না চাহিলে যারে পাওয়া যায় পর্ব-১৫+১৬

0
495

#না চাহিলে যারে পাওয়া যায়
#পর্ব-১৫

জ্ঞান ফিরতে উঠে বসতে চাইলেই হাতে তীব্র ব্যাথা অনুভব করলো রুহি-
“উফফ!”
ব্যর্থ হয়ে আবার শুয়ে পড়লো। তখনই কানে এলো-
“আহ, উঠছো কেন? তোমার হাতে স্যালাইন চলছে। নড়াচড়া না করে শুয়ে থাকো নয়তো হাতে ব্যাথা পাবে।”
নিজের বাম হাতের দিকে তাকাতেই স্যালাইনের সুঁচ নজরে এলো রুহির। পুনরায় শুতে যেয়ে মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা টের পেতেই মাথা চেপে ধরলো ডানহাতে। হাতে এলো কপালের দিকের ব্যান্ডেজ। রুহি বারবার হাতিয়ে বুঝলো বেশ বড় ব্যান্ডেজ, চোখ কুঁচকে ফেললেই বড্ড ব্যাথা টের পাওয়া যাচ্ছে। রাযীন খানিকদূরে সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু করছিলো। মাঝে মাঝে রুহির পানে চেয়ে দেখছিলো। ও মাথায় হাত দিতেই উঠে এসে রুহির শিওরে এসে বসলো। হঠাৎ করে রাযীনের এমন ব্যবহারে হতচকিত রুহি নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলেও পারলোনা। রাযীন ওর বাহু ধরে আটকালো তারপর মাথা ধরে আলতো করে চেপে দিতে লাগলো। রাযীনের এমন আচরণে ভীষণ অবাক হলেও কথা বলার এনার্জি হলো না তার। খানিক বাদে রাযীনই জানতে চাইলো-
“তোমার কি হয়েছিলো বলো তো? এমন ভয়ংকর ভাবে পড়লে কি করে? কপালে তিনটে স্টিচ লেগেছে। অল্প সময়ের মধ্যে মেঝেতে রক্তের বন্যা। ভাগ্যিস নিয়াজ সাথে সাথে টের পেয়েছিলো। তা না হলে খবর ছিলো তোমার সেই সাথে আমাদের। কি হয়েছিলো বলবে? পা পিছলে গেছিলে নাকি?”
নিয়াজ নামটা কানে যাওয়ার সাথে সাথে রুহির কান খাড়া হলো। মনে করার চেষ্টা করলো কি হয়েছিলো। সেকি সত্যিই শুভকে দেখেছিলো নাকি চোখের ভুল? শুভ এখানে কি করে আসবে? ও তো বলেছিলো ওর কেউ নেই, এতিম ছেলে। তাহলে? বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না, মাথা ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে উঠলো। রাযীনর আলতো হাতের স্পর্শও ভীষণ ব্যাথা দিচ্ছে, বিরক্ত লাগছে।
“জবাব দিচ্ছ না যে?”
রাযীন পূনরায় জানতে চাইতেই রুহি অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকালো-
“কি হয়েছিলো জানি না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথা ঘুরে উঠলো।”
“ওহহহ।”
“গলা শুকিয়ে গেছে একটু পানি দেবেন?”
“কিন্তু স্যালাইন চলছে যে?”
