Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-৩৪+৩৫

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-৩৪+৩৫

0
9

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৩৪

সন্ধ্যা নামতেই আকাশজুড়ে কালো মেঘের রাজত্ব নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা মাটির বুকে আছড়ে পড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সেই টুপটাপ শব্দ রূপ নিল একটানা ঝরঝর সুরে। চারপাশ যেন বৃষ্টির স্নিগ্ধ পর্দায় ঢেকে গেল। ভেজা মাটির সৌরভ বাতাসে মিশে এক অদ্ভুত প্রশান্তির আবেশ ছড়িয়ে দিল। দূরের গাছগুলোর পাতায় জমে থাকা ফোঁটাগুলো মাঝে মাঝে টুপ করে পড়ে নিস্তব্ধতায় ছোট্ট শব্দ করল।হালকা শীতল বাতাস ভেজা গাল ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর দূরে কোথাও বিদ্যুতের ঝলকানি ক্ষণিকের জন্য আকাশ আলোকিত করে আবার সবকিছু অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছে।কোথাও ছাতা হাতে কয়েকজন মানুষ দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ি ফিরছে, আবার কোথাও দোকানের টিনের চালের নিচে দাঁড়িয়ে কেউ বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়। টিনের চালে বৃষ্টির অবিরাম টুপটাপ শব্দ যেন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো সঙ্গীত, যা সন্ধ্যার নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে।নিশাত ও রোদসীকে বিদায় দেওয়া হয়ে গেলে অতিথিদের বিদায় জানাতে জানাতে সন্ধ্যা নেমে যায়।সবাইকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে মেহেককে কোনো এক বাহানার ছলে উৎস তার সাথেই রেখে দেয়।বিয়ের সব তদারকি আজ তাদের দুই ভাইয়ের উপর পরে তাই বিভিন্ন কাজে বাসায় তার কয়েকবার যাওয়া হয়।প্রথম বার যখন এসেছল তখন তার বাইক নিয়েই আসে।তাই মেহেককে নিয়ে সে বাইকে করেই যাবে।কিন্তু বাড়ির গাড়িগুলো ছেড়ে দিলেই আকাশ ডাকতে শুরু করে। মুহুর্তের মধ্যেই গুঁড়ি গুঁড়ি তারপর ঝরঝর করে বর্ষন শুরু হতে লাগল।আর উৎস ও মেহেক সেন্টারের পার্কিং লটেই আটকে পড়ে যায়।সেন্টারে রাতের কোনো অকেশন না থাকায় সন্ধ্যা হতেই বন্ধ করে ফেলে।তাই তারা বাহিরের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে বৃষ্টি থামার।মেহেক আলতো হাসি এঁটে উৎসর হাতের আঙুলের ভাঁজে তার হাত রাখল।উৎস মুঠো করে নিলো।মেহেকের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“শরীর খারাপ লাগছে?”

মেহেক দুই পাশে মাথা নাড়ল।
-“এটাই বুঝি বৃষ্টি বিলাস।”

-“ধরে নে তাই।তা কেমন ফিলিংস হচ্ছে?”

-“দারুন।”

-” উৎস ভাই আমার না খুব ইচ্ছে… ”

উৎস ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-“কী?”

-“আপনার সাথে বৃষ্টিতে ভিজার সাথে রাস্তার টং এ এক কাপ চা খাওয়ার খুব আকাঙ্খা জেগেছে এই কিশোরী মনে।”

উৎস মেহেককে এক পলক দেখে সামনের টুপ টুপ করে পড়া বৃষ্টি দিকে তাকায়।মেহেক পুনরায় বলল,
-“তাহলে বৃষ্টি বিলাসে কোনো ঘাটতি থাকত না।”

-“সব ইচ্ছা পূরণ করার জন্য এই শেহেজাদা আছে।আপনি শুধু বলে যান শেহেজাদী।আদেশ মঞ্জুর হয়ে যাবে।”

মেহেক উৎসর কথায় শব্দহীন ভাবে হেঁসে দিলো।
-“আপনি পাড়েন ও বটে।”

রাস্তার ওপর পাশে একটা চায়ের দোকান।দোকানে একটা পিচ্চি ছেলে সবাইকে চা দিচ্ছে।তাকে উৎস হাঁক ছুড়ে বলল দুই কাপ চা দিয়ে যেতে।ছেলেটা মাথায় পলিথিন দিয়ে চা দিয়ে গেল।রাস্তার দিকে মুখ করে তারা দু’জনে চা খেলো।

