগাধ ভালোবাসা।এই ভালোবাসা ওদের বন্ধনকে অটুট রেখেছে।ভালোবাসা যেখানে সেখানে খুনসুটি হবেই।মেহেক তার পছন্দ মতো নিয়েছে তাই এবার উৎসকে বলল,
-“এক ডজন দিবেন যখন আপনি পছন্দ করে দেন।”

-” আমার কষ্টের টাকা নষ্ট করছিস আবার আমাকে বলছিস পছন্দ করে দিতে।রুহুটা কি বের করে ফেলবি নাকি!”

ওদের মিষ্টি ঝগড়া দেখে মধ্য বয়সী দোকানদার হো হো করে হেঁসে দেয়।মুখে আলতো হাসি দিয়ে বলেন,
-“তোমাদের জুটিটা বেশ।এমন মিষ্টি মিষ্টি ঝগড়া করে সারাজীবন সুখে দুখে পাশে থেকো।তা বলো কোনগুলা নিবা?”

উৎস পুরো দোকান ঘেঁটে এক ডজন চুড়ি পছন্দ করে।প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে বলে,
-“কত হয়েছে?”

দোকানদার বিনয়ী হয়ে বললেন,
-“তিন হাজার টাকা।”

উৎস হতভম্ব হয়ে মেহেকের দিকে তাকায়।মেহেক উৎসর হাত টেনে বলে,
-“দাঁড়িয়ে না থেকে টাকা দিন।”

-“টাকা দিবো মানে টাকা কী গাছে ধরে!”

-“আপনার পকেটে ধরে।কিপ্টমি কইরেন না তো পরে দেখা যাবে প্যান্টের পকেট ছিঁড়ে টাকা হুরহুর করে ঝরে পড়বে।”

-“এই চুড়ির দাম কিভাবে তিন হাজার হয়?আমি পাঁচশ দিবো।”

মেহেকে উৎসর কথায় তাৎযব হয়ে তাকায়।কিপটা ভেবেছিলো কিন্তু এখন প্রমানিত হলো।

দোকানদার বললেন,
-“বাবা তুমি তো কাশ্মীরি চুড়ি নিয়েছো এই চুড়ি তিনশো করে বেঁচি তোমাদের পঞ্চাশ টাকা ছার দিয়ে আড়াইশো রেখেছি।”

-“এতো দাম দিয়ে চুড়ি কিনে লাভ নাই
যেই জিদ রাগ উঠলেই আসার মারবে।কম দামের মধ্যে কী আছে?”

-“কাচের চুড়ি আছে এক রঙের, মুঠো চল্লিশ টাকা করে।”

-“ওই দেন।”

#চলবে