রাযীনকে একটু দ্বিধাগ্রস্থ দেখায়। জীবনে প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতিতে পড়ে নিজেকে অসহায় লাগছে রাযীনের। এই মেয়েটার সাথে গত পনেরোদিন ধরে সকাল বিকাল ঝগড়া করতে করতে কেমন একটা বাজে অভ্যাস হয়ে গেছিলো। এখন মেয়েটাকে এমন অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে কিছুতেই ভালো লাগছে না। নিজের ভেতর অস্থিরতা টের পাচ্ছে বেশ ভালো ভাবেই। রুহি হাত দিয়ে দেখালো-
“সামান্য একটু দিন। এই এতোটুকু।”
রাযীন হেসে দিলো রুহির কথা বলার ভঙ্গিতে। উঠে এসে চামচে করে অল্প একটু পানি নিয়ে রুহির ঠোঁটে ঠেকালো।
“থ্যাংক ইউ।”
“ইউ আর ওয়েলকাম।”
রুহি রুমের চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হলো। এটা তো রাযীনের রুম নয়। তাহলে?
“আমরা কোথায় আছি?”
“হাসপাতালে। রুম দেখে বুঝতে পারছো না?”
“হাসপাতালে!”
“বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছো আজ। কি রক্ত বাবারে বাবা। তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালে না আনলে কি হতো ভাবাই যায় না।”
রুহি হতবাক হয়ে রাযীনের দিকে তাকিয়ে রইলো। এমন ভয়ংকর ভাবে পড়েছিলো নাকি সে? বুঝতে পারেনি তো? কিছু সময় চিন্তিত হয়ে সামনে ঝোলা সাদা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলো। রা্যীন ফিরে এসে রুহির পাশে বসতে গেলো রুহি বললো-
“থাক আর মাথা টিপতে হবে না। এমনিতেই অনেক ঝামেলা দিয়েছি আপনাকে। আপনি বরং আপনার কাজ করুন।”
“আরে সমস্যা নেই।”
“না প্লিজ। আমি এখন একটু শোব।”
রুহি হাত দেখাতেই রাযীন থমকে গেলো-
“বেশ।”
রাযীন পূনরায় সোফায় ফিরে গেলো। ল্যাপটপে কাজে মন দিতেই রুহি ডাক শোনা গেলো-
“শুনুন, কয়টা বাজে এখন?”
“বিকেল চারটা। কেন বলতো?”
“বিকেল! সারাদিন পার হয়ে গেছে?”
রুহি বিস্মিত কন্ঠে জানতে চাইলো। রাযীন নরম কন্ঠে বলে-
“হ্যা, সারাদিন ঘুমিয়েছো। এখন আবার ঘুমাবে ওষুধের কারনে।”
“ওহহহ।”
“আচ্ছা একটা কথা বলবেন?”
“হ্যা বলো।”
রাযীনের কন্ঠ ততটাই নরম যতটা হওয়া সম্ভব।
“নিয়াজ সম্পর্কে একটু বলুন তো।”
“নিয়াজ!”
রাযীনের কন্ঠে বিস্ময়-
“হ্যা, আপনার ছোট ভাই তো?”
রাযীন মাথা নাড়ে-
“কেন জানতে চাইছো বলতো?”
রুহি চোখ বুঝে ক্লান্ত গলায় বললো-
“থাক বাদ দিন পরে কোন এক সময় শুনবো। এখন একটু ঘুমাই।”
রাযীনের চেহারায় চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। সেই সময় সামনে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠতেই রেখা মিলিয়ে গেলো আস্তে আস্তে। সে রুহির দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো তারপর মোবাইল নিয়ে বেড়িয়ে এলো।