রাত গভীর হতে না হতেই বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল। একসময় শুধু কার্নিশের কিনারা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়া কয়েক ফোঁটা পানির শব্দই শোনা গেল। মেঘের ফাঁক গলে ফিকে চাঁদের আলো ভেজা পৃথিবীর বুকে নরম রূপালি আভা ছড়িয়ে দিল। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল ভেজা মাটি আর কদমফুলের মিষ্টি সুবাস। দূরের গাছপালার পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো রাতের আলোয় ক্ষুদ্র মুক্তোর মতো ঝিলমিল করছিল। চারদিকে এমন এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশের জন্ম নিল, যেন প্রকৃতি দীর্ঘক্ষণ কেঁদে অবশেষে নিশ্চিন্ত এক নিঃশ্বাস ফেলেছে।বৃষ্টি আসায় প্রকৃতি ঠান্ডা হয়ে গেছে।শরীরের গরম মাএা শীতল হয়ে আসল।সারা শরীরে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে।এমনি সময় মেহেক বায়না ধরল।

-“উৎস ভাই আইসক্রিম খাবো।”

উৎস আদেশের স্বরে বলল,
-“আবহাওয়া ঠান্ডা। রাত হয়ে গিয়েছে বাড়ি ফিরতে হবে।”

-“আপনি না বললেন আমার সব আদেশ শুনবেন।”

-“কোন রাজ্যের রানী আপনি?আপনার আদেশ শুনব!”

মেহেক গর্বের সাথে বলল,
-“মিস্টার জুবরান চৌধুরী উৎসর জীবনের রানী আমি।”

-“বেশি গর্ব করা ভালো না। শেষে দেখবি রাজকোষ ফাঁকা।”

-“রাজকোষ দেখে তো আপনার ফাদে পা দেই নি।”

উৎস কপাল কুঁচকালো।অবাকের স্বরে প্রশ্ন করল,
-“আমি তোকে ফাদে ফেলেছি?”

-“নয়তো কি?আপনি আমাকে বাধ্য করেছেন আপনার প্রেমে পড়তে।”

-“কীভাবে বাধ্য করেছি?”

-“লেবুর মতো দুই চোখ,কান খরগোশের মতো খাঁড়া,হাতির মতো নাক,ছাগলাদাড়ি,সবেদার মতো চেহারা,গায়ের রং পেয়ারা।এসব দেখে যে কোনো মেয়ে দিনে দুপুরে আপনার উপর উষ্টা খেয়ে পড়বে।অন্য কেউ আপনার ঘারে চেপে পড়লে মন্দ মন্দ কথা ছুঁড়বে। আপনি আমার কাজিন তাই এসব আমি কি সহ্য করতে পারব তাই বাধ্য হলাম এই ঢেড়সের উপর পিছলা খেতে।”

মেহেকের বর্ননা শুনে উৎস আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা হল।এ কেমন বর্ননা দিল তাকে নিয়ে।সব সময় শুনে,দেখেছে মানুষ সামনে গাল ভর্তি প্রশংসা করে আর পিছনে ছুড়ি মারে আর এই মেয়ে সামনা সামনি তাকে ডাইরেক্ট খোঁচা মারল।সব কথা হজম না হয় করল কিন্তু শেষের কথাটা ঢেড়স?তাকে ঢেড়স বলল!

-“আমি ঢেড়স?”

-“হুম,দেখেন না ঢেড়স খেলে আমার এলার্জিতে গা চুলকায় তেমনি আপনি আমার সামনে আসলে মুচরামুচরি শুরু হয়ে যায়।”

-“মিরকি বেরাম তোর আর দোষ চাপাচ্ছিস আমার?”

-“বেরাম আপনি বানিয়ে বলছেন মিরকি বেরাম!”

