Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-২২+২৩

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-২২+২৩

0
8

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২২

ভোরের প্রথম আলোটা জানলার পর্দা ভেদ করে ঘরে আসতেই নিশাতের ঘুম ভেঙে গেলো।রাতে কখন ঘুমিয়েছে তা তার মনে নেই।সাদিফের কথা ভাবতে ভাবতে দুই চোখের পাতা স্ব-ইচ্ছায় বুঁজে গিয়েছিল।মাথাটা ঝিম ধরে আছে।এক কাপ চা খেলে ভালো লাগতো।তাই গায়ে ওড়না পেচিয়ে ওয়াশরুমে গেলো।ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় গেলো। মুখ মুছতে মুছতে পর্যবেক্ষণ করে নিলো ভোরের আকাশটা।পূর্ব আকাশে ধোঁয়াটে রঙের আভা ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশটা পুরোপুরি নীল নয় বরং ছাই-রঙা। সকালটা বড়ই স্নিগ্ধ, ঠান্ডা বাতাস বইছে।তার শরীর শীতল হয়ে গেলো।কিন্তু তার মন ভার হয়ে গেলো কোনো অনাগত বার্তা নিয়ে।আজকের দিনটা অন্য দিনের মতো স্বাভাবিক হবে তো।কেনো জানি তার মন অস্থির হয়ে পড়ে।রাতের ঘটনা তাকে ভাবাচ্ছে।মাথাটা পুনরায় টপকাচ্ছে তাই সে নিচে গেলো।তিন মা এখনো রান্নাঘরে আসেনি।যে যার ঘরে।একটু পর এসেই দিনের ব্যস্ততায় লেগে পড়বেন।নিশাত এক কাপ চা বানিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে।চায়ের কাপ চুমুক দিতেই চোখ যায় সদর দরজায়।সদর দরজা বাড়ির ভেতর থেকে খোলা!যে কেউ চলে আসবে।রাতে কী লাগানো হয়নি?কিন্তু এমন ভুল তো কেউ করবে না। তাহলে কী কেউ বেরিয়েছে?এতো সকালে কারো বের হওয়ার তো কথা না।জগিং এ গেলে তো উৎস,ফারাজ ছয়টায় যায়।এখনো ছয়টা বাজতে মিনিট দশেক বাকি।যে বের হয়েছে সে আরো আগেই বের হয়েছে।নিশাত চা খেয়ে উপরে চলে গেলো।দুই দিন ধরে পড়তে বসা হয় না।এভাবে চলতে থাকলে তো সে এডভোকেট শব্দ টা তার নামের সাথে যোগ করতে পারবে না।ছোট থেকে স্বপ্ন দেখে এসেছে ওই কালো পোশাক তার গায়ে থাকবে।তার রুমে গিয়ে পড়তে বসলো।কিন্তু পড়ার মাঝেই সাদিফের মুখ বইয়ের পাতায় ভেসে উঠছে।মন বসাতেই পারছে না পড়ায়।তবুও চেষ্টা করে গেলো পড়ার।

উৎসর ঘুম ভাঙতেই দেখলো তার পাশে সাদিফ নেই।তাকে না দেখতে পেয়ে উৎস আশ্চর্য হলো।গত রাতে কী সাদিফ তার ঘরে শুতে আসে নাই?এসব বাদ দিয়ে সে ফ্রেশ হয়ে নিচে গেলো।নাস্তার টেবিলে সবাই আছে কিন্তু সাদিফ নেই।নিশাতকে দেখতে পেয়ে উৎস চিন্তিত হয়।সবাই থাকায় নিশাতকে প্রশ্ন করলো না চুপচাপ চেয়ার টেনে বসে পড়লো মেহেকের উল্টো পাশে।মেহেক উৎসকে দেখে মিটিমিটি হাসলো।তাকে হাসতে দেখে উৎস চোখ রাঙায়।মেহেক থামলে তো সে জেনে গেছে উৎসের মনে একমাত্র মেহেক আছে আর কেউ নেই।তাহলে তো আরো মাথায় উঠবে নাচবে।সাদিফকে নাফিসা রুটি ও ডিম ভাজি দিয়ে বলল,
-“কিরে তুই এসে পরলি সাদিফকে ডাকলি না।”

