#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|২৩|
পুরনো ঘা’এ খোঁচা লাগলে সেখান থেকে রক্তক্ষরণ বেশি হয়। যেমন হচ্ছে এখন সুজানার মা বাবার। বৃদ্ধ দুজন মানুষের মেয়ের শোকে পাগল পাগল অবস্থা। শুকিয়ে যাওয়া চোখ মুখ নিয়ে উনারা এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। আদিদ প্রথমে ভেঙ্গে পড়লেও হসপিটালে এসে উনাদের দেখে সে নিজেকে সামলে নেয়। এই মানুষগুলো-কে দেখে সে নিজের মনে সাহস তৈরি করে। সত্যের মুখোমুখি তো হতেই হবে। সে নিজেকে শক্ত করে সুজানার মা বাবার কাছে গিয়ে বসে। উনাদের বোঝায়। মনে আশ্বাস দেয়। জানে এসব কিছুই কাজে দিবে না। যতই হোক, মা বাবা তো। এতদিন তো উনারা এই ভেবে বেঁচে ছিল যে, তাদের মেয়ে হারিয়ে গিয়েছে, একদিন হয়তো ঠিক ফিরে আসবে। কিন্তু আজ, আজ এই মানুষগুলো আর কী ভেবে বেঁচে থাকবেন যখন উনারা শুনবেন এটা উনাদের মেয়ের’ই ক*ঙ্কা*ল…?
.
.
সুজানার মা বাবার কাছ থেকে ডি এন এ সিম্বল নেওয়া হয়। এই সিম্বল এর সাথে ঐ ক*ঙ্কা*লের সিম্বল মিললেই ধরে নেওয়া হবে ঐটা সুজানার’ই ক*ঙ্কা*ল। বৃদ্ধ মানুষগুলো ভয়ে গুটি শুটি মেরে বসে আছেন। হয়তো মনে মনে দোয়া করছেন, যেন সিম্বল না মিলে।
_______________________
শহর থেকে অনেকটা ভেতরে আসার পর পদ্মদের গাড়িটা থামল। এতটা পথ আসতে আসতে পদ্ম’র কিছুটা চোখ লেগে গিয়েছিল। গাড়িটা থামতেই সে পিটপিট করে তাকাল। বোঝার চেষ্টা করলো কোথায় আছে তারা। কিন্তু চারদিক এত অন্ধকার যে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে। আরাফাত গাড়ি থেকে নামল। তারপর পদ্ম’র পাশের দরজাটা খুলে বললো,
‘নামো পদ্ম।’
পদ্ম আস্তে করে নামল। বিস্ময় নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো,
‘আমরা কোথায় এসেছি?’
আরাফাত হাসল। বললো,
‘তোমার কাঙ্খিত স্থানে। চলো।’
পদ্ম বুঝতে পারলো না। চারদিক ভীষণ নীরব। কোথাও তেমন কোনো সাড়া শব্দ নেই। কেবল কোথা থেকে যেন একটা অদ্ভুত পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। আর তাছাড়া তাদের গাড়ি ছাড়া এখানে আর কোনো গাড়িও নেই। বাকিরা কোথায়, এখনো আসেনি? পদ্ম আরাফাত-কে বললো,
‘আচ্ছা, বাকিরা এখনও আসেনি? মা, বাবা কাউকেই তো দেখছি না।’
‘আছেন। উনারা ভেতরে গিয়েছেন। চলো তুমি।’
পদ্ম’র ভীষণ অদ্ভুত লাগল বিষয়’টা। নতুন বউকে রেখে সবাই ভেতরে চলে গেল? আশ্চর্য!
আরাফাতের পেছন পেছন পদ্ম কিছুটা এগিয়ে গেল। সামনে গিয়ে দেখল একটা পুরোনো কাঁচা দালান। কেমন যেন দেখতে। একেবারে অপরিষ্কার আর অগোছালো। দু’তালার বারান্দায় মেয়েদের কিছু জামা কাপড় ঝুলানো। পদ্ম সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো,
“এভাবে কেউ কাপড় নাড়ে। দেখতে কেমন বিচ্ছিরি লাগছে।”
দালানের কাঠের দরজাটা খুলে আরাফাত বললো,
‘চলো, ভেতরে চলো।’
পদ্ম ইতস্তত কন্ঠে বললো,
‘আমাকে বরণ করবে না?’
‘হ্যাঁ, করবে তো। সবাই ভেতরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, চলোই না।’
পদ্ম অস্বস্তি নিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়াল। ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই সে যেন ভীষণ অবাক হলো। কিছু মেয়ে কেমন অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এখানের কাউকেই সে চিনতে পারছে না। আরাফাতের মা, বোন উনারা কোথায়। পদ্ম আরাফাতের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘উনারা কারা? উনারা সবাই আমার দিকে এভাবে কেন তাকিয়ে আছেন?’
