Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৩

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-০৩

0
1407

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ৩

(প্রিয় পাঠকগন আপনাদের আগে ভাগেই বলে রাখি- নায়কের নাম চেঞ্জ করা হয়েছে কারণ দ্বীপ এবং দিয়া- লিখতে গেলে মনে হয় এরা ভাই বোন, তাই চেঞ্জ করে দিলাম! নায়কের নাম আগে ছিল (আদ্রিয়ান খান দ্বীপ) চেঞ্জ করে রাখা হয়েছে #আদ্রিয়ান_খান_নির্ণয় ।
___________________

-তরে কইছিলাম না কথার হেরফের হইলে জান নিয়ে নিব? এ্যাই চুত-মারানি তোর সাহস ক্যামনে হয়লো আমার কথা অমান্য করার? জান এর ভয় নাই? মরতে চাস?

নির্ণয়ের চোখ দুটো তখন যেন আগুনের গোলা। রাগে সে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে। মস্তিষ্ক আর যুক্তি—দুটোই লোপাট। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়ার প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ যেন এক লহমায় ফেটে পড়ল। এক টানে দিয়ার শাড়ির আঁচল টেনে খুলে ফেলল। শাড়ি উন্মুক্ত হতেই দিয়ার শরীরটা যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। বাঁধা দিতে চাইলো তবে সে বরাবরই ব্যার্থ।

নির্ণয় দিয়ার উন্মুক্ত উদরে খামচে ধরতেই ব্যথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে! ঠোঁটের কোণে সিগারেট চেপে ধরতেই সেটার আগুনের আলোয় তার কঠোর চোয়াল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সিগারেট ধরিয়ে সে গভীর টান দিল। ধোঁয়া ছাড়ার পরই সেই জ্বলন্ত সিগারেটের ডগাটা শক্ত করে চেপে ধরলো দিয়ার উন্মুক্ত উদরে।

—আহ… মা!

ব্যথায় চিৎকার করে উঠল দিয়া। দিয়ার সেই তীব্র চিৎকার থামানোর জন্য নির্ণয় তার খরখরে মরুভূমির ন্যায় শুষ্ক উষ্ঠ জোড়া দিয়ে সজোরে চেপে ধরলো দিয়ার নরম ওষ্ঠদ্বয়। দিয়ার চিৎকার নিমেষে চাপা পড়ে গেল নির্ণয়ের চাপা ক্রোধের মধ্যে। প্রায় পাঁচ মিনিট পর ছেঁড়ে দিল। দিয়া ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। নির্ণয় দিয়া কে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিয়ে গর্জে উঠলো।

—এ্যাই বান্দির বাচ্চা জবাব দে! পিঠে পাখা গজায়ছে? একটা কথা মনে রাখবি পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।

দিয়া ছলছল চোখে তাকালো নির্ণয়ের পানে। ভাঙ্গা কন্ঠে শুধালো।

—আমার প্রতি এতো কিসের ঘৃণা আপনার?

দিয়ার প্রশ্নে গাঁ দুলিয়ে হেঁসে উঠল নির্ণয়। অহংকার করে বলল।

—তোকে ঘৃণা? সেটাও আমি? এতো বড় চিন্তা ভাবনা কেনো তোর?

বাক্য শেষ করেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল নির্ণয়। দিয়া সেদিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর চোখের পানি মুছে আসতে করে উঠে দাঁড়ালো। শাড়ির আঁচল ঠিক করে পা বাড়ালো নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এতক্ষণে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। দরজা অব্দি যেতেই নির্ণয় ফিরে এলো। হাতে পানির গ্লাস আর একটা ছোট ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে।

নির্ণয় কে দেখে ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল দিয়া। নির্ণয় সেটা খেয়াল করে বলে উঠলো।

—যখন ভয় পাওয়ার তখন তো ভয় এর “ভ” ও পাও না। এখন ভয় পাচ্ছ কেন?

