Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৯+২০

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৯+২০

0
642

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১৯

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

তখন প্রায় সন্ধ্যা সাতটা বাড়িতে আসা আত্মীয় স্বজন ইতিমধ্যেই চলে গিয়েছে। শুধু হাতে গোনা কয়েকজনই রয়ে গেছে। তাদের মধ্যে নদীও রয়েছে। নেওয়াজ মোল্লা বার কয়েক বললেন বাড়ি ফিরে যেতে তবে নদী আজ বায়না ধরেছে এ বাড়িতে থাকার। নেওয়াজ মোল্লা না পেরে মেয়েকে এ বাড়িতে রেখেই চলে গিয়েছে।

ওয়াহিদ ও এসেছে খানিক্ষণ আগেই, তবে পুরো বাড়ি ঘুরেও যখন কোথাও নির্ণয় কে পেলো না তখন ওয়াহিদের মেজাজ ভিশন খারাপ হলো। নিজে দাওয়াত দিয়ে বাড়ি এনে শেষে কিনা সেই উধাও। ভাবতেই মনে পড়ল উপরের ঘর গুলো দেখা হয়নি হয়তো কোন ঘরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। আর কিছু না ছুটলো উপরে। দুতলার তিন নাম্বার ঘর টি পেরোতেই চোখে পড়ল দিয়া মূর্তির ন্যায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে ঘর থেকে খানিকটা দূরে।

কৌতূহল বশত গিয়ে দাঁড়ালো দিয়ার সামনে। চোখের সামনে হাত নাড়ালো কয়েকবার তবে দিয়ার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না। মেয়েটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে কিছু একটা চেপে ধরে রেখেছে। চোখ দুটো অসম্ভব লাল।

—“কি হয়েছে এমন সং সেজে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?”

দিয়ার ঘোর কাটলো। চোখের পলক ফেলতেই দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো অবলিলায়। ওয়াহিদের দিকে তাকিয়ে ফের তাকালো সামনের ঘরের দিকে! ওয়াহিদ দিয়ার দৃষ্টি লক্ষ্য করে সেদিকে তাকাতেই মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। দু কদম পিছিয়ে গেল ছেলেটা। হুস ফিরতেই দুই হাতে চেপে ধরলো দিয়ার চোখ। না না এমন দৃশ্য যে দেখাও যে পাপ।

ওয়াহিদ কটমটিয়ে তাকালো সামনের ঘরটায়! ওই তো নির্ণয়ের বাহুতে নদী দু’জন দু’জনকে রোমান্টিক উত্তোলন ভঙ্গিতে চুমু খেতে ব্যস্ত। নির্ণয়ের হাত বেপোরোয়া ভাবে ছুটে চলেছে নদীর লতানো কোমড় জুড়ে। ছিঃ কি বিচ্ছিরি সেই দৃশ্য ওয়াহিদের গাঁ গুলিয়ে এলো। রাগী ভঙ্গিতে যখন এগিয়ে যেতে লাগলো ওমনি দিয়া খপ করে ধরে ফেললো ওয়াহিদের হাত। শক্ত গলায় বলল-

—“যা হচ্ছে হতে দেও। তুমি এসো আমার সাথে, তোমার সাথে আমার জরুরী কিছু কথা আছে।

ওয়াহিদ ঘাড় ঘুরিয়ে আরো একবার তাকালো সেদিকে এরপর চলে গেল দিয়ার পিছু পিছু। ঘরে গিয়েই খেকিয়ে উঠল ওয়াহিদ-

—“তুই কি অন্ধ? এসব দেখেও চুপ কীভাবে থাকিস?

দিয়া মৃদু হাঁসলো বলল-

—“রিল্যাক্স ভাইয়া এতো হাইপার হচ্ছো কেনো?

ওয়াহিদ খুবই রেগে গিয়ে দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো দিয়ার বাহু! গম্ভীর গলায় শুধালো-

—“তুই সত্যিই দিয়া তো? আমার তো সন্দেহ হচ্ছে।

দিয়া ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে দিল ওয়াহিদের হাত। শান্ত গলায় বলল-

—“সন্দেহ হওয়ার কারণ?”