‘উনারা হলেন আমাদের গ্রামের কিছু আত্মীয়-স্বজন। গ্রামের মানুষ তো তাই হয়তো নতুন বউ দেখে এইভাবে তাকিয়ে আছে।’
‘ওহহ আচ্ছা।’
পদ্ম হালকা হেসে সবাইকে সালাম দিল। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে কেউ তার সালামের জবাব দিল না। পদ্ম’র যেন ব্যাপার’টা কেমন লাগছে। তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। তাই সে আরাফাত-কে বললো,
‘মা কোথায়? মা-কে ডাকুন না, আমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’
‘আসলে, মা হয়তো রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। তুমি চলো না আমি তোমাকে আমার রুমে নিয়ে যাচ্ছি।’
পদ্ম’র কাছে সবকিছু যেন কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। বউ বরণ না করে উনি রান্নাঘরে কাজ করছেন? আর তার উপর এই মহিলাগুলোও কেমন অদ্ভুত। কেউ কোনো কথা বলছে না অথচ কেমন ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে।
পদ্ম ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে আরাফাতের পেছন পেছন হাঁটতে থাকে। নিচ তলায় একবারে কর্ণারের একটা রুমে আরাফাত পদ্ম-কে নিয়ে ঢুকল। রুমে ঢুকা মাত্রই যেন পদ্ম’র মনটা ভালো হয়ে গেল। কত ফুল দিয়ে সাজানো রুমটা। পদ্ম ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখতে লাগল। আরাফাত তখন তাকে বললো,
‘পদ্ম, তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। ঐ যে আলামারিতে তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু রাখা আছে। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।’
আরাফাত চলে গেলে পদ্ম রুমের দরজা আটকে দিয়ে আলমারির কাছে যায়। সেখান থেকে বেছে বেছে একটা কাঁচা হলুদ রঙের সুতি শাড়ি বের করে। সেটা নিয়েই সে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে।
.
.
আদিদের পুরো বাড়ি জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চলে। তবে সেই তল্লাশিতে আহামরি কিছু পাওয়া যায়নি। কেবল পাওয়া গিয়েছে দুই একটা মোবাইল যেগুলো স্টোর রুমে ছিল। আর পাওয়া গিয়েছে দুইটা পুরোনো ছবি। ছবি দুইটাতেই দুটো মেয়ের অস্পষ্ট মুখ দেখা যাচ্ছে। বাড়ি থেকে পুলিশ অফিসার অভিকে কল করে বলে, উনারা এই বাড়ির সবাইকে থানায় নিয়ে যাচ্ছেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। আদিদ আর সুজানার মা বাবাকে নিয়ে অভিও যেন থানায় চলে আসে। হসপিটালের টেস্টের ফাঁকেই অভি সবাইকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে থানার দিকে রওনা দেয়। অভি’রা থানায় গিয়ে পৌঁছাতেই দেখল আদিদদের বাড়ির দু’জন কাজের লোককে থানার একজন কনস্টেবল খুব বকাবকি করছেন। যেন উনারাই আসল আসামী। আদিদ বিরক্ত হয়ে তখন সেই কনস্টেবলের কাছে গিয়ে বলে,
‘উনাদের সাথে এমন করছেন কেন? উনারা কিছু করেননি।’
কনস্টেবল জবাবে বললো,
‘আপনি কী করে এত সিউর হচ্ছেন মশাই যে উনারা কিছু করেননি?’
‘উনারা আমাদের বাড়ির বিশ্বস্ত আর পুরোনো লোক, উনারা কিছু করেননি আমি জানি।’
‘বিশ্বস্ত লোকেরাই কিন্তু সবার আগে বিশ্বাস ভাঙ্গে, সেটা জানেন তো মি. আদিদ হোসেন?’
অফিসার বললো। আদিদ জবাবে বললো,
‘কিন্ত উনারা সত্যিই নির্দোষ।’
‘আপনার বাড়ি থেকে একটা ক*ঙ্কা*ল পাওয়া গিয়েছে। আরো পাওয়া গিয়েছে কিছু মোবাইল ফোন আর দুটো মেয়ের ছবি। আপনি বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা কতটা সিরিয়াস? এমন একটা সিচুয়েশনে আপনি কাউকে হুট করেই নির্দোষ বলে দিতে পারেন না। আগে আমাদের তদন্ত করতে দিন, তারপরই না বলতে পারবেন তারা আদৌ নির্দোষ কিনা?’
