#পুষ্পের_নিদ্র
#আনআমতা_হাসান
পর্ব : ১১
চোখ বাধা অবস্থায় একগুচ্ছ রাগ আর একরাশ অভিমান নিয়ে বধু বেসে নিদ্রের অন্ধকার রুমের খাটের মধ্যে বসে আছে পুষ্প। খুব ধুমধামে নিদ্র পুষ্প আর পল্লব রিমঝিমের এর হলুদ আর বিয়ে হয়। তার বিয়েতে এতোকিছু হবে তা সে কল্পনাতেও ভাবেনি। সে তো সব সময় ভেবেছে একদিন হুট করে তার রাগী বরটা রাগ নিয়ে তাদের বাসায় এসে সবার কথা অমান্য করে তাকে তার শশুর বাড়ি নিয়ে চলে যাবে। সে সেই মূহুর্তের জন্য নিজেকে তৈরিও রেখেছিল। তার খুশির আর একটা কারণ তার জানু রিমঝিম। এখন তার ভাবি। কিন্তু এতো এতো খুশির মধ্যেও তার রাগ আর অভিমানের কারন হলো আজকে তার জন্মদিন প্লাস তাদের এনিবাসারিও। সবাই তাকে উইশ করলো, গিফট দিল। পল্লব আর রিমঝিম মিলে তো শত ব্যাস্ততার মধ্যে কেকও কাটিয়েছে রাত বারোটায়। অথচ নিদ্র তাকে এখনো উইশই করেনি। গিফট তো দূরের কথা। জানে আজকে তাদের বিয়ে তাই সারাদিন নিদ্র অনেক ব্যস্ত ছিল। কিন্তু রাত ১২ টায় কেন উইশ করেনি? প্রতিবারই তো রাত বারটায় উইশ করে। পুষ্প রাত ১২ টা থেকে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত কতোবার যে ফোন চেক করেছে তার কোন হিসাব নেই। অথচ সারাটা রাতেও নিদ্র ওকে একটা ফোন বা মেসেজ দেয়নি। ঘড়ির ঠংঠং করে এগারো বার শব্দ করায় পুষ্প বুঝলো, এখন বাজে রাত এগারোটা। আর কিছুক্ষন পরই তো দিনটা শেষ হয়ে যাবে। অথচ এখনো নিদ্রের আসার নাম নেই। তার উপর চোখ বেদে একটা অন্ধকার রুমের খাটের উপর সাদিয়া ভাবি বসিয়ে দিয়ে গেছে। চারপাশে গোলাপ, রজনিগন্ধ, বেলি ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে। কিন্তু সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। ইচ্ছা করছে চোখের বাদনটা খুলে ফেলতে। কিন্তু সাদিয়া ভাবি বলে গেছে নিদ্র বলেছে তার পারমিশন ছাড়া যদি পুষ্প চোখে বাদন খোলে তাহলে তার খবর আছে। রাগে দুঃখে পুষ্পের এখন কান্না করতে ইচ্ছা করছে।
🌺
পল্লবের রুমের খাটের মধ্যে লম্বা ঘুমটা দিয়ে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছে রিমঝিম। ক্ষনে ক্ষনে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে তার। এটা কষ্টের অশ্রু না। সুখের অশ্রু। সে তো পল্লবকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু তার জানু সব ঠিক করে দিয়েছে। সেদিন সে রাগে কষ্টে পল্লবকে সেই কথাগুলো বলে নিচে নেমেই ওয়াসরুমে ডুকে ইচ্ছে মতো কান্না করে। ঘন্টাক্ষনিক পর পুষ্পের ডাকে ওয়াসরুম থেকে বের হয়। কান্নার ফলে তার ফর্সা চোখ মুখ লাল হয়ে ফুলে যায়। সবাই তার চোখ মুখ দেখে কি হয়েছে প্রশ্ন করলে। সে মাথা ব্যাথার কথা বলে। রাতে পুষ্পের পাশে ঘুমের বান ধরে পরে কান্না করতে থাকে। হঠাৎ সে শব্দ পায় পুষ্প রুম থেকে বের হচ্ছে। সে মনে করেছে পুষ্প পানি খেতে রুম থেকে বের হয়েছে। সে সেভাবেই শুয়ে কান্না করতে থাকে। আর তার চোখে ভাসতে থাকে তার সাথে পল্লবের বিয়ের দিনের কথা। সেদিন পল্লব তাকে প্রথম বাইক দিয়ে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল। ঘুরতে ঘুরতে তারা পথ হারিয়ে ফেলে। আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় নেটওয়ার্কও ভালো ছিল না। যার ফলে জিপিএস দেখে আসতে পারছিল না। তারা ঘুরতে ঘুরতে একটা গ্রামে চলে যায়। আর সেখানে গিয়ে নিজেদের স্বামী স্ত্রীর পরিচয় দেয়। কিছু কিছু গ্রামের লোক তাদের কথা