Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-০২

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-০২

0
1

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২

চৌধুরী বাড়ির তিন গিন্নি সকাল থেকে কাজ করতে করতে হাপিয়ে গেছে।বাড়ির সবার জন্য রান্না বাড়ির বউরাই করে তাদের সাহায্য করার জন্য শাহাদাত চৌধুরী একজন লোক রেখেছে তার নাম বিলকিস। বাড়ির ছেলে মেয়েরা তাকে আন্টি বলেই ডাকে।যথেষ্ট সম্মান করে তাকে কিন্তু মেহেক ও এরিদ তার নাম নিয়ে মজা করে,খিলখিল করে হাসে।আসল কথা হচ্ছে,একদিন তাদের বড় মা বলেছিলো তারা যখন ছোট ছিলো তখন তার সখীদের সাথে একটা খেলা খেলতো। খেলাতা ছিলো এমন যে সবাই সবার এক পা করে দিবে তারপর একজন বলবে পায়ের নিচে কী তার জবাবে আরেকজন বলবে কাউয়ার ডিম।কে ভাঙছে?আলুদ্দিনের বউ।কই গেছে বাপের বাড়ি।কী হইছে? মাইয়া।মাইয়ার নাম কী? বিলকিস।
তারপর সবাই এক পা উঁচু করে বলতে থাকবে বিলকিস বিলকিস যে পা ফালাবে সেই চোর হবে।তারপর সে বাকিদের ধরবে।এই খেলা শুনে মেহেক খুব খুশি হয়।তার কাছে এটা খুব ইন্টারেস্টিং একটা খেলা। সে বাসায় থাকলে বিলকিস আন্টিকে দেখলেই এরিদকে নিয়ে খেলা শুরু করবে।দুজন খেললে মজা লাগে না দেখে নিশাত ও রোদসীকে ধরে এনে খেলবে।আর তাদের খেলা দেখে বড়রা হাসবে এবং বিলকিস রেগে গিয়ে মালিহাকে বিচার দিবে তার সাথে ওরা মজা করছে এই বলে।এতে মেহেক আরো বেশি করেই করবে।তাকে যে যেতা করতে নিষেধ করবে সে সেটাই বেশি করে করবে।এতে তার আনন্দ হয় বটে।মেয়েটা এতো চঞ্চল, জেদি তার কথা সবাই শুনতে বাধ্য।কিন্তু এখন থেকে হয়তো তার জেদ নগন্য হবে এক জনের কাছে।

দুপুর হয়ে গেছে সবাই একে একে ড্রাইনিং টেবিলে এসে বসেছে।উৎসের ফ্রেন্ড সাদিফও এসেছে। তার মা বাবা কেউ নেই। কার এক্সিডেন্টে মারা গেছে আল্লাহর রহমতে সে কোনো মতে বেঁচে গিয়েছিল।বাবার অঢেল টাকা পয়সা রয়েছে কিন্তু ছেলেটার তো কারো দায়িত্ব নিতে হবে তাই তার খালা তাকে বড় করেছে।
আজ চৌধুরী বাড়িতে সবাই আছে শুধু সাজ্জাদ চৌধুরী নেই। তিনি তার কর্ম নিয়ে সিরিয়াস তারপরও এতো বছর পর বাড়ির ছেলে বাড়িতে এসেছে ছুটি চেয়েছিলেন কিন্তু পাননি।
ড্রাইনিং টেবিলে সবাই থাকলেও এক জনকে দেখা যাচ্ছিলো না।বাড়িটাকে যে মাথায় করে রাখে সেই নেই এখানে। আজ কতো খাবার রান্না করা হয়েছে তার মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয় জর্দা তবুও তার দেখা নেই সন্দেহজনক তো।মেয়েটা তেমন খায় না সেটা ওর শরীরের গড়ন দেখলেই বোঝা যায়।পাখির খাবারের সমান তার খাবার।কয়েক দানা ভাত গিলেই উঠে যাবে।
ফারাজ তার মেজো মাকে বললো,
-“মোজো মা মেহেক কোথায়?খাবে না।”

-“উৎস আসার পর সেই যে ঘরে গিয়ে দরজা দিয়েছে এখনো খুলেই নি।ডাকতে গেলেই ঝাড়ি দিয়ে উঠবে তোর বোনটা যা হয়েছে না।”

-“কেনো?”