★★★

“বাবা, এতোদিন কোথায় ছিলি বলতো? এতোগুলো বছর নিরুদ্দেশ থাকলি কি করে? মাকে একবারের জন্যও মনে পড়েনি?”
শুভ হাসলো শিখার কথায়। মনটা অন্যদিকে পড়ে আছে, মায়ের প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছে না করলেও অনিচ্ছায় মুখ খুলে-
“মনে পড়বে না কেন মা? তবে আমি তো কখনো তোমার অতোর কাছের ছিলাম না। মনে করে দেখো বাসায় থাকতেও তোমার সাথে আমার দেখা হতো কদাচিৎ। আমি আমার জগতে ব্যস্ত তুমি তোমার জগতে। আমরা সবাই একসাথে থেকেও আলাদাই ছিলাম মা। তাই দূরে গিয়ে তোমাদের কথা আমার তেমন মনে পড়েনি। বরং সত্যি বলতে আমি ভালোই ছিলাম একা একা।”
শিখার ছেলের কথা শুনতে শুনতে চোখ ছলছল করে। অভিমানি কন্ঠে বলে-
“ভালোই ছিলি তবে ফিরলি কেন? না ফিরলেই হতো।”
“নিজের প্রয়োজনে ফিরলাম মা। আমার খুব দামী একটা জিনিস এখানে আছে তাই ফিরতে বাধ্য হলাম বলা যায়।”
শুভর শ্বাস গভীর হলো। মনটা চঞ্চল হয়ে আছে। কখন দেখবে তাকে? এখন কেমন আছে ও? জানার তৃষ্ণা বাড়ছে। হাসপাতালে দেখতে যেতে ইচ্ছে করলেও চক্ষু লজ্জায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিখা অবাক হয়ে ছেলেকে দেখছে-
“দামী জিনিস! কি সেটা?”
“আছে কিছু একটা সে তোমার না জানলেও চলবে। আচ্ছা ওসব কথা বাদ দাও। একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। বড় আব্বুর এমন অবস্থা হলো কি করে?”
শুভর চোখে সন্দেহ খেলে যায়। মাকে খর চোখে পর্যবেক্খন করে। শিখা ঠোঁট উল্টায়-
“কি করে বলবো বলতো? গলায় ব্যাথা বলে অনেকদিন বলছিলো। টেস্ট করে ক্যান্সার ধরা পড়লো চিকিৎসার মাঝেই হঠাৎ একদিন স্ট্রোক করলো।”
শুভ চুপচাপ বসে শুনলো। মৃদু হাসলো-
“তোমরা তাহলে ভালোই আছো এখন। বড়আব্বু অসুস্থ, বড়মা উদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায়। সংসারে এখন তুমিই সব।”
“সে তুই ঠিকই বলেছিস। এই সংসার এখন আমাকেই দেখতে হয়। বড় ভাবি খায় দায় ঘুমায় কোথায় কি হচ্ছে তার কোন খবর রাখে না।”
শিখার কন্ঠে খুশির আভাস লুকোয় না। শুভ উঠে দাঁড়ালো-
“রাজ ভাইয়া হঠাৎ ফিরে এলো যে? কোন বিশেষ কারন আছে কি?”
“কারনটা যে কি সেটা এখনো বুঝতে পারছি না। তবে এবার এসে বিজনেসে নজর দিতে চাইছে। হয়তো বিজনেসের ভার নিতে চায়। তোর বাবা অবশ্য বলেছে, দরকার কি? তুমি দেশে থাকোনা তোমার কেন বিজনেস দেখতে হবে। আমরা তো আছিই দেখার জন্য।”
“ওহহহ। আর এতোদিন বাদে বউ ফেরত আনাটা, সেটা কি?”
“জানিনা বাপু। মাঝে একদিন দেখলাম উকিল এলো ভাইজানের কাছে। তার কিছুদিন পরেই রাজ দেশে ফিরলো। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে বউ ফিরিয়ে আনলো। এদিকে কানাঘুষা শুনতে পাই ওখানে নাকি কোন মেয়ের সাথে লিভ টুগেদার করে।”
মায়ের কথা শুনতে শুনতে শুভ দাঁতে দাঁত চাপে। চোখের সামনে সকালের দৃশ্য ভেসে উঠলো। রুহিকে কোলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গাড়ির দিকে ছুটছে রাজ ভাই। গায়ের রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিলো শুভর। তার রুহিকে রাজ ছুয়ে দিচ্ছে ভেবে তখনই ইচ্ছে হচ্ছিলো রাজের হাত ভেঙে দিতে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে বাধ্য হয়ে সব সইতে হলো। এখন সেসব ভেবে আনমনা হয়ে যাচ্ছে শুভ। তাকে এখানে দেখে রুহির রিয়্যাকশন যে খুব খারাপ হবে তাতে সন্দেহ নেই। ওর জন্যই রুহির এ অবস্থা সেটাও বেশ বুঝতে পারছে। শুভ মনে মনে প্রার্থনা করে রুহি যেন ওকে ভুল না বুঝে। কোন উল্টো পাল্টা ডিসিশন না নেয়। একবার যেন শুভর কথা মন দিয়ে শোনে। যাকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিলো তাকে কি করে অন্য কারো হতে দেখবে? রুহি যেন বোঝে শুভও নিরুপায় হয়ে এখানে এসেছে। অসহায় বসে থেকে রুহিকে অন্যের হতে দেখা সম্ভব না শুভর পক্ষে।