-“আমার বন্ধু ছাড়াও এ বাড়িতে ওর আরেকটা সম্পর্ক রয়েছে।সুতরাং যার সাথে সম্পর্ক তাকে জিজ্ঞেস করো।”

ভাইয়ের কথায় নিশাত ঢোক গিললো।সাথে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।এভাবে সবার সামনে তাকে কেনো বলি করছে?সে কীবোর্ড বলবে সাদিফ কোথায়?

মালিহা বললেন,
-“ঘুমিয়েছে তোর ঘরে নিশাত কী বলবে?”

-“যেখানেই ঘুমাক।ডেকে দেওয়া ওর কাজ আমার না।”
বড়োদের সবার সামনে উৎসের কাঠখোট্টা জবাবে নিশাত হতভম্ব হয়।শাহাদাত চৌধুরী গলা খেঁকিয়ে বললেন,
-“গুরুজনদের সামনে কথা ঠিক করে বলো।”

পরিস্থিতি উল্টো দিকে যেতে দেখে ফারাজ বলল,
-“আমি যাচ্ছি।”

উৎস বাঁধা দিয়ে বলল,
-“না।নিশাত যা।”

নিশাত অসহায় দৃষ্টিতে উৎসের দিকে তাকায়।তার সাথে এমন করছে কেনো?নিশাতকে উঠতে না দেখে উৎস পুনরায় বলল,
-“যেতে বলেছি তোকে।”
নিশাতের গা কেঁপে উঠে।ধীরে উঠে উৎসর ঘরে যায়।

শাহাদাত চৌধুরী বললেন,
-“ইদানিং দেখছি তুমি বোনদের উপর রেগে কথা বলছো।”

উৎস খেতে খেতে বলল,
-“বোনরা তো পুতুল হয়ে থাকবে কেউ শিখিয়ে দিলে বলবে নয় তো চেপে যাবে সব।আগে তাদের ভালো বুঝতে বলো তারপর আমাকে বলো।”

নিশাত উৎসর ঘরে ধুঁকে দেখে ঘর ফাঁকা।ওয়াশরুম, বারান্দাও ফাঁকা।রুমে এসে নিশাত ভাবতে লাগলো সাদিফ কোথায়?তখনি টুং করে শব্দ হলো উৎসর ফোন থেকে।উৎসর ফোনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো বিধায় নিশাতের চোখে ভেসে উঠলো একটা মেসেজ।
-“আমি চলে এসেছি উৎস। তুই ঘুমিয়েছিলি তাই ডাক দিলাম না।আমার খোঁজ নিতে হবে না কারো।”
নিশাত মেসেজটা পড়ে এক পা পিছিয়ে গেলো।তার উপর রাগ করে সাদিফ চলে গেলো কাউকে কিছু না বলে।তাহলে সদর দরজা এই জন্যই খোলা ছিলো।নিশাত সাদিফকে কল দিতে চাইলো কিন্তু উৎসের ফোন লক করায় কল দিতে পারলো না।রাগ করে চলে যাওয়ায় তার চিন্তা হতে লাগলো।বাসার সবাইকে কি বলবে?উৎস ভাই রাতের ঘটনা জানলে ওতো তাকে বকবে।নিশাত উৎসর ফোন নিয়ে নিচে গেলো।সবাই তাকে সাদিফের কথা জিজ্ঞেস করলে নিশাত কিছু না বলে উৎসের হাতে ফোন দিয়ে তার ঘরে চলে যায়।খাবারের কথা বললে পড়ে খাবে বলে।উৎস নিশাতকে না খেয়ে চলে যেতে দেখে ফোন চেক করে।সাদিফের মেসেজ দেখে আন্দাজ করে রাতে ওদের মধ্যে কিছু হয়েছে। তাই সাদিফ চলে গেছে।এখন ওরা স্বামী স্ত্রী ওদের ঝামেলা ওদের মেটানো প্রয়োজন। ওরা দু’জন ভালো থাকবে তাই বিয়ে দিয়ে দিছে।সংসার কিভাবে করবে সেটা ওদের ব্যাপার।নিজেদের সমস্যা নিজেদের মিটিয়ে নেওয়া শ্রেয়।উৎস মনে মনে ঠিক করলো ওদের বিষয়ে নাক গলাবে না।ওরাই ওদের গুরুত্ব বুজে দূরত্ব দূর করবে।নিশাতের চলে যাওয়াই বলে দিচ্ছে সাদিফের জন্য ও চিন্তিত।সবাইক তো বলতে হবে সাদিফ কোথায়?তাই উৎস বলল,
-“ওর একটা কাজ ছিলো তাই ও চলে গিয়েছে।”