-“আরে ফারুজ ভাই তুমি তো জানই না উৎস ভাইয়া এসেই মেহেক আপুকে কান ধরে উঠ বস করিয়েছে। তাই রেগে আছে প্রচুর মাথাও গরম মনে হয় ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে।”

-“এই বজ্জাত তোকে না বলেছি ফারুজ বলবি না।”

-“আমি তো বলতে চাই না মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়।”

-“রোদসী আজ থেকে তোর দায়িত্ব ওকে আমার নামটা ট্রেনিং দিবি।”

-“আচ্ছা ভাইয়া।”

-“আমি যাচ্ছি”
ফারাজ উৎসের দিকে তাকিয়ে মেহেকের ঘরের দিকে গেলো।দরজা ভিতর থেকে লাগানো তাই ফারাজ দরজায় টোকা দিয়ে মেহেককে ডাকলো।
-“মেহেক এই মেহেক।খাবি চল।”

-“আমি খাবো না তোমরা খাও।”
মেহেকের রাশভারি কন্ঠে ফারাজ বিস্ময় হয়ে গেলো।মেহেক কী কেঁদেছে?বোকা মেয়েটা এই জন্যও কেঁদে কেটে শেষ!

-“আমিও খাবো না আগে দরজা খোল।”

-“খুলবো না। তুমি যাও তো।”

-“খুলতে বলছি তোকে”
মেহেকের খিদে পেটে ইদুঁর দৌঁড়াচ্ছে। খুব খিদেও পেয়েছে।ফারাজ ভাই যেহেতু এসেছে তার কাছে উৎসের নামে নালিশ করবে যদি সে এর বিচার করে তাহলে খেতে যাবে।এই ভেবে সে গিয়ে দরজা খুললো।ফারাজের আপন কোনো বোন নেই কিন্তু তিনটা বোন কাজিন হলেও তার প্রাণ।ওদের কাউকেই সে কাজিন মনে করে না। ফারাজ মেহেকের মুখ দেখে রীতিমতো অবাক।
-“কিরে চোখ মুখ টমেটোর মতো লাল করে ফেলেছিস দেখি।”

-“হুম সাধে করেছি।”
এই রে তার বোন এমনিতেই রেগে আছে তারমধ্যে সে উল্টো পাল্টা বললে তো হিতে বিপরীত হয়ে যাবে।

-“আয় খেতে আয় তারপর ওর বিচার করবো কওবরো সাহস ওর,আমার বোনকে কান ধরে উঠ বস করায়।”

এবার মেহেক বাচ্চা মেয়েদের মতো কেঁদে বললো,
-“তুমি জানো ফারাজ ভাই শুধু কান ধরে উঠ বস করায় নি আরো একটা অপরাধ করেছে ওই সরষে ভূত।”

-“সরষে ভূতটা আবার কে?”

-“তোমার শয়তান ভাই।”
ফারাজ তার ভাইয়ের নাম শুনে হো হো করে হেঁসে দিলো।
-“তুমি হাঁসসো!”

-“না না আর হাঁসবো না। বল আরেকটা কী অপরাধ।”

-“সবার জন্য কতো কিছু এনেছে আর আমার জন্য কিচ্ছু আনে নি।”

-“কে বলেছে আনেনি?”

-“উৎস ভাই।”
উৎস তো এমন ছেলে না ও সবার জন্যই তো অনেক কিছু এনেছে তার ধারণা মতে তাহলে ওর টা?

-“আচ্ছা নিচে আয় এর বিচার আজ করবই।”

-“সত্যি করবে তো”

-“হুম আয়”
মেহেক চোখ মুখ তার ওড়না দিয়ে মুছে নিচে গেলো।

ড্রাইনিং টেবিলে সবাই সবার জায়গা দখল করে বসে আছে।দুটো চেয়ার ফাঁকা একটা এরিদের পাশে আরেকটা উৎসের পাশে।ফারাজ ইচ্ছে করে এরিদের পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসলো।
মেহেক ফারাজকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো না হলে দেখা যাবে এর বিচার করবেই না।

-“এই মেহেক,কেমন আছো?”
মেহেক খেয়াল করেনি প্রথমে সাদিফকে। তাকে ডাকায় সে তার দিকে তাকালো।উৎসের সাথে যখন বাড়ির সবাই কথা বলতো তখন সাদিফের সাথেও বলতো।ছেলেটা খুব ভদ্র,শান্ত।উৎসকে বাহিরে যেতে সেই সাহায্য করেছিলো।তারা দুই জন ভালো বন্ধু। বিদেশেও এক সাথে পারি দিয়েছিলো আবার এক সাথেই ফিরলো।বলতে গেলে তারা বাল্য কালের বন্ধু।
-“জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন ভাইয়া?”