সবাইকে একে একে অনেক প্রশ্ন করা হলো। বেশি প্রশ্ন করা হলো আদিদ-কে। কারণ সুজানার হারিয়ে যাওয়ার আগে লাস্ট কথা তার সাথেই হয়েছিল।
এক থেকে দেড় বছরের আগের কেইস’টা আজ আবার রি ওপেন করা হয়েছে। প্রশাসন এবার যেন নড়ে চড়ে উঠল। আর তাতেই কপালে ঘাম ধরলো রুবি হোসেন আর আকবর সাহেবের। তবে উনারা এমন একটা ভাব ধরলেন যেন উনারা কিছুই জানেন না। এই ক*ঙ্কা*ল কার কিংবা এই মোবাইল ফোনগুলো, এই মেয়ের ছবিগুলো কোথা থেকে এলো, যেন সেই সম্পর্কে উনাদের বিন্দুমাত্র ধরাণা নেই। এমন একটা ভাব করছেন যেন এসব দেখে উনারা আকাশ থেকে পড়েছেন। কিন্তু কথায় আছে, সত্যকে হাজার চেষ্টা করেও ঢেকে রাখা যায় না। যেমনটা হয়েছে এখানেও।
রুবি হোসেন খুব কৌশলে অফিসারদের সকল উত্তর দিতে পারলেও, আকবর সাহেব ঠিকই মুখ ফসকে ভুল কথা বলে ফেলেন। যেখানে অফিসার রুবি হোসেনকে যখন জিগ্যেস করেন, সুজানার নিখোঁজ হওয়ার দিনে আকবর সাহেব কোথায় ছিলেন। তিনি তখন জবাবে বলেন, “বাসায়’ই ছিলেন।” আর অন্যদিকে আকবর সাহেবকে সেই একই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি নাকি ঐদিন কোনো এক অফিসিয়াল কাজে শহরের বাইরে গিয়েছিলেন। ব্যস, এখানেই লাগল খটকা। আবার আদিদের কথা শুনে অফিসার জানতে পারেন, সেদিন তার মা বাবা দুজনেই বাসায় ছিলেন। আর আদিদ ছিল হসপিটালে। তো সব মিলিয়ে অফিসারের সন্দেহের তীর গিয়ে বিঁধল এবার আদিদের বাবার উপর…
চলবে…
#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|২৪।
পদ্ম অনেকক্ষণ হলো রুমে একা বসে আছে। তার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। আরাফাত সেই কখন গিয়েছে এখনো তার আসার নাম নেই। এদিকে তার পরিবারের কেউও আসছে না। পদ্ম ভাবছে, একবার কি বাইরে গিয়ে দেখবে সে? এভাবে আর কতক্ষণ সে রুমে বসে থাকবে? খিদেও লেগেছে খুব।
পদ্ম ভাবনার মাঝেই হঠাৎ দরজায় কারো ঠকঠক আওয়াজ শুনতে পেল। সতর্ক গলায় বললো,
‘কে?’
‘পদ্ম, আমি। খুলো।’
আরাফাতের গলা চিনল সে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। আরাফাত তখন একটা খাবারের প্লেট নিয়ে ভেতরে ঢুকল। তারপর দরজা’টা আটকে দিয়ে পদ্ম-কে বললো,
‘তোমার নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে। খাবার নিয়ে এসেছি, খেয়ে নাও।’
পদ্ম একবার খাবারের দিকে তাকিয়ে আবার আরাফাতের দিকে তাকায়। নিচু সুরে বলে,
‘সবাই কি খেয়ে ফেলেছে?’
আরাফাত বললো,
‘সবার কথা আমি জানি না। মা তোমার জন্য খাবার পাঠিয়েছেন। বলেছেন খেয়ে দেয়ে রেস্ট নিতে।’
এখানের সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুত। পদ্ম’র মনটা খচখচ করছে। তাও সে নিজেকে এটা বলে বোঝ দেয় যে, “নতুন পরিবেশ তাই হয়তো তার এমন মনে হচ্ছে, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আরাফাত খাবারের প্লেট’টা পদ্ম’র হাতে দিয়ে বললো,
‘তুমি খাও, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
‘আচ্ছা।’
.
.
‘অফিসার, আপনার সমস্ত জিজ্ঞসাবাদ শেষ হয়ে থাকলে আমরা কি এখন বাড়ি যেতে পারি?’
অফিসার আড় চোখে আকবর সাহেবের দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
‘এত কিসের তাড়া আপনার?’
‘আরে আজব তো, কয়টা বাজে দেখেছেন? রাতে কি আমরা এখানেই বসে থাকবো? বাসায় যেতে হবে না আমাদের?’
অফিসারের মোটা ব্রু গুলো কুঁচকে এলো। বিরস মুখে বললো,
‘আজকে রাত’টা বরং এখানেই কাটান। একটু অভ্যাস করুন। এমনও হতে পারে, হয়তো বাকি রাতগুলো আপনার এখানেই কাটাতে হলো।’
আকবর সাহেব চটে গেলেন যেন। রাগি গলায় বললেন,
‘কী বলতে চান আপনি?’
