Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০২

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০২

0
3946

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২

দিগন্তে তখন সদ্য আলোর রেখা দেখা দিয়েছে, আর সেই স্নিগ্ধ প্রত্যুষের শান্তিকামী বার্তা নিয়ে জানালায় ভিড় করেছে একদল চঞ্চল পাখি। তাদের কলকাকলির মিষ্টি সুর দিয়ার কানে পৌঁছালো ঠিকই, কিন্তু তা যেন আজকের এই নিষ্পেষিত ভোরের সঙ্গে কোনোভাবেই মানানসই নয়। সেই সুর দিয়ার কানে পৌঁছালো এক যন্ত্রণাময় বিদ্রূপের মতো।

সে ক্লান্তিতে পিটপিট করে চোখ মেলল। দৃষ্টি তখনও ঘোলাটে, চারপাশের জগৎ যেন অস্বচ্ছ। ঠিক সেই মুহূর্তে এক উচ্ছৃঙ্খল দমকা হাওয়া জানালার ভারি পর্দাটিকে সশব্দে সরিয়ে দিল। সমস্ত অন্ধকার দূর করে সোনালী সূর্যের এক ঝলক আলো যেন তীর্যকভাবে এসে দিয়ার চোখে মুখে আছড়ে পড়ল!

তীব্র আলোর ঝলকানি চোখ সইয়ে নিতে না পেরে দিয়া পুনরায় পল্লব বন্ধ করলো। দিয়া চোখ বন্ধ করে রইলো ঠিকই, কিন্তু ঘুম আর এলো না। বরং বিগত রাতের সমস্ত ভারী স্মৃতিগুলো যেন ভিজে মাটির মতো তার মনের গভীরে চেপে বসতে শুরু করলো! ওভাবেই সে নিষ্ক্রিয় ভঙ্গিতে বিছানায় পড়ে রইলো কিছুক্ষণ। অতঃপর, অনিবার্য এই রূঢ় দিনের মুখোমুখি হওয়ার জন্য যখন সে সমস্ত শক্তি এক করে বিছানা ছেড়ে উঠার জন্য উদ্ধত হলো, তখনই তার শরীরে অনুভূত হলো এক প্রবল অচেনা ভার। তার মনে হলো, কোনো ভারী বস্তার মতো কিছু তার ওপর লেপটে আছে।

আতঙ্কে দিয়ার নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম হলো। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখলো—দ্বীপ তাকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে রেখেছে। যেন শিকারী তার শিকারকে সর্বোচ্চ নিশ্চিতিতে জাপটে ধরে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। দ্বীপের সেই সুগঠিত কঠিন বাহু দিয়ার শরীরের চারপাশে এমনভাবে জড়ানো যেন তা কোনো লোহার বাঁধন! যেখানে একটুও নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই তার। গতকালের অত্যাচার শেষে এখন এই নৈকট্য দিয়ার কাছে কেবল এক নিষ্ঠুর প্রহসন। দিয়ার মনে হলো দ্বীপ যেন কেবল তার শরীর নয় বরং মুক্তিকামী আত্মাকেও আস্টেপিস্টে চেপে ধরে রেখেছে।

মুহূর্তের মধ্যে দিয়া তীব্র ঘৃণায় দ্বীপের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল। সেই মুখ, যা এখন শান্ত ঘুমে আচ্ছন্ন, তা দিয়ার কাছে কোনো পুরুষের মুখ নয়—যেন তা এক নিষ্ঠুর হিংস্রতার প্রতিচ্ছবি। দ্বীপকে দেখলেই তার শরীরের রক্তে যেন এক বিরাগের স্রোত খেলে যায়। তার অন্তর যেন বিদ্রোহ করে ওঠে। এত গভীর ঘৃণা যে, দিয়ার গা গুলিয়ে আসে, মনে হয় যেন এক্ষুনি বমি হয়ে যাবে। তার সমস্ত চেতনা শুধু এইটুকুই বলতে থাকে—এই পুরুষটি তার জীবনের নিকৃষ্টতম অভিশাপ, আর তার এই সান্নিধ্য মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণার।

আর এক মুহূর্তও সেই বিষাক্ত সান্নিধ্যে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হলো না। তীব্র ঘৃণার এক অতর্কিত শক্তিতে দিয়া যেন বিস্ফোরিত হলো। সে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে, এক ঝটকায় নিজেকে দ্বীপের সেই লোহার মতো কঠিন বন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিল।

মুক্ত হওয়ার আকুলতায় তার শরীর যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠলো। বিছানা থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তার ক্ষত-বিক্ষত শরীর ব্যথায় টনটন করে উঠলো। তবে দিয়া সেসব উপেক্ষা করে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটল।
___________________