-“এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোমাদের সবাইকে দেখে এখন আরো চাঙ্গা হয়ে গেছি।”
উৎস সাদিফের দিকে তাকালো।উৎসের সাথে চোখাচোখি হতেই সাদিফ খাওয়ায় মন দিলো।
উৎসের চাহনির মধ্যে কিছু ছিলো।হয়তো সে ইশারায় বুঝিয়ে দিলো ওর সাথে কথা বলতে না।

মেহেক উৎসের পাশে বসলো।সে এমন ভাবে খাওয়ায় মনোযোগ দিয়েছে যে তার আশেপাশে ভূমিকম্প হলেও নড়েচড়ে বসবে না আর না তাকাবে কোনোদিকে।
মেহেক মনে মনে বিড়বিড় করলো
-“রোবট একটা”

মেহেকের পাতে তার ছোট মা খাবার দিলো সে না খেয়ে নাড়াচাড়া করছে আগে তার নালিশকৃত বিচার করা হবে তারপর সে খাবে।এই দিকে ফারাজ খাওয়ায় ব্যস্ত।
মেহেক রাগি চোখে ফারাজের দিকে তাকালো ফারাজেরও তার দিকে চোখ পরে গেলো এতোক্ষণ চেয়েছিল কথাটা উঠাতে না উঠালেই উৎস তার ছোট হয়েও তাকে কয়েকটা কথা শুনাবে।কিন্তু তার বাধ্য হয়ে বলতেই হলো।
-“উৎস তুই নাকি সবার জন্য অনেক কিছু এনেছিস কিন্তু মেহেকের জন্য কিছুই আনিসনি?”
উৎস কোনো জবাব দিলো না বরং নির্বিকার ভাবে খেতে লাগলো।সবাই উৎসের দিকে তাকালো।

-“কে বললো আনেনি উৎ”
উৎস টেবিলের নিচ দিয়ে তার পায়ের আঙুল দিয়ে সাদিফকে খোঁচা মেরে থামিয়ে দিলো।সাদিফ উৎসের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
-“দেখেছো বড় আম্মু তোমার ছেলে আমার জন্য একটা কিচ্ছুও আনেনি।একটা চকলেট হলেও কথা ছিলো একটা চকলেটও না।”

-“এই জন্য তুই ঘরে বসেছিলি?”
নিশাতের প্রশ্নে মেহেক কোনো জবাব দিলো না মাথা নিচু করে রাখলো।
-“আমাকে তো অনেক চকলেট দিয়েছে সেখান থেকে অর্ধেক তোর।”
-“আমার থেকেও তোকে দিবো এখন মন খারাপ না করে খা তো।”
নিশাত, রোদসীর কথা মেহেকের পছন্দ হলো না। তাকে তো দেয়নি দিলে একটা কথা ছিলো।তাকে অপমান করেছে তাকে দেয়নি বাকি ভাই বোনদের দিয়েছে। তার সাথে দুই নাম্বারি করেছে তার সরষে ভাই।
-“মা আমি তোমার জন্য অনেক চকলেট নিয়ে আসবো রাতে।”

-“একদম না।তোমার মেয়ের ধিরিঙ্গিপনা দিন দিন বাড়ছে এখন থেকেই ওর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
মা তো নয় জেনো সৎ মা।তার সাথে আঠার মতো লেগেই তাকে তার বাবা তাকে এনে দিবে এতে তার কি সমস্যা!তার কিছু লাগলে সে বলবে তা না করে মেয়েকে ধমকাতে থাকে চব্বিশ ঘণ্টা।মেহেক মুখ ভোঁতা করে বসে থাকলো।তাকে মুখ গোমরা করে বসে থাকতে দেখে তার বড় আব্বু বললো,
-“তুমি একদম ঠিক করোনি।দুই বোনের জন্য আনতে পারলে আরেক জন কি করেছে। ওরা তিন জনই তো তোমার বোন।”
উৎসের মধ্যে কোনো প্রকার হেলদোল নেই সে কিছু বললো না আড়চোখে মেহেকের দিকে একবার তাকালো।উৎসের চুপ থাকা দেখে মালিহা বললো,
-“আমার মনে হয় মেহেকের উপর রেগে আছে তাই দেয়নি।আমার ছেলে এমন না ও এতো জ্ঞানহীন না।”