চলবে—
©Farhana_Yesmin

#না চাহিলে যারে পাওয়া যায়
#পর্ব-১৬

দু’দিন পর হাসপাতাল থেকে ছুটি হলো রুহির। পুরোপুরি সুস্থ না তবে বাসায় থাকতে পারবে পর্যাপ্ত রেস্ট করার শর্তে। সেলাই শুকাতে সময় লাগবে সে পর্যন্ত সাবধানে থাকতে হবে। আসলে হাসপাতালে থাকতে ভালো লাগছিলো না রুহির। রাযীন নিজের কাজ ফেলে ওর কাছে বসে থাকছে এটা দেখে ওর কেমন যেন অসস্তি লাগছিলো৷ রাযীনের ব্যবহারে ব্যপক পরিবর্তন দেখে অবাক কম হয়নি রুহি। প্রয়োজনে যতবার ডেকেছে রাযীন একডাকে সারা দিয়েছে। রা্যীনের কাঁধে ভর দিয়েই বাথরুম সেরেছে, খাবার খেয়েছে। এই লোক এতটা ধৈর্য্যশীল সেটা আগে ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি। এখন সচক্ষে দেখে বেশ অবাকই লাগছে। এতোদিন মনে হতো এই লোক ঝগড়া ছাড়া আর কিছু জানে না। এখন মনেহচ্ছে যতটা দেখায় ততটাও খারাপ না লোকটা।
“নামো।”
রুহি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো শশুর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়ানো। ওর আসার খবর পেয়েই হয়তো রোজী আর মর্জিনা এসে দাঁড়িয়ে আছে।মর্জিনা গাড়ি থেকে ব্যাগগুলো নামিয়ে নিলো। রাযীন এগিয়ে এসে রুহিকে ধরলো। রোজীও এগিয়ে এলো-
“এসো বউমা। কেমন একটা ধকল গেলো তোমার বলো দেখি? ভুল বুঝতে পারেন এই ভয়ে তোমার বাবাকে কিন্তু জানাইনি বউমা। কি লজ্জার ব্যাপার হলো বলো দেখি?”
“লজ্জার কি আছে মা? এটাতো দূর্ঘটনা।”
“তা হোক। তোমার বাবা ভাবতে পারেন তার মেয়েটিকে আমরা দেখে রাখতে পারছি না। তুমি একটু কষ্ট করে তোমার শশুর এর সাথে দেখা করবে কি? ভীষণ পাগলামো করছেন তোমায় না দেখতে পেয়ে।”
“হ্যা মা, বাবার সাথে দেখা করবো এতে কষ্টের কি আছে? আমার পায়ে তো আর কিছু হয়নি, পা তো ঠিকই আছে।”
“তবুও মাথার আঘাত তো বেশ ভালোই ছিলো।”
রোজী কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলো। রুহি আশেপাশে ঘাড় ফিরিয়ে কাউকে খুঁজলো যেন-