উত্তর করলো না দিয়া। বোকা বোকা চাহনিতে তাকিয়ে দেখতে লাগলো নির্ণয় কে।

লম্বা চৌড়ায় নির্ণয় প্রায় ছয় ফুট দুই ইঞ্চি! ফর্সা গাঁয়ের রং! ফুখ ভর্তি চাপ দাঁড়ি! সিল্কি চুল! পরনে তার সেই নিখুঁত পোশাক- কালো রঙের ফরমাল প্যান্ট, তার ওপর সাদা শার্ট। শার্টের উপর পড়া কালো রঙের সাসপেন্ডারস দুটি প্যান্টের কোমরের সঙ্গে যুক্ত। গলার ফাঁস আলগা হয়ে থাকা নেকটাই এবং হাতের বলিষ্ঠ পেশির ওপর আঁটোসাঁটো করে বাঁধা কালো রঙের আর্মব্যান্ড।

দেখতে হিরোর থেকেও বেশি আকর্ষণীয়। বয়স তার ২৯ তো হবেই তবুও যেন চেহারায় এক রুক্ষ যৌবনের ছাপ। তার সেই নিখুঁত গড়ন ফ্যাশন হাঁটা চলার স্টাইল সবকিছু মিলে এক ভয়ংকর সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। যেন আল্লাহ তায়ালার নিজ হাতে যত্নে গড়া কোনো ভাস্কর্য।

দিয়া অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখছে নির্ণয় কে। তার মনে হচ্ছে এর থেকে সুন্দর- সুদর্শন পুরুষ এই ভুবনে আর দ্বিতীয়টি হয়না। অজান্তেই মনের গহীন থেকে বেরিয়ে এলো দুটি শব্দ।

— হায়েএএ মাশ আল্লাহ…

দিয়া কে নিজের দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে খেকিয়ে উঠলো নির্ণয়।

—এ‌্যাই ছ্যামরি এ্যাই ওমন ভেবলা কান্তের মতো তাকিয়ে আছো কেন? আমার কী রুপ বের হয়েছে?

হঠাৎ নির্ণয়ের ধমকে স্তম্ভিত ফিরে পেল দিয়া। চোরের মতো দৃষ্টি ঘোরালো এদিক সেদিক। তা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাঁসি আটকালো নির্ণয়। ফের ধমক দিয়ে বললো।

—এ্যাই মেয়ে যাও এক্ষুনি এ্যাই শাড়ি পাল্টে অন্য শাড়ি পরে আসো। ফের যদি কথার অমান্য করেছো তো দেখো তোমার সাথে কী কী হয়।

নিজের বাক্যে সম্পূর্ণ হতেই বেরিয়ে গেল নির্ণয়। দিয়া শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়লো যেন এতক্ষন সে নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘাড় কাত করে উঁকি দিয়ে দেখলো নির্ণয় চলে গিয়েছে তাই নিজেও ছুটলো ঘরের দিকে।

__________________

প্রায় রাত নয়টা দিয়া শাড়ি পাল্টে এসেছে অনেক্ষণ। চুপচাপ গুটি শুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে এক কোনে।
জাহারা কে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রিয়া ছুটলো সেদিকে।

—ভাবী আপনি এখানে একা একা দাঁড়িয়ে আছেন যে? ওমা ভাবী আপনি শাড়ি চেঞ্জ করলেন কখন?

মিষ্টি করে হাসলো দিয়া।
—এই তো কিছুক্ষণ আগেই।

—ওয়াও তোমাকে তো হেব্বি সুন্দর লাগছে ভাবী! দেখো ভাইয়া যেন আবার হার্টফেল না করে।

__________

(চলো তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেই খাঁন বাড়ির সকলের সাথে)

নির্ণয়ের বাবা চাচা দুইজন ফুফু একজন। নির্ণয়ের বাবা সবার বড় নাম! আশরাফুল খাঁন। চাঁচা- ইসমাইল খাঁন। ফুফু স্বর্ণালী খাঁন।

নির্ণয় ওর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। মা অসুস্থ থাকায় আর দ্বিতীয় সন্তান নেননি তাঁরা।