মিথ্যা বলে। ওদের কাছে প্রমাণ চায়। সঠিক প্রমাণ দিতে না পারায় গ্রামের লোকরা তাদের মসজিদে নিয়ে গিয়ে মসজিদের ইমামকে দিয়ে বিয়ে পরায়। তার ভাবনার মাঝেই পুষ্প রুমে ডুকে দরজা লক করে রুমের লাইট ওন করে দেয়। সে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান দরে। পুষ্প লাইট ওন করে তার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে দরে বলেছিল তোর হিমরাজ তোকে আবার বিয়ে করবে। সে কিছু না বুঝে কৌতুহলি চোখে পুষ্পের দিকে তাকালেই পুষ্প তাকে সবটা খুলে বলে। কিভাবে সে জেনেছে তার ভাই পল্লবই তার হিমরাজ। কিভাবে সে তার হিমরাজকে বলে রাজি করিয়েছে। সেদিনও সে কেদেছিল। হাউমাউ করে তার পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে কেদেছিল। দরজার খোলার শব্দে ভাবনার সুতো কাটে তার। চোখের পানি মুছে লাল ওড়নার মধ্যে দিয়েই সামনে তাকিয়ে দেখে হিমালয়ের মত দবদবে সাদা গায়ে গোল্ডেন কালারের সেরয়ানি পরে রুমে ডুকছে পল্লব। মুগ্ধ নয়নে গোমটার আড়াল থেকে পল্লবকে দেখতে থাকে সে। তাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে পল্লব খুব ব্যস্ত হয়ে যায়। যার ফলে তার সাথে কথা বলা তো দূরের কথা পল্লবের দেখাও পায়নি সে। শুধু গায়ে হলুদের সময় আর পুষ্পের বার্থডে পালন করার সময় যা একটু দেখেছে। তাই এখন ঘুমটার আড়াল থেকে মন ভরে দেখছে।
রুমে ঢুকে দরজা লক করে দেয় পিছনে ঘুরতেই পল্লবের চোখ পরে খাটের বসে থাকা রিমঝিমের উপর। গোল্ডেন কালারের সুতার কাজ করা রেড কালারের লেহেঙ্গার পরে খাটের উপর বসে আছে রিমঝিম। মাথায় লম্বা ঘোমটার ফলে মুখটা দেখা যাচ্ছে না। সে গিয়ে খাটের পাশে দাড়াতেই রিমঝিম নেমে তার পা ধরে সালাম করতে নিলেন সে রিমঝিমের দুই বাহু ধরে তাকে সোজা করে দাড় করিয়ে মাথায় ঘুমটা সরিয়ে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল
– তোমার স্থান সবসময় আমার বুকের মধ্যে ছিল আর থাকবে। কিন্তু আমার কষ্টটা কোথায় জানো? রুবি যদি আমার বউ হত তাহলে তুমিও তো আমার বউ ছিলে। তুমি কেন নিজের অধিকার ছেড়ে দিলে অন্যের জন্য? আমি সব সময় তোমাকে আগলে রেখেছিলাম। আর চেয়েছিলাম তুমিও আমাকে আগলে রাখ। প্রয়োজনে আমার জন্য পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই কর। সেইদিন তোমার সেই চড়ে আমার অপমান থেকে কষ্ট বেশি লেগেছে। নিজেকে খুব ব্যর্থ মনে হয়েছে। কষ্টটা অভিমানে পরিনত হলেই আমি চলে যাই।
রিমঝিম আবার কান্না করে দেয়। পল্লব চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল
– এই এতো কান্না করে প্লিজ। কান্না থামাও।
– আম সরি। আমি অনেক বড় ভুল করেছি। আমার তোমার কথা বিশ্বাস করা উচিৎ ছিল।
– উহু। তোমার কোন দোষ ছিল না। আমার দোষ ছিল। আমার বুঝার উচিত ছিল। তোমার বাবাও তোমার মাকে ভালোবাসি বলে বিয়ে করে। ভুলিয়ে-বালিয়ে সব সম্পত্তি নিজের নামে নিয়ে নেয়। তার নিজের মেয়েসহ স্ত্রীকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে, অন্য মেয়েকে বিয়ে করে তার সাথে চলে গিয়েছিল। তাই তুমি হয়ত চাইলেও বিশ্বাস করতে পারনি।
রিমঝিম বলল
– কিন্তু তুমি তো আর বাবার মতো আমাকে রেখে চলে যাওনি। আমার কাছে শুধু সময় চেয়েছিলে।
– না সব দোষ আমার বুঝার উচিৎ ছিল।
– না সব দোষ আমার।
– না আমার।
– না,,,,,,
পল্লব রিমঝিমকে থামিয়ে দিয়ে বলল
– দুজনেরই দোষ ছিল হয়েছে।