-“তোর মাথা নষ্ট।ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ খা।”

-“আমার ডাক্তার তো আপনি।”

-“তোর মাথা পুরো গেছে।”

-“প্রেমে পড়লে মাথা যাবেই।”

সাদা, লাল ও গোলাপি ফুলের মালা দিয়ে খাটের চারপাশ সযত্নে সাজানো হয়েছে। বিছানাজুড়ে ছড়িয়ে আছে তাজা গোলাপের পাপড়ি, যা ঘরটিকে আরও স্নিগ্ধ ও মনোরম করে তুলেছে।বেলি ফুলের সুবাস ঘরটাকে আরো মাতাল করে তুলেছে।ঘরের এক কোণে নরম হলুদ আলো জ্বলছে, যা পুরো পরিবেশে উষ্ণতা ও প্রশান্তির আবহ তৈরি করেছে। জানালার হালকা পর্দা বাতাসে মৃদু দুলছে, আর বাইরে রাতের নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের হালকা বাতাসের শব্দে ভেঙে যাচ্ছে। টেবিলের ওপর রাখা রয়েছে ফুলে ভরা একটি কাঁচের ফুলদানী, সঙ্গে কিছু ফল, মিষ্টি ও পানি।লাল বেনারসির আঁচল গুছিয়ে, মাথা সামান্য নিচু করে খাটের ঠিক মাঝখানে কাচুমাচু হয়ে বসে আছে নিশাত। মুখজুড়ে লাজুক হাসির আভা, আর চোখেমুখে নতুন জীবনের অজানা অনুভূতির ছাপ স্পষ্ট।তার সামনেই বসা সাদিফ।তাকে প্রান ভরে দেখেই যাচ্ছে।এতে নিশাতের অস্বস্তি যেনো দ্বিগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।তার মধ্যে নীরবতা, সেই নীরবতা ভেঙে বাধ্য হয়ে নিশাত বলল,
-“এভাবে তাকাবেন না।”

সাদিফ মৃদু হেঁসে বলল,
-“কেনো লজ্জা পাচ্ছ বুঝি?”

-“আমি ঘুমাব।”

-“ঘুমাও।”

-“ঘুমাব?”

-“হুম ঘুমাও।”

-“…..”

-“…”

তাদের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।সাদিফের কোনো হেলদোল নেই।সে আপন মনে তাকিয়েই আছে।নিশাত চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।তাকে এমন অস্বস্তিতে ফেলার কোনো মানে হয়!ইচ্ছে হচ্ছে তার বলতে
-“হয় বাসর করেন নয়তো ঘুমান আমাকেও ঘুমাতে দেন।”

কিন্তু এসব কি বলা যায়?কি করবে বুঝতেও পারছে না।অবশেষে ঠিক করল ঘুমিয়ে পড়বে।তাই বালিশ মাথার কাছে রাখতেই সাদিফ নিশাতকে টেনে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।নিশাত সাদিফের খুব কাছে চলে যাওয়ায় ক্রমাগত বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে।
-“কি খারাপ লাগছে?”

-“….”

-“বউ জান,এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লে চলবে?রাতটা একটু স্পেশাল করলে কেমন হয়?”

নিশাত আমতা আমতা করে বলল,
-“ম..মানে..?”

-“তুমি তো অনেক চিকন তাই আমার ভিটামিন দিয়ে তোমাকে মোটা বানিয়ে দেই।”

লজ্জা,সরমের মাথা খেয়ে সাদিফ কি বলছে?এমনিতেই সে লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছে না তার উপর কিসব কথা বার্তা।নিশাতের গাল টমেটোর মতো লাল হয়ে গিয়েছে।

-“আমার একটু সময় লাগবে।”

-“হুম নাও সময়।কিন্তু বউ জান আমাকে বেশি অপেক্ষা করিও না তাহলে ধৈর্য্য হারিয়ে”
নিশাত চট করে সাদিফের মুখে হাত দিলো।সাদিফ চুপ হয়ে গিয়ে বাঁকা হাসি দেয়।

—-

-“জান এমন দূরে দূরে থাকছিস কেনো?”

-“তোমাকে ভয় লাগছে।”

-“আমি বাঘ নাকি ভাল্লুক যে ভয় পাচ্ছিস?”
সিজান একটু একটু করে রোদসীর দিকে এগোল।রোদসী পিছিয়ে যেতে যেতে থাস করে বিছানার পড়ে গেলো।সিজান তাকে উঠার সময় না দিয়েই ওর উপর ঝুঁকে পড়ল।

-“আজকে যদি আমার না হোস তাহলে তোকে পেটুকস বানিয়ে ছাড়ব।”

-“কী?”