সুফিয়া বললেন,
-“এ বাড়ির জামাই ও।বলে যেতে পারতো না।”

-“জামাই দেখেই তো এতো ভোরে ডাকে নাই।পরে বলতা সাত সকালে সবাইকে ডেকে তুলেছে।হঠাৎ কাজ পড়েছে তাই গিয়েছে।”

উৎসর কথার সাথে কেউ পেরে উঠবে না।তাই কথা বাড়ালো না।

—————

উৎস অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে।ডেসিনটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলে জেল দিয়ে সেট করছে।মেহেককে কখন বলেছে তার ঘরে আসতে এখনো ওর দেখা নাই।সে বের হওয়ার আগে না এলে ওর খবর আছে আজ।এরি মধ্যে মেহেক লাফাতে লাফাতে হাজির হলো।উৎস কটমট করে তাকাতেই মেহেক স্থির হয়ে দাঁড়ায়।
-“আমি আপনাকে এখন আর ভয় পাই না।”

উৎস স্পষ্ট ভাষায় বলল,
-“ভয় পাস না।”

মেহেক ভাব নিয়ে বলল,
-“না।”

-“ওকে পেতে হবে না।এই নোটসগুলো পড়ে রাখবি আমি এসে সব ধরবো।যদি না পড়িস তারপর দেখবি পানিশমেন্ট কী?কতো প্রকার?”
উৎস মেহেকের মুখের সামনে কয়েক পাতা ধরে বললো।মেহেক আশ্চর্য হয়।
-“আপনি এই জন্য ডেকেছেন?”

-“হুম।”

-“আমি এসব ছাতার মাথা পড়তে পারবো না।”

-“আমিও ফেলটুস মেয়েকে বিয়ে করবো না।”

-“কেনো করবেন না?”

-“ফেলটুস মেয়েকে বিয়ে করলে আমার মানসম্মান বলে কিছু থাকবে?স্কলারশিপ পাওয়া ছেলের বউ নাকি এইচএসসি ফেল!”

-“যত শিক্ষিত তত ঘাবলা।মেয়েদের বেশি পড়া ভালো না। ফোনে দেখেন নাই কতো মেয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ঘরে স্বামী, সন্তান রেখে আরেক বেডার লগেও ইটিস পিটিসি করে।আমি ওসব চাই না বাবা আমি তো পাক্কা গৃহীনী হয়ে আপনার সন্তান লালন-পালন করবো।”

-“তোকে পালতেই তো আমার দম বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার তুই পালবি আমার সন্তান!”
উৎস মেহেকের হাত টেনে নোটসগুলো হাতে ধরিয়ে দেয়।
মেহেক মিনতি করে বলল,
-“ভাই না ভালো আমার এসব আমাকে পড়তে দিও না।”

উৎস রেগে গিয়ে বলে,
-“তোর কোন জন্মের ভাই আমি?অফিসে যাওয়ার সময় হয়ে যাচ্ছে না হলে এর শাস্তি পেয়ে যেতি।”