ওয়াহিদ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না, পাল্টা প্রশ্ন করে বলল-

—“চল সবাইকে ওদের ওই নোংরা কার্যকলাপের বেপারে জানাবি।”

দিয়া ত্যাড়ামি করে বলল-

—“কখনই না’ প্রশ্নই ওঠে না”

—“তাহলে কি করবি? বসে বসে ওদের রং তামাশা দেখবি?

—“হ্যাঁ!”

—“পাগল হয়ে গেছিস তুই? মাথা ঠিক আছে তোর?”

দিয়ার ভাব ভঙ্গি শান্ত-

—“হ্যাঁ একদম ঠিক আছে”

—“তাহলে?”

দিয়া অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে বলল-

—“এখনই যদি সবাই সবটা যেনে যায় তাহলে তো খেলাটা ঠিক জমবে না ভাইয়া।”

ওয়াহিদ বুঝলো না দিয়ার কথার মানে। কপাল কুঁচকে বলল-

—“মানে?”

—“নদী এতদিন ধরে যে খেলার গুটি গুলো সাজিয়েছে সেগুলো কে কী নষ্ট হতে দিলে চলে বলো? তাই ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে তবেই না হবে আসল খেলা।

—“তুই ঠিক কী করতে চায়ছিস?”

—“আমি শুধু ওদের সঙ্গ দিতে চায়ছি, আর কিছু না!”

—“এতে তোর ক্ষতি ছাড়া লাভ টা কোথায়?”

—“অনেক লাভ আছে ওসব তুমি বুঝবে না। তুমি শুধু আমাকে একটু হেল্প করবে, পারবে?”

—“কেমন হেল্প?”

দিয়া কুটিল হেঁসে একে একে বলল নিজের সব প্ল্যান। এসব শুনে চোখ ছানাবড়া ওয়াহিদের।

—“রিস্ক হয়ে যাবেনা বেশি”

—“একটু রিস্ক না নিলেই নয়”

—“যা করবি বুঝে শুনে করিস”

—“অনেক বুঝলাম এখন করার পালা” তুমি শুধু আমার এই টুকু হেল্প কর?”

—“ঠিক আছে”

বলে ওয়াহিদ চলে যেতে নিলেই দিয়া পিছু ডেকে বলল-

—“ওদের দু’জনের সামনে স্বাভাবিক থাকবে। ওরা যেন বুঝতে না পারে যে তুমি সব জানো কিংবা দেখেছ।

ওয়াহিদ মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। দিয়া এবার নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলো না। ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে। লম্বা চুল গুলো খামচে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। এতো বড় ধোঁকা সে কীভাবে সহ্য করবে? সেটাও যদি হয় নিজের বোন এবং হাসবেন্ডের দেওয়া।

বহু কষ্টে সে ওয়াহিদের সামনে নিজেকে শক্ত খোলসে মুড়িয়ে রেখেছিল। তবে এখন? চোখ বন্ধ করতেই চোখের পাতায় ভেসে উঠছে সেই অপৃৃতিকার দৃশ্য। যন্ত্রণায় কলিজা ফেটে যাচ্ছে। ও যতই নির্ণয়ের সামনে নিজেকে সংযত রাখুক বলুক পছন্দ করে না লোকটাকে। কিন্তু মন তো জানে ও না চায়তেও ভালোবেসে ফেলেছে ওই লোকটাকে।

ভালোবাসা কী মুখে বলে প্রকাশ করতে হয়? লোকটা কী বুঝে না সে ঠিক কতখানি ভালোবেসে ফেলেছে। একটুখানি অবাধ্য হওয়ায় এত বড় শাস্তি?

দিয়া চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। বিড়বিড় করে বলল-

—“একটুখানি অবাধ্য হওয়ায় আমি যদি এতো বড় শাস্তি পেতে পারি, তাহলে আপনার এই ছলনায় বিশ্বাসঘাতকতার এর থেকে বড় শাস্তি আপনি পাবেন মিস্টার খাঁন।

একটু থেমে-

—“আমি আপনাকে ধংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করাবো’ ধংস করে দিব আপনাকে।”

__________________

রাত নয়টা ওয়াহিদ নদী নির্ণয় দিয়া সহ বাড়ির সকলে ডাইনিংটেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে। দিয়া শান্ত এতটাই শান্ত যেন কিচ্ছুটি হয়নি। দিয়া কে চুপচাপ দেখে আশরাফুল খাঁন শুধালেন-

—“আজ এতো চুপচাপ কেন আম্মু? কিছু কি হয়েছে?