হঠাৎ পুরোনো কথা মনে পরতেই দুজনেই হেসে ফেলে। পল্লব রিমঝিমকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বলল
– প্রমিজ করছি যা কিছুই হয়ে যাক আমি তোমার থেকে আর কখনো দূরে যাব না।
রিমঝিমও তার পল্লবের বুকে মাথা রেখে বলল
– আমিও প্রমিজ করছি যা কিছু হয়ে যাক। আর কখনো তোমাকে অবিশ্বাস করবো না।
🌺
শেষমেশ বন্ধুদের ৬০ হাজার টাকা দিয়ে রুমে ঢুকলো নিদ্র। এই বন্ধু নামক মানুষ গুলোকে এখন সবচেয়ে বেশি ডেঞ্জেরাস বলে মনে হচ্ছে নিদ্রের। যেই বন্ধুরা দুপুরে পুষ্পের বাড়িতে পুষ্পের ফেন্ড আর কাজিনদের সাথে ঝগরা করে তার টাকা বাচিয়েছে, সেই বন্ধুরাই এখন তার থেকে কণেপক্ষদের থেকেও ডাবল টাকা নিয়ে ছেড়েছে। সাথে জুটেছে তার একমাত্র খালাতো ভাই এর একমাত্র বউ সাদিয়া। ভাগ্য ভালো তার কাজিন বলতে এই একটা মাএ বড় ভাই আছে। তা না হলে আজকে বাসর বাদ দিয়ে রাস্তায় গিয়ে ভিক্ষা করতে হতো।
রুমের দরজা ঠেলে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে পিছনে ঘুরে একপা এগোতেই থেমে গেল নিদ্র। ফুলে ফুলে সাজানো খাটের ঠিক মাঝখানে বসে আছে তার পুষ্প। চারিদিকে সাদা সাদা ফুলের মাঝে তার লালটুকটুকে পুষ্পের সুন্দর্য যেন পৃথিবীর সব সুন্দর্যকে হার মানায়।একধেনে তাকিয়ে দেখছে নিদ্র তার পুষ্পকে।
পুষ্প কারোর ঘরে ঢোকার শব্দ পেয়ে বলে উঠে
– কে, নিদ্র ভাইয়া
পুষ্পের কথা কানে যেতেই নিদ্র রেগে গেল। দাতে দাত চেপে পুষ্পকে জিজ্ঞেস করল
– কি বললে?
পুষ্প চিন্তা ভাবনা না করেই বলল
– আমার তো চোখ বাধা তাই কে এসেছে তাই জিজ্ঞেস করেছিলাম।
নিদ্র আবার জিজ্ঞেস করল
– আমাকে কি বলে ডাকলে?
– কি আবার নিদ্র ভা ,,,,,,,,,
এতটুকু বলতেই পুষ্পের খেয়াল হলো ও নিদ্রকে আগের অভ্যাস মতো ভাইয়া বলে ডেকে ফেলেছে। ওরই বা দোষ কি এতোদিনের অভ্যাস কি আর এই কয়দিনে যায়। একটা ঢোক গিলে পুষ্প বলল
– সরি ভুল করে বলে ফেলেছি আর হবে না।
– আর হবে কি হবে না তা তোও পড়ে দেখা যাবে। এখন তোও এই ভুলের শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।
পুষ্প শাস্তির কথা শুনে ভয়ে কাপাকাপি করতে থাকে।
কথাটা বলেই নিদ্র তার সেরোয়ানির পকেট থেকে ফোনটা বের করে নিশব্দে পুষ্পের ছবি তুলে নেয়।
ছবি তোলা শেষ হলে নিদ্র পুষ্পকে বলল
– যেখানে বসে আছো সেখানেই দাঁড়াও।
পুষ্প নিদ্রের কথা শোনে ভাবতে থাকে সে কি কানে ঠিক শুনছে নাকি নিদ্র তাকে খাটের উপর দাড়াতে বলছে।পুষ্পের ভাবনার মাঝেই নিদ্র দমক দিয়ে বলল
– কি হলো কথা কানে যাচ্ছে না দাঁড়াও বলছি।
নিদ্রর দমক কানে যেতেই পুষ্প চট করে বসা থেকে খাটের উপরেই দাঁড়িয়ে যায়।
নিদ্র এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল
– কানে দরে দাঁড়াও।
পুষ্পের এবার কান্না পায়। সে না হয় অভ্যাসবসত ভাইয়া ডেকেই ফেলেছে। তাই বলে আজকের দিনেও কেউ নিজের বউকে কানে ধরিয়ে দাড় করিয়ে রাখে।
নিদ্র আবার দমক দিয়ে বলল
– কি হলো কথা কানে যাচ্ছে না কানে দর
দমক শুনে পুষ্প কাদো কাদো মুখ নিয়ে কানে ধরে। নিদ্র একটা মুচকি হাসি দিয়ে তার পুষ্পের ফুলের বিছানায় কানে ধরে কাদো কাদো মুখ করে থাকার ছবি তুলে ফোনটা পকেটে রাখে। তারপর ঘরে সাজানো মোমবাতিগুলো থেকে একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে ড্রয়ার থেকে লাইটার নিয়ে মোমবাতিটাতে আগুন ধরিয়ে লাইটারটা ড্রয়ারে রাখে। এই মোমবাতিটা দিয়ে বাকি মোমবাতিগুলো জ্বালাতে থাকে।
🌺
চলবে………..