-“বউ আমার শুদ্ধ রানী। ভুলেই গিয়েছিলাম তার জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য।পেটুকস মানে প্রেগন্যান্ট। ”

রোদসী নাক ছিটকিয়ে বলল,
-“বিয়ে করে ঘরে বউ আনতে না আনতেই দেখি চরিএহীন হয়ে গেছো।”

-“বউর সামনে চরিএ হীন না হলে আমার দিকে চৌদ্দ গুষ্টি আঙুল তুলবে।”

#চলবে

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:৩৫

-“ভাই ওই গোলামের পু* রে থামানো যাচ্ছে না।ওর বাপ চাচাদের কারণে ও এমনিতেই এগিয়ে আছে।ওরে হারিয়ে আপনি কেমনে মেয়র হবেন।ওই জা* আমাকে অপমান করেছে এর বদলা আমার চাইই চাই।”

-“শান্ত হো ইকবাল।ওর দম কতদর আমিও দেখব।”

-“তুমি কী করবে আর?ওর একটা বোনকে এক রাতের জন্য হলেও চেয়েছিলাম দুইটার বিয়ে হয়ে গেলো আরেকটা পড়ে আছে শুধু।”

-“আগে ফারাজকে রাস্তা থেকে সরাই তারপর তোর ব্যবস্থা করছি।”

-“কী করবে?”

-“ফারাজের পার্টি অফিসে আমার দলের লোক লাগিয়ে দিয়েছি।”

-“কেন?”

-“ওর গাড়িতে জাল টাকা রাখবে। পুলিশকে টাকা খাইয়ে রাস্তায় আটক করবে, সাংবাদিক তথ্য ফাঁস করবে।ফারাজ চৌধুরী সবার চোখের আড়ালে কালো ব্যবসা করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে।”
কথাগুলো বলেই মফিজ হো হো করে হেঁসে উঠে।ইকবাল বলল,
-“ভাই এতে ওর ক্যারিয়ার গোল্লায় যাবে।”

-“মেয়র হওয়ার শখ জখম হয়ে থেকে যাবে চৌধুরী বাড়ির গায়ে।”

এক তলার পুরোনো ভবনটির সামনের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে দলের নাম লেখা। লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে রঙিন ব্যানার, পোস্টার আর বিভিন্ন সময়ের মিছিল-সমাবেশের ছবি। ফারাজের নির্বাচনের তারিখ প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে।দুই দিন পরেই নির্বাচন কিন্তু এখনো প্রচারণা পুরো দমে চালাচ্ছে তার দলের লোকরা।ফারাজকে যেভাবেই হোক জয়ী হতে হবে।নিশাত,রোদসীর বিয়ে হওয়ার পর সবাই সবার কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ফারাজের লোকরা লেগে পড়েছে মিছিল নিয়ে প্রচারণা করতে।ফারাজ ও বেরিয়েছে তাদের সাথে।সারাদিন সবার ঘরের দরজা দরজায় গিয়ে ভোট চেয়ে এসেছে।সারাদিন খেটেখুটে পার্টি অফিসের নিজস্ব ঘরে গা হেলিয়ে শুয়ে আছে ফারাজ।মাথার নিচে এক হাত ও পায়ের উপর পা তুলে রেখেছে।তখনি তার কল বেজে উঠলো।রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপর পাশ থেকে মেয়েলি অভীমানি সুর ভেসে আসে।

-“সারাদিন কোথায় ছিলেন?একটা বার মনে পড়ল না।”

-“মনে পড়লেই তো নিজেকে সামলাতে পারি না।সুইটহার্ট তাই একটু কম মনে করি।বিয়ের পর কাছে পাব তখন কাম সারতে পারব এখন তো পারব না।”

-“মুখে লাগাম টানুন।”

-“তোমার ঠোঁট লাগাও তাহলে মুখে লাগাম টানব।”

এই লোকটার সাথে কথা বলতে গেলেই ইয়াফা রেগে যায়।সব সময় রোমান্টিক মুডে থাকে।ইয়াফা কল কেটে দেয়।

-“এই ছেমরি ফোন দেয় আবার একটা কথা বললেই কেটে দেয়।একটু পীরিতির কথা বলব তা না।”

ইয়াফা ফারাজের একটা ছবি বের করে কল্পনা করতে থাকে তাদের সম্পর্কের শুরু কীভাবে হয়েছিল।