দিয়া দৃষ্টি তুলে তাকালো আশরাফুল খাঁনের মুখের দিকে। মৃদু হেঁসে বলল-

—“কই কিছু হয়নি তো।

—“কিছু না হলে এতো চুপচাপ কেন? আর দিনগুলোতে তো দুজনে সতিনের মতো লেগে থাকো, আজ কি দুজনে আগে ভাগেই ঝগড়া শেষ করে এসেছো?”

দিয়া একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো নির্ণয়ের মুখের দিকে, লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই কেমন গাঁ গুলিয়ে আসে দিয়ার ও তাড়াতাড়ি মাথা নত করে ফেলল নিম্ন স্বরে বলল-

—“কিছু হয়নি বাবা।”

আশরাফুল খাঁন বিষয়টি আর ঘাঁটলেন না। ওয়াহিদের উদ্দেশ্যে বললেন-

—“তা ওয়াহিদ বাবা তোমার দিনকাল কেমন চলে? আজকাল তোমাকে তো দেখাই যায়না।

ওয়াহিদ সৌজন্যমূলক হেঁসে বলল-

—“ইদানীং একটু ব্যস্ত থাকি আঙ্কেল, আপনি তো জানেনই।”

আশরাফুল খাঁন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-

—“তোমাকে কে যে ডাক্তারি পড়তে বলল! সারাক্ষণ হসপিটালে রুগী নিয়ে ব্যস্ত থাকো, তা বিয়ে শাদি কি করা লাগবেনা বয়স তো আর কম হলো না।”

ওয়াহিদ হাঁসলো বলল-

—“সময় হলেই করবো আঙ্কেল”

খাওয়া শেষ আশরাফুল খাঁনের হাত ধুয়ে উঠে যেতে যেতে শুধু বললেন-

—“দেখো তোমরা যা ভালো মনে করো।”

ওয়াহিদ জবাবে শুধু হাঁসলো। ওর ও খাওয়া শেষ, রাত ও বাড়ছে এবার বাড়ি ফিরতে হবে। নয়তো মা চিন্তা করবেন। বলল-

—“নির্ণয় এবার আমাকে যেতে হবে’

নির্ণয়ের চোখ দুটো লাল’ কেমন তালমাতাল অবস্থা, তাই নির্ণয় মুখে কিছু বলল না’ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো’ ওয়াহিদ একবার তাকালো দিয়ার দিকে, দিয়া চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করলো, ওয়াহিদ সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির উদ্দেশ্যে।

___________________

রাত এগারোটা দিয়ার শরীর ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছে তাড়াতাড়ি। নির্ণয় খাবার খেয়ে কোথায় যেন গিয়েছে এখনো ফেরেনি। ওসবে দিয়ার কোনো হেলদোল নেই তাই তো আরামছে ঘুমাচ্ছে।

তবে এই আরাম বেশীক্ষণ টিকলো না। নির্ণয় ফিরেছে। দিয়াকে গভীর ঘুমে দেখে পা বাড়ালো ওয়াশ রুমের দিকে। হাত মুখ ধুয়ে এক মগ পানি হাতে বিছানার কাছে এসে দাঁড়ালো নির্ণয়। কিছুক্ষণ ঘুমন্ত দিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মগে থাকা পানি গুলো ঢেলে দিল মেয়েটার মুখে।

ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল দিয়া। নাকে কানে পানি ঢুকেছে বোধহয়। সামনে নির্ণয়কে মগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চেঁচিয়ে উঠল-

—“সমস্যা কি আপনার? মাথার তাঁর কি ছিঁড়ে গেছে? কী করলেন এটা?”