নিশাত ঘরে এসে একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছে সাদিফকে। সাদিফের ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে।ওর চিন্তায় দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে কি করবে এখন?রাগের মাথায় সাদিফ কিছু করে বসলে তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।নিশাত আবার কল করে কিন্তু পুনরায় হতাশ হয়।ফোন বন্ধ পাচ্ছে।নিশাতের হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে।তবুও সে ঘামছে।সাদিফের জন্য অস্থিরতায় সে হাঁসফাঁস করতে লাগলো।পরিশেষে সিদ্ধান্ত নিলো সাদিফের অফিসে যাবে।সেখানে পেতে পারে।যদি না পায় তাহলে বাসায় যাবে।কিন্তু ওর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।নিশাত দ্রুত রেডি হয়ে বেরিয়ে যায়।মালিহা চৌধুরি ডাইনিং টেবিলে বসে সবজি কাটছিলেন। তাকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে দেখে তিনি হাঁক ছুঁড়লেন,
-“নিশাত কোথায় যাচ্ছিস?এতো তাড়াহুড়ো করে!”

নিশাত চলন্ত পায়েই বলল,
-“বড়ো মা।আমি একটু বের হচ্ছি।”

রান্নাঘর থেকে সুফিয়া ভারী স্বরে বললেন,
-“সকালের খাবার খাওয়া হয়নি।এখন আবার কোথায় যাচ্ছে?”

-“আম্মু একটু কাজ আছে।টেনশন করো না।আমি গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।”
নিশাত চলে যায়।ও চলে গেলে সুফিয়া কাটকাট স্বরে বললেন,
-“দুটো আমাকে জালিয়ে মারছে।মায়ের কথা শুনে দেখে।না খেয়ে একজন দিন কানা হয়েছে আরেক জন আরেক রোগ বাধিয়ে আসবে।”

তার প্রতুত্তরে নাফিসা হাতের খুনতি নাড়তে নাড়তে বললেন,
-“ভাবি এসব ছাড়ো তো।এই বয়সে সবাই একটু অযত্নে চলে।”

মালিহা শাক বাছা হয়ে গেলে রান্না ঘরে যায়।তিনিও একি সুরে তাল মিলিয়ে বললেন,
-“ছোট ঠিক বলেছে।আমিও এই বয়সে কতো অযত্নে ছিলাম তারপরও তোদের ভাইজান আমার প্রেমে পাগল হয়েছে।”

সুফিয়া আফসোসের স্বরে বললেন,
-“ভাইজান তোমার জন্য যা পাগল ছিলো।এরকম যেনো আমাদের তিন মেয়ের জামাইও হয়।”

-“ভাইজান কেনো বলছিস?আমার দুই দেবর কী কম ভালোবাসে নাকি তোদের।”

নাফিসা অসহায় স্বরে বললেন,
-“দুই দেবর বলো না ভাবি।আমার উনি তো বছর শেষে মনে পড়ে আমার কথা।”

-“সে তো কাজের জন্য।আঁচলে বেঁধে রাখ।”
সুফিয়ার কথায় গৃহকর্মী বিলকিস বলল,
-” আপনেগো তিন জনের স্বামী অনেক ভালা। আমার দেখা মতে চৌধুরী বাড়ির মতো ভালো পুরুষ আর কোত্থাও নাই।যেমন তিন ভাইজান আপনাদের অনেক ভালোবাসে দেখবেন উৎস,ফারজ বাবা জীবনও ভালোবাসবো।”

মালিহা গর্বের সাথে বললেন,
-“তাই হবে দেখিস।আমার দুই রাজপুত্র বউদের রাজকন্যা বানিয়ে রাখবে।”

ছয় তলা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিশাত।তার মাথায় একটা মানুষের কথাই শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে। সে হচ্ছে সাদিফ।সাদিফকে সে ভালোবাসে না তবু কেনো ওর জন্য ভাবছে?কেনো পাগলের মতো ছটফট করছে?ওর চিন্তায় মাথা কাজ করছে না।এটা কিসের ইঙ্গিত?