দুই দিন আগের ঘটনা–

কাউকে ভালোবাসার জন্য সব সময় শত কথার প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো কয়েকটি ছোট্ট আলাপ, কিছু নীরব অনুভূতি আর একে অপরকে দূর থেকে বোঝার ক্ষমতাই একটি সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে।ফারাজ আর ইয়াফার গল্পও ঠিক তেমনই। তাদের পরিচয় হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। কথা হয়েছে খুবই কম সামনাসামনি তো প্রায় নয়ই, বেশিরভাগই ফোনে। ফোনের ওপাশে কয়েক মিনিটের কথা, পড়াশোনার খবর, কখনো কোনো সাধারণ বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এসবের মাঝেই অদ্ভুত এক টান তৈরি হয়েছিল।
ফারাজ বুঝতে পেরেছিল, ইয়াফা তার জীবনের খুব বিশেষ একজন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে ইয়াফাও অনুভব করেছিল, ফারাজের কণ্ঠস্বর শুনলে তার মন অকারণেই ভালো হয়ে যায়। ফোন কেটে যাওয়ার পরও সে অনেকক্ষণ সেই কথাগুলো মনে মনে ভাবত। কিন্তু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার সাহস তার কখনো হয়নি।
সে ভাবত,
-“যদি আমি বলি আর সে যদি আমাকে ওই নজরে না দেখে তখন?”

অথচ সে জানত না, একই ভয় নিয়ে ফারাজও প্রতিদিন কাটাচ্ছে।কেননা ইয়াফা মেহেকের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। ফারাজের চিন্তার বিষয় এইটাই যে মেহেক আর ইয়াফারও বন্ধুত্ব খুব ভালো আর ইয়াফাকে প্রপোজ করার পরে ও যদি একসেপ্ট না করে আর মেহেকে এইসব কথা বলে তাহলে ভাই হিসেবে ফারাজ বেশ লজ্জিত হবে বোনের কাছে।যদিও মেহেকের ধারনা ফারাজ কোনো মেয়েকে পছন্দ করে। তাই একদিন মেহেক হেসে ফারাজকে বলল,
-“ভাইয়া, তুমি এতদিনেও বলোনি? মেয়েটা যদি অন্য কারো হয়ে যায়?”

ফারাজ মৃদু হেসে বলেছিল,
-“আমি চাই ওর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিটা আমি তৈরি করি। এমনভাবে বলব, যেন কোনো দিন ভুলতে না পারে।”

মেহেক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
-“কী করবে?”

ফারাজ শুধু মুচকি হেসেছিল।কিছু বলেনি, বলা যায় না এই মেয়ে যদি গিয়ে বান্ধবীকে বলে দেয় তখন সব ভেস্তে যাবে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফারাজ নিজের মনকে বুঝায় যে ওকে যে করেই হোক ইয়াফাকে বলতে হবে মনের কথা। কারণ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত,ইয়াফাকে নিজের মনের কথা বলা।এক বিকেলে ইয়াফা বাসায় ফিরছিল।সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়ছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা, যানবাহনের শব্দ, মানুষের ভিড় সবকিছু যেন প্রতিদিনের মতোই।
হঠাৎ একটি বিশাল ডিজিটাল বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপনের বদলে অন্য কিছু ভেসে উঠল।
সাদা পটভূমিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা,

-“ইয়াফা…”

সে অবাক হয়ে থেমে গেল।এরপর ধীরে ধীরে লেখা বদলাতে লাগল।
-“আমাদের খুব বেশি কথা হয়নি…তবুও তোমার প্রতিটি কথায় আমি আমার ভবিষ্যৎ খুঁজে পেয়েছি।”

ইয়াফার বুক কেঁপে উঠল।মানুষজনও বিলবোর্ডের দিকে তাকাতে শুরু করল।পরের লাইন ভেসে উঠল
-“তোমার হাসি আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য।তোমার নীরবতাও আমি বুঝতে শিখেছি।”

ইয়াফার চোখ ভিজে উঠল।তারপর লেখা এল,
-“যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছি মনের কোনের সুপ্ত ভালোবাসা জেগে উঠেছিল।আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হবে যদি তুমি আমার জীবনের সঙ্গী হও।”

শেষে পুরো স্ক্রিন জুড়ে ফুটে উঠল,
-“ইয়াফা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি কি আমার হবে?”