চাঁচা ইসমাইল খাঁনের দুই ছেলে। বড় ছেলে- আরিয়ান খাঁন! ছোট ছেলে- হৃদয় খাঁন।

ফুফু স্বর্ণালী খাঁনের জমজ তিন মেয়ে। নিলা-মিলা-প্রিয়া! প্রিয়ার বাবা গত হয়েছেন আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে! তখন থেকেই তাঁরা খাঁন বাড়িতেই থাকেন।

___________

প্রিয়ার কথায় অসস্থি বোধ করছে দিয়া তাই কথা এড়াতে বললো।

—তুমি এখানে? নিলা আর মিলা কোথায়? ওদের দেখতে পাচ্ছি না যে।

—ওরা ছাদে বসে কি যেন একটা নিয়ে ডিসকাস করছে। ওখানে নির্ণয় ভাইয়া ও আছে যাবে তুমি?

—এ্যাই না না আমি যাব না।

—ওমা লজ্জা পাচ্ছ বুঝি? থাক লজ্জা পেতে হবে না। তুমি এখানেই থাকো আমি যায়।

বলতে বলতেই এক প্রকার দৌড়ে চলে গেল প্রিয়া। দিয়া সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল। “সবগুলো পাগলের দল”

***

কিছু সময় পর ছাঁদ থেকে নেমে এলো ওরা। এসেই আরিয়ান নির্ণয়ের হাতে ধরিয়ে দিল একটি গিটার। নির্ণয় দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকালো আরিয়ানের দিকে—যেন এখুনি তাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। কারণ নির্ণয় মঞ্চে গাইতে একেবারেই স্বচ্ছন্দ নয়। ইতিমধ্যেই সামনে উপস্থিত বন্ধুমহলে প্রবল হইহুল্লোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। সকলে নির্ণয়কে গান গাওয়ার জন্য চিৎকার করে উৎসাহ দিতে শুরু করেছে।

দিয়া সেদিকে তাকিয়ে মুখ বাকালো। লোকটি কি গান ও গাইতে পারে? ইশশ্ যদি গলার স্বর ফাটা বাঁশের মতো হয় তখন? মানসম্মান আর থাকবেনা। এই ভেবে দিয়া নিজের দুই কান শক্ত করে চেপে ধরেছে।

ভিড়ের মাঝখান থেকে নির্ণয়ের খুব কাছের এবং তার সকল পাপের ভাগীদার তার বাঁ হাত- ‘রফিক’ চেঁচিয়ে উঠলো।

—ওস্তাদ হিন্দি মিন্দি গান কিন্তু গাইবেন না! আমরা হইলাম খাঁটি বাঙালি তাই একখান কাড়াক টাইপের বাংলা গান ধরেন।

নির্ণয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকালো রফিকের দিকে! তার খুব ইচ্ছে করছে সবগুলো রে শুলে চড়িয়ে বনবাসে পাঠিয়ে দিতে। তবে তা সে পারবে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একবার তাকালো অদূরে কানে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়ার পানে। এরপর গিটারে খানিক্ষণ টুংটাং শব্দ তুলে গান ধরলো।

🎸♪♪♪♪♪♪♪♪♪♫♬

দুধে আলতা বদন তোমার- চন্দনের শুভাষ ভরা!
দুটি দিঘল কাজল আঁখি- যেন মেঘের কাজল পড়া!

তোমার নরম দুটি ঠোঁটে- ফোটে লতায় পদ্ম ফুল!
যেন রেশমী সুতোর গোছা- তোমার মাথার ওই না চুল!

তুমি ফেলবে যেথায় চরণ- সেই মাটি হবে ধন্য!
ধুলো হয়ে আসবে উরে তোমার চরণ ছোঁয়ায় জন্য!

তোমার হাঁসি দেখে ফুলের- খুব ঈর্ষা হবে মন!
লজ্জাতে পড়বে ঝড়ে যেওনা কো ফুলও বন!

তুমি নারী নাকি পরী বিধি নিজেই করবে ভুল!
আমি তো হায় একটি মানুষ খুঁজে পায়না কোনো কুল!