#চলবে

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২৩

ছয় তলা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিশাত।তার মাথায় একটা মানুষের কথাই শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে। সে হচ্ছে সাদিফ।সাদিফকে সে ভালোবাসে না তবু কেনো ওর জন্য ভাবছে?কেনো পাগলের মতো ছটফট করছে?ওর চিন্তায় মাথা কাজ করছে না।এটা কিসের ইঙ্গিত?সাদিফের একাউন্ট ঘেটে ওর অফিস কোথায় জেনেছে।কিন্তু এখন সাদিফের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাচ্ছে না।তবুও তাকে যেতে হবে।তার পা চলছে না।বুকের ধুকপুকানি যেনো বেরেই যাচ্ছে।রিসেপশনে গিয়ে নিশাত সাদিফের কথা জিজ্ঞেস করলো।
-“সাদিফ স্যার অফিসে আছে?”

রিসিপশনের ছেলেটা নিশাতকে বিনয়ী স্বরে বলল,
-“মেম,স্যার আজ কারো সাথে দেখা করবেন না।আপনি অন্য দিন আসতে পারেন।”
ছেলেটার কথা শুনে নিশাত সস্তি পেলো।সাদিফ অফিসেই আছে। কিন্তু ওর সাথে সে দেখা করবে।তবে বেশ অবাক হলো সাদিফ কারো সাথে দেখা করবে না বলে দিয়েছে।তাহলে ও কি জানতো ওর সাথে দেখা করতে সে আসবে?

-“আমি আজই কথা বলবো।আপনি বলুন উনি কোন রুমে আছে?”

-“কিন্তু মেম স্যার নিজে থেকে না করে দিয়েছে আমি তো পারমিশন ছাড়া যেতে দিতে পারি না।”

নিশাত একটু গম্ভীর স্বরে বলল,
-“দেখুন আমার উনার সাথে কথা বলা প্রয়োজন আমাকে যেতে দিন।”

ছেলটা পুনরায় নিষেধ করলো।
-“আপনি কী বলবেন আমাকে বলুন আমি ম্যানেজারকে বলে জানিয়ে দিচ্ছি স্যারকে।”

নিশাত রেগে যায় ছেলেটার কথায়।সে রুষ্ট গলায় বলল,
-“আপনি জানেন আমি কে?আমার হাসব্যান্ড, তার কাছে আমি যাবো আর আপনি আটকানোর কে?”
বলেই নিশাত সাদিফের রুম খুজতে লাগলো।সাদিফের রুমের বাহিরে ওর নাম লেখা বোর্ডে।নক না করেই ধুঁকে গেলো।রিসেপশনের ছেলেটাও নিশাতের পিছু নিয়ে আসলো।সাদিফের স্ত্রী বলায় ছেলেটা ভেবেছে হয়তো কোনো পাগল হবে।কারন তারা সবাই জানে সাদিফ বিয়ে করে নাই।
নিশাতকে দেখে সাদিফ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।নিশাত সাদিফের কলার ধরে রাগে কটমট করতে করতে বলল,
-“তুমি আমার হাসব্যান্ড তোমার অফিসে তোমার সাথে দেখা করতে আমার কিসের পারমিশন? কিসের পারমিশন?”
নিশাতের এমন কথায় সাদিফ বাকরুদ্ধ।তাকে তুমি করে বলছে আবার হাসব্যান্ড বললো!তার রুমে রিসিপশনের ছেলেসহ ম্যানেজারও উপস্থিত হয়।
-“স্যার”

-“বাহিরে যান”

-“উনি”
সাদিফ ধমকের স্বরে বলল,
-“বাহিরে যান।”
উনারা বাহিরে চলে যায়।সাদিফ নিশাতকে তার থেকে ছাড়িয়ে দার করায়।গলায় কাঠিন্য ভাব টেনে বলল,
-“তুমি এখানে কেনো?”