‘কিছু না। আপাতত চুপচাপ এখানে বসে থাকুন। কাজ শেষ হলে আমরাই আপনাদের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করবো।’
‘কিন্তু আপ…’
‘বাবা থাক না। উনারা যখন বলছেন, আমরা আরো কিছুক্ষণ থাকি না এখানে। এমনিতেও বাসায় গিয়ে টেনশনে আমি থাকতে পারবো না। তার চেয়ে বরং এখানেই থাকি। এই সবকিছুর একটা সমাধান হোক। আমি আর নিতে পারছি না। আমাদের বাড়ি থেকে ক*ঙ্কা*ল, মোবাইল ফোন, ছবি…কী করে সম্ভব? আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে।’
অভি আদিদের কাঁধে হাত রেখে বলে,
‘শান্ত হ। এত হাইপার হলে তো মাথা ব্যথা করবেই। একটু শান্ত হয়ে বস, আমরা দেখছি ব্যাপার’টা।’
‘আমার কী মনে হয় বলতো, কেউ হয়তো আমাদের ফাঁসানোর জন্য এসব করেছে। আমার তো আবার শত্রুর অভাব নেই। আরে ঐ আই.বি.এস কম্পানি আছে না, ওরা তো আরো আগে থেকেই আমার পেছনে পড়ে আছে। আমার তো মনে হচ্ছে ওরাই এসব করেছে।’
‘তার মানে আপনি কী বলতে চান আংকেল, ঐ কম্পানির লোকেরা আপনার বাড়িতে ক*ঙ্কা*ল রেখে গিয়েছে আবার এই মোবাইল ফোন আর ছবিগুলোও ওরা’ই রেখেছে, তাই তো?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম তাই।’
অভি তপ্ত শ্বাস ফেলল। বললো,
‘এটা কি কোনো ভাবে সম্ভব আংকেল? কেউ আপনার বাসায় ঢুকে এত কিছু করে ফেলবে আর আপনি জানবেন’ই না? আমার তো মনে হয় না এমন কিছু হয়েছে। আমার তো মনে হচ্ছে, আপনাদের মধ্যেই কেউ এসব করেছে? আন্টি, আপনার কী মনে হয়?’
রুবি হোসেন আর আকবর সাহেব একজন অন্যজনের মুখের দিকে তাকালেন। রুবি হোসেন নাকের পাল্লা ফুলিয়ে ফোস ফোস করতে করতে বললেন,
‘তুমি আমাদের সন্দেহ করছো? আদিদ, শুনেছো তোমার বন্ধু কী বলছে?’
আদিদ চুপ থাকে। অভি বলে,
‘সন্দেহ তালিকায় আপনারা সবাই’ই আছেন। ইনফেক্ট আদিদ ও। যেহেতু এসব কিছু আপনাদের বাড়ি থেকে পাওয়া গিয়েছে তাই আপনাদের সন্দেহের তালিকায় রাখতেই হবে। কিছু করার নেই।’
আকবর সাহেব তখন তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
‘এসব দু টাকার গোয়েন্দার সন্দেহ তে আমাদের কিচ্ছু যাই আসে না। যত্তসব।’
আদিদ ব্রু কুঁচকে বললো,
‘বাবা, কী বলছো এসব?’
অভি কিঞ্চিত হাসল। বললো,
‘থাক আদিদ, বলতে দে। যে যাই বলুক, সত্য তো আমি ঠিকই খুঁজে বের করবো। ওহ, বাই দ্যা ওয়ে, তোদের বাড়িতে আজকে একটা বিয়ে গেল না? ঐ মেয়েটা এখন কোথায় আছে?’
রুবি হোসেন তখন ভড়কে গেলেন। উচ্চ স্বরে বললেন,
‘ওর খবর জেনে তুমি কী করবে? ও এখন ওর শ্বশুর বাড়িতে আছে।’
‘শ্বশুর বাড়ি কোথায়?’
‘তুমি এত কিছু জেনে কী করবে বলতো?’
পুলিশ অফিসার উনাদের কথা শুনে বলে উঠল,
‘আজ উনাদের বাড়িতে বিয়ে ছিল? কার বিয়ে?’
আদিদ বললো,
‘আসলে আমাদের বাড়িতে কিছুদিন যাবত একটা মেয়ে ছিল, উনার’ই আজ বিয়ে হয়েছে।’
অফিসার চোখ ছোট করে সন্দিহান গলায় বললো,
‘মেয়েটা আপনাদের কী হয়?’
