#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#সমাপ্ত_পর্ব
নিত্য দিনের চেয়ে আজকের দিনটা চৌধুরী বাড়ির সবার জন্য আলাদা।খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন।অনেক দিনের অপেক্ষার পর এই দিনটা এসেছে।ফারাজের মেয়র হওয়া স্বপ্ন,সমাজের অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা আজ কোথায় মোর নেয় তা নিয়ে চৌধুরী বাড়ির সবার মনে আশঙ্কা।ভোর হতেই সবাই উঠে গিয়েছে।ফারাজ সারা রাত দুচোখ এর পাতা এক করতে পারেনি।ইয়াফা ও ফারাজের দুশ্চিন্তার জন্য ঘুমাতে পারে নি।তাকে ভরসা দিয়ে গেছে ভালো কিছু হবে।ঘড়ির কাটা প্রায় সাত টার ঘরে। সবাই বসার ঘরে উপস্থিত।উৎস, ফারাজ,সিজান, সাদিফ বের হবে।কেন্দ্রের পরিস্থিতি কেমন? ঝামেলা করছে কী না বিরোধী দলের লোকজন।এসবের জন্য তাদের গিয়ে দেখতেই হবে।এছাড়া ফারাজের লোকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কোনো ঝামেলা হলেই একশন নিবে।হঠাৎ সেখানে রায়ান ও সোহানা হাজির হয়।তাদের হাতে লাগেজ।তাদের দেখে সবাই অবাক হলেও মেহেক ও উৎস স্বাভাবিক থাকে।মালিহা বেগম সোহানার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
-“একি তোমরা কোথায় যাচ্ছ?”
সোহানা তপ্ত হেসে নরম কন্ঠে বলল,
-“আমরা ইন্ডিয়া বেক করছি।”
-“কেনো?কিছু দিন থেকে যাও।আজ ফারাজের নির্বাচন।”
রায়ান কথা টেনে নিয়ে বলল,
-“আন্টি ফ্লাইট নয়টায়।উৎসর থেকে জেনে নেওয়া যাবে।আবার কখনো বাংলাদেশে আসলে আপনাদের বাসায় আসব।আপনারা ভিষন আন্তরিক।”
-“তোমরা চলে যাবে আগে বললে না কেনো আমাকে?উৎস তুই কী জানতি?ওদের থাকতে বললি না।”
সোহানা বলল,
-“আসলে আন্টি কনসার্ট তা ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছে তাই হুট করে সব হয়ে গিয়েছে।উৎস ও জানত না।ওরে রাতেই বলেছি।”
-“আবার আসবে তো।”
সোহানা মৃদু হেঁসে বলল,
-“জি আন্টি আসবো।আর সামনেই আমাদের বিয়ে। আমাদের বিয়েতে আপনাদের সবাইকে আসতে হবে।”
তারপর সোহানা মেহেকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মেহেক ও সোহানার চাওয়াচাওয়ি হয়।মেহেকের হাত ধরে বলল,
-“ভাগ্য করে একটা বর পেয়েছো।তোমার ভাগ্যর তারিফ করতে হয়।তোমাদের জুটি খুব মানিয়েছে।মন থেকে বলছি তোমরা অনেক ভালো থাকবে।”
-“আবার এসো আপু।”
-“হুম।”
-“সোহানা পৌঁছে ফোন দিস আর কোনো সমস্যা হলে জানাস।”
সোহানা মাথা নাড়ায়।
-“সময় পেলো মেহেককে নিয়ে ঘুরে আসিছ।আর আমাদের বিয়েতে তোদের থাকতেই হবে।”
-“হুম”
রায়ান উৎসর কাঁধে হাত রাখল।উৎস রায়ানকে বুকে জরিয়ে নেয়।উৎস কন্ঠ চেপে বলল,
-“সোহানার বিশ্বাস ভেঙে দিস না।মেয়েটা বাবা মার ভালোবাসা হারিয়েছে তোর ভালোবাসার অভাব হতে দিস না।অল দ্যা বেস্ট।”
-“থ্যাংক্স,তুই না বোঝালে হয়তো ও কখনো বুঝতে চাইতই না।আসি।”
দুই জন একে অপরকে ছেড়ে দেয়।বাকিদের থেকে বিদায় নিয়ে ওরা চলে গেলো।ওরা বেরিয়া যাওয়ার পরই ফারাজ,উৎস, সিজান,সাদিফ চলে যায় কেন্দ্রে।
——