নিশাত শুকনো ঢোক গিলে সেও প্রশ্ন করলো,
-“আপনি কখন চলে এসেছেন?”

সাদিফ নিশাতের প্রশ্ন এড়িয়ে বলল,
-“কি জন্য এসেছো বলো।”

-“আমার প্রশ্নের জবাব দিন।”

-“জবাব দেওয়ার তো কোনো কারন দেখছি না।”
নিশাতের চোখে পানি টলমল করছে।কান্না মিশ্রিত স্বরে বলল,
-“আমি আপনার স্ত্রী।”

-“তা তুমি মানো!বাসায় যাও।আমি ডিভোর্স দিবো তোমাকে আর বলতে হবে না ডিভোর্সের কথা।”

নিশাত সাদিফের কথায় চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারলো না।অশ্রু উপচে পড়লো।সাদিফের বুকে হামলে পড়লো। সাদিফ টাল সামলাতে না পেরে চেয়ারে বসে পড়লো।নিশাত করুন স্বরে বলল,
-“আপনার অনুপস্থিতি আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না।আপনাকে না পাওয়ার যন্ত্রণা অনেক গভীর।আমি আপনাকে চাই।আমি আপনাকে ছাড়তে পারবো না।আপনি জানেন আপনার জন্য আমার কি পরিমাণ চিন্তা হচ্ছিলো।নিশ্বাস আঁটকে আসছিলো।”

সাদিফ নিষ্পলক চাহনিতে দেখে গেলো নিশাতের পাগলামো।এই কয়েক ঘন্টায় তার জন্য এতো ছটফটানো!তার পরিবর্তন দেখে সাদিফ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“যাকে ফিরিয়ে দিয়েছো সে যদি এখন তোমাকে আর না চায়?”

-“আমাকে পাগল বানিয়ে এখন বলছেন ছেড়ে যাবেন!”

-“কেনো ছাড়তে দিবে না?”

-“না।”
সাদিফ নিশাতের না বলার সাথে সাথেই ওকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।তাদের মধ্যে কিছু সুন্দর মুহুর্ত ও কেটে গেলো।

দিনের কোলাহল স্থিমিত হয়ে রাতের আভা চারোদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে।ফুটপাতের দোকানগুলোতেও আলো জলে উঠলো।রাস্তার ধারে খাবারের দোকানগুলো থেকে ঘ্রাণ চারোদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।ট্রাফিক সিগন্যাল পরতেই চোখ গেলো একটা দোকানে।’শর্মা হাউস’ শহরের নাম করা একটা দোকান।এখানকার শর্মা মেহেক পছন্দ করে।ওর পছন্দও বটে।তাই উৎস গিয়ে শর্মা নিয়ে আসলো।অফিসের কাজ তাড়াতাড়ি সেরে ফেলেছে। বাসায় গিয়ে তার নিজস্ব জারুল ফুলকে পড়তে বসাতে হবে।শর্মার লোভে যদি একটু পড়ে।
উৎস বাড়িতে প্রবেশ করতেই সবার প্রথমে তার হাতের প্যাকেটে চোখ যায় মেহেকের।এক ছুটে এসে উৎসর সামনে দাঁড়ায়।কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে,
-“উৎস ভাই, আপনার হাতে কী?”

-“ঘোড়ার ডিম।খাবি?”
মেহেকের ফুরফুরের মুখটা মিইয়ে গেলো।এরিদ ও রোদসী সেখানেই ছিলো।রোদসী তার হাসি চেপে রাখলেও এরিদ হেঁসে দেয়।

-“আমি কী খাওয়ার জন্য বলেছিলাম?সব সময় এভাবে কেনো কথা বলেন আমার সাথে?”