“কি দেখছো এমন করে? তুমি কি কাউকে খুঁজছো?”
“আজ ছোটমাদের কাউকে দেখছি না যে?”
“নিয়াজের বাড়ি ফিরে আসা উপলক্ষে সবাই মিলে নানা বাড়ি গেছে ওরা। যেতে চাইছিলো না অবশ্য। আমিই বললাম সবার সাথে দেখা করে আসার জন্য।”
“ওহহহ।”
রুহি আশাহত হয়ে উত্তর দিলো। বুকের ভেতরটা অস্থিরতায় লাফাচ্ছে, মনের মধ্যে জমে থাকা কৌতূহল শান্ত হয়ে তিস্টাতে দিচ্ছে না। নিয়াজই কি শুভ কিনা এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা ভীষণ জরুরি ওর জন্য। কিন্তু রাযীনকে এতো প্রশ্ন করে ওর মনে সন্দেহ জাগতে পারে। শিওর না হয়ে আগেভাগে রাযীনকে কিছু বুঝতে দিতে নারাজ রুহি। চিন্তায় চিন্তায় মাথাটা ছিড়ে পড়ার যোগার। নিজেকে অনেক কষ্টে শান্ত রাখছে সে। কিভাবে সেটা নিজেও জানে না। মনের চঞ্চলতা নিয়ে শশুরের সাথে দেখা করে দ্রুত নিজের রুমে ফিরলো। এতটুকুতেই কেমন যেন ভীষণ ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। রুহি বিছানায় শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর চোখ মেলতেই দেখলো রাযীন বাথরুমে গেলো নিজেকে ফ্রেশ করতে। রুহি কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করলো। মনে করার চেষ্টা করছে শুভ কখনো এমন কিছু কি করেছে যাতে বোঝা যায় সে এ বাড়ির সন্তান? যতদূর মনে পড়ে শুভ সবসময় খুব সাধারণ ভালো চলাফেরা করেছে। নিজে টিউশন করেই নিজের খরচ জোগাড় করেছে। পড়ালেখায় বরাবরই শুভ ভালো বলে পাশ করে বেরুনোর সাথে সাথে ব্যাংকে চাকরি হয়ে গেলো। তার কিছুদিন পরে রুহির চাকরি হলো। শুভ আগে হোস্টেলে থাকলেও চাকরি পাওয়ার পর একটা দুরুমের ফ্ল্যাট ভাড়া নিলো ওর আরেক কলিগের সাথে শেয়ারে। নাহ, সন্দেহজনক কিছু মনে পড়লোনা। শুভ নিজেকে এতিম দাবী করেছিলো তাহলে এই বাড়িতে এলো কি করে? নাকি অন্য কাউকে শুভ বলে ভুল করেছে? সারাক্ষণ মাথায় শুভর ভাবনা থাকে এইজন্যই হয়তো শুভকে দেখেছে। রুহি মাথা নেড়ে শুভর ভাবনা দূর করতে চাইলো।