-“এই টুকু একটা মেয়ের সাথে রাগ দেখার মানেই হয় না। ওর জন্য যা এনেছো তা দিয়ে দিবে।”

এবার মেহেকের মুখে হাসি ফুটলো।সেও কতো বোকা!ভেবেই দেখেনি এমন কখনো উৎস করতেই পারে না।
ফারাজ চোখের ইশারায় মেহেককে আসস্ত করে খেতে বললো।মেহেক খাওয়া শুরু করলো।
উৎস খেতে খেতে কয়েকবার আড়চোখে মেহেককে দেখছে।সেটা মালিহা বেশ লক্ষ্য করলো।দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলের কান্ড দেখে মুচকি হাসলো।
উৎসের খাওয়া শেষ প্রায়।
-“সাদিফ খাওয়া শেষ হলে আমার রুমে আসিছ।”
-“ওকে”
উৎস উঠে দাঁড়ালো।
-“বাবা তুমি তো জর্দা খেলেই না।একটু খেয়ে দেখো।”

-“মেজো আন্টি এতোটা জর্দা খেতে পারবো না আমি।”

-“আরে সাদিফ ভাইয়া একটু খেয়ে দেখেন একবার খেলে আঙুল চাটবেন।”

-“কী এমন আছে এতে যে এতোই স্পেশাল।”

-“আমার আপু বানিয়েছে তার হাতের জর্দা মারাত্মক টেস্ট। আমার তো খুবই পছন্দ।”
জর্দা নিশাত ভালো ভাবে রান্না করে তার হাতের জর্দা খুবই সুস্বাদু। মেহেক তার বোনের রান্না করা খাবার দেখলেই বুঝে যায়।নিশাতের রান্না সবার থেকে আলাদা।বাড়িতে জর্দা আইটেম করা হলেই নিশাত করে।
সাদিফ নিশাতের দিকে তাকাতেই দু’জনের চোখাচোখি হয়ে গেলো নিশাত চোখ নামিয়ে নেয়।
সাদিফ এক চামচ মুখে নিতেই জেনো কোথায় হারিয়ে গেলো।খুব সুস্বাদু হয়েছে।সে সব জায়গায় কম বেশি খেয়েছে কিন্তু এটা কিছুটা আলাদা টেস্ট।

-“আসলেই মেহেক তোমার বোনের হাতে জাদু আছে বলতে হয়।”

——–

দুপুরের খাওয়ার পর্ব শেষ হলে শাহাদাত চৌধুরী ও সাফওয়ান চৌধুরী তাদের কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।সাধারণত কেউ দুপুরে খেতে আসে না খাবার নিয়ে যায় না হলে বাড়ির ড্রাইভার দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু আজ উৎস আসায় তারাও বাসায় আসলো লাঞ্চ করতে।বাড়ির তিন বউ বাগানে চলে যায়।শীতকাল মানেই হচ্ছে দুপুরের খাওয়া শেষ করে বাগানে মাদুর বিছিয়ে তিন জা রোদে বসে গল্প করবে।জমানো তেল রোদে দিয়ে গলিয়ে একে অন্যের মাথায় লাগিয়ে দিবে। এই সময়টা তারা তিন জনই ফ্রি থাকে।