-“কারণ তুই এভাবে কথা শোনার জন্য কাজ করিস।”

মেহেকের কমল মন ভেঙ্গে গেলো।ভালোবাসলে সবাই তার প্রিয় মানুষের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে।আর তাকে উঠতে বসতে কথা শোনায়।মালিহা চৌধুরী সেখানে উপস্থিত হলেন।তাকে দেখে মেহেক করুন স্বরে নালিশ করলো।
-“বড় আম্মু,তোমার ছেলে আমার সাথে এভাবে কেনো কথা বলে?আমি একটু জিজ্ঞেস করছিলাম কি এনেছে আর আমাকে কথা শুনাচ্ছে!”

মালিহা চোখ গোল করে ছেলের দিকে তাকালেন।রাগি স্বরে বললেন,
-“তুই আমার লক্ষী মেয়েটাকে বকিস কেনোরে?ওর সাথে তুই ভালো ভাবে কথা বলবি।”

-“পড়তে বলেছিলাম বসেছে তোমার লক্ষী মেয়ে!”

মালিহা চৌধুরী চুপসে গেলেন।ছেলের রাগ আকাশ শুয়েছে।মেহেক সন্ধ্যা হওয়ার পর বই নিয়ে না বসে রোদসী,নিশাতের বিয়ের প্ল্যান নিয়ে আড্ডায় বসেছে।এসব জানলে উৎস হাত পা ভেঙে ওদের হাতে ধরিয়ে দিবে।ওর সাথে তো আরো দুই জন ফাসবে তাই চোখের ইশারায় দুই জনকে কেটে পড়তে বললো।ওরাও বাধ্যর মতো চলে গেলো।রোদসী মেহেককে বকুনির হাত থেকে বাঁচাতে কিছু বলতে আগ্রহ হয় কিন্তু উৎস তার কথা আরো আগেই শুনবে না তাই অসহায়ের মতো চলে যায়।কিন্তু এখন তো ওর হাত থেকে মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে।না হলে মেহেককে কাঁদিয়ে ছাড়বে তাই মালিহা চৌধুরী কমল স্বরে বললেন,
-“এবারের মতো ছেড়ে দে।এখন থেকে ও পড়বে।তুই ঘরে যা মেহেক তোর ঘরে পড়তে যাবে।কিরে মেহেক এখন পড়তে বসবি তো?”
শেষের কথাটা মালিহা চৌধুরী মেহেককে উদ্দেশ্য করে বললেন।মেহেক অসহায় চাহনিতে তাকায়।তার বড় আম্মু তাকে বাঁচালো নাকি নতুন বিপদে ফেলে দিলো।উৎস মেহেকের আপাদমস্তক পরখ করে মা’কে বলল,
-“এখানে শর্মা আছে সবাইকে দিয়ে দাও।আর আসামীরটা আমার ঘরে পাঠিয়ে দিবে পড়া শেষ হলে দিবো নয়তো গেইটের পাশে কুকুরটাকে দিয়ে আসবো।”

শর্মার কথা শুনতেই মেহেকের মুখে হাসি ফুটে কিন্তু কুকুরের কথা তুলতেই ক্রোধ প্রগার হয়।কটমট করতে করতে বলল,
-“বড় আম্মু তোমার ছেলের আনা শর্মা আমি খাবো না।তাকে বলে দাও।”

-“আম্মু তোমার আদরের মেয়েকে বলে দাও আমি কাউকে খাওয়ার জন্য পা ধরে বলবো না।”

মেহেক চিবুক নামিয়ে বলল,
-“বড় আম্মু আমি তো কাউকে বলি নাই আমার পা ধরে বলতে।আগ বাড়িয়ে আমার সাথে ঝগড়া করতে না করো।আমি রেগে যাচ্ছি কিন্তু।”

উৎস চোয়াল শক্ত করে সে ও মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
-“আম্মু তোমার সামনে বলছে আমাকে আমি ঝগড়া করছি আর তুমি চুপ করে দেখছো!ওর কলিজা কতো বড় হলে ও এই কথা বলে?”