দুধে আলতা বদন তোমার- চন্দনের শুভাষ ভরা!
দুটি দিঘল কাজল আঁখি- যেন মেঘের কাজল পড়া!

********

দিয়া ভেবেছিল নির্ণয় গান গাইতে পারে না। কিন্তু তার চিন্তা ভাবনা মূহুর্তেই ভুল প্রমাণ করে দিল নির্ণয়- দিয়া কে নিজের দিকে তার ওই ডাগর ডাগর চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকতে দেখে হালকা হাসলো। মেয়েটা যে তার গান শুনে ভীষণ রকম অবাক হয়েছে সেটা তার ফেস রিয়াকশন দেখেই বুঝা যাচ্ছে।

গান শেষ করে নির্ণয় এগিয়ে গেল দিয়ার দিকে। একদম গাঁ ঘেঁষে দাঁড়ালো।

—অবাক হয়েছেন বুঝি?

হঠাৎ নির্ণয়ের এহেন কান্ডে ভয় পেয়ে গেল দিয়া ছিটকে খানিকটা দূরে সরে গেল। বুকে থুথু দিতে দিতে বললো।

—আপনার মাথায় কি গ্যাস্ট্রিক আছে নাকি? উফফ একটুর জন্য জান টা বেরিয়ে গিয়েছিল।

—কিছুই তো করলাম না! জান বের হবে কীভাবে?

দিয়া কপাল কুঁচকে তাকালো।
—মানে?

দুষ্টু হাসলো নির্ণয়। হাত বাড়িয়ে দিয়ার শাড়ি পরিহিত কোমড় আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে আনলো।

—রুমে চলো বুঝিয়ে দিচ্ছি।

—ছিঃ কি নির্লজ্জ ব্যাটা মানুষ। আল্লাহ রক্ষা করো।

এবার সশব্দে হেঁসে উঠল নির্ণয়। যেতে যেতে বলল।

—আজকে মাফ করে দিলাম কিন্তু কালকে ছাড়ছি না।

নির্ণয়ের এমন লাগামহীন কথা শুনে লজ্জায় কান গরম হয়ে উঠলো দিয়ার। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো কেউ শুনেছে কি না। নাহ কেউ শুনেনি হাপ ছেড়ে বাঁচলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো।

—“অসভ্য নির্লজ্জ বেহায়া লাগামহীন দুর্নীতিবাজ” ইয়া আল্লাহ রক্ষা করো।

______________

রাত প্রায় দু’টো। সকল আত্মীয়-স্বজন অনেক্ষণ আগেই চলে গিয়েছেন। বাড়ির সকলেও মনে হয় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু ঘুম নেই দিয়ার চোখে; সে চুপচাপ জানালার পাশে বসে। নির্ণয় সেই দশটার দিকে বের হয়েছে, এখনো ফেরেনি। তাতে দিয়ার কিছু যায় আসে না। অন্তত, সে নিজেকে এটাই বোঝাতে চায়।

পুরো ঘর জুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজমান- এতটাই গভীর নিস্তব্ধতা যে বাইরে ঝিঁ-ঝিঁ পোকার ডাকও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। জানালার বাইরে আবছা অন্ধকারে কেবল পুরোনো আম গাছটার ডালপালা নড়ছে। দিয়া একবার দেয়ালে টাঙ্গানো ঘড়ির দিকে তাকাল- দু’টো বেজে সাতাশ মিনিট।

হঠাৎই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো নির্ণয়। দিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই আতঙ্কে শিউরে উঠলো। নির্ণয়ের পরনে সাদা শার্ট—রক্তে লাল হয়ে গেছে। জামার হাতা আর বুকের কাছে রক্তের গাঢ় ছাপ। দিয়া দ্রুত পায়ে এগোতে এগোতে প্রশ্ন করল:

—এতো রক্ত কেন? কি হয়েছে? আপনাকে কেউ মেরেছে? নাকি আপনি কাউকে মেরে এলেন?

^………^

[চলবে]