“এতো কি ভাবছো বলো তো? দু’দিন ধরে দেখছি যতক্ষণ সজাগ থাকো গভীর ভাবে কিছু ভেবে চলেছো। এনিথিং সিরিয়াস? চাইলে আমার সাথে শেয়ার করতে পারো। চাকরিতে কোন ঝামেলা হচ্ছে কি?”
রুহি চমকে চোখ মেলে দেখলো রা্যীন দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। স্নান সেরে বাইরে যাওয়ার পোশাক পরে নিয়েছে। ডিপ গ্রিন কালারের শার্ট আর অফ হোয়াইট গ্যাভার্ডিন প্যান্টে রাযীনকে খুব স্মার্ট দেখাচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। গা থেকে ভুরভুর করে পারফিউমের সুবাস বেরুচ্ছে। চুলগুলো ভেজা ভেজা একদম স্নিগ্ধ অনুভূতি হলো রাযীনকে দেখে। রুহি তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। রাযীন চোখ নাচাতেই রুহি ভ্রু কুঁচকে উঠে বসলো-
“কোথাও বেরুচ্ছেন?”
“হ্যা, অফিসে যাচ্ছি। দু’দিন যাইনি আজ যেতে হবে। আমার একটা প্রজেক্টে ঝামেলা হয়েছে তাছাড়া আজ অফিসে ছোটআব্বু আর ভাইয়া কেউই নেই। তুমি দুপুরে খেয়ে মেডিসিন নিয়ে নিয় কেমন? একা থাকতে সমস্যা হলে মর্জিনাকে ডেকে নিয়।”
“আচ্ছা। একটা কথা জানার ছিলো আমার। এখন প্রশ্ন করবো না পরে?”
“কি জানতে চাও?”
“নিয়াজ কে?
রাযীন আয়নার দাঁড়িয়ে চুলগুলোতে আবার ব্রাশ চালায়। রুহির প্রশ্ন শুনে ওর হাত থেমে যায়, ঘুরে দাঁড়িয়ে রুহির দিকে তাকালো গুরুগম্ভীর ভাবে-
“গতদিনও জানতে চেয়েছিলে। কি ব্যাপার বলোতো? তুমি কি আগে দেখেছো ওকে? তোমার চেনা?”
“চেনা কিনা কিভাবে বলবো? দেখিনি তাকে, সেদিন সকালে সবাই দেখলাম তার জন্য ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। সেই কিউরিওসিটি থেকে জানতে চাইছি।”
রাযীন হাসলো-
“তাই বলো। আসলে নিয়াজও আমার মতো পলাতক ছিলো কিনা সেই জন্যই ওকে নিয়ে এতো ব্যস্ততা।”
“মানে?”
“মানে ও সবসময় একটু ঘরকুনো ছিলো, নিজের মতো থাকতো। ইন্টার পাশ করার পরে একদিন ঘর ছেড়ে কোথায় যে গেলো আর বাড়ি ফিরলো না। অনেক খোঁজ করেও ওর হদিস পাওয়া যায়নি। ওই যে বলে না, যে নিজ থেকে হারিয়ে যেতে চায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না ওইরকম ব্যাপার আর কি। সেই ছেলে এবার আচমকা এসে হাজির। এখন বুঝতে পারছো তো কেন ওকে নিয়ে ব্যস্ততা?”
“আপনারা সব ভাই কি তবে তার ছিড়া? ঘর পালানো রোগের রোগী?”
রুহির মুখ থমথমে। ওর কথা শুনে রাযীন হো হো করে হাসলেও রুহির মুখেচোখে হাসির লেশমাত্র নেই। সে মুখচোখ শক্ত করে বসে আছে।
“তা বেশ বলেছো। বলে গরীবের ঘোড়া রোগ আর বড়লোকের খোঁড়া। আচ্ছা আমি আসি, ফিরতে রাত হবে আমার।”
“আমাকে বলছেন কেন? আপনার স্প্যনীশ গার্লফ্রেন্ডকে বলুন।”
রাযীন মনভোলানো হাসি দিলো-
“রাগছো কেন? ওর সাথে তো পথে যেতে যেতে কথা হবেই।”
রাযীন চোখ টিপে বেড়িয়ে গেলো। রুহি রাগে ফুঁসতে লাগলো, মাথা থেকে যেন ধোঁয়া বেরুচ্ছে। নিয়াজই তবে শুভ? কিভাবে পুরোপুরি শিওর হবে চোখে না দেখে? বেশি টেনশনে রুহির মাথা ব্যাথায় টনটন করছে। না পারতে আবার বিছানায় গড়িয়ে পড়লো রুহি। অনিচ্ছায় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।

কতোক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না, হঠাৎ কানের কাছে ফিসফিস শুনে রুহির ঘুম ভাঙলো। কেউ একজন কোমল গলায় ওর নাম ধরে ডাকছে, কপালে আলতো হাতে নরম স্পর্শ দিচ্ছে। রুহি তাকাতেই মুখটা ওর উপর ঝুঁকে গেলো। আবছা আলোয় স্পষ্ট বোঝা না গেলেও পুরুষ আয়বর বুঝতে অসুবিধা হলোনা। হঠাৎ ভয়,পেয়ে চিৎকার করবে এমন সময় শোনা গেলো-
“রুহ, আমি শুভ। এখন কেমন লাগছে তোর? খুব বেশি ব্যাথা পেয়েছিস, তাই না?”
“শুভ! সত্যিই তুই শুভ! তুইই কি নিয়াজ?”

চলবে—
©Farhana_Yesmin