সাদিফ উৎসের রুমে বসে ওর সাথে কথা বলছে।ফারাজ তার রুমে,এরিদকে নাফিসা ঘুমাতে বলেছে তাই সে এখন গভীর নিদ্রায়।কিন্তু ঘুমাতে চায়নি প্রতিদিন তার মার বকা খেয়ে তারপর ঘুমায় আজও তার কোনো ব্যতিক্রম ছিলো না। উৎস এসেছে তাই সে ঘুমাবে না বলে বায়না ধরে কিন্তু তার মা বকে বকে ঘুম পাড়িয়েছে।নিশাত পড়তে বসেছে মেয়েটা পড়া লেখায় যথেষ্ট মেধাবী। বাড়ির সবারই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ শুধু বিচ্ছু দুইটা বাদে একটা মেহেক আরেকটা এরিদ।নিশাত পড়া ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না।আর রইল রোদসী সে এখন ছাদে।তার ফুল গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে। তার ফুল গাছের বাগান পছন্দ তাই ছাদে তার পছন্দ মতো কিছু চাড়া লাগানো আছে।শীত ঋতু হওয়ায় চারিদিকে ঠান্ডা বাতাস বইছে তাই সূর্যের আলো গায়ে লাগলে ভালোই লাগছে তার।রোদ টাও মিষ্টি মিষ্টি লাগছে।
মেহেক তার রুমে পায়চারি করছে।কী করবে সে?কীভাবে তার জিনিসগুলো হাতাবে?ভাবতে ভাবতে মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো এক দৌড়ে চলে গেলো ফারাজের ঘরে।গিয়েই দরজায় টোকা দিলো।দরজা লাগানো ছিলো না হালকা করে আবজানো ছিলো।চৌধুরী বাড়ির ছেলে মেয়েদের প্রত্যকের রুম আলাদা।প্রত্যকের পার্সোনাল বলতে তো কিছু আছে যদিও তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের মতো সম্পর্ক সবার সাথে খুব ফ্রেন্ডলি তারপরও ছেলে মেয়েরা বড় হচ্ছে।দু’তলা চৌধুরী বাড়িটির উপর তালায় সব ছেলে মেয়েদের জন্য বরাদ্দ আর নিচ তলা বড়দের জন্য।এ বাড়ির একটা নিয়মও রয়েছে কেউ কারো ঘরে ধুকার আগে অবশ্যই নক করে ধুকবে।
-“কে?”
-“আমি মেহেক”
ফারাজ শুয়ে ফোন স্কল করছিলো।মেহেক এসেছে দেখে উঠে বসলো।
-“ভিতরে আয়”
মেহেক ভিতরে প্রবেশ করলো।
-“ফারাজ ভাই”
-“হ্যা বল”
-“উৎস ভাই তো তোমাকেও এখনো কিছু দেয়নি তো চলো না এক সাথে গিয়ে নিয়ে আসি।”
ফারাজ মেহেকের মুখের দিকে তাকালো।মেহেক বোকাদের মতো হাসি দিলো।
-“যাবি বলছিস”
-“হুমম”
-“আচ্ছা যাওয়াই যায়।”

-“উৎস আসবো?”
-“হুম আসো”
ফারাজ ভিতরে ধুকে উৎসকে চোখ মারলো।সাদিফ অবাক হয়ে উৎসের দিকে তাকায় তখনি ফারাজের কন্ঠ ভেসে আসে
-“দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ভিতরে আয়”
মেহেক গুটিগুটি পায়ে ভিতরে ধুকলো। উৎস মেহেকের দিকে তাকালো।মেহেক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের দু’জনের অবস্থা দেখে সাদিফ হেসে দিলো হো হো করে।
-“উৎস আসি।আজ রেস্ট নে কাল আবার দেখা হবে।”
উৎস মাথা নাড়ালো।সাদিফ ফারাজ আর মেহেককে বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

-“কিছু বলবে?”
-“না”
-“তাহলে”
-“হ্যা”
-“কী না হ্যা”
-“আমাদের জন্য কী এনেছিস তা নিতে”
মেহেক মাথা উঁচু করে উৎসের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো।
-“বসো”
-“আয় আয় বস বস”
মেহেক ফারাজের সাথে বসতে গেলেই উৎস বলে উঠলো
-“তোমাকে শুধু বলেছি”
মেহেকের মুখ চুপসে গেলো।তাকে পদে পদে অপমান করছে এই বজ্জাত লোকটা!
মেহেক দাঁড়িয়ে রইলো।
উৎস একটা প্যাকেট তার ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
-“এই নাও এটা তোমার।কথা না বাড়িয়ে যেতে পারো। ”

ফারাজ মৃদু হাসি দিয়ে মেহেকের দিকে তাকিয়ে বড় বড় কদমে তার রুমে চলে গেলো।

দরজায় কোনো পুরুষালী কন্ঠ পেতেই নিশাত তার ভেজা চুল গুলো খোঁপা করে মাথায় ওড়না দিয়ে দরজার কাছে গেলো।
-“আপনি!কিছু বলবেন ভাইয়া?”
-“ওহ সরি তুমি!আমি ভেবেছিলাম আন্টি।বাসায় জাবো তাই ভাবছিলাম দেখা করে যাই।”