‘উনি আমার পেশেন্ট ছিলেন। উনার একটা এক্সিডেন্টের পর উনি আমাদের হসপিটালে এসে ভর্তি হোন। উনি উনার মামা মামীর কাছে থাকেন। কিন্তু, সেই এক্সিডেন্টের পর উনি আর উনার মামা মামীর কাছে ফিরে যেতে চান না। কারণ, উনারা নাকি পদ্ম’র উপর খুব অত্যাচার করতো। তখন মা উনাকে দেখে, আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। তবে এতে উনার সম্পূর্ণ মত ছিল। আমাদের পক্ষ থেকে কোনপ্রকার জোর করা হয়নি।’
‘উনি যদি অত্যাচারের স্বীকার হয়ে থাকেন তবে আমাদের সাথে কেন যোগাযোগ করেননি? আপনারাই বা এভাবে অচেনা অজানা একটা মেয়েকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন কী করে? আর উনাকে বিয়েও দিয়ে দিলেন? মানে সবকিছু তো কেমন অদ্ভুত লাগছে। আজকাল পৃথিবীতে নিজের কাছের মানুষের জন্যই কেউ কিছু করতে চায় না আর আপনারা অপরিচিত একটা মেয়ের জন্য এত কিছু করলেন? ব্যাপার’টা বেশ ইন্টারেস্টিং! তা, মেয়েটা আছে কোথায় এখন? উনাকে ডাকতে হবে। যেহেতু উনি এতদিন আপনাদের বাড়িতে ছিলেন সেহেতু উনিও এই কেইসের সঙ্গে সম্পূর্ণ জড়িয়ে আছেন। উনার নাম্বার দিন, আমরা যোগাযোগ করবো।’
অস্থির হয়ে উঠলেন রুবি হোসেন। শেষ সময়ে এসে তারা নৌকা বুঝি এবার ডুবল। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
‘আরে, ওর আজকে মাত্র বিয়ে হয়েছে। সবে মাত্র মেয়েটা নতুন একটা জীবন শুরু করেছে, দরকার আছে ওকে এত ঝামেলার মধ্যে টানার?’
অফিসার হাসল। বললো,
‘বাহ, আপনার তো দেখছি ঐ মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তা। ভালো, চিন্তা থাকা ভালো। কিন্তু, আমাদের তো কিছু করার নেই, ডিউটির খাতিরে এখন আমাদের এসব করতেই হবে। উনাকে এখন এখানে আসতে হবে, আমাদের সাথে কথা বলতে হবে।’
‘কাল সকালে আসলে হয় না? এখন তো অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।’
‘কে বলতে পারে, দেখা যাবে কাল সকালে আবার হয়তো এই মেয়েটাও উধাও হয়ে গেল…সুজানার মতো। কি, হতে পারে না?’
অফিসারের কথা শুনে ভয়ে আকবর সাহেব আর রুবি হোসেনের মুখ চুপসে গেল।
আদিদের কাছ থেকে অফিসার পদ্ম’র ফোন নাম্বার নিল। ফোন দিয়ে দেখল, নাম্বার বন্ধ দেখাচ্ছে। অফিসার আদিদ-কে বললো,
‘নাম্বার তো বন্ধ দেখাচ্ছে।’
‘এক কাজ করুন, আমার কাছে উনার হাসবেন্ডের নাম্বার আছে, আপনি বরং উনার নাম্বারে কল দিন।’
আদিদ নাম্বার দিতেই অফিসার সেই নাম্বারে কল করলো। কিছুক্ষণ পর কল’টা রিসিভ ও হলো।
‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘আমি ইন্সপেক্টর রকিব বলছি, থানা থেকে। আপনি কি পদ্ম’র হাসবেন্ড বলছেন?’
ইন্সপেক্টরের কথা শুনেই আরাফাত ফট করে কল’টা কেটে দিল। অফিসার ফোন’টা হাতে নিয়ে কপাল কুঁচকে বললো,
‘কল’টা কেটে দিল কেন?’
অভি বললো,
‘আরেক বার কল করুন।’
অফিসার আরেকবার কল করলো। এবার ফোন নাম্বার বন্ধ দেখাচ্ছে। অফিসার অভিকে বললো,
‘নাম্বার বন্ধ।’
অভি বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তাড়া দিয়ে বললো,
‘নাম্বার’টা দিন। এক্ষুণি লোকেশন ট্র্যাক করতে হবে। নিশ্চয়ই কোনো ঘাপলা আছে, এমনি এমনি ও ফোন কাটেনি। এই আদিদ, পদ্ম-কে কোথায় বিয়ে দেওয়া হয়েছে? লোকেশন’টা বল আমায়।’
‘আমি তো জানি না। মা, তুমি কিছু বলছো না কেন? বিয়ে তো তোমরা দিয়েছো। আরাফাতদের বাড়ি কোথায়, কোথায় থাকে ওরা?’