#চলবে

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২০

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

দিয়ার এমন ত্যাড়া কথায় নির্ণয় আরও রেগে গেলো। শক্ত হাতে চেপে ধরলো চুলের মুঠি। ব্যথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। তবে নির্ণয়ের সেদিকে খেয়াল নেই, সে রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে।

—“তোকে কতবার বলেছি, আমার কথার অমান্য করিস না, করিস না। তবে তুই কি শুনেছিস সে কথা? তুই তো এখন নিজের মর্জির মালিক হয়ে গেছিস তাই না?

দিয়া কোনো জবাব দিচ্ছে না। ও দেখতে চাই লোকটা আর কী কী করতে পারে। দিয়া কে জবাব দিতে না দেখে নির্ণয়ের রাগ যেন এবার আঁকাশ ছুঁলো। সে টেনে হেঁচড়ে মেঝেতে আঁছড়ে ফেলল দিয়া কে।

—“খুব বাড় বেড়েছিস তুই। এর শাস্তি তো তোকে পেতেই হবে।

বলতে বলতেই প্যান্টের বেল্ট খুলে হাতে কিছু অংশ পেচালো, অতঃপর হৃদয়হীনার মতো পিটাতে শুরু করল মেয়েটা কে। দিয়া কোনো শব্দ করছে না। ওর ঠোঁটে লেগে আছে ঠান্ডা একটা হাঁসি। যেন নিজের শেষ আশা টুকুও হারিয়ে সে এখন মুক্ত।

—“চোতমারানি! কিছু বলিনা দেখে কি আঁকাশে উড়িস? আজ তোকে মাঝ আসমান থেকে টেনে হেঁচড়ে মাটিতে ফেলবো।

এতো জোরে জোরে বেল্টের প্রতিটি বারির শব্দ হচ্ছিল যে ঘরটা যেন সেই শব্দে মেতে উঠেছে। দিয়ার শরীরের চামড়া ফেটে রক্ত বেরোতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। তবে নির্ণয়ের থামার নাম নেই। সে ক্ষুধার্ত জানোয়ারের মতো হিংস্র হয়ে উঠেছে।

দিয়া আর সহ্য করতে পারলো না। জ্ঞান হারালো। তবে জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ার আগে মেয়েটা নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বলেছে-

—“আজ আমার শেষ আশা টুকুও ফুরিয়ে গেল। আমার মালিকের কসম আমি যদি বেঁচে থাকি তবে আমার উপর হওয়া প্রতিটি অত্যাচার নির্যাতনের হিসাব আমি নিব। এর থেকে দ্বিগুণ কষ্ট আমি আপনাকে ফিরিয়ে দিব। আপনি সহ্য করতে না পেরে প্রতিটি সেকেন্ড নিজের মৃত্যু চাইবেন।

নির্ণয় দ্যান দিল না দিয়ার কথায়। দ্যান দেওয়ার কথাও না। আসলে তার কান অব্দি দিয়ার বাক্য গুলো পৌঁছেছে কি-না সন্দেহ। সে তো ব্যস্ত বহুত ব্যস্ত দিয়ার ক্ষতবিক্ষত শরীর খানা খুবলে খেতে।

যখন নির্ণয়ের হুস ফিরলো ততক্ষণে দিয়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে এসেছে। রক্তে রাঙা হয়ে আছে মেঝে। ঠোঁট গুলোও কেমন ফেকাশে রং ধারণ করেছে। নির্ণয়ের বুক মোচড় দিয়ে উঠলো। সে কি আজ বেশি বেশি করে ফেললো। ফের নিজে নিজেই বলে উঠলো- ও এটারি যোগ্য।

অতঃপর খানিক্ষণ বসে রইল দিয়ার নিস্তেজ দেহটার পাশে। গালে থাপ্পড় দিয়ে ডাকলো-

—“ডোডো? এ্যাই ডোডো?