❝— ফারাজ __❞

প্রতিটা ছবির সাথে ভেসে উঠসিলো ইয়াফার হাস্যজল মুখ।এই ছবিগুলি কে কখন তুলেছে ইয়াফা জানে না। ইয়াফার আশেপাশের মানুষ ওকে বিলবোর্ডে দেখে ইতিমধ্যে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে।ইয়াফা নিজেও আর নিজের অশ্রু ধরে রাখতে পারল না।তার হাত কাঁপছিল।তাকে কেউ গভীর ভাবে ভালোবাসতে পারে?তার স্বপ্ন মনে হচ্ছে।ঠিক তখনই রাস্তার অপর পাশ থেকে ফারাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার হাতে দামি ফুলের তোড়া ছিল আর তার চোখে ছিল আন্তরিকতা।ইয়াফার পিঠ ওর দিকে থাকায় ও ফারাজকে দেখতে পায়নি। ফারাজ ইয়াফার পিছনে হাঁটু মুড়ে বসলো। একহাতে ফুলের তোড়া আর অন্য হাতে একটা আংটি ধরে নরম কণ্ঠে ডাকলো,
-“ইয়াফা…”

ইয়াফা কণ্ঠ শুনেই বুঝলো পিছনে কে। ও ভয়ে ভয়ে পিছনে ঘুরে অবাক হয়ে থাকল ফারাজের দিকে। ফারাজ হাসিমুখে বলা শুরু করলো,

-“আমাদের খুব কম কথা হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি কথাই আমার কাছে অমূল্য। আমি কখনো তোমাকে চাপ দিতে চাইনি। শুধু চেয়েছি, যখন বলব, তখন তুমি বুঝতে পারো—এই ভালোবাসা সত্যি।ইয়াফা… আমি তোমাকে মন থেকে ভালোবাসি।তুমি কি আমার জীবনের সঙ্গী হবে?বিয়ে করবে আমাকে?”

চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ইয়াফা কাঁদতে কাঁদতে কিছুক্ষণ ফারাজের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু হেসে ফারাজের হাত থেকে ফুলগুলো নিলো আর নিজের বা হাত এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“জানেন হবু মেয়র সাহেব … আমিও আপনাকে অনেক আগে থেকেই ভালোবাসি।কিন্তু সাহস পাইনি বলতে।আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আপনি শুধু মেহেকের বান্ধবী হয়েই মজা করতেন ।আজ আপনি আমার মনের কথাটাই বলে দিলেন।হ্যাঁ, ফারাজ… আমিও আপনাকে ভালোবাসি।খুব করে ভালোবাসি ”

ফারাজ ধীরে ধীরে ইয়াফার হাতের অনামিকা আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দিলো। চারপাশে উপস্থিত মানুষ করতালিতে ফেটে পড়ল।দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল মেহেক আর উৎস। মেহেক আবেগে কেঁদে বলল,
-“আমি জানতাম ইয়াফা ভাইয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু ভাইয়াও যে ওকে পছন্দ করে বুঝিনি।”

উৎস বলল,
-“দুজনেই শুধু অপেক্ষা করছিল।”

মেহেক অবাক হয়ে বলল,
-“আপনি জানতেন ভাইয়া ওকে পছন্দ করে?”

উৎস উত্তর দিলো না।চুপচাপ মেহেককে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো।কিন্তু বিলবোর্ডে ফারাজের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ায় ইয়াফার বাবা-মার কানেও এসব পৌঁছে যায়।মান সম্মান বাঁচাতে দুই পরিবারের কথার মাধ্যমে বিয়ে ঠিক করা হয়।ফারাজ মেয়র হলেই ওদের চার হাত এক করে দেওয়া হবে।আর এই সবটাই উৎসর জন্য সম্ভব হয়।প্রথমে সাদিফ তারপর সিজান এরপর ফারাজ সবার বিয়ে হতে সেই সাহায্য করে কিন্তু তার বিয়ে লাপাত্তা।এই দিকে বাকিদের কারো সিরিয়াস নেই।সিরিয়াস হবে কিভাবে সে চায় পালিয়ে বিয়ে করতে আর মেহেক পালিয়ে বিয়ে করতে নারাজ এতে সবাই ক্ষেপে যাবে তাদের উপর।এই জন্য উৎসও বিয়ে করতে পারছে না তার একটাই জেদ পালিয়ে বিয়ে করবে।পালিয়ে বিয়ে করার মজাই অনেক নাকি তার ভাষ্যমতে!