রুবি হোসেন চোখ মুখ কুঁচকে বললেন,
‘আমি কী করে জানবো। আমাকে তো শুধু বলেছে, ওরা নাকি খিলক্ষেত থাকে। আর কিছু জানি না আমি।’
অভি তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
‘না জানলেও সমস্যা নেই। লোকেশন ট্র্যাক করতে দু মিনিট লাগবে আমাদের।’
‘তো যাও না, করো গিয়ে লোকেশন ট্র্যাক। এখানে বসে থাকতে কে বলেছে।’
‘করবো তো অবশ্যই। খালি একটা ভয় হচ্ছে আরকি এটা ভেবে যে, কান টানলে তো আবার মাথাও আসে।’
রুবি হোসেন আর আকবর সাহেব রাগে দাঁতে দাঁত পিষছেন। এই অভি যে তাদেরকেই সন্দেহ করছে সেটা আর উনাদের বুঝতে বাকি রইল না। এইদিকে উনারা বসে থেকে কিছু করতেও পারছে না। আরাফাতকে যে একটা ম্যাসেজ দিয়ে সতর্ক করবে সেই উপায়ও নেই। মোবাইল এখন সব পুলিশের কাছে। কিন্তু, এইভাবে হাত গুটিয়েও তো বসে থাকাও তো যায় না। এইভাবে বসে থাকলে তো তাদের এতদিনের ব্যবসা সব লাটে উঠবে…
রুবি হোসেন হঠাৎ কেমন যেন করতে লাগলেন। দু হাত নাড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলেন। আকবর সাহেবকে ইশারা দিতে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন,
‘এই আদিদ, দেখো না তোমার মা কেমন করছে।’
আদিদ মায়ের দিকে তাকিয়ে দ্রুত উনার কাছে গেল। উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
‘কী হয়েছে মা, এমন করছো কেন?’
‘আমার প্রেশার’টা মনে হয় বেড়েছে, আদিদ। এখনও ঔষধ খাইনি। তাই শরীর’টা খুব খারাপ লাগছে বাবা। মাথা’টা খুব ঘুরাচ্ছে। শ্বাস ফেলতেও কষ্ট হচ্ছে। বুকে চাপ লাগছে খুব।’
আদিদ তার মায়ের পালস্ চেক করে। অফিসার-কে ডেকে বলে,
‘আমার মায়ের বিশ্রাম প্রয়োজন। উনার হঠাৎ খুব শরীর খারাপ লাগছে। একটা রুমের ব্যবস্থা করা যাবে?’
রুবি হোসেন তখন অস্থির কন্ঠে বললেন,
‘আমাকে বাসায় নিয়ে চল না, বাবা। এখানে থেকে আমার আরো বেশি কষ্ট হচ্ছে।’
‘সরি ম্যাডাম, আপনি এখন বাসায় যেতে পারবেন না। আমাদের রেস্ট রুমে আপনার বিশ্রামের ব্যবস্থা করছি। আর যদি প্রয়োজন পড়ে তবে আমরা আপনার চিকিৎসার ব্যবস্থাও করবো, চিন্তা করবেন না। চলুন।’
রুবি হোসেনের শরীর রাগে রি রি করছে। কী ভেবেছিল আর কী হলো। বাধ্য হয়ে উনাকে রেস্ট রুমে পরে থাকতে হলো। এত অভিনয় করেও লাভের লাভ কিছুই হলো না, উল্টো এখন তাকে রুমে বন্ধী হয়ে পরে থাকতে হবে।
.
.