দিয়া কোনো জবাব দিলো না। তাকালো না অব্দি। ভয় হলো নির্ণয়ের সে উঠে গিয়ে পানি এনে ছিটালো মেয়েটার মুখে। উঁহু কাজ হলো না এতেও।

—“এ্যাই চোতমারানি ওঠ। ওঠ বলছি। এতো নাটক করার কি আছে? আজ কি নতুন আমি তোকে মেরেছি? ওঠ জবাব দে।

দিয়ার কোনো হেলদোল নেই। নির্ণয়ের ভয় বাড়লো। কোলে তুলে নিল দিয়ার দেহ খানা। ছুটলো ওয়াশরুমে। বেশ কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো। দিয়ার শরীর টা বোধহয় পরিস্কার করল। সাথে নিজেকে ও।

পরিস্কার করারই কথা। এই অবস্থায় হসপিটাল নিয়ে গেলে ডক্টর তাঁকেই হাজার খানেক কথা শুনাবে। মামলাও হতে পারে বউ কে এভাবে পিটানোর দায়ে। এই মুহূর্তে সে এতো রিস্ক নিতে চাইলো না।

দিয়াকে গরম কাপড় পরিয়ে ছুটলো নিজের মেনশনের উদ্দেশ্যে। এ বাড়িতে ওকে রাখা যাবেনা। সবাই যদি ওর এই অবস্থা দেখে তাহলে তার আর রক্ষে নেই। তাই তো নিজের মেনশনে যাচ্ছে এত রাতে। নির্ণয় গাড়িতে বসেই কল করল নিজের ডক্টর কে। ওপাশ থেকে ডক্টর কি বলল বোঝা গেল না।

নির্ণয় হাই স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব মেনশনে পৌঁছাতে হবে। নিজের উপর রাগ ও বেড়েছে তার। মন চাচ্ছে নিজেই নিজের গলা টিপে মেরে ফেলতে। তবে এটা সম্ভব নয়।

নির্ণয় দিয়ার শরীরে হাত দিয়ে দেখল, শরীর এখন ও ঠান্ডা। ও গাড়ির স্পিড আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিলো। যত দ্রুত সম্ভব মেনশনে পৌঁছাতে হবে।

_______________

তখন প্রায় রাত তিনটে। বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে দিয়া। পাশেই ডক্টর দাঁড়িয়ে। দিয়ার শরীরে সেলাইন চলছে। ডক্টর একবার নির্ণয়ের দিকে তাকালো। শুকনো ঢোঁক গিলে কিছু একটা লুকালো। নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বললো-

—“এভাবে মেয়েটার গায়ে হাত তোলার কোন মানে হয়? তুমি কি আদৌ মানুষের কাতারে পড়? দেখোতো মেয়েটার অবস্থা। যদি মেয়েটা মারা যেত তখন কি করতে?

নির্ণয় চুপচাপ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। ডক্টর টি তার বাপের বয়সী। তাই তো কোনো জবাব দিচ্ছে না চুপচাপ শুনে যাচ্ছে।

—“দেখো নির্ণয় ও এখনও ছোট। ও তো একটু আধটু অমান্য হবেই। ওর বয়স টাই এমন। তাই বলে এমন অমানবিক হলে তো আর চলবে না। তুমি তো শিক্ষিত মানুষ। আর শিক্ষিত হয়ে যদি অশিক্ষিতদের মত কর তাহলে অশিক্ষিত রা কি করবে একবার ভেবেছো? যাক গে সে সব। এখন ও সময় আছে নিজেকে শুধরে নেও।

নির্ণয় মাথা নাড়লো, হ্যাঁ সে নিজেকে শুধরে নিবে। ডক্টর কিছু ঔষধ লিখে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। নির্ণয় পিছু পিছু আসল। বলল-

—“আমি আপনাকে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে আসি। চলেন।

ডক্টর মাথা নেড়ে না বললেন-

—“যাও মেয়েটার কাছে যাও। আমি একা চলে যেতে পারবো। তুমি ওর একটু খেয়াল রাখো যত্ন নেও। আর ঔষধ গুলো ঠিক মতো খেতে বল।

নির্ণয় সম্মতি দিয়ে বলল-

—“জ্বি’ আচ্ছা। আপনি সাবধানে যাবেন।

ডক্টর মুচকি হেঁসে চলে গেলেন। নির্ণয় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। এরপর ছুটলো উপরে।

________________

ভোরের আলো ফুটেছে ধরণীতে। সূর্যি মামা উঁকি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। নির্ণয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এখন ও দিয়ার জ্ঞান ফিরেনি। চিন্তা বেড়েছে নির্ণয়ের। সে একের পর এক সিগারেট ফুঁকে চলেছে‌।

হঠাৎ ফোনটা প্রচন্ড শব্দে বেজে উঠল। নির্ণয় বিরক্তি নিয়ে রিসিভ করে কানে ধরলো-

—“হ্যালো”

—“কোথায় তোমরা?