মেহেক মুখ ফুলিয়ে ধীর পায়ে উৎসর ঘরে ঢুকল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমানের ছাপ। ঠোঁট দুটো ফুলে আছে, ভ্রু কুঁচকে আছে, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা না বলা অভিযোগ নীরবে প্রকাশ পাচ্ছে। দরজার কাছে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করল হয়তো উৎস একবার তাকাবে, হয়তো জিজ্ঞেস করবে,
-“কী হয়েছে?”

কিন্তু উৎস নিজের কাজেই ব্যস্ত। তার দৃষ্টি কাগজপত্র আর ল্যাপটপের পর্দায় আটকে আছে। মেহেক যে ঘরে এসেছে, যে অভিমান নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে যেন তার কোনো খেয়ালই নেই।
অপেক্ষা ধীরে ধীরে কষ্টে বদলে গেল। মেহেক নিঃশব্দে গিয়ে বিছানার এক কোণে বসে পড়ল। মুখটা আরও গোমরা হয়ে গেল, চোখের কোণে জমল অপ্রকাশিত অভিমান। সে ইচ্ছে করেই কোনো কথা বলল না। মনে মনে ভাবল,
– “একবারও কি আমার দিকে তাকানোর সময় নেই আপনার?আমার থেকে কাজ বড়ো?”
ঘরের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল। একদিকে উৎস নিজের জগতে ডুবে রইল অন্যদিকে মেহেকের নীরব অভিমান ধীরে ধীরে ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ল।অবশেষে মেহেকের ক্রোধ বেড়ে গেলো।উৎস বুঝতে পেরেছে মেহেক এসেছে কিন্তু সে টেবিলে মুখ করে মনোযোগ দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।মেহেক উৎসর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। উৎস তাকায় না।

-“উৎস ভাই”

-“যা বলতে এসেছিস বলতে পারিস।”

-“আমি এসেছি।”

-“হুম দেখেছি।”

মেহেক রাগে ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল।
-“কী হয়েছে? ”

-“আজকে কয় তারিখ।”

উৎস স্বাভাবিক ভাবে বলল,
-“এপ্রিলের পাঁচ তারিখ।”

মেহেক নাক ফুলিয়ে বলল,
-“আজকে কী?”

উৎস একটু ভেবে বলল,
-“গত বছর এই দিনে পাশের বাড়ির দাদি মারা গিয়েছিল।”

মেহেক অবাক হয়ে আবার বলল,
-“আমি মৃত্যু বার্ষিকী কথা বলি নাই।অন্য কিছুর কথা বলেছি।”

-“আমি জানি না তুই বলে দে।”

-“তা থাকবে কেনো আমি তো আপনার কেউ না।আমার জন্মদিন ছিলো আজ সবাই মনে রেখেছে উইশ করেছে,দোয়া করেছে আর আপনি সারাদিন বাসায় ছিলেন না।”

-“আজকে তোর জন্মদিন ছিলো?আচ্ছা যা দোয়া করে দিলাম তোর ভবিষ্যত সুখের হোক।”

-“ভবিষ্যৎ এমনিতেও সুখের হবে।এখন অন্য কিছু দেন।”
বলেই মেহেক হাত পাতে।
উৎস মেহেকের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“খুচরা পয়সা নেই।”

মেহেক হা হয়ে তাকায়।
-“আমি খুচরা পয়সা চাই নি।”

-“ওহ চাসনি, আমি ভাবলাম রাস্তার মানুষদের সাহায্য করে দোয়া নিবি তাই হাত পেতেছিস।”

-“সবাই আমাকে অনেক গিফট দিয়েছে এবার আপনি দিন।”

-“যাকে তাকে আমি গিফট দেই না।দিলে আমার বউকে দিবো।”

-“আমি তো আপনার হবু বউ।”

-“হবু বউ দিয়ে বাসর করতে পারব?পারলে আয় করি তারপর গিফট নে।”

মেহেক লজ্জা পেয়ে বলল,
-“ছি কিসব কথাবার্তা!”

-“গিফট চাই তোর”

-“হুমম”

-“বল কী চাই।”

-“আপনাকে পার্মানেন্টলি ভাবে লিখে নিতে।”

উৎস একটু ঝুঁকে বলল,
-“আর ইউ সিউর?”

মেহেক মুচকি হেসে উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হুম”

উৎস চট করে মেহেকের হাত শক্ত করে ধরে নিলো।
-“তাহলে চল আজই সব খেল খাতাম করি।”

#চলবে