আরাফাতের লোকেশন ট্র্যাক করা হয়ে গিয়েছে। অফিসার তার কিছু সদস্য নিয়ে অলরেডি সেই জায়গার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে থানায় আকবর সাহেব আর রুবি হোসেন দুজনই চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন। এবার বুঝি সত্যি সত্যিই তাদের পতন ঘটল বলে…
চলবে…
#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
।২৫।
ট্র্যাক করা লোকেশনে গিয়ে কাউকে পাওয়া গেল না। জায়গা’টা শহর থেকে বেশ ভেতরে হওয়ায় পুলিশদের পৌঁছাতেও কিছুটা লেইট হয়ে গিয়েছে। উনারা এদিক ওদিক অনেক খোঁজা খুঁজির পর একটা পুরোনো দালান পেলেন। ভেতরে গিয়ে দেখলেন পুরো দালান শূন্য। তবে এখানে যে কিছুক্ষণ আগেও মানুষ ছিল সেটা আর উনাদের বুঝতে বাকি রইল না। রুমের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা জিনিসগুলো দেখে, খুব ভালো ভাবেই আন্দাজ করতে পারলেন যে, যারা ছিল তারা কিছুক্ষণ আগেই এখান থেকে বেরিয়ে পড়েছে। পুরো দালান সার্চ করার পর বেশ কিছু জিনিস উনারা জব্দ করেন। যার মধ্যে মেয়েদের জিনিসপত্র বেশি ছিল। একের পর খটকা লেগেই চলছে। আর অফিসারের সন্দেহও ক্রমে ক্রমে তীব্র হচ্ছে। অফিসার বেশ চিন্তিত কন্ঠে তার পাশের এ.এস.আই কে বললেন,
‘আমার তো মনে হচ্ছে ঐ আকবর সাহেব’ই কিছু একটা করেছেন। আর উনার স্ত্রীও হয়তো উনার সাথে জড়িয়ে আছেন। উনাদের কথাবার্তা খুব খাপছাড়া লেগেছে। দু’জনের কথা দু’রকম। এতদিন তো সুজানা ছিল, এখন আবার এই পদ্ম। এই মেয়েটার সাথেও মনে হচ্ছে সেইম ঘটনা ঘটেছে। আচ্ছা, উনারা কোনোভাবে নারী পা*চার চক্রের সাথে জড়িত নয় তো? হয়তো পদ্ম’র মতো মেয়েদের এইভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এসে পা*চার করে দেন।’
পাশের অফিসার’টি বললো,
‘হতে পারে স্যার। উনাদের হাব ভাব আমার প্রথম থেকেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। আমি বরং এসব কথা ইনভেস্টিগেটর অভিকে জানিয়ে দেই। উনি তখন সেখানে থেকে অন্য কোনো স্টেপ নিতে পারবেন।’
‘ঠিক আছে আপনি জানিয়ে দিন। তারপর আমরা এখান থেকে বেরুব। কেন জানি মনে হচ্ছে, ওরা হয়তো বেশি দূর যেতে পারেনি। আমাদের এগিয়ে দেখতে হবে। আপনি ফাস্ট কাজ করুন।’
‘ওকে স্যার।’
.
.
অভি কল’টা কেটে দিয়ে আদিদের কাছে গেল। গম্ভীর গলায় বললো,
‘আরাফাত বা পদ্ম কাউকেই উনারা খুঁজে পাননি। তুই আন্টিকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, উনি তাদের এক্সেক্ট লোকেশন’টা জানেন কিনা? নয়তো কিন্তু পরে প্রেশার তোদের উপর দিয়েই যাবে। একে তো সুজানার কেইস, এখন যদি আবার পদ্ম’র সাথেও সেইম জিনিস হয় তবে অফিসাররা কিন্ত আর তদন্ত করবেন ডিরেক্ট সবাই’কে জেলে ঢুকিয়ে রি*মা*ন্ডে নিবেন। বুঝতে পারছিস তো, আমি কি বলছি?’
আদিদ দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে পেছনে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। তারপর সে ঠোঁট কামড়ে কী যেন কিছুক্ষণ ভাবল। অতঃপর বললো,
‘আমি আমার মা বাবাকে খুব ভালোবাসি। এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরও আমি বলবো, উনাদের উপর আমার যথেষ্ট ভরসা আছে। উনারা তো সুজানাকে খুব ভালোবাসতেন। আর…আর পদ্ম-কেও তাই। আমার তো কোনোদিন কোনোকিছু ঐরকম ভাবে সন্দেহজনক লাগেনি। একবারের জন্যও মনে হয়নি আমার মা বাবা এসব করতে পারেন। তাহলে…তাহলে তুই হঠাৎ আমার মা বাবার পেছনে এইভাবে পরে আছিস কেন? অন্য কিছুও তো হতে পারে। হতে পারে সত্যিই এখানে অন্য কেউ আমাদের ফাঁ*সাচ্ছে। কি হতে পারে না? আর তুই তো দেখেছিস, মা অসুস্থ হয়ে পরেছেন। আর বাবাও কেমন স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। আমি নিজেও মানসিক ভাবে সুস্থ না। বারবার আমার দৃশ্যপটে কেবল ঐ ক*ঙ্কা*ল টা’ই ভেসে উঠছে। এত কিছুর মাঝে এখন আবার পদ্ম’র চিন্তা। বিশ্বাস কর, আর নিতে পারছি না আমি। মনে হচ্ছে এক্ষুণি স্ট্রোক করবো।’