আশা বেগম ফোন করেছেন। সকাল সকাল ছেলে আর বউ কে না দেখে মেজাজ তার তুঙ্গে।

—“মেনশনে”

আশা বেগম খেকিয়ে উঠলেন-

—“এ বাড়ি কি হয়েছে? তোমার সমস্যাটা ঠিক কোথায় বলতো? এমন রাত বিরাতে বউ নিয়ে চলে যাও আমাদের বলার প্রয়োজন মনে কর না।

নির্ণয় ছোট্ট করে বলল-

—“চেঁচামেচি করোনা তো আম্মু। আর আমার বউ নিয়ে আমি এসেছি তোমাদের এতো প্রবলেম হচ্ছে কেনো?

একটু থেমে-

—“এতো ফোন করে বিরক্ত করো না তো, সময় হলে আমি নিজেই ফোন করবো। রাখি”

আশা বেগম কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিলেন তবে সে আর কিছু বলতে পারলেন না। তার আগেই নির্ণয় কর কেটে দিয়েছে। তিনি বিরক্ত হলেন খুব। ছেলেটা তার একটা কথাও শুনে নাহহ। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

____________

তখন প্রায় সকাল দশটা-

দিয়ার জ্ঞান ফিরেছে। নির্ণয় নিজের হাতে রান্না করেছে দিয়ার জন্য। ঔষধ গুলো ও আনিয়েছে রফিক কে দিয়ে। নির্ণয় খাবার প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকলো। বলল-

—“এখন শরীর কেমন?

দিয়া ঠ্যাস মেরে বলল-

—“এতটাই ভালো যে এখন আমার সাউন্ড বক্সে গান ছেঁড়ে নাচতে ইচ্ছে করতেছে।

নির্ণয় একবার শুধু তাকালো তবে কিছু বলল না। খাবার প্লেট সামনে দিয়ে বলল-

—“নেও খাও, ঔষধ খেতে হবে আবার।

দিয়া খাবার প্লেট হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো। কপাল কুঁচকে বলল-

—“বিশ টিশ আবার মিশিয়েছেন নাকি? হ্যাঁ মিশাতেই পারেন আপনার আবার ভরসা নেই, আপনি সব পারেন। নাহহ এ খাবার আমি খাব না।

নির্ণয় দাঁত কিড়মিড়িয়ে তাকালো দিয়ার দিকে। বলল-

—“বিশ কেন মিশাব?

দিয়ার সোজাসাপ্টা উত্তর-

—“পথের কাঁটা সরানোর জন্য!”

নির্ণয় অবাক হয়ে বলল-

—“হোয়াট?”

দিয়া বিরক্ত হয়ে বলল-

—“বাংলা ভাষা বুঝেন নাহহ?

নির্ণয় কিছু বলল না। খাবার প্লেট নিজের হাতে নিয়ে, এক লোকমা ভাত মেখে দিয়ার মুখের কাছে ধরতেই দিয়া মুখটা সরিয়ে নিল। বলল-

—“আপনি আগে খান পরে আমি খাব।

নির্ণয় এবার অবাকের সপ্তম আসমানে। বলল-

—“Are you Fucking kidding me?

—“No Way.. আমি আপনার সাথে মজা কেনো করব? আপনি কি আমার বিয়ায় লাগেন? নাকি আপনি মজার দোকান দিছেন? আজব..

নির্ণয়ের রাগে গাঁ রি’রি করছে। কিন্তু সে তা প্রকাশ করল না। নিজেকে যথাযথ শান্ত রাখল। বলল-

—“যদি এই খাবার খেয়ে আমি বেঁচে থাকি তখন?

—“তখন আমি চুপচাপ খাবার টা খেয়ে নিব।

নির্ণয় আর কথা বাড়ালো না। এক লোকমা ভাত মুখে দিলো। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইলো। এরপর বলল-

#চলবে

😏😏