-“বড় মা বাগানে আছে”
-“মেজো আর ছোট আন্টি?”
-“তারাও আছে”
-“ওহ থ্যাংক্স।আসি”
-“জ্বি আবার আসবেন।”
-“হ্যা অবশ্যই।ইয়ে না মানে প্রয়োজন হলে তো আসতে হবে।”
-“হুম”
সাদিফ রুমে হালকা উঁকি দিয়ে দেখলো টেবিলে বই খোলা।
-“পড়ছিলে?”
-“হুম সামনে এক্সাম তো।”
-“ক..কিসে পড়ছো?”
-“ল নিয়ে পড়ছি”
-“ওহ অল দা বেস্ট। আর হ্যা তোমার হাতের জর্দা আসোলেই অনেক মজা।”
-“থ্যাংক্স”
-“ওয়েলকাম,আসি”

বাগানে গিয়ে বাকিদের সাথে কথা বলে সাদিফ বিদায় নিয়ে চলে গেলো।বাড়ির তিন বউও তাকে বললো মাঝে মাঝে চলে আসতে তার মধ্যে তো এখন শীতকাল। পিঠেরও দাওয়াত দিলো।

——-
-“উৎস ভাই”
-“হুমম”
-“আমারটা”
-“আগে এক হাত দিয়ে কান ধর আর আরেক হাত দিয়ে নাক ধর।”
মেহেক উৎসের কথা মতো তাই করলো।
-“হুম ধরলাম”
-“এইবার বল আর কখনো যদি আমি আমার ছবি পোস্ট করি তাহলে আমি কানে শুনতে পাবো না এবং তার সাথে নাক দিয়ে নিশ্বাস নিতে পারবো না।”

-“এটা বললে তো সবাই আমাকে বয়রা বলবে আর আমিও মরে যাবো যদি অক্সিজেন নিতে না পারি।”

-“সেটা তো তখনি হবে যখন তুই ছবি পোস্ট করবি।এখন বল কোনটা চাস?”

মেহেকে কিছুক্ষন ভেবে বললো,
-“ওকে ছাড়বো না।”
-“মনে থাকবে তো”
-“থাকবে যদি বেশি চকলেট দাও”
উৎস মেহেকের দিকে তাকালো।তাদের চোখাচোখি হলো কিন্তু বেহায়া মেহেক চোখ সরালো না বরং তাকিয়ে থাকলো উৎসের ধূসর চোখের মনির দিকে।এই প্রথম তার চোখে ধরা দিলো উৎসের চোখের মনি ধূসর রংয়ের।
-“আমার রুপ চকলেটের মতো গলে পড়ছে না যে এভাবে তাকিয়ে থাকতে হবে!”
মেহেক লজ্জা পেয়ে তার দৃষ্টি সড়িয়ে নিলো।কী অদ্ভুত মুখের উপর যা তা বলে দেয়।কিন্তু এর আগে কখনো মেহেক উৎসের চোখের মনির দিকে খেয়াল করেনি আজই করল। উৎস দেশের বাহিরে যখন ছিলো তখন ভিডিও কলে কথা বললে সে ওর দিকে তেমন তাকাতোই না বরং সে ক্যামেরায় তাকে দেখতো। নিজের দিকে তাকিয়েই কথা বলতো আর দেখতো তাকে কেমন লাগে ভিডিও কলে।কিন্তু ভিডিও কল দিলেও উৎস অন্যদের সাথে কথা বললেও মেহেকের সাথে কমই বলতো মাঝে মাঝে মেহেকের সাথে কথা বলতো।উৎস কয়েকবারই খেয়াল করেছে মেহেক কথা বলার সময় ওর দিকেই তাকিয়ে কথা বলে।যার নিজেকে দেখার এতো ইচ্ছে সে ঘরের আয়নাতেই দাঁড়িয়ে মন ভরে দেখুক।কথা বলার সময় কেনো দেখবে!এজন্য উৎস ওর সাথে কথা বলতে চাইতো না কিন্তু ওই যে আছে না বদমাশ বিটকেল ভাই মেহেকের হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়ে বলবে,
-“কথা বল, তোর সাথে উৎসের কথা আছে।”
আর এই গাধী মেয়ে দাঁত বের করে খিলখিল করতে করতে বলবে,
-“উৎস ভাই কী বলবা বলো আমি শুনছি”
বলেই ক্যামেরায় নিজেকে দেখতে থাকবে।অন্যদিকে উৎসের প্রশ্নের জবাবে হুম না বলতে থাকবে।

#চলবে