আদিদ চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকে। অভি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সত্যিই তো, এই ছেলেটা আর কত সহ্য করবে? সুজানা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ছেলেটা স্বাভাবিক হতে পারেনি। এখনও তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। এত এত কষ্টের পরও নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজ আবার সেই পুরোনো কষ্টে বুকটা তার থরথর করে কাঁপছে। হয়তো আশেপাশে এত মানুষ না থাকলে সে এতক্ষণে কেঁদে চোখ ভাসাতো। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত সেটা এখন আর হয়ে উঠছে না।
অভি তার পাশে বসলো। নরম সুরে বললো,
‘প্রত্যেক’টা সন্তান’ই তার মা বাবাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে। আর এটাই স্বাভাবিক। আমি তোকে কষ্ট দেওয়ার মত কিছু বলতে চাই না। কিন্তু কী করবো বল? এই কেইস’টা এখন এমন একটা সিচুয়েশনে আছে যে, না চাইতেও এখন আঙ্গুল’টা তোদের দিকেই তুলতে হচ্ছে। তদন্তের খাতিরে এমন অনেক কিছু আমাদের করা লাগে যেটাতে আমাদের মন একেবারেই সাঁই দেয়না। কিন্তু, আমরা বাধ্য। আগে দায়িত্ব তারপর আবেগ। আমাকে ভুল বুঝিস না, দোস্ত। আমার কিছু করার নেই।’
আদিদ সোজা হয়ে বসলো। অভির পিঠে চাপড় মেরে বললো,
‘আরে না, আমি জানি এটা তোর ডিউটি। আর সত্যি বলতে তো আমিও চাই, আসল অপ*রাধী ধরা পরুক। তাদের কঠিন শাস্তি হোক। কিন্তু…মা বাবা-কে নিয়ে এসব কিছু আমি কল্পনাতেও ভাবতে পারবো না। আমার তখন বুক কাঁপে। মা বাবা-কে কেউ কি অপ*রাধীর চোখে দেখে বল?’
‘আর যদি মা বাবা সত্যি সত্যিই অপ*রাধী হয়ে থাকে, তখন?’
আদিদ চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে বলে,
‘জানি না আমি। প্লীজ, আমাকে আর এসব ব্যাপারে প্রশ্ন করিস না। আই কান্ট টলোরেট ইট এনিমোর।’
অভি কথা বাড়াল না। জবাবে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
____________________________
চোখের পাতা পিট পিট করছে। হয়তো সেটা খুলতে চাইছে। কিন্তু পারছে না। সেইটুকু শক্তিও যে শরীরে নেই। তাও পদ্ম থামল না। চেষ্টা চালিয়ে গেল। খুব কষ্টে সে পল্লব মেলে তাকাল। চারদিক তো অন্ধকার। কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে। মাথা ভার হয়ে আছে। মস্তিষ্ক ও তো কাজ করছে না। ঠোঁট নাড়াতে পারছে না। হাত আর পা ও যেন কেমন আষাঢ় লাগছে। সে এইটুকু বুঝতে পারছে তার শরীর দুলছে। আরেকটু সময় যাওয়ার পর সে বুঝতে পারলো, সে কোনো একটা গাড়িতে আছে। এবার তার স্নায়ুতে নাড়া পড়ল। সজাগ হলো মস্তিষ্ক। এবার টের পেল সে তার মুখ বাঁধা। আর তার সাথে তার হাত আর পা ও বাঁধা। সঙ্গে সঙ্গেই তখন তার মনে পড়ল তার কী হয়েছিল। সে তো খাবার খাচ্ছিল। আর খাবার শেষ করার পর পরই তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। বিছানায় হালকা হেলান দিয়ে বসেছিল সে। আরাফাতের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু, তারপরই হঠাৎ কী যেন হলো। সে ঘুমিয়ে পড়ল। আর তারপর আর কিছু মনে নেই। পদ্ম এবার ছটফট করতে লাগল। এবার তার মনে হচ্ছে, সে ভুল করে ফেলেছে, মারাত্মক ভুল। নিজের হাতে নিজের জীবন শেষ করেছে সে। সে খুব চেষ্টা করছে, কথা বলার জন্য। কিন্তু পারছে না আর সেটা সম্ভবও না। সে এবার নড়ে চড়ে উঠায় টের পেল সে এখানে একা নয়। এখানে আরো কেউ আছে। কিন্তু, অন্ধকারে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। ভয়ে শরীর যেন তার জমে যাচ্ছে। কারা আছে তার সাথে, কেউ তো কোনো কথাও বলছে না। আরাফাত ঠকিয়েছে তাকে। শুধু আরাফাত না ঐ রুবি হোসেন আকবর সাহেব, সবাই তাকে ঠকিয়েছে। এইসব কিছু উনাদের নাটক ছিল। পদ্ম নিরবে কাঁদতে থাকে। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে উঠেছে। তার মনে হচ্ছে তার শরীর যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। চোখগুলো যেন আবারও বুজে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝেই চোখ বন্ধ হয়ে গেল তার। হয়তো ভয়ে সে আবারো চৈতন্য হারিয়েছে…
চলবে…