রাস্তায় মিছিল বের হয়েছে।ভোট গননা করে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে কিছুক্ষন আগে।বিজয়ীর নাম শুনতেই রাস্তায় বড়ো মিছিল বের হয়েছে।হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে ফারাজের দলের লোকরা।ফারাজ জয়ী হয়েছে। ব্যস্ত রাস্তা আরো ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।সূর্য হেলে পড়েছে। খানিকক্ষণ বাদেই একে বারে ডুবে যাবে আর চারোপাশে আধার নামবে।ফারাজকে কাঁধে করে নিয়েই ঘুরছে।সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে তাদের উপর কিন্তু ফলাফল পাওয়ার পর সব ক্লান্ত মুছে গেছে।পাড়ায় পাড়ায় মিষ্টি বিলানো হচ্ছে। চৌধুরী নিবাসে ও খুশির বন্যা বয়ে গিয়েছে।উৎস ফোন বের করে সময় দেখার জন্য।তখনি তার চোখ আকাশচুম্বী।উনপঞ্চাশ মিস কল!ফোন সাইলেন্ট থাকায় বুঝতে পারেনি।সারাদিন ব্যস্ত থাকায় বাড়ির কথা ভুলেই গিয়েছিল। তার চেয়ে বড়ো কথা তার এখন বউ আছে ঘরে।উৎস থেমে যায়।মিছিলের সাথে আর পা মিলালো না।কল বেক করল।কিন্তু কল কেটে দিয়েছে ফোনের ওপর পাশের ব্যক্তি।উৎস বাড়িতে চলে গেলো।
মেহেক বারান্দায় বসে পপ্পন খাচ্ছে। কানে তার হ্যাডফোন লাগান।উৎস তার পাশে কোমর হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সেই দিকে মেহেকের কোনো খেয়ালি নেই।উৎসর কপালে ভাঁজ পড়ল।এক টানে হ্যাডফোন খুলে ফেলল।মেহেক তড়িৎ চোখে পাশ ফিরে তাকায়।বিরক্ত হয়ে বলল,
-“হ্যাডফোন নিলে কেনো?দিন।গান শুনছি দেখছ না।”
-“আমি কল দিয়েছি কল কেটেছিস কেনো?”
-“আর আমি ঊনপঞ্চাশ বার দিয়েছি সে বেলায়?”
-“জানিস না আমি ব্যস্ত ছিলাম।”
-“একটু খবরাখবর নিতে ফোন দিয়েছিলাম কে জানত নির্বাচন ফারাজ ভাই না তুমি করছ!”
-“খিদে লেগেছে।”
-“টেবিলে রাখা আছে।”
-“নিয়ে আয় ঘরে।”
-“তোমার হাত পা সবই আছে নিয়ে আসো।”
উৎস দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“একটু পানি দে।”
-“ঘরে রাখা আছে।”
-“বেশ।সব কিছু যদি আমারই করতে হয় তাহলে ওতোগুলো চকলেট সবাইকে ভাগ করে দিয়ে দিবো।কী বলিস।”
উৎস হনহনিয়ে ঘরের ভিতর চলে গেলো।মেহেক পিছন থেকে গিয়ে সহসা উৎসকে পেচিয়ে ধরল।
-“যাচ্ছি যাচ্ছি সব এনে দিচ্ছি।”
উৎস তার বা হাত দিয়ে মেহেককে এক ঝটকায় টেনে সামনে নিয়ে এসে ওর গলায় মুখ ডুবিয়ে বলল,
-“আপাতত অন্য কিছু চাই দিবি?”
-“হুম দিবো।বলো তোমার কী লাগবে?”
-“তোর মতো একটা কিউট মেয়ে চাই।”
-“কী!”
-“আমি বাবা হতে চাই।”
-“আমি নিজেই তো বাচ্চা। আরেক বাচ্চা সামলাবো কীভাবে?”
-“মা হলে বুঝদার হয়ে যাবি।মেয়েরা বিয়ের পর না চাইতেও অনেক কিছু শিখে যায়।আর সেখানে তোর পাশে আমি তো আছি।তাহলে অসুবিধা কোথায়?তুই ফিটার বানিয়ে দিবি আর আমি খাইয়ে দিবো আমাদের পুচকে কে।”
-“তুমি না…!”
-“তোকে বড়ো করেছি। তোর সব কাজ আমি করেছি,আমাদের মেয়েটাকে দুজন একসাথে বড়ো করব না হয়।ঘরটা খালি খালি লাগে ভীষণ।”
-“তোমার চোখের কাতরতা,ভালোবাসা, মুগ্ধতা, যত্ন দেখে আমি সত্যি বিমোহিত।কঠর ব্যাক্তিত্বের আবরণে ভালোবাসা নামক শব্দটা তোমার দৃষ্টির আড়ালে নিস্তব্ধতা বয়ে আনে।কিন্তু তুমি পাশে থাকলে সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করেও ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ অনুভব করা যায়।”
উৎসর ঠোঁটের কোনায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে।
-“একবার ভালোবাসতে জানলে ভালোবাসার রং মানুষকে পাল্টে দেয়।যেমন আজ আমার জারুল ফুলের মুখে কঠিন ধাঁচের সংলাপ।”
__________সমাপ্ত_________