মেহেক তেজি স্বরে বলল,
-“দেখবে না তো কি করবে?বিদেশে গিয়ে তো আস্ত এক মুলা হয়েছে।এই মুলার দ্বিগুণ বড়ো আমার কলিজা।”

ওদের দুজনের ছুড়া ছুড়ি কথায় মালিহা চৌধুরী বেশ চটে গেলেন।ওরা দুজনে দুজনকে যা বলছে একে অপরকে সবই তো শুনছে তারপরও তাকে টেনে টেনে কথা বলছে।তিনি কন্ঠ ভারী করে ধমক দিয়ে বললেন,
-“চুপ, একদম চুপ।আর একটা কথা যদি দুই জনের এক জনও বলিস তাহলে দুইটার গায়েই আমার হাত উঠবে।বড় হয়েছিস নাকি এখনো ছোটই আছিস?উৎস তুই না বড়ো বুঝদার তাহলে ঝগড়া করছিস কেনো?”

উৎস দাঁতে দাঁত পিষে মেহেকের দিকে তাকালো।ওর চোখ দিয়ে অগ্নি বর্ষন হলো।চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো এর শাস্তি ওর পেতে হবে।বড়ো বড়ো কদমে জায়গা প্রস্থান করলো।উৎসর আকস্মিক রাগি ব্যবহারে মেহেকের চোখ ভরে উঠলো।গড়িয়ে পড়ার আগেই উপরে চলে গেলো।মালিহা চৌধুরী তপ্ত শ্বাস ছেড়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।তিনি যেই ভয়টা পেয়েছিলেন তাই হলো।মেহেকের মন নরম কিছু হলেই চোখ দিয়ে পানি ঝড়ে তাই ওকে কেউ কিছু বলে না। শাহাদাত চৌধুরী এবং মালিহা চৌধুরির জন্য ওকে কেউ কিছু বলতে পারে না কিন্তু উৎস আসার পর ওর উপর উনারা কিছু বলতে পারেন না।

——–

-“উৎস”

-“আম্মু, ভিতরে আসো।তোমাকে না বলেছি তুমি পারমিশন ছাড়া আসবা আমার ঘরে।”

মালিহা ছেলের কথায় হেঁসে হাতের হাফ প্ল্যাটটা উৎসর টেবিলে রেখে উৎসর পাশে বসে।উৎস স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন করলো
-“কিছু বলবে?”

-“তোর বাবাকে তোদের কথা বলবো?ওদের সাথে তোরাও”
উনার কথা সম্পূর্ণ করার আগেই উৎস বলল,
-“আমার বিয়ে নিয়ে এখন ভাবতে হবে না।আগে ওদের কাজ শেষ করো।”

ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে তিনি বললেন,
-“তোদের এতো ঝগড়া আর ভালো লাগছে না বাবা।মেয়েটার মুখের দিকে তাকানো যায় না।একটু তো নরম হয়ে কথা বলতে পারিস।”

-“ও আমার একটা কথা শুনে!পারলে আরো জেদ ধরে বসে থাকে!”

-“তাই তো বলছি বিয়ে করে নে।”

-“বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে?”
উৎস থেমে খাবারের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
-“কেনো এনেছো?আমি খেলে খেয়ে আসতাম।আমার খাওয়ার জন্য আনা হয় নাই।”

-“তুই না বললি মেহেক আসবে তাই তো”

-“কই এসেছে কী মহারানী!দেখো গিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছে।আমাকে যেতে বলবে না ওর কাছে বলে রাখলাম।যে নিজে ভালোটাই বোঝে না সে আবার আমাকে বুজবে!”

-“আমি ওকে বুজিয়ে পাঠাচ্ছি তুই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করবি না।”

-“ওর ভালো ও অনেক বুজে। আসতে হবে না ওর।আমিও দেখবো ওর দম।”

-“পাগল হতে পারবি পাগলির জন্য,আর পাগলির পাগলামো সয্য করবি না!”

#চলবে