ঘড়ির কাঁটায় প্রায় এক ঘণ্টার হিসেব চুকিয়ে তবেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো দিয়া। ভোরের নরম আলোয় এই রাজকীয় শয়নকক্ষ দিয়ার কাছে এখন আরও বেশি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। গত রাতের ভয়াবহতা তখনও তার শরীরে দগদগে ক্ষত আর মনে এক শীতল শূন্যতা রেখে গেছে। দিয়ার চঞ্চল চোখজোড়া পুরো ঘর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। কোথাও দ্বীপ নেই—গভীর দীর্ঘ একটি শ্বাস তার পাঁজর ভেদ করে বেরিয়ে এলো।

অতঃপর নিঃশব্দে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল ড্রেসিং টেবিলের দিকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখেই আঁতকে উঠলো দিয়া। এ কেমন বীভৎস চিত্র! সারা শরীর জুড়ে ছড়ানো কালসিটে দাগের বিস্তার—গত রাতের নিদারুণ অত্যাচারের স্থির, নির্মম স্বাক্ষর। প্রতিটি দাগ যেন এক একটি যন্ত্রণাদায়ক চিৎকারের প্রতীক।

এরপরই তার নজর গেল বিছানার দিকে। সেখানে রাখা আছে একটি গাঢ় খয়েরী রঙের শাড়ি, আর তার পাশে ভাঁজ করা একটি সাদা কাগজ। কৌতূহলী হয়ে দিয়া দ্রুত পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। হাতে তুলে নিলো কাগজটি। সেখানে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা একটি কঠিন নির্দেশ:

—”এই শাড়ি পরে তৈরি হও। যদি কথার হেরফের হয়েছে রে শশুরের মাইয়া, তাহলে তোর জান নিয়ে নিব।

দ্বীপের রেখে যাওয়া সেই হুমকি-চিঠি এবং সেই শাড়িটার ঠিক পাশেই রাখা আরেকটি কালো রঙের শাড়ি। দিয়া আরও খেয়াল করলো- কাল রাতের চাদর খানা পাল্টে একটি নতুন চাদর বিছানো হয়েছে খাটে তবে দিয়া সেসব পাত্তা না দিয়ে— এক স্থির প্রতিজ্ঞা নিয়ে দ্বীপের নির্দেশিত খয়েরী শাড়িটি ছুঁড়ে ফেলে দিলো মেঝেতে, হাতে তুলে নিলো কালো শাড়িটি।

__________________

আজ দিয়া আর দ্বীপের বহুল আলোচিত বিবাহোত্তর সংবর্ধনা (রিসেপশন)। দেশের স্বনামধন্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গদের উপস্থিতিতে খাঁন বাড়ি আজ যেন এক মিলনমেলা। সন্ধ্যার পর থেকেই বিশাল অট্টালিকা প্রাঙ্গণ ঝলমলে আলোয় উদ্ভাসিত—যেন এক উৎসবের নগরী।

অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার তাড়নায় বাড়ির সকলে আজ ভীষণ ব্যস্ত; ছোটাছুটি আর তদারকির অন্ত নেই কারো। মোল্লা বাড়ির সকলেও আজ উপস্থিত খাঁন বাড়িতে। উপস্থিতির সেই ভিড়ের মধ্যেই রুহানি বেগম (দিয়ার মাই) একবার উপরতলার ঘরে গিয়ে দিয়াকে দেখে এসেছেন। কিন্তু নেওয়াজ মোল্লার সাথে এখনো দেখা হয়নি দিয়ার।

________________

প্রায় সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ খাঁন বাড়ির যুবতীরা দিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। দ্বীপের কড়া নির্দেশ ছিল—দিয়াকে যেন নিখুঁতভাবে সাজিয়ে আনা হয়। কিন্তু তাদের কোনো উদ্যোগই দিয়ার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তথাকথিত লজ্জা আর মানসম্মানের ভয়ে সে প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের সাহায্য। বরং নিজের মতো করেই যতটা সম্ভব সামান্যতম প্রসাধনে নিজেকে তৈরি করেছে।

দিয়াকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখে নিমন্ত্রিত সকলের দৃষ্টি যেন থমকে গেল সেই দিকেই। উপস্থিত জনতার চোখ স্থির হয়ে আটকালো তার রূপে। কী অপরূপা এই মেয়েটি! হলদেটে ফর্সা গায়ের রং, হাঁটু ছুঁই ছুঁই লম্বা কালোকোচমাথা চুল। আর চোখ দু’টো! সাধারণ মানুষের তুলনায় খানিকটা বড়—যে কেউ সেই চোখে একবার তাকালে মুহূর্তেই যেন এক গভীর মায়ায় আচ্ছন্ন হবে নিশ্চিত! যেন দৃষ্টির গভীরে লুকানো কোনো এক অলৌকিক আকর্ষণ।

হলভর্তি অতিথিদের ভিড়ে কোথাও একফাঁকে দ্বীপের ডান হাত—আকাশের ফিসফিসানি কানে এল।

—ভাইজান, দ্যাহেন! ভাবীরে তো আইজকা ম্যালা সুন্দর লাগতাছে।

আকাশের কথা শুনে হাতে থাকা কাগজগুলো পকেটে গুঁজে সামনের দিকে চোখ তুলতেই দ্বীপের দৃষ্টি মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়াকে দেখে এক পলকের জন্য যেন সমস্ত রাগ, ক্ষোভ ভুলে গেল সে; মুগ্ধতা নিয়ে খানিকক্ষণ কেবল চেয়েই রইল। কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই মুগ্ধতার ঘোর কাটল! দিয়ার পরনে কালো শাড়ির দিকে চোখ যেতেই তার চোখ দুটো যেন আগুনের মতো লাল বর্ণ ধারণ করল। ক্রোধে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।

দিয়া একবার আড়চোখে তাকালো দ্বীপের দিকে। তার দৃষ্টির ভাষা পড়তে দিয়ার এতটুকুও ভুল হলো না—দ্বীপ ভীষণ রেগে গিয়েছে তার নির্দেশ অমান্য করে কালো শাড়ি পরায়। তবুও দিয়া সেদিকে তেমন পাত্তা দিল না। সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল অতিথিদের সাথে পরিচিত হতে। দিয়ার সেই নীরব বিদ্রোহ দেখে দ্বীপ মুহূর্তেই তার ক্রোধ চেপে গেল—মুখে ফুটল এক শীতল বাঁকা হাসি।

পরমুহূর্তেই ঘটলো এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা! ভিড়ের মধ্য একটি ওয়েটার এসে সজোরে ধাক্কা খেল দিয়ার সঙ্গে। হাতে থাকা ট্রে ভর্তি উজ্জ্বল রঙের শরবতগুলো ছিটকে পড়ল সদ্য পরা কালো শাড়িটির ওপর। সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত জনতার মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হলো।

ওয়েটারটি ভয়ে প্রায় কাঁপছে। সে বারবার বলছে:

—সরি! সরি! সরি! মাফ করবেন ম্যাডাম, আমি ইচ্ছে করে করিনি, ভুলবশত হয়ে গেছে। মাফ করে দিন আমাকে!

লোকটির আতঙ্ক দেখে দিয়া তার উদ্দেশ্যে শান্ত কণ্ঠে বললো:

—এতো হাইপার হবেন না ভাইয়া—আমি বুঝতে পেরেছি আপনি ইচ্ছে করে করেননি।

দিয়ার শান্ত স্বরে কিছুটা স্বস্তি পেলেও ওয়েটারটি আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না, দ্রুত মাথা নিচু করে নীরবে সেখান থেকে প্রস্থান করল। এরপর দিয়া তার সামনে দাঁড়ানো অন্যান্য মহিলাদের উদ্দেশ্যে বললো:

—এক্সকিউজ মি! আপনারা গল্প করুন, আমি একটু শাড়িটা পরিষ্কার করে আসি।

বলেই দিয়া দ্রুত উপরের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। করিডোর ধরে কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ মূল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল—এক লহমায় পুরো বিশাল অট্টালিকা অন্ধকারে ডুবে গেল। আকস্মিক অন্ধকারে দিয়া মুহূর্তেই ভীত হলো, তবুও সে দেয়াল ধরে হাতড়ে হাতড়ে কয়েক পা এগোলো।

ঠিক তখনই, অন্ধকারে এক জোড়া শক্ত হাত তাকে হিংস্রভাবে টেনে নিয়ে এসে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরলো। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না দিয়া, ভয়ে কেঁদেই দিল। লোকটির প্রশস্ত বুকে এলোপাথাড়ি চড় মারতে মারতে রুদ্ধশ্বাসে বললো:

—কে আপনি? ছাড়ুন বলছি আমাকে? আপনার সাহস কী করে হয় আমাকে ছোঁয়ায়?

লোকটি অন্ধকারে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার গরম নিঃশ্বাস দিয়ার চোখে-মুখে আছড়ে পড়ছে।

—জবাব দিচ্ছেন না কেন? কে আপনি? ছাড়ুন বলছি আমাকে।

হঠাৎই লোকটি শীতল, শান্ত কণ্ঠে বলে উঠলো:

—কাল সারা রাত কতভাবে ছুঁলাম, আর এখনি সেই ছোঁয়া ভুলে গেলে? ভেরি ব্যাড।

কণ্ঠস্বর শুনেই দিয়া বুঝলো—এ আর কেউ নয়, এ দ্বীপ। সে ভয়ে আমতা আমতা করে বললো:

—আ…আপনি তো নিচে ক…কাজ করছিলেন! এ…এখানে ক…কিভাবে এলেন?

দ্বীপ এবার প্রচণ্ড রাগে দিয়ার থুতনি চেপে ধরলো। অন্ধকারে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো:

“………”

[চলবে]